বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
.....................................
শান্তনুকে আমি ভুলেগিয়েছিলাম চৈত্রের এমনই এক প্রহরে।হ্যাঁ,সত্যি বলছি আমি ওকে ভুলে গেছি!
শান্তনুর শান্ত স্বভাবটা হটাৎ অশান্ত হয়ে উঠার স্মৃতিটুকু কেবল আমি ভুলতে পারিনা।তার সারল্য,সততা আমাকে এতোটাই মুগ্ধ করেছে যে শান্তনুর হয়ে আমি আরেকবার জন্মাতে চেয়েছিলাম সেদিন।শেষ দিন।
স্টেশনটা যদি না থাকতো শান্তনুও আমার জীবনে আসতো না।আমরা কেউ কাউকে চিনতাম না কখনোই।
মনটা কোন এক কারণে খুব খারাপ ছিল,স্টেশনে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছিলাম।আজেবাজে চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল মাথায়।দুপুর দুটায় ট্রেন কিন্তু চারটে বেজে গেছে তবুও ট্রেনের দেখা নেই!হটাৎ সিদ্ধান্ত নিলাম বাসায় ফিরবো না,ট্রেন আসলেও।
কেউ একজন বলে উঠলো-এই শুনছেন?ট্রেন নাকি আসবে না।
মানে?
ইঞ্জিনে প্রবলেম হয়েছে।
আপনি জানলেন কি করে?
কাউন্টার থেকে এইমাত্র শুনলাম।
ও!
ছেলেটি চলে গেলো একটু দুরে।মুখটা খেয়াল করিনি।হয়তো অনেক্ষন ধরে আমায় ফলো করছিল সে।
যাইহোক,নতুন টেনশানে পড়লাম এবার।এখনতো বাসায় ফিরতে ইচ্ছে করছে খুব!মা দুঃচিন্তা করবে দেরী হয়ে গেছে অনেক।
স্টেশনটা ধীরে ধীরে জনশূন্য হয়ে পড়ছে,ছেলেটিকেও দেখলাম রিকশায় উঠতে।আমিও চলে যাবো বাসে করে।.......
কিছুদিন পর স্টেশনে আবার ছেলেটিকে দেখলাম,হাতে একটা বই।পরনে আকাশি রংয়ের টি-শার্ট।
ছেলেটি একা চুপচাপ দাড়িয়ে। আমাকে দেখেই এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো,আরে আপনি সেই ব্যাক্তি নাহ?
হ্যাঁ।
তা কিভাবে ফিরলেন সেদিন?
বাসে করে।আপনি কি করে চিনলেন?আমিতো বোরখায় ছিলাম সেদিন!
আপনি আনমনা দাঁড়িয়ে ছিলেন তো তাই চিনতে অসুবিধে হয়নি।সবসময় কি এমন মুড অফ থাকেন?
নাহ!
কেউ একজন ডাকলো,শান্তনু এদিকে আয় তো।আসছি-
ট্রেন চলে এসেছে।শান্তনুদের দেখলাম পাশের কামরাতে উঠছে।
এভাবেই স্টেশনে বার বার দেখা এবং শান্তনুর সাথে আমার বন্ধুত্ব।সে আমার দু'বছরের জুনিয়র ছিলো।অনার্স প্রথম বর্ষে পড়তো শান্তনু আর আমি তৃতীয় বর্ষে।একই কলেজে পড়তাম আমরা।
আমার বন্ধু বলতে তেমর কেউই ছিলো না।শান্তনুই আমার প্রথম ছেলে বন্ধু।একটু ধার্মিক টাইপ ছিলাম বলে তেমন কোন ছেলের সাথে কথা বলিনি।তবে শান্তনুর সাথে পরিচয় হওয়ার পর অনেকটা বদলে যাই।
শান্তনু আমাকে খুব পছন্দ করতো,আমরা একসাথে বসে আড্ডা দিতাম তমাল তলায়।রেললাইনে পাশাপাশি হাঁটতাম অনেক।আস্তে আস্তে আমরা একজন আরেকজনের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ি।একদিন কথা না হলে কেমন যেন অস্থিরতা কাজ করে মনে!না,না এটা হয় না।শান্তনু যে আমার ছোট হয়।ক্লাসেও,বয়সেও!
তাই কিছুদিন শান্তনুকে এড়িয়ে চলার চেষ্ঠা করি।ফোন রিসিভ করিনি,ক্যাম্পাসেও দেখা করিনি।শান্তনু আমায় পাগলের মতো এসএমএস করতে থাকে-ফারহানা,তুমি এমন করছো কেন?আমার কি অন্যায় সেটা বলো প্লিজ।কথা বলো,ইত্যাদি—
শান্তনু,আমি তোমার বড় আপু হই!আমার সাথে তোমার এতো কথা বলা উচিৎ নয়।দুরত্ব রাখা ভালো।
শান্তনু কিছুই বুঝেনা,অশান্ত হয়ে পড়ে খুব।মিতা ফোন দিয়ে বলে সে নাকি ফোন করে অনেক কান্না করেছে।আমি এমন করছি কেন বার বার জানতে চেয়েছে।আমারো কেমন জানি ভালো লাগছে না শান্তনুকে ছাড়া।
পরদিন ক্যাম্পাসে আমরা গল্প করি অনেক।শান্তনুর মন খারাপ ছিলো খুব,অভিমানে চুপচাপ ছিলো।ফেরার সময় শুধু চেনাসুরে ডেকে বলেছে-ফারহানা তুমি আর আমার সাথে এমন করো না।আমার খুব কষ্ট হয়।
আমি চলে আসি।
এভাবে আমরা খুব আপন হয়ে পড়ি।ভুলে যাই বয়সের সীমা।শান্তনু খুব ভালবাসে আমাকে!আমিও বাসি খুউব।শান্তনু আমার প্রথম প্রেম।আমিও তার—
আমাদের অসম প্রেমের গল্পটা ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়ে ধীরে ধীরে।কানাঘুষা চলতে থাকে সবার মাঝে।শান্তনু অবশ্য এসব কথার তোয়াক্কা করে না।আমাকে তেমন কেউ চিনতো না বোরখা পড়ার জন্যে কিন্তু অসম প্রেমটার জন্যে এখন সবাই চিনে।আমি অনেকটা পরিচিত হয়ে পড়ি।
এই সেই মেয়েটা না?আরে ওই যে জুনিয়র ছেলের সাথে-
ছিঃ।
শান্তনু জবাব দিতে চাইতো কিন্তু আমার জন্যে পারেনি।আমাকে দেখতে অবশ্য শান্তনুর চেয়ে কমবয়সী মনে হতো।কিন্তু এখন আমি সবার সিনিয়র আপু।
আমরা গল্প করতাম অনেক।শান্তনু নামাজ পড়তো নিয়মিত তা না হলে আমি ওর সাথে কথা বলবো না।আমাকে দেয়া ওর প্রথম এবং শেষ গিফট ছিল "বোরখা"।আর আমি তাকে দিয়েছিলাম কবিতার বই এবং একটা নীল রঙের টি-শার্ট। আমরা কথা বলতাম ফোনে রাত প্রায় ২ টা পর্যন্ত।রুমে একা থাকায় সমস্যা হতো না।......
কিছুদিন হলো শান্তনু ক্যাম্পাসে আসছে না,ফোনেও পাচ্ছি না।খুব অস্থিরতা কাজ করছিল,কি হলো ওর?
আমি ভুল করেছি শান্তনুকে বিশ্বাস করে।ভুল যদি হয় তবে একই ভুল শান্তনুও করেছে।
কলেজের পাশেই একটা মেসে থাকতো সে।খোঁজ নিয়ে দেখি একসপ্তাহ হলো মেস ছেরে দিয়েছে।আর আমাদের কথা হয়না আজ তেরো দিন।
ঠিক সতেরো দিনের মাথায় শান্তনু আমাকে কল দেয়,ক্যাম্পাসে আসে।আমরা আগের মতো গল্প করি।তবুও যেনো একটুরো মেঘ শান্তনুর মনে জমে আছে।
এক সপ্তাহ পর শান্তনু কেমন যেনো বদলে যেতে লাগলো।তেমন কথা বলেনা।অথচ এই শান্তনুর জন্য আমি অপবাদ শুনি।বিষয়টা মাও জেনে গেছে।অনেক কষ্টে বুঝিয়েছি মাকে সে আমার খুব ভালো বন্ধু।মিথ্যে বলেছি মাকে।আজ শান্তনু আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছে,কষ্ট দিচ্ছে!আমি ঠকেছি শান্তনুকে বিশ্বাস করে।খুব কাঁদতে ইচ্ছে করছিলো চিৎকার করে।আমি আর পারছিনা।
শান্তনু হটাৎ এসে একদিন বললো-ফারহানা চলো পালিয়ে যাই!
শান্তনু!
হ্যাঁ,চলো।পালাবে না?
পালাবো।কি হয়েছে তোমার বলোতো?
চলো রেললাইনে হেঁটে হেঁটে বলি।
শান্তনু আর আমি পাশাপাশি হাঁটছি।
-ফারহানা,বাড়িতে আমাদের বিষয়টা জেনে গিয়েছে।
মানে!?
-হ্যাঁ।খুব প্রেসারে ছিলাম কিছুদিন।তবে এখন সব ম্যানেজ করে নিয়েছি।খুব ভালবাসি আমি তোমাকে!
-জানিতো!
-আচ্ছা,যদি কখনো শুনতে পাও যে শান্তনু মরে গেছে।তবে কি করবে তুমি?
-নাহ!এমন শুনবো না কখনোই।শান্তনু আমাকে ঠকাতে পারে না।আমি আরেকবার শান্তনুর জন্য জন্মাতে চাই,তার জুনিয়র হয়ে!
সেদিন আমাদের অনেক কথা হয়েছিল।চৈত্রের রোদ ছিল মাথার উপরে তবুও রোদ মনে হয় নি।শান্তনু ছাতা ধরে রেখেছিল মাথার উপরে।এটাই আমাদের শেষ কথা।।
চৈত্রমাস তখনো শেষ হয়নি,শান্তনুর শরীরটা বেশি ভালোনা।তাই আমাদের কথা কম হয়।এমনি এক চৈত্রের প্রভাতে অপরিচিত নাম্বার থেকে কল আসে।প্রথম রিসিভ করার পর কেউ কিছু বলেনি কান্নার মতো শব্দ শোনা গিয়েছিল শুধু।
কেমন যেন একটা অস্থিরতা কাজ করছে ভেতরে,বিচ্ছিরি একটা সকাল শুরু হয়েছে আজ।কিছুই ভালো লাগছেনা।আধঘন্টা পর আবারো সেই নাম্বার থেকে কল আসে।
-হ্যালো,কে ফারহানা আপু?
-হ্যাঁ।
-আমি শান্তনুর চাচাতো ভাই বলছি।
-জ্বী,বলেন।
-শান্তনুতো ;
-বলেন,শান্তনু কি?
-শান্তনু এক্সিডেন্ট করেছে।
-জ্বী! কখন?কোথায়?কিভাবে!?
-আপনি আসুন সব জানতে পারবেন।
আমি পাগলের মতো শান্তনুদের বাড়ি ছুটে যাই।আমাদের বাড়ি থেকে ৭ কি:মি: দুরে ছিলো ওদের বাড়ি।মাও আমার সাথে চললেন।
বাড়িতে পৌছে দেখি উঠোনে অনেক ভীড়।শান্তনুর মা-বাবা,ভাই-বোন সবাই কাঁদছে।২০ মিনিট আগে শান্তনুকে হাসপাতাল থেকে ফেরৎ আনা হয়েছে।
সবাই বলাবলি করতে লাগলো,এই সেই মেয়েটা না?যার জন্যে ছেলেটা এতো পাগল ছিল।একসপ্তাহ বাসায় খায়নি ভুলে যেতে বলায়।
হ্যাঁ,এটাই ফারহানা।
আমি ছুটে গেলাম শান্তনুর কাছে বারান্দায়। উঠোনের এক কোণে শান্তনুর গোসলের জন্য মশারি টানানো হচ্ছে।আমার জন্য অপেক্ষা করছিল সবাই।
-শান্তনু!রক্তাক্ত শান্তনু ঘুমিয়ে আছে বারান্দায়! আমি কখনোই ওকে ছুঁয়ে দেখিনী কিন্তু ওর রক্তাক্ত দেহটা দেখে সহ্য হচ্ছিল না আমার।আজ বোরখা ছিলো না আমার পড়নে।ওড়নার এক কোণ দিয়ে শান্তনুর কপালটা মুছে দিই।কি পবিত্র আমার শান্তনু!!
সত্যিই সে চলে যাচ্ছে আজ।শান্তনু—
আমি কান্না থামিয়ে রাখতে পারছিনা আর।মাও দেখি কাঁদছেন।তিনি সব মিথ্যে ধরে ফেলেছেন আজ।আমাকে ক্ষমা করো মা।আমি শান্তনুকে খুব ভালবাসি।শান্তনু এভাবে চলে যেতে পারে না।
আমি আর কিছুই বলতে পারিনা।শান্তনুর হাঁতটা ধরার ইচ্ছে হয়েছিল খুব তবে অভিমানে ছুঁইনি।....
কিছুক্ষন পর সাদা কাফনে মোড়ানো শান্তনুকে খাটিয়ায় তুলা হলো।কি সুন্দর লাগছে আজ তাকে,কি পবিত্র অবয়ব! আমি আর কাঁদছি না।সে চলে যাক-
কতোবার বলেছি তুমি রাস্তা একটু সাবধানে পার হবা।এতো ব্যাস্ততা কিসের তোমার!এক্সিডেন্ট হতে পারে।কিন্তু সে আমার কথা শুনেনি।অন্য রাস্তায় চলে যাচ্ছে আজ।আর আমি সাবধান হতে বলবো না।
একটা কান্নার রোল পড়ে গেলো চারদিকে।শান্তনুর পরিবার,আমি।খাটিয়ায় করে নিয়ে যাচ্ছে ওকে-
অবাক বিষয় আজ কেউ সিনিয়র বলে আঙুল তুলছে না আমার দিকে।বরং একটা মায়া কাজ করছে আমার জন্যে সবার।আমিতো এই মায়া চাইনা।চাই শুধু শান্তনু বেঁচে থাকুক আবার সবাই মন্দ বলুক অসম প্রেম বলে।-
আজ একবছর হলো শান্তনু চলে গেছে।আর আমরা পাশাপাশি ছিলাম ৭ মাস।এই সাতটি মাসের একটি দিনও আমি ভুলতে পারি নি।
স্টেশনে শান্তনু আর ফিরবে না তবুও আমি আনমনে দাঁড়িয়ে থাকি যদি হটাৎ এসে ডাক দেয়!না শান্তনু আসেনি একদিনও আসে স্টেশনে।আমি আর কারো কানাঘুষাও শুনিনি অসম প্রেম বলে।আল্লাহর কাছে এমন নীরবতা আমি কখনোই চাই নি।
চৈত্রের প্রখর রোদ আমাকে পুড়িয়ে দিয়েছে।আমি কখনোই ভুলতে পারবো না এই চৈত্রমাস।আমার শান্তনুকে!
ভালো থেকো শান্তনু।আমাদের আবার দেখা হবে এটাই আল্লাহর কাছে আমার প্রার্থনা।আমি আসছি—
......................................
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now