বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
“ক্যাম্পেবেল লাইব্রেরী”
কৃষ্ণেন্দু মুখোপাধ্যায়
---------------------
যোগেশ রায় গভীর চোখে আমার দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলেন,”তুমি ক্যাম্পবেল লাইব্রেরিতে যেতে চাইছ?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ!” এর বেশি কিছু বললাম না যোগেশ রায়কে। কলকাতা থেকে এতদূর মাইকেলগঞ্জে এসেছি ক্যাম্পবেল লাইব্রেরির খোঁজে, এটা শুনেই ওঁর চোখ কপালে উঠেছে। আমার দিকে বারবার সন্দিগ্ধ চোখে তাকাচ্ছেন।
“তুমি জানলে কী করে ক্যাম্পবেল লাইব্রেরি কথা?”
“একটা বইয়ে।”
উনি যেভাবে দেখছেন আমাকে বুঝলাম দ্বন্দ্ব কাটছে না। তাই আরএকটু বিস্তারিত বললাম, “এখানকার একসময় জমিদার ছিলেন শ্ৰীপতি রায়চৌধুরী। ভারতবর্ষ স্বাধীন হওয়ার আগে জমিদাররা চেষ্টা করতেন নানাভাবে ব্রিটিশ প্ৰভুদের খুশি রাখতে। উইলিয়াম ক্যাম্পবেল ছিলেন এখানকার কালেক্টর। শ্ৰীপতি রায়চৌধুরী জমিদার বাড়ির বাইরে একটা লাইব্রেরি করেছিলেন। উইলিয়াম ক্যাম্পবেলকে খুশি করতে লাইব্রেরিটার নাম রেখেছিলেন ক্যাম্পবেল লাইব্রেরি। স্বাধীনতার পর আরও পনেরো বছর ছিল লাইব্রেরিটা। আপনি ছিলেন লাইব্রেরির শেষ লাইব্রেরিয়ান।”
মাঙ্কি ক্যাপ আর মাফলারে মোড়া বৃদ্ধ যোগেশ রায়ের মুখটা আরও অবাক হয়ে গেল। নিজের মনে বলতে থাকলেন, “শ্রীপতি রায় চৌধুরীর কিন্তু বইয়ের জন্য কোনও ভালবাসা ছিল না। শুধু ক্যাম্পবেল সাহেবকে খুশি করতেই লাইব্রেরিটা করেছিলেন। কলকাতা থেকে শুধু বেছে-বেছে ইংরেজি বই আনাতেন। এই অঞ্চলে ইংরেজি বই পড়ার পাঠক একদম ছিল না। লাইব্রেরিটা একদম চলত না।”
বিনীত গলায় বললাম, ‘জানি।”
“কিন্তু তুমি বোধ হয় সব জান না। রায়চৌধুরীদের জমিদার বাড়িটা এখন ধ্বংসস্তুপ। ক্যাম্পবেল লাইব্রেরিটার অবস্থা আরও খারাপ। পঞ্চাশ বছর আগে আমি লাইব্রেরিটায় শেষবারের মতো তালা লাগিয়ে বেরিয়ে এসেছিলাম। তার কয়েকদিন পরে আগুন লেগে গিয়েছিল লাইব্রেরিটায়।”
‘তাও জানি। আমি সেই তালার চাবিটাই একবার চাইছি স্যার। লাইব্রেরিটা একবার দেখতে চাই।”
ঈষৎ চঞ্চল হয়ে উঠলেন যোগেশ রায়, “কিন্তু কেন? কিছুই তো নেই এখন ওই লাইব্রেরিতে। বইপত্তর যা ছিল সবই আগুনে পুড়ে গিয়েছে, না হয় পোকায় কেটে দিয়েছে। কী দেখবে ওখানে?”
যে কথাগুলো এখানে এসেই বলেছিলাম। সেই কথাগুলোই বললাম, ‘আমি বাংলার হারিয়ে যাওয়া লাইব্রেরিগুলো নিয়ে রিসার্চ করছি স্যার। ক্যাম্পবেল লাইব্রেরির মতো এত ইন্টারেস্টিং লাইব্রেরি আমি একটাও পাইনি। অনেক গোপন তথ্য আছে স্যর।”
‘গোপন তথ্য!” যোগেশ রায় নিজের মনে বিড়বিড় করে বলে উঠলেন।
“আমি সরকারি পারমিশনের কাগজ করিয়ে নিয়ে এসেছি স্যার। থানার পারমিশনও নিয়ে এসেছি। কিন্তু আপনাকে এড়িয়ে ক্যাম্পবেল লাইব্রেরিতে যাওয়ার মানেই হয় না। বিশেষ করে আপনার কাছে চাবিটা যখন আছে, তখন তালা ভাঙার ও কোনও মানে হয় না।”
একটু চুপ করে থেকে যোগেশ রায় নিচু গলায় বললেন, “বেশ! কাল সকালে তা হলে এসো।’
“কালকে নয় স্যার। আজকেই যেতে চাই।”
যোগেশ রায় জানলার বাইরের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কী বলছ? এখন গেলে কতক্ষণ সময় পাবে তুমি?”
বাইরে শীতকালের বিকেলের রোদ পড়ে আসছে। আমি নিজের পরিকল্পনার কথা একটুও বুঝতে না দিয়ে বললাম, “অল্প সময়ই যথেষ্ট স্যার। আমি কিছু ফোটো তুলতে চাই। তথ্য তো অনেক জোগাড় হয়েই আছে।”
যোগেশ রায় আমার চোখের দিকে একবার স্থির দৃষ্টিতে তাকালেন। তারপর গলাটা খাঁকরিয়ে অল্প পরিষ্কার করে নিয়ে হাঁক পাড়লেন, “চলিতদার!”
একটু পরেই একটা লোক এসে হাতজোড় করে বলল, “হুজুর।”
এক-একটা লোক আছে যাদের প্রথম দর্শনেই দেখতে খুব একটা ভাল লাগে না। চলিতদার নামের যে লোকটা এল, তারও বয়স হয়েছে। কিন্তু বেশ গাঁট্টাগোট্টা চেহারা। হাঁটুর উপর খাটো করে পরা ধুতি। গায়ে খাকি রঙের একটা সোয়েটার। গলায় গামছা। চোখদুটো কীরকম কুতকুতে।
“‘বাবু লাইব্রেরি দেখতে এসেছে। চাবিটা নিয়ে গিয়ে দ্যাখ, তালা খোলে কিনা।”
চলিতদার যেন রোবো। পঞ্চাশ বছর পর কেউ ক্যাম্পবেল লাইব্রেরি দেখতে যাচ্ছে শুনে একটুও প্রতিক্রিয়া হল না। আমাকে জিজ্ঞেস করল, “সাইকেল চালাতে পারেন?”
“পারি।”
চলিতদার চলে যেতেই আমি উঠে দাঁড়িয়ে যোগেশ রায়কে বললাম, “আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।”
যোগেশ রায় আঙুল নাড়ালেন, “উম হুম। তুমি একটা পোড়ো লাইব্রেরির ভিতরে এই ভর সন্ধে বেলায় যাচ্ছ। ওখানে সাপখোপ, বিছে থাকতে পারে। আমার লোক তোমাকে পৌঁছে দিচ্ছে। তোমাকে লিখে দিয়ে যেতে হবে, তোমার কিছু হয়ে গেলে গেলে আমি দায়ী নই।”
যোগেশ রায় ভিতরে গিয়ে কিছুক্ষণ পর একটা প্যাড আর পেন নিয়ে এলেন। উনি যে রকম চাইছিলেন আমি লিখে দিলাম। তারপর চলিতদারের সঙ্গে একটা সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।
পুরুলিয়া জেলায় মাইকেলগঞ্জকে একটা বড় গ্রামই বলা চলে। অখ্যাত কিন্তু চমৎকার জায়গা। আধুনিক শহরের ছোঁয়া লাগেনি এখানে। প্রকৃতি এখনও তার সুন্দর ডালপালাগুলো বিছনোর জায়গা পেয়েছে। লাল কাঁকড় বিছানো রাস্তায় খসখসে আওয়াজ তুলে সাইকেল চালাতে মনটা কিসে যেন আচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছিল। ছোটদাদুও হয়তো একদিন এই রাস্তায় এরকম ভাবেই সাইকেল চালাতেন।
ছোটদাদুকে, মানে মায়ের ছোটকাকাকে আমি দেখিনি। আমার জন্মের অনেক আগে ছোটদাদু এই মাইকেলগঞ্জেই মারা গিয়েছিরেন। ছেলেবেলা থেকেই শুনে এসেছি অসুখ করে ছোটদাদু মারা গিয়েছিলেন। কিছুদিন আগে মায়ের কাছে সত্যিটা জেনেছি। ছোটদাদু আত্মহত্যা করেছিলেন। তারপর মায়ের কাছে রাখা ছোটদাদুর একটা ডায়েরি পড়েছি। সেদিনই ঠিক করেছিলাম, মাইকেলগঞ্জের ক্যাম্পবেল লাইব্রেরিতে আসব। ছোটদাদু জমিদারবাড়িতে সেক্রেটারির কাজ করতেন। আমি ইচ্ছে করেই যোগেশ রায়কে ছোটদাদুর কথা বলিনি।
সাইকেলে মাইকেলগঞ্জের একটু বাইরে বেরিয়ে এলাম। সূৰ্যটা আরএকটু ঢলে এসেছে। দু’দিকে পৌষের ফসল ওঠা মাঠ। মাঝে-মাঝে নুইয়ে পড়া খেজুর গাছ। নরম কমলা আলো ছড়িয়ে আছে চারিদিক। চরাচরে একটা কুয়ামার আস্তরণ ক্রমশ গাঢ় হচ্ছে। আর-একটু এগোতেই একটা অগভীর শালবন পড়ল। সেটা ছাড়িয়েই জমিদার বাড়ির ধ্বংসস্তুপ। আর তার পিছনেই ক্যাম্পবেল লাইব্রেরি।
ক্যাম্পবেল লাইব্রেরির সামনে সাইকেল থেকে নেমে চুপ করে দাঁড়ালাম। ছোট একটা দোতলা বাড়ি। কোনও সাইনবোর্ড নেই। এককালে যে এখানে আগুন লেগেছিল তার কোনও চিহ্নও নেই। বাইরের দেওয়াল থেকে পলেস্তারা খসে পড়ে ইট বেরিয়ে পড়েছে। তবে দরজাটা দেখলাম অটুট। বড় তালাটাও ঝুলছে সেখানে।
চলিতদার চাবি দিয়ে তালাটা খোলার চেষ্টা করল। আমি জানতাম এতদিনের বন্ধ তালা সহজে খুলবে না। তাই সঙ্গে করে একটা কেমিক্যাল সলিউশান নিয়ে এসেছিলাম। সেটার কয়েক ফোঁটা ঢেলে চাবি ঘোরাতেই তালাটা খুলে গেল। ভিতরটা অন্ধকার। ভ্যাপসা একটা গন্ধ। একটু ভিতরে ঢুকতেই মাকড়সার জাল জড়িয়ে গেল মুখে। ব্যাকপ্যাক থেকে জোরালো টৰ্চটা বের করে জ্বালাতেই মনটা খারাপ হয়ে গেল।
বড় একটা হলঘরের মতো জায়গা। প্রচুর বইয়ের র্যা ক। তার মধ্যে এখনও রয়েছে বেশ কিছু ধুলোমাখা আধপোড়া বই। চলিতদারের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে ফেললাম, “কে আগুন লাগিয়েছিল এখানে?’
চলিতদার কোনও উত্তর দিল না। ফিসফিসে গলায় বললাম, “আমি খুঁজে বের করব।”
ব্যাকপ্যাক থেকে ক্যামেরা বের করলাম। বইয়ের র্যা কগুলোর কাছে গিয়ে ফোটো তুলতে আরম্ভ করলাম। হঠাৎ একটা দরজা বন্ধ করার আওয়াজ পেলাম। ঘাড় ঘুড়িয়ে দেখলাম চলিতদার নেই। আর লাইব্রেরিতে ঢোকার দরজাটা বন্ধ। এগিয়ে গিয়ে দরজাটা টেনে খুলতে গিয়ে দেখলাম বাইরের থেকে তালা দিয়ে দেওয়া হয়েছে।
আশঙ্কা আমার একটা ছিলই। তবে কীভাবে বিপদে পড়তে পারি আন্দাজ ছিল না। তাই স্থানীয় থানায় বলে এসেছি। আর ওসির মোবাইল নম্বরটা নিয়ে এসেছি। ওসি বলেছেন সমস্যায় পড়লে মোবাইলে ফোন করলে জিপ পাঠিয়ে দেবেন। সেই ভরসাতেই মনে হল ভিতরটা আর-একটু ভালভাবে দেখে নিই।
র্যা কের বইগুলো দেখতে-দেখতে মনটা ভারী হতে শুরু করল। কত দুর্লভ বই নষ্ট হয়ে গিয়েছে। শুধু কিছু মলাটের অবশিষ্টাংশ রয়ে গিয়েছে। একটু পরে ক্লান্ত হয়ে লাইব্রেরিয়ানের চেয়ারে গিয়ে বসলাম। সামনের টেবিলের ওপর ব্যাগপ্যাকটা রাখলাম। চোখটা ভারী হয়ে আসতে থাকল। ঘুম-ঘুম পাচ্ছে। তার মধ্যেই একবার চটকাটা ভাঙল।
দূরে একটা লাইব্রেরির র্যাকের সামনে কে যেন দাঁড়িয়ে রয়েছেন। হাতে একটা বই। আবছা একটা হলদেটে আলো সেখানে। ভাল করে বোঝার চেষ্টা করলাম, কে। তারপর আমার মুখ থেকে অস্ফুস্ট একটা আওয়াজ বেরল, “ছোটদাদু!”
না, কোনও সন্দেহই নেই। ছোটদাদুই। আমি মামার বাড়িতে ছোটদাদুর ফোটো দেখেছি। অবিকল এইরকম পোশাক। একেবারে বিহ্বল হয়ে আমি আর-একটু কাছাকাছি। এগিয়ে গিয়ে বললাম, “ছোটদাদু, আমি অঙ্কুশ। আমার মায়ের নাম ইলোরা। আপনার ভাইঝি।”
ছোটদাদু আমার দিকে তাকালেনই না। নিজের মনে বই পড়তে থাকলেন।
বললাম, ‘আমি আপনার ডায়েরিটা পড়েছি ছোটদাদু। আর ডায়েরিটা পড়ে এখানে না এসে থাকতে পারিনি। যে অন্যায় আপনার সঙ্গে হয়েছে তার প্রমাণ আমি নিয়ে যাবই। আমি জানি না হলে আপনার আত্মা শান্তি পাবে না।”
ছোটদাদু তবুও বইয়ের ওপর থেকে মুখ সরালেন না। যেন আমার কথা শুনতেই পাননি। আমি বইয়ের র্যা কগুলো দেখে চমকে উঠলাম। একটু আগে এই র্যা কগুলোয় সব আধাপোড়া পোকায় কাটা বই দেখেছি। এখন দেখছি সব সুন্দর ঝকঝকে বই। আমার সামনের র্যা কটাতেই এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার ১৯৪৫ সালের এডিসনের পরপর ভলিউম সাজানো।
ছোটদাদু শান্তভাবে বইটা মুড়ে র্যাসকে রাখলেন। তারপর লাইব্রেরিয়ানের টেবিলের কাছে কী যেন খুঁজতে থাকলেন।
খুট...খুট...খুট করে একটা আওয়াজে আমার সংবিত ফিরল। চারদিক ঘটফুটে অন্ধকার। আমার মাথাটা টেবিলের উপর। এতক্ষণ তা হলে স্বপ্ন দেখছিলাম। কিন্তু ওই আওয়াজটা শুনে দ্রুত টানটান হয়ে উঠলাম। আওয়াজটা আসছে দরজার কাছ থেকে। দ্রুত মোবাইলটা হাতে নিলাম। রাত্রি দু’টো দশ বাজে। তাড়াতাড়ি ওসিকে একটা এস এম এস করলাম, “প্লিজ হেল্প!”
টর্চটা জ্বেলে দরজার দিকে আলো ফেললাম। ঠিক তখনই আওয়াজটা বন্ধ হয়ে দরজাটা খুলে গেল। বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন, যোগেশ রায়। পিছনে চলিতদার।
“চোখের উপর থেকে আলোটা সরাও,” অদ্ভুত একটা ঠান্ডা গলায় বললেন যোগেশ রায়।
আমি হাসলাম, “আমি জানতাম, আপনি আসবেন।”
“আমিও তোমার পরিচয় বুঝতে পেরেছি। শ্যামাকান্ত দাশগুপ্তর মুখের সঙ্গে ভীষণ মিল তোমার। আমি বুঝতে পেরেছি। পঞ্চাশ বছর পর তুমি একটা বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে ক্যাম্পবেল লাইব্রেরিতে এসেছ।”
“কী সেই বিশেষ উদ্দেশ্য, সেটা তো আপনার না বোঝার কথা নয় যোগেশবাবু। শ্যামাকান্ত দাশগুপ্ত ছিলেন আমার ছোটদাদু। অল্পবয়সে এখানকার জমিদারিতে সেক্রেটারি থাকার সময় তিনি একটা বই লিখেছিলেন, ‘দ্য পোট্রেট অফ মাইকেলগঞ্জ।’ লাইব্রেরিয়ান হিসেবে আপনার পাণ্ডিত্যকে খুব শ্রদ্ধা করতেন ছোটদাদু। খুব ভরসায় আপনাকে পাণ্ডুলিপিটা পড়তে দিয়েছিলেন। আপনি সেটা টাইপ করে নিজের নাম দিয়ে ইংল্যান্ডের এক প্ৰকাশকের কাছে পাঠিয়ে ছিলেন। সেটা আপনার নামে বই হয়ে বেরিয়েছিল। বইটা অনেক প্রাইজ পেয়েছিল। ছোটদাদু অনেক পরে সেটা জানতে পেরে অভিমানে, দুঃখে, হতাশায় আত্মহত্যা করেছিলেন। ডাইরিতে লিখে গিয়েছেন সেইসব কথা। সেই সঙ্গে এটাও লিখে গিয়েছেন, বইটার পাণ্ডুলিপি আছে এই লাইব্রেরির কোথাও। একমাত্র এই পাণ্ডুলিপিটাই প্রমাণ করতে পরে বইটা ছোটদাদুর লেখা। আমি সেই পাণ্ডুলিপিটাই খুঁজতে এসেছি।”
“কোনওদিন খুঁজে পাবে না সেই পাণ্ডুলিপি। ওটা আগুনে পুড়ে গিয়েছে। চলিতদার নিজের হাতে আগুন লাগিয়েছিল। কিন্তু এতদিন পর এই সত্যিটা জানাজানি হলে আমার আত্মাও কোনওদিন শান্তি পাবে না। আর তাই এই লাইব্রেরির বাইরে তুমিও কোনদিন বেরতে পারবে না। চলিতদার!” হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন যোগেশবাবু। জ্বলন্ত একটা চোখ নিয়ে চলিতদার আমার দিকে এগিয়ে আসতে থাকল। আমার শুধু মনে হল হঠাৎ আমার পিছনে কে যেন এসে দাঁড়াল আর আমার হাতে ধরা জ্বলন্ত টর্চটা আস্তে-আস্তে মিইয়ে গিয়ে আবার ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে গেল। তারপর আমার আর কিছু মনে নেই।
চোখটা যখন খুলল বাইরে ফুটফুটে নরম দিনের আলো। চারদিক চেয়ে বুঝলাম আমি ক্যাম্পবেল লাইব্রেরির ঠিক বাইরে মাঠের উপর শুয়ে আছি। আমার মুখে জলের ছিটে দিচ্ছেন দু’জন পুলিশ। আমাকে চোখ খুলতে দেখে একজন বললেন, “কেমন আছেন এখন?”
“ভাল। এখানে কী করে এলাম?”
“উফ! অ্যাডভেঞ্চার করতে গিয়ে যা এক-একটা কাণ্ড করেন না আপনারা। কাল সারারাত্রি এত দৌড়াদৌড়ি গিয়েছে। কোথায় একটু রেস্ট নেব, এমনসময় বড়বাবু খেয়াল করলেন। আপনি মাঝরাতে হেল্প চেয়ে এস এম এস করেছেন। এসে দেখি আপনি তালাবন্ধ লাইব্রেরির মধ্যে অজ্ঞান হয়ে পড়ে রয়েছেন।”
উঠে বসতে-বসতে বললাম, “কী হয়েছিল কাল রাত্রে?”
“যোগেশ রায়ের নাম শুনেছেন? বিখ্যাত রাইটার। কাল রাত বারোটায় ওঁর বাড়িতে আগুন লেগেছিল। উনি আর ওঁর চাকর, দু’জনেই পুড়ে মারা গিয়েছেন। রাত দুটোয় লাশ সদরে মর্গে পাঠালাম। তারপর রিপোর্ট লিখতে-লিখতে ভোর।”
আমি আর কোনও কথা বলতে পারিনি। পুলিশের জিপে উঠে ক্যাম্পবেল লাইব্রেরিটা শেষবারের মতো দেখতে-দেখতে মনে-মনে বললাম, “ছোটদাদু ক্ষমা কোরো। তোমার পাণ্ডুলিপিটা খুঁজে পেলে নতুন করে তোমার নামে বইটা ছাপাতাম।”
পুলিশের জিপ বাসস্ট্যান্ডে নামিয়ে দিল। সকালে ফাঁকা একটা বাস পেয়ে গেলাম স্টেশনে যাওয়ার জন্য। গুছিয়ে বসে জলের বোতল বের করার জন্য ব্যাকপ্যাকটা খুলতেই একতাড়া পুরনো হলদেটে কাগজ চোখে পড়ল। এরকম কোনও কাগজ ব্যাকপ্যাকে ছিলনা। বের করতেই দেখলাম প্রথম পাতাতেই মুক্তোর মতো হাতের লেখায় লেখা আছে, “দ্য পোট্রেট অফ মাইকেলগঞ্জ বাই শ্যামাকান্ত দাশগুপ্ত।
(সমাপ্ত)
----------
।। একাকী কন্যা ।।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now