বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
স্কুল ছুটির পর বাড়ি ফিরছিলেন হাশেম সাহেব। সমুদ্রের পাশে পাশে অনেকদূরে যেতে হয় তাঁকে। সাইকেল চেপেই যাতায়াত করেন প্রতিদিন। শাহবাজপুর প্রায় আড়াই মাইল দূরে এখান থেকে।
রোদ এখনও চড়া। ঘামে ভিজে উঠছে সার্ট। কুসুমপুর জামে মসজিদের গম্বুজে ঠিকরে পড়ছে রোদ। খুব ধীরে প্যাডেল করছেন হাশেম সাহেব।
সামনে বড় একটা বাঁক। বাঁকের মাথায় বুড়ো বটগাছটা ঝিরঝির বাতাস ছাড়ছে।
নীচে ঢেউয়ে ঢেউয়ে নাচছে সমুদ্র।
আরে ! কী ওটা?
জোরে প্যাডেল করে কাছে চলে এলেন হাশেম সাহেব। ভাল করে দেখে চমকে উঠলেন ভীষণভাবে ৷
ত্রিশ হাত নীচে বড় পাথরগুলাের মাঝখানে চার হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে কাজেম সওদাগরের ছোট মেয়ে শিউলি।
জোয়ারের পানি প্রায় ছুয়ে ফেলেছে ওর পা। দেখলেই বোঝা যায় প্রাণহীন দেহটা অনুভব করতে পারছে না কিছুই। তাড়াতাড়ি সাইকেল থেকে নেমে চালের নীচের দিকে রওনা হলেন হাশেম সাহেব।
আর দশ মিনিট দেরি হলে পানিতে ভেসে যাবে লাশটা। তার আগেই তুলে আনতে হবে ওকে। পরে খবর দেয়া যাবে লোকজনকে ৷
জ্বরের ঘোরে প্রলাপ বকছে মিতা ৷ ডাক্তার বলেছেন চিন্তার কিছু নেই। কড়া রোদে অনেকক্ষণ বসেছিল বোধ হয়। তাই জ্বর উঠেছে ৷
বিলুর কাছ থেকে জানতে পেয়েছেন মাজেদা বেগম দৃপুরের রােদে সমুদ্রের ধারে গাছের কাছে বসেছিল মিতা। আরও কী কী যেন বলতে চাইছিল মেয়েটা। তিনি বুঝতে পারেননি।
মাথায় জলপট্টি দিচ্ছেন মাজেদা বেগম ৷ বিড়বিড় করে জুলেখার নাম বলছে মিতা। ‘ওহ পুতুলটাই মত নষ্টের মূল।’ মনে মনে বললেন তিনি।
রশীদ চেয়ারম্যানের বউ অনেকভাবে চেষ্টা করলেন। কিন্তু বিলুর কথা বুঝতে পারছেন না কিছুতেই ৷ বোবা মেয়েটা হাত নেড়ে মুখের বিচিত্র ভঙ্গি করে কিছু একটা বলতে চাইছে।
শুধু বুঝতে পারলেন শিউলির মৃত্যুর সাথে মিতার একটা সম্পক আছে।
কি সেটা?
সকালবেলা উঠোনের ধার ঘেঁষে লাগানো ফুলের চারাগুলােতে পানি দিচ্ছিলেন মাজেদা বেগম ৷ মৌসুমী ফুলের চাষ করা তাঁর পুরনো অভ্যাস ৷
টালির ঘরটাকে স্টোর রুম হিসাবে ব্যবহারের ইচ্ছা আছে তাঁর। টুকিটাকি জিনিসপত্র রাখা যাবে ওখানটায়৷
দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকলেন মাজেদা বেগম। ঝকঝক করছে ঘর।
মেঝের দিকে তাকিয়ে স্থির হয়ে গেলেন। মেরুদণ্ড বেয়ে বয়ে গেল ঠাণ্ডা একটা স্রোত ৷
লম্বা কালচে দাগটা তেমনি আছে ৷
দৌড়ে বেরিয়ে এলেন মুহূর্তে ৷ সমস্ত শরীর কাঁপছে।
স্পষ্ট মনে আছে গতকাল খুন্তি দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে পুরো দাগটা ভুলে ফেলেছিল হাবুর মা।
তখনও ফার্মেসীতে যাননি আহাদ সাহেব ৷ সব শুনে থ হয়ে গেলেন। নিজে এসে দেখলেন বিদঘুটে দাগটা ৷ কোনও কথা সরল না মুখে ৷
“এই ঘরটা ব্যবহার না করাই ভাল ৷ বন্ধ করে রাখো এটা৷ দরকার নেই স্টোর রুম।’
এই বাড়িটায় যে অস্বাভাবিক কিছু একটা আছে এতদিন পর সেটা স্বীকার করলেন আহাদ সাহেব।
আরও খোঁজ খবর নিয়ে ফেলা উচিত ছিল বাড়িটা।
স্কুলে মিতাকে এড়িয়ে চলতে লাগল ওরা ৷ একমাত্র শেলি ছাড়া ওর আর কোনও বন্ধু সেই। চম্পা ওকে দেখলেই কেমন যেন আড়ষ্ট হয়ে যায়।
কথাটা ছড়িয়ে পড়েছে ভেতরে ভেতরে। মিতার পুতুলটার কথাও জানে ওরা। হেডমাস্টারকে সব কথা খুলে বলেছেন আহাদ সাহেব।
“হয় এ রকম ৷ আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে ৷ আশ্বাস দিয়েছেন উনি ৷'
পিছনের বেঞ্চে চুপচাপ বসে থাকে মিতা। কখনও খেলতে যায় না। শেলির সাথে কথা বলে মাঝে মাঝে।
শুক্রবার সকালে হাঁটতে হাঁটতে আম বাগানের কাছে চলে এল মিতা। খুব অস্থির লাগছে ওর। জুলেখার সাথে কথা বলেছে রাতে ৷
ঘুমুতে যাবার পরপরই একটু শীত শীত লাগছিল ওর। বাতাসে একটা গন্ধ ভেসে এল হঠাৎ ৷ টেবিলের ওপর রাখা জুলেখার দিকে চাইল মিতা।
ভুল দেখল কী?
আস্তে আস্তে বড় হচ্ছে ওটা। এক সময় হাওয়ায় ভাসতে লাগল যেন।
বিছানায় সেঁটে গেল মিতা। মেঝেতে নাক ডাকচ্ছে হাবুর মা। মিহি একটা অস্পষ্ট স্বর শোনা গেল ৷
‘তােমাকে খুব পছন্দ করি আমি। কিন্তু তোমার আববু আম্মু তোমাকে ভালবাসে না ৷ '
প্রতিবাদ করতে চাইল মিতা ৷ কিন্তু গলায় জোর পেল না।
‘তুমি ওদের মেয়ে নও, রীতা ওদের মেয়ে। রীতা'কে আদর করে ওরা। ও থাকলে তোমাকে কেউ ভালবাসবে না।‘
একঘেয়ে সুরে বলে যাচ্ছে কেউ।
কই উঠে পড়ো ৷ এখনই সময়।'
চিন্তা করবার শক্তি হারিয়ে ফেলল মিতা। স্বপ্ন দেখছে বলে মনে হলো।
হঠাৎ পাশের রুম থেকে কেঁদে উঠল রীতা ৷ অবুঝ শিশুর আতঙ্কিত কান্না ৷
মাঝখানের দরজা খােলাই ছিল। পায়ে পায়ে এগিয়ে এল মিতা। কখন যে ৰিছানা থেকে উঠে পড়েছে খেয়াল নেই। রীতার বিছানার কাছে চলে এল নিঃশব্দে ৷
আহাদ সাহেব, মাজেদা বেগম কেউ নেই। এখনও শুতে আসেননি ওরা। ড্রয়িং রুমে রয়েছেন।
ছোট মশারীটা গুটিয়ে তুলতুলে ফর্সা শিশুটিকে কোলে তুলে নিল মিতা। আরও জোরে কাঁদতে শুরু করল রীতা। বুকের সাথে জোরে ঠেসে ধরল ওকে।
ইস কী সুন্দর ৷ গালে একটা চুমাে দিল মিতা। কিন্তু নিজের হাত দুটাকে কিছুতেই সামলে রাখতে পারছে না ও, আরও জোরে পিচ্চিটাকে ঠেসে ধরল দুহাত দিয়ে ৷
কর্পূরের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে এ ঘরেও। ভয় পেল মিতা। নীল হয়ে উঠেছে বাচ্চাটার ফর্সা মুখ ৷ শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। হাত থেকে ছেড়ে দিতে চেষ্টা করল ওকে ৷ কিন্তু পারছে না।
প্রাণপণে চেঁচাতে গিয়ে খুক খুক করে কাশছে রীতা।
কী রে মিতা কী হয়েছে?‘ গলা মাজেদা বেগমের ৷ কান্নার শব্দে উঠে এসেছেন ওপরে ৷
“কাদছে মা। রীতা কাঁদছে। ' ঘোর কেটে গেছে মিতার।
'আমাকে ডাকিসনি কেন! দেখি দেখি। ইস ৷ এত ঠেসে ধরে কোলে নেয় কেউ। আরেকটু হলেই তো দম বন্ধ হয়ে যেত।'
কড়া গলায় ধমক দিলেন মাজেদা বেগম।
রীতাকে কোলে নিয়ে আদর করছেন ৷ “শুয়ে পড়গে যা।'
চোখে জল এসে গেল মিতার। অভিমানে কোনও কথা বলল না ৷ চুপচাপ এসে শুয়ে রইল বিছানায়। রাতে আবার সেই স্বপ্নটা দেখল ৷
কালো ফ্রক পরা একটা অন্ধ মেয়েকে সবাই মিলে খেপিয়ে, খুঁচিয়ে উত্ত্যক্ত করে তুলছে। শেষ পর্যন্ত উচু ঢাল থেকে নীচে পড়ে পেল অসহায় মেয়েটা।
ছোট্ট মেয়েটার চোখে মুখে কী অসহ্য বেদনা। ক্রোধ আর প্ৰতিহিংসার আগুন। ঢাল বেয়ে উঠে আসছে সে অদ্ভুত ভঙ্গিতে। সাদা দৃষ্টিহীন চােখ জুড়ে প্রচণ্ড আক্রোশ।
ঘামে বালিশ ভিজে গেল মিতার। শরীরটা অল্প অল্প কাঁপছে। মার কাছে গিয়ে শুতে ইচ্ছে করল খুব। কিন্তু রীতা আছে ওখানে। অন্ধকারে নিঃশব্দে কাঁদতে লাগল মিতা ৷
‘শুনছ, মিতার ভাবসাব খুব একটা ভাল মনে হচ্ছে না।‘
‘কী করেছে?‘
'একটু আগে রীতার কান্না শুনে ওপরে উঠে দেখি ওকে ধরে চাপ দিচ্ছে মিতা। দম প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। নীল হয়ে গিয়েছিল চেহারা। আমি সময়মত না গেলে হয়তো মরেই যেত।‘
'কি যা তা বলছ?’ উষ্মা প্রকাশ করলেন আহাদ সাহেব।
‘হ্যা। আমার মনে হয় কিছু একটা আছে ওর সঙ্গে। কেমন ঢুপচাপ হয়ে গেছে হাসি খুশি মেয়েটা৷'
‘ওসব না। পা টা নরমাল হচ্ছে না বলে খুব আপসেট হয়ে আছে ও।'
‘ঢাকায় নিয়ে দেখানো দরকার। মেয়েমানুষ। আল্লা না করুক কিছু একটা হয়ে গেলে… তখন?'
মাজেদা বেগমের গলা দুশ্চিন্তায় কেঁপে উঠল।'
‘প্রফেসর শরীফকে দেখিয়েছি না? উনি তো বললেন আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে।'
দােলনায় দুলছিল বিলু। পেছন থেকে ধাক্কা দিচ্ছে টুনু৷ সুন্দর ছেলেটাকে দেখে ওর এর দিকে এগিয়ে গেল মিতা। এই ছেলেটা খুব ভাল। সুন্দর করে হাসে।
তুমি খেলবে?’ আগ্রহের সঙ্গে বলল টুনু।
“হ্যা।’ ঘাড় কাত করল মিতা।
মিতাকে দোলনার দিকে আসতে দেখে নেমে পড়ল ৰিলু৷ মিতা ধাক্কা দিক এটা চায় না সে। শিউলি মারা যাবার সময় চালের ওপরে ওর সাথে মিতাকেও দেখেছে সে। ঠিক বুঝতে পারেনি কী ব্যাপার। কিন্তু হঠাত্ করে দেখল আচমকা ঢালের ওপর থেকে নেই হয়ে গেছে শিউলি।
কিন্তু টুনু নাছেড়াড়বান্দা। মিতাকে খেলতে নেবেই সে। বেশ কয়েকবার ওকে দোলনায় তুলে ধাক্কা দিল টুনু। ভাল লাগছে।
এবার উঠল বিলু। দুজনে খুব জোরে জোরে ধাক্কা দিচ্ছে। প্রায় সাত আট ফিট্ উঠে যাচ্ছে দোলনা। খিল খিল করে হাসছে বোবা মেয়েটা।
এখন থামা দরকার। দম হারিয়ে ফেলেছে সে। কিন্তু থামছে না মিতা। ব্যা ব্যা করে কিছু একটা বলল বিলু। বুঝতে পারছে না মিতা। আরও জোরে ধাক্কা দিল এবার।
ভয় পাচ্ছে বিলু ৷ প্রায় দশ এগারো ফিট উঠে আসছে দোলনা। আর্তনাদ করছে সে। কিন্তু কিছুতেই থামছে না মিতা।
মিতার চারপাশে তখন ঘন কুয়াশা। কানের কাছে ফিসফিস করে বলছে কেউ “এই মেয়েটা তোমার শত্রু। তোমাকে খেলায় নিতে চায়নি ৷ তোমাকে পছন্দ করে না। এই সুযোগ। ’
নিজেকে আর ঠিক রাখতে পারছে না মিতা। সবাই তার শত্রু, শুধু জুলেখা তার একমাত্র বন্ধু। 'কোথায় জুলেখা।‘
‘এই যে। তোমার পেছনে৷’
হঠাৎ প্রচণ্ড জোরে এক ধাক্কা মারল মিতা। প্রায় চােদ্দ ফুট উপরে উঠে পেল বিলু। হাত থেকে ছুটে গেল মোটা দড়ি ৷
হাওয়ার উড়ে এল যেন মেয়েটা৷ মাথাটা আগে পড়ল শক্ত মাটিতে। ধড়ম করে পুরো শরীরটা বাড়ি খেল প্রচণ্ড ভাবে।
প্রাণঘাতী আর্তনাদ করে উঠল বিলু। ভ্যা করে কেঁদে ফেলল টুনু ৷ হাত পা মাটিতে ছড়িয়ে নিথর হয়ে গেল বোবা মেয়েটা।
তখনও অনবরত দুলছে দােলনাটা। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাড়িয়ে রইল মিতা ৷ বিলুর নাক দিয়ে দু ফোটা রক্ত গড়িয়ে পড়ল। পায়ের ব্যাথাটা আবার বাড়ছে ৷ খুঁড়িয়ে খুড়িয়ে দৌড়াতে লাগল মিতা৷ চোখ দিয়ে অনবরত জল গড়াচ্ছে।
মিতার কাছে খবর পেয়ে সবাই জানতে পারল কী ঘটেছে। টুনু একটানা কাদছে তো কাঁদছেই! মিতাকে দেখাচ্ছে আর বলছে, ‘ধাক্কা দিছে এ্যা এ্যা এ্যা।’
গলা শুকিয়ে গেল মিতার। কােনওমতে ওকে বাসায় নিয়ে এলেন আহাদ সাহেব ৷ বিলুর মায়ের গালাগালি আর আহজারিতে পাগল হবার দশা তার।
(পরবর্তী পর্বে সমাপ্ত)
-------------------
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now