বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

খুকি এবং এক টুকরো সুখ দুঃখ

"ছোট গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X খুকি এবং এক টুকরো সুখ দুঃখ। - সংশয় রহমান। ================ ১ । -রহিমা এককাপ চা দাও তো ! -জ্বি আফা দিতাছি ! তড়িঘড়ি করে চা নিয়ে মিসেস জামানের বেডরুমে ঢোকে রহিমা । মিসেস জামান তখন বিছানায় আধশোয়া হয়ে পত্রিকায় পাতা উল্টাচ্ছিলেন । চা এগিয়ে দিয়ে পাশে দাড়িয়ে থাকে রহিমা । -কিছু বলবে ? -জ্বে । আইজকা আমারে একটু তাড়াতাড়ি ছাইড়্যা দেওন লাগবো আফা । পোলাডা খ্যালতে যাইয়া পায়ে চোট পাইছে । পত্রিকা ভাঁজ করে রেখে রহিমার দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকলেন মিসেস জামান । সত্য নাকি মিথ্যা বলছে বোঝার চেষ্টা করলেন হয়তো । -আচ্ছা ঠিকাছে । দুপুরের খাবার রেডী করে যেও । রাতেরটা আমি ম্যানেজ করে নেব । -জ্বে আফা । -জ্বে আফা কি ? তোমাকে কতোবার বলেছি শুদ্ধ করে কথা বলতে ? বলো জ্বি আপা ! -জ্বি আফা -আফা না , বলো আপা । জ্বি আপা -জ্বি আপা । -ঠিকাছে যাও এখন । রান্নাটা সেরে ফেলো । উজ্জ্বল হয়ে ওঠে রহিমার মুখ । দুঃশ্চিন্তার কালো মেঘ সরে যায় চেহারা থেকে । শাড়ীর আচল দিয়ে কপাল মুছতে মুছতে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ায় রহিমা । ২। ঘুণেধরা কাঠের দরজাটা ঠেলে ঘরে ঢুকল রহিমা ।এক হাতে একটা বোতলে ৫ টাকার খোলা সরিষার তেল । ২ টাকার কিনতে চেয়েছিল কিন্তু দোকানি দিতে রাজি হয়নি । বলে ২ টাকার নাকি আজকাল কিছুই পাওয়া যায় না । কে বলেছে পাওয়া যায় না । খোকার বাপ এখনো প্রতিরাতে ২ টাকার বিড়ি কিনে আনে । ২ টাকায় ৫টা বিড়ি পাওয়া যায় । রহিমার আর এক হাতে একপাতা প্যারাসিটামল । গরীবের একমাত্র ঔষধ । জ্বর হলে প্যারসিটামল , সর্দি হলে প্যারাসিটামল , পেট ব্যাথায় প্যারাসিটামল , মাথা ব্যাথায় এমনকি ডায়রিয়াতেও ঐ এক প্যারাসিটামল । আজকাল রহিমা ঔষধের দোকানে গিয়ে দাড়ালেই দোকানি ছেলেটা একপাতা প্যারাসিটামল এনে দেয় । বিনিময়ে ৮ টাকা গুনতে হয় রহিমাকে । বিছানায় কুন্ডলী পাকিয়ে ঘুমিয়ে আছে খোকা । ডান পা টা গোড়ালির কাছে ফুলে আছে । টেবিলের উপর ঔষধের পাতাটা রেখে রান্নাঘরে যায় রহিমা । রসুন সহ সরিষার তেলটুকু গরম করে । একটা বাটিতে করে তেলটুকু নিয়ে বিছানায় খোকার পায়ের কাছে বসে রহিমা । ডান হাতের আঙ্গুল দিয়ে খানিক তেল নিয়ে দুহাতে ভালো করে ঘষে নেয় । তারপর খোকার ফুলে যাওয়া জায়গাটায় মালিশ করতে থাকে । জেগে যায় খোকা । শুয়ে থাকা অবস্থাতেই চোখ মেলে তাকায় । -"কহন আইছো মা ?" -"অহনই আইলাম বাবা ! তোমার বাপজানে কই ?" -"আব্বায় রিসকা লইয়া অহনই গেল গা ।" -"দুপরে খাওন হইছে বাপজান ?" -"হ মা খাইছি ।আইজকা আব্বায় আমারে তুইল্যা খাওয়াই দিছে !" মুখে হাসির আভা দেখা যায় খোকার । -"তা বাপধন কি দিয়া খাইলেন ? সালুন কি আছিলো ?" মালিশ দিতে দিতে ছেলের সাথে গল্প করতে থাকে রহিমা । -"আব্বায় ডিমের সালুন রানছিলো ! হেব্বি টেস হইছে । তুমার থাইক্যাই ভালা " মুখ টিপে হাসে রহিমা । মানুষটা কথা কম কইলেও মানুষটার দিলডা ভালা । টুইস্যার বাপের থিকাও ভালা ! ৩। ইদানিং কাজে যেতে লজ্জা করে রহিমার । তিনমাসের অন্তঃস্বত্বা সে । শরীরের আকৃতি অনেকটাই বদলেছে । এখন একটু খানি ভালো করে তাকালেই বুঝতে পারা যায় । শাড়ী দিয়ে ভালো করে ঢাকলেও কাজ হয়না । আর কয়দিন পরই কাজ ছেড়ে দেবে রহিমা । খোকা যথন পেটে ছিল তখন স্বাস্থ্য আপা বলে গেছে এই অবস্থায় ভারী কাজ করা ঠিক না । রহিমা ঠিক করে আজকেই মিসেস জামানকে জানিয়ে রাখবে । চা নিয়ে মিসেস জামানের বেডরুমে ঢোকে রহিমা । -"আপা আপনের চা !" -"কি ব্যাপার রহিমা ? আজকে চা না চাইতেই হাজির ! কিছু বলবে ?" চায়ের কাপ হাতে নিতে নিতে বললেন মিসেস জামান । -"না.... মানে.... আপা !" -"তোতলাচ্ছো কেন ? ও আচ্ছা বুঝেছি । ছুটি দরকার ? বেশ তো ! এসময় কাজ না করাই ভালো । বাসায় বসে রেস্ট নাও । আর শোন প্রতিমাসে তোমার স্বামীকে একবার পাঠিয়ে দেবে , তোমার বেতন নিয়ে যাবে ।" -"জ্বে আইচ্ছা আফা " প্রচন্ড আনন্দে বলে ওঠে রহিমা -"আবার ? ঠিকভাবে বলো !" কপট রাগ দেখায় মিসেস জামান । -"জ্বি আচ্ছা আপা !" হেসে চলে যেতে ধরে রহিমা । দরজার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে প্রায় এমন সময় আবার ডাকেন মিসেসে জামান । -"রহিমা শোনো !" ফিরে আসে রহিমা । -"কত মাস হলো বাচ্চার ?" লজ্জা পায় রহিমা । আচলে মুখ ঢেকে আস্তে করে বলে -"তিনমাস হইল আপা ।" -"দেখি এদিকে আসো !" কাছে ডাকেন মিসেস জামান । সংকোচে এগিয়ে যায় রহিমা । শাড়ীর উপর দিয়েই আস্তে করে একটা হাত রহিমার পেটের উপর রাখেন মিসেস জামান । যেন বাচ্চাটাকে স্পর্শ করতে চান । নিজের মাথাটা এগিয়ে নিয়ে যান । কানটা চেপে ধরেন রহিমার পেটের সাথে । যেন বাচ্চার প্রতিটা নড়াচড়া তিনি উপলব্ধি করতে চান । রহিমার অস্বস্তি হচ্ছিল খুব । একটু পর মাথাটা সরিয়ে নিলেন মিসেস জামান । চোখ তুলে রহিমার দিকে তাকাতেই রহিমা দেখতে পেল মিসেস জামানের গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রু । ভেতরটা কেঁপে উঠল রহিমার । রহিমা ভুলেই গিয়েছিল যে মিসেস জামান কোনদিন মা হতে পারবেন না ।অশ্রু লুকানোর কোন চেষ্টা করলেন না মিসেস রহমান । জড়ানো গলায় রহিমাকে চলে যেতে বললেন । যাবার সময় মনে করিয়ে দিলেন তার স্বামী এসে প্রতিমাসে যেন বেতনটা নিয়ে যায় । রহিমা বাড়ির পথে হাটা ধরলো । হাঁটতে হাঁটতেই একটা ভয়ংকর সিদ্ধান্ত নিল রহিমা । খোকার বাপের সাথে পরামর্শ করা দরকার । ৪। (কিছু মাস পর) রহিমার ভাঙ্গা ঘরের সামনে চকচকে একটা পাজেরো দাড়িয়ে আছে । তার পাশে একটা প্রায় ভেঙ্গে পড়া রিকসা । পাজেরোর মালিক এবং রিকসার মালিক দুজনই এখন রহিমার ঘরের ভেতরে । পাজেরোর পাশেই ফাঁকা জায়গাটায় রহিমার ছেলেটা খেলছে । খোকার পা টা ঠিক হয়ে গেছে । এখন সে দৌড়াতেও পারে , লাফাতেও পারে । কিছুক্ষন পর রহিমার ঘর থেকে একজন পুরুষ এবং একজন মহিলা বের হয়ে এলো । মহিলাটির দুবাহুর উপর তোয়ালে দিয়ে জড়ানো একটি ছোট্ট ফুটফুটে কন্যা শিশু । পুরুষটির হাতে একটা ব্রিফকেস । কিন্তু চোখ দুটো মহিলার কোলে থাকা কন্যা শিশুটির দিকে । ব্রিফকেসটা রেখে আসার কথা ছিল । কিন্তু এই কুড়েঘরের মালিক ব্রিফকেসটা রাখতে আপত্তি জানায় তাই বাধ্য হয়েই সঙ্গে করেই নিয়ে যেতে হচ্ছে । মূল্যবান এই ব্রিফকেস এখন এদের কাছে একদমই মূল্যহীন ।ঘরের ভেতর বিছানায় শুয়ে আছে রহিমা । খোকার বাপ তার একহাত দিয়ে রহিমার একহাত ধরে আছে । আরেকহাত দিয়ে চোখ পরিষ্কার করছে । বাইরে খেলা বন্ধ করে খোকা অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে চলে যাওয়া পাজেরোর দিকে । ৫। (বেশ কয়েক বছর পর) -"রহিমা ! এই রহিমা !" চেচিয়ে ডাকে খুকি ! খুকি হচ্ছে জামান দম্পত্তির একমাত্র মেয়ে । -"তোমাকে কতবার বলেছি খুকি যে উনাকে সম্মান দিয়ে ডাকবে । উনি তোমার গুরুজন ।" খুকির রুমে ঢুকে বললেন মিসেস জামান । -"এহ কাজের বুয়াকে আবার কি সম্মান দিয়ে ডাকতে হবে ?" নাক সিটকায় খুকি ! মিসেস জামানের মাথায় রক্ত উঠে যায় । কষে একটা চড় লাগিয়ে দেন মেয়ের গালে । একমুহুর্তে ফর্সা গালটা লাল হয়ে ওঠে খুকির । মাত্রই রুমে ঢোকা রহিমা দৌড়ে গিয়ে মিসেস জামানকে শান্ত করে । টেনে নিয়ে আসে রুমের বাইরে । সোফায় বসিয়ে দেয় । তারপর পাশে ঠায় দাড়িয়ে থাকে । -"দেখলে রহিমা , দেখলে ! কত্তবড় বেয়াদব হয়েছে মেয়েটা " অভিযোগ করেন মিসেস জামান । -"ছোট মানুষ আপা ! কিছু বুঝে না এখনো তাই অমন করে । আপনে ঠান্ডা হন আপা !" শাড়ীর আচল দিয়ে বাতাস করতে করতে বলে রহিমা । রহিমার দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকেন মিসেস জামান । তারপর ধীর গলায় বলেন -"তোমার খারাপ লাগেনা রহিমা ?" -"না আপা । আমার যহন ডাকে তহন আমি রহিমা শুনি না , খালি মা টুকু শুনি" অবাক হয়ে রহিমার দিকে তাকিয়ে থাকে মিসেস জামান ।কেউ খেয়াল করে না দরজার ওপাশ থেকে খুকি তখন একইরকম অবাক দৃষ্টিতে দুজনার দিকে তাকিয়ে ছিল । সমাপ্ত


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮২ জন


এ জাতীয় গল্প

→ খুকি এবং এক টুকরো সুখ দুঃখ

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now