বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
"
তারা চন্দ্রবাবুর দেহকে তুলে নিয়ে তার ঘরের ভিতরে গিয়ে রেখে এল।
বৈঠকখানায় ফিরে এসে মহেন্দ্র সোজা গিয়ে দাঁড়াল সেই টেবিলের সামনে, যার উপরে আগে ছিল দশটা হারাধনের ছেলের মূর্তি, কিন্তু এখন তাদের সংখ্যা হচ্ছে মাত্র চার।
মহেন্দ্র গম্ভীর স্বরে বললে, আমরা হচ্ছি গুনতিতে চার জন মানুষ, আর আমাদের সামনেও রয়েছে চারটে পুতুল। চার জন মানুষ আর চারটে পুতুল। একটা করে মানুষ মরবে আর একটা করে পুতুল অদৃশ্য হবে। কিন্তু শেষ পুতুলটা নিশ্চয়ই অদৃশ্য হবে না। আমাদের মধ্যে যে হত্যাকারী, শেষ পুতুলটা ভেঙে ফেলে নিশ্চয়ই সে আত্মহত্যা করবে না। অতএব—
ডাক্তার বললেন, অতএব?
মহেন্দ্র বললে, অতএব শেষ পুতুলটা নয় জন লোকের মৃত্যুর পরও ওই টেবিলের উপরেই দাঁড়িয়ে থাকবে। কিন্তু তখন যে তার দিকে তাকিয়ে থাকবে, সে ব্যক্তির নাম কী?
সবাই সচমকে দৃষ্টিপাত করলে পরস্পরের মুখের দিকে। সে দৃষ্টিতে ছিল না কেবল বিভীষিকার ভাব, ছিল বিষম এক বিরাগভরা সন্দেহ।
আমরা সকলেই তখন এই বাড়িতেই উপস্থিত ছিলুম। কিন্তু আমরা কেউ শুনতে পাইনি রিভলভারের শব্দ। এর কারণ কী?
অমলেন্দু বললে, এর কারণ হচ্ছে ঝড়ের আর সমুদ্রের গর্জন। মাঝে মাঝে বাজও ডাকছিল। এত গোলমালের ভিতরে ডুবে গিয়েছিল সেই রিভলভারের শব্দ ।
সে রাত্রে তারা সকাল সকালই শয়নগৃহের দিকে অগ্রসর হল। মহেন্দ্র বললে, আজ রাত্রে নিশ্চয়ই আমাদের কারুরই ঘুম হবে না। জেগে থাকবে হত্যাকারী, আর একটা শিকারের সন্ধানে। আর জেগে থাকবে বাকি তিন জনও দারুণ আতঙ্কে। হত্যাকারী এখন সশস্ত্র, রিভলভার’ এখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি।
প্রত্যেকেই নিজের নিজের ঘরে গিয়ে ঢুকল এবং সশব্দে দরজা করলে অগলবদ্ধ! চার জন আতঙ্কগ্রস্ত মানুষ, প্রত্যেকেই যে-কোনোরকমে আত্মরক্ষা করবার জন্যে প্রস্তুত।
অমলেন্দু ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আয়নাতে নিজের মুখ দেখে মনে মনেই বললে—অমলেন্দু, তোমার মুখের ভাব অস্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। সাবধান, শেষটা তুমিও যেন পাগল হয়ে যেয়ো না।
হঠাৎ অকারণেই টেবিলের একটা দেরাজ টেনে তার ভিতরে সে করলে দৃষ্টিনিক্ষেপ।
দেরাজের ভিতরে আবার ফিরে এসেছে তার রিভলভারটা। সে দাঁড়িয়ে রইল স্তম্ভিত ভাবে।
প্রাক্তন গোয়েন্দা মহেন্দ্র এগিয়ে গিয়ে বসল বিছানার একপাশে। তার চক্ষের ভাব হিংস্র, কোনো শিকারি জন্তুর মতো সে যেন যে-কোনো শিকারের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়বার জন্যে প্রস্তুত হয়ে আছে। বিছানায় শয়ন করবার জন্যে তার একটুও ইচ্ছা হল না। বিপদ এখন খুব কাছেই ঘনিয়ে এসেছে—দশ জনের মধ্যে বাকি আছে মাত্র চার জন। অতি শীঘ্রই নিশ্চয় আর-একজনকেও বিদায় নিতে হবে। কিন্তু এবারে যে তার পালা নয়, সে বিষয়ে তার কোনোই সন্দেহ নেই।
হঠাৎ সে উৎকর্ণ হয়ে দাঁড়িয়ে উঠল।
বাইরে তার দরজার সামনেই জাগল কার পদশব্দ। পা টিপে টিপে কেউ চলছে বটে, কিন্তু মহেন্দ্রর সতর্ক কর্ণকে সে ফাঁকি দিতে পারেনি।
তাড়াতাড়ি সে ছুটে গিয়ে দরজার উপরে কান পেতে শুনতে লাগল। হ্যাঁ, নিশ্চয়ই কারুর পদশব্দ। সিঁড়ির উপর দিয়ে শব্দটা নেমে যাচ্ছে নীচের দিকে। মহেন্দ্র হঠাৎ দরজাটা খুলে ফেলে বাঘের মতো লাফিয়ে বাইরে গিয়ে পড়ল। কিন্তু কোথাও কারুকেই দেখতে পেলে না, একটা ছায়া পর্যন্ত না। সে সর্বাগ্রে ছুটে গেল স্বপ্নার ঘরের দিকে। দরজার উপরে সজোরে করাঘাত করতেই ভিতর থেকে স্বপ্না সভয়ে বলে উঠল, কে, কে, কে?
স্বপ্না তাহলে বাইরে বেরিয়ে আসেনি! তারপর সে গেল ডাক্তারের ঘরের দিকে। সে ঘরে দরজা ছিল ভেজানো, ধাক্কা দিতেই খুলে গেল। ঘরের ভিতরে কেউ নেই। ডাক্তারের শয্যা শূন্য।
সে চেঁচিয়ে ডাকলে, ডাক্তার বোস, ডাক্তার বোস!
মহেন্দ্র দৌড়ে গেল অমলেন্দুর ঘরের দিকে। দরজায় করাঘাত করতেই ভিতর থেকে অমলেন্দু দিলে সাড়া।
মহেন্দ্র চিৎকার করে ডাকলে, অমলেন্দুবাবু, অমলেন্দুবাবু! শীঘ্র বাইরে বেরিয়ে আসুন।
মিনিটখানেক পরেই খুলে গেল ঘরের দরজা। অত্যন্ত সন্তপর্ণে বাইরে বেরিয়ে এল অমলেন্দু। তার ডান হাতটা আছে পকেটের ভিতরে। সে উগ্রকণ্ঠে বললে, রাত দুপুরে এ-সব কী কাণ্ড? ততক্ষণে স্বপ্নাও বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে। মহেন্দ্র বললে, আমি বাইরে শুনতে পেয়েছি কার পায়ের শব্দ। বেরিয়ে এসে দেখি ডাক্তারের ঘরের দরজা খোলা আর ডাক্তার নেই ঘরের ভিতরে!
অমলেন্দু বললে, বটে, বটে, তাই নাকি? এই নিশুতি রাতে, এই ভয়াবহ বাড়িতে ডাক্তার নেই তার ঘরে? তাহলে সেই কি যত নষ্টের গোড়া?
মহেন্দ্র বললে, এখন আমাদের ওই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।
অমলেন্দু বললে, স্বপ্না দেবী, আপনি আবার নিজের ঘরের ভিতরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিন। এরপর আমরা দুজনেই যদি একসঙ্গে এসে আপনাকে ডাকি, তবেই আপনি দরজা খুলে দেবেন। আর কেউ ডাকলে দরজা খুলবেন না। বুঝেছেন?
স্বপ্না বললে, বুঝেছি! আমি নারী বটে, কিন্তু নির্বোধ নই। সে আবার চলে গেল তার ঘরের দিকে।
মহেন্দ্র বললে, কিন্তু ডাক্তারকে খুঁজতে হবে অত্যন্ত সাবধানে। ভুলে যাবেন না, তার হাতে আছে একটা গুলিভরা রিভলভার।
নীরস হাস্য করে অমলেন্দু বললে, ভুল মহেন্দ্রবাবু, ভুল! রিভলভারটা এখন আছে আমার পকেটেই! এই দেখুন! সে পকেটের ভিতর থেকে বার করে দেখালে রিভলভারের অর্ধেকটা।
মহেন্দ্রর মুখ রক্তহীন হয়ে গেল এক মুহুর্তে, সে আঁতকে উঠে দুই পা পিছিয়ে গিয়ে দাঁড়াল।
অমলেন্দু হা হা করে হেসে উঠে বললেন, মহেন্দ্রবাবু, নির্বোধের মতন ব্যবহার করবেন না। আমি যদি গুলি করে আপনাকে মারতে চাইতুম তাহলে রিভলভারের কথা আপনার কাছে প্রকাশ করতুম না। এখন চলুন, ডাক্তার কোথায় লুকিয়ে আছে, খুঁজে দেখা যাক।
আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেছে অভাবিতভাবে। দমকা হাওয়া এখনও থেকে থেকে কেঁদে উঠছে বটে, কিন্তু নির্মেঘ আকাশে দেখা দিয়েছে চাদের জ্যোতির্ময় মুখ। চারিদিকে জ্যোৎস্নার দুগ্ধধবল স্বচ্ছ প্রলেপ। সমুদ্রের তরঙ্গে তরঙ্গে ঝলকে ঝলকে উঠছে লক্ষ লক্ষ হীরার কণা।
কিন্তু মহেন্দ্র ও অমলেন্দুর সমস্ত অন্বেষণই ব্যর্থ হল। কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না ডাক্তারকে ।
প্রায় শেষ রাত্রি। ঘুম নেই স্বপ্নার চোখে। বিছানার উপরে চুপ করে সে বসে আছে অত্যন্ত ছন্নছাড়ার মতো।
হঠাৎ ঘরের দরজায় হল দুমদুম করে করাঘাত। স্বপ্না চমকে বলে উঠল, কে, কে?
একসঙ্গে মহেন্দ্র ও অমলেন্দুর কণ্ঠে শোনা গেল, আমরা, দরজা খুলে দিন। দরজা খুলে দিতেই তারা দুজনে ঘরের ভিতরে এসে ঢুকল।
অমলেন্দু বললে, স্বপ্না দেবী, কোনো নতুন খবর আছে?
—না, কিন্তু আপনাদের খবর কী?
—ডাক্তার অদৃশ্য হয়েছে।
স্বপ্না চিৎকার করে বলে উঠল, কী?
—ডাক্তার এই দ্বীপের ভিতরে কোথাও নেই।
স্বপ্না অবিশ্বাসের স্বরে বললে, হতেই পারে না। নিশ্চয় সে কোথাও লুকিয়ে আছে! কখন হঠাৎ এসে আমাদের কারুকে আক্রমণ করবে।
মহেন্দ্র বললে, ঝড় নেই, মেঘ নেই, বৃষ্টি নেই। চারিদিকে ফুটফুটে চাঁদের আলো। আমরা ঈগলপাখির মতো তীক্ষ্ণ চোখে সারা দ্বীপটা তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখেছি। তবু ডাক্তারের কোনোই পাত্তা পাওয়া গেল না। সে অদৃশ্য হয়েছে— হাওয়া হয়ে যেন মিশিয়ে গিয়েছে হাওয়ার ভিতরে!
বৈঠকখানার টেবিলের উপরে দাড়িয়ে আছে এখন মাত্র তিনটে মাটির পুতুল।
(চলবে)
----------
।। একাকী কন্যা ।।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now