বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

"মা" লেখিকা -সারাহ্ ইকবাল

"ছোট গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X অনেকদিন পর আজ দেশে বেড়াতে যাচ্ছে আমির-আনিকা জুটি, প্রায় চার বছর পর বলা যায়।আজ প্রায় একযুগেরও বেশি সময় ধরে এই দম্পতী কানাডাপ্রবাসী, মাঝখানে আরো দুইবার ছুটিতে দেশে গেলেও এইবারই প্রথম একদম হঠাৎ করে দেশে যেতে হচ্ছে ওদের।কারণ আমিরের আম্মা হঠাৎ করে বেশ অসুস্থ হয়ে পরাতে ও বারবার হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে, " আমার ছেলে কোথায়? ওকে একটু ডেকে দাও" বলে কান্নাকাটি করাতে প্রায় বাধ্য হয়ে আমির সিদ্ধান্ত নেয় দেশে দ্রুত যাবার।যদিওবা এই বলা নেই কওয়া নেই হুট করে দেশে যাবার কথায় আনিকা কিছুটা অভিমান করে ছিলো আমিরের উপর,এমনকি সে শুধু আমিরকেই একা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো।কিন্তু যখন আমিরের আব্বা ও বোনেরা কল দিয়ে পুরো পরিবারসহ আমিরকে যেতে অনুরোধ করলো রীতিমতো আমিরের সাথে কলা বলা বন্ধ করে দিলো আনিকা।তারপর আনিকার যখন মাথা কিছুটা ঠান্ডা হলো, সে আমিরকে বুঝিয়ে বলতে লাগলো, - দেখো আমির, আমি মানছি তোমার আম্মা অনেক অসুখ।কিন্তু এটা ভেবে দেখো এই যে আমরা চারজন এতোগুলো টাকা খরচ করে টিকিট কেটে দেশে গিয়ে যদি দেখি আম্মা সুস্থ, তাহলে? পানিতে ফেলার মতন টাকার মালিক নাকি আমরা? তারথেকে ভালো হয়, তুমি যাও।যদি তোমার মনে হয় আমাদের ও আসা উচিৎ, তখন জানিও। আমি আজান ও আয়াতকে নিয়ে চলে আসবো।আই প্রমিজ। আনিকা আমিরের পাশে এসে বসলো, ওর হাতটা শক্ত করে ধরলো।আমির কিচ্ছুক্ষণ মাটির দিকে নিশ্চুপে তাকিয়ে থাকার আনিকার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বললো, - আমি আম্মাকে গিয়ে কি জবাব দিবো? যদি তোমাদের কথা জিজ্ঞাসা করেন?? এবার আনিকা ক্ষেপে গেলো, - উনি হাসপাতালের বিছানায় কি একবারো বলেছেন আমার ছেলে, ছেলের বউ, নাতি- নাতনীরা কোথায়?? উনি বলেননি কিন্তু। তোমার আম্মা তার ছেলেকে দেখতে চান, আমি পাঠাচ্ছি তার ছেলেকে। এইটুকু কি যথেষ্ট নয়,আমির?? আমির আর মাথা ঠান্ডা রাখতে পারলো না। সেও চেঁচিয়ে বললো, - তুমি কখনওই আমার পরিবারকে আপন ভাবতে পারোনি তাই না, আনিকা?? কানাডায় তোমার মা,ভাই তোমার সব আত্মীয়স্বজন আছে, তাই তুমি সুখী। আর আমি? কে আছে আমার?? তবুও তো আজ চৌদ্দবছর ধরে আছি এই পরদেশে।ভালবেসে তোমায় বউ করেছিলাম বলে আজ এইদিন দেখতে হবে আমাকে?? - ওমা তাই বুঝি! তোমার কেউ নেই?? আমি, আজান ও আয়াত, আমরা কি উড়ে এসেছি জুঁড়ে বসেছি তোমার জীবনে?? আমরা আপন নই! আনিকা রাগের মাথায় বেডসাইড টেবিলে রাখা ল্যাম্প মাটিতে ছুঁড়ে ফেললো। আমির আর কথা না বাড়িয়ে রুম থেকে বেরিয়ে আজান ও আয়াতের রুমে গেলো। আমিরের রাগ হলেই সে নিজের সন্তানদের রুমে যায়।ছোটকালে ওর আম্মা এই কাজটিই করতেন। স্বামী- সংসার নিয়ে কোন ঝামেলার সৃষ্টি হলেই তিনি আমিরকে কোলে নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকতেন। আমির ক্লাস ফাইভে পড়া পর্যন্ত তিনি সেটি অব্যাহত রেখেছিলেন, হয়তোবা আরো রাখতেন যদি না একদিন আমির বলেই ফেলে, -আম্মা আমি এখন বড় হয়ে গেছি, আর কোলে নিও না।আমার লজ্জা লাগে। সেইদিন আমিরের এই কথা শুনার পর ওর আম্মার হুঁশ ফিরে যে আসলেই তার ছেলে এখন আর কোলের নেওয়ার মতন বয়সে নেই।যদিওবা তিনি আমিরের চুলে হাত বুলিয়ে ও কপালে চুমু খেয়ে বলেছিলেন, -বাবা আমার, মায়ের কাছে সন্তান সারাজীবন ছোট অনেক।যখন তুই বুড়া হবি, তখনো আমার চোখে তুই ছোটই রইবি। ওইদিন আমির কিছু না বুঝে শুধু আম্মার দিকে ড্যাঁবড্যাঁব করে তাকয়েই ছিলো।কিন্তু আজ এতগুলা বছর কেটে যাবার পর, নিজের সন্তান হবার পর পিতা- মাতার কাছে সন্তান কি এই কথায় মমার্থ সে খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারে। কিন্তু তার শুধু কষ্ট একটা জায়গাই, ছয় বছরের প্রেম ও চৌদ্দবছর সংসার করার পরেও আনিকা আজ অবধি ওকে বুঝেনি। একটা মানুষকে বুঝতে কি বিশ বছর যথেষ্ট নয়?? নাকি উল্টো ঘটনা ঘটেছে। এই বিশবছরেও সে নিজেই আনিকাকে চিনে উঠতে পারেনি?? আমির তার সন্তানদের রুমে গিয়ে ঢুকলো। তার ছেলে আজানের বয়স এগারো বছর ও মেয়ে আয়াতের বয়স চারবছর। আজ ছুটিরদিন, তাই দুজনই বাসাতে। ওরা দুই ভাইবোন মিলে পড়ার টেবিলে বসে একসাথে কিছু করছিলো, আমিরকে দেখে আয়াত দৌড়ে এসে ওর কোলে চড়ে বসলো। তারপর ওর আদুরে গলায় বললো, - ড্যাডি, উই আর মেকিং সামথিং ফর মম। প্লিজ ডোন্ট টেল হার এবাউথ ইট। উই আর গোনা সারপ্রাইজ হার। - ওহ রিয়েলি! ওকে আই এম নোট গোনা টেল, ইফ ইউ শো মি হোয়াট আর ইউ গাইজ মেকিং ফোর ইউর মম। আমির আয়াতের গালে চুমু দিয়ে বললো। আজান টেবিলের সামনে চেয়ারে বসা অবস্থায় আমিরের সামনে একটা পোস্টারের সাইজের কাগজ মেলে ধরলো। পুরোটা কাগজ জুঁড়ে ওদের পুরো পরিবারের ছবি আঠা দিয়ে লাগানো, সাথে দুই পিচ্চির নিজেদের হাঁতে আঁকা নানা কারুকার্যও রয়েছে। আর কাগজের ঠিক মাঝখানে বড়বড় করে রঙিন সাইনপেন দিয়ে লিখা, " Happy Mother's Day, Mom! Azaan- Ayaat love you a lot! You're the world best mom!" কাগজটি দেখে আমিরের বুকের ভিতর কেমন একটা মোচড় দিয়ে উঠলো, সে ছেলেমেয়েকে ওদের এতো সুন্দর সারপ্রাইজ তৈরি করার জন্য কিচ্ছুক্ষণ বাহাবা দেওয়ার পর নিজে এসে নিজের ঘরে একা চুপচাপ বসে রইলো।আনিকা পাশের ফ্ল্যাটে গেছে, ওর মায়ের বাসায়। আনিকা দিনের অর্ধেক সময় ওই বাসায় কাটাতে ভালবাসে। এমনকি আমির যেদিন কাজে বেশি ব্যস্ত থাকে, আনিকা রান্নাবান্নাও করেনা। সে ও ওদের সন্তানেরা ওইদিন ওর মায়ের বাসাতেই খাওয়াদাওয়া সেরে নেয়। এতে আমিরও কখনো আপত্তি করেনি।ও বরং খুশিই ছিলো,আনিকা ও ওর সন্তানেরা আপনজনের ভালবাসা পাচ্ছে, ওরা খুশি আছে। আমিরের আজ খুব নিজের পরিবারের কথা মনে পরছে। ওর বাবা- মা, দুই বড়বোন। কত্ত সুখের সংসার ছিলো ওদের। কলেজে থাকাকালীন আনিকার সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পরে ও, আনিকা আর ও ব্যাচমেট ছিলো।তারপর কলেজ শেষ হলে আনিকা ওর পরিবারের সাথে কানাডা চলে আসে। তবে ওদের ভালবাসা শক্তিশালী ছিলো বলে সম্পর্ক টিকে ছিলো।এরপর আমির ভার্সিটি শেষ করে বাসায় আনিকার কথা বলে। আনিকা আগেই বলে দিয়েছিলো সে আর দেশে ফিরতে পারবে না, সে চেয়েছিলো আমির যেন কানাডাতে এসে ওর সাথে এখানে সংসার করে।আমির ও ভেবেছিলো বাংলাদেশ থেকে কানাডাতে ওর ক্যারিয়ার ও ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। তাই সে ওর পরিবারের সামনে আনিকার কথা তোলার সাথে নিজের কানাডা যাবার সিদ্ধান্তও ব্যক্ত করেছিলো। ওর আম্মা ওর কথায় কোন দ্বিমত পোষণ করেননি, যদিওবা আড়ালে তিনি কেঁদে বুক ভাসিয়েছিলেন। কিন্তু বেঁকে বসেন ওর আব্বা, পরে দুই দুলাভাইকে দিয়ে আব্বাকে রাজি করেছিলো ও। আমির বিয়ে পর আনিকার সাথে সেই যে কানাডা এসেছে, মাঝখানে দুবার একমাস একমাস দুইমাসের জন্য দেশে গেলেও আত্মীয়স্বজন - বন্ধুবান্ধব, নিজের বউ- বাচ্চা,ঘুরাঘ,দাওয়াত, শোপিং এর ব্যস্ততায় নিজের আম্মার সাথে আলাদা বসে এক কাপ চা খাওয়ার সুযোগ পায়নি ও।কানাডা থেকে প্রতিদিন না হলেও সপ্তাহে একবার দেশে কল দিলেও আম্মার কান্নাকাটিতেই সব সময় শেষ হয়ে যায়। আমিরের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে আসলো, " কবে শেষ আম্মাকে হাসতে দেখেছে? আম্মার সুখ- দুঃখ জানতে চেয়েছে? এখন আম্মা আব্বার সাথে রাগ করে কার কাছে যান?? " অতঃপর, দুইদিন পর। আজ আমির তার পুরো পরিবার নিয়ে দেশে যাচ্ছে। আজ রাত তিনটায় ওর বড় দুলাভাই কল করেছিলেন,ওর আম্মা চিরবিদায় নিয়েছেন। আর আজই ঘুমাতে যাবার আগে ঠিক বারোটায় আধো আধো ঘুম নিয়ে ওর সন্তানেরা আনিকাকে নিয়ে মাদারজ ডে'র কেক কেটেছে। আনিকার ভাই ভাগিনা- ভাগিনীদের কেক ও উপহার এনে সাহায্য করেছেন ওদের মায়ের জন্য এই দিনটি স্মরণীয় করে তুলতে।আনিকা পিচ্চিদের মতন আহ্লাদে আটখানা হয়ে উঠেছিলো। সে বারবার নিজের সন্তানদের জড়িয়ে ধরে চুমু খাচ্ছিলো আর বলছিলো, "ওহ মাই গড, আই এম ব্লেসড।আই এম দ্যা মাদার অফ টু ওয়ান্ডারফুল চিল্ড্রেন"। আম্মার চলে যাবার কথা শুনার পর একফোঁটাও জল ফেলেনি আমির। সে শুধু নিজেকে মনে মনে অবিরত বলছে, " তুই একটা অমানুষ, আমির। তুই কাঁদিস না।তুই তোর আম্মার সুপুত্র না, তুই আর হওয়ার সুযোগও পাবিনা"।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১০১ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now