বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
টুনু খেলছে আম বাগানে। মিতার খুব ইচ্ছা করছে ওর সাথে দোলনায় দুলতে। একটু আগে দেখা মেয়েটাকে হঠাৎ চিনে ফেলল মিতা। একেই দেখেছে সেদিন স্বপ্নে ৷
গোরস্তানের কাছাকাছি আসতেই আবার খুঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করল মিতা। ভেতরে ঢোকার একটা অদম্য আগ্রহ বোধ করল। নিজের অজান্তেই হাঁটতে শুরু করল সেদিকে।
দোলনায় দোলা বন্ধ করে টুনু একদৃষ্টে চেয়ে দেখছে মিতাকে। গােরস্তানের দিকে কেন হাঁটছে মেয়েটা?
সরু কাঁচা রাস্তার দু পাশে সারি সারি কবর। কেমন যেন নেশার মতো হাঁটছে। সেই কববটার সামনে এসে দাঁড়াল। দুহাত দিয়ে সরিয়ে দিল ঝোপঝাড়। ছোট্ট একটা নাম। জুলেখা। মিতা তাকিয়ে বইল সেদিকে। ওর পুতুলের নাম।
রান্নাঘরে অনেকক্ষণ বসে থেকে হাপিয়ে উঠলেন মাজেদা বেগম। খোলা বিশাল জানালা দিয়ে সমুদ্র দেখা যায়। ডানদিকে দিগন্ত ভেদ করে উঠেছে সারি সারি পাহাড়।
বাতাস শির শির করে ঢুকছে রান্নাঘরে। মাজেদা বেগম উদাসভাবে তাকিয়ে রইলেন সমুদ্রের দিকে।
আরে কে ওটা? চমকে উঠলেন মাজেদা বেগম। গোরস্থানের ভাঙা দেয়ালের ওপাশে ঝুঁকে পড়ে কিছু একটা খুঁজছে মিতা। কী করছে এখানে?
স্কুলে যায়নি ? অজানা অশেঙ্কায় কেঁপে উঠল বুকটা। অন্য রকম হয়ে যাচ্ছে মেয়েটা। এরকম একা ভর দুপুরবেলা গোরস্তানে কী করছে?
মিতা দাড়িয়েই আছে৷ নড়ছে না। মেয়েকে নিয়ে আসার জন্য নিজেই বাড়ি থেকে বের হয়ে এলেন তিনি ৷ জোরে হাঁটতে লাগলেন। ভারী শরীর… হাসফাস করছেন ক্লান্তিতে। জোরে হাটার উত্তেজনায় বুক ধড়ফড় করছে। ঘাম ঝরছে শরীর বেয়ে।
প্রায় সাত মিনিট হেঁটে গোরস্তানের সামনে এসে পড়লেন মাজেদা বেগম।
হাবুর মা বাড়িতে থাকলে তাকে এই কষ্টটা করতে হত না
'এই মিতা এখানে কী করছিস?
মায়ের গলার আওয়াজ শুনে চমকে গেল মিতা ৷
'এমনি, আম্মু। জুলেখার কবর দেখছিলাম।'
‘কার কবর?'
'জুলেখার।‘ হাত তুলে দেখলে মিতা।
“তোর কী মাথা খারাপ হয়েছে? স্কুলে যাসনি?’
‘চলে এসেছি।'
'বাসায় চল। ‘ মেয়ের হাত ধরে টানলেন মাজেদা বেগম।
'জুলেখার কবরটা দেখবে না , মা?'
মেয়ের মুখের দিকে তকােলেন মা। শান্ত সমাহিত মুখ। কী মনে করে ঝুঁকে পড়লেন হেডস্টোনটার দিকে লেখাটা চোখে পড়ল।
'জুলেখা ৷' অবাক হয়ে উঠে দাড়ালেন।
পাশের কবরটার দিকে নজর গেল। সাদা সিমেন্টের ওপর কালো অক্ষরে লেখা।
'গুলবাহার বেগম।
পাপে মৃত্যু
১৮ ৭০ সাল।’
এটা কী ধরনের লেখা? এর মানে কি? কুসুমপুর এলাকাটাই যেন কেমন রহস্যে ঘেরা। চিন্তাগ্রস্ত মনে সোজা হয়ে দাড়াতে গেলেন মাজেদা বেগম। হঠাৎ তীব্র ব্যথায় অন্ধকার হয়ে গেল চারপাশ। কােমরের কাছটায় লক্ষ লক্ষ সূচ ফোটাচ্ছে কেউ।
মায়ের চেহারা দেখে ঘাবড়ে গেল মিতা। দাঁতে দাঁত চেপে বললেন মাজেদ বেগম ‘জলদি দৌড়ে যা ফার্মেসীতে। তৌর আব্বাকে খবর দে,বলেই বসে পড়লেন মাটিতে।
সময় হয়ে গেছে। খোঁড়াতে খোঁড়াতে দৌড়াচ্ছে মিতা। পিছন থেকে আধাশোয়া অবস্থায় অসহায়ভাবে চেয়ে রইলেন মাজেদা বেগম।
শেষ পর্যন্ত তার প্রথম সন্তান ভুমিষ্ঠ হতে যাচ্ছে এইখানে। এই গোরস্থানে। হায় খোদা!
তুলতুলে পেঁজা তুলোর মত একটা শিশু। আহাদ সাহেব তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছেন। ঠিক মায়ের আদল পেয়েছে। চুমো দিলেন মেয়ের লালচে গালে। দাড়ির খোঁচায় কেঁদে উঠল অবােধ শিশু।
“আবার তুমি কাদাচ্ছ ওকে?' মাজেদা বেগম কৃত্রিম রেগে বললেন।
মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিলেন আহাদ সাহেব বাচ্চাটাকে। কান্না থামবার কোনও লক্ষণ নেই পিচ্চিটার।
'মিতা কােথায়?'
“কী জানি। সকাল থেকেই তো দেখছি না ওকে। স্কুলেও গেল না আজকে।'
মিতাকে পাওয়া গেল তার ঘরে। জুলেখাকে বুকে ধরে ঘুমিয়ে আছে।
উদ্বিগ্ন হলেন আহাদ সাহেব। এই সময় কখনও ঘুমায় না মেয়েটা। অসুখ করেনি তো? চোখের কোনা সামান্য চকচক করছে। মনটা খারাপ হয়ে গেল তার। কেঁদে কেঁদে ঘুমিয়ে পড়েছে মিতা ৷
সকাল থেকে একটু দুরে দুরে ছিল মিতা। ব্যাপারটা মাজেদা বেগমকে বলতেই উত্তর দিলেন, 'তােমাকে আগেই বলেছি, মিতার ব্যাপারে একটু কেয়ারফুল থাকা দরকার। কােনওভাবেই ও যাতে মনে না করে যে ওকে আমরা অবহেলা করছি ৷ '
আমি তো খুব কেয়ারফুলই থাকি ৷ '
সকাল থেকে একবারও মিতার সাথে কথা বলেছ তুমি?’
আমতা আমতা করলেন আহাদ সাহেব ৷ সত্যিই খেয়াল করেননি ব্যাপারটা।
উঠোনের কোনায় একটা ছোট ঘর। লাল ইটের তৈরি। টালির ছাদ। দেখলেই বোঝা যায় বহুকাল ব্যবহার করা হয়নি ওটা।
হাবুর মা সকাল থেকেই পরিষ্কার করছিল ঘরটা। মাকড়সা, তেলাপোকা আর ছুঁচোর মচ্ছব ভিতরে। ধুলায়, ময়লায় কাশতে কাশতে হার্টফেল হবার দশা
ভেতরটা খারাপ নয়। অদ্ভুত কিছু জিনিস পাওয়া গেল সেখানে৷ কয়েকটা পেইন্টেড আর কয়েকটা খালি ক্যানভাস। ছবি আঁকত চৌধুরীদের কেউ। মেঝেটা দেখে অবাক হলেন মাজেদা বেগম। পুরোটাই মােজাইক্ করা।
জবরজং ছোট্ট ঘরটার এত সুন্দর মেঝে ভাবাই যায় না।
ঝেড়েমোছে ঝকঝকে করে ফেলল রুমটা হাবুর মা।
চিমসে বুড়িটার গায়ে শক্তি আছে বটে। কালো একটা লম্বা দাগ কিছুতেই উঠছে না। প্রায় দেড় ফুট লম্বা বিচিত্র ধরনের একটা দাগ।
কিছু একটা পড়েছিল মেঝেয়। এখনও উঁচু হয়ে আছে। কীসের দাগ?
হঠাৎ ভয় পেয়ে গেলেন মাজেদা বেগম।
কোনও সন্দেহ নেই। রক্তের দাগ ৷ এখানে রক্তের দাগ কেন? দ্রুত হেঁটে গিয়ে আহাদ সাহেবকে ডেকে নিয়ে
এলেন তিনি। ‘এই দেখ, এটা কীসের দাগ? কিছুতেই উঠছে না। '
'কত কিছুর দাগ হতে পারে। কী করে বলি।'
আমার মনে হয় রক্তের দাগ, ' ফিসফিস করে বললেন মাজেদা বেগম।
'এরকম মনে হলো কেন তােমার?'
'এই বাড়িটায় ভূতুড়ে কিছু একটা আছে। পুরনো জমিদারবাড়ি। এখানে রক্তের দাগ থাকতেই পারে।"
আহাদ সহেবের গা ঘেষে দাড়ালেন মাজেদা বেগম৷
‘খুঁচিয়ে তুলে ফেলো দাগটা, হাবুর মা ৷ দা, ছুরি কিছু একটা, দিয়ে খোঁচাও।’ বললেন আহাদ সাহেব।
স্কুলে আবার শিউলির' সাথে ঝগড়া হয়ে গেল মিতার। সবার আগে এসে সামনে বসেছিল মিতা। লাল সুটকেসটা রেখে বাইরে গিয়েছিল।
দশ মিনিট পরে এসে দেখল আগের জায়গায় নেই সুটকেসটা ৷ কেউ ওটাকে দ্বিতীয় বেঞ্চে নিয়ে রেখে দিয়েছে। মেজাজ খারাপ হয়ে গেল মিতার।
শিউলির কথাই মনে পরল প্রথম। তাই হবে ৷ ওর ব্যাগটা রয়েছে সামনের বেঞ্চে ৷
আমার সুটকেস সরিয়েছ কেন?
আমার বয়েই গেছে তোমার সুটকেস ধরতে,’ ঠোঁট বেঁকিয়ে বলল শিউলি। ‘আমি সরিয়েছি ওটা মিতা। আমরা একসঙ্গে বসব।‘ পিছন থেকে বলল শেলী।
'আন্দাজী কথা বলো কেন তুমি? আমি আপাকে বলে দেব।‘ খেপে উঠল শিউলি।
“বলো গে।’
বলবই তো ৷ বেশি ডাট হয়েছে না? ল্যাংড়া মেয়ের এত ডাট ভাল না।’ খোঁচা দেবার জন্যেই বলল শিউলি।
কান ঝাঁ ঝাঁ করতে লাগল মিতার। আর কিছু শুনতে পাচ্ছে না সে। অস্পষ্ট কয়েকটা কথা কানে গেল ৷
ঢং কত, ধাড়ি মেয়ে পুতুল নিয়ে স্কুলে আসে ৷'
মিতাকে টেনে বাইরে নিয়ে গেল শেলী ৷ ইচ্ছা করছিল খামচে রক্তাক্ত করে দেয় শিউলির মুখচােখ ৷
টপ টপ করে কয়েক ফোটা পানি পড়ল মিতার চোখ বেয়ে ৷
‘শিউলিটা না ভারি পাজি। তুমি কিছু মনে কােরাে না, কেমন?’ সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করল শেলী।"
কেন, ওর কী দোষ? না জেনে শিউলিকে বলতে গেল কেন মিতা?' পেছন থেকে বলল আরেকটা মেয়ে।
রাগে দুঃখে স্কুল থেকে বেরিয়ে এল মিতা। পায়ের ব্যাথাটা বাড়ছে দ্রুত। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে লাগল। সুটকেসটাও ভারী মনে হচ্ছে খুব।
জুলেখার দিকে চোখ পড়া মিতার। দুধ সাদা চোখ দুটো ভাবলেশহীন চেয়ে আছে। মনে হচ্ছে খুব দুঃখ পেয়েছে সেও।
সমুদ্রের ধারে আসতেই বাতাসের ঠাণ্ডা ছোঁয়া লাগল শরীরে ৷ হঠাৎ কেঁপে উঠল সূর্যের আলো। দেখতে দেখতে ঘন কুয়শায় ঢেকে গেল চারপাশ।
বাতাসে তাসছে সেই পুরনো গন্ধ। কালো ফ্রক পরা ছায়াটাকে আবার দেখতে পেল মিতা। বাতাসে তির তির কাপছে৷ ‘বাড়ি যেও না, মিতা। বসে থাকো ওই গাছের আড়ালে ৷' আদেশের সুরে বলল মেয়েটা ৷ জুলেখাকে আরও জোরে বুকের সাথে চেপে ধরল মিতা৷ পায়ের ব্যথাটা একদম সেরে গেছে। মন্ত্রমুগ্ধের মত কাজ করল সে। হেঁটে গিয়ে বিশাল বটগাছটার আড়ালে শিকড়ের ওপর বসে রইল। ঘন কুয়াশার চাদর ঢেকে দিয়েছে সব কিছু ৷ ঘুম পাচ্ছে এখন ওর। মিনিট, ঘণ্টা কীভাবে যাচ্ছে বুঝতে পারছে না কিছু। ঘোর লেগে গেছে। কালো বনেট পরা ছায়াটাকে দেখা যাচ্ছে না কোথাও৷ হঠাৎ দূরে হাসির শব্দ শোনা গেল। বারো তেরো বছরের কয়েকটা মেয়ে হাসছে ৷ আসছে এদিকে ৷ কান খাড়া করে রইল মিতা। পরিচিত কণ্ঠটা শুনতেই রাগে হাত পা জ্বলতে লাগল ওর। ফ্রক পরা ছায়াটাকেও দেখা গেল হঠাৎ। কোনও কিছু বোঝার আগেই পা টিপে টিপে উঠে এল মিতা৷ হিস হিস করে উঠল একটা মিহি কণ্ঠ , ‘আসছে। এই সুযোগ ৷' কয়েক মুহূর্ত ইতস্তত করল মিতা। চুম্বকের মত টানছে ওকে ফ্রক পরা মেয়েটা ৷ ‘আমি তোমার বন্ধু৷ ওরা তোমাকে ভালবাসে না। এসো আমার সঙ্গে।‘
দুই দিকে বেণী ঝোলানাে একটা মেয়েকে আবছা মত দেখতে পেল মিতা। কাঁধে ঝুলছে দামী স্কুল ব্যাগ৷ একা। কেমন সতর্ক পায়ে এগুচ্ছে মেয়েটা। এখনও ওর মুখোমুখি যায়নি মিতা। দু ধার দিয়ে উঁচু ঢাল ৷ প্রায় পঁচিশ তিরিশ ফুট নীচে চিকচিক করছে বালু আর পাথর ৷ ঢালের ওপর দিয়ে হাটছে মেয়েটা ৷ মিতাকে দেখেই চমকে উঠল ৷ দু’হাতে বিদ্যুৎ খেলে গেল মিতার।
নিজেও চমকে উঠল সে। এত শক্তি সে পেল কোথায়? ওর আর মেয়েটার মাঝখানে কালো ফ্রক পরা ছায়াটাকে মুহূর্তের জন্যে দেখতে পেল মিতা। সাদা চোখ দুটো পাথরের মত নিষ্প্রান। মূহূর্তের মধ্যে কেটে গেল কুয়শার মেঘ। ঝলমল করে উঠল রােদেলা দুপুর।
বিশাল চালের ওপর একা দাড়িয়ে আছে মিতা। পায়ে ভীষণ ব্যাথা। কপালে হাত দিয়ে চমকে উঠল। জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে গা ৷ সুটকেস হাতে নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বাড়ির দিকে রওনা হলো সে। যে কোনও সময় ও জ্ঞান হারাতে পারে। খুব দুর্বল লাগছে। এদিকে বোবা বিলু তখন আতঙ্কিত চোখে চেয়ে আছে মিতার দিকে।
কয়েকশ গজ দূরে আমবাগানে খেলতে খেলতে খুব খারাপ কিছু একটা দেখেছে সে। খুব খারাপ।
(ক্রমশ)
----------
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now