বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
স্রষ্টা এক। তবে কি একা?
.
আমার বিশ্বাস, স্রষ্টা তাঁর নিজস্ব একাকীত্ব আমাদের প্রত্যেকের মাঝেই সামান্য হলেও ঢুকিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু আমার কেনো যেনো মনে হয়, অন্যদের সেই সামান্য একাকীত্বের চেয়ে একটু বেশিই একাকীত্ব দিয়েছেন আমাকে। এই বেশি একাকীত্ব আমাকে দেয়া তাঁর কতো বড়ো পুরষ্কার— সেটা ভেবেই আমার নিজেকে বড়ো বেশি সৌভাগ্যবান বলে মনে হয় মাঝে মাঝেই।
কিন্তু একাকীত্ব খুব আনন্দময় নয়। খুব কষ্টমুখর। খুব যাতনাময়। কে বলবে— স্রষ্টা হয়তো তাঁর নিজস্ব পরিমণ্ডলের আদ্যন্তে খুব যাতনাময় একটা স্বত্বা।
যা হোক, আমি স্রষ্টা সম্পর্কীয় কোনো আলোচনায় বসি নি। স্রষ্টাজ্ঞান আমার অতোটা নেই। আমি নিজেকে খুলতে বসেছি। আমি নিজেকে মেলতে বসেছি। একটু। বলতে চাচ্ছিলাম আমার একাকীত্ব নিয়ে। দেখি, ফিরতে পারি কিনা সেদিকে।
.
জীবনের একেকটা দিন গেছে, আর আমি একা হয়েছি। সপ্তাহ গেছে— আমি একা হয়েছি। মাস গেছে, বছর গেছে— আমি একা হয়েছি।
.
বাবাকে খুব ভালোবাসতাম কিনা এখনো বুঝতে পারি না। কিন্তু খুব মান্য করতাম। একদিনের ঘটনা খুব মনে পড়ে। ক্লাস সিক্স-কি-সেভেনে পড়ি। তখন। কোনো কাজ নেই আমার। একটু পড়ি, আর সারাদিন ঠনঠন করে বেড়াই। মাঠে মাঠে ঘুরে বেড়াই। বনে বাদাড়ে ঘুরে বেড়াই। নির্জন কোনো পুকুর পাড়ে চুপচাপ বসে থাকি। কোনো কোনো দিন খুলনা-বেনাপোলের ট্রেন লাইন ধরে চলে যায় দিগন্ত ছুঁতে। দূর থেকে দূর-সুদূর।
এসবেরই মাঝে একদিন বাবা ডাক দিলেন। একটু রেগে বললেন, ‘তোর থেকে ছোটো ছোটো ছেলেরা দেখি মসজিদে গিয়ে নামায পড়ে নিয়মিত, আর তুই?’
আমাকে উদ্দেশ্য করে আর কোনোদিন কিছু বলতে হয় নি বাবার। পরের ওয়াক্ত থেকেই আমি নামাযে যেতে শুরু করলাম। সেই সাথে শুরু হলো অধ্যবসায়। আমি বাবার তথাকথিত নামাযী সন্তান হবো না। আমি যা হবো— হওয়ার মতোই হবো। সবাই আমপারা থেকে ছোটো ছোট দেখে কোনো রকমে ৪টা সুরা শিখে ৫ ওয়াক্ত নামায পড়ে ধার্মিক হয়ে পার করে দেয় পুরোটা জীবন। সবার কাতারে পড়তে আমার ইচ্ছে হলো না। আমি আলিফ বা তা ছা শিখলাম। মাখরাজ শিখলাম। ইত্যাদি। এবং তারপর শিখলাম আরবী কায়দা পড়া। কায়দা থেকে কোরাআন। কোরআন পড়া শুধু আরবীতেই সীমাবদ্ধ থাকলো না। অর্থ জানতে থাকলাম। ব্যাখ্যা জানতে থাকলাম। এবং এসবের জন্যে আমি কোনো শিক্ষক বা ধর্মগুরুর আশ্রয় নিই নি কখনো। সব নিজের প্রচেষ্টায়। নানান জায়গা থেকে বই-পুস্তক যোগাড় করে করে।
আমি এতোকিছু বললাম নিজের দাম বাড়ানোর জন্য না। আমি আমার বাবাকে কতোটা মান্য করতাম, এবং সেটা কতোটা শ্রদ্ধাভরে— তা দেখানোর জন্য। আমার সেই মাননীয়, শ্রদ্ধেয় বাবা হঠাৎ একদিন আমাকে ছেড়ে চলে গেলেন। এটাই হয়তো আমার প্রথম একা হওয়া।
.
ক্লাস টুতে উঠে একটা বন্ধু পেলাম। প্রিন্স। আগে একা ঘুরতাম, এবার ঘুরি দুইজনে। আমি আর প্রিন্স। প্রিন্স আর আমি। যা কিছু করি— সব দুইজনে। আমাদের বন্ধুত্বের সবচে’ মজার ঘটনা হলো— আমি এখনো ভেবে নিজে নিজে খুব সুখী হয়ে উঠি প্রায়ই— মাগরীবের নামায পড়ে হয়তো আমি বেরোতাম ওর উদ্দেশ্যে, নয়তো ও আমার উদ্দেশ্যে। দু’জন এক হবার পর থেকে শুরু হতো আমাদের গল্প। পড়ার কথা ভুলে যেতাম। খাওয়ার কথা ভুলে যেতাম। এমনকি এশার নামাযের কথাও ভুলে যেতাম। গল্পে গল্পে একসময় সন্ধ্যে গাঢ় হয়ে আসতো। আমাদের কেউ একজনের হঠাৎ মনে হতো— বাড়ি ফিরতে হবে যে! তারপর শুরু হতো এগিয়ে দেবার পালা। দেখা যেতো আমি ওকে ওদের বাড়ির কাছাকাছি এগিয়ে দিতে গেলাম— ও দাঁড়িয়ে পড়ে বললো— ‘চল তোকেও এগিয়ে দিয়ে আসি।’
আমি ‘না’ করতাম না। আমাদের বাড়ির কাছাকাছি আসতেই আমিও দাঁড়িয়ে যেতাম— ‘চল, তোকেও এগিয়ে দিয়ে আসি’।
ও হাসতে হাসতে বলতো— ‘চল।’
এইভাবে গাঢ় বন্ধুতায় কেটে গেছে কতো কতো দিন! একদিন হঠাৎ খেয়াল করলাম— আমার কোথাও প্রিন্স নেই। ক্লাসের বেঞ্চে নেই। পাল্লা দিয়ে হাতের লেখা ভালো করার প্রতিযোগীতায় নেই। মাগরীবের পরের সময়ের সঙ্গতায় নেই। রেল লাইন বেয়ে বেয়ে দিগন্ত ছোঁয়াতে নেই। কোথাও নেই। স্রেফ বুকের গহীনে কোথাও খুব গভীরভাবে রয়ে গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম প্রিন্স ওর নানাবাড়ি চলে গেছে। ওখানে থেকেই পড়ালেখা করবে। তার পর থেকে আমার ভেতরে থাকা ক্লাসে রেজাল্ট ভালো করার গুণটা হাওয়া হয়ে গেলো। আগে যেখানে ২ থেকে ৫-এর ভেতর রোল থাকতো, এখন সেটা ১৩ থেকে শুরু করে ৫৩। আমি যখন ক্লাস নাইনে, তখন আমার রোল নং হয়েছিলো ৫৩।
২-৫-এর আমাকে ১৩-৫৩ বানানো বন্ধু, আজো আমার বন্ধুতালিকার শীর্ষে থাকা সেই প্রিন্স, এখনো জানে না— ওর সেদিনের চলে যাওয়া হয়তো আমার দ্বিতীয়বারের একা হওয়া।
.
তারপরের একা হওয়ার আর হিসেব করি নি। কতো ভালো ভালো বন্ধু— কামাল, টিটু, শহিদ, মিলকান, মেহেদী, জাহাঙ্গীর ভাই, শাকিল, রুবেল, নাহিদ; কতো স্নেহী স্বজন— মা, মিয়া ভাই, মেজো ভাই, মিয়া ভাবী; কতো মায়াময় প্রকৃতি— খোলা মাঠ, নির্জন পুকুর পাড়, দিগন্ত ছোঁয়া রেল লাইন; —একদিন সবার থেকে একা করে নিলাম নিজেকে। কী এক অভিমানে আর মন টিকলো না— শ্রাবণের এক বৃষ্টিদিনে সবাইকে ছেড়ে একা একা চলে এলাম খুলনা শহরে। ছোটো বোনটার বাসায়।
তারপর কতো বন্ধু-স্বজন আবার জুটে গেলো— সাঞ্জু, শাহীনাপু, কণাপু, আনু ভাই, লিজাপু। এবং তারপর, একেক সময়ে, একেকদিন, একেকজন, যে যার মতো ব্যস্ত হয়ে পড়লো। তারপর থেকে আজ কতোগুলো বছর আমি একা! এখন আমার বন্ধু কেবল বই, গান, আর ফেসবুক। এদের ভেতর অন্যরকম একটা সম্পর্ক ফেসবুকের সাথে। অফিসের কাজে সারাদিন মার্কেটে মার্কেটে ঘুরে বেড়াই, আর একটু অবসর পেলেই পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে চোখের সামনে নিয়ে আসি। টুক করে ঢুকে পড়ি ফেসবুকে। ডাব্লু ডাব্লু ডাব্লু ডট ফেসবুক ডট কম। কতো যে ভালো বন্ধু এনে দিয়েছে ফেসবুক আমাকে! তাদের কেউ খুব ভালো বন্ধু, কেউ ভাই, কেউ মায়ের মতো স্নেহী বোন। সবচে’ বড়ো কথা— নিজের সৃষ্টিগুলোকে প্রকাশের স্বাধীনতা দিয়েছে ফেসবুক আমাকে। সবকিছু মিলিয়ে আমার একাকী দিনগুলো বেশ কেটে যায়।
কিন্তু, বিপত্তি বাঁধলো গত রোববার সকালে। ফেসবুকে ঢুকতে গিয়ে দেখি ঢুকতে পারছি না। কী হলো? কী হলো? তারপর খেয়াল করলাম— আমার আইডি লক্ড। কেনো যেনো মনে হলো আবার আমি একা হয়ে গেলাম। ভীষণ একা।
.
.
।। ২ ।।
আজ ঘুম ভাঙলো মোবাইলের রিংটোনের শব্দে। ঘুমচোখেই সেটা কানে ধরলাম।
‘হ্যালো, ভাইয়া!’
‘হ্যাঁ, রায়হান— বল।’
‘তোমার আইডি ঠিক করে ফেলেছি!’
কেনো জানি না— আমার চোখ ভিজে উঠলো। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। আমি যেনো হঠাৎ দেখতে পেলাম— আমার বাবা বারান্দায় বসে আছেন, মা-ও তাঁর পাশে বসা। ঝমঝম করে বৃষ্টি হচ্ছে। সেই বৃষ্টিতে ভিজে জবজবে হয়ে দুইটা ছেলে তাঁদের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। একটাকে তাঁরা চেনেন, একটাকে চেনেন না।
চেনাটা অচেনাটাকে দেখিয়ে বললো, ‘আব্বা, এই দেখো তোমাদের আরেকটা ছেলে।’
একটু পরেই দেখা গেলো— চেনা ছেলেটা বৃষ্টিতেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিজছে। অচেনাটা তার পাশে নেই! অচেনাটা বারান্দায়! তার ভেজা মাথাটা অস্থির— তোয়ালেসহ মায়ের চুড়িপরা হাত দুটো মিষ্টি সুরে ব্যস্ত ভারী!
চেনা-অচেনা ছেলে দুটো আর কেউ না— একটা আমি, আরেকটা হলো রায়হান।
.
.
।। ৩ ।।
আজ এমন বাদল দিনে বাবা-মায়ের বেঁচে থাকাটা খুব জরুরি ছিলো।
.
.
----------------------------------
বাবা, এই দেখো তোমার আরেকটা ছেলে
সুপণ শাহরিয়ার
৫ শ্রাবণ ১৪২২ । ২০ জুলাই ২০১৫
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now