বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
"
—আমাদের মধ্যে একজন, আমাদের মধ্যে একজন, আমাদের মধ্যে একজন? প্রত্যেকেরই মস্তিষ্কের মধ্যে এই তিনটি শব্দই বারংবার ধ্বনিত ও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
পাঁচ জন লোক—পাঁচ জন আতঙ্কগ্রস্ত লোক! পাঁচ জনের প্রত্যেকেই অত্যন্ত সতর্ক হয়ে লক্ষ করছে পরস্পরের প্রত্যেকটি ভাবভঙ্গি। তাদের মনের বিষম সন্দেহ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তাদের মুখে-চোখে, তা গোপন করার চেষ্টাও কেউ করছে না।
পাঁচ জন লোক—প্রত্যেকেই পরস্পরের শত্রু! কেবল কোনো রকমে আত্মরক্ষা করবার জন্যেই পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস হারিয়েও তারা পরস্পরের সঙ্গে বাস করছে এক জায়গায়।
সেদিন রান্নাবান্নার কথা কারুরই মনে জাগল না। ভাড়ার ঘরে কয়েকরকম বিস্কুটের টিন এবং এয়ার টাইট’ টিনের পাত্রে বিলাতি ফল ও দেশি রসগোল্লা ছিল। তাই খেয়েই সকলে নির্বাপিত করলে জঠরাগ্নি।
ডাক্তার বোস বললেন, এই ভয়াবহ বাড়ির ভিতরে এমন করে বন্দি হয়ে থাকতে আর ইচ্ছে করছে না।
মহেন্দ্র বললে, কিন্তু বাইরে যাবারও কোনো উপায় নেই। তাকিয়ে দেখুন।
হ্যাঁ, বাইরে আবার নেমেছে ঝরঝরে বৃষ্টি-ধারা এবং আবার প্রবল হয়ে উঠেছে প্রচণ্ড ঝোড়ো-হাওয়া! উচ্চতর হয়ে আবার ভেসে আসছে সমুদ্রের উচ্ছসিত কোলাহল।
ডাক্তার বললেন, চলুন আমরা দোতলার হলঘরে বসিগে যাই। নীচেটা আর আমার ভালো লাগছে না। সত্যবালা ছাড়া আর সকলেরই মৃত্যু হয়েছে একতলাতেই।
মহেন্দ্র, অমলেন্দু ও স্বপ্নাও এই প্রস্তাবে সায় দিলে। তারা একসঙ্গে উপরে উঠে গেল।
দোতলার হলঘর থেকে আরও ভালো করে দেখা যেতে লাগল দ্বীপের প্রাকৃতিক দৃশ্য।
সারা আকাশ ভরে জমে উঠেছে মেঘের পর মেঘের অশ্রান্ত মিছিল। মাঝে মাঝে লক লক করে জুলে উঠছে বিদ্যুতের অগ্নিসপ। ধারাপাত-ধ্বনিতে চারিদিক পরিপূর্ণ। অরণ্যের বড়ো বড়ো গাছগুলো আর্তনাদ করে হেলে হেলে পড়ছে উন্মত্ত ঝড়ের ধাক্কার পর ধাক্কায়। সমুদ্রকে দেখাচ্ছে এক ক্রুদ্ধ ও অনন্ত জলদানবের মতো, উদাম বেগে উৎকট স্বরে চিৎকার করতে করতে অগণ্য তরঙ্গবাহু তুলে রংবার সে দ্বীপের উপরে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ছে আর ফিরে যাচ্ছে—ঝাঁপিয়ে পড়ছে আর ফিরে যাচ্ছে।
কারুর মুখেই একটি কথা নেই। কিন্তু ওই বিশাল সমুদ্রের মতোই যে তাদের বুকের ভিতরটা তোলপাড় করছিল, এটা বোঝা যায় তাদের বিভ্রান্ত মুখের উপরে দৃষ্টিপাত করলেই।
স্বপ্নার দেহের ভিতরটা কেমন শীত শীত করতে লাগল, একটা কোনো গরম গাত্রবস্ত্র আনবার জন্যে উঠে দাঁড়িয়ে এদিকে-ওদিকে তাকিয়ে বললে, চন্দ্রবাবু কোথায়? তিনি তো এখানে নেই! আমি ভেবেছিলুম তিনিও আমাদের সঙ্গে সঙ্গে উপরে এসেছেন।
ডাক্তার বললেন, না, তিনি বৈঠকখানাতেই বসে আছেন।
প্রত্যেকেই আবার প্রত্যেকের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলে ত্ৰস্ত দৃষ্টিতে।
অমলেন্দু বললেন, এই বিপজ্জনক বাড়িতে তিনি বুড়োমানুষ একলা বসে আছেন!
মহেন্দ্র তৎক্ষণাৎ একলাফে উঠে দাঁড়িয়ে বললে, ভালো কথা নয়, এ ভালো কথা নয়! চলুন, আমরা সকলে গিয়ে তাকে উপরে ডেকে আনি।
সকলে একসঙ্গে আবার নেমে গেল একতলায়। সর্বাগ্রে যাচ্ছিলেন ডাক্তার বোস। বৈঠকখানার দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ভিতরের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ তিনি যেন আড়ষ্ট হয়ে গেলেন! বাকি তিন জনে তার দেহের এপাশ-ওপাশ থেকে দৃষ্টিপাত করলে বৈঠকখানার ভিতর দিকে।
দেখা গেল, একখানা সোফার উপরে চন্দ্রবাবু চুপ করে বসে আছেন। কিন্তু তার গায়ে জড়ানো আছে একখানা টকটকে লাল রঙের গাত্রাবরন এবং তার মাথায় আছে পরচুলা–হাইকোর্টের বিচার-কক্ষে জজের যে-রকম পরচুলা মাথায় পরে থাকেন।
এই একান্ত অভাবিত ও অস্বাভাবিক দৃশ্য দেখে সকলেরই বুক ছাঁৎ ছাঁৎ করে উঠল।
ডাক্তার বোস মাতালের মতন টলতে টলতে অগ্রসর হয়ে চন্দ্রবাবুর সেই স্থির মূর্তির পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। একবার তার মুখের দিকে তীক্ষ-দৃষ্টিপাত করেই তিনি শীঘ্র হস্তে তাঁর পরচুলা ধরে একটা টানা মারলেন। পরচুলাটা ঘরের মেঝের উপরে পড়ে গেল; দেখা গেল, চন্দ্রবাবুর মাথার সামনেকার কেশহীন অংশটা। ঠিক সেইখানেই রয়েছে একটা রক্তাক্ত ছিদ্র!
মহেন্দ্র বলে উঠল, রিভলভার! সেই রিভলভারটা আমরা খুঁজে পাচ্ছি না।
জীবনহীন স্বরে ডাক্তার বোস বললেন, রিভলভার দিয়ে কেউ গুলি ছুড়েছে— চন্দ্রবাবুর মৃত্যু হয়েছে মুহুর্তের মধ্যেই।
স্বপ্না হেট হয়ে পড়ে মাটির উপর থেকে পরচুলাটা তুলে নিলে। তারপর সভয়ে বলে উঠল, এ যে দেখছি পশমে তৈরি! কালকেই সৌদামিনী দেবী বলেছিলেন, তার এক বান্ডিল পশম তিনি আর খুঁজে পাচ্ছেন না!
মহেন্দ্র বললে, চন্দ্রবাবু ওই লাল রঙের গায়ের কাপড়! ওটা হচ্ছে সেই স্নানঘরের হারিয়ে যাওয়া পর্দা ছাড়া আর কিছুই নয়।
স্বপ্না ভয়ার্ত অস্ফুট কণ্ঠে বললে, এই বীভৎস দৃশ্য দেখাবার জন্যেই কি হত্যাকারী ওই পর্দা আর পশমের বান্ডিল চুরি করেছে?
আচম্বিতে অমলেন্দু হা হা করে অট্টহাস্য করে বলে উঠল, এইখানেই হল কঠোর নির্দয় বিচারপতি চন্দ্রকান্ত চৌধুরির জীবন-নাট্যের বিয়োগান্ত সমাপ্তি। বিচারগুহে বসে জজের পরচুলা মাথায় পরে তিনি আর কারুর উপরেই প্রাণদণ্ড দিতে পারবেন না, কারণ আজই তিনি কোনো অজ্ঞাত হত্যাকারীর আদেশে নিজেই লাভ করেছেন প্রাণদণ্ড!
(চলবে)
---------
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now