বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

হারাধনের দ্বীপ" হেমেন্দ্রকুমার রায় ▪▪▪পঞ্চম পরিচ্ছেদ▪▪▪

"রহস্য" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X " ঘটনাটা ঘটে গেল অত্যন্ত আচমকা। সকলেই শ্বাস রোধ করে নির্বোধের মতো মনোতোষের ভূপতিত দেহটার দিকে তাকিয়ে স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল! তারপর ডাক্তার বোস তাড়াতাড়ি উঠে পড়ে নিশ্চেষ্ট দেহটার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন। মনোতোষের বুকের উপরে একবার হাত রেখে বিভ্রান্ত চোখে সভয়ে প্রায় অবরুদ্ধ স্বরে বলে উঠলেন, ভগবান! এ দেহে যে জীবনের কোনো লক্ষণই নেই! কেউ যেন সে কথা বিশ্বাসই করতে পারলে না। জীবনের কোনো লক্ষণই নেই? মৃত? মূর্তিমন্ত তরুণ যৌবনের মতো মনোতোষ, অমন স্বাস্থ্য-সবল আদর্শ দেহ, এমন আচম্বিতে এত স্বল্প সময়ের মধ্যে তার মৃত্যু হতে পারে কখনো? না, বিশ্বাস করা অসম্ভব। ডাক্তার বোস মৃতের উপরে করলেন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিপাত। তারপর তার হাতের আধভাঙা গেলাসটা তুলে নিয়ে পরীক্ষা করতে লাগলেন। মেজর সেন শুধোলেন, মৃত? আপনি কি বলতে চান মনোতোষবাবুর দম বন্ধ হয়ে মৃত্যু হয়েছে? ডাক্তার বললেন, শ্বাস রোধ হওয়ার ফলে মনোতোষবাবু মারা পড়েছেন। তিনি খুব সাবধানে গেলাসের ভিতরে যে কয়েক ফোটা পানীয় ছিল, আঙুলে করে তা তুলে নিয়ে একবার দেখলেন। সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেল তার মুখের ভাব! মেজর সেন বললেন, কোনো মানুষ যে এমনভাবে মারা পড়তে পারে আমার তা জানা ছিল না। সৌদামিনী বললেন, জীবনের মধ্যেই আমরা পাই মৃত্যুর আলিঙ্গন। ডাক্তার উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, না, এমনভাবে বিষম লেগে হঠাৎ মানুষ মারা পড়তে পারে না। মনোতোষবাবুর স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি। স্বপ্না প্রায় চুপি চুপি বললে, তাহলে ওই গেলাসের ভিতরে কি বিষটিষ কিছু ছিল? ডাক্তার মাথা নেড়ে বললেন, হ্যাঁ, তবে নিশ্চয় করে কিছু বলতে পারি না। মনে হচ্ছে সায়ানাইড’। প্রসিক অ্যাসিডের স্পষ্ট গন্ধ নেই, সম্ভব পোটাসিয়াম সায়ানাইড। মুহুর্তের মধ্যে কাজ করে। চন্দ্রবাবু তীক্ষ্ণ কষ্ঠে বললেন, বিষ কি গেলাসের ভিতরে ছিল? —হ্যা। অমলেন্দু বললে, আপনি কি বলতে চান, গেলাসের ভিতরে বিষ রেখেছিলেন মনোতোষবাবু নিজেই? —তা ছাড়া আর কী বলব? মহেন্দ্র বললে, আত্মহত্যা? আশ্চর্য। স্বপ্না থেমে থেমে বললে, মনোতোষবাবু যে আত্মহত্যা করেছেন, এ কথা ভাবতেই পারা যায় না। তার কথাবার্তা, ভাবভঙ্গির ভিতরে ছিল জীবনের প্রবল উচ্ছাস। পৃথিবী ছিল তার কাছে পরম উপভোগ্য। ডাক্তার বললেন, কিন্তু এখানে আত্মহত্যা ছাড়া আর কোনো কিছুর কথা মনে ওঠে কি? সকলেই মাথা নাড়লে। ঘরের ভিতরে বাইরের কোনো লোকই আসেনি, সকলেই স্বচক্ষে দেখেছে যে, মনোতোষ নিজেই গেলাসটা তুলে নিয়ে লেমোনেডটা পান করেছে। গেলাসের মধ্যে যদি সায়ানাইডের অস্তিত্ব থাকে, তাহলে তার জন্যে মনোতোষ ছাড়া আর কেউই দায়ী হতে পারে না। কিন্তু—কিন্তু মনোতোষ আত্মহত্যা করবে কেন? মহেন্দ্র বললে—চিন্তিতভাবেই বললে, ডাক্তার আপনার কথা কিন্তু আমার মনে ঠিক লাগছে না। আত্মহত্যা করার দিকে যে শ্রেণির লোকের ঝোঁক থাকে, মনোতোষবাবুকে দেখলে সে শ্রেণির লোক বলে মনে হয় না। ডাক্তার বললেন, আমিও আপনার কথাই মানি। এ হচ্ছে অদ্ভুত রহস্য! ডাক্তারের সঙ্গে অমলেন্দু মনোতোষের অসাড় দেহটাকে ধরাধরি করে তুলে নিয়ে গিয়ে রেখে এল তার শয়নগৃহে। তারা যখন ফিরে এল, প্রত্যেকেই তখন দাঁড়িয়ে উঠেছে। রাত্রি ঠান্ডা নয়, কিন্তু দেখলে মনে হয় প্রত্যেকেরই দেহ যেন শীতার্তের মতোই কম্পমান। সৌদামিনী বললেন, রাত হল, এখন আমাদের ঘুমুতে যাওয়া উচিত। বড়ো ঘড়িটার দিকে সবাই তাকিয়ে দেখলে। বেজে গেছে রাত বারোটা। সৌদামিনীর কথায় সবাই মনে মনে সায় দিল বটে, কিন্তু কেউই যেন দল ছাড়া হতে প্রস্তুত নয়। তারা কেউ যেন শয়নগৃহে গিয়ে একলা হতে চায় না। কিন্তু চন্দ্রবাবু দৃঢ়কণ্ঠে বললেন, আমাদের সকলেরই এখন খানিকটা ঘুমের দরকার।’ বলে তিনি নিজেই অগ্রসর হলেন। আর-সকলে তখন তার পিছনে পিছনে অগ্রসর হতে লাগল। নিঝুম রাত্রি। দূর থেকে সমুদ্রের তরঙ্গ-কোলাহল ছাড়া আর কোনো শব্দই ভেসে আসছে না। প্রত্যেকের পায়ের চাপে কাঠের সিঁড়িটা যেন আর্তনাদ করে ভেঙে দিতে লাগল বাড়ির ভিতরকার স্তব্ধতা। কোণে কোণে দেখা যাচ্ছে কালো কালো ছায়া, দেখলেই ছাৎ ছাৎ করে ওঠে মন। কিন্তু এ হচ্ছে একেবারে আধুনিক বাড়ি—শক্তিশালী পেট্রোলের ল্যাম্পের আলোকপ্রবাহে সমুজ্জ্বল। কোথাও লুকোচুরির কোনো জায়গাই নেই। তবু একটা অপার্থিব ভাব মনকে দিতে চায় আচ্ছন্ন করে এবং এইটেই হচ্ছে সবচেয়ে ভয়াবহ! ভূতপূর্ব জজ নিজের শয়নগৃহে প্রবেশ করে আগে করলেন জামাকাপড় পরিবর্তন। সোফার উপরে তিনি তার পাইপে তামাক ভরে অগ্নিসংযোগ করলেন। তাঁর চোখের সামনে জেগে উঠল আসামি বরেন বসুর মূর্তি—যার ফাঁসি হয়েছিল তারই হুকুমে। তাঁর স্পষ্ট মনে আছে বরেন বসুর চেহারা। দেখতে ছিল সে সুপুরুষ। আর তার সেই সপ্রতিভ, অকপট দুটি চোখ। অত্যন্ত সরলভাবে সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে সে প্রত্যেক প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিল একটুও সঙ্কুচিত না হয়ে। সেই জন্যেই জুরিরা তার পক্ষপাতী হয়ে পড়েছিল। কিন্তু তিনি পুরাতন ব্যবহারজীবী— আগে ছিলেন বিখ্যাত ব্যারিস্টার, তারপর হয়েছিলেন জজ। জীবনে অসংখ্য অপরাধীর সঙ্গে পরিচয় হয়েছে তাঁর, সুন্দর সরল মুখ দেখে ভোলবার পাত্র নন তিনি। তিনি দিয়েছিলেন তাকে প্রাণদণ্ড, আইনের দিক দিয়ে তা কিছুমাত্র অসঙ্গত হয়নি। মনে মনে তিনি মৃদুহাস্য করলেন। তারপর জলভরা গেলাসের ভিতরে নিজের বাঁধানো দাঁতের পাটি খুলে রেখে দিলেন। তার মুখের নীচের দিকটা চুপসে গেল। অতিশয় নিষ্ঠুর দেখাতে লাগল তার মুখের নীচের দিকটা। আবার হাসতে হাসতে মৃদুস্বরে তিনি বললেন, বিরেনের প্রাণদণ্ড দিয়েছি, বেশ করেছি!’ তারপর সোফা থেকে উঠে আলো নিবিয়ে শয্যায় গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করলেন। নীচেকার হলঘরে তখনও দাঁড়িয়ে ছিল মহেন্দ্র। তাকে দেখাচ্ছিল হতভম্বের মতো । এক কোণে টেবিলের উপরে যেখানে তথাকথিত হারাধনের ছেলের মূর্তিগুলো ছিল, সেইদিকে দৃষ্টিনিবদ্ধ করে তার চোখ দুটাে হয়ে উঠেছে বিস্ফারিত। সে অস্ফুট স্বরে বললে, এ আবার কী কাণ্ড! আমি হলপ করে বলতে পারি, এখানে একটু আগে ছিল ঠিক দশটা পুতুল! মেজর সেনের চোখে ঘুম নেই—বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করছিলেন তিনি। আলোকহীন অন্ধকার ঘর—কিন্তু সেই অন্ধকারেও তার চোখের সামনে জেগে উঠেছে সুরেন্দ্রনাথ পালের মূর্তি। প্রথমটা তিনি সুরেনকে পছন্দ করতেন। কিন্তু স্ত্রীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হবার পর যখন তিনি জানতে পারলেন যে, এই পারিবারিক দুর্ঘটনার মূলে ছিল সুরেনেরই চক্রান্ত, তখন তার নাম মনে করলেও তার মন ক্ষিপ্ত হয়ে উঠত দারুণ ক্রোধে। তারপর উত্তর-আফ্রিকার সেই যুদ্ধক্ষেত্রের কথা। হ্যাঁ, সুরেন যে আর জীবন নিয়ে ফিরে আসতে পারবে না, সেটা ভালো করে জেনেই তিনি তাকে পাঠিয়েছিলেন শক্ৰদের বিরুদ্ধে। কেন পাঠাবেন না? তার জঘন্য চক্রান্তের ফলেই ছারখার হয়ে গিয়েছে তার সংসার, বিষময় হয়ে উঠেছে তার জীবন। সে-রকম নিকৃষ্ট জীবকে পৃথিবী থেকে লুপ্ত করে দিলে মানুষের উপকার করাই হয়। সেই সময়ে ফৌজের কোনো কোনো লোক তাকে সন্দেহ করেছিল। কানাঘুষায় তিনি শুনলেন, সুরেনের মৃত্যুর জন্য দায়ী করা হয়েছে তাকেই। কিন্তু সেখবর তো ফৌজের বাইরের আর কারুর জানবার কথা নয়। সুদীর্ঘ দশ বৎসর আগেকার কথা, আজ আবার নতুন করে ওঠে কেন? বিনিদ্র স্বপ্নাও বিস্ফারিত নেত্রে তাকিয়ে আছে কড়িকাঠের দিকে। ঘরের আলো জ্বলছে। অন্ধকারে থাকতে তার ভয় করে। সে ভাবছে : নীরেন্দ্রনারায়ণ, নীরেন্দ্রনারায়ণ! আজ রাত্রে কেন আমার মনে হচ্ছে, তুমি আবার আমার খুব কাছে এসে দাঁড়িয়েছ? সাগর-সমাধি ছেড়ে কেন তুমি আবার উঠে এসেছ? সেদিন চোখের সামনে দেখলুম, তলিয়ে গেলে তুমি অতল জলে! ভেবেছিলুম তোমার স্মৃতিটুকু পর্যন্ত আর আমার মনকে পীড়া দিতে পারবে না। আবার—তুমি কে? কুমার নরেন্দ্রনারায়ণ? তুমিও কি তোমার হারা ছেলেকে খুঁজতে এসেছ এখানে? লোকে কী বলে শুনেছিলে তো? আমার কাছে তুমি করেছিলে বিবাহের প্রস্তাব। আমিও রাজি হয়েছিলুম। তার অল্পদিন পরেই নীরেন্দ্রনারায়ণ জলে ডুবে মারা যায়। শুনেছি কেউ কেউ সন্দেহ করেছিল যে, যাতে সে তোমার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হয়, সেই উদ্দেশ্যেই আমি ইচ্ছা করেই সমুদ্রের কবল থেকে উদ্ধার করিনি তাকে । তুমিও কি এইসব কথা শুনেছিলে? শুনে কি বিশ্বাস করেছিলে? জানি না। জনবার অবসরও আর পাইনি। তোমার সঙ্গে আমার বিবাহও হয়নি। কারণ পুত্ৰশোকে তুমি যে শয্যা নিলে, সেই শয্যাই হল তোমার মৃত্যুশয্যা। (ক্রমশ) -------- ।।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৯০ জন


এ জাতীয় গল্প

→ হারাধনের দ্বীপ" হেমেন্দ্রকুমার রায় ▪▪▪পঞ্চম পরিচ্ছেদ▪▪▪

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now