বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
"
স্বপ্না জিজ্ঞাসা করলে, আপনি কি একথা বিশ্বাস করেন?
অমলেন্দু ও স্বপ্না জানলার ধারে বসেছিল একখানা কৌচের উপরে। জানলার শার্সি বন্ধ। বাইরে অশ্রান্তভাবে ঝরছিল বৃষ্টিধারা। ঝোড়ো হাওয়া উন্মত্তের মতো গর্জন করতে করতে আছড়ে পড়ে জানলার শাসির উপরে মারছিল ধাক্কার পর ধাক্কা। দূরে দেখা যাচ্ছিল উত্তাল সমুদ্র-তরঙ্গের উত্তেজিত নৃত্য।
অমলেন্দু বললে, সমস্তই হচ্ছে অসম্ভব কাণ্ড! মেজর সেনের শোচনীয় মৃত্যুর পর একটা বিষয়ে নেই কোনোই সন্দেহ। দৈব-ঘটনা বা আত্মহত্যা, এসব হচ্ছে বাজে কথা। খুন, খুন! এখানে তিন-তিনটে লোককে নিশ্চয়ই খুন করা হয়েছে।
স্বপ্না শিউরে উঠে বললে, ওঃ এ হচ্ছে ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন!
অমলেন্দু গম্ভীর কণ্ঠে বললে, হ্যাঁ। আমরা সকলেই বাস করছি দুঃস্বপ্নের রাজ্যে। এর পরে অত্যন্ত সাবধান হয়ে আমাদের এখানে থাকতে হবে।
স্বপ্না তার কণ্ঠস্বর আরও নামিয়ে বললে, ওদের মধ্যে হত্যাকারী কে, আপনি কি তা অনুমান করতে পারেন?
অমলেন্দুর ওষ্ঠাধরে ফুটল মৃদু হাস্য। সে বললে, ওদের মধ্যে? দেখছি ওদের দল থেকে আপনি আমাদের দুজনকেই বাদ দিতে চান। অবশ্য, সেটা মন্দ কথা নয়। নিশ্চিতরূপেই বলতে পারি আমি নই হত্যাকারী। আর মানুষ খুন করবার মতো পাগলামি যে আপনার ভিতরেও আছে, একথাও আমি মনে করি না?
স্বপ্না হাসতে হাসতে বললে, আপনাকে ধন্যবাদ।
অমলেন্দু বললে, ঠিক ওই কারণেই আপনিও কি আমাকে ধন্যবাদ দিতে পারেন না?
স্বপ্না একটু ইতস্তত করে বললে, আপনার মুখেই আমরা শুনেছি যে, সমস্যায় পড়লে আপনি একুশ জন মানুষের মৃত্যুর জন্যেও দায়ী হতে পারেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও গ্রামোফোন রেকর্ডে যে ব্যক্তি আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে, আপনাকে সেরকম লোক বলে আমার বিশ্বাস হয় না।
অমলেন্দু বললে, যথার্থ কথা। ধরুন, এক জন কি দুই জন লোককে আমি হয়তো হত্যা করতে পারি। কিন্তু তারও একটা উদ্দেশ্য থাকা চাই। কেন আমি একটা কি দুটো নরহত্যা করব? নিশ্চয়ই কোনো লাভের লোভে। কিন্তু বর্তমান ক্ষেত্রে আমার বা আপনার কোনোই লাভের আশা নেই। সুতরাং ধরে নেওয়া যাক, আপনি বা আমি এইসব খুনের জন্যে মোটেই দায়ী নই। তাহলে বাকি রইল আর পাঁচ জন মাত্র লোক। তাদের মধ্যে হত্যাকারী কে? আমি যদি চন্দ্রবাবুকে সন্দেহ করি, তাহলে আপনি কি অত্যন্তই অবাক হবেন?
স্বপ্না সবিস্ময়ে বলে উঠল, চন্দ্রবাবুকে সন্দেহ! কেন?
—কেন, তা ঠিক বলতে পারি না। তবে ভেবে দেখুন, তিনি হচ্ছেন এক বৃদ্ধ ব্যক্তি, আর বৎসরের পর বৎসর ধরে সর্বশক্তিমান বিচারকের ভূমিকায় অভিনয় করে আসছেন। নিজেকে মনে করেছেন দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। তার একটিমাত্র ইঙ্গিতেই যে-কোনো মানুষ ত্যাগ করতে পারে অস্তিম নিশ্বাস। বিচারকের আসন ছেড়ে আজ তিনি নেমে এসেছেন বটে, কিন্তু নিজের শক্তির দম্ভ আজও ভুলতে পারেননি, কোনো মানুষকে আর প্রাণদণ্ড দেবার সুযোগ না পেয়েই হয়তো আজ তিনি পাগল হয়ে গেছেন!
স্বপ্না আস্তে আস্তে বললে, হয়তো সেটা অসম্ভব নয়।
অমলেন্দু বললে, আপনি কাকে সন্দেহ করেন?
—ডাক্তার বোসকে।
—ডাক্তারকে কেন?
—প্রথম দুই মৃত্যুর কারণ হচ্ছে, বিষ। বিষ নিয়ে নাড়াচাড়া করতে হয় ডাক্তারদেরই। এটাও মনে রাখবেন, ডাক্তার বোস ঘুমোবার ওষুধ বলে সত্যবালাকে কী একটা পান করতে দিয়েছিলেন।
—হ্যাঁ, সে কথা সত্য।
—তারপর ডাক্তার যখন মেজর সেনকে ডাকতে যাবার নাম করে বেরিয়ে গিয়েছিলেন, তখন তার সঙ্গে কেউ ছিল না।
—হয়তো আপনার এ অনুমান যুক্তিহীন নয়।
ডাক্তার বোস অধীর কণ্ঠে বললেন, আমাদের এখান থেকে বেরিয়ে পড়তেই হবে—যেমন করে হোক বেরিয়ে পড়তেই হবে।
চন্দ্রবাবু জানলার শার্সির ভিতর দিয়ে মেঘাচ্ছন্ন আকাশ ও বৃষ্টিস্নাত অরণ্যের দিকে তাকিয়ে চিন্তিতমুখে বললেন, আবহাওয়া সম্বন্ধে আমার বিশেষ জ্ঞান নেই, তবে আমার মনে হচ্ছে এই জল-ঝড় সম্ভবত আরও চব্বিশ ঘণ্টার ভিতরে থামবে না। এমন দুর্যোগে কোনো নৌকেই এই দ্বীপের কাছে আসতে পারবে না।
ডাক্তার প্রায় আর্তস্বরে বললেন, আর ইতিমধ্যে আমাদের সকলকেই একে একে প্রাণ দিতে হবে?
চন্দ্রবাবু বললেন, প্রাণ যে দিতেই হবে তার কোনো স্থিরতা নেই। যে কোনো বিপদকে এড়াবার জন্যে আমি যথেষ্ট সাবধানতা অবলম্বন করেছি।
ডাক্তার বললেন, কিন্তু মনে রাখবেন, এর মধ্যেই তিন জন হতভাগ্যকে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হয়েছে।
—হ্যাঁ, আমি তা ভুলিনি। কিন্তু তারা কোনো বিপদের জন্য প্রস্তুত ছিল না। আমরা আগে থাকতেই সাবধান হয়ে আছি।
ডাক্তার অসহায়ভাবে বললেন, কিন্তু কী আমরা করতে পারি? আজই হোক আর কালই হোক— বলতে বলতে তিনি থেমে গেলেন। তারপর আবার বললেন, এসব যে কোন পাষণ্ডের কীর্তি, সেকথা পর্যন্ত আমরা জানি না।
—জানি না নাকি?
—আপনি কি কারুকে সন্দেহ করেছেন?
—অবশ্য আমার হাতে আসল প্রমাণ বলে কিছুই নেই। কিন্তু সমস্ত ব্যাপারটা তলিয়ে বুঝে একটা সিদ্ধান্তে আমি উপস্থিত হয়েছি। একজনের কথা আমার বারবার মনে পড়ছে।
ডাক্তার হতভম্বের মতো তার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনি কার কথা বলছেন?
কিন্তু চন্দ্রবাবু কোনো জবাব দেবার আগেই ঘরের ভিতরে প্রবেশ করলে অমলেন্দু ও মহেন্দ্র। এবং তারা আসন গ্রহণ করবার পরেই ঘরের ভিতরে হস্তদন্তের মতো এসে দাঁড়াল নিত্যানন্দ।
সে বাঁধো বাঁধো গলায় বললে, আপনারা কিছু মনে করবেন না, কিন্তু কেউ কি বলতে পারেন, স্নানঘরের দরজার পর্দাখানা কোথায় গেল?
অমলেন্দু বললে, স্নানঘরের দরজার পর্দা? তুমি কী বলতে চাও?
—পর্দাখানা আর খুঁজে পাচ্ছি না।
চন্দ্রবাবু বললেন, আজ সকালে সেখানা কি যথাস্থানেই ছিল?
—আজ্ঞে হ্যাঁ।
মহেন্দ্র বললেন, কী রকম পর্দা?
—স্নানঘরের দেওয়াল আর মেজের রং লাল। তার সঙ্গে মিলিয়ে দরজায় ঝোলানো ছিল একখানা লাল রঙের পর্দা।
অমলেন্দু বললে, ‘পর্দাখানা তুমি আর খুঁজে পাচ্ছ না?
—আজ্ঞে না?
মহেন্দ্র শুকনো হাসি হেসে বললে, পর্দাখানা তাহলে আপনা আপনিই অদৃশ্য হয়েছে? কথাটা পাগলের মতন শোনাচ্ছে বটে, কিন্তু এ হচ্ছে পাগলেরই বাড়ি। পর্দাখানা নেই বলে কোনো দরকার নেই আর মাথা ঘামাবার। তার কথা ভুলে যাও। একখানা লাল রঙের পর্দা দিয়ে কেউ কারুকে খুন করতে পারে না।
আর কিছু না বলে নিত্যানন্দ ধীরে ধীরে ঘরের ভিতর থেকে বেরিয়ে গেল। ঘরের ভিতরে বসে প্রত্যেকেই তাকাতে লাগল প্রত্যেকের মুখের দিকে সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে।
রাত্রে সবাই মৌনমুখে আহার করতে বসল। বাইরের অন্ধকার থেকে ভেসে আসছে মেঘের আর ঝড়ের গজন। ঘরের ভিতরে জ্বলছে বটে পেট্রলের সমুজ্জ্বল আলো, কিন্তু তবু চারিদিকে যেন ঘনিয়ে আছে একটা থমথমে ভয় ভয় ভাব!
অমলেন্দু হঠাৎ স্তব্ধতা ভঙ্গ করে বললে, উপরে তিনটে ঘরে রয়েছে তিনটে মৃতদেহ সৎকারের কোনো ব্যবস্থাই হল না।
চন্দ্রবাবু বললেন, এই দুর্যোগে সৎকারের কোনো ব্যবস্থাই হতে পারে না। উপরন্তু যতক্ষণ আমরা বাইরের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন না করতে পারি ততক্ষণই ওই দেহগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করা যুক্তিসঙ্গত নয়। আগে পুলিশে খবর দিতে হবে তারপর অন্য কথা?
সৌদামিনীর সঙ্গে স্বপ্নাও চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ে বললে, রাত বাড়ছে, আমরা এখন ঘুমোতে যাই।
মহেন্দ্র বললে, কিন্তু ঘুমানোর আগে কেউ যেন ঘরের দরজা বন্ধ করতে ভুলবেন না।
চন্দ্রবাবুও উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, আমাদেরও ঘুমোবার সময় হয়েছে। চলুন সবাই, আশা করি কাল সকালেই সুপ্রভাত’ বলে পরস্পরকে সম্বোধন করতে পারব।
সকলের শেষে গাত্রোত্থান করে মহেন্দ্র সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলে। একবার ঘরের চারিদিকে বুলিয়ে নিলে তার অতি সতর্ক দৃষ্টি। তারপর নিজের মনে বিড়বিড় করে বললে, আজ আর কেউ বোধ হয় হারাধনের ছেলেদের নিয়ে টানাটানি করবে না।
(ক্রমশ)
(
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now