বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

ঘোর নিশুতি ------ (পর্ব ২)

"রোমাঞ্চকর গল্প " বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X (অতিপ্রাকৃত থ্রিলার) " ঘোর নিশুতি " শাহ মোহাম্মদ মোশাহিদ ---------------------- (পর্ব ২) পাঁচ. মানুষের টাক কয় ধরনের হয় জানিস? এটা আবার কেমন প্রশ্ন করলো মুমিতু! কপালে ভাঁজ পড়লো মাশরাফির। মুমিতুর বাদরামীর একটা সীমা থাকা উচিত। প্রথমে ভাবলো প্রশ্নটা এড়িয়ে যাবে। কিন্তু কৌতূহল দমাতে পারলো না। জিজ্ঞেস করেই বসলো, কয় ধরনের হয়? তিন ধরনের। একটা হলো সুখটাক। সুখটাক! হ্যাঁ, সুখটাক। এ ধরনের টাক সাধারণত দেখা যায় উচ্চবিত্ত, উচ্চ মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তদের মাথায়। তবে সবকিছুরই ব্যতিক্রম আছে। সুখটাকওয়ালাদের টাক থাকে তেলতেলে, মোলায়েম। রোদের আলো পড়লে চিক চিক করে। টেনশনে থাকলে ওদের টাকে শিশিরবিন্দুর মতো ঘাম জমে। হা হা করে হেসে উঠলো মাশরাফি, বাহ, ভালো ব্যখ্যা দিলি তো। আর একটা হলো দুঃখটাক। দুঃখটাক! ওটা কি দুঃখী মানুষের টাক নাকি? হ্যাঁ, দুঃখী মানুষের টাক। এ ধরনের টাক হয় খসখসে, রুক্ষ। এটা বেশি দেখা যায় নিম্নবিত্তদের মাথায়। কদাচিৎ উচ্চ ও মধ্যবিত্তদের মাথায়ও থাকে। দুঃখটাকওয়ালারা সারাক্ষণই দুশ্চিন্তায় থাকে। আর মাথা থাকে সবসময় গরম। তাই টাকে ঘাম জমার সুযোগ-ই হয় না। একটু জমলো তো, মাথার তাপে সব বাষ্প হয়ে গেলো। নিম্নবিত্তদের দুঃখটাকে সবসময় ধুলো-ময়লা জমে থাকে। তৃতীয় টাক হলো, টুকটাক। এর উদাহরণ আমাদের ডান দিকেই দাঁড়িয়ে আছে, বলে ইশারা করলো মুমিতু। তাকিয়ে দেখলো মাশরাফি। ছিপছিপে ধরনের এক লোক দাঁড়িয়ে বাদাম চিবুচ্ছে। মাথায় টাক। তবে টুকরো টুকরো। কোথাও চুল, কোথাও ফাঁকা। ওরা মাথার বা দিকটা দেখতে পাচ্ছে। লম্বা জুলফি। এর ওপরে টুকরো টুকরো দুই জায়গায় চুল নেই। ভীষণরকম তেলতেলে। কিছুটা লালচে রঙা। বাদামওয়ালার কাছ থেকে লবণ নিতে গিয়ে একটু ঘুরলো লোকটা। পেছনের দিকটা দেখা গেলো এবার। ওখানেও টুকটাক কয়েক জায়গায় চুল নেই। দেখে মনে হচ্ছে বেরসিক কাক ঠুকরে নিয়েছে। তাও অপরিকল্পিতভাবে। লোকটার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছে দু’জন। অপরের দুর্দশা দেখে হাসতে নেই, এটা ওরা জানে। কিন্তু হাসি এসে গেলে কী করবে। টুকটাকওয়ালা লোকটা অনবরত বাদাম চিবুচ্ছে। আর মুমিতু মাশরাফি দাঁড়িয়ে আছে বাসের অপেক্ষায়। মতিঝিল শাপলা চত্বর থেকে জুরাইন যেতে হলে মোটামুটি ঝক্কি পোহাতে হয়। কিছুদিন পর পর সরাসরি জুরাইনের বাস চালু হয়, আবার কী কারণে যেন বন্ধ হয়ে যায়। অবশ্য সবসময়ই কিছু মাইক্রোবাসকে দেখা যায় শাপলা চত্বর থেকে যাত্রী নিয়ে জুরাইনের উদ্দেশ্যে যেতে। কিন্তু রাজধানীতে মাইক্রোবাসে যাতায়াত ভয়ঙ্কর ব্যপার। আচমকা ভেতর থেকে প্যাসেঞ্জারদের কেউ অস্ত্র ধরে বসে। সাথে যা থাকে তাও দিতে হয় এবং জখমও হতে হয়। তারপর নীরব কোনো জায়গায় গাড়ি থামিয়ে নামিয়ে দেয় ছিনতাইকারীরা। তাই সহজে মাইক্রোবাসে উঠতে চায় না যাত্রীরা। কিন্তু যে রাস্তায় বাসের সঙ্কট, সেখানে অনেক সময় বাধ্য হয়ে মাইক্রোবাসেই উঠতে হয়। জুরাইনের দু’একটা বাস এসে দাঁড়ালেই হলো, মৌচাকের মতো ঘিরে ফেলে যাত্রীরা। ঠেলাঠেলি করে উঠতে একদম ভালো লাগে না মুমিতুর। আর মাশরাফিরতো নয়ই। আজ বোধহয় মাইক্রোবাসে চড়েই যেতে হবে। ‘এই জুরাইন রেলগেট বিশ টাকা’, ‘জুরাইন রেলগেট বিশ টাকা’ হাঁকডাক করছে মাইক্রোর ড্রাইভাররা। ওখানেও ভীড় কম নয়। তবে আজ একটার পর একটা আসছে দেখে ততটা চাপ পড়ছে না। মাশরাফিকে টেনে নিয়ে মাইক্রোতে উঠে বসলো মুমিতু। মজার ব্যপার হলো মুমিতুর পাশের সিটে এসে বসলো সেই টুকটাক লোকটা। ওরা ভাবতেও পারেনি লোকটার মাথায় গণ্ডগোল আছে। গাড়িটা তখন গেন্ডারিয়া রেলস্টেশনের সামনে। লোকটা সম্ভবত এই প্রথমবার তাকালো মুমিতুর দিকে। তারপরই শুরু হলো সেই বিব্রতকর ঘটনার। আচমকা হাত চেপে ধরলো মুমিতুর- দেবতা! দেবতা!! সচকিত হয়ে উঠলো মাইক্রোর যাত্রীরা। তাতে কোনো ভ্রƒক্ষেপ নেই টুকটাকের। সে অনবরত ‘দেবতা, দেবতা’ বলে চেঁচাচ্ছে। এক রহস্যময় উল্লাস ভর করেছে তার ওপর। এবার মুমিতুর হাত ছেড়ে পা ধরে টানাটানি শুরু করলো। মুখে ঐ এক কথা- দেবতা, দেবতা। মাশরাফি হতচকিত। হতচকিত মাইক্রোবাসের যাত্রীরা। ড্রাইভার গাড়ি থামিয়ে দিলো। কিন্তু যাত্রীরা ইশারা করতেই আবার চালাতে শুরু করলো। একটা পাগলের জন্য খামোখা রাস্তায় দেরি করে লাভ নেই। ওদিকে টুকটাকের বেপরোয়া ভক্তিতে মুমিতুর অবস্থা কাহিল। কে দেবতা, কিসের দেবতা! যাত্রীরাও বেশ মজা পেয়ে গেলো। একজন মুমিতুকে পরামর্শ দিলো, পাঁচ-দশ টাকা থাকলে দিয়ে দাও। টাকার জন্যই এসব করছে। মুমিতুও দশ টাকার একটি নোট বের করে বাড়িয়ে দিলো টুকটাকের দিকে। কিন্তু টাকা নিতে রাজি নয় সে- আপনি আমার দেবতা। আপনি আমারে জানে বাঁচাইছেন। হাসির রোল পড়লো গাড়িতে- এ দেখছি অভিজাত পাগল। পাঁচ-দশ টাকা নেয় না। কিন্তু টুকটাক এসবের কিছুই গায়ে মাখছে না। দুই হাত জড়ো করে ভক্তি করলো মুমিতুকে, হাঁ ভগবান, সব তোমার লীলা। আমি দেবতারে খুঁইজা মরি। আর তুমি কি না আমার পাশে আইনা বসাইয়া দিলা। হাঁ ভগবান, তোমার লীলা বোঝার সাধ্য কার! মাইক্রোবাসটা ততক্ষণে চলে এসেছে। রেলগেটে থামার পর নেমে গেলো যাত্রীরা, মাশরাফি আর মুমিতু ছাড়া। মুমিতু এড়াতে পারছে না টুকটাককে। আর মাশরাফি নামতে পারছে না মুমিতুকে রেখে। যাত্রীদের কয়েকজন লক্ষ্য করলো ব্যপারটা। তারপর এগিয়ে এলো সাহায্য করতে। টাকার জন্য পাগলরা কত কিছুই করে। প্রতিনিয়ত আবিষ্কার করে টাকা খসানোর নতুন নতুন কৌশল। কিছুদিন আগে রাজধানীর পথে-ঘাটে দেখা যেতো অদ্ভুত পাগল। ময়লা হাতে দাঁড়িয়ে থাকতো ওরা। মাঝে মাঝেই চড়াও হতো ভদ্র যাত্রীদের ওপর। টাকা দিতে না চাইলে ময়লা ঢেলে দিতো গায়ে। ইদানিং ওই কৌশলটা পুরনো হয়ে গেছে। তবে টুকটাকওয়ালার এই ‘দেবতা’ কৌশলটা বেশ উপভোগ্য মনে হলো মাশরাফির। যদিও মুমিতুর অবস্থা বেগতিক। টুকটাকওয়ালার গালে ঠাস ঠাস করে দুটি চর বসিয়ে দিলো যাত্রীদের একজন। চেহারাটা কালো হয়ে এলো ওর। ছেড়ে দিলো মুমিতুর পা। তারপর মুমিতু, মাশরাফি দু’জনেই দৌড়। ওদের পেছন পেছন দৌড়াতে লাগলো টুকটাকওয়ালাও। দৌড়ালো মুমিতুদের বাড়ির গেট পর্যন্ত। ছয়. রাত গভীর। চান্দেরটেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে দু’জন- জাফর হায়দার ও লোকাল থানার ওসি। এল আকৃতির দো’তলা বিল্ডিং। সামনে চৌকোনো মাঠ। মাঠের উত্তর দিকেই বিশাল কবরস্থান। মাঠ আর কবরস্থানের মাঝে ঠিক যেখানটাতে পিশাচটা এসে থেমেছিলো সেখানেই দাঁড়িয়ে আছেন ওরা। ঘন জঙ্গলের ভেতর চাঁদের আলো পড়ছে না। ওরা ঢেকে গেছেন অন্ধকারের চাদরে। থেকে থেকে ডাকছে রাতজাগা পাখি। থমথমে পরিবেশ। কথা বলছেন ওসি সাহেব, আপনি আসলে বদ্ধ পাগল। এমন কথা কেউ বিশ্বাস করে? আমি যা দেখলাম, যা শুনলাম তারপরও অবিশ্বাস করি কী করে? এ এলাকায় আমি চাকরি করছি অনেকদিন। এখানকার মানুষ এমনিতেই একটু রহস্যজনক। চোর-ডাকাত, বদমাশের এলাকা এটি। এখানে অনেক কিছুই অসম্ভব নয়। মানলাম অসম্ভব নয়। কিন্তু আমি যে নিজের চোখে দেখলাম? আপনারও বিভ্রম হয়েছে। বাস থেকে নেমে থমথমে অবস্থা দেখে আপনি ভয়ঙ্কর কিছুর মুখোমুখি হওয়ার জন্য মানসিকভাবে তৈরিই ছিলেন। তারপর আপনার তৈরি ভয়-ই আপনাকে তাড়া করলো। আর গ্রামের অন্যরা? অশিক্ষিত মানুষদের কথা বাদ দিন। খেয়াল করবেন গ্রামের অশিক্ষিতদেরকেই ভূতে ধরে বেশি। ভূতে ধরার প্রধান লক্ষণ হল এমন কিছু ব্যবহার করা যা সাধারণ অবস্থায় তার পক্ষে করা সম্ভব নয়। আপনি ভুলে যাবেন না, আমি মনোবিজ্ঞানের ছাত্র। ওহ, ভুলেই গিয়েছিলাম। দুঃখিত, মায়ের সাথে মাসির গল্প করে ফেললাম। আপনিতো আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনোবিজ্ঞানে পাস করেছেন। তা মনোবিজ্ঞানে পড়ালেখা করে ট্যুরিজমের দিকে ঝুঁকলেন কেন? ক্ষেপে যাচ্ছিলেন জাফর হায়দার। কিন্তু তার আগেই ক্ষেপে উঠলো থমথমে কবরস্থান। চান্দেরটেকের নীরবতা খান খান করে ভেসে এলো শিয়ালের মরণচিৎকার। ওদের চোখের সামনেই লাফিয়ে উঠলো কবরের মাচান। মাটিমাখা কাফনের কাপড় আর মাচানটিকে ঝুলে থাকতে দেখলো গাছের ডালে। তারপরই চোখে পড়লো বীভৎস সেই দৃশ্য- পিশাচটার এক হাতে শিয়ালের মুণ্ডু, আর এক হাতে ধড়। ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরছে। তাজা রক্তে ঢাকা পড়ে গেছে পিশাচের মুখ। উবু হয়ে কিছু একটা করলো ওটা। কয়েকমুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে ছিলো পুরো পৃথিবী। তারপরই আশপাশ থেকে মাতম শুরু করে দিলো অন্য শিয়ালেরা। আর দেরি নয়। হোলস্টার থেকে পিস্তল বের করলেন ওসি সাহেব। লক্ষ্য স্থির করার ধৈর্য নেই। এলোমেলো গুলি ছুঁড়লেন দুই দুইবার। গুলির শব্দে আরো এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হলো জঙ্গল। তারপর আবার শুরু হলো মাতম। মাঠের দিকে এগিয়ে আসছে পিশাচটা। আরেকবার গুলি ছুঁড়লেন তিনি। পিশাচের গায়ে লাগলো কি না বোঝা গেলো না। সাত. চান্দেরটেকের প্রতিটি ঝোঁপ-ঝাড় চষে ফেললো পুলিশ। স্কুলঘরে খুঁজে পাওয়া গেলো কাফনের কাপড়। মাঠের দিককার জানালার গ্রিল ভাঙা। ইটের দেয়ালে ছোপছোপ রক্তের দাগ। কবরস্থানে হা হয়ে আছে একটি কবর। মাচানের বাঁশগুলো এলোমেলো ছড়িয়ে। কোনোটা ফেঁটে চৌচির, কোনোটা মচকানো। পুরনো আগাছাগুলো তুবড়ানো-মুচড়ানো। এতটুকু বুঝতে কষ্ট হবে না যে, গত রাতে কবরস্থানের ওপর বয়ে গেছে ভয়ঙ্কর ঝড়। ভেঙ্গে খান খান হলো সমস্ত চান্দেরটেকের নীরবতা। দলে দলে ছুটে এলো সাংবাদিক। এ গ্রাম ও গ্রাম থেকে ভীড় করতে লাগলো হাজারো কৌতূহলী লোক। চোখ বড় বড় করে পিশাচ কাহিনী শুনাতে ব্যস্ত চান্দেরটেকের প্রতিটি মানুষ। টান টান উত্তেজনার মধ্য দিয়ে দুপুর গড়ালো। দুপুর গড়িয়ে বিকেল এলো। সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়লো। বাড়ি খালি করে পালিয়ে গেলো অনেকেই। আর হাতেগোনা যারা থেকে গেলো, তাদের জন্য রইলো কড়া পুলিশ প্রহরা। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলো। সেই সাথে নেমে এলো আতঙ্ক। আশপাশের দশ গ্রামের মানুষ দরজা বন্ধ করলো। চান্দেরটেকের ঝোঁপে-ঝাড়ে জ্বলে উঠলো কৃত্রিম আলো। দল বেঁধে টহলে নামলো শত শত পুলিশ। থেকে থেকে বাজলো টহল বাঁশি। দূরের গ্রামের মানুষ অপেক্ষায় থাকলো খারাপ কোনো খবরের। কিন্তু সে রাতে চান্দেরটেকে খারাপ কিছুই ঘটেনি, কেবল মহাসড়কে একটি অ্যাক্সিডেন্ট ছাড়া। কী কারণে মাইক্রোবাসটি উল্টে গেলো কেউ বলতে পারেনি। চালকসহ তিন জনের লাশ পাওয়া গেলো। সবারই মাথা ধড় থেকে আলাদা, হাত-পা থেতলানো। আতঙ্কে আতঙ্কে কেটে গেলো আরো একটি দিন। দিন গড়িয়ে রাত নামলো। আবার সেই পুলিশি টহল। ওসি সাহেবের সাথে টহল দিচ্ছেন জাফর হায়দারও। সেই বিদেশী পুরোহিতের সাথে একবার যোগাযোগ করা যায় না? জিজ্ঞেস করলেন ওসি সাহেব। ছয় মাস আগে তিনি মারা গেছেন। জবাব শুনে কিছুক্ষণ চুপ রইলেন ওসি সাহেব। চেহারাটা আরো ফ্যাকাশে হয়ে এলো। তারপর আবার লাইটারটি দেখতে চাইলেন। কবরস্থানের লোমহর্ষক ঘটনার পর কম করে হলেও পঞ্চাশবার নেড়েচেড়ে দেখেছেন এটি। সেই একই রকমÑ কুপির মতো আকৃতি, ঘোড়ার ছাপ। কী ক্ষমতা আছে এর! দু’জন দাঁড়িয়ে আছেন সেই আগের জায়গাতেই। তবে পরিবেশটা আগের মতো নয়। স্কুলঘর আর কবরস্থানে জ্বলছে উচ্চক্ষমতার বৈদ্যুতিক বাতি। এদিক ওদিক ঘোরাফেরা করছে ইউনিফর্ম পরা পুলিশ। যাই বলেন, আমার মনে হচ্ছে পালিয়েছে পিশাচটা, বললেন জাফর হায়দার। পালিয়েছেতো বটেই। পুলিশের ভয় আছে না? ওটা বোধহয় বুঝতে পারেনি আপনি পুলিশ। বুঝতে পারলে এমন ভুল করতো না, রসিকতা করলেন জাফর। হা-হা-হাহ করে দিলখোলা হাসি দিলেন ওসি সাহেব, পিশাচগিরি করবি ভালো কথা। পুলিশের সাথে টক্কর দিতে এলি কেন? এবার বুঝলিতো, তল্পিতল্পা গুটিয়ে পালাতে হলো। হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে এলেন এক কনস্টেবল- অ্যাক্সিডেন্ট স্যার! অ্যাক্সিডেন্ট! থতমত খেলেন ওসি সাহেব। হ্যাঁ স্যার, মহাসড়কে আরেকটি মাইক্রোবাস উল্টে গেছে। তড়িঘড়ি পিক-আপে উঠলেন তারা। প্রস্তুত ছিলেন চালক। কাঁচা রাস্তা ধরে যতদ্রুত সম্ভব ছুটে চললো গাড়িটা। স্কুল ঘরের বাঁক ঘুরে হুঁশ করে বেরিয়ে এলো জঙ্গল থেকে। কয়েক মিনিটের মাঝেই গাড়িটা চলে এলো মহাসড়কের কাছাকাছি। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে একটি মাইক্রোবাস উল্টে আছে। পাশেই এক ছায়ামূর্তির নড়াচড়া। কাঁচা রাস্তা যেখানটায় মিশেছে এর একটু উত্তরেই ঘটেছে দুর্ঘটনাটা। উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে চলে গেছে সড়ক। পূর্ব আর পশ্চিম দিকের এলাকায় ফসলি মাঠ। রাস্তার ধার ঘেঁষে গভীর খাদ। পিক-আপটা এসে থামলো একেবারে মহাসড়কের ওপর। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সব। নড়ে উঠলো ছায়ামূর্তিটি। পনের-ষোল বছরের এক কিশোর। ভাঙ্গা কাচের ভেতর মাথা অবধি ঢুকিয়ে কী যেন করছে। আর কাউকে দেখা যাচ্ছে না ওখানটায়। আ-হা-রে, এতটুকু ছেলে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করছে। ওদেরকে আসতে দেখে নিশ্চয়ই ভরসা পাবে ছেলেটা, ভাবলেন জাফর হায়দার। পিক-আপ থেকে নামলেন ওরা দুইজনসহ মোট চারজন। ছেলেটার কোনো হুঁশ নেই। গাড়ির ভেতর কী যেন খটমট করেই যাচ্ছে। লাশ বের করার চেষ্টা করছে হয়তো। সড়কে পিঠ দিয়ে চিত হয়ে আছে মাইক্রোবাস। চারটি চাকা সোজা উপরে। আর নিচের দিকটা একেবারে চ্যাপ্টা হয়ে গেছে। ওয়্যারলেসে আরো কয়েকজন কনস্টেবল ডেকে পাঠালেন ওসি। তারপর ছেলেটার উদ্দেশ্যে চেঁচালেন, এই যে ছেলে শান্ত হও। আমরা দেখছি ব্যাপারটা। সাথে সাথে নড়ে উঠলো পুরো গাড়ি। দ্রিম করে একটা শব্দ হলো। তারপর গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো কিশোরের মুখ। চাঁদের আলোয় ঝিলিক মেরে উঠলো মায়াবি চেহারাÑ ডাগর চোখ, চঞ্চল অবয়ব। মায়া হলো ওদের। ভুলে গেলেন গাড়ি নড়ে ওঠার মতো বড় ধরনের অস্বাভাবিকতাটাও। আফসোস করলেন, আ-হা এমন নির্জনে বিপদের মুখে পড়তে হলো ছেলেটাকে! নিশ্চয়ই কোনো আপনজনের লাশ থেতলে গেছে গাড়ির ভেতর। আবার নড়ে উঠলো গাড়িটা, যেন কেউ ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো। সরাসরি ছেলেটার মুখের দিকে তাকালেন জাফর। তারপরই দেখতে পেলেন দৃশ্যটা- কিশোরের দুই ঠোঁটের খাঁজ বেয়ে ঝরছে রক্তের ধারা, চাঁদের আলোয় কালচে রঙ নিয়েছে। অশুভ সঙ্কেত বেজে উঠলো বুকের ভেতর । কিন্তু এরপরও জোর করে ভাবতে চাইলেন, ওটা হয়তো ছেলেটারই রক্ত। সম্ভবত দাঁতে বা মুখের ভেতর কোথাও আঘাত পেয়েছে। ততক্ষণে থেমে গেছেন সবাই। কিন্তু নিজেকে নিজে অভয় দিয়ে আরো এক পা সামনে বাড়লেন জাফর হায়দার। হুড়মুড় করে গাড়ির ভাঙ্গাচোরা বডিটা গড়িয়ে এলো তার দিকে। আর ভাবার সময় নেই। পকেট থেকে বের করলেন লাইটার। স্পার্ক করলেন এবং ছেলেটা উধাও। তিনি আস্তে করে সরে দাঁড়ালেন কেবল। গাড়ির বডিটাকে দেখলেন গড়াতে গড়াতে খাদে পড়ে যেতে। আট. অসাড় পড়ে আছে মুমিতু। কামরাজুড়ে ছায়ার আনাগোনা। ছায়াগুলো নাচছে ধীরলয়ে। একেবারে নিঃশব্দে। কালো কুঁচকুঁচে শরীর ওগুলোর। মুখে চুন মাখা। এলোমেলো আঁকিবুকি নয়, কালো মুখে সাদা চুন, অনেকটা বৃদ্ধ মানুষের দাড়ির মতো। কিন্তু ছায়ামূর্তিগুলো বৃদ্ধ নয়। হ্যাংলা। ছিপছিপে। আর ওজনহীন। যেনো বাতাসে ভাসছে। শুরু হয়েছে উৎসব। কোনোটা নৃত্যের তালে ঝুলে পড়ছে বৈদ্যুতিক পাখার সাথে। কোনোটা মাথা উল্টো করে দাঁত কেলাচ্ছে। দাঁতগুলো ধবধবে সাদা। ভয় পায়নি মুমিতু। ভাবছে কী নাম দেয়া যায় এই হ্যাংলাগুলোর। নাহ, কোনো নাম খুঁজে পাওয়া গেলো না। নিশ্চয়ই কোনো না কোনো নাম আছে এদের। এখন কেবল মনে পড়ছে না, এই যা। কয়েকটা হ্যাংলা এবার উঠে এসেছে বিছানায়। কিন্তু একদম নড়তে পারছে না মুমিতু। পাশেই বেঘোরে ঘুমুচ্ছে মাশরাফি। ওকে নিয়ে যত জ্বালা। এমন একটা বিরক্তিকর সময়ে কোথায় ওর সাহায্য দরকার, তা না দুনিয়া কাত করে ঘুমুচ্ছে। হুঁশ-হুাঁশ শ্বাস টানছে আর ছাড়ছে। সম্ভবত এ কারণেই মাশরাফিকে ঘাটাতে চাইছে না ওগুলো। একেকটার যা ওজন, মাশরাফির এক নিঃশ্বাসের বাতাসে তিন পাক ঘুরে তারপর দাঁড়াতে হবে হ্যাংলাদের। নিঃশ্বাস ছাড়ছে মুমিতুও। কিন্তু কোনো শব্দ নেই। নেই তেমন গতিও। এগিয়ে আসছে হ্যাংলারা। তাতা থৈ থৈ, তাতা থৈ থৈ করে উঠে বসলো ওর শরীরে। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। কিন্তু কোনো ওজন ঠাহর করতে পারছে না। ছোট বেলায় শুনেছে- রাতে জানালা খুলে ঘুমুলে ওরা নাকি ঘরে ঢোকে। ঘরের খাবারে ঢাকনা দেয়া না থাকলে সব চেটেপুটে বাসি করে রাখে। এতেই ক্ষান্ত হয় না। সুযোগ পেলে মানুষের শরীর চাটে। মুখ হা করা থাকলে দাঁত, জিহ্বা সব চেটে লুল লাগিয়ে দেয়। সে জন্যইতো সকাল সকাল দাঁত ব্রাশ করতে হয়, গোসল করতে হয়। রাতের হাঁড়িপাতিলগুলো সকালে মেজে নিতে হয়। এখন মুমিতু আর সেই ছোট্টটি নেই। অনেক বড় হয়েছে। পড়ালেখা করছে। মুমিতু ভাবলো এটাও হয়তো তার মনের ভুল। যেই না ভাবলো, অমনি ওগুলো মুমিতুর মুখের ওপর উঠে এলো। ওর মনে হলো হ্যাংলাগুলো এবার বিষাক্ত নিঃশ্বাস ছাড়ছে। কিন্তু এক বিন্দু টের পেলো না সে। তাহলে নিঃশ্বাসগুলো যাচ্ছে কোথায়? যেখানেই যাক, তা নিয়ে ভাবার প্রয়োজন মুমিতুর নেই। আপাতত এই বিরক্তিকর অনুষঙ্গগুলো দূর করতে পারলেই হয়। এই যা, এবার আরো বেপরোয়া হয়ে এলো হ্যাংলারা। শরীরের চারদিকে কিলবিল কিলবিল করছে। কোথাও কোনো স্পর্শ নেই। বাতাসে ভাসছে। মুমিতুর অসহায়ত্ব দেখে মজা নিচ্ছে। ফুরফুর করে একেকটার ঠ্যাং উড়ে যাচ্ছে বাতাসে। আবার ডিগবাজি খেয়ে ঠিক হয়ে নিচ্ছে। কোনোটা কেলানো দাঁত নিয়ে ভয় দেখানোর চেষ্টা করছে, তো দাঁতের খাঁচাশুদ্ধ মাথাটাই উড়ে যাচ্ছে কাগজের মতো। মুমিতু চেষ্টা করছে হাত-পা ছুঁড়তে। পারছে না। ইস, একবার নড়তে পারলেই হতো। হ্যাংলাগুলোর হ্যাংলামো ছুটিয়ে ছাড়তো সে। তালপাতার সেপাই, এসেছে মুমিতুকে ভয় দেখাতে! তালপাতারওতো ওজন আছে। ওদের তাও নেই। আরেকবার নড়ার চেষ্টা করলো মুমিতু। কিন্তু না। হ্যাংলাগুলো মায়াজালে আটকে রেখেছে তাকে, কিছুতেই ভেদ করা যাচ্ছে না। মাশরাফিকে ঘুম থেকে জাগাতে পারলেও হতো। কিন্তু কিভাবে? কেবল অপেক্ষাই এখন একমাত্র উপায়। ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছে মুমিতু। কিন্তু মুহূর্তেই বদলে গেলো দৃশ্য। বদলে গেলো হ্যাংলাগুলোর ঠোঁটের রঙ। কালো কুঁচকুঁচে হ্যাঙলাদের গালে ছিলো সাদা দাড়ির মতো চুন। আর এখন সাথে যোগ হলো লাল টকটকে ঠোঁট। যেহেতু হ্যাংলাদের অবয়ব মানুষের ছায়ার মতোই, তাই নিশ্চিত হওয়া যায়, ওদের ঠোঁট আগেও ছিলো। কিন্তু ঠোঁটের রঙ কেমন ছিলো, তা মনে পড়ছে না মুমিতুর। অন্য যাই হোক অন্তত লাল ঠোঁটো ছিলো না ওগুলো। তাহলে নিশ্চিত চোখে ঠেকতো ওর। মনে হলো, খ্যাক খ্যাক করে হেসে উঠলো হ্যাংলারা। কিন্তু কোনো শব্দ হলো না। কেবল দুই ঠোঁটের মাঝখানে বড়সর একটা ফাঁকা তৈরি হলো। আর সেই ফাঁকা দিয়ে লকলকে কালো জিভ বের করলো। কয়েকবার কেঁপে উঠলো জিভগুলো। তারপর আবার স্বাভাবিক। শুরু হলো নতুন এক যন্ত্রণা। সেটা মোটেও কারো হ্যাংলামো নয়। ঠক ঠক করে দরজার কড়া নাড়ছে কেউ। নড়েচড়ে উঠলো মুমিতু। নড়েচড়ে উঠলো হ্যাংলারাও। পড়িমরি করে ছুট দিলো জানালার দিকে। তারপর বাতাসে ভাসতে ভাসতে ঘোর নিশুতিতে পালিয়ে গেলো। শরীরে শক্তি ফিরে এলো মুমিতুর। কী কাণ্ড, এই শেষ রাতে কে আবার ডাকছে? নাহ, ব্যাপারটা মোটেও ভালো ঠেকছে না মুমিতুর। কে হতে পারে! বাড়ির কেউ তো শেষ রাতে চোরের মতো ডাকতে আসবে না। ঘরের আলো জ্বাললো সে। তারপর জিজ্ঞেস করলো, কে? জবাব নেই। এই কে, কে ওখানে? এবারও কোনো উত্তর নেই। কয়েক সেকেন্ডের জন্য কড়া নাড়ার শব্দ থামলো কেবল। তারপর আবার শুরু হলো। কী ব্যাপার, মুখে কথা নাই? একবার ঠিক করলো মাশরাফিকে ডাকবে। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবলো, এটা হবে বোকামি। যদি চোর বা ডাকাত কোনোটাই না হয়, তাহলে মাশরাফির কাছে ছোট হয়ে যাবে সে। শেষে একতরফা ওকে ভীতুর ডিম বলে খোঁচা দেয়া যাবে না। যা আছে কপালে। দরজা খুলে দিলো মুমিতু। অমনি হুমড়ি খেয়ে পড়লো লোকটা। বৈদ্যুতিক বাতির আলোয় চক চক করে উঠলো টাক। টুকটাক। হ্যাঁ, সেই ছিপছিপে টুকটাকওয়ালা লোকটা। মুমিতুর পায়ের কাছে গড়াগড়ি খাচ্ছে- দেবতা, দেবতা। আপনের পায়ের কাছে আশ্রয় চাই দেবতা। ঘুরে দাঁড়ালো মুমিতু। পুলিশে ফোন করতে হবে এখনি। (


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১১৫ জন


এ জাতীয় গল্প

→ ঘোর নিশুতি ------- (৪র্থ ও শেষ পর্ব)
→ ঘোর নিশুতি ------ (পর্ব ১)

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now