বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

হারাধনের দ্বীপ" হেমেন্দ্রকুমার রায় ▪▪▪পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ▪▪▪

"রহস্য" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X " পরদিনের সকালবেলা। প্রায় রাত চারটের সময় স্বপ্নার চোখে এসেছিল ঘুম, আজ সকালবেলা আটটার আগে সে আর বিছানা থেকে উঠতে পারলে না। কিন্তু বিছানা থেকে নামতে না নামতেই ঘরের বাহির থেকে শুনতে পেলে অমলেন্দু ও মহেন্দ্রর কণ্ঠস্বর। তারা তার নাম ধরে ডাকাডাকি করছে। দরজা খুলে দিতেই অমলেন্দু উত্তেজিত কন্ঠে বললে, সমুদ্র আবার ডাক্তারকে ফিরিয়ে দিয়েছে। কথার অর্থ ধরতে না পেরে জিজ্ঞাসু চোখে চেয়ে রইল স্বপ্না। মহেন্দ্র বললে, বুঝতে পারছেন না? ডাক্তারকে সমুদ্র গ্রাস করেছিল কাল রাত্রে। আজ আবার ডাঙার দিকে পাঠিয়ে দিয়েছে তার মৃতদেহকে। আমরা দুজনে খুব ভোরবেলা উঠে সমুদ্রের ধারে গিয়েছিলুম, ডাক্তারের দেহ দেখতে পেয়ে তুলে নিয়ে এসেছি। স্বপ্না শিউরে উঠে প্রায় রুদ্ধকণ্ঠে বললে, কোথায়, কোথায় সে দেহ? এসেছি। আপনার আর সে দৃশ্য দেখে কাজ নেই।’ স্বপ্না অমলেন্দু বললে, আমরা ডাক্তারের দেহটাকে তাঁর ঘরের ভিতরেই রেখে এসেছি। আমনার আর সে দৃশ্য দেখে কাজ নেই স্বপ্না খানিকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বললে, “আচ্ছা, আপনারা এখন নীচে যান। আমি জামাকাপড় বদলে এখনই গিয়ে চা আর খাবার তৈরি করে দিচ্ছি। যতই বিপদ হোক, আমরা তো উপোস করে থাকতে পারব না! অমলেন্দু বললে, স্বপ্না দেবী, আপনি জামাকাপড় বদলে নিশ্চিন্ত হয়ে নীচে আসুন। ততক্ষণে আমরা নিজেরাই উনুনে আগুন দিয়ে চায়ের কেটলি চড়িয়ে প্রস্তুত হয়ে থাকব। সিঁড়ি দিয়ে নীচের দিকে নামতে নামতে মহেন্দ্র বললে, অমলেন্দুবাবু, আপনার রিভলভারটা যদি সমুদ্রের জলে বিসর্জন দিতে পারেন, তাহলে আমি অত্যন্ত খুশি হই। —কেন বলুন দেখি? —ওই রিভলভারটা যতক্ষণ আপনার কাছে থাকবে, আমি নিজেকে নিরাপদ বলে ভাবতে পারব না। অমলেন্দু বললে, প্রাণ থাকতে এ রিভলভারটা আমি কাছছাড়া করতে পারব না। এইসব বাজে কথা না ভেবে আপনি এখন কতকগুলো কাঠ কেটে আনুন দেখি! আমি রান্নাঘরে গিয়ে চায়ের তোড়জোড় শুরু করে দিই। তার পরের ঘটনা ঘটল অত্যন্ত তাড়াতাড়ি। অমলেন্দু টেবিলের উপরে প্লেটগুলো সাজাতে সাজাতেই স্বপ্না এসে তার সঙ্গে যোগদান করলে। অমলেন্দু বললে, সবই প্রস্তুত, মহেন্দ্রবাবু এখন কাঠ নিয়ে এলেই হয়। তার মুখের কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই উঠানের দিক থেকে শোনা গেল একটা প্রচণ্ড আর্তনাদ ও কোনো গুরুভার জিনিস পড়ে যাওয়ার শব্দ। স্বপ্না সচকিত কণ্ঠে বলে উঠল, ও কার আর্তনাদ অমলেন্দুবাবু, ও কীসের শব্দ? অমলেন্দু বেগে বেরিয়ে গেল রান্নাঘরের ভিতর থেকে। স্বপ্না আড়ষ্ট হয়ে মিনিট দুই দাঁড়িয়ে রইল, তারপর ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে বসে পড়ল একখানা চেয়ারের উপর। উঠানের দিকে থেকে শোনা গেল অমলেন্দুর ভয়ার্ত কণ্ঠস্বর—স্বপ্না দেবী, স্বপ্না দেবী! শীঘ্ৰ এদিকে আসুন! স্বপ্নার দেহ তখন অবশ হয়ে এসেছিল। কোনোক্রমে নিজেকে সামলে নিয়ে সে উঠানের দিকে গেল দ্রুতপদে। তারপর সেখানে গিয়ে বিস্ফারিত নেত্রে দেখলে, অমলেন্দু হাটু গেড়ে মাটির উপরে বসে আছে এবং তার সামনেই পড়ে রয়েছে মহেন্দ্রের রক্তাক্ত ও নিশ্চেষ্ট দেহ। ভয়ে সে মুখ দিয়ে উচ্চারণ করতে পারলে না একটা শব্দও। অমলেন্দু বললে, মহেন্দ্রবাবুর মাথা চূৰ্ণবিচূর্ণ হয়ে গিয়েছে। ওই পাথরের ভাঙা আবক্ষ মূর্তিটা দেখতে পাচ্ছেন? ওটা ছিল দোতলার বসবার ঘরে! দোতলা থেকে কেউ ওটা মহেন্দ্রবাবুর মাথার উপরে ছুড়ে মেরেছে। স্বপ্না থেমে থেমে বললে, কিন্তু দোতলায় তো জনপ্রাণী নেই! দুজনে মূর্তির মতো স্থির দাঁড়িয়ে আছে বৈঠকখানার ভিতরে—অমলেন্দু ও স্বপ্না। সর্বপ্রথমে কথা কইলে অমলেন্দু। টেবিলের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে সে আস্তে আস্তে বললে, ওখানে দাঁড়িয়ে আছে আর দুটো পুতুল। ও-দুটো হচ্ছে আমাদের দুজনেরই প্রতীক। এখন কার পালা আগে আসবে—আমার, না আপনার? স্বপ্না সচিৎকারে বললে, এ বাড়ি অভিশপ্ত অমলেন্দুবাবু! এখানে দাঁড়িয়ে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে! আসুন, আমরা বাইরে পালিয়ে যাই! অমলেন্দু বললে, তাই চলুন। কিন্তু বাইরে গিয়ে আমরা সাত্ত্বনা পাব না— এ দ্বীপটাই হচ্ছে অভিশপ্ত! দুজনে বাড়ির বাইরে গিয়ে দ্রুতপদে অগ্রসর হতে লাগল সমুদ্রের দিকে। যেতে যেতে এসে পড়ল একটা জঙ্গলের কাছে। সেখানে দাড়িয়ে রয়েছে তিনটে বড়ো বড়ো গাছ। স্বপ্না হঠাৎ চলা বন্ধ করলে সেই গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে। তারপর বললে, অমলেন্দুবাবু, এক কাজ করতে পারেন? —কী কাজ স্বপ্না দেবী? —এই গাছটা খুব উঁচু, এর উপরে আপনি উঠতে পারেন? অমলেন্দু বিস্মিত কণ্ঠে বললে, কেন? —এর উপরে উঠলে অনেক দূর পর্যন্ত দেখতে পাওয়া যাবে। হয়তো জলের উপরে কোনো নৌকা কি ওপারের কোনো গায়ের চিহ্ন আপনার নজরে পড়তে পারে। দেখাই যাক না, যদি আমরা বাইরের কারুর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারি। অমলেন্দু একটু ভেবে বললে, আপনার এ প্রস্তাব মন্দ নয়। আচ্ছা, আপনি নীচে দাঁড়ান, আমি গাছের উপরে উঠে দেখি কোথাও কিছু দেখতে পাওয়া যায় কি না? অমলেন্দু পায়ের জুতো জোড়া খুলে ফেললে। তারপর দু-হাতে গাছের গুড়ি জড়িয়ে উপর দিকে উঠতে লাগল। এবং উঠতে উঠতে অনুভব করলে, তার পকেটের ভিতরে ফস করে হাত চালিয়ে রিভলভারটা কে টেনে কারে নিলে। —স্বপ্না দেবী, স্বপ্না দেবী! স্বপ্না খিলখিল করে হেসে উঠে বললে, এইবারে আমি নিজেকে নিরাপদ বলে মনে করতে পারব! অমলেন্দু লাফিয়ে পড়ল ভূমিতলের উপরে। ক্রুদ্ধকণ্ঠে বললে, স্বপ্না দেবী, এরকম কৌতুক আমি পছন্দ করি না। আমার রিভলভার এখনই ফিরিয়ে দিন। স্বপ্ন দৃঢ়কণ্ঠে বললে, এ রিভলভার এখন আমার কাছেই থাকবে। আমি আপনাকে হত্যা করব না, সে বিষয়ে আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। অমলেন্দু তার দিকে এগিয়ে গেল, স্বপ্নাও গেল পিছিয়ে। বললে, কিছুতেই এ রিভলভার আপনাকে আমি ফিরিয়ে দেব না। আপনি আরও এগিয়ে এলে নিজেই বিপদে পড়বেন। অমলেন্দুর মুখ তখন আরক্ত হয়ে উঠেছে প্রচণ্ড ক্রোধে। আত্মহারার মতন গর্জন করে সে বললে, স্বপ্না ফিরিয়ে দাও আমার রিভলভার! —কখনো না, কখনো না। ওইখানে দাঁড়িয়ে থাকুন। নারী হলেই কেউ অবলা হয় না। চরম বিপদের সময় ভেড়াও ফিরে রুখে দাঁড়ায়। আপনি আর এক পা এগুলেই আমি রিভলভার ছুড়তে বাধ্য হব। অমলেন্দু স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল, কিন্তু তার মুখ-চোখ উদ্রান্তের মতো। ডান হাতে রিভলভার তুলে স্বপ্নাও নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল—তার মুখে-চোখে দৃঢ় প্রতিজ্ঞার ভাব। আচম্বিতে অমলেন্দু বন্য জীবের মতো সামনের দিকে লম্ফত্যাগ করলে এবং সঙ্গে সঙ্গে গর্জন করে উঠল স্বপ্নার হাতের রিভলভার। তীব্র এক আর্তনাদ করে অমলেন্দু মাটির উপরে লুটিয়ে পড়ল। দু-এক বার ছটফট করেই তার দেহ হয়ে গেল একেবারে নিম্পন্দ। স্বপ্না হা হা করে অট্টহাসি হেসে উঠল, তারপর দ্রুতপদে ছুটতে লাগল বাড়ির দিকে। চত্বর পেরিয়ে বাড়ির ভিতরে ঢুকে সিঁড়ি বেয়ে সে উঠে গেল দোতলায়, তারপর নিজের ঘরে ঢুকে ধপাস করে একখানা চেয়ারে বসে পড়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বললে, আর কোনো ভয় নেই, আর কোনো ভয় নেই! দ্বীপে এখন আমি একলা! হ্যাঁ, নয়টা মৃতদেহের মাঝখানে একলা বেঁচে আছি খালি আমি! আমার হাতে আছে রিভলভার—এখন আমি আর কারুকেই ভয় করি না! সাক্ষাৎ মৃত্যুও যদি আমার সামনে আসে, তাকে দেখেও আমি রিভলভার ছুড়তে ইতস্তত করব না! হা হা হা হা, আমি একলা—আমি একলা? আচমকা পিছনে শোনা গেল যেন কার পদশব্দ। স্বপ্না ফিরে দেখবারও অবসর পেলে না, হঠাৎ সবলে কে চেপে ধরলে তার কণ্ঠদেশ! তার হাত থেকে রিভলভারটা খসে মেঝের উপরে পড়ে গেল সশব্দে এবং ক্রমে ক্রমে তার চোখের সামনে পৃথিবী হয়ে এল অন্ধকার৷


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৯২ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now