বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
‘বাড়িটা তাে ভালই, কিন্তু এত বড় বাড়ি সাজাব কী দিয়ে?'
স্বামীর দিকে তাকিয়ে বললেন মাজেদা বেগম ৷
অসুবিধা কী ৷ ফার্নিচার আমাদের কম নেই খুব একটা।‘
‘আব্বু, আমরা মোটে চারজন ৷ এত বড় বাড়িতে থাকব কী করে?’
মেয়ের দিকে তাকালেন আহাদ সাহেব ৷ বাড়ি দেখে মেয়ে খুশি হয়েছে কিনা বুঝতে পারলেন না ৷ তবে চঞ্চলতা আছে খুব ৷ ছুটাছুটি করে বেড়াচ্ছে ৷
পুরনো লাল ইটের বাড়ি ৷ খুব সস্তায় পেয়ে গেছেন আহাদ সাহেব ৷ পাহাড়তলীতে ভাড়া বাসায় এতদিন ছিলেন। জাকজমক সেখানে ভালই ছিল। তবুও তাে ভাড়া বাড়ি।
তা ছাড়া রমরমা প্রাকটিস। ডাক্তার হিসাবে নামডাক কিছুটা ছিল ৷ সব ছেড়েছুড়ে চলে এলেন কুসুমপুরে ৷ চিটাগাঙে এই অঞ্চলটাই সবচেয়ে প্রাচীন ৷ হিন্দু জমিদারদের বাড়িঘর আছে ছড়ানাে ছিটানাে। ভাঙা চােরা। পলেস্তরাে খসা ৷
এই বাড়িটড়াই সবচেয়ে ভাল ৷ মালিক কাদের চৌধুরী কেন যে হুট করে বিক্রি করে দিলেন বুঝতে পারলেন না আহাদ সাহেব ৷ তেমন কিছু জিজ্ঞেসও করেননি এ ব্যাপারে।
হাজার হোক জমিদারী শানশওকত আছে ৰাড়িটাতে ৷ সুযোগ বারবার আসে না। বিশাল বাড়িটার দিকে তাকিয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন আহাদ সাহেব ৷ ‘একটু নির্জন, এই যা।'
'একটু না, বেশ নির্জন। আমার তো রাত বিরেতে গা ছমছম করবে একা বেরুতে।‘ মাজেদা বেগম ক্ষোভ চেপে রাখার চেষ্টা করলেন না।
‘আরে না না ৷ ওই তো ওদিকে রশীদ চেয়ারম্যানের বাড়ি ৷ আর পুবে ফজুমিয়ার বাড়ি। তেমন কোনও অসুবিধা হবে না,’ স্ত্রীকে আশস্ত করার চেষ্টা করলেন আহাদ সাহেব ৷
“এই তোমরা সব দেখছ কী? মালপত্র গুলো নামাও না৷ বিকেল হতে তাে আর বাকি নেই। '
তাড়া খেয়ে ঠেলাঅলারা ধরাধরি করে মালপত্র নামাতে শুরু করল। সেগুন কাঠের ভারি ভারি খাট পালঙ্ক। টেনে হিচাড় নামাৰার চেষ্টা করতেই হ্যা হ্যা করে উঠলেন আহাদ সাহেব ৷ "আহ হা ৷ আচড় লাগবে তো খাটে। আলগা করে তুলে নামাও না। কাজকর্ম শেখোনি কিছু?’
বিকেল নাগাদ সব জিনিসপত্র ঘরে তোলা হয়ে গেল। মিতার উত্সাহের অন্ত নেই। এটা সেটা ধরে টানাটানি করছে ৷ আহাদ সাহেব খুশি হলেন ৷ একে নিয়েই চিন্তা ছিল। ভীষণ জেদী মেয়ে। যদি অপছন্দ করে বসত তা হলে মুশকিল হত খুব।
“কি মা, পছন্দ হয়েছে বাড়ি?"
“হ্যা… খুব সুন্দর। কেমন রাজবাড়ি রাজবাড়ি ভাব, না?'
"আরে রাজবাড়িই তো ছিল এটা।"
মেয়ের কথায় হাসলেন আহাদ সাহেব ৷ ‘জমিদার নারায়ণ চন্দ্র চৌধুরীর বাড়ি ছিল এটা ৷ কাচারী বাড়ি। কোলকাতা থেকে এখানে এসে থাকতেন মাঝে মাঝে।' আমার রুম ঠিক করে… ফেলেছি দোতলায়।’
“তাই নাকি? তুমি একা একা থাকতে পারবে আলাদা রুমে?’
"বারে আগের বাসায় ছিলাম না?‘
ঠোট ওল্টাল মিতা।
“ঠিক আছে। তোমার মাকে বলে দেখো ৷' কোমরে আঁচল, পেঁচিয়ে বিছানাপত্র ঠিকঠাক করছিলেন মাজেদা বেগম। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। এখন তার পরিশ্রম করার সময় নয়৷ হাবুর মাকে চিৎকার করে কিছু একটা বলে এ ঘরে এসে ঢুকলেন।
'কি কথা হচ্ছে বাপ মেয়েতে?'
‘মিতা দোতলায় আলাদা ঘরে থাকতে চাইছে ৷' “বললেই হলো। ওই একরত্তি মেয়ে দোতলায় একা থাকবে?"
“আহা… তা কেন? আমরাও তো দোতলায়ই থাকব। ' 'মােটেই না একতলায় থাকব সবাই। দোতলায় কাঠের বড় বড় জানালা। কেমন একটা প্রাচীন প্রাচীন ভাব। মাকড়সার জালে ভর্তি ৷'
স্বামীর কথা আমলেই আনলেন না মাজেদা বেগম ৷ ওপরতলাটা পছন্দ হয়নি তার। অনেক উঁচুতে সিলিং আর অদ্ভুত তিনকােনা জানালা ৷ দেয়ালের গায়ে বড় বড় কাঠের আলমারি ৷ ওখানে থাকতে রাতে ভয় লাগবে তার।
'জানাে, আবার, দোতলায় বাদুড় আছে।,
চোখ বড় বড় করে বলল মিতা। ‘বাদুড় ? কোথায়?'
‘দােতলায় ভেন্টিলেটরে অনেকগুলো দেখলাম।’
‘তাের আর ওপরে গিয়ে কাজ নেই। মুখে খামচে দেৰে,'
মেয়েকে সাবধান করে দিলেন মাজেদা বেগম। আহাদ সাহেব বললেন, “যাক না। খেলুক ওপরে গিয়ে ৷ বাদুড় কাউকে খামচায় না।'
এই এক দূর্বলতা তার। মেয়েটার মুখের দিকে চাইলে কিছুতেই তাকে না বলতে পারেন না। বারো বৎসরের বিবাহিত জীবনে কোনও সন্তান হয়নি তাদের। চার বৎসরের মাথায় এতিমখানা থেকে চেয়ে নিয়েছিলেন মিতাকে।
চার বৎসর বয়স তখন মিতার ৷ আহাদ সাহেব বা মাজেদা বেগম কোনওদিনই বুঝতে দেননি কাউকে মিতা তাদের পালিতা মেয়ে। যদিও মিতা জানে।
মা বাবার অভাব কখনও বোধ করেনি সে। সুযোগ হয়নি। আদরে স্নেহে তাকে ঘিরে রেখেছেন আহাদ দম্পতি।
সন্ধ্যা নামছে পাহাড়ে ৷ দূরের সমুদ্রে অবিশ্রাম গর্জনে ভেঙে পড়ছে ঢেউ। সেদিকে তাকিয়ে রইলেন আহাদ সাহেব ৷ সাগর পারের নতুন জীবন কেমন হবে কে জানে।
খুশিতে নাচতে নাচতে ঘরে ঢুকল মিতা। আব্বু, আব্বু, দেখো এটা কী?"
প্রায় দেড়ফুট লম্বা একটা পুতুল মিতার হাতে। 'কােথায় পেলে এটা?'
'দোতলায়। দেয়াল আলমারির ভেতরে ছিল। ইস, কী সুন্দর না পুতুলটা?’ খুশিতে চকচক করছে মিতার চোখ।
ভাল করে পুতুলটা দেখলেন আহাদ সাহেব। অনেক পুরনো। তিরিশ চল্লিশ বছরেরও হতে পারে। এর আগে এ ধরনের পুতুল চোখে পড়েনি তার। কালো ফ্রক পরা। মাথায় ইউরোপিয়ান বাচ্চাদের মত কালো বনেট ৷
মনে হয় কাদের সাহেবের জিনিস। ভুলে ফেলে গেছে। কাল একসময় দিয়ে আসতে হবে ওটা।
"না, দেব না এটা আমি। আমি পেয়েছি এটা ৷ আমার পুতুল।‘ বুকের সাথে চেপে ধরল মিতা পুতুলটা৷ যেন কেউ কেড়ে নেবে বলে ভয় পাচ্ছে।
মাজেদা বেগম ঘরে ঢুকলেন ৷ মুখে ক্লান্তির ছাপ। ‘না, আজকে সব গোছগাছ করা সম্ভব না। হাবুর মা তো একটা আলসের হদ্দ। তোমার ফার্মেসীর ওরা খাট পালং গুলো ফিট করে না দিয়ে গেলে মেঝেতে শুতে হত আজ।'
আহাদ সাহেব হাসলেন। স্ত্রীর এই গােছগাছ করার অভ্যাস অনেক পুরানো। একদিনেই সব করে ফেলতে চায়।
‘দেখো কী পেয়েছে তোমার মেয়ে।"
‘দেখেছি আমি। সকাল থেকেই তো দোতলায় পই পই করে ঘুরছে। আরও কত কী যে আবিষ্কার করবে কে জানে। এই মিতা, যা হাতমুখ ধুয়ে আয়। মাকড়সার জাল আর তেলেপােকার লাদি দিয়ে তো ঢেকে গেছে মাথা।‘
‘আঃ, মা। কী বলো তুমি!' ঘেন্নায় তিড়িন বিড়িন করতে লাগল মিতা। মাথা ঝাঁকাল কয়েকবার।
‘চা খাইবেন, আসেন।' নতুন পাকের ঘর থেকে বেরিয়ে এল হাবুর মা। আদর্শ ফোকলা বুড়ি। কানে প্রায় শোনেই না। তবে শরীর শক্ত সমর্থ। কাজ করতে পারে খুব।
‘খাওয়া যাক এক কাপ, কী বলাে।” স্ত্রীর দিকে চাইলেন আহাদ সাহেব।
'হরলিকস বানাও। টায়ার্ড লাগছে। ' চেয়ারে বসলেন মাজেদা বেগম।
‘আম্মু, এটার নাম কি জানাে?’ আদর করে পুতুলটার মাথায় হাত বুলাচ্ছে মিতা। অদ্ভুত একটা পুতুল। চোখ দুটো একদম সাদা। মাথাটা সামান্য ওপর দিকে তোলা, মনে হয় যেন অন্ধ।
'পুতুলটা পুরনো মনে হয় না? তাই নাম দিলাম জুলেখা৷'
নাম ?' ভ্রু কুচকে গেল মাজেদা বেগমের।
‘জুলেখা একটা একটা নাম হলো? কত সুন্দর সুন্দর নাম আছে। তা না একটা গাইয়া নাম রাখলি। '
‘আমার বন্ধু। আমার যা খুশি রাখব।‘ ঠোট ফুলাল মিতা। মায়ের খোঁচাটি ভাল লাগেনি ওর।
বাপের গা ঘেঁষে গিয়ে দাড়াল মিতা। 'তােমার বন্ধু বুঝি এটা?’
'হ্যাঁ। এতবড় ডল পুতুল আর কারও নেই।'
'ঠিক আছে। আমরা তা হলে পাচজন হলাম বাসায়, না?'
হেসে ফেলল মিতা। তার নিজের রুমের দিকে চলে গেল সে।
নীচতলায় মোট পাচটা রুম। সামনের দিকে ড্রইং রুম। মাঝখানের ঘরটাকে লিভিংরুম বানানো হয়েছে। উত্তর দিকের ছোট রুমটায় মিতা আর বুয়া থাকবে। পুবের ঘরটা আহাদ সাহেবের স্টাডি রুম। পাঁচ নম্বর কক্ষে রান্নাঘর।
নতুন বাড়িতে ইলেকট্রিসিটি, পানি, সবই আছে। নিজের ঘরে ঢুকে সুইচ টিপতেই উজ্জ্বল আলোয় ভরে গেল চারদিক ৷
বাইরে রাত নেমেছে। গ্রামটা এখন সুনসান, নীরব মনে হচ্ছে। শুধু সমুদ্রের চাপা গর্জন শোনা যাচ্ছে ! জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল মিতা ৷
জোনাকীর আলোয় ভরে গেছে সমুদ্রের ধার। সামনে অনেকটা ফাঁকা জায়গা। তারপর সমুদ্রের উচু পাড় ৷ পায়ের শব্দে পিছনে চাইল মিতা ৷ আহাদ সাহেব ঢুকলেন ভিতরে ৷ '
'বাহ ৷ চমৎকার সাজানো হয়েছে তো মা মণির রুম।'
"জুলেখা থাকবে আমার পড়ার টেবিলের ওপর, আর বুয়া ওই দিকে। আচ্ছা, আব্বু, ওই ফাঁকা জায়গাটায় তো আমরা রাতে বেড়াতে পারব, না?'
জানালা দিয়ে বাইরে তকােলেন আহাদ সাহেব। কী গর্জন! অথচ কী সুন্দর ৷ অনেকক্ষণ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। চিটাগাঙের হৈ হুল্লোড়ের সাথে কোনও তুলনাই হয় না।
চাঁদের আলোয় দুই ফিটের মত উঁচু লাল ইটের দেয়ালটা চোখে পড়ল এতক্ষণে। হঠাৎ একটা অশ্বস্তিতে ভরে উঠল মন ৷ এই রুমে মিতাকে থাকতে দেয়া কি ঠিক হলো? জানালা দিয়ে তাকালেই ওর চোখে পড়বে ওটা।
চৌধুরীদের পুরনো পারিবারিক গোরস্তান। এই ঘরে বসে গোরস্তানটাই চোখে পড়বে ওর সবার আগে ৷ ছোট মেয়ে। ভয় পাবে না?
অথচ যে রকম জেদী ৷ একবার যখন নিজে পছন্দ করেছে শত চেষ্টাতেও আর রুম বদলাতে রাজি হবে বলে মনে হয় না ৷ খুঁতখুঁত করছে আহাদ সাহেবের মন।
’ওটা কবরস্থান, মা। ওখানে বেড়াতে যেতে পারব না আমরা। চাইলে ওই দিকের রুমটা নিতে পারো ৷ '
‘কেন?
“রাতের বেলা ভয় করবে না?'
'নাহ। আমরা তো তিনজন থাকব এ ঘরে। '
তিনজন মানে?'
“বারে l আমি বুয়া আর জুলেখা। তিনজন হলাম না?'
ভুলেই গিয়েছিলেন আহাদ সাহেব ব্যাপারটা। 'ওহহাে। তাই তো৷ তোমার তো আবার একজন বন্ধু জুটেছে।'
রাতের খাবার শেষে তড়ােতাড়ি শোওয়া হলো আজ। নতুন বাড়ি। মাজেদা বেগম একা উঠোনে যেতে রাজি হলেন না। তাঁর নাকি গা ছমছম করে। বুয়া গিয়ে উঠোনের দিকের দেয়ালের ছোট গেটটা বন্ধ করে দিয়ে এল ৷
বেশ কয়েকটা বড় বড় শিশু আর ইউক্যালিপ্টাস গাছ উঠোনে। একটা দুর্লভ গাছ আছে ৷ নাগলিঙ্গম।
মিতাকে শুইয়ে দিতে এসে আহাদ দম্পতি উঠোনটা আরেকবার দেখলেন ভাল করে। মাজেদা বেগমের মনে হলো এই বাড়িতে আরও কিছু লোক থাকলে ভাল হত।
‘চাের ডাকাতের ভয় নেই তো?’
আরে না। এই তো কাছেই পুলিশ ফাঁড়ি আছে একটা ৷ তা ছাড়া লোকজনও খুব ভাল এদিকটায় ৷'
স্ত্রীকে আশ্বস্ত করবার জন্য বললেন বটে কথাটা। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে এই ব্যাপার আরও ভাল করে ভেবে দেখা উচিত ছিল তাঁর। বাড়িটা সত্যি বড্ড নির্জন।
মিতার রুম থেকে নিজেদের ঘরে চলে আসবার সময় পুতুলটাকে দেখতে পেলেন আহাদ সাহেব। টেবিলের ওপর দাঁড়িয়ে জানালার বাইরে অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।
হঠাৎ একটা অদ্ভুত চিন্তা মাথায় এল আহাদ সাহেবের। মনে হলো সত্যি সত্যি দশ বারো বছরের একটা মেয়ে তাকিয়ে আছে বাইরে ৷ চোখ দুটো দুধ সাদা, অদ্ভুত।
কিন্তু মনে হচ্ছে দেখতে পাচ্ছে সব কিছু৷ জীবন্ত।
(ক্রমশ)
--------
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now