বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

"হারাধনের দ্বীপ" হেমেন্দ্রকুমার রায় ▪▪▪তৃতীয় পরিচ্ছেদ▪▪▪

"রহস্য" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X রাত্রের আহারের জায়গা হল বৈঠকখানার পাশের ঘরে। খাবারের আয়োজন হয়েছিল প্রায় ভুরিভোজনের মতো। নিত্যানন্দ যেন একই অনেকজন। তার পরিবেশনে সবাই পরিতুষ্ট। আহারাদির পর সকলেই আবার বৈঠকখানায় এসে বসল। ভোজনের পর চন্দ্রবাবুর খিটখিটে মেজাজ কতকটা যেন প্রসন্ন হয়ে উঠল। তিনি কোনো কোনো প্রসঙ্গ তুললেন, ডাক্তার বোস ও মেজর সেন তার কথা শুনতে লাগলেন । স্বপ্না বললে, ‘মহেন্দ্রবাবু, আপনি তো সিংহলপ্রবাসী শুনলুম। ওখানকার গল্প বলুন। মহেন্দ্র তার কৌতুহল নিবারণের চেষ্টায় নিযুক্ত হল। অমলেন্দু তার চেয়ারখানা টেনে নিয়ে গিয়ে দেওয়াল ঘেঁষে বসল। তারপর তার সতর্ক দৃষ্টি ফিরতে লাগল এর-ওর-তার মুখের উপর। সৌদামিনী চেয়ারের উপরে কাঠের পুতুলের মতো স্থির। তিনি সকলের কথা শুনতে লাগলেন, কিন্তু নিজে একটিও বাক্য উচ্চারণ করলেন না। মনোতোষ চেঁচিয়ে বললে, নিত্যানন্দ, এখানে আইসক্রিম সোড়া থাকে তো আমায় একটা এনে দাও। এখানকার কথাবার্তা তার ভালো লাগছিল না। সে উঠে জানলার কাছে একটা টেবিলের সামনে গিয়ে বসে পড়ল। নিত্যানন্দ একটা গেলাসে আইসক্রিম সোডা ভরে তার সামনে এনে রাখলে। মনোতোষ বললে, আইসক্রিমের আর একটা বোতল আর চাবি টেবিলের উপর রেখে দাও। দু-গ্লাস না খেলে আমার তেষ্টা মিটবে না। গেলাসে বার-দুয়েক চুমুক দিয়ে টেবিলের দিকে তাকিয়ে মনোতোষ সচমকে বলে উঠল, আরে এ কী ব্যাপার! মনোতোষের কথা শুনে সকলেই মুখ ফিরিয়ে তার দিকে তাকিয়ে দেখলে। অমলেন্দু সবিস্ময়ে বললে, ‘টেবিলের উপরে সাজানো ওই মূর্তিগুলো কীসের? দশ দশটা মূর্তি। চন্দ্রবাবু ও সৌদামিনী ছাড়া আর সবাই উঠে সেই টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। মহেন্দ্র কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে ধীরে ধীরে বললে, এগুলো হচ্ছে সেই ছেলেভুলোনো ছড়ার মূর্তি। হারাধনের দশটি ছেলে! স্বপ্না বললে, এ তো ভারী মজার ব্যাপার দেখছি! ওই বাঁধানো ছড়াটা আমার ঘরের দেওয়ালে টাঙানো আছে! তারপর অন্য সকলেও বললে সেই একই কথা। সকলেরই ঘরে টাঙানো আছে ওই ছড়াটা। চন্দ্রবাবু মুখ বিকৃত করে বললেন, একেবারে ছেলেমানুষি ব্যাপার। সকলে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। নিস্তব্ধ রাত্রে বাহির থেকে ভেসে আসতে লাগল সমুদ্রের তরঙ্গ-কোলাহল। সৌদামিনী বললেন, সমুদ্রের সাড়া রাত্রে শোনায় চমৎকার। স্বপ্না তিক্তকণ্ঠে বললে, সমুদ্রের শব্দকে আমি ঘৃণা করি! সৌদামিনী একটু বিস্মিত হয়ে তার মুখের দিকে চোখ তুলে তাকালেন। তারপর আবার স্তব্ধতা। তারপর সমুদ্রের কোলাহল ডুবিয়ে ঘরের ভিতরে আচম্বিতে জাগ্রত হল আর-এক অদ্ভুত কণ্ঠস্বর! সে যেন অমানুষিক কণ্ঠস্বর... —ভদ্রমহোদয় ও মহোদয়াগণ! সকলে চুপ করে আমার কথা শুনুন! প্রত্যেকেই অত্যন্ত চমকে উঠল। সকলে চারিদিকে তাকাতে লাগল—চার দেওয়ালের দিকে, পরস্পরের মুখের দিকে। কে কথা কইলে, কোথা থেকে আসছে এই আশ্চর্য কণ্ঠস্বর? সেই অজানা কণ্ঠে স্পষ্ট, উচ্চস্বরে শোনা গেল… তোমাদের বিরুদ্ধে এই হচ্ছে অভিযোগ… ডাক্তার ভবনাথ বসু। ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে ১৪ই মার্চ তারিখে তুমি লতিকা রায়চৌধুরিকে হত্যা করেছ। সৌদামিনী দেবী, ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে ৫ই নভেম্বর তারিখে তোমার জন্যে অমলাদেবী মারা পড়েছেন। মহেন্দ্রকুমার মিত্র, ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে ১০ই অক্টোবর তারিখে জ্যোতির্ময় বসুর মৃত্যু হয়েছে তোমার জন্যেই। স্বপ্না দেবী, ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে ১১ই আগস্ট তারিখে কুমার নরেন্দ্রনারায়ণের পুত্র নীরেন্দ্রনারায়ণকে তুমি হত্যা করেছ। অমলেন্দু মল্লিক, ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে ফেব্রুয়ারি মাসের কোনো এক তারিখে সিংহলের বিজন অরণ্যে ২১ জন মানুষের মৃত্যুর জন্যে তুমিই দায়ী। মেজর মন্মথমোহন সেন, ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দের ১৪ই জানুয়ারি তারিখে তুমি তোমার স্ত্রীর বন্ধু সুরেন্দ্রনাথ পালকে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে পাঠিয়ে দিয়েছ। মনোতোষ চৌধুরি, গত বৎসরের নভেম্বর মাসের ১৫ই তারিখে তুমি সুকুমার ও তার ভগ্নী অতসীর মৃত্যুর জন্য দায়ী। নিত্যানন্দ দাস ও সত্যবালা দাসী, ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের ৬ই মে তারিখে নিস্তারিণী দেবী মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছেন তোমাদের জন্যেই। চন্দ্রকান্ত চৌধুরি, ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের ১০ই জুন তারিখে বরেন্দ্রনাথ বসুকে তুমি মৃত্যুর মুখে পাঠিয়ে দিয়েছ। আজ তোমরা এখানে বন্দি। নিজেদের স্বপক্ষে তোমাদের কিছু বলবার আছে? স্তব্ধ হল কণ্ঠস্বর। কিছুক্ষণ সবাই স্তম্ভিত ও নির্বাক। তারপরই হুড়মুড় করে কতকগুলো কাচের জিনিস ভাঙার শব্দ হল। নিত্যানন্দ একখানা ট্রের উপরে কয়েকটা ভরতি কফির পেয়ালা সাজিয়ে নিয়ে ঘরের ভিতরে প্রবেশ করেছিল, হঠাৎ তার হাত ফসকে ট্রেখানা সশব্দে পড়ে গেল মেঝের উপরে। এবং ঠিক সেই মুহুর্তেই ঘরের বাহির থেকে শোনা গেল একটু উচ্চ আর্তনাদ ও ধপাস করে একটা দেহ পতনের শব্দ। সর্বপ্রথম সাড়া হল অমলেন্দুর। সে এক লাফে এগিয়ে ঘরের দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বাহিরে দরজার ঠিক সামনেই অচেতন হয়ে পড়ে আছে সত্যবালার দেহ। অমলেন্দু ডাকলে, মনোতোষবাবু! মনোতোষ তাড়াতাড়ি সেখানে ছুটে গেল এবং দুইজনে ধরাধরি করে সত্যবালার দেহ বৈঠকখানায় নিয়ে এসে একখানা সোফার উপর শুইয়ে দিলে। ডাক্তার বোস সত্যবালাকে খানিকক্ষণ পরীক্ষা করে বললেন, কোনো ভয় নেই, অজ্ঞান হয়ে গেছে, এখুনি জ্ঞান হবে। স্বপ্না চেঁচিয়ে বলে উঠল, ও কে কথা কইলে? কোথায় সে? মেজর সেন বললেন, এ সব কী ব্যাপার? কেউ কি আমাদের সঙ্গে কৌতুক করতে চায়? তার হাত ঠকঠক করে কাঁপছে। তাকে দেখলে মনে হয়, তার বয়স যেন দশ বছর বেড়ে গিয়েছে! মহেন্দ্রর সর্বাঙ্গ ঘেমে উঠেছিল, রুমাল বার করে সে মুখ মুছতে লাগল। কেবল চন্দ্রবাবু ও সৌদামিনী এমন স্থির ভাবে বসেছিলেন, যেন এখানে অসাধারণ কোনো কিছুই ঘটেনি। অমলেন্দু বললে, মনে হচ্ছে, এই ঘরের ভিতরে দাঁড়িয়েই এইমাত্র ওই কথাগুলো কেউ উচ্চারণ করেছে। স্বপ্না বললে, কিন্তু কে সে? নিশ্চয়ই আমাদের মধ্যে কেউ নয়? অমলেন্দুর চোখ একবার ঘরের খোলা জানালার দিকে আকৃষ্ট হল। তারপর সে মাথা নাড়লে নিশ্চিতভাবে, না—ওখান থেকে কেউ কথা বলেনি। ঘরের আর-একদিকে আর-একটা দরজা দিয়ে পাশের অন্য-একটা ঘরের ভিতরে যাওয়া যায়। অমলেন্দু ধাক্কা মেরে সেই দরজাটা খুলে ফেলে ভিতরে ঢুকেই বলে উঠল, ও, এইবারে বোঝা গেছে। সকলে তাড়াতাড়ি উঠে তার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। কেবল সৌদামিনী সিধে হয়ে স্থিরভাবে বসে রইলেন নিজের চেয়ারের উপরে। ও-ঘরের দেওয়াল ঘেষে দাঁড় করানো আছে একটা টেবিল এবং সেই টেবিলের উপরে রয়েছে প্রকাণ্ড একটা চোঙায়ালা সেকেলে গ্রামোফোন। চোঙার মুখটা স্পর্শ করে আছে বৈঠকখানা ঘরের দেওয়ালকে । অমলেন্দু চোঙাটা ঠেলে সরিয়ে দিতেই দেখা গেল, দেওয়ালের উপরে রয়েছে ছোটো ছোটো তিন-চারটে ছিদ্র। অমলেন্দু গ্রামোফোনের সাউন্ড বক্সটা রেকর্ডের যথাস্থানে স্থাপন করে আবার কল চালিয়ে দিলে এবং সঙ্গে সঙ্গে আবার শোনা গেল—ভদ্রমহোদয় ও মহোদয়াগণ! সকলে চুপ করে আমার কথা শুনুন! স্বপ্না চেঁচিয়ে উঠল, বন্ধ করে দিন—মেশিন বন্ধ করে দিন! এ হচ্ছে ভয়ানক? অমলেন্দু মেশিন বন্ধ করে দিল। ডাক্তার বোস আশ্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বললেন, এ হচ্ছে একটা যাচ্ছেতাই নির্দয় ঠাট্টা! অত্যন্ত অপমানকর! পরিষ্কার স্বরে চন্দ্রবাবু, আপনি তাহলে একে ঠাট্টা বলেই মনে করছেন! ডাক্তার ফ্যালফ্যাল করে তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন, তা ছাড়া আর কী মনে করতে পারি? চিবুক চুলকোতে চুলকোতে চন্দ্রবাবু শান্তকণ্ঠে বললেন, আপাতত আমি কোনো মতামত প্রকাশ করতে চাই না। মনোতোষ বললে, কিন্তু আপনারা একটা কথা ভুলে যাচ্ছেন। এই মেশিনটা চালিয়ে দিয়েছে কে? চন্দ্রবাবু বললে, হ্যাঁ, এইবারে সেই কথা নিয়েই আলোচনা করতে হবে। চলুন, আবার বৈঠকখানায় গিয়ে বসি। সত্যবালার তখন জ্ঞান হয়েছে। সে ক্ৰন্দন করছিল অস্ফুট স্বরে। তার পাশে গিয়ে একখানা চেয়ারের উপরে বসেছিলেন সৌদামিনী। নিত্যানন্দ কাছে গিয়ে সৌদামিনীকে সম্বোধন করে বললে, আপনি দয়া করে সরে বসুন। আমাকে ওর সঙ্গে কথা কইতে দিন। সত্য, তুমি কাঁদছ কেন? চুপ করো, শাস্ত হও। সত্যবালা উদ্ভ্রান্ত চোখে সকলকার দিকে তাকাতে লাগল। ডাক্তার সান্ত্বনা কণ্ঠে বললেন, কেঁদো না সত্যবালা, তোমার আর কোনো ভয় নেই। —হ্যাঁ। পাণ্ডুমুখে কম্পিতস্বরে সে বললে, ওই কণ্ঠস্বর—ওই ভয়ানক কণ্ঠস্বর—ঠিক যেন বিচারক রায় দিচ্ছেন আসামিদের প্রতি— নিত্যানন্দ বললে, হ্যাঁ, আমিও এমন চমকে গিয়েছিলুম যে আমার হাত থেকে ট্রেখানা পড়ে গেল। ওসব হচ্ছে মিথ্যাকথা—একেবারে বাজে মিথ্যাকথা! চন্দ্রবাবু দু-এক বার কেশে নিজের গলা পরিষ্কার করে নিয়ে বললেন, গ্রামোফোনের মেশিনটা চালিয়ে দিয়েছিল কে? তুমিই কি? নিত্যানন্দ চিৎকার করে বলে উঠল, ও রেকর্ডে কী আছে আমি তা জানতুম না! ভগবানের দিব্য, আমি কিছুই জানতুম না! জানলে পরে আমি কিছুতেই একাজ করতুম না! চন্দ্রবাবু শুষ্ককণ্ঠে বললেন, তোমার কথা আমি সত্য বলেই মেনে নিচ্ছি। কিন্তু মেশিনটা তুমি চালিয়ে দিয়েছিলে কেন? —আমি মনিবের হুকুম তামিল করতে বাধ্য। —কে তোমার মনিব? —কে যে আমার মনিৰ তাও আমি জানি না। তবে অ্যাটনি বিজনবাবুর মুখেই আমি তার হুকুম শুনেছি। —হুকুমটা কী, নিত্যানন্দ? —আমাকে ওই রেকর্ডখানা মেশিনের উপরে রাখতে হবে। তারপর রাত্রের খাওয়া-দাওয়া হয়ে গেলে আমি যখন কফির ট্রে হাতে করে বৈঠকখানায় আসব, আমার স্ত্রী তখন মেশিনটা চালিয়ে দেবে। অত্যন্ত মৃদুকণ্ঠে চন্দ্রবাবু বললেন, আশ্চর্য কথা! নিত্যানন্দ আবার চেঁচিয়ে বললে, কিন্তু আশ্চর্য হলেও আমি সত্য কথাই বলছি। ওই রেকর্ডের উপরে একটা নামও লেখা আছে। আমি ভেবেছিলুম, ওখানা কোনো গানের রেকর্ড। অমলেন্দুর দিকে তাকিয়ে চন্দ্রবাবু বললেন, এই রেকর্ডের উপরে কোনো নাম লেখা আছে নাকি? অমলেন্দু স্নান হাসি হেসে বললে, আছে, মশাই, আছে। রেকর্ডের উপরে লেখা আছে—‘সর্বশেষের গান’! মেজর সেন উত্ত্যক্ত কণ্ঠে বললেন, সমস্ত ব্যাপারটাই হচ্ছে রাবিশ! সকলের নামেই এইরকম বাজে অভিযোগ করা! কে এই বাড়ির মালিক? অ্যাটনি বিজন বোসের সঙ্গে তার কী সম্পর্ক? সৌদামিনী তীক্ষ কষ্ঠে বললেন, হ্যাঁ, কে এই বাড়ির মালিক? জজ চন্দ্রকান্তবাবু, চিরকালই হুকুম দেওয়া ছিল তার পেশা। সেই রকম হুকুমের স্বরেই তিনি বললেন, হুঁ, এইবারে ওই কথাটাই জানা দরকার। নিত্যানন্দ, তুমি আগে তোমার স্ত্রীকে এ ঘর থেকে নিয়ে যাও। তারপর আবার ফিরে এসো। নিত্যানন্দ বললে, আজ্ঞে হ্যাঁ। তারপর তার কাধে ভর করে সত্যবালা সেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। সকলেরই কণ্ঠস্বর শুকিয়ে গিয়েছিল। মনোতোষ বললে, আমার তেষ্টা পেয়েছে। আপনারাও কিছু পান করবেন নাকি? সবাই বললে, হ্যাঁ। মনোতোষ বললে, পাশের ঘরে একটা সেলফের উপরে আমি অনেকগুলো সোডা-লেমোনেডের সাজানো বোতল দেখে এসেছি। আপনারা একটু অপেক্ষা করুন, আমি এখনই নিয়ে আসছি। নিত্যানন্দ আবার ঘরের ভিতরে এসে ঢুকল। চন্দ্রবাবু বললেন, তা হলে নিত্যানন্দ, এ বাড়ির মালিক কে, তুমি তা জানো না? —আজ্ঞে না। আমি তাকে দেখিওনি, তার নামও শুনিনি। আমাকে নিযুক্ত করেছেন অ্যাটনি বিজনবাবু। চন্দ্রবাবু বললেন, অ্যাটনি বিজন বসু? হুঁ, ও নাম আমার পরিচিত। তারপর নিত্যানন্দ, তোমার আর কী বক্তব্য আছে? —আপনারা আসবার দু-দিন আগে আমরা দুজনে এখানে এসেছি। দেখলুম, সাজানো-গুছানো বাড়ি, ভাড়ার ঘর খাবারে ভরতি। কোথাও কিছুরই অভাব নেই। —তারপর? —তারপর আর বলবার কথা বিশেষ কিছুই নেই। তারপর আমি একখানা চিঠি পাই। তাতেই লেখা ছিল, আমাকে কী কী করতে হবে। —সে চিঠিখানা তোমার কাছে আছে? —আজ্ঞে হ্যাঁ। এই নিন। নিত্যানন্দ পকেট থেকে একটা কাগজ বার করে চন্দ্রবাবুর হাতে দিলে। চন্দ্রবাবু চিঠিখানার দিকে তাকিয়ে বললেন, চিঠিখানা দেখছি টাইপ করা। লেখকের ঠিকানা হচ্ছে কলকাতার গ্র্যান্ড হোটেল। মহেন্দ্র টপ করে এগিয়ে এসে চিঠিখানা টেনে নিয়ে বললে, আমাকে একবার চিঠিখানা দেখতে দিন। তারপর কাগজখানার উপরে দৃষ্টি নিবন্ধ করে মৃদুস্বরে ধীরে ধীরে বললে, আন্ডারউড টাইপরাইটার! নতুন যন্ত্র—কোনো টাইপ ক্ষয়ে যায়নি। সাধারণ টাইপ করার কাগজ। এর ভিতর থেকে বিশেষ কিছু আবিষ্কার করা চলবে না। হয়তো আঙুলের ছাপ পাওয়া যেতে পারে কিন্তু পাওয়া যাবে বলে আমি বিশ্বাস করি না। চন্দ্রবাবু হঠাৎ অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে মহেন্দ্রের দিকে করলেন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিপাত। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, আশ্চর্য আপনার নাম তো এখনও আমরা জানতে পারিনি? মহেন্দ্র থতমত খেয়ে একটু থেমে বললে, আমার নাম? আমার নাম নরেন্দ্রনাথ লাহিড়ি। চন্দ্রবাবু কিছুক্ষণ গম্ভীর হয়ে বসে রইলেন। তারপর বললেন, এইমাত্র গ্রামাফোনের রেকর্ডের সাহায্যে সকলকার নামে কোনো ব্যক্তি গুরুতর অভিযোগ করেছে। নরেনবাবু, আপনি ছাড়া অভিযোগ হয়েছে আর-সকলের বিরুদ্ধেই। না, ঠিক সকলের বিরুদ্ধে নয়, অভিযুক্তদের মধ্যে আছেন মহেন্দ্রকুমার মিত্র নামে জনৈক ব্যক্তি। তিনি কে? তিনি তো এখানে উপস্থিত নেই? মহেন্দ্র নাচারভাবে বললে, দেখছি, আত্মপ্রকাশ করা ছাড়া আমার পক্ষে আর কোনো উপায় নেই। চন্দ্রবাবু, আমার নাম নরেন্দ্রনাথ লাহিড়ি নয়। —তা হলে আপনারই নাম কি মহেন্দ্রকুমার মিত্র? —আজ্ঞে হ্যা। অমলেন্দু তপ্তকণ্ঠে বললে, আপনি কেবল নাম লুকিয়ে এখানে আসেননি। মিথ্যা কথা বলতেও আপনার বাধে না। আপনি নিজেকে সিংহলপ্রবাসী বলে জানাতে চান। সিংহলে আমি অনেকবার গিয়েছি। একটু আগেই আপনার মুখে সিংহলের যে-সব গল্প শুনছিলুম, সেখানে গেলে নিশ্চয়ই আপনি ওরকম বাজে গল্প বলতে পারতেন না। কে আপনি? সকলের দৃষ্টি গেল মহেন্দ্রর দিকে—ক্রুদ্ধ, সন্দেহপূর্ণ দৃষ্টি। মনোতোষ এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল তার সামনে, তার দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ। খাপ্পা হয়ে সে বললে, কে তুমি, নাম আর পরিচয় লুকিয়ে আমাদের দলে এসে যোগ দিয়েছ? মহেন্দ্র কিছুমাত্র সঙ্কুচিত হল না, শান্ত অথচ দৃঢ়কষ্ঠে বললে, আপনারা সকলেই আমাকে ভুল বুঝেছেন দেখছি। আমার পরিচয়ও আমি দিতে পারি আর তার প্রমাণও আমি দেখাতে পারি। আমি আগে ছিলুম পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগে, এখনও প্রাইভেট ডিটেকটিভে’র কাজ করি। কোনো ব্যক্তি এই দ্বীপে আসবার জন্যে আমাকে নিযুক্ত করেছেন। চন্দ্রবাবু বললেন, কোনো ব্যক্তি মানে? কে সে? —পিছনে কে আছেন আমি তা জানি না, কিন্তু আমাকে নিযুক্ত করেছেন অ্যাটনি বিজন বোস। তারই কথামতো আমিও একজন অতিথিরূপে এখানে এসেছি। আমার কর্তব্য হচ্ছে, আপনাদের সকলেরই উপরে সতর্ক দৃষ্টি রাখা। এজন্য আমি যথেষ্ট পারিশ্রমিকও পেয়েছি। —আমাদের উপরে দৃষ্টি রাখবার কারণ? —কাননকুন্তলা দেবী বলে কোনো মহিলার এখানে আসবার কথা। তাঁর গায়ে নাকি থাকবে লক্ষাধিক টাকার জড়োয়া গয়না। আসলে আমাকে পাহারা দিতে হবে তার জন্যেই। কিন্তু আমার কী বিশ্বাস জানেন? কাননকুন্তলা দেবী হচ্ছেন কাল্পনিক মহিলা, সুতরাং কোনোদিনই তিনি এখানে আসবেন না। চন্দ্রবাবু বললেন, আপনার বিশ্বাস বোধহয় ভুল নয়। স্বপ্না বলে উঠল, কিন্তু ব্যাপারটা মনে হচ্ছে যেন ডাহা পাগলামি! চন্দ্রবাবু ঘাড় নেড়ে সায় দিয়ে বললেন, আমারও তাই মনে হয়। আমরা কোনো বিপজ্জনক পাগলের পাল্লায় পড়েছি। (ক্রমশ) ---------- ।। একাকী কন্যা ।।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৭৭ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now