বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

বৃদ্ধার বয়স

"ছোট গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X বৃদ্ধার বয়স কত হতে পারে আলম ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। ষাট-পঁয়ষট্টি হতে পারে। তাঁর চলনেবলনে সাত পুরুষের আভিজাত্য ফুটে উঠছে। এই বয়সের কোন নারী কাঁপা-কাঁপা শরীর নিয়ে পার্কে হাওয়া খেতে আসতে পারে, এটা মোটামুটি অবিশ্বাস্য বলা যায়। ভদ্রমহিলা শুধু যে হাওয়া খাচ্ছেন তা না, আলমের সাথে চটাং-চটাং কথাও বলছেন। যেমন, একটু আগে তিনি ইটের তৈরি উঁচু বেদীতে ওঠার সিঁড়ি খুঁজে না পেয়ে এদিক- সেদিক চোখ বুলিয়ে নিলেন, তারপর দরাজ গলায় আলমকে উদ্দেশ্য করে হাঁক দিয়ে উঠলেন, " এই ছেলে! এই যে স্লিপিং বয়! হ্যালো! " ধানমন্ডি লেক। লেক-এর একপ্রান্তে একটা বিশালাকার জারুল গাছ। একটা পুরনো ইংরেজি পত্রিকা চোখের উপর দিয়ে আলম জারুল গাছের গুঁড়িতে ঠেস দিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করছিল। ইংরেজি পত্রিকা সাথে রাখার আরও একটা কারন আছে, আশপাশের মানুষ পাঠককে সমীহের চোখে দেখে। ছোটখাটো অপরাধে কেউ হুট করে সন্দেহ করে না। আলম বৃদ্ধার আচমকা হাঁক শুনে মুখের উপর থেকে পত্রিকা সরিয়ে জিজ্ঞেস করলো, " কী ব্যাপার? আমাকে ডাকছেন? " " হু " " কিছু বলবেন? " " ষাঁড়ের মত ছেলে, শুয়ে শুয়ে কী দেখছ, হাহ? আমাকে একটু ধরে উঠিয়ে দেও তো বাপু। সিঁড়ি খুঁজে পাচ্ছি না।" ঘুমে চোখ দুটো কেবল লেগে আসছিলো, এর মধ্যে এমন আচমকা অনধিকার টাইপের হামকি-ধামকি কারও ভালো লাগার কথা না - আলমেরও কাছেও ভালো লাগে নি। সে এক রাশ বিরক্তি নিয়ে বৃদ্ধাকে সাহায্য করতে এসে আবারও ধমকের শিকার হল। " তুমি কি বাপু গাধা প্রজাতির মানুষ না-কি? এত উঁচুতে টেনে তুলতে চাইছ! তুমি চাও, আমার হাতের ডানা খুলে তোমার হাতে চলে যাক? সোজাসুজি সিঁড়ি দেখিয়ে দাও, তারপর হাতটা একটু ধর, ব্যস হয়ে গেলো! " আলম রোবটের মত হুকুম তামিল করলো। বৃদ্ধা চোখের ভারী চশমা আঁচলের খুটে মুছে নিয়ে বেদীর উপর পা ছড়িয়ে বসে বললেন, " তোমার নাম কী? " " আলম। " " আলম, আমার আচরণে তুমি কি কিছু মনে করেছ? " " জি, কিঞ্চিৎ অসন্তুষ্ট হয়েছি। আপনি আমার সাথে অতি উদ্ধত আচরণ করছেন। আমাকে দুটি বিপরীতধর্মী চরিত্রের প্রাণির সাথে তুলনা করেছেন - ষাঁড় এবং গাধা। অপরিচিত কাউকে এভাবে সম্বোধন করার কথা না। " বৃদ্ধা তাঁর শ্বেতশুভ্র চুলের সিঁতির দু'দিকে আঙুল বুলিয়ে নিয়ে হাসলেন। বললেন, " হু, তোমার কথায় যুক্তি আছে। আই এপলোজাইজ। তুমি শিক্ষিত ছেলে, এটা বুঝতে পারছি। তা তুমি কি সারাদিন পার্কে ঘুমিয়ে কাটাও, না-কি অন্য কিছু করো?" আলম বেদীর পাশের জারুলের গুড়িতে আবারও ঠেস দিয়ে বসলো। অদ্ভুত কারণে এই বৃদ্ধাকে সে উপেক্ষা করতে পারছে না। সে পানসে মুখে উত্তর দিলো, " অনার্স কমপ্লিট। ফ্রম তেজগাঁ কলেজ। মাস্টার্স এডমিশানের টাকা নাই। আপাতত কাটাকুটির ব্যবসা নিয়ে আছি। " আলমের কথায় বৃদ্ধার ভুরূ কুঁচকে গেল। তিনি মৃদু হেসে বললেন, " বুঝলাম না। কাটাকুটি মানে? " " কাটাকুটি মানে কাটাকুটি! রক্তমাংস নিয়ে কারবার করি আর কি। " " তারমানে তুমি কসাই? ভালো। আজকালকার ছেলেমেয়েদের জন্য তো চেইন-শপ গুলোতে পার্ট টাইম অনেক জবই আছে এখন। তোমাকে দেখলে অবশ্য কসাই মনে হয় না। " বৃদ্ধার কথায় আলমের মধ্যে কোন ভাবান্তর দেখা গেলো না। এ মুহূর্তে তার ঘুমানো প্রয়োজন। রাতে জাগলে দিনে ঘুমানোর বিকল্প নেই। বৃদ্ধার দৃষ্টিশক্তি এখনও বেশ প্রখর। তিনি চশমার নিচের ফাঁক গলে ভালো করে তাকালেন। প্রায় ছয় ফুট গড়নের যুবক। মুখে খোঁচাখোঁচা দাড়ি। চোখে রাতজাগা ক্লান্তি স্পষ্ট হয়ে আছে। চওড়া বুক আর প্রশস্ত কাঁধ-এর এই যুবককে কসাই ভাবতে তাঁর বয়স্ক অভিজ্ঞ চোখ সায় দিচ্ছে না। আলমের দিকে চোখ ধরে রেখে ভদ্রমহিলা মনে হয় কিছুটা সান্ত্বনার স্বরেই বললেন, " আমার কথায় আবার আগের মত অসন্তুষ্ট হয়ে বসে থেকো না। কশাইগিরি কাজটা খারাপ না। অনেক জায়গায় একে ফাইন আর্টের সাথে তুলনা করা হয়। পৃথিবীর প্রথম বুচারি শুরু হয় অনেক আগে। পেলিওলিথিক যুগে। দক্ষিণ ইজরায়েলে। শহরের নাম এই মুহূর্তে মনে আসছে না। " আলমের চোখ ঘুমে বুজে আসছে। সে অনিচ্ছা নিয়ে বলল, " শহরের নাম মনে না থাকলে সমস্যা নেই। কশাইগিরির ইতিহাস জানায় আমার আপাতত আগ্রহ কম। " " উম, তা ঠিক, তা ঠিক। তা বাপু, তোমার কাটাকুটির চাকরী কি পার্মানেন্ট , না-কি টেম্পোরারি? আলম আর ধৈর্য ধরে রাখতে পারলো না। প্রায় মিনতির ভঙ্গিতে বলল, " কামকাজ যখন মিলে তখন করি। আপাতত বেকার। আর কোন কথা না, আজকের জন্য আমাকে মাফ করেন দাদীমা! ঘুমাতে দেন। " বৃদ্ধা চোখ থেকে চশমা খুলে নিয়ে আবারও হেসে ফেললেন। বললেন, " কথা বলা আমার অনেক দিনের অভ্যাস। অতীতে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করার ফল এটা। আমি বদরুন্নেসা কলেজের এক্স-প্রিন্সিপ্ যাল। অনেকেই আমাকে মেহেরজান ম্যাডাম নামে চিনে। তবে তোমার সাথে গায়ে পড়ে কথা বলার অবশ্য দুইটা স্ট্রং কারণ আছে। একটা এখন বলা যায়, আরেকটা পরে বলবো অথবা কখনই বলবো না। " আলম হালকা কেশে গলা পরিষ্কার করে নিয়ে বলল, " প্রথমটা বলেন শুনি। " " তোমাকে শুধু মাত্র আজকের দিনের জন্য একটা সস্তা চাকরী দিতে চাই। এজন্য হাজার তিনেক টাকা পাবে তুমি। তোমার স্ট্যান্ডার্ড মিনিট ভ্যালু, এর চেয়ে বেশি হবার কথা নয়। সামনে আমার একমাত্র নাতনীর বিবাহ। কিছু কেনাকাটার কাজ আছে। আমি বয়স্ক একজন মানুষ, বুঝতেই পারছ। আমার গাড়ির ড্রাইভার ছুটিতে না থাকলে সমস্যা হত না। " " আপনি একা কেন? বাসায় আর কেউ নাই? " " আপাতত নেই। কেনাকাটায় আমার নাতনীও থাকবে। এই বাজারে একজন বিশ্বস্ত পুরুষ সাথে পেলে ভালো হয়। " আলম আজীবন জটিলতা দেখে অভ্যস্ত। তার মত অচেনা মানুষকে হুট করে কেউ এতটা বিশ্বাস করতে পারে, এটা তার চিন্তার বাইরে। কোথাও একটা ঝামেলা আছে মনে হচ্ছে। আলম গাছের গুঁড়ি ছেড়ে বৃদ্ধার কাছে এসে দাঁড়িয়ে বলল, " আমাকে বিশ্বস্ত মনে হওয়ার কারণটা জানতে পারি? " মেহেরজান ম্যাডাম যেন এমন প্রশ্ন শোনার জন্য আগে থেকেই তৈরি ছিলেন। তিনি তৎক্ষণাৎ উত্তর দিলেন, " কেন জানি মনে হল, মানুষ হিসাবে তুমি খুব একটা খারাপ না। একটু আগে দেখলাম, একটা বাচ্চা ছেলে পড়ে গিয়ে ব্যথা পেয়েছে, তুমি ছেলেটাকে আদর করে তার বাবার কোলে দিয়ে এসেছ। আমাদের নবিজীও শিশুদের ভালবাসতেন। " বৃদ্ধার কথায় আলম কিছুটা লজ্জা পেলো মনে হয়। সে প্রচলিত অর্থে ভালো মানুষ নয়। পার্কে ঢোকার আগে সে একটা টং-এর দোকানের সামান্য বিলও ফাঁকি দিয়েছে। প্রথমে সে একটা কেক, একটা চা খেয়েছে। চা শেষ করে ঠোঁটের ফাঁকে একটা বেনসন সিগারেট নিয়ে কানে মোবাইল ফোন ধরে মিথ্যে অভিনয় করে বলেছে, " এই তো ভাইজান, আপনার কাছ থেকে আমি মাত্র পঞ্চাশ গজ দক্ষিণের একটা চায়ের দোকানে। কী বলেন? খুঁজে পাচ্ছেন না? এই যে আমি হাত উঁচু করে রাস্তার ডান পাশে দাঁড়াচ্ছি। কি, এবার দেখা যায়? " -- আলম তার কাল্পনিক ভাইজানকে দেখা দেয়ার অভিনয় করতে করতে হঠাত দোকানীর চোখের আড়াল হয়ে গিয়েছে। দোকানী বুঝতেও পারে নি, এই যুবক তার কথিত ভাইজানকে কোন কালেই খুঁজে পাবে না - তার পকেট শূন্য। এরপর এলো বাচ্চার ঘটনা। পার্কে ঢুকে আলমের উদ্দেশ্য ছিল একচোট ঘুমিয়ে নেয়া। শেষ দুপুরের সময়টা লেকের পরিবেশ শান্ত থাকে। প্রেমিক- প্রেমিকা জুটি গুলো হৈ হুল্লোড় করে না। একে অপরের কানের কাছে নাক ঘষে-ঘষে কথা বলে। শব্দহীন আবেগ বিনিময়। আলম অবশ্য শেষ পর্যন্ত শব্দহীন পরিবেশ পায় নি। এক ভদ্রলোক চার-পাঁচ বছরের এক ছেলে নিয়ে এসেছে। সেই ছেলে আলমের কানের কাছে কামান দাগানোর মত চিৎকার করে লাফাচ্ছে। এবং এক পর্যায়ে হাঁটুর কিছু অংশ কেটে নিয়ে কান্না-কাটি অবস্থা তার। জখম অবশ্য মারাত্মক না। ছেলেটির ফুঁপিয়ে ওঠা কান্না ভদ্রলোকের কানে যায় নি, কারন তিনি মোবাইল কথনে ব্যস্ত ছিলেন। এই সুযোগে আলম ছেলেটির কাছে এগিয়ে গিয়েছে। বাচ্চাটিকে সাহায্য করা তার উদ্দেশ্য ছিল না। সে গিয়েছিলো বাচ্চার হাতে পরে থাকা স্বর্ণের ব্রেসলেট'টা কৌশলে গায়েব করে দিতে। কৌশল কাজে লাগে নি। আলম কাছে যেতেই বাচ্চা ব্রেসলেট পরিহিত হাত হাফ প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে চেঁচিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলেছে, " আংকেল আমি হাতে ব্যথা পাই নাই, আমার তো হাঁটু কেটে গিয়েছে। আমার আব্বু কোথায়... " বাচ্চার বাবা অদূরেই মোবাইলে বিরাট কোন সমস্যা সমাধানে ব্যস্ত ছিলেন। ছেলের চিৎকারে দ্রুত ছুটে আসলেন। আলমের ব্রেসলেট অপারেশন ব্যর্থ। তার জন্য রইলো শুধু একটা সহজ শিকার হারিয়ে ফেলা একরাশ হতাশা। আফসোস বুঝি একেই বলে! আলম বৃদ্ধার দিকে চেয়ে আছে। সে প্রায় নিশ্চিত, তার সামনে বসে থাকা বয়স্কা মহিলা তার ব্যাপারে ভুল মূল্যায়ন করেছেন। এই বৃদ্ধা জানেও না, এই মুহূর্তে আলমের ডান পকেটে, পেতলের একটা গোঁফ-দাঁড়ি কামানোর ধারালো ক্ষুর ভাঁজ করা অবস্থায় আছে! আলম অবাক হওয়ার ভাণ ধরে বলল, " এই সামান্য ঘটনায় একজন অপরিচিত মানুষকে বিশ্বাস করা যায়, তাও আবার এই ঢাকা শহরে? আমার একদিনের চাকরী পর্যন্ত আপনার এই বিশ্বাস লাস্টিং করবে তো, না- কি? হাহা " আলম নিজের কথায় নিজেই হেসে ফেললো। তার কাছে মনে হচ্ছে, ভদ্রমহিলা অবশেষে তাঁর সিদ্ধান্ত থেকে সরে দাঁড়াবেন। তিনি এখন ঘোরের মধ্যে আছেন। এই বয়সের মানুষেরা নানারকম বার্ধক্যজনিত অসুখে ভুগেন। ইনিও হয়ত অপরিচিত কাউকে দেখলেই হুট-হাট চাকরী দেয়া টাইপের মত বিচিত্র কোন অসুখে ভুগছেন। হঠাত দেখা যাবে, তিনি বাড়ির দারোয়ান ডেকে বলছেন, " এই গুন্ডা কিসিমের লোক আমার বাড়িতে ঢুকল কিভাবে? একে আমি চিনি না। এখুনি পুলিশে ফোন লাগাও! " আলমের ধারণা সত্য হয় নি। মেহেরজান ম্যাডাম তাকে ভুলে যান নি, পুলিশের কাছে ধরিয়েও দেন নি। তিনি আলমকে বাড়ির মূলফটক ঘেঁষা একটা বিচ্ছিন্ন ঘরে বসিয়ে রেখেছেন। আলম মোটামুটি স্থবির হয়ে বসে আছে। সন্ধ্যা হবে হবে করছে। ধানমন্ডির প্রায় নির্জন বাড়িটা তে বাইরের লোক বলতে শুধু গেটের দারোয়ান রশিদ মিয়া। স্বামীর মৃত্যুর পর মেহেরজান তাঁর একমাত্র পুত্র সন্তান সিফাতকে বিয়ে দেন। বিয়েটা মাত্র দু'বছর টিকে ছিল। ততদিনে ফুটফুটে এক কন্যা সন্তানের জন্ম দিয়েছে সিফাতের স্ত্রী। প্রভাতের প্রথম সূর্যালোকের মত সুন্দর ও নিষ্পাপ মুখটি দেখে মেহেরজান তাঁর নাতনীর নাম রাখেন ঊষা। সিফাত আমেরিকায় পিএইচডি শেষ করে এক ইহুদী মেয়েকে বিয়ে করে ওখানেই থেকে যায়। সেই থেকে মেহেরজান শিশু ঊষাকে একটু একটু করে হাঁটা শিখিয়েছেন পৃথিবীর কঠিন পথে। আলমের এক জানালা বিশিষ্ট ঘরটা মূল বাড়ি থেকে আলাদা। ঘরের একটা অংশ, পুরনো আমলের কিছু আসবাবপত্রের স্তূপ হয়ে আছে। পুরনো আসবাবের ছড়াছড়ি হলেও ঘরটা ঝকঝকে পরিষ্কার। দেয়াল ঘেঁষে মাঝারী গোছের একটা বাংলা টেবিল আর একটা পুরনো কাঠের চেয়ার রাখা। টেবিল ড্রয়ারের আংটায় ছোট একটা তালা ঝোলানো। তালাটির মুখ খুলে আছে। এই বাড়ির মোট তেরোটা স্থানে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা লাগানো। আলমের ঘরের ক্যামেরাটি অত্যন্ত ক্ষুদ্র ও লুকানো। হঠাত করে বোঝার উপায় নেই এরকম একটা অগোছালো ঘরেও সার্ভিলেন্স ক্যামেরা থাকতে পারে। এই মুহূর্তে মেহেরজান তাঁর নাতনী ঊষাকে নিয়ে একটা স্ক্রিনের সামনে বসে আছেন। ঊষার চোখে অপার্থিব বিস্ময় খেলা করছে। স্ক্রিনের যুবকের মাঝে তার দীর্ঘদিনের অতি পরিচিত একটি মানুষের বেশ মিল রয়েছে। সেই পরিচিত মানুষটির নাম অয়ন। একেবারে সিনেমা নাটকের দ্বৈত চরিত্রের মত দেখতে। পার্থক্য শুধু একটাই, অয়ন কিঞ্চিৎ কুঁজো হয়ে বসতো। এছাড়া দুজন কে অনায়াসে বদলে আনা যায়। যদিও এখন আর বদল করা সম্ভব নয়। দীর্ঘ আট বছরে তিল-তিল করে গড়ে তোলা ভালোবাসার বাঁধভাঙা স্রোতটি দুবছর আগেকার এমনই এক সন্ধ্যায় হঠাত থমকে গিয়েছিলো। ঢাকা শহর কিছুদিনের জন্য আগুণের হোলী খেলার কেন্দ্র হয়ে উঠেছিলো। ইউকে থেকে গ্রীষ্মের ছুটিতে দেশে আসা ভীষণ মেধাবী এক যুবক তার ব্যক্তিগত গাড়িসহ ঝলসে গিয়েছিলো সেদিনের পেট্রল বোমার আঘাতে। সরকার কিংবা বিরোধী রাজনীতির কোন দল সেদিন জানতেও পারে নি, ঝলসে যাওয়া যুবকের গায়ে তখনও হলুদের গন্ধ লেগে ছিল। ঊষা স্ক্রিনে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারলো না। তার চোখে এখন অন্যকিছুর আনাগোনা। সে ধরা গলায় বলল, " দাদীমা, সবই তো বুঝলাম। কিন্তু এটা কিভাবে ভুলে যাই যে, সে অয়ন নয় - সে একজন অপরিচিত আগন্তুক মাত্র? " মেহেরজান তাঁর অতি আদরের নাতনীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, " ইয়েস মাই ডিয়ার চাইল্ড। আমি জানি সে অয়ন নয় - অন্য কেউ। আমি একটা ঝুঁকি নিতে চাই। জানি এটা আমার বাড়াবাড়ি, তবু ঝুঁকিটা নিতে চাই। " ঊষা যেন কিছুটা কেঁপে উঠলো। বলল, " ও মাই গুডনেস! তুমি কি আমার ব্যাপারে কোন পরিকল্পনা করছ? " মেহেরজান কপট রাগ দেখিয়ে বললেন, " আমাকে এত কাঁচা মনে করছিস কেন ঊষা? আমি জানি, অভাবের যন্ত্রণা মাথায় নিয়ে পথে-ঘাটে ঘুরে বেড়ানো মানুষকে হুট করে বিশ্বাস করা যায় না। জীবনের ভয়ঙ্কর জটিলতা দেখতে দেখতে এরা মনের অজান্তে নিজেরাই একসময় জটিল হয়ে যায়। তবে কারও কারও মধ্যে মানবিকতার মত ভীষণ অসাধারণ কিছুও খুঁজে পাওয়া যায়। প্রস্ফুটিত হওয়ার কোন সুযোগ থাকলে, সেটা তাদের দেয়া উচিৎ। ছেলেটা ছোটখাটো কোন অপরাধের সাথে জড়িয়ে থাকতে পারে। এ সম্ভাবনা আমি উড়িয়ে দিচ্ছি না। তবে এদেরকে মেইন স্ট্রিমে আনার প্রয়োজন আছে। অয়ন ঘটিত আবেগও একটা ফ্যাক্ট। " " বুঝতে পারছি, দাদীমা। তোমার এই এক্সপেরিমেন্টে সঙ্গ দিতে হলে আমার স্টিলের নার্ভ দরকার! বাই দা ওয়ে, এই লোকের মধ্যে অসাধারণ কিছু কি পেয়েছ? " মেহেরজানের মুখে তাৎক্ষণিক কোন উত্তর এলো না। তিনি স্ক্রিনের দিকে আবারও নিরিখ করে তাকালেন। আশ্চর্য হলেও সত্য, এখন পর্যন্ত আলম একটিবারের জন্য চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ায় নি। মাঝে কিছুক্ষণ মোবাইল নিয়ে নাড়াচাড়া করেছে। এদিক- ওদিক একটু উঁকিঝুঁকি মেরেছে, এখন শান্ত হয়ে বসে আছে। তার সামনের টেবিল- ড্রয়ারের তালাটা খোলা। অথচ ড্রয়ারে কী আছে এ ব্যাপারে তার কোন কৌতূহল নেই। ছ্যাঁচড়া গোছের মানুষরা একটা পেপার- ওয়েট পেলেও পকেটে গুঁজে রাখে। মেহেরজান আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গীতে বললেন, " অসাধারণ কিছু আসলেই পেয়েছি কি-না, এখনও বুঝতে পারছি না। এই ছেলেকে গত পনেরো দিন যাবত লেকের ধারে দেখছি। এই পনেরো দিনে মোট কুড়িটা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নোট করেছি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটা বৈশিষ্ট্য হল, তাকে কোন মেয়ের দিকে খারাপ দৃষ্টিতে তাকাতে দেখি নি। পুরুষের চোখের এই বিশেষ দৃষ্টি রিড করা সহজ, এটা তো অন্তত জানিস! " ঊষা মাথা পিঠের দিকে ভাঁজ করে সিলিং বরাবর চোখ রেখে বড় করে একটা নিঃশ্বাস ছাড়ল। বলল, " দাদীমা, ঝুঁকিটা তুমি একটু বেশিই নিচ্ছ। " মেহেরজানের মাথায় অন্য কিছু খেলা করছে। নিজেদের ব্যক্তিগত বাড়িটি সহ ঢাকা শহরে তাঁর আরও পাঁচটা বহুতল বাড়ি রয়েছে। আরও কিছু মাঝারী মানের ইনভেস্টমেন্টের সাথে শংকরে একটা তিনতলা মার্কেটের পুরোটাই ভাড়া দেয়া আছে। এই বয়সে এত চাপ তিনি নিতে পারছেন না। তিনি তাঁর প্রিয় নাতনীর দিকে আগ্রহ ভরে তাকালেন। এবং মোটামুটি একটা বিশ্লেষণ দাড় করিয়ে বললেন, " ঝুঁকি নেয়ার ব্যাখ্যা আমি আগেই দিয়েছি, ডিয়ার। তুই হিসেব করে দেখ, গত ছয় বছরে আমাদের প্রোপার্টি দেখভালের জন্য প্রচলিত নিয়মে ইন্টার্ভিউ নিয়েছি। এক-এক করে চারজন ম্যানেজার নিয়োগ দিয়েছি। এরা সবাই উচ্চ শিক্ষিত ছিল, তবে মানবিক বা সৎ কিছুই ছিল না। ছয় বছরে মোট আটাশ লাখ টাকা লুটে খেয়েছে এরা। " মেহেরজান একটু দম নিয়ে আবার বললেন, " একটা জিনিশ প্রায় আমার মনে আসে। এদেশের সবচেয়ে বড় দুর্নীতিবাজ গুলোর অধিকাংশই ছাত্র জীবনে তার ক্লাশের সবচেয়ে মেধাবী মুখ ছিল। সময়ের সাথে এই মেধাবী ছেলেমেয়ে গুলোর মেধা চর্চার অবস্থানও পরিবর্তিত হয়। এরা দেশের বড় আমলার চেয়ারে বসে, এবং অনেকেই দুর্নীতির প্রতিযোগিতায় নাম লেখায়। অথচ এরাই ছাত্র জীবনে, " দুর্জন বিদ্যান হইলেও পরিত্যাজ্য " ভাব সম্প্রসারণ লিখে হায়েস্ট মার্কস পেত! প্রচলিত গৎবাঁধা শিক্ষা মনুষ্যত্ব বিকাশের একটা উপায় এটা মানি - তবে একমাত্র উপায় নয়। " ঊষা হতাশার স্বরে বলল, " হু, বুঝলাম। কিন্তু তুমি করতে চাওটা কী, শুনি? " " উলটো পথে হেঁটে দেখতে চাই। সব কিছু ঠিক থাকলে, ছেলেটিকে আমাদের প্রোপার্টি ম্যানেজার করার ইচ্ছে আছে। এজন্য ওকে অবশ্য বেশ কিছু পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। " কথা শেষ করে মেহেরজান তাঁর আলমিরা খুললেন। সেখান থেকে ভ্যালভেট কাপড়ের একটা সুদর্শন বক্স বের করে ঊষাকে গাড়ি বের করতে বললেন। আলম অপেক্ষায় থাকতে থাকতে এক পর্যায়ে টেবিলের উপর কপাল ঠেকিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলো। দারোয়ান রশিদ মিয়া এসে তাকে জাগিয়ে দিয়ে বলল, তার ম্যাডাম গাড়ি বারান্দায় আলমের জন্য অপেক্ষা করছেন। আলম চোখ কচলিয়ে বাইরে এসে দাঁড়াতেই বৃদ্ধা আগের মত সহাস্য হাঁক ছাড়লেন, " কী স্লিপিং বয়! সারাক্ষণ পড়ে পড়ে ঘুমালে হবে? চলো, তোমার ডিউটি এখন থেকেই শুরু হল। " আলম এগিয়ে আসছে। ঊষা হেঁটে আসা মানুষটিকে এক ঝলক দেখে নিলো। ছেলেটা পুরোপুরি অয়নের মত দেখতে, এটা ঠিক নয়। কেমন যেন হেলেদুলে হাঁটে, চোখ দু'টোও অয়নের মত মায়াকাড়া নয়। তবু হঠাত দেখলে বুকের এক পাশ কেঁপে উঠতে চায় বারংবার। আলম তার ডান হাত প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালো। পকেটের মধ্যে তার হাত ভাঁজ করে রাখা ধারালো বস্তুটির স্পর্শ পাচ্ছে। এ দেশে শ্রেষ্ঠ পাঁচ জন বোকা নারীর তালিকা করা হলে এই বৃদ্ধার অবস্থান নিশ্চিত উপরের দিকে হওয়ার কথা। বুড়ো বয়সে ভীমরতি হলে যায় হয় আর কি! আলম ঘাড় ঘুরিয়ে বৃদ্ধার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ভীষণ অপরূপা এক তরুণীর দিকে তাকিয়ে আবার দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। এই তাহলে বৃদ্ধার তথাকথিত নাতনী! এরই সম্ভবত বিয়ে। কোন এক অদ্ভুত কারনে মেয়েটার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে আছে। মেয়েটা কী কোন কারনে ভয় পাচ্ছে? ভয় পাওয়ার মত কিছুই তো এখনও ঘটে নি। ভাবতে ভাবতে আলম বৃদ্ধাকে অনুসরণ করলো। মেহেরজান আলমকে নিয়ে পেছনের সিটে বসলেন। ঊষা গাড়ির স্টেয়ারিং-এ হাত রাখল। গাড়ি এখন ইস্টার্ন প্লাজা অভিমুখে যাচ্ছে। প্রায় দু'ঘন্টা ধরে মেহেরজান ঊষাকে নিয়ে নির্ঝঞ্ঝাট কেনাকাটা সারলেন। নিজেদের জন্য কিছু জামাকাপড় কিনলেন। বেরুনোর আগে জুয়েলারির দোকান থেকে লাল রঙের ভ্যালভেটে মোড়া একটা বক্স নিয়ে আনন্দিত মুখ নিয়ে বের হলেন। আলম কিছুটা চিন্তিত, কারণ তাকে কোন কঠিন দায়িত্ব দেয়া হয় নি। মার্কেটে প্রবেশের পর মেহেরজান হেসে বলেছিলেন, " শোন বাপু, তোমার দায়িত্ব তেমন একটা নেই। তুমি আমাদের সাময়িক বডি গার্ড। দেশে চোর-বাটপারের তো আর অভাব নেই! জুয়েলারি শপ-এ যাওয়ার পর তুমি দূরে দাঁড়িয়ে শুধু খেয়াল রাখবে কেউ আমাদের ফলো করছে কি-না। ছয় ভরী ওজনের গয়নার সেট নিয়ে দুজন অবোলা নারীর নিরাপত্তার একটা বিষয় আছে, তাই না? " বৃদ্ধার কথায় আলমের ভেতরটা খারাপ লেগে ওঠে। ভেতরের গহীনে লুকিয়ে থাকা মানুষটা বেরিয়ে আসতে চায়। এত উচ্চ শিক্ষিতা একজন প্রবীণা এতটা শিশুসুলভ বিশ্বাস করেন কিভাবে? মাত্র কিছু সময়ের মধ্যে এই বিশ্বাস তাসের ঘরের মত ভেঙে পড়বে। কারণ ইতিমধ্যে আলম তার কিছু সহযোগীকে শিকারের বৃত্তান্ত জানিয়ে দিয়েছে। কাটাকুটিতে তার চেয়ে বেশি অভিজ্ঞ তার মনির ভাই। কলেজে থাকাকালীন মনির আলমের এক ইয়ার সিনিয়র ছিল। বেচারা ইভ টিজিং করতে গিয়ে রেইপ-এর মামলার ফাঁদে পড়ে বসে। জেল জরিমানা হওয়ার পর আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারে নি। সে এখন মোটর সাইকেলের বিখ্যাত স্টান্ট। সমস্যা একটাই, সে তার স্টান্টবাজীর মেধা দুর্ধর্ষ ছিনতাইয়ের কাজে ব্যবহার করে। গত সপ্তাহে একটা ল্যাপটপ কেঁড়ে নেয়ার সময় এক প্রফেসর সাহেবের চোখ কলমের খোঁচা দিয়ে গেলে দিয়েছে সে। গ্রিন রোডের একটা মোটর গ্যারেজে তাদের মূল আস্তানা। আস্তানা হিসেবে গ্যারেজ খুব ভালো জায়গা। সার্ভিসিং করাতে আনা অন্যের মোটর সাইকেলে চড়ে সহজেই কাজ করা যায়। আলম লম্বা করে একটা শ্বাস ছাড়ল। এক অভিযানে দু'তিন লাখ টাকার গয়না পেয়ে যাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। অভিযান সফল হলে আজ আলমের পারসেন্টেজ বাড়িয়ে দেয়া হবে। স্বয়ং মনির ভাই কথা দিয়েছেন। আজ সায়েন্স ল্যাব মোড়ের বিখ্যাত জ্যাম নেই। ঊষা খুব সাবলীল ভাবে গাড়ি চালাচ্ছে। আলমের দিকে একবার ফিরেও তাকায় নি। এতে অবশ্য আলমের কিছু আসে যায় না। অপরিচিত যুবকের সাথে কথা বলার কিছু নেই। এসব শুধু সিনেমা-নাটকে মানায়। বাস্তবের সুন্দরীরা এসব ক্ষেত্রে একটু হিসেবী মনোভাব দেখায়। তবে অতিরিক্ত অহংকার ভালো না। আলম সৌজন্য বিনিময়ের কিছু সুযোগ খুঁজেছে, কিন্তু মেয়েটি কোন প্রতিক্রিয়া দেখায় নি। গাড়ি ল্যাব এইডের সামনের রাস্তা থেকে বাঁয়ে ঢুকেছে। মেহেরজান অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্নের রাজ্য খুলে নিয়ে বসেছেন। বেশিরভাগ প্রশ্ন আলমের পরিবার বিষয়ক। আলম অত্যন্ত সফলতার সাথে প্রতিটা তথ্য মিথ্যা করে বানিয়ে উত্তর দিয়েছে। এই মুহূর্তে তার দৃষ্টি গাড়ির সামনের দিকে। আলমের বুকে হাতুড়ি পেটানোর শব্দ শুরু হয়েছে। তার ডান পাশে স্তূপ করে রাখা শপিং-এর ব্যাগ। আরও ডানে বোকা বৃদ্ধা এক মনে বকবক করে যাচ্ছেন। তারা লেক-এর কাছাকাছি একটা নির্জন জায়গায় আসতেই দুটো মোটরসাইকেল ধীর গতির গাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালো। আলমের সতর্ক হাত এখন ডান পকেটে ভাঁজ করে রাখা ধারালো অস্ত্রের উপর। রাত খুব বেশি না হলেও এই রাস্তায় মানুষের পদচারনা কমে এসেছে। অন্য কোন সময় অন্য কোন পরিস্থিতি হলে হয়ত চিৎকার চেঁচামিচি বেশি হত - আজ চেঁচামিচি হল না। বৃদ্ধা তাঁর নাতনীকে শান্ত হয়ে গাড়ি সাইড করতে বললেন। মেহেরজান সকল দায়ভার নিজ কাঁধে নিয়ে নিলেন। এ দায়ভার তাঁর জন্য নতুন নয়, এ দায়ভার তিনি শুরু থেকেই নিয়েছিলেন। ভীষণ যৌক্তিক মানুষ হয়েও আগুণ নিয়ে খেলা করার মত অযৌক্তিক আবেগ নিয়ে বসে ছিলেন। পৃথিবীর চোখে অনেক কিছু অযৌক্তিক হলেও, তাঁর কাছে এটা ছিল, ছড়িয়ে যাওয়া পুথির মালা আবার নতুন করে গেঁথে নেয়া ইচ্ছের মত। আলম শুধু ভ্যালভেটে মুড়ে রাখা স্বপ্নের বিনিময়ে তাদের কোন ক্ষতি না করার প্রতিশ্রুতি দিলো। মেহেরজান নির্লিপ্ত ভঙ্গিমায় পার্স থেকে তিনটি একহাজার টাকার নোট বের করে আলমের দিকে বাড়িয়ে বললেন, " মিঃ আলম, আপনার ধর্ম আপনি পালন করেছেন, এবার আমার কথা আমকে রাখতে দিন। আপনার পারিশ্রমিক নেয়া হয় নি। টাকাটা নিন। " আলম গাড়ি থেকে নেমে গিয়ে কিছুটা থমকে দাঁড়ালো। হাত বাড়িয়ে আনমনা হয়ে টাকাটা নিলো। মেহেরজান গাড়ির সাইড-গ্লাস টেনে তোলার আগে শেষ বারের মত আলমের দিকে তাকিয়ে ডাকলেন। অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, " আলম, আপনাকে বিশ্বাস না করার হাজারটা কারণ ছিল। তবু আপনাকে বিশ্বাস করেছিলাম। শুদ্ধ হওয়ার সুযোগ কখনও ফুরিয়ে যায় না, শুধু এটুকু মনে রাখবেন। " আলম আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না। তার মনির ভাই দৌড়ে এসে কলার টেনে খেঁকিয়ে উঠলো, " এই লাইনে নতুন পুলাপাইন নিয়া কাজ করলে মরণ আছে আমার! ব্যাটা নাটক করার সময় নাই। তাড়াতাড়ি ভাগ! " ঊষা এক্সিলারেটর-এ পা রেখে কণ্ঠে বিষাদ নিয়ে তার দাদীমার উদ্দেশ্যে বলল, " ওল্ড লেডি! ইনাফ ইজ ইনাফ! " মেহেরজান কোন কথা বললেন না। তিনি অন্য কিছু ভাবছেন। আলমকে দেখানোর জন্য জুয়েলারি দোকানে গিয়েছেন সত্য, তবে দামী কোন গয়না কেনেন নি। ভ্যালভেট কাপড়ের বক্সটা তিনি তাঁর নিজের বাসার আলমিরা থেকে নিয়ে এসেছিলেন। বক্স দেখতে সুন্দর হলেও, ভেতরে ছিল গোল্ডেন পালিস করা সস্তা ধাতুর তৈরি গয়না। যদিও আলম নামের স্মৃতি কাতর করে দেয়া ছেলেটির জন্য এর চেয়ে বড় পুরষ্কার দেয়ার ইচ্ছে মেহেরজানের ছিল। ছেলেটিকে আসল অলংকার গুলো দিতেও তাঁর খারাপ লাগতো না। তাঁর মনটাই খারাপ হয়ে গেলো। অয়নের ডুপ্লিকেট ছেলেটিকে দ্বিতীয় কারণটি আর বলা হল না। বাসায় ফিরে ঊষা শাওয়ার ছেড়ে তার নীচে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে কাঁদল। অয়ন মারা যাওয়ার পর বেশ কয়েক মাস যাবত এই অভ্যাসটা তার ছিল। প্রায় প্রতি রাতেই সে অয়নকে স্বপ্নে দেখে গভীর রাতে শাওয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে কাঁদত। বহুদিন হল অয়ন আর স্বপ্নে আসে না। দেয়াল ঘড়ি ঢংঢং করে মোট বারো'টা ঘন্টা বাজিয়েছে। মেহেরজান তাঁর দুঃখী নাতনীর মাথা কোলের মধ্যে টেনে নিয়ে চুলে বিলি কেটে দিচ্ছেন। দুজনই নীরব এবং ক্লান্ত। শৈশব থেকে বাবা-মা থাকতেও মেয়েটি অনাথ হয়ে ঘুরছে। ডিভোর্সড বাবা-মা'র পক্ষ থেকে প্রতি সপ্তাহে এক বার ফোন করে মেয়ের খোঁজ নেয়া, অনাথ হয়ে থাকারই নামান্তর। অয়ন ছেলেটা বেঁচে থাকলে এই দিন হয়ত দেখতে হত না। ভাবতে ভাবতে মেহেরজানের বুকটা ভেঙে আসে। মেহেরজানের চোখ লেগে আসছিলো, তিনি হঠাত চমকে উঠলেন। তাঁর শোবার ঘর থেকে রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে বিকট শব্দে ইন্টারকম-এর ফোন বেজে উঠেছে। রশিদ মিয়া ফোন দিয়েছে। মেহেরজান ক্লান্ত কন্ঠে হ্যালো বলতেই রশিদ মিয়া হাঁপাতে হাঁপাতে জানালো, " ম্যাডাম, গেইটের সামনে এক লোক শুয়া আছে। অবস্থা ভালো না। পকেট-গেইটের ফাঁক দিয়া দেখলাম। চেহারাডা বিকালে আফনের সাথে আসা ভাইজানের মত। এখন কী করি? " পুলিশকে খবর দেয়া হয়েছে। তাঁদের আসতে কত সময় লাগবে কে জানে। ঊষা বিরাট লজ্জায় পড়ে গিয়েছে। তার চোখ ভরে জল আসছে, কিন্তু মুছে নিতে পারছে না। কারণ তার হাত অন্য কাজে ব্যস্ত। সে দু হাত দিয়ে সজোরে চেপে ধরে আছে আলমের পেটের বাঁ দিক'টা। সেখানে ফিনকী দেয়া রক্তে বরফ কুঁচির কাপড় মুহূর্তে লাল হয়ে উঠছে। মেহেরজান আলমের মাথাটা পরম মমতায় কোলের মধ্যে আগলে ধরে আছেন। তার পাশে অবলীলায় পড়ে আছে ভ্যালভেট বক্স'টা। ছেলেটা বুঝতেও পারে নি, সস্তা দরের একটা নিছক বাকসো বাঁচাতে গিয়ে তার নিজের জীবন আজ বিপন্ন। বাজার মূল্যে এটা হয়ত সস্তা ছিল, কিন্তু মেহেরজানের বিশ্বাসটা তার কাছে সস্তা নয়। ঊষা ব্যাথায় নীল হয়ে যাওয়া আলমের দিকে তাকিয়ে এক ঝটকায় উঠে গিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিলো। পুলিশের জন্য সময় নষ্ট করার মত সময় নেই তার হাতে। আলম বহু কষ্টে কিছুটা শক্তি সঞ্চয় করে নিয়ে বৃদ্ধার দিকে তাকিয়ে কিঞ্চিৎ হাসল। তারপর বড় করে একটা শ্বাস নিয়ে টেনে টেনে বলল, " আপনার বিশ্বাস আমি ফিরিয়ে দিতে এসেছি। ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। ছুরি অনেক ভেতরে ঢুকেছে, বাঁচব বলে মনে হয় না। আপনার স্লিপিং বয় এবার পুরো স্লিপিং হয়ে যাবে। " কথা শেষ হতেই আলমের শরীরে ভয়ানক খিঁচুনি শুরু হল। সে আর চোখ মেলে রাখতে পারছে না। আশপাশের দৃশ্য ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসছে। শব্দ কমে আসতে শুরু করেছে। কেউ একজন তার মুখের কাছে ঝুঁকে এসে চিৎকার করে বলছে, " মাই ডিয়ার চাইল্ড, পরম করুণাময়ের কাছে দরকার হলে আমার নিজের জীবনের বিনিময়ে তোমার জীবন চাইবো আমি! তোমার বেঁচে থাকা বড্ড বেশি প্রয়োজন। আমি তোমাকে মরতে দিব না। কিছুতেই না। আই প্রমিজ! " রাতের নির্জনতা ভেদ করে গাড়ি সাঁই-সাঁই করে ছুটছে। সময় ফুরিয়ে আসছে অথচ পথ ফুরাতে চাচ্ছে না। ঊষা কাঁধ বাকিয়ে একটু পর পর চোখের জল মুছে নিচ্ছে। এমন বাঁধনহারা জল সে কখনই ফেলতে চায় নি! # হাবিজাবিঃইফতেখার_মাছুম


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮১ জন


এ জাতীয় গল্প

→ ৯৩ বছর বয়সী বৃদ্ধার শখ বিমান চালানো!

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now