বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
মাথার উপরে সিলিং ফ্যান তার সর্বোচ্চ গতিতে ঘুরছে। তবুও ঘেমে যাচ্ছি আমি। একমনে তাকিয়ে আছি সিলিং ফ্যানের দিকে। মনে হচ্ছে ফ্যানের সাথে আমিও ঘুরতে থাকি। কিন্তু কিভাবে কি করব বুঝে উঠতে পারছিনা! খুব ভয় লাগছে আমার। সিলিং ফ্যানের সাথে ঘুরতে প্রচন্ড সাহস লাগে সেই সাহস তো আমার নেই। আমি কি পারব ঘুরতে??? ধুর! কি বলছি আমি? আমি যখন ফ্যানের সাথে থাকব তখন তো ফ্যান ঘুরবেনা। ফ্যান টা আটকিয়ে যাবে। আর আমি ঝুলে থাকব। আচ্ছা, খুব কি কষ্ট হবে ফ্যানের সাথে ঝুলতে?? নাহ! মোটেও কষ্ট হবেনা। আমি এখন যতটা কষ্ট পাচ্ছি তার থেকে অন্তত বেশি কষ্ট হবেনা। এভাবে ধুকে ধুকে কষ্ট পাওয়ার থেকে একেবারে কষ্ট পাওয়া ভালো। অন্তত বেঁচে থেকে আর তিলে তিলে মরতে হবেনা। কষ্ট পেতে হবেনা। কেন এমন হলো?? ভালোই তো ছিলাম। আগে তো বেশ ছিলাম....
.
আমি জিনিয়া। মা বাবার একমাত্র মেয়ে। আমার অন্য কোন ভাই বোন নেই। আমি একাই। বাবা সরকারী চাকুরীজীবী। মা গৃহিণী। দুজনার অনেক আদরের মেয়ে আমি। অনেকটা চঞ্চল এবং দুষ্টু প্রকৃতির মেয়ে আমি। সব দিকেই যেন আমি পারফেক্ট। খেলাধুলায়,পড়াশুনায়,গানে সবখানেই আমার প্রথম হওয়া চাই। ক্লাসের সেরা ছাত্রী ছিলাম আমি। হইচই করে সবাইকে মাতিয়ে রাখতাম। কারো মন খারাপ দেখলে ভালো করে দিতাম এক নিমিষেই। সেই আমি আজ ভালো নেই। ভালো নেই আমি।
.
আমি যখন ক্লাস টুয়েলভ এ.. কিছুদিন পরেই বাবা রিটায়ার্ড করবেন। তখন বাবা-মা ভাবেন তাদের মেয়ে তো বড়ই হয়েছে এখন তাকে ভালো পাত্রস্থ করতে হবে। তাহলেই ওনাদের দায়িত্ব শেষ। শেষ বয়সে অন্তত মেয়ের ভালোটা দেখতে চান এই আশায় বাবা একদিন আমার ঘরে এসে বলে,
-তোমার সাথে কিছু কথা ছিলো মা!
-হ্যাঁ বাবা। বলো কি বলবে?
-আমরা তোমার বিয়ে দিতে চাই। অন্য কোথাও কি তোমার পছন্দ আছে? কাউকে কি পছন্দ করো? যদি করো আমাদের বলো, আমরা দেখব। দেখে শুনে ভালো হলে তার সাথেই বিয়ে দেব।
-মাথা নিচু করে লজ্জাশরম ত্যাগ করে বললাম, হ্যাঁ বাবা। আমি একজনকে পছন্দ করি। (তারপর ছেলের সম্পর্কে আরো অনেক কিছু বললাম।)
-আচ্ছা মা। আমরা ছেলের পরিবারে যাব। কথা বলব।
একথা বলেই বাবা আমার ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
.
আমি যাকে ভালোবাসি তার নাম জীতু। অনার্স ফাইনাল ইয়ারে পড়াশুনা করে। দেখতে সুন্দর। অত্যন্ত ভদ্র একটা ছেলে। বাসার অবস্থাও বেশ ভালো। আর আমাদেরো কম কিছুনা। তাই ভাবছিলাম সবাই ভালোয় ভালোয় মেনে নেবেন সবকিছু। জীতুকে ফোন করে জানিয়ে দিলাম আমার মা-বাবা তোমার ওখানে যাবে। সে শুধু বলল, বলেই যখন দিয়েছো তখন আসতে দাও দেখি কি হয়!
.
বাবা-মা জীতুদের বাসায় গেলেন বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে। যদিও যেতে চাননি তবুও মেয়ের সুখের কথা ভেবে গেলেন জীতুদের বাসায়। সেখানে গিয়ে বিয়ের কথাবার্তা বলতেই জীতুর বাবা ক্ষেপে যান। উনি বলেন, এখন আমি আমার ছেলেকে বিয়ে দেব ভাবলেন কি করে? এরকম আরো অনেক কথা প্রসঙ্গে আমার বাবা-মা একপ্রকার অপমানিত হয়েই ফিরে আসেন। এসে সব বলেন আমাকে। বাবা বলেন,
-এখন কি করব মা?? আমরা তো গেছিলাম ই। তারা তো রাজী হলোনা।
-আমি মাথা নিচু করে কাঁদছি। বলার মত কিছু পাচ্ছিনা শুধু মনে হচ্ছে আমার জন্যই এরকম হলো। আমার জন্য বাবা-মা কে অপমানিত হতে হলো।
-কি মা কিছু বলো..
-বাবা বাদ দাও না আমার বিয়ে। আমি এখন বিয়ে করব না।
-তা কি করে হয় মা? ক'দিন আর বাঁচব? আমি তোমার সুখ দেখে যেতে চাই। আমি তোমার সংসার,সন্তান দেখে যেতে চাই।
-আর কথা বাড়ালাম না। বাবাকে বললাম,তোমার যা ভালো মনে হয় করো। আমি আর কিছু বলব না। কিন্তু পরে কিছু হয়ে গেলে আমায় কিছু বলতে পারবেনা।
-কিছুটা ভয় পেলেও বলল, কিছু হবেনা। আমরা আছি তো তোমার সাথে।
.
তখন থেকে ছেলেপক্ষ দেখতে আসা শুরু হয়। অনেকেই আসতে থাকে দেখতে থাকে আমাকে। আমাকে সবাই পছন্দ করে যায় কিন্তু বাবা-মায়ের ই কিছু পছন্দ হয়না। শেষে একটা ঘর পছন্দ হয়ে যায়। ছেলে দেখতে সুন্দর, স্মার্ট, ভালো চাকুরী সব মিলিয়ে ছেলেও পার্ফেক্ট। এবার আর নিস্তার নেই। পাকা কথা দিয়ে দেয় বাবা। কথা দেওয়ার পর বাবা আমাকে বলে, ছেলেকে নাম্বার দিয়েছি ফোন দিলে কথা বলে নিও।
.
সময় করে ছেলেটা ফোন করে,
-হ্যালো! আসসালামু আলাইকুম। কে বলছেন?
-ওয়ালাইকুম আসসালাম আমি জামিল বলছি। আপনি জিনিয়া তো?
-হ্যাঁ আমি জিনিয়া। (শুনেছিলাম ছেলেটার নাম জামিল)
জি বলুন।
- একটা কথা শুধু জানার ছিলো যদি বলতেন?
-বলুন কি জানতে চান?
-আপনার এ বিয়েতে সম্মতি আছে?
-দেখুন আমি বাবাকে খুব ভালোবাসি আর বাবার কথায় রাজী হয়েছি।
-আচ্ছা ঠিক আছে।
.................................
এভাবেই আরো কিছু কথা হয় সেদিন। তারপর ডেট অনুযায়ী ধুমধাম করে বিয়ে হয়ে যায় আমার আর জামিলের।
.
বিয়ের প্রথম দিকে কেন জানি মানতে পারতাম না জামিলকে। খুব বোরিং লাগত। কথা খুব কম বলতাম। প্রয়োজন ছাড়া কথা বলতাম না। এক কথায় দায় সারা কাজের মত তার ঘর করতাম। বিয়ে দিয়েছে এখানে থাকতেই হবে এরকম মানসিকতা নিয়ে সংসার করতাম। তাকে সেরকম ভালো বাসতেও পারতাম না।তার প্রতি কোন টান ও কাজ করত না। ভাবতাম তাকে ছেড়েও ভালো থাকতে পারব। তার কোন কথা শুনতাম না। আমার যা মনে হত তাই করতাম। সে ডান বললে আমি বাম বলতাম। সারাক্ষণ ফোন নিয়ে থাকতাম। গেইমস,ফেসবুকে সময় দিতাম। যার তার সাথে চ্যাট করতাম। আড্ডা দিতাম। নিষেধ করলেও শুনতাম না।
অন্যদিকে জামিল পুরোই আলাদা। সে আমাকে অনেক ভালোবাসত। আমাকে সর্বস্ব দিয়ে ভালো রাখার খুশি রাখার চেষ্টা করত। চাইত আমি যাতে তাকে ভালোবাসি। তার কথা শুনি। সবসময় তার পাশে থাকি।
.
এভাবে বিয়ের ৩ বছর কেটে গেলো। আমার মধ্যে পরিবর্তন এসেছে। আমি জামিলকে ভালোবেসে ফেলেছি। জামিলের সাথে থেকে থেকে এমন অভ্যাস হয়ে গেছে যে, ওকে ছাড়া আমি থাকতে পারব না। ওকে ছেড়ে অন্যকিছুতেও মন বসেনা আমার। সারাক্ষণ ওর সাথেই থাকতে মন চায়। ওর ভালোবাসাই পেতে চায়।
অন্যদিকে জামিল এখন আমার মত হয়ে গেছে। আমাকে আগের মত ভালোবাসেনা। আমার কেয়ার করেনা। আমার দিকে ফিরেও তাকায় না। অফিস থেকে এসে ফোন চাপে। ফোন চাপা শেষ হলে ঘুমিয়ে যায়। আমাকে সময় দেয়না। তার ফোন চাপা আমার একদম সহ্য হয়না। মনে হয় আছাড় দিয়ে ভেঙ্গে ফেলি। কিন্তু পারিনা...
.
আমরা একই বিছানায় থাকি অথচ কারো শরীরের সাথে কারো শরীর লাগেনা। আমি এগিয়ে গেলেও সে সরে যায়। আমি অভিমান করে পাশ ফিরে শুয়ে থাকি তার স্পর্শ আশা করি। কিন্তু না। সে আমার কাছে আসেনা। আমার খুব কষ্ট হয়। কষ্টে বুক ফেটে যায়। কাউকে কিছু বলতে পারিনা। বাবাকে একবার বলেছিলাম, বাবা আমি এরকম মেনে নিতে পারছিনা বাবা। বাবা বলে, ধৈর্য ধরো মা।সব ঠিক হয়ে যাবে।
.
আর কত ধৈর্য ধরব আমি? এরকম যে আমি সহ্য করতে পারছিনা। জামিলকে বলি, এরকম কেন করছো আমার সাথে? সে বলে, আমার আর কিছুই ভালো লাগেনা। তোমাকে স্পর্শ করতেও ইচ্ছে করেনা। এরকমি ভালো আছি আমি। আমি জামিলের কথাতে খুব কষ্ট পাই। তাকে আর কিছু বলিনা আমি। আমিও চুপচাপ থাকি। কথা বলিনা জামিলের সাথে। একই বিছানায় দুজন দুপাশ ফিরে শুয়ে থাকি। আমার বুকটা ফেটে যায়। চাপাস্বরে কাঁদি আমি। বালিশ ভিজিয়ে ফেলি আর ভাবি, জামিলের মনে কি অন্য কেউ? অন্য কারো জন্য কি সে আমার সাথে এমন করছে???? যদি তাই হয় তাহলে আমি বাঁচব কি করে??? আমি তো আর একা নই.......
.
সব ভাবনায় ছেদ পড়লো একটা অস্তিত্বের সাড়া পেয়ে..
নাহ! আমাকে এভাবে হেরে গেলে চলবেনা। যে আসছে তাকে তো ভালোভাবে আনতে হবে পৃথিবী তে। ৬ মাস আগেও তো জামিল এমন ছিলোনা। খুব ভালো ছিলো। আমার পেটে জামিলের সন্তান। জামিল সেটা জানে। তবুও কেন এমন করছে আমি জানিনা!! যাই হোক, আল্লাহর রহমত যেটা সেটা তো আমি ফেলতে পারিনা। তাকে তো মেরে ফেলতে পারিনা আমি। তাকে তো পৃথিবী তে আনতে হবে। সুস্থভাবেই আনতে হবে। আমার বাবা তো নাতী/নাতনীর মুখ দেখতে চেয়েছে। ওনাকে আমি নাতী /নাতনীর মুখ দেখাবই। তারপর যা হবার হবে। এরমধ্যে সব ঠিক হয়ে গেলে হবে না হলে পরের ব্যাপার পরে দেখা যাবে। আপাতত আমাকে ঠিক থাকতে হবে। যে আসছে তাকে সুস্থ,স্বাভাবিক ভাবে পৃথিবী তে আনতে হবে। আমাকে আর মরার কথা মুখেও আনলে চলবে না। কে বলতে পারে যে আসছে সেই হয়ত সবকিছুর সমাধান করে দেবে। আমি বাঁচব। আমাকে যে বাঁচতেই হবে। ফ্যান ঘুরুক। ঘুরুক তার মত। আমাকেও যে আমার জীবনের চাকা ঘুরাতে হবে। আমাকে আমার সন্তানের জন্য বাঁচতেই হবে.......
সমাপ্ত
Rabeya Akter(রুহ আফজা)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now