বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
অতিপ্রকৃত বড় গল্প
" জুংগা "
অপু তানভীর
-------------
(২য় ও শেষ পর্ব)
সব কিছু ঠিক করা হয়েছে । রাফায়েল সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে ফেলেছে । পুকুরের পানির ভেতর দিয়েই নাকি ওদের যেতে হবে । কিভাবে যেতে হবে সেটা ওর জানা নেই । অন্য কারোই সে সম্পর্ক ধারনা নেই । একটু আগে সে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে এসেছে এখানে । রাফায়েল কঠিন করে বলে দিয়েছে এই সময়ে পুকুর পাড়ে আর কারো থাকা চলবে না কিছুতেই । অবশ্য তাদের জন্য অন্য কাজ আছে । যেহেতু রাফায়েল ওর সাথে যাচ্ছে সেহেতু এখানে মিমিকে বাঁচানোর জন্য যে কাজ গুলো করতে হবে সেটা ওদের কেউ করতে হবে । খুব একটা অসুবিধা হওয়ার কথা না । কারন রাফায়েল খুব ভাল করেই বলে দিয়েছে কি করতে হবে এবং কিভাবে করতে হবে !
মিশু পুকুরের পানির দিকে তাকিয়ে আছে এক ভাবে । নিজের মনটা শক্ত করে নিয়েছে । ওকে যেতেই হবে । নয়তো সারা জীবন ওর কেবল মনে হবে ওর কাছে একটা উপায় ছিল ওর বড় আপুকে বাঁচানোর জন্য কিন্তু ও চেষ্টা করে নি । যেভাবেই হোক ও যাবে এবং মিমিকে মুক্ত করবেই । এমন কি নিজেকে শেষ করে দিয়ে হলেও ।
মিশু রাফায়েলকে আসতে দেখলো । আজকে রাফায়েল কাল রংয়ের পোশাক পরেছে ঠিক যেমনটা ও পরেছে । কালো টাইট জিন্সের সাথে কালো টিশার্ট । এমন কিছুই পরতে বলেছি রাফায়েল, ঢিলাঢোলা পোশাক পরতে মানা করেছিলো । নিশ্চয়ই কোন কারন আছে !
ওর সামনে এসে বলল
-কি প্রস্তুত ?
-হুম !
-ভয় লাগছে ?
-লাগছে !
-ভয় নেই ! আমি আছি । যতক্ষন আছি ততক্ষন তোমার কিছু হবে না । তবে আমি না থাকলে, কি হবে সেটা বলতে পারছি না !
-ভয় দেখাবেন না ।
-আমি সাহস দিলাম তো ।
-বুঝতে পারছি । চলেন !
রাফায়েল আকাশের দিকে তাকালো । তারপর চোখ বন্ধ করে কি যেন পড়লো । তখনই মিশু দেখলো কেমন যেন একটা পরিবর্তন হচ্ছে চারিদিকে । বাতাস টা যেন একটু বেশি ভারি হয়ে গেছে । একটু যেন বেশিই অন্ধকার হয়ে গেল মুহুর্তেই ভেতরে । চারিদিকে কেবল সন্ধ্যা । এখনও আলো মরে নি কিন্তু মুহুর্তের ভেতরেই কেমন সব কিছু অন্ধকার হয়ে উঠলো ।
রাফায়েল বলল
-চল !
এই বলে ওর হাত বাড়িয়ে দিল । মিশু হাত টা ধরলো । কেমন একটু ঠান্ডা ঠান্ডা মনে হল হাত টা !
ওর হাত ধরেই মিশু আস্তে আস্তে পুকুরের সিড়ি দিয়ে নিচে নামতে লাগলো ।
রাফায়েল বলল
-চোখ বন্ধ কর । তবে হাটা থামিও না !
মিশু তাই করলো । চোখটা বন্ধ করে আস্তে আস্তে পা ফেলতে লাগলো । একে একে সিড়ি দিয়ে নেমে হঠাৎ মিশুর মনে হল ও কোন সমান জায়গা দিয়ে হাটছে, নিচটা অনেকটা নরম নরম । কিছু দুর হাটার পরে রাফায়েল ওকে চোখ খুলতে বলল । চোখ খুলে অবাক হয়ে দেখলো ও পুকুরের মাঝে পানির উপর দাড়িয়ে আছে । চোখ বড় বড় করে তাকালো ও রাফায়েলের দিকে । রাফায়েলের চেহারায় কোন পরিবর্তন এল না । রাফায়েল বলল
-বড় করে নিশ্বাস নাও !
মিশু তাই নিল এবং তখনই ওর দুজনেই পানির নিচে তলিয়ে গেল । মিশুর কাছে মনে হল ওর সারা শরীরের খুব ঠান্ডা পানি যেন চারিদিক চেপে ধরেছে । ওর নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে । তবে এখনও ওর কব্জির কাছে রাফায়েলের ধরা হাতটা ও অনুভব করতে পারছে । এইটাই আপাতত বুকে ওকে সাহস জোগাচ্ছে । কিন্তু যখন একটা সময় ওর মনে হল ও যেন অনন্তকাল ধরে ঠান্ডা পানির ভেতরেই রয়েছে । যখনই ওর মনে হল ও আর দম ধরে রাখতে পারবে না তখনই ও আবারও নিজেকে আবারও পানির উপর আবিষ্কার করলো । এবং পানিতে পা দিয়ে ও আর রাফায়েল দাড়িয়ে আছে । নিজের দিকে তাকিয়ে দেখলো ওদের জামা কাপড় একদম শুকনো । ওরা একটু আগে পানির ভেতরে ছিল সেটা কোন ভাবেই প্রমান করার উপায় নেই ।
জোড়ে নিঃশ্বাস নিতে নিতে মিশু বলল
-কি হল এটা ? কি হচ্ছে ?
রাফায়েল স্বাভাবিক কন্ঠে বলল
-এখন থেকে অনেক কিছুই হবে যার কোন ব্যাখ্যা নেই । আসো আমরা চলে এসেছি !
এতোক্ষনে মিশির চারিদিকে তাকানোর সময় হল । এটা কোন ভাবেই ওদের পরিচিত সেই পুকুর পাড় নয় । পুকুর তো নয় যেন এটা কোন বড় নদী । খুব দুরে পাড় দেখা যাচ্ছে । রাফায়েল সেদিকে হাটা দিয়ে দিয়েছে । মিশুর পানির উপরেই দৌড়াতে লাগলো রাফায়েলকে ধরার জন্য । চারিদিকটা কেমন শীতের সকালের মত লাগছে । কুয়াশা কারনে ঠিক দেখা যাচ্ছে না । তবে সেই কুয়াশার ভেতরে একটা সিগ্ধ ভাব থাকে এই কালো কুয়াশার ভেতরে রয়েছে অশুভ একটা কিছু ।
পাড়ে এসে রাফায়েল ওর দিকে তাকিয়ে বলল
-এবার তোমার একলা যেতে হবে ?
-মানে ?
-মানে হল আমি তোমার সাথে যেতে পারবো না । তবে আমি তোমার উপর চোখ রাখার চেষ্টা করবো ! ঠিক আছে ? মনে রাখবে এটা জুংগার রাজ্য । সব কিছুতেই তার ক্ষমতার থাকবে তবে তোমাকে সাহায্য করার জন্য কিছু আছে এখানে । ওকে দেখা মাত্র তোমার কাজ হবে দৌড়ানো । ও যেন কোন ভাবেই তোমাকে আটকে না ফেলে ।
-কিন্তু আমি ওকে চিনবো কিভাবে ?
-দেখলেই চিনতে পারবে । আর এই যেখানেই যাও এই পুকুরের কাছে আসতে হবে, দিক ঠিক রেখো । ও যদি তোমাকে তাড়া করে সোজা এসে এই পুকুর ঝাঁপ দিবা । তাহোলে ওপাড়ে তোমাদের পুকুরে গিয়ে উঠবা ! যদি পেছনে ও আসে আমার জন্য অপেক্ষা করবা না । কেমন !
মিশু মাথা ঝাকালো । বলল
-কিন্তু ওকে খুজে পাবো কিভাবে ?
-তোমার খুজে পাওয়া লাগবে না । তুমি যে এখানে ঢুকে পড়েছো এটা এখনই টের পেয়ে গেছে । ও তোমার খোজে চলে আসবে !
মিশুর পুর শরীর জুড়ে একটা ঠান্ডা ভয়ের অনুভুতি প্রবাহিত হল । জানে না সামনে ওর জন্য কি অপেক্ষা করছে ।
-গুড লাক !
মিশুর ইচ্ছে হল এখনই পেছন ঘুরে বড় পুকুরটাতে ঝাঁপ দেয় । কিন্তু সেটা করলো না । রাফায়েলকে পেছনে রেখেই হাটতে লাগলো সামনে দিকে । সামনে ওর জন্য কি অপেক্ষা করছে ও সেটা জানে না । যতই সামনে এগোতে লাগলো ওর মনের ভয় টা ততই বাড়তে লাগলো !
জোবাইদা বেগম তোজবি নিয়ে বসে আছেন মেয়ের পাশে । একটু আগেও তার চোখ দিয়ে পানি পরছিলো । এক মেয়ে মৃত্যুর কোলে শুয়ে আছে আর অন্য দিকে আরেক মেয়ে মৃত্যুর দিকেই ছুটে গেছে । বোনের জন্য এমন ভাল বাসা দেখে জোবাইদা বেগমের মনটা আনন্দে ভরে উঠেছিলো কিন্তু সেটা মাত্র কয়েক মুহুর্তের জন্যই । তার পরেই উপলব্ধি হল যে তিনি হয়তো তার দুই মেয়েকেই হারাতে পারেন । এই বৃদ্ধ বয়সে তখন তিনি কাকে নিয়ে থাকবেন !
তার স্বামী আলতাফ মাহমুদ হাতে হাতুড়ি আর পেরেক নিয়ে বসে আছে । রাফায়েল যাওয়ার সময় তাকে কঠিন একটা কাজ দিয়ে গেছেন । সেটা করার মাধ্যমেই মিমির জীবন রক্ষা পেতে পারে । কাজটা সহজ তবুও তাকে সঠিক সময়ে কাজটা করতে হবে ।
মিমিকে ফ্লোরের উপর শোয়ানো হয়েছে । ওকে ঘিরে ঠিক ২৩টা মোমবাতি জ্বালানো হয়েছে । এবং স্বামী স্ত্রী সহ বাড়ির কাজের মেয়ে সবাই অবাক হয়ে দেখেছে যে দেখেছে ২৩ টা মোমোবাতির জ্বালানোর পরে সেগুলোর আগুনের রং মোটেই স্বাভাবিক আগুনের মত নয় । গাঢ় কালো রংয়ের আগুন দেখে ওনারা সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল সেটার দিকে ।
রাফায়েল বলল
-এটা কালো দেখাচ্ছে কারন এখানে জুংগা আপনার মেয়ের আত্মার সাথে জড়িয়ে আছে । ঠিক এটাই আপনার কাজ হবে ।
যখনই জুংগা মিমিকে ছেড়ে এসে মিশুর পেছনে আসবে তখনই এই মোমবাতি গুলোর কালো আগুন স্বাভাবিক রং এ ফেরৎ আসতে থাকবে । তখনই আপনার কাজ শুরু হবে ।
-কি করতে হবে ?
-এই দেখছেন না হাতুড়ি আর পেরেক । আপনার কাজ হবে সেই মোমবাতিরা সরিয়ে সেখানে এই পেরেকটা পুতে দেওয়া । যখনই আপনি ২৩ টা মোমবাতির জায়গাতে ২৩ টা পেরেক পুততে পারবেন তখনই বুঝবেন আপনার মেয়ে নিরাপদ । কিন্তু একটা কথা খুব ভাল করে মনে রাখবেন !
এই লাইনটা বলেই রাফায়েল চুপ করে ছিল কিছুটা সময় । তারপর আবার বলা শুরু করলো
-আমি দরজার মাঝে হাত রাখলে কোন ভাবেই যখন দরজা বন্ধ করা সম্ভব ঠিক তেমনি যদি জুংগার ওকে পুরোপুরি ভাবে ছেড়ে না যায় তখন ও কিন্তু এই পেরেক মেরে ওকে সিকিউর করা যাবে না । মনে থাকবে তো, কেবল মাত্র মোমের আগুনের রং স্বাভবিক মানে নীল কিংবা লাল হলেই আপনি পেরেক পুতবেন !
আলতাফ মাহমুদ বলল
-মনে থাকবে আমার !
-থাকতেই হবে । এটার উপর অনেক কিছু নির্ভর করছে !
ওরা চলে গেছে অনেকক্ষন আগে । পুকুর পাড়ে কাউকে যেতে দেয় নি । বাসার সবা কাজের লোককে বাইরে বের করে দেওয়া হয়েছে । কেবল শিউলি মেয়েটা রয়ে গেছে । জোবাইদা বেগম এক ভাবে আগুনের দিকে তাকিয়ে আছেন । কত সময় পার হয়েছে সেটা তিনি জানেন না । ঘরের আলো কমিয়ে রাখা হয়েছে যাতে মোমের আগুনের রংটা ভাল করে বোঝা যায় । ঠিক তখনই মিমির পায়ের কাছে একটা আগুন একটু যেন নড়ে উঠলো । তিনি স্বামীর দিকে তাকালেন । চোখ দেখেই মনে হল সেও দেখেছে । কয়েক মুহুর্ত পার হয়ে গেল । তারপরেই কালো রংয়ের আগুনটা রং বদলে গেল । প্রথমে নীল তারপর লালচে নীল হয়ে গেল !
-ঐ তো !
আলতাফ মাহমুদের শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল । তিনি হাতের পেরেক আর মোম নিয়ে প্রস্তুতই ছিল । হাত দিয়ে মোমটা সরিয়ে সেখানে হাতুরির এক বাড়িতেই পেরেটা পুতে দিল !
তার মানে জুংগা মিমিকে ছেড়ে চলে যেতে শুরু করেছে । এই কথাটা মনে হতেও তাদের মনে আরেকটা ভয় বাসা বাঁধলো । যদি মিমিকে ছেড়ে দিতে শুরু করে এর মানে হচ্ছে জুংগা মিশুর দিকে যেতে শুরু করেছে ।
জোবাইদা বেগমের চোখ দিয়ে আবারও পানি গড়িয়ে পড়লো । মনে মনে উপর ওয়ালার কাছে প্রার্থনা করলো উপরওয়ালা যেন তার মেয়েকে বাঁচিয়ে রাখে !
প্রথমে মিশু শব্দটা ঠিক পাত্তা দিল না । কারন শব্দটা এসেছে ওর পেছন থেকে । যেদিকে পুকুরটা আছে । ওর মনে হল রাফায়েল ওর পেছনে আসছে । বুকের ভেতরে যেব একটু সাহস পেল । ও সামনে দিকে দিকে এগিয়েই যাচ্ছে ।
জায়গাটার বর্ণনা দেওয়ার কোন উপায় নেই । চারিদিকে ঠিক অন্ধকার হয়ে নেই তবে আলোও নেই ঠিকঠাক মত । আব-ছায়া আলো । সেই কালো কুয়াশার মত । অনেক দুর পর্যন্ত দেখা যায় কিন্তু স্পষ্ট করে কিছুই দেখা যায় না । ওদের পৃথিবীর মতই সব কিছু । এখানে খুব বেশি গাছ পালা । কিন্তু গাছ গুলো একটু অদ্ভুদ ধরনের ।
প্রত্যেকটা গাছ বেশ লম্বা । কিন্তু প্রত্যেকটা গাছে দুইটার বেশি ডাল নেই । মানুষের যেমন দুইটা হাত থাকে ঠিক তেমনি । লম্বা দুইটা ডাল । সেই ডালের মাথা থেকে আবার কিছু ডাল বেরিয়ে আছে । এই ডাল গুলো শরীরে বাঁধছে । ভাগ্য ভাল ও টাইট কিছু পরে এসেছে নয়তো এগুলো একটু ঝামেলা হত ।
তখনই আবারও পেছনে আওয়াজ হল । এবার আরও জোড়ে । কেউ যেন কিছু সাথে জোড়ে একটা ধাক্কা খেল কিংবা ধাক্কা মারলো । রাফায়েল হতে পারে না এইটা ! অন্য কিছু ?
কি ? কোন টা ?
জুংগা কি তাহলে পেছন থেকে আসছে ? মিশু ঝট করে পেছন ফিরে তাকালো । ওর মনে হল পেছন থেকে কেউ যেন খুব দ্রুত সরে গেল । মিশু নিজের বুকের ধড়ফড়ানীটা খুব ভাল করেই বুঝতে পারছিলো । এখনই ওকে দৌড় দেওয়া উচিৎ । রাফায়েল বলেছিল যে কোন ভাবেই জুংগার হাতে পরা চলবে না । তবুও আরও কয়েক মুহুর্ত লেগে গেল ওর সিদ্ধান্ত নিতে । সেই সাথে পেছনের পুকুরের কথাটাও ওর মনে রাখা উচিৎ । ঐটাই হচ্ছে ওর এখান থেকে বের হওয়ার এক মাত্র রাস্তা ।
ও দৌড় দেবে কি দেবে না কিংবা দৌড় দিলেও সেটা কোন দিবে এমন কথা যখন ভাবছে তখনই সে জুংগাকে দেখতে পেল । কাউকে বলে দিতে হল না কিন্তু মিশুর বুঝতে একটুও কষ্ট হল না যে এই হচ্ছে জুংগা !
মানুষের সাথে কিংবা অন্য কোন প্রাণীর সাথে এই প্রানীর কোন মিলই নেই । দুইটা হাতের বদলে সেখানে চারটা হাত ধরেছে । লম্বায় ওর থেকে অল্প একটু বড় হবে । অসম্ভব মোটা পেট তবে পা দুটো সেই তুলনায় অনেক ছোট । মাথাট ঠিক মাঝ দিয়ে একটা বড় শিং বের হয়ে গেছে । চোখটা শিংয়ের ঠিক নিচেই । কান গুলো অনেক গাধার কানের মত ছড়িয়ে আছে । নাক কিংবা মুখ বলে কিছু নেই সেখানে মসৃন হয়ে আছে !
ওকে দেখেই প্রাণীটা অদ্ভুদ শব্দ করে উঠলো । শব্দটা শুনে মনে হল এটা আর যাই হোক পৃথিবীর কোন আওয়াজ হতে পারে না । কিন্তু ও দৌড়াতে পারছে না । ভয়ে ওর পা যেন জমে গেছে । জুংগা ততক্ষনে ওর দিকে দৌড়াতে শুরু করেছে । ঠিক যখন ওর উপর ঝাপ দিতে যাবে তখনই একটা অবাক করা ঘটনা ঘটলো । দুই হাত বিশিষ্ট লম্বা লম্বা গাছ গুলো একসাথে হয়ে একটা দেওয়া করে মিশুকে আড়াল করে ফেলল । মিশু আবারও সেই চিৎকার শুনতে পেল । কেউ দেওয়া আঘাত করলে যেমন শব্দ হয় তেমন । জুংগা গাছের প্রাচীর ভাঙ্গার চেষ্টা করছে ।
এখন ওর দৌড় দেওয়া উচিৎ ! তখনই ওর হাত ধরে কেউ টান দিল ।
রাফায়েল !!
নাহ ! রাফায়েল না ! একটা গাছ ! ঠিক হাতের মত করে ওর হাত চেপে ধরেছে । চিৎকার দিতে গিয়েও থেমে গেল । গাছ টা ওকে সামনে দিকে ধাক্কা দিল যেন !
একটা শব্দ উচ্চরন করলো তবে সেটা ওর পরিচিত কোন শব্দ নয় । মিশুর কেন জানি মনে গাছটা ওকে পালাতে বলছে । এবার মিশু সত্যিই দৌড়াতে শুরু করলো । এবং অবাক হয়ে লক্ষ্য করলো ও যেখান দিয়ে যাচ্ছে গাছের সারি গুলো যেন একটু একটু ওকে সরে যাচ্ছে । ওকে জায়গা করে দিচ্ছে । তাররপ ও পার হতেই আবার আগের জায়গাতে চলে যাচ্ছে তারা !
গাছ গুলো ওকে সাহায্য করছে !
কিন্তু কেন ?
রাফায়েল অবশ্য বলেছিলো এমন কাউ আছে যারা ওকে সাহায্যও করবে ! এরাই কি তাহলে তারা ?
পেছন জুংগার ভেঙ্গে চুড়ে আসাটা হঠাৎ করেই বন্ধ হয়ে গেল । মিশুও দৌড়াতে দৌড়াতে হাঁপিয়ে উঠেছে । একটু দম নিতে লাগলো ।
ঠিক তখনই উপর থেকে কেউ এসে ওর ঠিক সামনে এসে পড়লো । চিৎকার করতে যাবে তখনই দেখতে পেল এটা রাফায়েল !
চোখ ফেটেকান্না চলে এল । জীবন কাউকে দেখে এতো খুশি সে হয়েছে কি না মিশু জানে না । রাফায়েলকে জড়িয়ে ধরলো ।
-তুমি কোথায় চলে গেছিলে আমাকে ছেড়ে !
-আমাকে যেতে হয়েছিলো ।
-আর কখনও যাবে না । মনে থাকবে !
-আচ্ছা যাবো না !
একটু শান্ত হলেই মিশু বলল
-জানো এই গাছ গুলো না আমাকে পালাতে সাহায্য করছে । কেন আমি ঠিক বুঝতে পারছি না ।
-কারন এগুলো ঠিক গাছ না । বলেছিলাম না তোমার সাহায্যের জন্য কেউ আছে !
অবাক হয়ে বলল
-তাহলে কি ?
-এরা সবাই আগে মানুষ ছিল । মেয়ে ছিল । এখন এখানে বন্দী অবস্থায় আছে ! তোমার আপুও ঠিক এমনই হয়ে যাচ্ছিলো আস্তে আস্তে । আমি তোমাকে ছেড়ে তার কাছেই গিয়েছিলাম । অনেক দিন ধরেই সে আছে এই জন্য তার শরীর থেকে বেরিয়া আসা শিকড়টা কেটে দেওয়া দরকার ছিল নয়তো সে দ্রুত তার আগের জায়গাতে যেতে পারতো না । এখন বেশ দ্রুত হচ্ছে ট্রান্সফরমেশন !
-আমরা এদের কে সাহায্য করতে পারি না !
-না । সেই উপায় নেই । তোমার আপুকে সাহায্য করতে পারছি কারন তার বডি এখনও মারা যায় নি । এডের সবার বডি মারা গেছে । চল আমাদের এখানে আর থাকা ঠিক হচ্ছে না ।
কিন্তু ততক্ষনে একটু দেরি হয়ে গেছে । ঠিক যেভাবে উপর থেকে রাফায়েল এসে ঝাপিয়ে পড়েছিলো জুংগাও ঠিক ওদের সামনে এসে লাফিয়ে পড়লো । তারপর প্রথমেই রাফায়েলের হাত ধরে একটানে ওকে দুরে ছুড়ে ফেলে দিল । রাফায়েল কিছু করার আগেই দুরে ছিটকে পড়লো ।
মিশু একটু পিছিয়ে গিয়ে আবারও দৌড়াতে শুরু করে দিল । এবারও ঠিক পেছন থেকে সেই আসার আওয়াজটা শুনতে পাচ্ছে । প্রতি মুহুর্তেই মনে হচ্ছে কেউ ওকে পেছন থেকে চেপে ধরবে । এই বুঝি ওকে ধরলো ! একটু একটু করে যেন ওর পেছনের আওজাটা কমে আসতে লাগলো । যখনই মনে হল ও এবারও পালাতে পারবে তখনই ও হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল । এবং আবিস্কার করলো জুংগা নামের সেই কুৎসিত প্রাণীটা ঠিক ওর সামনেই । ওর পক্ষে আর কোন ভাবেই পালানো সম্ভব না । জুংগার মুখের জায়গাতে আগে কিছু ছিল না । অনেকটা ফাকা মসৃন জাগয়ার মত ছিল । সেখানে একটা ফাঁকের মত সৃষ্টি হল ।
প্রাণীটা হাসছে !
কুৎসিত হাসিটা দেখে মিশুর গা ঘিন ঘিন করে উঠলো । জুংগা মিশুর এক পা চেপে ধরলো । চিৎকার দিয়ে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করলো কিন্তু কোন লাভ হল না । একটা ঠান্ডা অনুভব হচ্ছে সেখানে জুংগা ধরেছে ।
রাফায়েল বলেছিল কোন ভাবেই জুংগার হাতে পরা যাবে না কিন্তু সেটা আর হল না বুঝি । যাক তবে এইটুকুই শান্তনা যে মিমি আপুকে ও মুক্ত করতে পেরেছে ।
জুংগা আরও একটু কাছে এল মিশুর । আরও যখন একটু এগিয়ে আসতে যাবে তখন ডান দিক এক একটা আওয়াজ এল । মিশু সেই সাথে জুংগাও সেদিকে ফিরে তাকালো ।
রাফায়েল !
তবে এবার সে আর খালি হাত নেই । লম্বা একটা বাঁশের মত লাঠি ওর হাত । রাফায়েল এক মুহুর্ত দেরী না করে নিজের যত শক্তি আছে ততশক্তি দিয়ে জুংগার মুখ বরাবর বাড়ি মারলো । থপ করে আওয়াজ হল । মিশু বুঝতে পারলো ওর পায়ের গোড়ালী ছেড়ে দিয়েছে জুংগা !
রাফায়েল এবার মিশুর হাত ধরে দৌড়াতে শুরু করলো । এখনও হাতে লম্বা লাঠিটা রয়েছেই । একবার পেছন দিকে তাকিয়ে দেখে জুংগাও উঠে দাড়িয়েছে । ওদের দিকে চিৎকার করতে করতে গিয়ে আসছে ।
মিশুর কেবল মনে হচ্ছে ওকে দৌড়াতে হবে । পুকুরটা কোথায় ?
কোন দিকে !
ঐ তো দেখা যাচ্ছে । রাফায়েল ওর দিকে তাকিয়ে বলল
-শুনো তোমার প্রথম কাজ হবে এখন সোজা গিয়ে পুকুরে ঝাপ দিবে ! ঠিক আছে !
দৌড়া দৌড়াতে বলল
-হ্যা !
-তারপর সাঁতরে উঠে পাড়ে দেখবে একটা মোমবাতি জ্বালানো আছে । আর ওটার পাশে একটা কালো বেড়াল মরে পরে আছে । তোমার কাজ হবে ওটা নিভিয়ে ফেলা এবং মরা বেড়ালটা পানির ভেতরে ফেলে দেওয়া । মনে থাকবে !
-তুমি ?
-আমার কথা চিন্তা করতে হবে না । তোমার কাজ হবে আগে দরজাটা বন্ধ করা । আমি যদি না বের হই তবুও । কারন জুংগা যদি দরজা দিয়ে বের হয়ে যায় তাহলে তোমাকে আবার যে টেনে নিয়ে যাবে এমন কি তোমার বোনকেও নিয়ে যেতে পারে । আমাদের সব পরিশ্রম বৃথা হয়ে যাবে !
মিশু কি বলবে বুঝতে পারলো না । হঠাৎ আবিস্কার করলো রাফায়েল থেমে গেছে । হাতে লাঠি নিয়ে জুংগাকে আটকানোর জন্য থেমে গেছে ! ওর দিকে তাকিয়ে বলল
-তোমার চোখ দুটো আমার সেই ছোট বেলার প্রেমিকার মত । আমাকে মনে রেখো, কেমন !
এই বলে রাফায়েল হাসলো একটু ! মিশুর চোখ ফেটে কান্না এল । মন বলল থেমে গিয়ে ওকে সাথে নিয়ে যেতে । তখনই রাফায়েল চিৎকার করলো
-যাও ! যাও বলছি !
মিশু আর কিছু ভাবলো না । সোজা পুকুরের ভেতরে ডাইভ দিয়ে পড়লো ! আবারও কয়েক মুহুর্ত সেই ঠান্ডা পানি ওকে চেপে ধরলো যেন তারপরেই ও পানি থেকে মাথা তুলে উঠলো ।
চারিদিকে নিকোস কালো অন্ধকার !
পরিচিত অন্ধকার !
এই অন্ধকারের ওর পরিচিত ! এটা ওর পরিচিত পৃথিবীর রাতের অন্ধকার ।
নিশু দ্রুত হাত পা চালালো ।
ওকে পাড়ে উঠতে হবে । ঐতো মোমটা জ্বলছে । ওটা নেভাতে হবে । গায়ের যত শক্তি আছে সেটা দিয়ে নিশু সাঁতরাতে থাকলো ! মনে মনে কেবল দোয়া করতে লাগলো রাফায়েল যেন মোমটা নেভানোর আগেই পানি থেকে ভেসে ওঠে !
পরিশিষ্টঃ
সপ্তাহ পার হয়ে গেছে । মিশুর বোন মিমির শরীরে আস্তে আস্তে শক্তি ফিরে আসছে । ডাক্তার এসেছিলো ওকে দেখতে । ওরা মিমির এতো প্রোগ্রেস দেখে সত্যিই অবাক হয়েছে । এটাকে একটা মিরাকেল বলেছে । বাসার সবার মন খুব ভাল । ওর বাবা আলতাম মাহমুদ পুরো গ্রামের মানুষকে পেট ভরে খাইয়েছে ।
রাফায়েলের পরিবারের খোজ করা হয়েছিল কিন্তু তার ব্যাপার কেয়ারটেকার কোন খোজ দিতে পারে নি । সে কেবল বলেছে যার যখন দরকার হয়ে যায় তখন রাফায়েল সেখানে হাজির হয়ে যায় ! সবার মন ভাল কেবল মিশুর বাদে । মিশুর মন খারাপ করে সেই পুকুর পাড়ে বসে থাকে এখন ! কারো সাথে ঠিক মত কথা বলে না ! জোবাইদা বেগমের বুঝতে কষ্ট হয় নি মেয়ের মন কেন খারাপ ! কিন্তু ভাগ্যের উপর কার হাত আছে !
ঐ দিনের পরে মিশুরদের পুকুর পাড়ে সবাই যেতে ভয় পায় কিন্তু মিশুর একদম ভয় পায় না । বরং বড় বেশি আপন মনে হয় জায়গাটা । ঐদিন মোমটা নেভানোর আগ পর্যন্তও মিশুর আশা ছিল রাফায়েল পানি থেকে মাথা তুলবে কিন্তু সে উঠে নি । প্রতিদিন বিকাল সন্ধ্যা মিশু এখানেই বসে থাকে । কেবল একটা আশা রাফায়েল হয়তো উঠে আসবে । কিন্তু আসে নি । ছেলেটা ওকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেকে উৎসর্গ করেছে । জুংগার সাথে যুদ্ধ করে ও কোন ভাবেই টিকতে পারবে না । মারা পরবে । এই কথাটা মনে হতেই মিশুর খুব কান্না আসে !
-আফা মনি চা !
শিউলী চা রেখে গেল । মিশু চায়ে চুমুক দিতেই ওর মুখটা বিকৃত হয়ে উঠলো । শিউলীকে ধকম দিয়ে বলল
-চায়ে চিনি দিস নাই কেন ? জানিস না আমি চিনি ছাড়া আমি চা খাই না !
শিউলী যেন কথা শুনে আকাশ থেকে পড়লো ।
-কি যে কন না আফা ! আফনের চায়ে আমি চিনি দিমু না ? দুই চামুছ দিছি !
কথাটা শুনে মিশু চা টা মাটিতে ফেলে দিল । শিউলী আসলেই সত্যি কথা বলছে । চায়ের নীচে এখনও অগলিত চিনির দানা দেখা যাচ্ছে ! তাহলে প্রথম চুমুকে এমন পানছে কেন লাগলো !
(সমাপ্ত)
---------
।।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now