বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
ফুলের দোকানের সামনে প্রচন্ড
বিরক্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রাতুল।
পাশে দাঁড়ানো মেয়েটার চুলগুলো
অনবরত ওর মুখের উপর উড়ে এসে পড়ছে।
রাতুল এক-দুবার রাগে কটমট করে
তাকিয়েছেও। কিন্ত এই সব বিষয়ে
বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা নেই সেই
মেয়েটার। সে দিব্যি ফুল কেনায়
ব্যস্ত। চুলগুলো হালকা ভেজা। মনে হয়,
বাসা থেকে স্নান সেরেই বের হয়ে
গিয়েছে। পরিচিত একটা শ্যাম্পুর
ঘ্রাণও নাকে বাজছে। যদিও নামটা
ঠিক মনে করতে পারছে না। রীতিমত
নেশা ধরিয়ে দেয়ার মত অবস্থা। কিন্ত
রাতুলের এসব অসহ্য লাগছে। কারণ
মেয়েটি ওর প্রেমিকার কথা মনে
করিয়ে দিচ্ছে। আসলে প্রাক্তন
প্রেমিকা। আজ তিন কবুল বলার সাথে
সাথেই মেয়েটা অন্য কারো হয়ে
যাবে। আর এখন রাতুল নির্লজ্জের মত
তার প্রাক্তন প্রেমিকার বিয়েতে
সামিল হতে যাচ্ছে।
রাতুল আবার ফুটপাথ ধরে হাঁটা শুরু করে।
মাথাটা এখন তার ভনভন করছে। এতক্ষণ
হেঁটে এসে ফুলের দোকানে একটু
দাঁড়িয়েছিল। সেখানেও মেজাজ
খারাপ হয়ে গেল। ভরদুপুর, সূর্যের তাপে
চামড়ায় জ্বালাপোড়া করছে।
সেদিকে এখন তার খেয়াল নাই।
নিজের মত হেঁটে যাচ্ছে। এইত কয়দিন
আগেই সব ঠিক ছিল। আসলে না।
অনেকদিন ধরেই ফারিয়া রাতুলকে
তার পরিবারের সামনে যাওয়ার জন্য
আকুতি মিনতি করছিল। কিন্ত নিজের
হীনমন্যতা থেকে আর সাহস হয়নি।
রাতুলের এমন অনীহা দেখে ফারিয়াও
আর সাহস করেনি পরিবারের সামনে
গিয়ে কিছু বলার। অতিরিক্ত রক্ষণশীল
পরিবারের মেয়েরা একটু ভীতুই হয়।
তার উপর বাবার আবার প্রচন্ড রাগ।
ফারিয়ার পরিবারের বেশিরভাগ
সিদ্ধান্তই ওর বড় ফুফু আর ফুপা নেয়। এই
পাত্রও উনাদেরই পছন্দের। নিজেদেরই
কোন আত্মীয় ছেলেটা। সবই সম্পত্তির
খেলা আর কি! মাঝখান দিয়ে বলি
হতে হল মেয়েটাকে। এসব ভাবতে
ভাবতে পায়ে হেঁটেই ফারিয়াদের
বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
.
ঘরোয়া ভাবে বিয়ের আয়োজন করা
হলেও বেশ জমজমাট অবস্থাই। ফারিয়ার
কাছের আত্মীয়রা চলে এসেছেন।
রাতুলকে দেখা মাত্রই ফারিয়ার মা
হাসিমুখে তাকে বসতে বলে। ফ্রেন্ড
হিসাবে অনেকদিন ধরেই তাকে
পরিবারের প্রায় সবাই চিনে, বেশ
আদরও করে।
রাতুল ফারিয়ার রুমের কাছে গিয়ে
উঁকি দিয়েই ওকে দেখতে পায়। আর
কিছু চিন্তা না করে পাশে রাখা
একটা চেয়ারে বসে পড়ল। শেষবারের
মত তাকে দেখে নিচ্ছে। রোবটের মত
বসে আছে মেয়েটা, ঠিক যেমনটা
গতকালের শেষ দেখার দিন চলে আসার
সময় ছিল। গতকাল ফারিয়া রাতুলের
হাত ধরে অনেকক্ষণ কেঁদেছে। পরে
হঠাত রোবটের মত চুপ হয়ে গেল, কিছু সময়
ওভাবেই বসে থেকে উঠে চলে
এসেছিল। আজও সেই অবস্থাতেই বসে
আছে। চোখ দুটো ঘোলা হয়ে আসতেই
রাতুল উঠে দাঁড়ায়। এখন আবেগ কন্ট্রোল
করতে হবে।
সিঁড়িকোঠায় দাঁড়িয়ে
নিকোটিনের ধোঁয়ায় আবেগ উড়িয়ে
দেয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করে আবার বাসার
ভেতর ঢুকে রাতুল। হঠাত করেই সেই
ফুলের দোকানের খোলা চুলের
মেয়েটা কোথাথেকে যেন সামনে
এসে পড়ে। ড্যাবড্যাব করে রাতুলের
দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে
ফারিয়ার ঘরে চলে যায়। এবার
রাতুলের বিরক্তির সীমা ছাড়িয়ে
যায়। এই মেয়েটা সব জায়গায় এসে
কেন হাজির হওয়ার কারণ বুঝতে পারে
না। রাতুল এবার একটু শান্ত হয়ে চুপচাপ
বসে। হাতঘড়ির দিকে তাকাতেই
বুকের ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে ওর।
.
ছেলেপক্ষ চলে এসেছে, কাজীও।
ফারিয়াকে ঘর থেকে বাইরে নিয়ে
আসার ঠিক আগ মুহূর্তে ছাদে চলে
এসেছে রাতুল। এখন ফারিয়াকে
দেখলে মাথা কাজ করবে না। উলটা
পালটা কিছু করেও বসতে পারে।
ছাদে দাঁড়িয়ে একের পর এক
সিগারেট টেনে যাচ্ছে। অনেক
আগেই সিগারেট ছেড়ে দিয়েছিল।
আজকে আবার শুরু করল। যুগ যুগ ধরেই তো
মানুষ কষ্ট ভুলে থাকার জন্য এই কাজটি
করে আসছে।
আবারো ফুলের দোকানের সেই
মেয়েটা সামনে চলে আসে। এবার
মেয়েটার চোখে মুখে আতংক দেখা
যাচ্ছে, কেমন একটা অপরাধী অপরাধী
ভাব। আবারো কিছুক্ষণ ড্যাবড্যাব করে
তাকিয়ে থেকে ছাদের অন্য কোণায়
চলে যায়। রাতুল এ নিয়ে বেশি
চিন্তা না করে আবার সিগারেটের
দিকে মনযোগ দেয়।
কিছুক্ষণ পরেই বাসা থেকে
চিল্লাচিল্লির শব্দ ভেসে আসে।
ছাদে যারা ছিল সবাই উৎসুক হয়ে
নিচে যায় কি হয়েছে জানতে।
রাতুলও যায়, শুধু ওই মেয়েটা ছাদে একা
থেকে যায়। বাসার ভেতর এখন
তুলকালাম কান্ড চলছে। সবাই কোণায়
কোণায় তল্লাশিতে ব্যাস্ত।
ফারিয়ার ঘর থেকে গহনা চুরি হয়েছে।
এগুলো ছেলেপক্ষকে যৌতুক হিসাবে
দেয়ার কথা। আধুনিক ভাষায় গিফট।
নাহলে নাকি সমাজে ছেলেপক্ষের
নাক কেটেই যায়।
গহনা তো পাওয়া গেলই না, উলটা
ফারিয়ার আলমারি থেকে রাতুলের
দেয়া কিছু গিফট আর শুকনো ফুল পাওয়া
গেল। এতক্ষণ ফারিয়ার হবু শ্বাশুরি
এটাকে চুরির কেইস মনে করলেও এখন
তিনি নিশ্চিত যে এটা ফারিয়ার
কাজ। বিয়ে না করার জন্য সেই গহনা
সরিয়ে ফেলেছে কোথাও অথবা তার
বয়ফ্রেন্ডকে পারাপার করেছে। বড় ফুপু
এসে ঠাস করে ফারিয়ার গালে এক চড়
বসিয়ে দেয়। ফারিয়া আগের মতই
পাথর হয়ে আছে। এদিকে ফারিয়ার
নীরবতা দেখে ছেলেপক্ষের সবাই
আরো তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেছে। দুই
পক্ষের মধ্যেই ঝগড়া, অপবাদ চলছে। এক
ঘন্টার মধ্যেই পুরো বাসা একদম নীরব
হয়ে যায়।
বাসার মুরুব্বিরা সবাই মাথায় হাত
দিয়ে বসে আছে। বিয়ে ভেঙ্গে
গিয়েছে। ফারিয়া ওর রুমে বসে
আছে। এবার মেয়েটার চোখ দিয়ে
পানি পড়ছে। বাকিরা সবাই
ডেকোরেটরদের সব গুছিয়ে নিতে
সাহায্য করতে ব্যস্ত। ফারিয়ার মামা
সবার পেয়েমেন্টের বিষয়টা দেখছে।
ফ্রেন্ড হিসাবে রাতুলও কাজে হাত
দিয়েছে। মুখে কিছু না বললেও মনে
মনে সে বেজায় খুশি। মানুষ কতটা
স্বার্থপর হতে পারে সেটা সে
নিজেকে দেখেই বুঝতে পারছে।
নিজের স্বার্থ থাকলে অন্যের
দুর্দিনেও যে পৈশাচিক আনন্দ পাওয়া
যায় সেটা সে আজকে বুঝল। হঠাত
ফুলের দোকানে দেখা ওই মেয়েটা
পাশে এসে দাঁড়িয়ে ম্লান একটা
হাসি দেয়। রাতুলকে একটা কাগজ
ধরিয়ে দিয়ে কিছু না বলে চলে যায়।
ফারিয়ার চিঠি মনে করে তা পকেটে
রেখে আবার কাজে মন দেয় রাতুল।
.
“স্যার,
ভালবাসলে সাহসী হতে হয়। অনুকূল
অবস্থাতেও ভালবাসার মানুষের হাত
শক্ত করে ধরার মনোবল থাকতে হয়। আজ
আমি ছিলাম, অন্য সময় আমি থাকব না,
আপনাদেরকেই লড়তে হবে। আমি
জীবনে প্রথমে চুরি করলাম। খুব অপরাধী
লাগছে নিজেকে। না খেয়ে কষ্ট
করেছি, কিন্ত কোনদিন চুরি করিনি।
আজ করলাম। কারণ, এক ফারিয়া আপুর
কাছে আমি ঋণী, দুই ভালবাসার
মানুষকে হারানোর কষ্ট আমি জানি।
নিজের প্রতিবন্ধীত্ব মা কখনো বুঝতে
দেয়নি। পড়াশোনাতেও ভালই ছিলাম।
মা মারা যাওয়ার পর আমার কেও ছিল
না। সৎ মা এসে বাসা থেকে বের করে
দেয়। রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষা করতাম।
ফারিয়া আপু সেদিন আমাকে কুড়িয়ে
নিয়ে যায়। আপুদের এনজিও’র
সাহায্যে আমি পার্লারের কাজ
শিখি। এখন নিজে টাকা কামাই করি।
বেশ ভাল আছি। নতুন ভাবে বাঁচতে
শিখেছি শুধুমাত্র আপুর জন্য। ফারিয়া
আপুর ঋণ কোনদিন শোধ করতে পাব
ভাবি নাই। আজ সুযোগ পেলাম, পিছুপা
হই নাই। ফারিয়া আপুকে বলবেন
যেখানে তিনি আপনার আর আপুর
স্মৃতিগুলা লুকিয়ে রেখেছিল,
সেখানেই সবকিছু আছে। একটা কিছুও
এদিক সেদিক হয়নি। এক বিন্দুও যদি
এদিক সেদিক হয়, দুর্গা মা’র কসম, আমার
যেন মৃত্যু হয়।
আর আমি বুঝতে পেরেছিলাম আপনি
আমার তাকিয়ে থাকা নিয়ে
অসস্তিবোধ করছেন। কিন্ত আমার
খারাপ কোন উদ্দেশ্য ছিল না। গরীবের
যেখানে তিনবেলা খাবার
জোটানোই দায়, সেখানে আর অন্য
কিছু মাথায় আসবে কেমনে? আমি তো
আবার ষোলআনাই অভাগা। ভগবান মুখে
ভাষা দেয়নি, কিন্ত চোখের ভাষা
বোঝার ক্ষমতা ঠিকই দিয়েছেন।
বোবা হলেও আপনাদের চোখ দেখেই
সব বুঝতে পেরেছিলাম। মন থেকে
আপনাদের জন্য শুভকামনা। ফারিয়া
আপুকে নিয়ে অনেক ভাল থাকবেন
স্যার”
চিঠিটার দিকে অপলক তাকিয়ে আছে
রাতুল। দরজায় টোকার শব্দে ভাবনায়
ছেদ পড়ে, চিঠিটা আবার
আলমারিতেই রেখে দেয়। রাতুলের বড়
ভাই রুমে ঢুকে অনেক যত্নের সাথে
ছোট ভাইকে পাগড়ি পরিয়ে দেয়।
অবশেষে দুই বছর পর ফারিয়া আর
রাতুলের বিয়ের সানাই বাজছে।
সেদিনের পর কেমন করে যেন দুইজনের
মধ্যেই খুব সাহস চলে এসেছিল। এত
বাধা, বিপদেও কেও কারো হাত
ছাড়েনি। গহনার ব্যাপার ফারিয়ার
মা আর খালারা মিলে সামলিয়ে
নিয়েছিল। ফারিয়া আর রাতুল মিলে
ওই মেয়েটাকে অনেক খুঁজেছিল। আগে
যে পার্লারে কাজ করত সেটা ছেড়ে
সে নতুন কোথাও কাজ নিয়েছে। কিন্ত
কোথায় সেটা কেও বলতে পারে নাই।
তবে যেখানেই থাকুক না কেন, রাতুল
আর ফারিয়ার বিশ্বাস, মেয়েটা অবশ্যই
ভাল আছে। স্বয়ং দেবীর কোন বিপদ
আসে নাকি কখনো?! মায়ের
ডাকাডাকিতে রাতুল আর তার বড় ভাই
রুম থেকে বের হয়ে যায়। বরযাত্রী
রওনা দিয়ে দিয়েছে। দুজনের কাছে
আসার অপেক্ষা তো শেষ হবে আজ,
কিন্তু দেবী দর্শনের অপেক্ষা যে রয়েই
যাবে!
.
দেবী!
-ফারজানা সিদ্দিকী নম্রতা
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now