বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

" যকের ধন " ----- (পর্ব ১৭)

"রোমাঞ্চকর গল্প " বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X " যকের ধন " হেমেন্দ্রকুমার রায় ---------------- (পর্ব ১৭) ▪▪▪পথের বাধা▪▪▪ কি দুর্গম পথ! কখনো প্রায় খাড়া উপরে উঠে গেছে, কখনো পাহাড়ের শিখরের চারিদিকে পাক খেয়ে, আবার কখনো বা ঘুটফুটে অন্ধকার গুহার ভিতর দিয়ে পথটা সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে। এ পথে নিশ্চয় লোক চলে না, কারণ পথের মাঝে মাঝে এমন সব কাটাজঙ্গল গজিয়ে উঠেছে যে, কুড়ল দিয়ে কেটে না পরিস্কার করে অগ্রসর হওয়া অসম্ভব। ঠাকুরদাদার পকেট-বইয়ে যদি পথের ঠিকানা ভালো করে না লেখা থাকত, তাহলে নিশ্চয় আমরা এদিকে আসতে পারতুম না। পকেট-বইখানা এখন আমাদের কাছে নেই বটে, কিন্তু পথের বর্ণনা আমরা আলাদা কাগজে টুকে নিজেদের সঙ্গে সঙ্গেই রেখেছিলুম। পথটা খারাপ বলে আমরা তাড়াতাড়ি এগিয়ে যেতেও পাবছিলুম না বিশ মাইল পথ আমরা অনায়াসে একদিনেই পেরিয়ে যেতুম, কিন্তু এই পথটা পার হতে আমাদের ঠিক পাঁচদিন লাগল। কাল থেকে মনে হচ্ছে, আমরা ছাড়া পৃথিবীতে যেন আর কোন মানুষ নেই। চারিদিক এত নির্জন আর এত নিস্তব্ধ যে, নিজেদের পায়ের শব্দে আমরা নিজেরাই থেকে থেকে চমকে উঠছি। মাঝে মাঝে বাঘা যেই ঘেউ ঘেউ করে ডাকছে, আর আমন চারিধারে পাহাড়ে পাহাড়ে এমন বিষম প্রতিধ্বনি তে জেগে উঠছে যে, আমার মনে হতে লাগল, পাহাড়ের শিখরগুলো যেন হঠাৎ আমাদের পদশব্দে জ্যান্ত হয়ে ধমকের পর ধমক দিচ্ছে। পাখিগুলো পর্যন্ত আমাদের সাড়া পেয়ে কিচির-মিচির করে ডেকে ছত্রভঙ্গ হয়ে উড়ে পালাচ্ছে—যেন এ পথে আর কখনো তারা মানুষকে হাঁটতে দেখেনি। পাঁচ দিনের দিন, সন্ধ্যার কিছু আগে, খানিক তফাৎ থেকে আমাদের চোখের উপরে আচম্বিতে এক অপূর্ব দৃশ্য ভেসে উঠল। সারি সারি মন্দিরের মতন কতকগুলো বাড়ী- সমস্তই যেন মিশকালো রঙে তুলি ডুবিয়ে, আগুনের মত রাঙা আকাশের পটে কে একে রেখেছে। একটা উচু পাহাড়ের শিখরের উপরে মন্দিরগুলো গড়া হয়েছে। এই নিস্তব্ধতার রাজ্যে শিখরের উপরে মুকুটের মত সেই মন্দিরগুলোর দৃশ্য এমন আশ্চর্যরকম গম্ভীর যে, বিস্ময়ে আর সন্ত্রমে খানিকক্ষণ আমরা আর কথাই কইতে পারলুম না। সকলের আগে কথা কইল বিমল। মহা আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল— বৌদ্ধমঠ! আমিও বলে উঠলুম—যকের ধন? রামহরি বললে, আমাদের এতদিনের কষ্ট সার্থক হল। বাঘা আমাদের কথা বুঝতে পারলে না বটে, কিন্তু এটা অনায়াসে বুঝে নিলে যে, আমরা সকলেই খুব খুসি হয়েছি। সেও তখন আমাদের মুখের পানে চেয়ে ল্যাজ নাড়তে নাড়তে ঘেউ ঘেউ করতে লাগল। আনন্দের প্রথম আবেগ কোনরকমে সামলে নিয়ে আবার তাড়াতাড়ি অগ্রসর হলুম। মঠ তখনো আমাদের কাছ থেকে প্রায় মাইল-খানেক তফাতে ছিল—আমরা প্রতিজ্ঞা করলুম, আজকেই ওখানে না গিয়ে কিছুতেই আর বিশ্রাম করব না। সন্ধ্যার অন্ধকার ক্রমেই ঘন হয়ে উঠল। বিমল আমাদের আগে আগে যাচ্ছিল। আচমকা সে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে বলে উঠল-- ‘সর্বনাশ! আমি বললুম, কি হল বিমল? বিমল বললে, উঁঃ, মরতে মরতে ভয়ানক বেঁচে গেছি? —কেন, কেন? খবৰ্দার। আর এগিয়ে না, দাঁড়াও। এখানে পাহাড় ধ্বসে গেছে, আর পথ নেই? মাথায় যেন বজ্র ভেঙে পড়ল—পথ নেই। বিমল বলে কি? সাবধানে দু-চার পা এগিয়ে যা দেখলুম, তাতে মন একেবারে দমে গেল। পথের মাঝখানকার একটা জায়গা ধ্বসে গিয়ে গভীর এক ফাঁকের স্মৃষ্টি হয়েছে, ফাঁকের মুখটাও প্রায় পঞ্চাশ-ষাট ফুট চওড়া। সেই ফাঁকের মধ্যেও নেমে যে পথের এদিক থেকে ওদিক দিয়ে উঠব, এমন কোন উপায়ও দেখলুম না। পথের দুপাশে যে খাড়া খাদ রয়েছে, তা এত গভীর যে দেখলেও মাথা ঘুরে যায়। এ কি বিড়ম্বন, এতদিনের পরে, এত বিপদ এড়িয়ে, যকের ধনের সামনে এসে শেষটা কি এইখান থেকেই বিফল হয়ে ফিরে যেতে হবে? আমার সর্বাঙ্গ এলিয়ে এল, সেইখানেই আমি ধুপ করে বসে পড়লুম। খানিকক্ষণ পরে মুখ তুলে দেখলুম, ঠিক সেই ভাঙা জায়গাটার ধীরে একটা মস্ত উঁচু সরল গাছের দিকে তাকিয়ে চুপ করে বিমল কি ভাবছে। আমি বললুম, তার কি দেখছ ভাই, এখানে বসবে এস, আজ এইখানেই রাতটা কোনরকমে কাটিয়ে, কাল আবার বাড়ীর দিকে ফিরব? বিমল রাগ করে বললে, এত সহজেই যদি হাল ছেড়ে দেব, তবে মানুষ হয়ে জন্মেছি কেন? আমি বললুম, হাল ছাড়ব না তো কি করব বল? লাফিয়ে তো আর ঐ ফাঁকটা পার হতে পারব না, ডানাও নেই যে, উড়ে যাব। বিমল বললে, তোমাকে লাফাতেও হবে না, উড়তেও বলছি না। আমরা হেঁটেই যাব। আমি আশ্চর্য হয়ে বললুম, হেঁটে! শূণ্য দিয়ে হেঁটে যাব কিরকম? বিমল বললে, শোন বলছি। এই ফাঁকটার মাপ সতেরো আঠারো ফুটের বেশী হবে না, কেমন? —হ্যাঁ। —আচ্ছা, ভাঙা পথের ঠিক ধারেই যে সরল গাছটা রয়েছে, ওটা আন্দাজ কত ফুট উঁচু হবে বল দেখি? —সতেরো-আঠারো ফুটের চেয়ে ঢের বেশী। —বেশ, তাহলে আর ভাবনা কি? আমরা কুড়ল দিয়ে কুপিয়ে গাছের গোড়াটা এমনভাবে কাটব, যাতে করে পড়বার সময়ে গাছটা পথের ঐ ভাঙা অংশের ওপরেই গিয়ে পড়ে। তাহলে কি হবে বুঝতে পারছ তো? আমি আহলাদে একলাফ মেরে বললুম, ওহে, বুঝেছি। গাছটা ভাঙা জায়গার ওপরে পড়লেই একটা পোলের মত হবে। তাহলেই তার ওপর দিয়ে আমরা ওধারে যেতে পারব। বিমল, তুমি হচ্ছ বুদ্ধির বৃহস্পতি! তোমার কাছে আমরা এক একটি গরুবিশেষ। বিমল বললে, বুদ্ধি সকলেরই আছে, কিন্তু কাজের সময়ে মাথা ঠাণ্ডা রেখে সকলেই সমানভাবে বুদ্ধিকে ব্যবহার করতে পারে না বলেই তো মুস্কিলে পড়তে হয় ...যাক, আজ আমাদের এইখানেই বিশ্রাম। কাল সকালে উঠেই আগে গাছটা কাটবার ব্যবস্থা করতে হবে। ▪▪▪বাধার উপরে বাধা▪▪▪ গভীর রাত্রি। একটা ঝুঁকে-পড়া পাহাড়ের তলায় আমরা আশ্রয় নিয়েছি। আমাদের দিকে পাহাড় আর দুদিকে আগুন। বিমল আর রামহরি ঘুমাচ্ছে আমিও কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছি— কিন্তু ঘুমোইনি, কারণ এখন আমার পাতার দেবার পালা। চাঁদের আলোর আজ আর তেমন জোর নেই; চারিদিকে আলো আর অন্ধকার যেন একসঙ্গে লুকোচুরি খেলছে। হঠাৎ বৌদ্ধমঠে যাবার পথের উপর দিয়ে খেযালের মত কি একটা জানোয়ার বারবার পিছনে তাকাতে তাকাতে তাড়াতাড়ি পালিয়ে গেল—দেখলেই মনে হয় সে যেন কোন কারণে ভয় পেয়ে পালিয়ে গেল। মনে কেমন সন্দেহ হল। পা থেকে মাথা পর্যন্ত কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে রইলুম বটে, কিন্তু চোখের কাছে একটু ফাঁক রাখলুম,—আর বন্দুকটাও কাপড়ের ভিতরেই বেশ করে বাগিয়ে ধরলুম। এক, দুই, তিন মিনিট। তারপরেই দেখলুম, পাহাড়ের আড়াল থেকে উপরে একটা মানুষ বেরিয়ে এল...তারপর আর একজন... তারপর আরো একজন—তারপর একসঙ্গে দুইজন। সবশুদ্ধ পাঁচজন লোক! আস্তে আস্তে চোরের মতন আমাদের দিকে তারা এগিয়ে আসছে। যদিও রাতের আবছায়ায় তফাৎ থেকে তাদের চিনতে পারলুম না— তবুও আন্দাজেই বুঝে নিলুম, তার কারা। সব-আগের লোকটা আমাদের অনেকটা কাছে এগিয়ে এল। আমাদের সামনেকার আগুনের আভা তার মুখের উপরে গিয়ে পড়তেই চিনলুম—সে করালী! একটা নিষ্ঠুর আনন্দে বুকটা আমার নেচে উঠল। এই করালী! এরই জন্যে কত বিপদে পড়তে হয়েছে, কতবার প্রাণ যেতে যেতে বেঁচে গেছে, এখনো এ আমাদের যমের বাড়ী পাঠাবার জন্যে তৈরী হয়ে আছে; ধরি ধরি করেও কোনবারেই একে আমরা ধরতে পারিনি— কিন্তু এবারে আর কিছুতেই এর ছাড়ান নেই। বন্দুকট তৈরী রেখে একেবারে মড়ার মত আড়ষ্ট হয়ে পড়ে রইলুম। করালী আরো কাছে এগিয়ে আসুক না,—তারপরেই তার মুখের স্বপ্ন জন্মের মত ভেঙে দেব! পা টিপে-টিপে করালী ক্রমে আমাদের কাছ থেকে হাত পনেরো-ষোলো তফাতে এসে পড়ল—তার পিছনে পিছনে আর চারজন লোক। আগুনের আভায় দেখলুম, করালীর সেই কুৎসিত মুখখান আজ রাক্ষসের মতই ভয়ানক হয়ে উঠেছে। তার ডানহাতে একখানা মস্ত বড় চকচকে ছোরা, এখান নিশ্চয়ই সে আমাদের বুকের উপরে বসাতে চায়। তার পিছনের লোকগুলোরও প্রত্যেকেরই হাতে ছোরা, বর্শা বা তরোয়াল রয়েছে। এটা আমাদের খুব সৌভাগ্যের কথা যে, করালীর কেউ বন্দুক জোগাড় করে আনতে পারেনি। তাদের সঙ্গে বন্দুক থাকলে এতদিন নিশ্চয়ই আমরা বেঁচে থাকতে পারতুম না। করালী আমাদের আগুনের বেড়াটা পেরিয়ে আসবার উদ্যোগ করলে। বুঝলুম, এই সময়। বিদ্যুতের মতন আমি লাফিয়ে উঠলুম— তারপর চোখের পলক ফেলবার আগেই বন্দুকটা তুলে দিলুম একেবারে ঘোড়া টিপে। গুড়ুম। বিকট এক চীৎকার করে করালী মাথার উপর দু-হাত তুলে মাটির উপরে ঘুরে পড়ে গেল। তার পিছনের লোকগুলো হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল—তাদের দিকেও তার একবার বন্দুক ছুড়তেই তারা প্রাণের ভয়ে পাগলের মত দৌড়ে পালাল। কিন্তু বন্দুকের গুলি বোধ হয় করালীর গায়ে ঠিক জায়গায় লাগেনি, কারণ মাটির উপরে পড়েই সে চোখের নিমেষে উঠে দাঁড়াল —তারপর প্রাণপণে ছুটে অন্ধকারে কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল। আমার দোনলা বন্দুকে আর টোটা ছিল না, কাজেই তাকে আর বাধা দিতেও পারলুম না। কয় সেকেণ্ড পরে ভীষণ এক আর্তনাদে নিস্তব্ধ রাত্রির আকাশ যেন কেঁপে উঠল—তেমন আর্তনাদ আমি জীবনে আর কখনো শুনিনি। তারপরেই আবার সব চুপচাপ —ও আবার কি ব্যাপার? মিনিটখানেকের মধ্যেই এই ব্যাপারগুলো হয়ে গেল। ততক্ষণে গোলমালে বিমল, রামহরি আর বাঘাও জেগে উঠেছে। বিমলকে তাড়াতাড়ি দু-কথায় সমস্ত বুঝিয়ে দিয়ে বললুম, কিন্তু ঐ আর্তনাদ যে কেন হল বুঝতে পারছি না। আমার মনে হল একসঙ্গে যেন জন-তিনেক লোক চেঁচিয়ে কেঁদে উঠল। বিমল সভয়ে বললে, কি ভয়ানক! নিশ্চয়ই অন্ধকারে দেখতে না পেয়ে তারা ভাঙা পথের সেই ফাঁকের মধ্যে পড়ে গেছে। তারা কেউ আর বেঁচে নেই। আমি বললুম, কিন্তু করালী ওদিকে যায়নি—সে এখনো বেঁচে আছে। রামহরি বললে, আহা, হতভাগাদের জন্যে আমার ভারি দুঃখ হচ্ছে, শেষটা অপঘাতে মরল! বিমল বললে, যেমন কর্ম, তেমনি ফল—দুঃখ করে লাভ নেই। করালীর যদি এখনো শিক্ষা না হয়ে থাকে, তবে তার কপালেও অপঘাত মৃত্যু লেখা আছে। আমি বললুম, ‘অন্ততঃ কিছুদিনের জন্যে আমরা নিশ্চয় করালীর দেখা পাব না। সে মরেনি বটে, কিন্তু রীতিমত জখম যে হয়েছে, তাতে আর কোন সন্দেহ নেই? বিমল বললে, আর তিনদিন যদি বাধা না পাই, তাহলে যকের ধন আমাদের মুঠোর ভিতর এসে পড়বেই—এ আমি তোমাকে বলে দিলুম। আমি হেসে বললুম, তোমার মুখে ফুলচন্দন পড়ুক। (চলবে) --------


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৯৩ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now