বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
স্কুলে শিউলির সাথে ছোটখাটো একটা ঝগড়াই হয়ে গেল মিতার। কোথা থেকে যেন শুনেছে যে মিতা বাবা মার পালিত মেয়ে৷ এতিমখানায় ছিল ৷ সেটা ধরেই খোঁচা দিল সে ৷
‘তুমি তো আহাদ সাহেবের মেয়ে না। এতিমখানায় ছিলে। তুমি আমাদের সাথে খেলবে না।’
রাগ চেপে রাখতে পারল না মিতা। শেলী আর চম্পার দিকে তাকাল সে ৷ খবরটা শুনে ওদের মুখেও একটা পরিবর্তন লক্ষ করল। আরও কয়কজন
আছে এই দিকে।
'খবরদার, বাজে কথা বলবে না। আমি তো আম্মুরই মেয়ে ৷'
'ৰাড়িতে থাকলেই মেয়ে হয় না। ’ বিদ্রুপ ঝিলিক দিয়ে উঠল শিউলির চোখে।
অসহায় বোধ করছে মিতা ৷ শেলীরাও কিছু বলছে না। মিতা জানে শিউলি সত্যি কথা বলেছে ৷ কিন্তু আব্বু আম্মু এত আদর করে ওকে। ওরাই তাে তার বাবা মা। হঠাত্ কান্না পেল মিতার।
শেলী থামিয়ে দিল শিউলিকে। ‘বেশি প্যাটপ্যাট করো তুমি। এসব নিয়ে তোমার কথা বলার কী দরকার?’
বাসায় ফেরার সময় কেমন জ্বর জ্বর বোধ করল মিতা। শরীর খারাপ লাগছে বলে আপার কাছ থেকে এক ঘন্টা আগেই ছুটি চেয়ে নিয়েছে।
সমুদ্রের ধার দিয়ে হেঁটে আসছে মিতা৷ একা৷ মন খুব খারাপ। শিউলি, শেলী, চম্পা, সবার ওপর রাগ হচ্ছে তার। কচুর স্কুল। আর যাবে না সে ওখানে।
মাথাটা ঝিমঝিম করছে ৷ সমুদ্রের দিকে চাইল কয়েকবার ৷ ফিকে হয়ে আসছে রোদ ৷ কয়েক মিনিটের মধ্যে কুয়াশায় ঢেকে গেল চারদিক।
কেমন একটা অদ্ভুত গন্ধ পাচ্ছে। কুয়াশার পথ ঘাট কিছুই দেখা যাচ্ছে না।
একটা হালকা ছায়ার মত আবছা দেখতে পেল মিতা ৷ কালো ফ্রক পরা একটা মেয়ে হেঁটে আসছে যেন এদিকে। কুয়াশার ঘর পর্দা ভেদ করে কিছু দেখতে পাচ্ছে না মিতা ৷
গন্ধটা হঠাৎ করেই চিনতে পারল সে। কর্পুরের গন্ধ।
আন্দাজে পা ফেলতে গিয়ে তাল হারিয়ে ফেলল মিতা। জ্বরের ঘোরে বুঝতে পারল না কী ঘটতে যাচ্ছে ৷ হালকা ছায়াটা বাতাসে মিলিয়ে যাবার আগেই উপর থেকে নীচে পড়ল মিতা ৷
বাতাসে তখন সমুদ্রের বুনো গর্জন ছাড়া আর কোনও শব্দ শোনা যাচ্ছে না।
ৰিলুই প্রথম দেখল জ্ঞানহীন দেহটা ৷ বোৰা ৰিস্ময়ে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইল উঁচু রাস্তা থেকে ৷ নীচে কয়েকটা পাথরের উপর অদ্ভুত ভঙ্গিতে শুয়ে আছে সেই একটু আগে দেখা মেয়েটা৷
আহাদ সাহেব থরথর করে কাপছেন ৷ বিলুর দুর্বোধ্য চিত্কারে কয়েকজন লোক জুটে গিয়েছিল ৷ তারাই ধরাধরি করে মিতাকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছে।
যতটা ভয় করেছিলেন ততটা ক্ষতি হয়নি। বাম পায়ের হাড়ে ফ্রাকচার হয়েছে ৷ গ্রীনস্টিক ফ্রাকচার।
‘আল্লার রহমত, মাজেদা ৷ মিতা ভয়েই জ্ঞান হারিয়েছিল৷ চিন্তার কিছু নেই।'
মাজেদা বেগম নির্বাক হয়ে রইলেন। এক্স যে রিপোৰ্টটা নিয়ে বাড়ি ফিরলেন তারা ৷ মিতা শুয়ে রইল ৰিছানায় ব্যাণ্ডেজ বাঁধা পা নিয়ে।
রশীদ চেয়ারম্যানের বউ খবরটা শুনে সন্ধ্যার দিকে আহাদ সাহেবের বাড়িতে এলেন।
"এইমাত্র শুনলাম খবরটা। আহা হা ৷ আসতে না আসতেই কী একটা বালা মুসিবত!'
'আগেই বলেছিলাম পাহাড় পর্বতের কাছে বাড়ি কিনে কাজ নেই… উনি শুনলেন না।'
পাহাড় পর্বতের দোষ নয়, ভাবী, তবে ৰাড়িটা একটু দেখে শুনে কিনলেই হত। ‘
'এই বাড়িটা তো ভালই। একটু বেশি বড় অবশ্য৷'
'রাতে একা বাইরে যাবেন না, ভাবী ৷ উঠােনের পাছপালাগুলো অনেক পুরনো তো। সাবধান থাকা ভাল।'
'কেন?’
‘না, পােয়াতী মেয়েদের একটু সাবধান থাকা ভাল।'
‘ও,' স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লেন মাজেদা বেগম ৷
খারাপ কিছু শুনবেন ভেবেছিলেন … বাড়িটা তাঁর নিজেরই এখন আর ভাল লাগছে না৷ মিতার পা টা ভাঙল এখানে আমার জন্যেই তো৷
জ্বরের ঘোরে মাথা এপাশ ওপাশ করছে মিতা। চোখ মেলে তাকিয়ে আছে মায়ের মুখের দিকে। অপরিচিত আরেকজনকে দেখতে পেল পাশে। রশীদ চেয়ারম্যানের বউ।
আমি চম্পার মা। কেমন আছ তুমি?
উত্তর দিল না মিতা৷ ক্ষীণ কণ্ঠে বলল, ‘জুলেখা কােথায়?’
“কাকে খুঁজছ?"
জুলেখা! ওর পুতুলের নাম ৷'
কথাটা এখানেও ছড়িয়ে গেছে … ‘মিতা আপনার পালিতা মেয়ে নাকি?’ আস্ত পানটা গালে পুরে জিজ্ঞেস করলেন রশীদ গিন্নী।
“নিজের মেয়ের চেয়ে বেশী ভালবাসি আমরা ওকে,' বলেই হেসে ফেললেন মাজেদা বেগম। এ ব্যাপারে আর কিছু বলতে চান না।
‘এই পুতুলটা কোথোয় পেলেন?' প্রায় চমকে উঠলেন রশীদ গিন্নি। প্রাচীন চেহারার পুতুলটা এতক্ষণে চোখে পড়েছে তাঁর৷ টেবিলের ওপর নির্মিমেষ দাঁড়িয়ে আছে।
আমার মেয়ে খুঁজে বের করেছে। দােতলায় দেয়াল আলমারির ভেতর ছিল। '
নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছেন না রশীদ গিন্নী ৷ কাদের খানের একমাত্র মেয়ে ফিরোজা দােতলায় ব্যালকনি থেকে পড়ে মারা যাবার পর তার বউ নিজে চুলোর আগুনে পুড়িয়ে ছাই করেছিলেন এটাকে। ফিরে এসেছে পুতুলটা। ' শিরশির করে ঠান্ডা একটা স্রোত বয়ে গেল মেরুদণ্ড দিয়ে। এরই নাম জুলেখা ৷ নামটাও কেমন যেন। কোথায় যেন শুনেছেন আগে ৷ আর দেরি করলেন না। 'আজ উঠি, ভাবী। কোনও চিন্তা করবেন না। মিতা ভাল হয়ে উঠলে আমার বাসায় বেড়াতে যাবেন কিন্তু।
' কার নিয়ে এসেছিলেন রশীদ গিন্নী। স্টার্ট দিচ্ছে ড্রাইভার গাড়িতে ৷ সদর দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন তাকে মাজেদা বেগম ৷ রশীদ আহমেদ বাড়িতেই ছিলেন। হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকলেন তার স্ত্রী।
‘ওগো শুনছ?
“কী ব্যাপার, চম্পার মা?' উদ্বিগ্ন কণ্ঠ রশীদ সাহেবের।
“কাদের সাহেবের মেয়েটা মারা যাবার সময় একটা পুতুল নিয়ে তার বউ খুব হৈ চৈ করেছিলেন, তোমার মনে আছে?'
না তো।কোন পুতুল?'
'ফিরোজা সারাদিন ওটা নিয়েই থাকত ৷ শেষের দিকে ৰিড়বিড় করে নাকি আলাপও করত ওটার সাথে।’
“তো কী হয়েছে? বাচ্চা মেয়েরা এমন করতেই পারে।'
' আরে না। গভীর রাতে ওই পুতুল হাতে নাকি ছাদে ঘুরে বেড়াত ফিরোজা ৷ ফরিদা ভাবীর ধারণা পুতুলটাই ধাক্কা মেরে তার মেয়েকে দোতলা থেকে ফেলে দিয়েছিল। ফিরেজো মারা যাবার পর চুলোর আগুনে পুড়িয়ে ফেলেন উনি পুতুলটাকে।’
'ব্যস, চুকে গেল।‘ মুচকি হাসি রশীদ সাহেবের ঠোটে।
‘ওই পুতুলটা ফিরে এসেছে…' ফিসফিস করে বললেন রশীদ গিন্নী ৷
“তার মানে…” ভ্র কূচকে গেল রশীদ সাহেবের। 'এইমাত্র আমি নিজে দেখে এলাম। মিতার পড়ার টেবিলে সাজানো রয়েছে। '
'ওরকম পুতুল আরও থাকতে পারে।’
‘না। দােতলায় দেয়াল আলমারির ভিতর পেয়েছে ওটাকে মিতা। তা ছাড়া অদ্ভুত একটা পুতুল। আমাদের দেশে এ রকম তৈরি হয় না।'
‘আমি তাে এর মধ্যে কোনও রহস্য দেখি না ৷'
'কি নাম রেখেছে জানাে? জুলেখা।‘ তুরুপের তাসটি টেবিলের রাখলেন রশীদ গিন্নি।
‘তাই নাকি?’ এবার আর কণ্ঠে হালকা সুরটি নেই। “আসতে না আসতেই পা ভাঙল মেয়েটার। দেখো আরও কত কী হয়৷'
চুমকির কাজ করা শাড়ির মত লাগছে সমুদ্রকে ৷ প্রখর রোদ পড়ে ঝিকমিক করছে। কুসুমপুরের সবুজ প্রকৃতিতে যেন আনন্দের শিহরন জেগেছে৷
সামান্য খুঁড়িয়ে হাঁটছে মিতা ৷ পায়ের ব্যাথাটি এখন আর নেই। কিন্তু স্বাভাবিক ভাবে আর কখনও হাঁটতে পারবে কিনা জানে না সে। স্কুলে যেতে চায়নি ও। কিন্তু মাজেদা বেগম বুঝিয়ে সুঝিয়ে পাঠিয়েছেন। বিষন্ন হয়ে আছে মিতার চেহারা। ডাইনে দূরে তাকিয়ে দেখতে পেল গোরস্তানের পাশের আম বাগানে এককা দোককা খেলছে তিনটে মেয়ে। বিলুকে চিনতে পারল। 'ও কি আর কোনওদিন ওদের মত দৌড়ঝাঁপ করতে পারবে? স্কুলে অন্য মেয়েরা কীভাবে তাকাবে ওর দিকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে মিতা। পায়ে সামান্য ব্যাথা লাগছে এখন। বাসায় ফিরে যাবে কি? ' শিউলির চেহাড়ারাটা দেখতে পেল মনের পর্দায়। মন শক্ত করল মিতা। কারুর সাথে কথা বলবে না সে। দরকার হলে একাই থাকবে। জুলেখার কথা মনে পড়ল ৷ নিয়ে এলে ভাল হত না ?
'কী তোর পা সারেনি?' রুপালি আপা জিজ্ঞেস করলেন ক্লাশে৷
‘সেরেছে।'
‘তাে খুঁড়িয়ে হাটছিলি যে?’ অনেক কষ্টে স্বাভাবিকভাবে হাটবার চেষ্টা করেছে মিতা।
পারেনি। চম্পা আর শিউলির দিকে তাকাল। ওরা আজ একসাথে বসেছে ৷ নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করছে। ওর দিকে চেয়ে হাসল চম্পা মিতাও চেষ্টা করল হাসতে ৷ কিন্তু পারল না৷ কান্না পাচ্ছে ওর। শেলীদের খুজল বার কয়েক। আসেনি ও। ঢিফিনের সময় শিউলিকে ক্লাশ রুমের কোণায় স্কিপিং করতে দেখল মিতা। চম্পা এসে জিজ্ঞেস করল, ‘স্কিপিং করতে পারবে? তা হলে এসো।'
মিতার খুব রাগ হলো। কোনও সন্দেহ নেই শিউলিই পাঠিয়েছে চম্পাকে ইচ্ছা করেই ৷ ওকে অপমান করতে চায়।
' আমি খেলব না। তুমি খেলোগে যাও।'
'পারলে তাে খেলবে ৷ তোমার তো পা খোঁড়া।' শিউলি বলল রুমের কােনা থেকে।
‘খোঁড়া!’ মাথার মধ্যে আগুন ধরে গেল মিতার। মনে হলো শিউলিকে খামচে রক্তাক্ত করে দিলে ওর ভাল লাগত। অন্য আরেকটা মেয়ে বোধহয় উপরের ক্লাশের, ধমক দিল শিউলিকে। মিতা আর এক মুহূর্ত দাড়াল না সেখানে ৷ অভিমানে, দুঃখে চোখে পানি এসে গেল। বইখাতা হাতে নিয়ে বাড়ির পথ ধরল। সমুদ্রের ধার দিয়ে উঁচু রাস্তা। মিতা একা হাঁটছে। মার কথা মনে পড়ল। বার বার সাবধান করে দিয়েছেন মা। 'কিনার দিয়ে হাঁটবি না। সামনে ডাইনে বাঁয়ে দেখেশুনে চলবি। ‘
চোখ ঝাপসা হয়ে এল আবার। অস্বচ্ছ হয়ে গেল চারদিক ৷ রােদের আলো তিরতির করে কাঁপতে কাঁপতে হারিয়ে গেল হঠাৎ। ঘন কুয়াশায় আটকা পড়ল মিতা। এবার আর ভুল করল না। ঠায় দাঁড়িয়ে রইল চুপচাপ। একটা ছায়া নড়ে উঠল ওর সামনে। ছোট একটা মেয়ে। কালো ফ্রক পরা। মাথায় কালো কাপড়ের কুঁচি দেয়া বনেট।
ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে গেল মিতা। দশ বারো বছরের একটা মেয়ে। ওর পাশে এসে দাড়াল। ইচ্ছে করলেই ছুঁতে পারে মিতা। ইচ্ছে করলেই ৷
দূর্বল একটা কণ্ঠ শোনা গেল ৷ মিতার কান ঝাঁ ঝাঁ করছে। মনে হলো ওকে কেউ জোর করে ধরে রেখেছে। এখন ইচ্ছা করলেও আর হাঁটতে পারবে না ও।
'ওরা কেউ তোমাকে দেখতে পারে না।' ফিসফিস করল মেয়েটা ৷ বাতাসে কাপছে শরীর। 'তুমি আমার বন্ধু হও। আমরা দুজনে বেড়াব। খেলব। '
ঠাণ্ডা হাওয়া লাগল মিতার চোখে মুখে।পুরনো গন্ধটা আবার পাচ্ছে। কপুঁরের গন্ধ ৷
‘কে তুমি?’
‘তােমার বন্ধু।'
‘কেউ আমার বন্ধু না। সবাই শিউলির মত।’ বিড়বিড় করল মিতা।
'শিউলিকে আমি দেখে নেব। তোমাকে আর খোড়া বলার সাহস পাবে না।' হিসহিস করে উঠল কণ্ঠস্বর।
মিতার মনে হলো সে এখন স্বাভাবিক ভাবে হাঁটতে পারবে। শরীরটা হালকা লাগছে। বাড়ির দিকে রওনা হলো মিতা। সত্যিই সে হাঁটতে পারছে ৷
কুয়াশা কেটে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। রোদের আলোর ঝলকানিতে মিতা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে সমুদ্র, পাহাড়, গ্রাম সবকিছু ৷
(ক্রমশ)
--------
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now