বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
(সূচনাerson এর বাংলা 'পুরুষ' বলাতে এই মূহুর্তে আমার কিঞ্চিত আপত্তি আছে। কারণ এখন আমি যে গল্পটা বলতে যাচ্ছি তার প্রধান চরিত্র নারী।তার নাম নীলা। পেশায় ডাক্তার্।সমস্যা সেখানে না। সমস্যা হল গল্পটি উত্তম পুরুষে লেখা আর আমি যদি বলি সেই উত্তম পুরুষটি হল নীলা তাহলে কতটুকু অযৌক্তিক শোনাবে তা বলাই বাহুল্য। অত ঝামেলায় যেতে চাচ্ছিনা। সূচনা এখানেই শেষ।মূল গল্পে যিনি আমি আমি বলে চিল্লাবেন তিনি এ গল্পেরই নায়িকা নীলা। অর্থাৎ গল্পের কথক স্বয়ং নীলা এবং গল্পটি সম্পূর্ণরূপে নীলার ভাষায় উপস্থাপন করা হয়েছে।) সকালে ঘুম ভাঙল দু:সংবাদ শুনে।মায়ের কোন দু:সম্পর্কের এক ভাগ্নির সদ্যজাত সন্তান মারা গেছে। পরিচিত যে কারো মৃত্যুসংবাদ আমার মনকে নাড়া দেয়। কিন্তু এই শিশুর মৃত্যুর খবর আমার মনকে তেমন নাড়া দিল না। ফ্রেশ হতে হতে মনের এমন অথর্ব আচরণের একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে ফেললাম। পৃথিবীটা মায়ার সংসার্। হাসি,কান্না,মনের দরজার কড়া নাড়া - এসব কিছুই মায়ার ফ্রেমে বন্দী।হয়ত ওই মৃত শিশুর জন্য আমার কোন মায়া নেই তাই এমন হচ্ছে।মায়ের ঐ ভাগ্নির নাকি বাচ্চা হওয়ার পরপরই মারা যায়। এই নিয়ে চারবার্। মা বলল,"তুই গিয়ে একটু দেখে আয়,বেচারির কি সমস্যা?বারবার এমন হয় কেন?বাচ্চা বাঁচেনা কেন?" মায়ের এই প্রশ্নের উত্তর দেবার আগে আমার সম্পর্কে কিছু বলা প্রয়োজন। আমি নীলা।ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে ফরেনসিক মেডিসিনে এম ফিল করছি। বাংলাদেশের ৯০%নারী ডাক্তার গাইনী তে ক্যারিয়ার গড়ে। আমি ছোটবেলা থেকেই ডানপিটে মেয়ে। থ্রিল আর রহস্য আমার খুব প্রিয়। তাই ফরেনসিক বেছে নেয়া। " মা,আমি ফরেনসিকের ডাক্তার,গাইনীর না।" মাকে ভূগোল পড়ানোর চেষ্টা করলাম। "তাতে কি?এম বি বি এস কি গাইনী না পড়ে পাস করেছিস ?" মা আমাকে উল্টো ভূগোল পড়িয়ে দিল। এমন কথার পর আর ঘরে বসে থাকা যায়না। তাই অনিচ্ছ্বা সত্তেও মোটরসাইকেল নিয়ে উপস্থিত হলাম। মোটরসাইকেল চালানো শিখেছি রোমান এর কাছে। ও প্রতিদিন বাইক দাপিয়ে কলেজে আসত। আমি চড়তাম পিছনে। একদিন ওর কাছে বায়না ধরলাম,বাইক চালানো শিখাতে হবে। ও গররাজি। কিন্তু আমিও নাছোড়বান্দা। অবশেষে ডানপিটে মেয়েটারই জয় হল। যাই হোক ,ওই বাড়িতে কোন কান্নাকাটির আলামত পাওয়া গেল না। তবে একটা থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে। বাড়িতে অনেক মহিলা । কোনটা যে আমার দু:সম্পর্কের খালাত বোন বুঝতে পারলাম না। আমাকেও কেউ চিনেছে বলে মনে হল না। বারান্দায় ছোট্ট একটা বাচ্চার দেহ কাফনে জড়িয়ে রাখা হয়েছে। আমি কোন পরিচয় না দিয়েই লাশের পাশে বসে থাকা ব্যক্তিকে মোটামুটি আদেশ ভঙ্গিতে বললাম,"মুখটা খোলো তো,লাশটা দে আমি যা দেখার দেখে নিলাম। তারপর বেশ জোরেসোরেই বললাম,"মৃত বাচ্চার মা কে?" প্রশ্ন শুনে একজন মহিলার দিকে সবাই তাকাল। আমি বুঝে নিলাম এটাই মরিয়ম বুবু (মায়ের ভাগ্নি)। আমি তার দিকে এগিয়ে গিয়ে বললাম,"বুবু আমি নীলা। আমার মায়ের নাম রাশেদা। কাঞ্চনপাড়ায় আমাদের বাড়ি।" -"তোমারে চিনছি আমি,বসো বইন। আগে কোনদিন দেখি নাই তো তাই চিনতে পারি নাই। তুমি ডাক্তার,না?"আমি হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লাম। থমথমে পরিবেশের মাঝেও সবাই একবার আমার দিকে তাকাল। বিকেলের মধ্যে দাফন হয়ে গেল। তারপর পরই আমি আমার চিকিৎসা শুরু করে দিলাম। প্রথমে কথা বললাম বুবুর স্বামীর সাথে। তারপর দাই এর সাথে কথা বললাম। দাই এর কাছ থেকে চারবার ডেলিভারীর তথ্যগুলো নিলাম। ওই বাড়িতে সর্বময় আধিপত্য বিস্তারকারিনী একজন মহিলার সাথে সাক্ষাৎ হল। তিনি বুবুর বড় জা। বিধবা মহিলা। তবে চেহারায় বয়সের ছাপ পড়েনি। অনুমান করলে বয়স ৩০-৩৫এর মাঝে ঘোরাফেরা করে। তার সাথেও কথা বললাম। রাতের খাবার শেষে আমি বুবুর ঘরে গেলাম। উদ্দেশ্য বুবুর সাথে কথা বলা। ঘরে জন দশেক মহিলা। সবাই যার যার মত করে সান্ত্বনার বাণী শোনাচ্ছিল। আমি রুমে ঢুকতেই সবাই একটু নড়ে চড়ে বসল। আমি বুবু বাদে অন্য সবাই কে বাইরে যাওয়ার ইশারা করলাম। এতক্ষণে সবাই আমার আসার উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবহিত। তাই বিনা বাক্যব্যয়ে সবাই ঘর খালি করল। আমি বসা চৌকির একপ্রান্তে,বুবু অন্যপ্রান্তে। আমি কিছু খুঁজছি এমন ভঙ্গিতে মাটির দিকে তাকানো। মাথা উঠিয়ে বুবুর চোখের দিকে তাকালাম। সারাদিন কঠিন ধকল গেছে তা চোখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। আমি কোন প্রকার ভণিতায় গেলাম না,সরাসরি বলে বসলাম,"এমনটা কেন করলে,বুবু?" বুবুর চোখ স্থির,মনে বিস্ময় - লুকোছাপের পথ বন্ধ,চোখে চোখ রেখে কথা বলছি। -"কোনটা বইন?" বুবুর ভারী কণ্ঠ। -"বাচ্চাগুলোকে মারলে কেন?" এবার মনের বিস্ময় চোখে এসে ভর করল বুবুর্। জানি তার উত্তর দিতে বেশ সময় লাগবে,বিস্ময়ের ঘোরে তিনি বাকরুদ্ধ। তবে এটা আমার জন্য বিস্ময় ছিল না। মর্গে মর্গে সারাদিন কাটে আমার্। লাশের গলার নীলচে দাগ দেখে সহজেই অনুমান করতে পেরেছিলাম এটা স্বাভাবিক মৃত্যু না। দাই এর তথ্যে সিওর হয়ে গেলাম যে ঠিক মৃত্যুর সময় বাচ্চার কাছে মা ছাড়া আর কেউ ছিল না। চারটা মৃত্যুর ঘটনা অভিন্ন হওয়ায় সবার কাছে যেমন স্পষ্ট ছিল যে এটা জ্বিনের আছর,আমার কাছে ঠিক ততটাই উন্মোচিত হয়ে গেল যে এটা খুন। -"বাচ্চার গলায় শাড়ির আঁচল পেঁচিয়ে ছিলে ,তাইনা?" আরও খানিকটা বিস্ময় চোখে জমার পর বুবু মাথা নাড়ল। হ্যাঁ সূচক। -"আসলে শাড়িটার রং কাচা ছিল,চোখ এড়ানো কঠিন।" ঘরে বেশ কিছুক্ষণের জন্য নিস্তব্ধতা নেমে এল। আমিই আবার শুরু করলাম,"কেন করলে এটা?" -"বাচ্চা কাচ্চা আমি একদম সহ্য করতে পারিনা।" বুবু এমনভাবে বলল যেন উত্তরটা তৈরীই ছিল। -"কিন্তু এ সম্পদ তো শুধু তোমার একার নয় ,দুলাভাইয়েরও। তার তো বাবা হতে ইচ্ছে করে। " বুবু কোন কথা বলল না। আমিও আর এ নিয়ে বুবু কে তেমন ঘঁটালাম না। আমি ও বাড়িতে আরও চার পাঁচ দিন থাকলাম। বেশ যত্ন আত্তি পেলাম। বুবু অসুস্থ। কিন্তু বুবুর জা অসাধারণ মহিলা। তিনি আমার সার্বক্ষণিক দেখভাল করলেন। আমি বুবুকে যথাসাধ্য কাউন্সিলিং করে অবশেষে পূনরায় কাজে যোগ দিলাম। এক বছর পরের কথা। একটা ফোন আসল। বুবুর ফোন। দুইদিন আগে তার একটা ফুটফুটে মেয়ে হয়েছে। বুবু আর বাচ্চা দুজনেই ভাল আছে। শুনে খুবই ভাল লাগল। বিশেষ করে ভাল লাগল বুবুর শেষ কথাগুলো,"তুমি ঠিকই বলেছিলে বইন,ভালবাসার ফসল ওই সন্তানের তো কোন দোষ নাই। প্রাণ দিছে আল্লাহ,আমি কাইড়া নেয়ার কে?" রমনী!বিস্ময়ের প্রতিমূর্তি।আমি নিজেও সেই সমাজের প্রতিনিধি- ভাবতেই নিজেকেও রহস্যাবৃত মনে হয়। বুবু বাচ্চা পছন্দ করে না -কথাটা আমার বিশ্বাস হয়নি। তা আদৌ সত্যও ছিল না। বুবুকে বলেছিলাম," সত্যটা কি আমাকে বলা যায় বুবু?" বুবু সেদিন বলেনি। তবে বলেছিল। -"বইন,তোমার দুলাভাই দিনে ভালো কিন্তু রাতে নেশা করে বাড়ি ফেরে। " -"এইজন্য তুমি বেবি মেরে ফেলবে?" -"সেইজন্য না,সে নেশা করে প্রায়ই ঘরে আসত না,মাঝে মাঝে আসত। যেদিন আসত সেদিন আমাকে জড়িয়ে ধরে নেশার ঘোরে 'সাথী','সাথী' বলে চিল্লাইতো। " -"সাথী কে?" সবার মত আমারও চিরায়ত কৌতূহলী মন এ প্রশ্নটাই করল। বুবুও ততটাই বিষণ্ন মনে উত্তর দিল,"আমার বড় জা।" আমি যেন পুরো আকাশ থেকে পড়লাম। নিজের কানকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। আমার চারিদিকে একটা অদৃশ্য ঘোরের জাল আমায় আটকে ফেলল। আমি অসাড় দিকভ্রান্ত মানুষে পরিণত হলাম। এ কি করে সম্ভব!নিজেকে সামলে নিতে কষ্ট হল।আধো ঘোর লাগা অবস্থাতেই বুবুকে জিজ্ঞেস করলাম,"তাহলে কি দুলাভাই অন্য দিনগুলোতে ......?" কথা শেষ করতে পারলাম না,তার আগেই বুবু বলল,"হ্যাঁ।" আমার তখন রীতিমত মাথা চক্কর দিতে শুরু করেছে। পায়ের নিচে মাটি আছে কিনা বুঝতে পারছিলাম না। আমি ধাতস্থ হতে পারছিলাম না,কিন্তু এসব ঘটনার সর্বসহা সর্বসাক্ষী বুবু তখন নিজ থেকেই বলতে শুরু করেছেন,"কোন কোন দিন আমার জা আমার ঘর থেকেও তোর দুলাভাইকে ডেকে নিয়ে যায়। আমি কিছুই বলতে পারিনা। এতকিছুর পরও দিনের বেলা সবার সামনে যখন তোর দুলাভাইকে দিব্বি ভাই বলে ডাকে ,বিশ্বাস কর আই পৃথিবীতে আমার বেঁচে থাকতে ইচ্ছে হয় না। তুই বল বইন যে ভালবাসা বিথীর জন্য,মরিয়মের জন্য না ,সেই ভালবাসার ফল মরিয়ম কেমনে ধারণ করব?যেই ভালবাসার গোড়ায় গলদ,শুরুতে মিথ্যা ,সেই ভালবাসাকে লালন পালন করি কেমনে?তবু সেই ভালবাসাকেই বুবু লালন করতে শুরু করেছেন।এ যাত্রায় কোন অঘটন ঘটার পূর্বাভাসও নেই। বড়ই সেলুকাস!বাংলার রমনীরা কত সহজে পুরুষের বড় বড় অপরাধ ক্ষমা করে দেয়। হঠাৎ করে মনে হতে থাকে আমি বোধ হয় আজও বাঙালি নারী হতে পারিনি।রোমানের কোন দোষ ছিল না,দোষ ছিল এটাই যে সে মেডিকেলে চান্স পায়নি,ডাক্তার হতে পারেনি। নন মেডিকেল ছেলের সাথে ঘর বাঁধতে পারব না এটাই ছিল আমার অজুহাত। নিজেকে মহাপাপী মনে হয়। ভাবতে কষ্ট লাগে,ওর মত দৃঢ় মনের ছেলেও প্রতিদিন ফোন দিয়ে কাঁদত। আমি ওর সাথে যাচ্ছেতাই ব্যবহার করতাম । আমি জানি,আমি ওর কাছে নিজেকে যতটা খারাপভাবে উপস্থাপ করেছি,ততটা খারাপ আমি নই। ওকে উপেক্ষা করতেই মোবাইল সিম চেঞ্জ করলাম,তবি যেদিনই ওই সিমটা অন করতাম সেদিন ই ও করত,টেক্সট করত। আসলে ও প্রতিদিনই কল করত,বন্ধ পেলেও করত। আজ এতদিন পরে বুকের বামপাশে চিনচিনে একটা ব্যাথা অনুভূত হচ্ছে রোমানের জন্য। কোথায় আছে ও এখন? কেমন আছে?বড্ড জানতে ইচ্ছে হচ্ছে আজ। নিজের অগোচরেই ফোনবুক ঘেঁটে পুরনো একটা মোবাইল নাম্বার্ খুঁজে বের করলাম। " রোমানের নাম্বার্। জানিনা এতদিন নাম্বারটা খোলা রেখেছে কিনা। তবু এক অনিশ্চিত প্রত্যাশায় নাম্বারটা মোবাইল স্ক্রিনে উঠিয়ে কল বাটনে চাপ দিলাম। ও কি ধরবে?ওর নাম্বারটা কি খোলা পাওয়া যাবে? আমি কি আবার শুনতে পাবো ওর কণ্ঠস্বর? নাকি একটু পরই ভেসে আসবেসেই যান্ত্রিক মহিলা কণ্ঠ,"এই মুহুর্তে মোবাইল সংযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না,..........."?? জানিনা আমি কিচ্ছু জানিনা। চোখে তীব্র আকুতি আর মনে আশঙ্কা নিয়ে অপেক্ষায় থাকতে হবে আরও কয়েক সেকেন্ড ..,....এই কয়েক সেকেন্ড যেন কয়েক সেকেন্ড নয় ,আমার অনুভবের সাথে যার কয়েক যুগের দীর্ঘসূত্রিতা।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now