বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
"
দ্বীপটা খুঁজে দেখবার প্রস্তাব শুনে মহেন্দ্র সায় দিলে সানন্দে। বললে, পুতুল দুটো অদৃশ্য হওয়া অত্যন্ত সন্দেহজনক ব্যাপার। ধরলুম, নিত্যানন্দই তার স্ত্রীকে হত্যা করেছে। কিন্তু মনোতোষবাবুর মৃত্যুকে আপনারা কি আত্মহত্যা বলে মনে করেন?
ডাক্তার বোস বললেন, না। আত্মহত্যা করবার জন্যে কেউ এই বিজন দ্বীপে আমন্ত্রণ রক্ষা করতে আসে না। মনোতোষবাবু ছিলেন জীবন্ত যৌবনের প্রতিমূর্তি, একেবারে আনন্দময় পুরুষ। তিনি যে পকেটে করে সায়ানাইড’ বিষ নিয়ে এখানে এসেছিলেন, একথা কল্পনা করাও অসম্ভব।
মহেন্দ্র বললে, হ্যাঁ আমি সে-কথা মানি। মনোতোষবাবুর মতো মানুষ পকেটে বিষ নিয়ে আমোদ করে বেড়াতে আসতে পারে না। কিন্তু তার গেলাসে বিষ গেল কী করে?
অমলেন্দু বললে, সেটাও আমি ভেবে দেখেছি। মনোতোষবাবু খানিকটা লেমোনেড পান করে গেলাসটা টেবিলের উপরে রেখে আমাদের কাছে এসেছিলেন। টেবিলটা ছিল খোলা জানলার সামনে। সেই সময়ে বাইরের কোনো লোক নিশ্চয়ই জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে ‘সায়ানাইড’ ফেলে দিয়েছির গেলাসের ভিতরে। তারপর মনোতোষবাবু আবার গেলাসে চুমুক দিতে যান আর মারা পড়েন সঙ্গে সঙ্গেই।
অবিশ্বাসের স্বরে মহেন্দ্র বললে, জানলা দিয়ে কেউ গেলাসে বিষ ফেলে দিলে আর আমরা তাকে দেখতে পেলুম না?
অমলেন্দু বললে, আমরা সকলেই তখন দ্বীপের ব্যাপার নিয়ে যথেষ্ট অন্যমনস্ক হয়ে ছিলুম।
ডাক্তার বললেন, সে কথা সত্য। আমাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ শুনে আমরা তখন সকলেই উত্তেজিত হয়ে উঠেছিলাম। সে সময়ে আমাদের কারুরই দৃষ্টি ছিল না জানলার দিকে।
মহেন্দ্র বললে, আমার যা বিশ্বাস তাই বললুম। আচ্ছা, এইবারে আমাদের অন্বেষণা শুরু করা যাক। আমাদের কারুর কাছে অন্তত একটা রিভলভার” থাকলে ভালো হত। কিন্তু সে আশা করা বৃথা।
অমলেন্দু নিজের পকেটের উপরে হাত রেখে বললে, আমার কাছে একটা রিভলভার আছে।
দুই চক্ষু অত্যন্ত বিস্ফোরিত করে মহেন্দ্র বললে, আপনি সর্বদাই সঙ্গে রিভলভার রাখেন?
অমলেন্দু বললে, সাধারণত তাই রাখি বটে। জীবনে বারবার আমাকে বিপদ-আপদের মধ্যে গিয়ে পড়তে হয়েছে। কাজেই এটা অভ্যাসের মধ্যেই দাঁড়িয়ে গেছে।
মহেন্দ্র বললে, তাই নাকি? তা এখানকার মতো ভয়াবহ বিপদের মাঝখানে আমরা বোধহয় আর কখনো পড়িনি। যদি এই দ্বীপের কোথাও কোনো উন্মাদগ্ৰস্ত হত্যাকারী লুকিয়ে থাকে, তাহলে সে দু-একটা রিভলভার কি ছোরাজুরি নয়, দস্তুরমতো একটা অস্ত্রশালার অধিকারী হতে পারে।
ডাক্তার বললেন, আপনার এ-অনুমান হয়তো ঠিক নয়। আমি দেখেছি এ শ্রেণির হত্যা-ব্যাধিগ্রস্ত পাগলকে চোখে দেখলে চেনা যায় না। মনে হয়, তারা বেশ নিরীহ ব্যক্তি।
মহেন্দ্র বললে, কিন্তু এই দ্বীপবাসী উন্মত্ত যে নিরীহ ব্যক্তি, আমার তা মনে হয় না।
তারা তিন জনে দ্বীপটা ভালো করে খুঁজে দেখবার জন্যে বেরিয়ে পড়ল। ছোটো দ্বীপ। মাঝে মাঝে বনজঙ্গল থাকলেও তা খুব গভীর ও দুর্ভেদ্য নয়। চারিদিকটা ঘুরে আসতে গেলে খুব দীর্ঘকালের দরকার হবে না।
খুঁজতে খুঁজতে এক জায়গায় তারা জলের ধারে এসে পড়ল। সেইখানে প্রায় সমুদ্রের মতো বিশাল নদীর মোহনার দিকে মুখ করে মূর্তির মতো বসে আছেন মেজর সেন। তার দৃষ্টি দিকচক্রবালরেখার দিকে বিস্তৃত। আগন্তুকদের পদশব্দেও তিনি একবারও ফিরে তাকালেন না। সেখানে তিনি ছাড়া যে আর কারও অস্তিত্ব আছে, এ সম্বন্ধেও যেন তার কোনো চেতনাও নেই!
মহেন্দ্ৰ ভাবলে, এটা যেন কেমন অস্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছে। মেজর সেন কি সমাধিগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন? গলা তুলে সে বললে, বাঃ আপনি তো বেশ শান্তিপূর্ণ জায়গাটি বেছে নিয়েছেন!
দুই ভুরু সঙ্কুচিত করে মেজর কাঁধের উপর দিয়ে মুখ ফিরিয়ে তাকিয়ে দেখলেন। বললেন, আর সময় নেই, হাতে আর বেশি সময় নেই। এখন আমাকে কেউ যেন বিরক্ত না করে।
মৃদুকণ্ঠে মহেন্দ্র বললে, আমরা আপনাকে বিরক্ত করতে আসিনি। দ্বীপটা খুঁজে দেখছি, হয়তো ঝোপঝাড়ের ভিতরে কোন শত্রু লুকিয়ে থাকতে পারে।
মেজর সেন আবার ভুরু সঙ্কুচিত করে বললেন, আপনারা বুঝতে পারবেন না—আপনারা কিছুই বুঝতে পারবেন না। দয়া করে আমাকে একলা থাকতে দিন।
মহেন্দ্র তার কাছ থেকে ফিরে আসতে আসতে বললে, ভদ্রলোকের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। ওঁর সঙ্গে কথা কয়ে লাভ নেই।
অমলেন্দু কৌতুহলী হয়ে শুধোলে, উনি কী বললেন?
—ওঁর হাতে আর সময় নেই। আমরা যেন ওঁকে আর বিরক্ত না করি।
ডাক্তার চিন্তিত মুখে বলেন, আশ্চর্য! এ আবার কী কথা?
সারা দ্বীপটা তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কারুর পাত্তা পাওয়া গেল না।
তারা তিন জনে নদীর অতিদূরবর্তী অস্পষ্ট সীমারেখার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কোথাও একখানা নৌকা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। বাতাস ক্রমেই প্রবল হয়ে উঠছে।
অমলেন্দু বললে, বোধ হচ্ছে ঝড় উঠবে। নিকুচি করেছে, এখান থেকে ওপারের কোনো গ্রাম পর্যন্ত দেখা যায় না। অথচ তীরের কাছাকাছি খাজুরী আর নন্দীগ্রাম বলে দুটো পল্লি আছে। আমরা কি আগুন-টাগুন জেলে গ্রামবাসীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারি না?
মহেন্দ্র বললে, শুকনো বনে আগুন লাগিয়ে দেখলে হয়।
অমলেন্দু বললে, কিন্তু আমার মনে হয় সে গুড়েও বালি। যে শয়তান এমন আটঘাট বেঁধে আমাদের এই দ্বীপে এনে ফেলেছে, সে কি ও কথাও ভেবে দেখেনি?
মহেন্দ্র বললে, আপনার কথার মানে?
—ঠিক মানে যে কী তাও বলা কঠিন। হয়তো গ্রামবাসীদের আগে থাকতেই জানিয়ে রাখা হয়েছে, দ্বীপ থেকে আমরা কেউ নিশানা বা সংকেত করলেও তারা যেন কিছুই গ্রাহ্যের মধ্যে না আনে।
—আর গ্রামবাসীরা সুবোধ বালকের মতো এই প্রস্তাবে সায় দেবে?
—হয়তো তাদের বলা হয়েছে, জনকয়েক লোককে ঠাট্টা করে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে এই দ্বীপের মধ্যে, একটা বাজি জেতবার জন্যে।
স্বপ্নার আর ভালো লাগছিল না সৌদামিনীকে। কী কঠিন স্ত্রীলোক। তার দ্বারা অপমানিত হয়ে এক অভাগি আত্মহত্যা করলে, তবু তিনি অনুতপ্ত নন? তার মনে দুঃখের লেশ নেই?
সৌদামিনী তার সামনে সিধে হয়ে বসে নির্বাক মুখে বুনে যাচ্ছিলেন পশমের কী একটা জিনিস। তার সান্নিধ্য স্বপ্নার আর সহ্য হল না। সে উঠে পড়ে বাড়ির ভিতর থেকে বেরিয়ে গেল। তারপর লক্ষ্যহীনের মতো বেড়াতে বেড়াতে গিয়ে পড়ল দ্বীপের কিনারায়। সেখানে তেমনি নিশ্চল হয়ে বসেছিলেন মেজর সেন। স্বপ্না যখন তার কাছে দিয়ে দাঁড়াল, তিনি মুখ তুলে কী রকম একটা উদ্রাস্ত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে দেখলেন। কেন সে জানে না, তার বুকটা ছাৎ করে উঠল।
মেজর বললেন, ও তুমি! তুমি এখানে এসেছ?
স্বপ্না তার পাশে গিয়ে বসে বললে, এখানে চুপ করে বসে জলের দিকে তাকিয়ে থাকতে আপনার বুঝি ভালো লাগছে?
মাথা নেড়ে শান্তভাবে তিনি বললেন, হ্যাঁ। বেশ জায়গা। এখানে বসে অপেক্ষা করতে ভালো লাগে।
স্বপ্না একটু সচকিত ভাবে বললেন, অপেক্ষা? কার জন্যে আপনি অপেক্ষা করছেন?
মেজর তেমনি শান্তভাবেই বললেন, আমি অপেক্ষা করছি শেষ পরিণামের জন্যে। একথা কি তুমি জানো না? আমরা সকলেই তো অপেক্ষা করছি শেষ পরিণামের জন্যে।
স্বপ্নার প্রাণটা ধড়ফড় করে উঠল। সে তাড়াতাড়ি বললে, আপনি কী বলতে চান?
মেজর সেন গম্ভীরকণ্ঠে বললেন, আমরা কেউ আর এই দ্বীপ থেকে ফিরে যাব না। শীঘ্রই আমাদের মুক্তির দিন আসছে।
স্বপ্না উঠে দাঁড়াল। সভয়ে বললে, আপনি কী বলতে চান, আমি বুঝতে পারছি না।
মেজর বললেন, আমি বুঝতে পেরেছি বাছা, আমি বুঝতে পেরেছি।
স্বপ্না উদ্বিগ্ন বললে, না, না, আপনি কিছুই বুঝতে পারেননি।
মেজর আবার জলের দিকে দৃষ্টিপাত করলেন, কোনো জবাব দিলেন না। সেখানে যে আর কেউ হাজির আছে, একথাও তিনি যেন ভুলে গেলেন।
স্বপ্না আর সেখানে দাঁড়াল না, দ্রুতপদে বাড়ির দিকে আসতে আসতে শুনতে পেলে, মেজর সেন আপন মনেই শান্তকণ্ঠে বলছেন, মুক্তি মুক্তি! মুক্তির আর বিলম্ব নেই।
নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে এসেই মহেন্দ্র দেখলে, দোতলার বারান্দার রেলিং ধরে ডাক্তার বোস চুপ করে দাঁড়িয়ে আছেন, সমুদ্রের দিকে প্রসারিত তার দৃষ্টি। মহেন্দ্রের সাড়া পেয়েই চমক ভাঙল ডাক্তারের। তিনি বললেন, মহেন্দ্রবাবু, আমার মনে জেগেছে এক দুর্ভাবনা।
মহেন্দ্র বললে, দুর্ভাবনা নিয়ে আমরা সকলেই তো এখানে ব্যস্ত হয়ে আছি।
অধীরভাবে হাত নেড়ে ডাক্তার বললেন, নিশ্চয়, নিশ্চয়। কিন্তু আমি সকলকার কথা বলছি না। আমি ভাবছি মেজর সেনের কথা?
—মেজর সেনের কথা?
অত্যন্ত নীরসকন্ঠে ডাক্তার বললেন, হ্যাঁ, আমাদের সকলেরই বিশ্বাস, আমরা পড়েছি কোনো উন্মাদগ্রস্ত হত্যাকারীর পাল্লায়। মেজর সেনকে দেখলে আপনার কী মনে হয়?
সচমকে মহেন্দ্র বলল, আপনি কি তাকে উন্মাদগ্রস্ত বলে মনে করেন?
ডাক্তার দ্বিধাভরা কণ্ঠে বললেন, হয়তো এ-রকম কথা বলা আমার উচিত হয়নি। আমি ডাক্তার হলেও উন্মাদ রোগ সম্বন্ধে বিশেষজ্ঞ নই। মেজরের সঙ্গে এদিক নিয়ে আমরা কোনো কথা হয়নি, সুতরাং আমি নিশ্চিত ভাবে কিছুই বলতে পারি না।
সেই সময়ে দুজনেই দেখলেন, নীচেকার চত্বর পার হয়ে অমলেন্দু ডান দিকে ফিরে আবার অদৃশ্য হয়ে গেল। ভূতপূর্ব ডিটেকটিভ মহেন্দ্র বললে, ডাক্তারবাবু, আমার কী মনে হয় জানেন?
—কী?
—ওই লোকটি ভালো নয়।
—অমলেন্দুবাবু? কেন?
—কেন তা আমি ঠিক জানি না। কিন্তু অমলেন্দুবাবুকে আমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারব না।
ডাক্তার বললেন, শুনেছি জীবনে উনি অনেক দুঃসাহসিক কাজ করেছেন।
—হ্যাঁ, কিন্তু তার কোনো কোনো দুঃসাহসিক কাজের কথা দ্বিতীয় ব্যক্তির কাছে প্রকাশ করা চলে না। সে একটু চুপ করে থেকে আবার বললে, ‘ডাক্তারবাবু, আপনার সঙ্গে কি সর্বদাই রিভলভার থাকে?’
ডাক্তার চমকিত হয়ে বিস্ফরিত চক্ষে বললেন, আমার সঙ্গে— কী আশ্চর্য নিশ্চয়ই নয়! আমি কেন রিভলভার সঙ্গে রাখব?
ডাক্তার বললেন, হয়তো এটা হচ্ছে কু-অভ্যাস। যাক ও কথা। সারা দ্বীপ খুঁজেও আপনারা যখন জনপ্রাণীকেও আবিষ্কার করতে পারলেন না, তখন আমার মনে হয়, হয়তো কেউ এই বাড়ির ভিতরেই লুকিয়ে আছে। মস্ত বাড়ি, ঘর। এখানটা তো এখনও খুঁজে দেখা হয়নি।
মহেন্দ্র বললে, বেশ, এইবারে বাড়িটাই খুঁজে দেখা যাক। হয় এখানে কারুকে খুঁজে পাব, নয়তো এই দ্বীপের ভিতরে বাইরের জনপ্রাণী নেই।
(ক্রমশ)
--------
।। একাকী কন্যা ।।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now