বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

হারাধনের দ্বীপ" হেমেন্দ্রকুমার রায় - ▪▪▪নবম পরিচ্ছেদ▪▪▪

"রহস্য" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X " সারা বাড়িখানা তারা পাতিপাতি করে খুঁজতে বাকি রাখলে না, কিন্তু কোথাও কোনো অচেনা মানুষ তো দূরের কথা, একটা কুকুর-বিড়ালেরও সাড়া পাওয়া গেল না । অমলেন্দু ধীরে ধীরে মাথা নাড়তে নাড়তে বললে, তাহলে আমাদেরই ধারণা ভ্রান্ত দেখছি। এখানে উপর উপরি দুটো আকস্মিক মৃত্যু হয়েছে বলে আমরা যতসব আজব কল্পনা আর কুসংস্কারের দুঃস্বপ্ন নিয়ে ভেবে সারা হচ্ছি। ডাক্তার বোস গম্ভীর স্বরে বললেন, কিন্তু আমাদের এই ভয় যুক্তিসঙ্গত। আমি হচ্ছি ডাক্তার, অনেক আত্মঘাতীকে আমি দেখেছি। মনোতোষবাবুর চেহারা আর প্রকৃতি আত্মঘাতীদের মতো ছিল না। অমলেন্দু সন্দেহজড়িত কণ্ঠে বললে, সেটা দৈব-দুর্ঘটনাও তো হতে পারে। মহেন্দ্র সে-কথা আমলে না এনে বলে উঠল, আরে রাখুন মশাই আপনার দৈব-দুর্ঘটনা! তাহলে সত্যবালার মৃত্যুও তো একটা দৈবদুর্ঘটনা হতে পারে? অমলেন্দু বললে, কেমন করে, শুনি? মহেন্দ্র কেমন যেন কিন্তু কিন্তু করতে লাগল। একটু চুপ করে থেকে সে হঠাৎ বললে, ডাক্তার, সত্যবালাকে আপনি একটা ঘুমোবার ওষুধ দিয়েছিলেন না? ডাক্তার বোস তার দিকে তীক্ষ দৃষ্টিপাত করে বললেন, হ্যাঁ, দিয়েছিলুম বটে। —ওষুধটা কী? —আমি তাকে এক মাত্রা Trional দিয়েছিলুম। অত্যন্ত নির্দোষ জিনিস। মহেন্দ্র বললে, কিন্তু মাত্রাটা একটু অতিরিক্ত হয়ে যায়নি তো? ডাক্তার ক্রুদ্ধকণ্ঠে বললেন, আপনি কী বলতে চান আমি বুঝতে পারছি না। —আমি বলতে চাই যে, ভুল করে মাত্রা আপনি খানিকটা বাড়িয়ে ফেলেছিলেন। এমন ব্যাপারও তো মাঝে মাঝে হয়? ডাক্তার তীক্ষ্ণস্বরে বললেন, আমি কিছুমাত্র ভুল করিনি। আপনার ইঙ্গিত হচ্ছে হাস্যকর। বলেই একটু থেমে তিনি আবার কণ্ঠস্বরকে রীতিমতো কর্কশ করে তুলে বললেন, আপনি কি বলতে চান যে সত্যবালাকে আমি ইচ্ছা করেই বেশি মাত্রায় ওষুধ দিয়েছি? অমলেন্দু তাড়াতাড়ি বললে, দেখছি আপনারা দুজনেই উত্তেজিত হয়েছেন। এমন অশোভন বাদ-প্রতিবাদের দরকার কী? মহেন্দ্র বললে, ডাক্তার বোস হঠাৎ ভুল করে ফেলেছেন, এইটুকুই আমি বলতে চাইছি। ডাক্তার জোর করে একটু হাসবার চেষ্টা করে বললেন, বন্ধু, ডাক্তারদের এমন ভুল করলে চলে না। কিছুমাত্র অপ্রস্তুত না হয়ে মহেন্দ্র বললে, ওই গ্রামোফোন রেকর্ডের কথা বিশ্বাস করলে বলতে হয়, আগেও আপনি এইরকম ভুল করে ফেলেছেন। ডাক্তার মুখ হয়ে গেল রক্তহীন। অমলেন্দু উত্তপ্ত কণ্ঠে বললে, মহেন্দ্রবাবু এ আপনি কী করছেন? আমরা সকলেই একই ফুটো-নৌকোর যাত্রী। ভুলে যাবেন না, গ্রামাফোন রেকর্ড জ্যোতির্ময় বসুর মৃত্যুর জন্য দ্বায়ী করেছে আপনাকেই। মহেন্দ্র দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ করে এক-পা এগিয়ে গেল। বিকৃত মুখে সে বললে, চুলোয় যাক, জ্যোতির্ময় বসু! রাবিশ, মিছে কথা! অমলেন্দুবাবু, আমাকে নিয়ে টানাটানি করবেন না, নিজের কথাটাও ভেবে দেখুন! দুই ভুরু উপর দিকে তুলে অমলেন্দু বললে, আমার কথা! —হ্যাঁ। আপনি হচ্ছেন এখানকার এক আমন্ত্রিত অতিথি। সামাজিক নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে গেলে কেউ কখনো সঙ্গে নিয়ে যায় রিভলভার? আমি এই প্রশ্নের উত্তর চাই। মহেন্দ্রের দিকে একটা অত্যন্ত বিতৃষ্ণা-ভরা দৃষ্টি নিক্ষেপ করে অমলেন্দু বললে, তাই নাকি? এই প্রশ্নের উত্তর চান আপনি? —আজ্ঞে হ্যাঁ মশাই! অমলেন্দু অপ্রত্যাশিতভাবে বললে, দেখুন মহেন্দ্রবাবু, আপনাকে যতটা বোকা দেখায় আপনি ততটা বোকা নন। —হতে পারে। কিন্তু রিভলভার সম্বন্ধে আপনি কী বলতে চান? এইবার অমলেন্দুর মুখে ফুটল হাসি, সে বললে, একটা বিপজ্জনক স্থানে আসতে হবে বলেই সঙ্গে আমি রিভলভার এনেছি। অত্যন্ত সন্দিগ্ধস্বরে মহেন্দ্র বললে, আপনি এ কথা তো আগে আমাদের বলেননি? —না। —তাহলে আপনি আমাদের উপরে পাহারা দিতে এসেছেন? —ধরুন তাই। —আসল ব্যাপারটা কী, খুলে বলুন দেখি? অমলেন্দু আস্তে আস্তে বললে, বাইরে আমি সকলকে জানাতে চেয়েছি যে, আর-সকলের মতো আমিও এখানে এসেছি আমন্ত্রিত অতিথির মতো। সেটা ঠিক সত্য কথা নয়। আসল ব্যাপার হচ্ছে এই: অ্যাটনি বিজন বোস ডেকে পাঠিয়েছিল আমাকে। সে বললে, যথেষ্ট বিপদ-আপদেও আমি মাথা ঠিক রেখে কাজ করতে পারি, আমার নাকি এই-রকম খ্যাতি আছে। অতএব আমি যদি এখানে এসে সকলের উপর সতর্ক দৃষ্টি রাখতে পারি, তাহলে আমার লভ্য হবে পাঁচ হাজার টাকা। আমি ধনী নই, লোভে পড়ে রাজি হয়ে গেলুম। কিন্তু অমলেন্দুর কথা মহেন্দ্রের মনে লাগল না। সে বললে, এসব কথা তো আপনি কালকেই আমাদের জানাতে পারতেন? অমলেন্দু শেষটা নাচারের মতন বললে, প্রিয় মহেন্দ্রবাবু, এখানে যে কীরকম অভাবিত কাণ্ড-কারখানা হবে, কাল তা আমি জানব কেমন করে? ডাক্তার বোস বললেন, তাহলে কালকের ব্যাপার দেখেশুনে আজ আপনার মত বদলে গেছে? একটা কালো ছায়া এসে পড়ল অমলেন্দুর মুখের উপর। সে নীরস স্বরে থেমে থেমে বললে, আজ্ঞে হ্যাঁ। আজ জেনেছি আমরা সবাই হচ্ছি একই ফুটোনৌকোর যাত্রী। ওই পাঁচ হাজার টাকা হচ্ছে একটা বাজে টোপ, আর সেই টোপ গিলেছি আমি নির্বোধ মাছের মতো। আমরা ফাঁদে পা দিয়েছি মশাই, সকলেই একসঙ্গে একই ফাঁদে পা দিয়েছি। মনোতোষবাবুর মৃত্যু! সত্যবালার মৃত্যু! টেবিলের উপর থেকে দু-দুটো পুত্তলিকার অন্তর্ধান। এসবই হচ্ছে ভয়াবহ দুলক্ষণ! কিন্তু কে যে এই বিষম ফাদ পেতেছে তা আমরা কেউই জানি না, কারণ সেই শয়তান আমাদের সামনে এসে এখনও হয়নি মূর্তিমান! দুপুরের আহারের জন্য ডাক এল। সকলে খাবার ঘরে গিয়ে দেখলে, টেবিলের উপরে সারি সারি সাজানো রয়েছে বিবিধ আহার্যের পাত্র। একপাশে চুপ করে দাঁড়িয়েছিল নিত্যানন্দ। তার স্থির মুখের পানে তাকালে তার মনের ভাব কিছুই ধরবার জো নেই। অমলেন্দু বললে, লাঞ্চ-ও ফিরে আসেনি, দ্বীপেও হাট-বাজার নেই। লাঞ্চ যদি না আসে, আর এই দ্বীপে যদি আমাদের কিছুদিন বন্দি থাকতে হয়, তাহলে আমাদের খোরাক জুটবে কেমন করে নিত্যানন্দ? আজ্ঞে, ভাঁড়ার ঘরে অনেক চাল, ডাল, আটা আর অন্যান্য জিনিস মজুত আছে। বিলিতি টিনের খাবারও এনে রাখা হয়েছে যথেষ্ট। বাহির থেকে খাবার না এলেও আমরা বেশ কিছুকাল চালিয়ে নিতে পারব। জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে মহেন্দ্র বললে, আকাশে মেঘ তো ক্রমেই পুরু হয়ে জমে উঠছে দেখছি। যদি দু-চার দিন ধরে দুর্যোগ চলে আর বাইরের কেউ এই দ্বীপের নাগাল না ধরতে পারে, তাহলে আমাদের অনাহার করতে হবে না শুনে নিশ্চিন্ত হলুম। সৌদামিনী বললেন, আমরা তো সবাই হাজির আছি, কিন্তু মেজর সে কোথা? স্বপ্না বললে, মেজর সেন সমুদ্রের ধারে বসে আছেন। তাকে কেমন অন্যমনস্ক দেখলুম! তার কথাও যেন খাপছাড়া বলে মনে হল। ডাক্তার বোস উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, আপনারা ডান হাতের ব্যাপার শুরু করে দিন, আমি মেজর সেনকে ডেকে আনছি। বাহির থেকে হঠাৎ একটা ঠান্ডা দমকা হাওয়া ঘরের ভিতরে এসে পড়ল। স্বপ্না বললে, ঝড় উঠতে আর দেরি নেই বোধ হয়। সকলে খাওয়ার কথা ভুলে উদ্বিগ্ন মুখে দৃষ্টিপাত করলে বাইরের দিকে। বাতাস ক্রমেই ঝোড়ো হয়ে উঠছে, সমুদ্রের কোলাহলও ক্রমেই হয়ে উঠছে উচ্চতর। নিত্যানন্দ হঠাৎ সচমকে বললে, বাইরে কার পায়ের শব্দ হচ্ছে। কে যেন ছুটতে ছুটতে এদিকে আসছে। সকলেই শুনতে পেলে চত্বরের উপরে দ্রুত পদশব্দ। সকলেই একসঙ্গে উঠে পড়ে দরজার দিকে ফিরে দাঁড়াল এবং সঙ্গে সঙ্গে ঘরের ভিতরে প্রবেশ করলেন ডাক্তার বোস। হাঁপাতে হাঁপাতে তিনি বলেন, মেজর সেন— —মারা পড়েছেন! কথাগুলো ফস করে বেরিয়ে পড়ল মহেন্দ্রের মুখ থেকে। সাত জন লোক তাকিয়ে দেখলে পরস্পরের মুখের দিকে। মহেন্দ্র ও অমলেন্দু ধরাধরি করে মেজর সেনের দেহ নিয়ে যখন ঘরের ভিতরে প্রবেশ করলে, ঠিক সেই সময়ে সারা দ্বীপের উপরে জেগে উঠল হু হু করে একটা দুর্দান্ত ঝড়ের দুরন্ত নিশ্বাস। স্বপ্না খাবার ঘর থেকে বেরিয়ে বৈঠকখানার ভিতরে গিয়ে ঢুকল। তারপর একটা টেবিলের দিকে তাকিয়ে সে তটস্থ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, এমন সময় সেইখানে এসে হাজির নিত্যানন্দ। সচকিত নেত্রে স্বপ্নার দিকে তাকিয়ে সে বললে, আমি এখানে দেখতে এসেছি— কেন যে চিৎকার করলে তা সে জানে না, কিন্তু স্বপ্না সচিৎকারেই বলে উঠল, বুঝেছি নিত্যানন্দ, আমার মতো তুমিও কী দেখতে এসেছ! দ্যাখো, টেবিলের উপরে আছে এখন মোটে সাতটা পুতুল! মেজর সেনের দেহ তাঁর শয়নকক্ষে স্থাপন করে অমলেন্দু ও মহেন্দ্র ফিরে এসে দেখলে সকলেই এসে হাজির হয়েছে বৈঠকখানার ভিতরে। ঝোড়ো হাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তুমুল বৃষ্টি। জানালার বন্ধ সার্শির উপরে দরদর করে ঝরে পড়ছে জল, সেইদিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে স্বপ্না। চেয়ারের উপরে সিধে হয়ে সৌদামিনী বসে আছেন নিষ্কম্প দীপশিখার মতো। ডাক্তার বোস ঘরের ভিতরে পায়চারি করছেন। চন্দ্রবাবু কৌচের উপরে হেলান দিয়ে উপবিষ্ট, তার দুই চক্ষু অর্ধমুদ্রিত। তারপর সোজা হয়ে বসে চোখ খুলে চন্দ্রবাবু বললেন, তারপর, ডাক্তার! ডাক্তার পায়চারি বন্ধ করে দাঁড়িয়ে পড়লেন। বিবর্ণমুখে বললেন, এবারে আর মৃত্যুর কারণ সম্বন্ধে সন্দেহ করবার কিছুই নেই। মেজর সেনের মাথার পিছন দিকে কোনো কঠিন জিনিস দিয়ে কে প্রচণ্ড আঘাত করেছে!’ ঘরের তিতরে শোনা গেল কয়েকজনের অস্ফুট কণ্ঠস্বর। চন্দ্রবাবু শান্তভাবেই বললেন, যা দিয়ে আঘাত করা হয়েছে, সেটা কি আপনি দেখেছেন? —না। —কিন্তু মৃত্যুর কারণ সম্বন্ধে আপনি নিশ্চিত? —হ্যাঁ। যখন চত্বরের পরে ইজিচেয়ারে বসেছিলুম, তখন একটা বিষয় লক্ষ করেছি। আপনারা কেউ কেউ আনাগোনা করছিলেন দ্বীপের এদিকে-ওদিকে। কারণটা বুঝতে আমার দেরি হয়নি। আপনারা দ্বীপটা খুঁজে দেখছিলেন, কোনো হত্যাকারী ওইখানে লুকিয়ে আছে কি না? অমলেন্দু বললে, আজ্ঞে হ্যাঁ, আপনি ঠিক আন্দাজ করেছেন। চন্দ্রবাবু বললেন, তাহলে আমার মতো আপনারাও বুঝতে পেরেছেন যে, মনোতোষবাবুর ও সত্যবালার মৃত্যু দৈব-দুর্ঘটনা কি আত্মহত্যা নয়। আর এতক্ষণে আপনারা নিশ্চয় এটাও ধারণা করতে পেরেছেন যে, কোন উদ্দেশ্যে আমাদের সকলকে ভুলিয়ে এই দ্বীপে নিয়ে আসা হয়েছে। মহেন্দ্র গর্জন করে বললে, আমরা কোনো পাগল খুনির পাল্লায় পড়েছি। এখন তা নিয়ে মাথা ঘামানো বৃথা। আপাতত আমাদের ভেবে দেখা উচিত, সবাই কী করে নিজের প্রাণ রক্ষা করতে পারি। ডাক্তার বোস কম্পিত কণ্ঠে বললেন, কিন্তু দ্বীপে বাইরের আর কেউ নেই! নিশ্চয়ই কেউ নেই! এক হিসাবে আপনার মত ভ্রান্ত নয়। আমিও আজ সকলে ওই সিদ্ধান্তেই পৌছেছিলুম। আমাকে জিজ্ঞাসা করলেই আমি আপনাদের বলতে পারতুম, এই দ্বীপের মধ্যে কোনো অজানা খুনিকেই খুঁজে পাওয়া যাবে না। অথচ সেই হত্যাকারী আছে এই দ্বীপের মধ্যেই। আইন যাদের স্পর্শ করতে পারে না, তার নিজের মনগড়া এমন কয়েকজন অপরাধীকেই দিতে চায় সে প্রাণদণ্ড। তার ফলে একে একে তিন জন লোক মারা পড়ল। অতএব আমাদের এই দণ্ডদাতা আছে এই দ্বীপের মধ্যেই— —কিন্তু এই দ্বীপের ভিতরে কেমন করে সে লুকিয়ে আছে? খুব সহজেই এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যায়। সে হচ্ছে আমাদেরই একজন। —না, না না না! চিৎকার করে উঠল স্বপ্না—প্রায় ক্রন্দিত কণ্ঠেই। কয়েকমুহূর্ত তার মুখের দিকে চুপ করে তাকিয়ে থেকে চন্দ্রবাবু বললেন, প্রিয় স্বপ্না দেবী, সত্যের সামনে দাঁড়িয়ে সত্যকে অবহেলা করা চলে না। আমরা ভীষণ বিপদের মাঝখানে এসে পড়েছি। আমাদেরই মধ্যে একজন হচ্ছে হত্যাকারী। কিন্তু সে যে কে, তা আমরা জানি না। আমরা যে দশ জন লোক এই দ্বীপে এসেছি, তাদের ভিতর থেকে মৃত তিন জনকে এখন বলা চলে সন্দেহের অতীত। বাকি আছি আমরা সাত জন। চন্দ্রবাবু একে একে প্রত্যেকের মুখের দিকে দৃষ্টিপাত করে আবার বললেন, আমি যা বললুম, আপনারা কি তা সত্য বলে মানতে রাজি আছেন? ডাক্তার বোস বললেন, অদ্ভুত কথা! অথচ আপনার কথা সত্য বলে মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। মহেন্দ্র বললে, হ্যাঁ, ওঁর কথাই ঠিক। আর আমাকে যদি জিজ্ঞাসা করেন তাহলে আমার সন্দেহের কথা আমি বলতে পারি— চন্দ্রবাবু হাত তুলে মহেন্দ্রকে স্তব্ধ হবার জন্যে ইঙ্গিত করে বললেন, আপনার সন্দেহের কথা নিয়ে পরে আলোচনা করলেও চলবে। আপাতত আমার মতে সকলে সায় দিচ্ছেন তো? সৌদামিনী একটুও এপাশে-ওপাশে হেললেন না, ঠিক সিধে হয়ে বসেই বললেন, চন্দ্রবাবু, আপনার কথা যুক্তিসঙ্গত বলেই মনে হচ্ছে। আমাদের এক জনের ঘাড়ে চেপেছে শয়তান। স্বপ্না অস্ফুটকণ্ঠে বললে, আমি একথা বিশ্বাস করতে পারি না। না, এ হচ্ছে অসম্ভব! চন্দ্রবাবু বললেন, আপনার কী মত অমলেন্দুবাবু? —আমিও আপনার কথায় সায় দিচ্ছি। চন্দ্রবাবুর মুখে ফুটল ক্ষীণ হাসির রেখা। তারপর তিনি বললেন, এখন প্রমাণগুলো পরীক্ষা করা যাক। আমাদের মধ্যে কোনো এক ব্যক্তিকে বিশেষ সন্দেহ করবার কারণ আছে কি? মহেন্দ্রবাবু, আমার মনে হয় এ-সম্বন্ধে আপনি যেন কিছু বলতে চান? মহেন্দ্র জোরে জোরে নিশ্বাস ফেলতে ফেলতে বললে, অমলেন্দুবাবু পকেটে রিভলভার নিয়ে এখানে এসেছেন। কাল এ-কথা তিনি কারুকে জানাননি। কিন্তু আজ স্বীকার করেছেন। অমলেন্দু তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললে, কাল কিছু না বলার কারণ ওঁদের জানিয়েছি, চন্দ্রবাবু। আপনিও কারণটা শুনুন। চন্দ্রবাবুর কাছে সব কথা সে আবার খুলে বললে। মহেন্দ্র তীক্ষকণ্ঠে বললে, আপনার কথা যে সত্য তার প্রমাণ কোথায়? চন্দ্রবাবু বললেন, দুর্ভাগ্যক্রমে আমাদের সকলেরই অবস্থা এক-রকম। একমাত্র প্রমাণ আমাদের মুখের কথাই। তারপর সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে তিনি আবার বললেন, আমরা যে কী রকম অদ্ভুত অবস্থায় এসে পড়েছি, কেউ বোধহয় সেটা এখনও ভালো করে বুঝতে পারছেন না। এখন কাজ করতে হবে মাত্র এক উপায়ে। আমাদের মধ্যে এমন লোক কে কে আছেন, যাদের মনে করা যেতে পারে সকল সন্দেহের অতীত? ডাক্তার বোস তাড়াতাড়ি বললেন, ডাক্তারি পেশায় আমি একজন বিখ্যাত ব্যক্তি। আমার উপরে এমন সন্দেহ কেউই করতে পারবেন না যে— চন্দ্রবাবু হাত তুলে তাকে স্তব্ধ হতে ইঙ্গিত করে বললেন, আমিও একজন বিখ্যাত ব্যক্তি। কিন্তু মশাই, তার দ্বারা কিছুই প্রমাণিত হয় না। ডাক্তাররাও পাগল হয়ে যেতে পারে, বিচারকরাও পাগল হতে পারে। এই হিসাবে—’ মহেন্দ্রের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, পুলিশের পক্ষেও পাগল হওয়া অসম্ভব নয়। অমলেন্দু বললে, আমাদের দলে দুই জন মহিলা আছেন, আশাকরি তাঁরা হচ্ছেন সকল সন্দেহের অতীত। নীরস কণ্ঠে চন্দ্রবাবু বললেন, আপনি কি বলতে চান, মেয়েরা কোনোদিন খুন-খারাপ করেনি? অমলেন্দু বিরক্তভাবে বললেন, নিশ্চয়ই তা মনে করি না। কিন্তু এক্ষেত্রে এটা বোধহয় অসম্ভব যে— চন্দ্রবাবু তার মুখের কথা শেষ হবার আগেই ডাক্তারের দিকে ফিরে বললেন, প্রিয় ডাক্তার, মেজর সেনের মাথায় আপনি যে ক্ষতচিহ্ন দেখেছেন, কোনো স্ত্রীলোক কি তাকে সে-ভাবে আঘাত করতে পারে? ডাক্তার শান্তকণ্ঠে বললেন, নিশ্চয়ই পারে, অবশ্য উপযোগী অস্ত্র হতে পেলে। চন্দ্রবাবু বললেন, এখানকার আর দুটো মৃত্যুর কারণ হচ্ছে, বিষ। পুরুষের মতো বিষ ব্যবহার করতে পারে যে-কোনো স্ত্রীলোকও। স্বপ্না ক্রুদ্ধস্বরে বললে, চন্দ্রবাবু, আপনিও পাগলের মতো কথা বলছেন! তার মুখের দিকে স্থির নেত্রে তাকিয়ে চন্দ্রবাবু ওজন-করা স্বরে বললেন, প্রিয় স্বপ্না দেবী, শান্ত হোন। আমি আপনার বিরুদ্ধে কোনোই অভিযোগ করছি না। আর সৌদামিনী দেবী, আমরা প্রত্যেকেই যে সন্দেহভাজন হতে পারি, আমার এ-কথায় আপনিও বোধহয় রাগ করেননি? সৌদামিনী বসে বসে শুনছিলেন। মুখ না তুলেই স্থির কণ্ঠে তিনি বলেন, আমি যে তিন-তিন জন মানুষকে হত্যা করতে পারি, আমাকে যিনি চেনেন নিশ্চয়ই তিনি এমন অসম্ভব কথা ভাবতে পারবেন না। তবে এটাও ঠিক যে, আমরা প্রত্যেকেই প্রত্যেকের কাছে অপরিচিত, সুতরাং কেউ কারুকেই বিশ্বাস করতে পারিনি। অতএব আমি আগে যা বলেছি এখনও তাই বলছি : আমাদের মধ্যে নিশ্চয়ই এমন কেউ আছে, যে হচ্ছে সত্যিকার শয়তান। চন্দ্রবাবু বললেন, তাহলে দাঁড়াচ্ছে এই। আমরা কেউই সন্দেহের অতীত নই। অমলেন্দু বললে, কিন্তু নিত্যানন্দের সম্বন্ধে কী বলতে চান? —তার মানে? —আমার তো মনে হয় নিত্যানন্দের উপরে কোনো সন্দেহ করা যেতে পারে না? —কী হিসাবে শুনি? —প্রথমত, এমন ভয়ানক কাজ করবার মতো বুদ্ধি তার আছে বলে মনে হয় না। দ্বিতীয়ত, তার স্ত্রীও হয়েছে নিহত। চন্দ্রবাবু দুই ভুরু কপালের উপরে তুলে বললেন, যুবক, আমার সামনে এমন কয়েকজন আসামিকে নিয়ে আসা হয়েছে, যাদের সম্বন্ধে অভিযোগ ছিল স্ত্রীকে হত্যা করা। বিচারে তারাও দোষী সাব্যস্ত হয়েছে। —হতে পারে। পৃথিবীতে, পত্নীকে হত্যা করেছে এমন লোকের অভাব নেই। কিন্তু বর্তমান ক্ষেত্রে সে যুক্তি প্রয়োগ করা চলে না। পাছে তার স্ত্রী সব কথা ফাঁস করে দেয় সেই ভয়ে, অথবা স্ত্রী তার চোখের বালি হয়েছিল বলে নিত্যানন্দ তাকে হত্যা করতে পারে বটে। কিন্তু যে অপরাধ তারা দুজনে মিলেই করেছে, তারই জন্যে সে হত্যা করতে পারে না তার স্ত্রী সত্যবালাকে। চন্দ্রবাবু বললেন, আপনি শোনা-কথাকে প্রমাণ বলে ধরে নিচ্ছেন। নিত্যানন্দ আর তার স্ত্রী দুজনে মিলে কারুকে যে হত্যা করেছে, এ কথা সত্য না হতেও পারে। হয়তো এটা হচ্ছে মিথ্যা অভিযোগ। সুতরাং— —সুতরাং আপনার কথাই অভ্রান্ত বলে আমাদের গ্রহণ করতে হবে। হত্যাকারী হচ্ছে আমাদেরই একজন। আমরা যে-কেউ হত্যাকারী হতে পারি। (ক্রমশ) --------- ।। একাকী কন্যা ।।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮৬ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now