বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

কয়েক ফোঁটা জোসনার রঙ

"ছোট গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X কয়েক ফোঁটা জোসনার রঙ ————Melon Gunguly তখন শীতের শুরুতে কবিতা সন্ধ্যা বা কবিতা পাঠের আসর হত আমাদের শহরে।। কারো বাসায় বা পৌরসভার কোন সস্তা মিলনায়তনে। তেমন কিছু না। একগাদা তরুণ ছোকরা, মাঝবয়েসী লোক পাঞ্জাবি পায়জামা পরে তম্বা মুখে বসে থাকত। একজন একজন করে দাঁড়িয়ে নিজের লেখা কবিতা পড়ে শোনাত সবাইকে। বেচারার পড়া শেষ হতেই একযোগে সবাই তার সমালোচনা শুরু করত।সমালোচনা আসলে কিছুই না। কেউ বলত- গত কুড়ি বছরে এমন কবিতা সে পড়েনি। কেউ বলত-কবিতায় জীবনানন্দের প্রভাব বেশি। ফালতু কবিতা। হেন তেন। বেশির ভাগ সময় একটা বিচ্ছিরি ঝগড়ার মধ্যে দিয়ে এই কবিতা পাঠের আসর শেষ হত। অনেক দিন মুখ দেখা দেখি বন্ধ হয়ে যেত কবিদের মধ্যে।আবার কোন চায়ের নিমন্ত্রনে কখনো কখনো মিল ঝুল হত। কখনো বা হত না। এমন এক কবিতার আসরে গিয়ে কবিকে আমি পেয়েছিলাম...। বন্ধু বিপিন কবিতা লিখত,বা লেখার চেষ্টা করত। কী লিখত কে বলবে! শীত গরম সব সময় টইটই করে ঘুরে বেড়াত। পায়ে চপ্পল। কাধে চটের ইয়া বড় এক ব্যাগ। হাতে মোটা একটা ডায়েরী । ডায়েরীর অবস্তা ছ্যাঁতরা ব্যাতরা । সুয়োগ পেলেই নিজের লেখা কবিতা পড়তে শুরু করত। সুযোগ পেলেই হল। কারো জন্মদিন হোক বা কুলখানি হোক কবিতা পড়বেই। বেশির ভাগ কবিতার আগামাথা বুঝতে পারতাম না। বেদনার বালুচর, নিঃসঙ্গ তেপান্তর, লিলুয়া বাতাস, নীল বেদনা,ধূসর কষ্ট,হলুদ ভালবাসা ।হেন তেন হাবিজাবি। বেশির ভাগ কবিতায় একটা মেয়েমানুষের কথা বারবার আসে। বুঝা যায় মেয়েটা বিপিনকে মোটেও পাত্তা দেয় না। অথবা বিয়ে হয়ে গেছে তার, আজব তো...। তবে সব সময় কবিতা লিখতে পারে না বিপিন। ভাব না উঠলে নাকি কবিতা লেখা যায় না। আর ভাবও সব সময় উঠে না।। বিপিনদের বাড়ির অবস্তা কেরসিন। একগাদা মানুষ। মনে হয় কলকাতার মেসবাড়ী, বনমালী লস্কর লেন। সারাক্ষণ লোকজন আসছে যাচ্ছে। যে কোন সময় কেউ না কেউ ভাত খেতে বসেছে। উচ্ছে ভাজা,পটল ভাঁজা,ডাটা শাক, মুলো, কাঁঠাল দানার চড়চড়ি,লাউ,ঝিঙ্গে আর এক বালতি হলুদ গরম পানি-যা কিনা ওরা ডাল হিসাবে চালাত। ওরা সপ্তাহে একদিন মাছ খেত। বছরে একদিন মাংস। কালী পুজোর সময়। তাও আবার পাঁঠার মাংস। বিপিনদের বাড়িতে অবশ্য কাঁচা কাঁঠাল দিয়ে তরকারি রান্না করা হত। বেশি করে মসলা দিয়ে কাঁচা কাঁঠাল রান্না করলে সেটার স্বাদ যে পাঁঠার মাংসের মত হয় কে না জানে।সেই জন্যই তো কাঁঠালকে গাছ পাঠা বলে। তো, বাড়িতে থাকলে বিপিন কবিতা লিখতে পারত না। মুড আসত না নাকি।অথচ আগারে বাগারে যে কোন জায়গাতে বসে ওর মাথায় কবিতা চলে আসত। চায়ের দোকানে বসে চা খাওয়ার সময়- কাত্তিক মাসের বিকালে রেল লাইনের উপর দিয়ে হাঁটার সময়- ঝুম বৃষ্টিতে ভিজে বাড়ি ফেরার সময়- এমন কি বটু হাওলাদারের পানের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে সুপুরি চিবোতে গিয়েও ওর মাথায় কবিতা চলে আসত। কবিতা নাকি মেঘের দেশের পরীর মত। যখন তখন চলে আসে...। কবিতা মাথার মধ্যে এলেই শুধু হয় না। ওটাকে আদর করে বসতে দিতে হয়। তারপর লিখে ফেলতে হত।মানে ঠিক মত বসা হলে। বিপিনের ডায়েরির অবস্থা ও খারাপ। একটা কবিতা যে কতবার কাটা ছেঁড়া করা হয় একমাত্র আল্লাহই জানেন। দেখলে হঠাৎ করে লিওনাদো দা ভিঞ্ছির নোটবই মনে হতে পারে। তবে এত গণ্ডায় গণ্ডায় কবিতা লেখার পরও বিপিনের কবিতা কোথাও ছাপা হত না। ব্যাপারটা বেশ দুঃখজনক। নানা জায়গাতে পাঠাত। নানান পত্রিকার সাহিত্য পাতার সম্পাদকদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখত তারপরও লাভের বেলায় ঘণ্টা। অল প্রফিট ইজ বেল। তাতে মোটেও দমে যেত না বিপিন। ওর কথা অনুসারে একজন কবিকে মোটামুটি ভুগতে হয়। না ভুগলে কবি হওয়া যায় না। যারা বড় বড় কবি তারা নাকি অনেক ভোগে। নজরুল সারা জীবন ভুগেছে,জীবন বাবু সারা জীবন ভুগেছেন। বিদেশের অনেক কবি নাকি দিনের পর দিন শুধু মেরুন রঙা আপেল খেয়ে দিন কাটাত। তো একদিন বিপিন আসে বলল-যাবি নাকি কবিতা সন্ধ্যায় ? আমার ইচ্ছা ছিল না। মানুষজনের ভিড় ভাল লাগে না। আর এইসব তো মানুষ না। কবি। আরেক ঝামেলা। শেষে কি মনে করে রাজী হলাম...। কবিতা সন্ধ্যা হবে ফকিরাপুলের ওখানে কোন এক বাড়িতে। কোন এক মুরুব্বি কবির বাসায়। তার আয়োজনে।গেলাম। পুরানো দিনের বাড়ি। দেয়ালের সিমেনট খাবলা খাবলা উঠে গেছে। শেষ কবে চুন করা হয়েছিল সেটা দারোগা ইমান আলী চুনুরিও বলতে পারবে না। জানালার গরাদগুলো পযন্ত ক্ষয় হতে হতে সরু হয়ে গেছে।জানালার পাল্লা থেকে সর্ষের দানার মত মিহি গোল গোল দানাদার কি যেন ঝরে পড়ছে মাঝে মাঝেই। জানালা আর দরজায় পর্দা ঝুলছে। সেগুলোর আদি রঙ কি ছিল বলতে পারলে কান কেটে ফেলব। তবে মুরুব্বি কবি মানুষ ভাল। সাদা পাঞ্জাবি আর পাজামা পরনের। এই গরমেও একটা ঘি রঙের চাদরকাধে ফেলা। মুখ ভর্তি শণ পাপরির মত দাড়ি গোঁফ। সারাক্ষণই হাসছেন। এই প্রথম কোন কবি পেলাম যিনি হাসেন। নিমন্ত্রিত কবির সংখ্যা ১২ জন। আমি বাদে। একেক জন কবি দেখতে একেক রকম। কেউ ভীষণ রকম মোটা। ঘাড়ে গর্দানে ঠাসা। মনে হয় বাস্তব জীবনে কসাই। কেউ রোগা । এত রোগা যেন জন্মের পর থেকে কিছু খায়নি। কারো মুখ ভর্তি দাড়ি গোঁফের জঙ্গল। যেন ক্ষৌর কর্ম না করে টাকা বাঁচাচ্ছে। কেউ টাক মাথা। লাইটের আলোতে টাক চকচক করছে প্লাটিনামের মত। মোটা মত একজন মহিলা কবি দেখলাম। সারাক্ষণ পাশের জনের সাথে ঝগড়া করছেন। সবাইকে লাল চা আর গোলাপি রঙের নোনতা বিস্কুট দেয়া হল। খালি পেটে আসলে কবিতা ফবিতা হয় না। সবাই চুক চুক করে লাল চা আর বাসি নোনতা বিস্কুট শেষ করলাম।তারপর শুরু হল কবিতা পাঠের আসর। তেমন কিছু না আসলে। একজন একজন করে দাঁড়াচ্ছে আর নিজের লেখা কবিতা পড়ে যাচ্ছে। এত মধ্যে একজনের কবিতা মাত্র ২২ পাতার। মাবুদে এলাহি। বেশির ভাগ কবিতার কোন ছাতা মাথা নেই। ফালতু আজগুবি শব্দে ভর্তি। যেমন- পকেট ভর্তি ভালবাসা,বুকের পাজরে রেললাইনের কুউউ, আমলকী রঙের বসন্ত,ভালবাসার খামার। মোদ্দা কথা যে যা খুশি লিখে এনেছে। তাই কবিতা বলে চালিয়ে দিচ্ছে।বেশির ভাগ কবিই ফালতু কতগুলো লাইন এলোমেলো করে সাজিয়ে রেখেছে। একজন একটা কবিতা বলা শেষ করা মাত্র সবাই তার সমালোচনা শুরু করে। সমালোচনার নামে বেচারাকে নানান কায়দা করে অপদস্ত করে আরকি। যে যত ভালই লিখুক ভাল বলা যাবে না। কবিতা পাঠের আসরে বোধহয় এটাই নিয়ম। আর সমালোচনাগুলো ও মোটামুটি একঘেয়ে। যেমন- কবি দুরমুজ আলী আশি দশকের কবি। উনার কবিতায় একই সাথে রয়েছে প্রেম আর দ্রোহ। তিনি যৌবনের পূজারি। তার বাক্য বিন্যাস ভাবগম্ভীর অথচ অর্থপূর্ণ। বাক্য ব্যবহার সংযত ও সীমিত। উপমায় নতুণত্ব নেই। লোরকা গারসিয়া আর এজরা পাউনডের কবিতার সাথে অনেক মিল রয়ে গেছে।কবি দুরমুজ আলী নিরন্তন প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবেন আশা করি। হেন তেন...। একটা জিনিস বুঝতে পারলাম তখনই কবিদের পেট ভর্তি হিংসা। কেউ কাউকে পছন্দ করে না। একজন আরেক জনের পিছে লেগে আছে খামখাই। হয়ত মনে মনে ভাবে- বাকি সব কবি যদি মারা যেত তবে সে একাই বড় কবি হয়ে যেত। পুলজারিৎ পুরস্কার ফিলিপ পুরস্কার সব পেত।নিদেন পক্ষে জাতীয় কবি নিশ্চিত হত। সব কবি চা বিস্কুট খেল আর নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করল। এতগুলো কবির মধ্যে একজন আমার বেশ নজর কাড়ল। রোগা মত। লম্বা। ঢোলা গুড়ের রঙের প্যান্ট আর লম্বা ঝুলঝুলে পাঞ্জাবী পড়নের।চোখ দুটিতে রাজ্যের বিষাদ। যেন মস্ত বড় ক্ষতি হয়ে গেছে বেচারার। কথা তেমন বলেন না। চোখে সরু ফ্রেমের চশমা।ভালই মানিয়েছে। এই বিষাদমাখা কবিই দলের মধ্যে সবচেয়ে তরুণ। উনার কবিতাগুলো বেশ পিচ্চি পিচ্চি। অন্য কবিদের মত বিশাল আকারের কবিতা সঙ্গে করে আনেননি উনি। একটা কবিতা----- মেয়েটার চোখের জল। বোকা আমি ভাবতাম হয়ত সেটা কাজল।। প্রত্যেকটা কবিতাই এই রকম। মোট ছয়টা কবিতা পড়লেন। তেমন হাততালি কেউ দিল না ।বরং তার কবিতায় ব্যবহার করা ভাষা আর উপমা নিয়ে সবাই বেশ কচলে দিল তাকে।যেমন করে রাস্তার শরবতওয়ালারা লেবু কচলায়। একজন বলল- কলকাতার কোন এক কবি নাকি এই রকম কবিতা লেখে। মানে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে চোর বলল আরকি। আরেকজন বলল- ঘাই হরিণীর ডাক শব্দটা জীবনানন্দ ব্যবহার করেছে। অর্থাৎ এই কবি জীবন বাবুর ভাবধারায় আছন্ন।ছন্দেও নাকি গরমিল আছে বেশ। মোট কথা সব মিলিয়ে বেশ কেলেঙ্কারি অবস্তা। উহ। মানুষগুলো পারেও। এই জন্যই কবি আর কাকের সংখ্যা সমান আমাদের দেশে। কবিতা সন্ধ্যা শেষ করে যখন বাইরে চলে এলাম তখন রাত হয়ে গেছে। বাইরে তখন ময়ূরকনঠী রাত। অচেনা শহর। হলুদ সোডিয়ামের আলোতে মনে হয় অসুখে ভুগছে শহরটা। দাঁতাল শূয়রের মত হুস হাস করে দৌড়ে যাচ্ছে দানব ট্রাক। টুং টাং করে ঘনটা বাজিয়ে যাচ্ছে রিক্সা। বাস ভর্তি পাকা ফলের মত লটকে আছে মানুষ। পিচ্চি সাগরেদ থাপড় দিচ্ছে বাসে গায়ে। বলছে -ওস্তাদ থামেন বামে। অন্ধ ফকির ভিক্ষা করছে।হাতে ধরা টিনের থালা ।সেটা আবার গেছে মরচে। ট্রাফিক পুলিসটা মাইকেল জ্যাকসনের মত নেচে নেচে ভিড় বাট্টা কমানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছে। সব মিলিয়ে জগা খিচুড়ি। ভাগ্য ভাল আমার সাথে ভন্ধু বিপিন ছিল। সাথে বিষণ্ণ কবি।অচেনা শহরে ভয় থাকে না। যদি পাশে পুরানো বন্ধু আর কোন বিষণ্ণ কবি থাকে। বাইরে গরম। আমরা একটা শরবতওয়ালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। কাঠের কেমন একটা ঠেলা গাড়ি নিয়ে লোকটা দাঁড়িয়ে। তার বিচিত্র ঠেলা গাড়ি ভর্তি হরেক পদের বোতল। সেই বোতল ভর্তি রঙ বেরঙের তরল। আমাদের দেখা মাত্র লোকটা বিশাল এক টুকরো বরফ যেটা কিনা মিনি আইসবার্গের মত সেটা ভেজা তোয়ালে দিয়ে জড়িয়ে ধরে কাঠের তক্তার উপর ঘষা শুরু করল।তক্তার উপর ধারলো লোহার পাত ছিল। বিচিত্র শব্দ করে বরফের কুঁচি ঝরে তিনটে গ্লাস ভরে ফেলল। তারপর সেই গ্লাসে কায়দা করে ঢেলে দিল সবুজ-লাল-হলুদ-কমলা সিরাপ।সবুজ একফালি লেবু। কি দারুন সেই শরবত। ব্যাবিলনের রাজ প্রাসাদে এমন শরবত পাওয়া যেত না। দূরের সিন্ধু দ্বীপ আর পানাম নগরীতেও এমন শরবত পাওয়া যেন না।বিশ্বাস করুন...। বিচিত্র রঙ্গিন শরবত হাতে কথা বলছিলাম কবির সাথে। কবি বলছিলেন তার কথা। আমরা মুগ্ধ শ্রোতা। কবি বলছিলেন শব্দের কথা, কবিতার কথা। উপমার কথা। একটা সরল কথা একটু সুন্দর করে বললে কবিতা হতে পারে। আর কবিতায় সুন্দর একটা ছবি ফুটে উঠবে। বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই। মাত্র এক লাইনে কি সুন্দর একটা ছবি ফুটে উঠে না ?মনে হয় না -ঠাণ্ডা গোলগাল একটা চাঁদ উঠেছে নীলচে কালো আকাশে ? -আর মোটা আখের মত বাঁশঝাড় দেখা যাচ্ছে। ওদের পাতা চাপিলা মাছের মত। আবার মেঘের ছায়া- ঢাকা সজল কেয়াঝাড়, পদ্মপুকুরের সবুজ ঢালুপাড়, তরুণ তরুলতা বাতাসে কয় কথা- আমারি নাহি পাখা ভুবন ভুলাবার। ---- টুকরো টুকরো শব্দ। কিন্তু দারুন অর্থবহ। অথবা ধরো--- ঠিক দুক্কুর বেলা ঘুরঘুট্টি। থই থই মেঘ কালো কুরকুটটি ! ইন্দ্রের কোচ ম্যান গলা খাকরায়, ঐরাবতের পিঠে বেত হাঁকরায়। বা আমি ছিলাম ছাতে তারায়-ভরা চৈত্র মাসের রাতে। বা জলের ছায়ায় ভেসে চলে জলের মাছগুলি, কোথা থেকে কোথা চলে কে বলবে খুলি। বা ফাল্গুনে বনে বনে পরীরা যে ফুল বোনে। এই জিনিস গুলো হল ছন্দ। অবশ্য ছন্দ না থাকলে যে কবিতা হবে না এমন কোন কথা নেই। যেমন জীবনবাবুর কবিতায় তেমন ছন্দ নেই। কিন্তু যা আছে পৃথিবীর অন্য কোন কবির কবিতায় নেই । যেমন... ভোর; আকাশের রং ঘাসফড়িঙের দেহের মতো কোমল নীলঃ চারিদিকে পেয়ারা ও নোনার গাছ টিয়ার পালকের মতো সবুজ। একটি তারা এখনো আকাশে রয়েছেঃ পাড়াগাঁর বাসরঘরে সবচেয়ে গোধূলি-মদির মেয়েটির মতো; কিংবা মিশরের মানুষী তার বুকের থেকে যে-মুক্তা আমার নীল মদের গেলাসে রেখেছিলো হাজার হাজার বছর আগে এক রাতে- তেমনি- তেমনি একটি তারা আকাশে জ্বলছে এখনো। তখন চারিদিকে নীল রঙের অন্ধকার জমে গেছে পুরানো দিনের ইটালিয়ান পনীরের মত। কবি জানতে চাইলেন- সামনে একটা হোটেলে বসে আমরা মোগলাই পরোটা খাবো কিনা। মোগলাই পরোটা আসলে দারুন কিছু না। ওই আরকি পরোটার ভেতরে ডিমের অমলেট দেয়। সেটা তো বাড়িতেই মা বানায়। আসলে কোন কিছুর নামের সাথে মোগলাই থাকলেই আমরা ব্যস্ত হয়ে পড়ি। কথায়ই তো আছে- পড়েছি মোগলের হাতে খানা খেতে হবে সাথে। আর কে না জানে মোগলরা অতিরিক্ত বিলাস করেই ফতুর হয়ে গিয়েছিল। সবচেয়ে বড় কথা আমার বাড়ির কথা মনে পড়ছিল। এত রাত পযন্ত আমি বাইরে থাকি না। রাস্তার এক কোনে এক ভিখিরি মা তার রোগা রোগা দুই- তিনটে বাচ্চা নিয়ে খেতে বসেছে । খাবার মানে আধপচা ভাত। হলুদ রঙের। ডাল হয়ত আছে। আর কিছু না। মা কম খেয়ে বাচ্চাদের বেশি করে মুখে তুলে দিচ্ছে। ওটা দেখে আমার মনটা হু হু করে উঠল। বাসার বাইরে আমি বেশিক্ষণ থাকতে পারি না। মায়ের কথা খুব মনে পড়ছিল আমার। কবি আর বন্ধু বিপিনকে বললাম - আমি বাসায় যাবো। কবি কি বুঝলেন কে জানে। হেসে বললেন- আচ্ছা তবে শীতের কোন এক সকালে আমার বাসায় গিয়ে তোমরা জল খাবার খেয়ে আসবে । কেমন? জল খাবার আসলে নাস্তা । হিন্দুরা আহ্লাদ করে অমন বলে। রঙ চঙ্গা বিচিত্র একটা বাসে উঠে গুলিস্তানে চলে এলাম। গুলিস্তান আর গুলশান শব্দটা ইরানি। মানে কি, কে জানে। কে যেন বলেছিল গুলশান মানে ফুল বাগান আর গুলিস্তান মানে ফুলের যায়গা । অহ, বলতে ভুলে গেছি গুলিস্তানে বড় কালো একটা লোহার কামান আছে। বিবি মরিয়ম কামান। জিনিসটা দেখে আফসোস করলাম। খামখা পড়ে আছে। আমার মহল্লায় হলে ওটা নিয়ে মানিক ভাঙ্গারিওয়ালাকে দিতাম। মানিক লোক ভাল। লোহার টুকরা দিলে কটকটি ভাঁজা দেয়। বেকুব আর কাকে বলে। কই লোহার টুকরা আর কই দারুন লোভনীয় কটকটি ভাজা। সেই রাতে বেশ দেরি করেই বাসায় ফিরলাম। মহল্লার মোড়ে কানু নাপিত আরেক জনের বগলের চুল কাটতে কাটতে মানে চেছে দিতে দিতে চিৎকার করে বললেন-হায় হায় কত রাইত কইরা বাসায় আইছে। খারা তর বাপেরে কমু কাইল্কা। আসলে কানু কাকা অমনই। আমি একবার ম্যাক গাইভার স্টাইলে চুল কেটে দিতে বলেছিলাম তাই আমার উপর রাগ। উনি বাটি ছাট ছাড়া আর কোন স্টাইল জানেন না।বাটি ছাঁট দিলে আমাকে কেমন ডাকুসর্দারদের মত লাগে। কিংবা বাগদাদ কি চোর সিনেমার পাকিস্তানি নায়কটার মত। কিন্তু আমি তো ম্যাকগাইভার হতে চাই। শীত কাল চলে এলো কেমন করে জানি। বাতাসে কমলালেবুর ঘ্রান।চারিদিকে হলুদ গাদা ফুল। আমাদের ইস্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ। স্বাভাবিক কারনেই পরীক্ষা খুব একটা ভাল হয়নি। আমার কোন দোষ নেই। আসলে প্রশ্ন কমন পড়েনি। ফালতু সব প্রশ্ন এসেছিল। বইতে নাকি সব প্রশ্নের উত্তর আছে। আমি খুঁজে পাইনি। চৌবাচ্চার অংকটা এসেছিল। ঐযে একটা চৌবাচ্চার চার পাঁচটা নল আছে। একটা নল দিয়ে এতক্ষণেচৌবাচ্চা ভর্তি হয়। আরেকটা নল খালি রাখলে এতক্ষণে চৌবাচ্চা খালি হয়। সব নল খুলে রাখলে কতক্ষণে কি হয়? আজগুবি অংক। মাথা খারাপ না হলে কেউ চৌবাচ্চার নল মুচড়া মুচড়ি করে ? তাও অংকটা পারতাম। আসলে আমাদের বাসায় আমরা নলকূপের পানি ব্যাবহার করি। তাই পারিনি। আরেকটা অংক এসেছিল- এক টাকায় সাতটা আমলকী কিনে দেখা গেল পড়ে তিনটা আমলকী পচে গেছে। তখন কত ,মানে শতকরা কত ক্ষতি হবে। এটাও পারতাম । কিন্তু সেটা তো আমলকীর সিজন না। বাজারে আমলকী বেশ আক্রা ছিল।আচারয়ালার কাছেও আমলকীর আচার দেখিনি। ইতিহাসে প্রশ্ন ছিল সবচেয়ে খারাপ। যাদের চিনি না জানি না তাদের ব্যাপারে বিদঘুটে সব প্রশ্ন। আর ইংরেজিতে সেই ডাক্তার আসার পূর্বে রোগি মারা গেল সেটা ইংরেজিতে লিখ। সারাবছর বই খাতা খুলে দেখিনি। কারন নতুন বই গুলো পেয়ে মনে হয়েছিল -আরে এ আর এমন কঠিন কি ? একটু হাতালে পিতালেই মুখস্ত হয়ে যাবে। ও দিকে খবর পেয়েছি নদীর ওপারে নবীগঞ্জে এক সাধু আছে। একটা তাবিজ নিলেই পরীক্ষায় পাশ। তাবিজের হাদিয়া একুশ টাকা। অনেক কষ্ট করে একুশ টাকা জমা করে রেখে দিয়েছি হরলিক্সের বয়ামের মধ্যে। পরীক্ষার এক সপ্তাহ আগে নবীগঞ্জ গেলাম। গিয়ে যা শুনলাম তাতে আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। সাধু বাবাকে নাকি পুলিসে ধরে নিয়ে গেছে। সাধু গঞ্জিকার ব্যবসা করত। গঞ্জিকা মানে গাঁজা। হায় হায়। সেই বার আমি আর বিপিন বহু কষ্ট করে নবীগঞ্জ থেকে ফিরে এসেছিলাম। সাধুবাবার খবর শুনে দিশা হারিয়ে মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। পরে ফেরার সময় দেখি ভুল রাস্তায়চলে গেছি। কিছুই চিনছি না। ভুলে অন্যের বাড়ির উপর চলে গিয়েছিলাম। আমাদের দেখে চার-পাঁচটা কুকুর তেড়ে এলো। দারুন দৌড় দিলাম । পিছন পিছন কুকুরগুলো দাঁত বের করে ধাওয়া করল। সে এক ভয়ঙ্কর অবস্তা। দৌড়াতে দৌড়াতে ভাবছিলাম কোরিয়ানরা নাকি কুকুর খায়।এই মুহূর্তে কোন কোরিয়ান আশে পাশে থাকত যদি। ছিল না। বরং ধঞ্চে ক্ষেতের পাশে হিসু করতে বসেছিল এক বুড়ো।আমাদের অবস্তা দেখে খ্যাক খ্যাক করে হাসছিল বুড়োটা। মানুষ কত খারাপ। নদীর ঘাঁট পযন্ত দৌড়ে গেলাম আমরা। শেয়ালকাঁটা আর শন ঘাসে আমাদের পা হাত ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে। কতবার যে গোবরে পা দিয়েছি আল্লাই জানেন। বিপিনের অবস্থা দেখে মায়াই লাগল । মারা যায়নি কে জানে। জোরে জোরে দম ছাড়ছে আর নিচ্ছে। এক পাটি স্যান্ডেল হারিয়ে ফেলেছে কবে। দুই তিন বার আছাড় খেয়ে পড়ে হাটুর কাছে ছিলে গেছে। দেখতে হালিমে দেয়া মাংসের মত লাগছে হাটুর মালাইচাকিটা। নদীর ঘাটে একটা চায়ের দোকান। পাকা কলা আর পাউরুটি ঝুলছে। বয়াম ভর্তি বাসি বিস্কুট। বিপিনের জন্য দয়া হল। এক টাকার বাবুল বিস্কুট কিনে দিলাম। সোনালী রঙের বড় বড় বিস্কুট। তাতে ইংরেজি কি সব লেখা। অনেক সময় নিয়ে বিস্কুট আর টিনের মগ ভর্তি করে নদীর পানি খেলাম দুই জনে। দারুন হাওয়া বইছে। শীতলক্ষ্যা নদীর ঘোলা পানি টলমল করছিল। দূরে কাশ বন। লম্বা লম্বা শন আর হোগলার বন। খাতা খুলে বিপিন কবিতা লিখে ফেলল- সেইদিন দুজনে খেয়েছিলাম হায় রাস্তার কুকুরের ধাওয়া। এত কষ্টের পরও আমাদের হল না তাবিজ পাওয়া।। এটা কিছু হল? যতসব ফালতু। আরও একটা কারনে পরীক্ষার রেজাল্ট খারাপ হল। আমার শেষ আশা ছিল কাহিল চন্দ্র সাহা। ও হচ্ছে ক্লাসের সবচেয়ে ভাল ছাত্র।সব মুখস্ত। তোতা পাখীর মত পুরো বই মুখস্ত বল যেতে পারে। সব অংক পারে। আঁট দশটা ইংরেজি রচনা ও মুখস্ত। মোটামুটি সবাই আমরা ওকে ঘৃণা করি। কারন পড়া না পারলেই স্যারেরা বলেন-মিলন কাহিলের পা ধুয়ে পানি খা। এটা কোন কথা? পা ধুয়ে কি পানি খাওয়া যায়? তার উপর কাহিলের পা ভর্তি প্যাঁচড়া ।শুকিয়ে আমসত্বের মত হয়ে গেছে। যাই হোক ভেবেছিলাম কাহিল চন্দ্র সাহা আমার সামনে বসবে। দেখে দেখে লিখে ফেলব। ওমা পরীক্ষার দিন দেখি কাহিল মাথা ভর্তি গোবর দিয়ে এসেছে। পাগল হয়ে গেল নাকি পড়তে পড়তে? মনে মনে খুশি হলাম। সবাই গোল হয়ে ধরে জিজ্ঞেস করলাম-কি হয়েছে?শুনলাম কাহিলের নাকি জণ্ডিস । মাথায় গোবর না। আসলে তেলাকুচ পাতা বেঁটে দেয়া। আর কাহিল তেমন কিছুই লিখতে পারল না পরীক্ষার খাতায়। উঁকি দেয়ার আগেই পাশ থেকে এক ছোকরা মিহি গলায় স্যারকে ডেকে বলল-স্যার , দেহেন দেহেন মিলন না কাহিলের খাতা দেইখা দেইখা লেহে। স্যার এসে আমার কান দুটো পুরানো দিনের রেডিয়োর মত মুচড়ে দিলেন ইচ্ছামত...। স্যার খুব খারাপ... মোদ্দা কথা পরীক্ষা খারাপ হল। হাফ ইয়ারলি পরীক্ষার পর বিভূতি স্যার আমাকে ডেকে নিয়ে কি ফালতু কথাই না বলেছিলেন। উনি জিজ্ঞেস করলেন-কিরে শয়তান (আমাকে ওই নামে ডাকেন আর কি) এক শীতের নৌকা ভ্রমণ রচনা তর আর কাহিল চন্দ্র দাসের লেখা এত মিল কেন ? দেখে লিখেছিস নাকি? ঢোক গিলে বললাম- ইয়ে স্যার আমরা আসলে একই সাথে একই নৌকা ভ্রমণে গিয়েছিলাম,। বাহ দারুন তো। কুৎসিত অঙ্গ ভঙ্গি করে বললেন স্যার।-তর কি ধাঁরনা আমি ফিটার খাই ? না স্যার। ভালো মানুষের মত বললাম -আপনি তো ইসবগুলের ভুষি খান শুনেছি। কালী বাজারের রামপ্রসাদির দোকান থেকে কিনতে ও দেখেছি আপনাকে? আপনি খামখা ফিডার খেতে যাবেন কেন ? বিভুতি স্যার বিরক্ত হয়ে বললেন - বাহ কথার দেখি খই ফুটছে। একেবারে উড়কি ধানের মুড়কি খই। পড়া জিজ্ঞেস করলে তো একেবারে জবান আঁটকে যায়। তারপর পরীক্ষার খাতা উল্টে বললেন - আচ্ছা নৌকা ভ্রমণে গিয়ে তরা কি খেয়েছিলি দুপুরে ? খাওয়ার কথা মনে নেই স্যার। অসহায় একটা ভঙ্গি করে বললাম। আসলে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখছিলাম তো। স্যার খুশি হয়ে বললেন - তা কি কি দেখলি ? এই ধরুন স্যার নদীটা একেবেকে যাচ্ছিল। দুই ধারে কাশবন। সাদা ফুল ফুটে আছে।নদীর পাড়ে সাদা বালি চিকচিক করছিল। গরুর গাড়ি পার হচ্ছিল। অনেক শালিক কিচমিচ করছিল। ছোট ছোট ছেলে মেয়ে গামছা দিয়ে মাছ ধরছিল...। থাম। গর্জে উঠলেন স্যার। এইসব তুই দেখেছিস শয়তান ?রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আমাদের ছোট নদী কবিতাটা নকল করে আমাকে শোনাচ্ছিস। মনে করিস আমি ফিডার খাই?বড় হয়ে তোকে রিক্সা চালাতে হবে বলে দিলেম।বাপ মাকে বল তর পড়ার পেছনে টাকা পয়সা খরচ যেন না করে। এই বলে দারুন লিকলিকে একটা বেত দিয়ে ভালমত ধুলা ঝেড়ে দিলেন আমার জামা কাপড় থেকে। বড় হয়ে আমাকে রিক্সা চালাতে হবে কথাটা শুনে মনে মনে বেশ দমে গেলাম। এতগুলো স্যার বার বার এই কথা বলেন। খুব ভয়ের ব্যাপার। আমি কল্পনা করি দশ বছর পর ময়লা লুঙ্গি আর ঘামে ভেজা জামা পরে রিক্সা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। আমার মহল্লার পরিচিত মেয়েগুলো যেমন-রিমি,সোমা,শিলা, টুম্পা এরা এদের বাচ্চা কাচ্চা আর জামাইদের নিয়ে ব্যাগ ভর্তি কেনাকাটা করে আমাকে জিজ্ঞেস করছে- এই রিক্সা নিমতলি যাবে ? ভাড়া কত ? আমি গামছা দিয়ে মুখ মুছে হেসে বলছি- ইনসাফ কইরা দিয়েন আফা। মেয়েটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলছে- একি মিলন না ? দিগুবাবুর বাজারে বাতাসি মাছ কিনতে গিয়েছিল বাবা। পাকচক্রে শহরআলি স্যারের সাথে দেখা হয়ে গিয়েছিল। স্যার আমার নামে কি কি শুনিয়ে দিয়েছেন কে জানে! বাসায় ফিরে বাবার সে কি তম্বি। ঢাকাই সিনেমার ভিলেনের মত মুখ ভঙ্গি করে বাবা যা বললেন তার অর্থ- ঠিক মত পড়া লেখা না করলে মেরে হাড্ডি গুডডি গুড়ো করে ফেলবেন। অথবা গায়ের চামড়া ছিলে ডুগডুগি বানাবেন। অথবা হাতকেটে পায়ে আর পা কেটে হাতে লাগিয়ে দেবেন। অথবা এক লাথথি দিয়ে চাঁদে পাঠিয়ে দেবেন-জার্নি টু দ্যা মুন বাই লাত্থি। প্রতিটা হুমকি অসম্ভব। কিন্তু শুনলে গা শিরশির করে। বাবা যখন কথাগুলো বলেন উনাকে দেখায় ভিলেনের মত। এক ভিলেন। লেখা পড়া নিয়ে বাবার কোন মাথা ব্যাথা নেই। তার ধারনা ইস্কুলের স্যারেরা পিটিয়ে পাটিয়ে আমাদের 'মানুষ' বানিয়ে দেয়। তবে বাড়িতে মেহমান এলে আমার পড়াশোনার ব্যাপারে বাবার আগ্রহ অনেক বেড়ে যায়। প্রথমেই জানতে চান আমার পরীক্ষার রিপোর্টটা কোথায়, সেটা যেন মেহমানদের দেখাই। বেশির ভাগ সময় ব্যাখ্যা দেই ওটা খুঁজে পাচ্ছি না। পরে মেহমানদের সামনে ইংরেজিতে অনুবাদ করতে বলা হয়- ১। একজন পাকা দাড়িওয়ালা লোক পাকা কলার দাম জিজ্ঞেস করছিল। ২।আমরা ইসটিশনে যাওয়া মাত্র ট্রেন ছেড়ে দিল। ৩। ইদানিং সবাই সর্দি কাশিতে আক্রান্ত হচ্ছে। ৪। লোহা সোনার চেয়ে সস্তা ধাতু হলেও অধিক প্রয়োজনীয়। প্রশ্নগুলো শুনলেই আমার হাত পা বরবটির মত নেতিয়ে যায়। কিছুই পারি না। ইংরেজিতে যে আমি খুব খারাপ তাও না। কিছু কিছু ট্রান্সলেশন তো খুব ভালই পারি। যেমন- পুস্প আপনার জন্য ফুটে না-দ্যা ফ্লাওয়ায় ইস নট সেলফিস। শেয়াল বুদ্ভিমান প্রানী- দ্যা ফক্স ইজ স্মাট বয়। আমি তাকে চিনি- আই সুগার হিম। ইত্যাদি ইত্যাদি। বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হতেই আমি মুক্তির আনন্দ পেলাম। তবে বাড়ির সবাইকে দেখানোর জন্য বিশাল একটা রুটিন বানিয়ে ফেললাম। রোজকার পড়াশোনা ১২ ঘণ্টা করে। মহৎ ব্যক্তির জীবনী মার্কা বইগুলো টেবিলে সাজিয়ে রাখলাম। মোট কথা সবাই যাতে মনে করে লেখাপড়ার প্রতি আমার আগ্রহ দারুন বেড়ে গেছে। রোজই বাবাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলি- বুকলিস্টটা বের হচ্ছে না কেন?রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বড় একটা পোস্টার এনে ঝুলিয়ে রাখলাম। একদিন বিপিন এসে হাজির ।বলল- কিরে কাল যাবি নাকি কবির বাসায়? কবির বাসায় যাবার কথা একদমই মনে ছিলা না। বিপিনের আছে। ও দাওয়াত মিস করতে চায় না। ওর কবিতা লেখার খাতায় সুন্দর করে লেখা থাকে কবে কোথায় কার বাসায় দাওয়াত আছে। কুলখানি হতে সুন্নতে খৎনা । অন্নপ্রাশন হতে জন্মদিন। ইফতার পার্টী হতে লক্ষ্মী পুজোর নাড়ুমুড়ি খাওয়া কিছুই মিস করতে চায় না। সুকুমার রায়ের খাই খাই ছড়ার মত সবই খেতে চায়। পরীক্ষা শেষ। আমার কাছে অল্প বিস্তর সময় আছে। কাজেই শুক্রবার কবির বাসায় ঢু মেরে আসা যায়। তোমরা জানো না তখন শুক্রবারের দারুন একটা আমেজ ছিল। ঘুম ভেঙ্গেই টিভি দেখতে বসে যেতাম।কারন অন্য দিনগুলোতে সেই বিকেলে টিভি চলতো। কাজেই সবার বাসায় টিভির শব্দ শুনা যেত শুক্রবারে। আমার শহরটাও বেশ নিঝুম ছিল তখন। এত হাউ কাউ ছিল না। আর শীতের সকালগুলো খুব সুন্দর হত।সকাল এগারোটার আগে কুয়াশা কাটতো না। সীসের মত রঙ হত আকাশটার। বাগানের হলুদ গাদা ফুল গুলো বেশ অলস সময় পার করতো। সকাল দশটায় আমাদের দাওয়াত। আসলে বলা দরকার কবি গৃহে নিমন্ত্রণ। ওটা শুনতে ভাল। এত সকালে ঘুম ভাঙ্গা কষ্টের। তারপরও উঠে পড়লাম। কবির বাসা দেখার শখ। আহ্লাদের চোটে শীতের সকালে গোসল দিলাম দারুন করে। প্রচুর শ্যাম্পু মাথায় দিলে আমার মাথার চুলগুলোতে শাহরুখ খানের মত বাবরিওয়ালা একটা ভাব চলে আসে। নইলে পাখীর বাসার মত লাগে। রাস্তায় যখন হাঁটছি তখন ও লোকজন তেমন নেই। সকাল নয়টা। মোড়ের চায়ের দোকানে মাত্র কেতলি বসিয়েছে । একটা লোক হাভাতের মত পাউরুটি নিয়ে বসে গরম চায়ের জন্য তাগাদা দিচ্ছে। পাশেই বাদামের খোসার রঙের একটা কুকুর গুটিসুটি হয়ে শুয়ে আছে। বেলের শরবত বিক্রি করছে একজন। বুড়ো মত একলোক অমৃত খাওয়ার মত করে বেলের শরবত খাচ্ছে। দেখেই বুঝা যায় অযথাই দৌড়ে এসেছে। ওটাকে জগিং বলে। বেলের শরবত নাকি উপকারি। একজনকে দেখলাম টিনের বালতি ভর্তি মধু নিয়ে বসে আছে। মধু ভর্তি মৌমাছি আর মোমের মত মৌচাক। মনে হল মাঝে মাঝে শীতের সকালে উঠা দরকার। সব কিছু কেমন অচেনা লাগে। কত কিছু দেখার বাকি। হিন্দু এক বুড়ি রামবাবুর পুকুর থেকে স্নান করে ফিরছিলেন,। হাতে তুলসির মালা। বিড়বিড় করে ইষ্ট দেবতাদের স্মরণ করছিলেন। শীতে আর বয়সের কারনে কাঁপছিলেন মৃগি রোগীর মত। বিপিনের সাথে কথা বলায় ব্যস্ত থাকায় বুড়ির সাথে ধাক্কা লেগে গেল। বুড়ির তম্বি দেখে কে। মুহূর্তেই মুখ দিয়ে গালিগালাজের তুবড়ি ছুটতে লাগল। সেই সাথে লাগাতার অভিশাপ। অভিশাপের মূল কথা হল- আমারা ভস্ম হয়ে যাবো। বুড়ির রাগ দেখে আমরা দৌড় দিলাম। আর বুড়ি আবার স্নান করতে পুকুরে নেমে গেলেন। দিগুবাবুর বাজারটা এই শীতের সকালেই জমে গেছে। কত ধরনের সবজি। ঝুড়ি ভর্তি লাল টম্যাটো। বাদামি রঙ্গের আলু।বড় ট্রাক ভর্তি হয়ে সবজি এসেছে নানান যায়গা থেকে। কামলা টাইপের মানুষগুলো সবজি নামাছে।একজন আছে ট্রাকের উপর। ওখান থেকে মস্ত বড় বাঁধাকপি নীচে ছুড়ে মারছে। নীচের জন ক্যাচ ধরে পাশের জনের কাছে দিচ্ছে। পাশের জন ক্যাচ ধরে তার পাশের জনের কাছে ছুড়ে দিচ্ছে। এই ভাবে একেবারে আড়ত পযন্ত চলে যাচ্ছে। বেপারি টাইপের লোকজন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিড়ি টানছে আর কামলাদের গালিগালাজ করছে- ওই হমুন্ধির পোলারা এতক্ষুণ লাগে রে মাল খালাস করতে। মন ডায় কয়...। বেপারিদের গলায় লাল হলুদ চেক মাফলার।কেমন টাউটদের মত লাগে। ঝুড়ি ভর্তি ধনেপাতা নামাছে কয়েকজন। ধনেপাতা ইংরেজি কি রে ? জানতে চাইল বিপিন। থ্যাঙ্ক ইউ লিফ। অম্লান বদনে জবাব দিলাম। কবির বাড়ির সামনে এসে বেশ অবাক হলাম। বেশ পুরানো দিনের বাড়ি দোতলা বাড়ি। একসময় অবস্তা ভাল ছিল বোধ হয়। এখন পরে গেছে। শেষ কবে চুনকাম করা হয়েছিল কে জানে। দেয়ালে নোনা ধরা। বাইরে অনেক জায়গা, বনমেথি, গিমাশাক আর পয়সা ফুলে ভর্তি। বড় বড় বাক্সা ঘাসের দঙ্গল। উনারা বোধ হয় অনেক টাকা পয়সার মালিক ? জানতে চাইলাম। মনে হয়। বিড়বিড় করে বলল বিপিন। একজন কালো মত লোক গুল দিয়ে দাঁত মাজছিল। আমাদের দেখে খেঁকিয়ে উঠল- এই কি চাই? ইয়ে মানে কবির সাথে দেখা করব। কোন মতে ঢোক গিলে বললাম। সেটা আগে বলবে তো। বাসি খিচুড়ির মত নরম হয়ে গেল লোকটা। আগে আর বলি কি করে ? আমাদের দেখেই তো খেঁকিয়ে উঠছিল লোকটা। চুপ করে রইলাম। সোজা ভিতরে চলে যাও। গুলমাখা আঙুল দিয়ে সামনে দেখিয়ে দিল। আমরা ঢুকে পড়লাম। আমার মনে হয় পৃথিবীর সব কবির এমন বাড়িতেই থাকা উচিত। সরকারের উচিত কবিদের জন্য আলাদা বাড়ি দেয়া। যেখানে শুধু কবিরা থাকবে। তাদের দেয়া হবে পরীদের রুমালের মত কাগজ।আর চন্দন কাঠের কলম। কবিরা শুধু লিখবে সুখ দুঃখের কবিতা। বাগানের বাক্সা ঘাসের উপর গত রাতের নীল শিশির জমে আছে। সকালের সূর্যের আলোতে ঝিকিমিকি করছে সেই শিশির কণা। অচেনা কোন মুল্যবান রত্নের মত। আমরা দিশে হারিয়ে চারিদিকটা দেখছিলাম। মনে হচ্ছিল ইংল্যান্ডের আপণ এভিনিউয়ে শেক্সপীয়রের বাড়িতে চলে এসেছি। সামনে পুরানো দিনের বাড়ি। নদী থেকে ঠাণ্ডা শীতের হাওয়া ভেসে আসছে। পরিবেশটা মায়াবী। বাড়ির দরজা জানালা সবুজ রঙ করা। ঢেঁকি শাকের মত সবুজ। আজকাল এমন সবুজ রঙ করে না কেউ । জানালা আর দরজার উপরে অর্ধ গোলাকার কাঁচের জানালার মত। নানান রঙের কাঁচ বসানো ওখানে। রাতের বেলা কামরার ভেতরে আলো জ্বললে বাইরে থেকে দারুন দেখাবে। ঘুলঘুলিতে সোনালী হলুদ খড়কুটো। পাখীর বাসা। চিরিপ চিরিপ করে পাটকিলে রঙের চড়ুই পাখী ডাকছে। টানা বারান্দা চলে গেছে শেষ পয়ন্ত। ওখানে লোহার গোল প্যাচ্যাঁন সিঁড়ি। উঠে গেছে দোতলায়। বারান্দায় লাল আর কালো রঙের সিমেন্ট দিয়ে প্রলেপ দেয়া। জলপদ্মের নকশা করা। মস্ত কারিগর না হলে এমনটা করা যায় না। পুরো বাড়িটা মাথায় করে তুলে রেখেছে ইয়া বড় বড় গোল থাম। বারান্দার ঠিক মাঝখানে কালো গোল একটা টেবিল। কয়েকটা চেয়ার। ওখানেই কবি বসে আছেন। কবিকে দেখাছিল একজন কবির মতই। পায়ে চপ্পল। পাঞ্জাবি-পায়জামা। পুরানো দিনের জমাট বাঁধা পনীরের রঙের একটা চাদর কেমন আলস্য করে গায়ে দিয়ে রেখেছেন। মনে হচ্ছে অন্য কোন পোশাকে কবিদের মানায় না। আসলে এমন একটা নিয়ম করা দরকার কবিরা শুধু পাঞ্জাবী আর পায়জামা পড়বে, শীতে গায়ে থাকবে পুরানো দিনের পনীরের রঙের চাদর। কোন কবি যদি গায়ে কোট টাই চাপায় সাথে সাথে তাকে লেংটা করে ফেলা হবে। লেংটা অবস্তায় চৌ রাস্তার মোড়ে বসে বসে কবিতা লিখবে। এটাই হবে শাস্তি। আমাদের দেখে হাসলেন কবি। উনার চোখ দুটিতে সব সময় বিষাদ মাখা। বসতে বললেন। টেবিলের উপর বেতের ঝুড়ি। ঝুড়ি ভর্তি কমলা। একটা লেখার খাতা। হয়তো লিখছিলেন। টেবিলের পায়ের নীচে ধূসর রঙের একটা বিড়াল। বিড়ালটা চোখ বন্ধ করে ভাঁজা মাছের স্বপ্ন দেখছিল হয়তো। পুরানো বাড়িতে গেলে আমি কথা বলতে পারি না। আরও অনেকবার দেখেছি। কেন যেন কথা বলতে ইচ্ছা করে না। এইসব বাড়িতে কত রকম গল্প থাকে। অনেকবার দিগুবাবুর বাজারের পাশের সেই জমিদার বাড়িতে গেছি। যেটা একটা ব্যাঙ্ক হয়েছে পরে।প্রায় আড়াই একর যায়গার উপর বাড়িটা। চারিপাশে ঝুপসি ঝুপসি শাল, জাম আর কাঁঠাল গাছ ভর্তি। বাইরে বাজারের কত হই চই । মাছের আঁশটে গন্ধ। কিন্তু এখানে কত সুনসান। কেমন বুনো একটা ঝাঁঝাল ঘ্রান। কোন জমিদারের বাড়ি ছিল কে জানে? ওরা চলে গেছে কবে । কিন্তু কান পাতলে যেন ওদের কথা বার্তা শুনতে পাই। চোখের সামনে যেন আজও দেখতে পাই পুরানো দৃশ্য কিছু। কবির বাড়িতে বসে কত কিছুই মনে হচ্ছিল। বড় ভাল লাগে এই হিম হিম ঠাণ্ডা শীতের সকাল। বাইরে রোদ উঁকি দিচ্ছে। দূরে্র নদীর পার থেকে ভেসে আসছে ইস্টিমারের অলৌকিক শব্দ। অদ্ভুত সব জিনিস আনা হল আপ্যায়নের জন্য। সাদা রুটি। আলু ভাঁজা। আলু পানি দিয়ে ভেঁজেছে নাকি তেল দিয়ে ভেঁজেছে কে বলবে? একদম সাদা। খোসা সহ ঝলসানো আলুর দম।হাতির কানের মত বড় পাপর ভাঁজা -তাতে আবার প্রচুর কালিজিরা দেয়া। চিনা মাটির পেয়ালা ভর্তি একমুঠো করে কাঠ বাদাম। আর সব শেষ এক পেয়ালা চা। চায়ের রঙ ক্যারাবিয়ান দ্বীপের সূর্যাস্তের মত। তাতে লেবু আর অচেনা গুল্মের মিষ্টি ঘ্রান। জীবনে বহু জায়গায় নিমন্ত্রণ খেয়েছি। কিন্তু এমন বিচিত্র পদ দিয়ে জলখাবার খাওয়া এই প্রথম। বিপিনের খাওয়া দেখে মনে হল বহু বছর অনাহারে ছিল। ছয়টা রুটি,দুই হাঁতা আলু ভাঁজা , দশটা পাপর ভাঁজা,পুরো পেয়ালা বাদাম আর পর পর তিন কাপ সুগন্ধি চা শেষ করে দম নিল বেচারা। মায়াই লাগল ওর জন্য। আরও অনেকবার খেয়াল করেছি খালি পেটে যত ভাল কথাই হোক না কেন, ভাল লাগে না। একবার উপবাস করে মন্দিরে গিয়েছিলাম। কি একটা পুজার সময়। হিন্দুদের তো পুজার অভাব হয়না। বার মাসে তেরো পার্বণ। আমার সামনে রোগামত পুরোহিত বসে কি সব অং বং করছিল। নম নম বিষ্ণু ...। আর চামচ ভর্তি করে ঘি ঢেলে দিচ্ছিল সামনের আগুনে। আমার পেট ভর্তি খিদে। মনে হচ্ছিল পুরোহিতের মাথাটা ঠেসে ধরি সেই আগুনে। কত মানুষ না খেয়ে মরে। আর ব্যাটা কেজি খানেক ঘি ভগবান বিষ্ণু কে খুশি করার জন্য আগুনে ফেলে নষ্ট করলো। কবির বাড়িতে যুতমত জলখাবার পেটে ঢোকার পর আমরা কাব্যরস আস্বাদন করার জন্য চেয়ারে ঠেস দিয়ে বসলাম। কবি বলে যেতে লাগলেন। সেই চর্যাপদের আমল থেকে। কবিতার জন্ম কবে ? কে কবে আবিষ্কার করে ছিল রূপসী এই মেয়েটাকে? কেউ জানে না। সবাই জানে কবিতা হচ্ছে সুখ আর দুঃখের অলৌকিক পংতি মালা। কবে কে দিশা হারিয়ে ছুটেছিল কবিতার পিছে ? ‘মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং ত্বমগমঃ শাশ্বতীঃ সমাঃ/ যৎ ক্রৌঞ্চমিথুনাদেকমবধীঃ কামমোহিতমঃ’ প্রাচীন ভারতের মহান ঋষি বাল্মীকি । শিকারির হাতে ধবল সাদা পাখীর মৃত্যু দেখে গভীর শোকে যে উচ্চারন করেছিলেন সেটাই কি আদি কবিতা না ? মনে পড়ে সেই অন্ধ কবির কথা। গ্রিসের পাথুরে পথ ঘাঁট যে হেঁটে বেড়াত। ছন্দে ছন্দে যে বলে বেড়াত গ্রীক আর ট্রোজানদের বীরত্বের কথা। সুন্দরী হেলেনের কথা। সেই কাহিনীগুলো আমরা চিনি ,ইলিয়াড আর অডেসি নামে। অন্ধ কবির নাম- হোমার। অপূর্ব সেই কাহিনী। সমুদ্র -দ্বীপ আর জলপাইয়ের ঘ্রান পাই সেই সব পড়ার সময়। হাজার বছর আগের চর্যাপদের কবিতা পড়- টালত মোর ঘর নাহি পরবেষী। / হাড়ীত ভাত নাঁহি নিতি আবেশী।” অর্থাৎ- টিলার উপর আমার ঘর, কোনও প্রতিবেশী নেই। হাঁড়িতেও ভাত নেই, তবু নিত্য অতিথি আসে। কবিরা কি করেন ? সামান্য সুখ দুঃখের কথা কেমন করে একটু গুছিয়ে বলেন। আর আমরা বিবাগী হয়ে যাই। সবার কথা কি ভাল লাগে ? না। লাগে না। ইস্কুলের কোন কোন স্যার কি সুন্দর করে ক্লাস নেয়। একটু ও বিরক্তি লাগে না। আবার দুই একজন স্যার কি বলে মাথায়ই ঢুকে না। বাংলা স্যার বলেন- আইজগে তুমাদের পরাব ভাংলা পত্তম পইত্রর। তুম্রা বই কুলেছ ? কি বিচ্ছিরি তাই না? আবার তামিল সিনেমার ভিলেনদের মত দেখতে ফেরদৌস স্যার যখন বাংলাদেশের মৎস্য সম্পদ পড়াতে গিয়ে কিভাবে টাকি মাছের ভর্তা বানাতে হয় বলেন তখন আমাদের দারুন লাগে। কারন উনি সুন্দর করে বলেন যে। কবিদের সবার লেখা কিন্তু ভাল হয় না। ওইয়ে কবি বলেছেন না- সবাই কবি নয়। কেউ কেউ কবি। একসময় রাজাবাদশারাও কবিতা লেখা আর পড়ার প্রতি ঝুকে পড়েছিল। কবিতা লেখাকে কেউ কেউ রাজরোগ ও নাকি বলতো। সব রাজার দরবার ভর্তি থাকতো গণ্ডায় গণ্ডায় কবি। উনারা কবিতা লিখত । রাজাকে পড়ে শোনাত। শুনে রাজা আহা উহু করতেন। পোঁটলা ভর্তি স্বর্ণমুদ্রা উপহার দিতেন কবিকে। বা নিজের গলা থেকে মুল্যবান মোতিদানার মালা খুলে ছুড়ে দিতেন কবির দিকে। সবচেয়ে আদর পেত রাজকবি। সবাই এই রাজকবি বা সভাকবি হবার জন্য লালায়িত হয়ে থাকতো। নিজের মধ্যে চলতো-লোভ-ঈর্ষা-হিংসার নোংরা খেলা। সব কবিই রাজার কাছে গিয়ে কান ভারি করতো সভাকবির নামে। মাঝে মাঝে সভাকবি হারাতো নিজের মর্যাদা। প্রাণদণ্ড পেত। বা রাজ্য ছেড়ে চলেও যেতে হতো। সেই নোংরা খেলা আজও চলছে কবি আর লেখকদের মধ্যে। মোটামুটি পশুর স্তরেই রয়ে যায় প্রিয় কবিগন। ইরানের বাদশাহ দ্বিতীয় শাহ্‌ নসরের সভাকবি ছিলেন রুদাকি( ৮৭০-৯৫৪) এই রুদাকি ছিলেন জন্মান্ধ। শুধু মদ নিয়েই এই রুদাকি লিখে ছিলেন একশো খণ্ডের এক কবিতা। কবিতাটিতে শ্লোকের সংখ্যা ছিল-তেরো লক্ষ। একটা কবিতা এমন-- নিয়ে এসো নীল রঙের পানপাত্র। তলোয়ারের ফলার মত ঝকঝকে মদ ভর্তি। গোলাপের পাপড়িতে জমে থাকা শিশিরের মত লোভনীয় মদ। ঘুমিয়ে থাকা প্রেমিকার গোলাপি পাতার নীচে লুকিয়ে থাকা চোখের মনির মত প্রিয় মদ...। আসলে বাদশাহ দ্বিতীয় শাহ্‌ নসর নিজেও মদ খেতে পচ্ছন্দ করতেন। তাই কবি রাতদিন এই মদ নিয়েই কবিতা লিখতেন। আপাতত মনে হতে পারে ঝোপ বুঝে কোপ মারা কবি। আসলে না। চরম প্রতিভাবান কবি ছিলেন এই রুদাকি। অনেকে মনে করে কবি মাত্রই মদ গেলে বালতি বালতি। যেমন - মাইকেল মধুসুদন দত্ত। উনি এত পরিমানে গিলত যে প্রায়ই উনার হাতে টাকা পয়সা থাকতো না। তখন ইশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরের কাছে টাকা ধার চাইতে যেতেন। বিদ্যাসাগর বাবুকে উনাকে টাকা পয়সা ধার দিতেন। কখনই ফেরত নিতেন না। আহা, এমন একজন বন্ধু পেলে আমিও মদ খেতাম। ওমর খৈয়ামের অনেক কবিতায় কিন্তু মদের ব্যাপার এসেছে। কিন্তু এর মানেই না উনি পাড় মাতাল। অসম্ভব ধরনের প্রতিভাবান এই কবি। উনার আসল নাম-গিয়াদ আল‌-দিন আবুল‌-ফাত্তাহ ওমর ইবনে ইব্রাহিম আল-নিশাবুরী খৈয়াম । উনি শুধু কবিই না জ্যোতির্বিদ এবং গণিতবিদ হিসাবেও বিখ্যাত ছিলেন। বীজগণিতের অনেক সুত্র উনি আমাদের দিয়ে গেছেন। উনার একটা কবিতা- সেই নিরালা পাতায় ঘেরা বনের ধারে শীতল ছায় খাদ্য কিছু, পেয়ালা হাতে ছন্দ গেঁথে দিনটা যায় ! মৌন ভাঙ্গি মোর পাশেতে গুঞ্জে তব মঞ্জু সুর - সেইতো সখি স্বপ্ন আমার, সেই বনানী স্বর্গপুর ! এক ধরনের পিচ্চি পিচ্চি কবিতা আছে। ওদের বলে হাইকু। নামেই বুঝা যায় জাপানের জিনিস । জাপানী কবিদের দিয়েই হাইকুর জন্ম। আর ওনাদের জন্যই জনপ্রিয় এই ধরনের কবিতা। The Old pond a frog jumps in plop! রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এটাকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন। অনুবাদটি - পুরোনো পুকুর, ব্যাঙের লাফ, জলের শব্দ। আরেকটা হাইকু। সাগরতীরে মাছ ভাঁজার দোকান, সীসের মত আকাশ। খদ্দের নেই।। আপাতত মনে হতে পারে- আরে ভাই, এটা কবিতা হয় কি করে ? আসলে এখানে কবি মাত্র কয়েকটা শব্দ ব্যবহার করে একটা দৃশ্য ফুটিয়ে তোলেন পাঠকের চোখের সামনে। পাঠককে কল্পনার আশ্রয় নিয়ে হয়। হাইকুকে অসমাপ্ত কবিতা বলে। কবি লেখা শেষ করেনি। পাঠককে শেষ করতে হয় তার হৃদয় দিয়ে। পাঠক তার নিজের আবেগে ঘুরপাক খায়। বিবাগী হয়ে যায় তার মন। পুরো ব্যাপারটাই পাঠকের কল্পনার খেলা। পাঠকের হাতেই সব। যেমন---- গাছের পাতা পরে আছে কাকের ছায়ার মত। নিঃসঙ্গ চাঁদ থেকে খসে পরা। (কবি-কাগা নো ছাইয়ো ১৭০৩-১৭৭৫) অথবা---- ঘুড়ি উড়ে । একই আকাশে। গতকাল অন্য ঘুড়ি উড়েছিল। বা প্রজাপতি উড়ে। বুনো অর্কিডকে ভালবেসে... মধ্যযুগ থেকে কত কবি এসেছে আমাদের ভাষায়। এরা অদ্ভুত সব কবিতা লিখে রেখে গেছেন আমাদের জন্য। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত (১৮৩৫-১৮৯৪) হতে মদনমোহন তর্কালঙ্কার(১৮১৭-১৮৫৮),কালিপ্রসন্ন ঘোষ ো(আ৮৪৩-১৯১১),নবীনচন্দ্র সেন(১৮৪৭-১৯০৯) হতে জসীমউদদীন(১৯০৩-১৯৭৬) এবং আজ পযন্ত । মনে পড়ে ? পাখী সব করে রব রাতি পোহাইল। কাননে কুসুমকলি সকলি ফুটিল।। বা মনে করো, যেন বিদেশ ঘুরে মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে তুমি যাচ্ছ পালকিতে মা চড়ে দরজা দুটো একটুকু ফাঁক করে আমি যাচ্ছি রাঙা ঘোড়ার পরে টগবগিয়ে তোমার পাশে, পাশে। বা বাবুদের তালপুকুরে হাবুদের ডালকুকুরে সে কি বাস করলে তাড়া বলি থাম একটু করি দাঁড়া ... প্রায় সব বাঙ্গালী ছোট বেলায় কবিতা লেখা শুরু করে। একটা ছোট কাকে আমায় শুধু ডাকে।। মার্কা কবিতা লিখেই নিজেকে তালেবর ভাবতে থাকে।অত সহজ না আসলে। একজন মানুষ ধনী হয় কি করে ?সহজ উত্তর তার কাছে বেশি মুদ্রা থাকে। কবি কবিতায় প্রাচুর্য তখনই আসে যখন সে তার কবিতায় নতুন ছন্দ আর উপমা প্রযোগ করতে পারে। আর সেইজন্য কবির স্টকে প্রচুর শব্দভাণ্ডার থাকতে হয়। প্রচুর জানতে হয় তাকে। তার জানার ভাণ্ডারে করতে হয় নতুন নতুন শব্দ। আমাদের ভাষাটা মজার। হরেক রকম শব্দ আছে আমাদের ভাষাতে। এমন কি প্রচুর বিদেশী শব্দও ঢুকে গেছে। মনেই হয় না বিদেশী। যেমন আরবি ভাষা থেকে এসেছে আইন, আদালত, তারিখ, ফসল, জাহাজ, হাকিম, উকিল, শয়তান, আসল, জিনিস ইত্যাদি। ফরাসি ভাষাথেকে এসেছে কারবার, খরচ চাবুক, দোকান, খাতা, পর্দা, রুমাল, কারখানা , চশমা, কুস্তি, মজুর, হাজার, শিকার, পোশাক, বরফ, ইত্যাদি। পর্তুগিজ ভাষা থেকে এসেছে আলমারি, আলপিন, জানালা, চাবি, পেয়ারা, কামিজ, সাবান, বোতাম,, ইস্পাত, তোয়ালে ইত্যাদি। অনায়াসে ব্যবহার করা যায় সেই সব শব্দ। বৈচিত্র সবাই আনতে পারে না। দুই একজন আনে। বদলে দেয় সব কিছু। তাই যখন জীবনানন্দ দাস কবিতা লেখা শুরু করেছিলেন অনেকেই বেশ বিরক্ত হয়েছিল। কিন্তু কে জানত জীবনানন্দ দাশ একাই পাল্টে দেবেন বাংলার কবিতা ? কত কথা হল কবির সাথে। আরও এক দফা চা খেলাম। বিপিন তো পুরোপুরি চা -খোর আদমি। তবে সব সময় তাড়াহুড়ো করে চা গিলতে গিয়ে জিভ পুড়িয়ে ফেলে। ততক্ষণে কুয়াশা কেটে গেছে। হলুদ রোদ উঠেছে সুন্দর। নদী থেকে ঠাণ্ডা হওয়া ভেসে আসছে। দূরে পুরানো হলুদ একটা দালান দেখা যাচ্ছে। লম্বা লম্বা থাম আর খিলান। ওটা হংস সিনেমা হল আগে হংস থিয়েটার বলতো লোকে। ইংরেজদের বানানো। আমার শহরে যখন ইংরেজরা ছিল তখন টমটম গাড়িতে করে ওখানে নাটক দেখতে যেত । আমার শহরে ইংরেজদের ছায়া এখনো রয়ে গেছে। রেল লাইন আর পোস্ট অফিস আছে কয়েকটা । ইশটিশনের পাশে লাল গুমটি ঘর। লাল টালির ছাদ। পাশে ঝাঁকরা নিম গাছ। নিম গাছে চিরকি মিরকি পাতা। কাঠ কয়লার মত কালো একটা কাক নিমফল খায় বসে বসে। গুমটি ঘরের ভেতরে পুরানো দিনের ইয়া ঢাউস একটা ঘড়ি। নষ্ট। কবে যেন সারে চারটার সময় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আর মেরামত করা হয়নি,। টেবিল ভর্তি হরেক কাগজ পত্র। আর পেতলের অদ্ভুত একটা লন্ঠন। ওটাতে লাল-হলুদ আর সবুজ কাঁচ বসানো। পৃথিবীর সব রেল লাইন শেষ হয় স্বপ্নের মত একটা ইশটিসনে গিয়ে। আমার শহরেও তাই। ইশটিসনের দুই ধরে বনকলমির ঝোপ। শেয়াল কাটার দঙ্গল। হলুদ রঙের ফুল হয়ে আছে শেয়াল কাঁটার ঝোপে। মেক্সিকান গাছ এটা। পতুরগিজ জাহাজিরা সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে দিয়েছিল এই ফুলটা। আমরা হেঁটে যাই। কাঁচা বাঁশ কেটে চায়ের দোকান বানানো হয়েছে একটা । সদ্য কাঁটা বাঁশের ঘ্রানে নেশার মত লাগে। ভেতরে মাটির চুলায় ফটফট করে জ্বলছে সাই বাবলার ডালাপালা। কালো কুঁচ কুচে ইয়া একটা কড়াইতে ভাঁজা হচ্ছে আলুর চপ আর বেগুনের ফুলুরি। খদ্দেরের নাকের সামনে ঝুলছে বাসি পাউরুটি আর কালো ছিট পরা হলুদ কলা। চায়ের দোকানের বাঁশের চাতাইয়ের দেয়ালে সেটে আছে বাংলা সিনেমার বিদঘুটে সব পোস্টার। নায়ক- নায়িকা- ভিলেন সবার হাতে পিস্তল। আজব। দূরের অচেনা কোন নীল পাহাড় থেকে শীতের হাওয়া ঝুপ করে নেমে পরে আমার শহরে। বৈচিঁ আর সোনালু লতা কাঁপে থর থর করে। ভেজা মাটির মিষ্টি ঘ্রান। টায়ার পুড়িয়ে ভাত রান্না করে দুঃখিনী মা। এক গাদা অচেনা পাখী ইংরেজি V হরফের মত উড়ে যাচ্ছে দূরে কোথাও। হয়তো ওদের প্রিয় কোন চারন ভূমিতে। যেখানে নরম আর ভেজা ঘাস পাওয়া যাবে। জলাভুমি ভর্তি গুগলি শামুক আর কচি লেবু পাতা রঙের পোকা পাবে অগুনিত। কবির সাথে বন্ধুত্ব গড়ে উঠল আমাদের। বিপিন কবি হতে চায়। আমি চাই না। কারন জানি কবিরা সারা জীবন কষ্ট করে। আমি জানি বন্দুকের নলই সকল ক্ষমতার উৎস। কবিরা মরার পর তাদের কবরে ফুল দেয়া হয়। তাদের নামে আলোচনা সভা হয়। তাদের নামে সাহিত্য পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। তাদের নামে রাস্তা ঘাঁট বাথরুম সব বানানো হয়। তাদের কবিতাগুলো জাতীয় সম্পদ হয়। কিন্তু কবি যত দিন বেঁচে থাকে তার দিনরাত্রি হয় অনন্ত দুঃস্বপ্নের খামার। তার লেখা পাণ্ডুলিপি ধূসর থেকে ধূসর হয়। বাক্স বন্দি হয়ে পরে থাকে তার কবিতা-যেগুলো সব ঘুমের দেশের নাম না জানা পরীর মত। কবি কোন বায়ুভুক রবীন্দ্রনাথ নয়। তাকে করতে হয় চালডাল -তেল নুনের বন্দোবস্ত। আমরা চাইলেও নতুন তামাক পাতার মত টাটকা কবিতা সে লিখতে পারে না রোজ। তাকে যোগার করতে হয় বাচ্চার স্কুলের ফী। কে না জানে আজকাল গৌরীসেন নেই। যে সবার খরচ যোগার করবে। ফেল কড়ি মাখো তেল এর যুগে আছি আমরা। আমার শহরে যে যে কবি আছে তারা সবাই ধনী । নিজের পয়সায় বই বের করে কবি হয়। নানান অনুষ্ঠানের সভাপতি হয়। কী ভাবে কী ভাবে যেন আজব সব নামের সাহিত্য পুরস্কার পেয়ে যায় উনারা মাত্র একটা বই লিখেই। আমি কবি হতে চাই না। জন্ম থেকেই অচেনা মানসিক রোগে আক্রান্ত আমি। এই বিবর্ণ ধূসর জনপদ ভাল লাগে না। জুতার বাক্সের মত ঘর বাড়ি। মরচে ধরা টিনের চালের উপর রুপালী অ্যালুমিনিয়ামের টিভি অ্যাণটিনা। সরু দেয়াল তুলে প্রতিবেশীর সাথে বিভেদের প্রাচীরতোলা-কিছু ভাল লাগে না। কয়েক ঘর বসতবাড়ির পর ইয়া বড় বড় এক একটা আবর্জনার স্তূপ। সারা বছর ওখানে মরা বেড়াল পরে থাকে পচে গন্ধ বের হবার জন্য। দিন রাত নষ্ট করা যাপিত এই জীবন অসহ্য। আয়ুর তিন ভাগের দুই ভাগ সময় নষ্ট হয় শুধু চাল ডাল কেনার পয়সা যোগার করার জন্য শ্রম বিক্রি করতে করতে। চারিদিকে নষ্ট হবার প্রতিযোগিতা। মফস্বলের দুঃখিনী মায়ের ছেলে উচ্চ শিক্ষার জন্য শহরে এসে রাজনীতিবিদদের পাশার ঘুঁটি হয়ে মারা যায়। তাই আমি কবি হতে চাই না। কারন কবিরা মিথ্যা স্বপ্ন দেখায়। মিথ্যা স্বর্গের চেয়ে সত্যের নরক অনেক ভাল। যদিও লোকে সেটা বলে না।লোকে মিথ্যা নিয়ে বাঁচতে ভালবাসে। আমি শুধু পালাতে চাই। দূরে কোথাও পালাতে চাই। হয়তো দক্ষিনের কোন দ্বীপে-লাল চিনির মত সৈকত আর নারকেল গাছের ছায়ায়। ছয় তারের গীটার বাজিয়ে বিবাগী সুর তোলে কোন আদিবাসি যুবক। বিদেশী টুরিস্টদের হাঁক ডাক নেই। সৈকত মাছ ভাঁজার নিঃসঙ্গ দোকান। কেরোসিন কাঠের বাক্সে বরফের কুঁচি দিয়ে ঠেসে রাখা সারডিন আর টুনা। নারকেল গাছের পাতার ছাউনি দিয়ে বানানো শুড়িখানা। কাঁচের লম্বা পানপাত্রে নীল রঙের মদ। টুরিস্টদের মন ভোলানোর জন্য গ্লাসের কোনায় কায়দা করে গুঁজে দেয়া কাগজের রঙিন ছাতা । আর কাঠগোলাপ ফুল। অথবা দূরের নাইরোবি শহর। রোদেলা জানজিবার দ্বীপ। হাতির রঙের মত কিলিমাঞ্জারো পাহাড়। মাসাইমারা গ্রাম। কেন যেন মনে হয় আমার শহরের শেষ ইসটিশনটা পার হলেই অচেনা নতুন দেশ। যেখানে গাছের পাতাগুলো পযন্ত অচেনা। শুকনো বাকল থেকে দারুচিনির ঘ্রান বের হয়। সারা বছর কাঁঠালিচাঁপা ফুলের ঘ্রান ভেসে আসে অচেনা কোন আনন্দলোক থেকে। কল্পনা বিলাসীরা কষ্ট পায় হরদম। আমিও পাই। মনে হয় কত গল্প ছড়িয়ে আছে চারিপাশে। রামকৃষ্ণ মঠের পাশে একটা বিশাল ফাঁকা মাঠ। মাঠের ঠিক মাঝখানে একটা নিঃসঙ্গ কবর। আরবি ভাষায় কি সব লেখা। কোন এক অলির কবর এটা। কবে এসেছিল দূর পারস্যের দেশ থেকে আমাদের জলে ভেজা এই বাংলায়। আর ফিরে যায়নি। অনুরোধ করেছিল নিঃসঙ্গ এই সবুজ মাঠে ঘুম পাড়িয়ে রাখতে। শুয়ে আছে আজও কোন এক জিন্দাপীরের গল্প শুনেছিলাম-মায়ের মুখে। আকন্দ লতা আর বন তুলসির ঝোপে ছিল তার কবর। পাড়া গাঁয়ের বধূরা সন্ধ্যাবেলা তার কবরের উপর রেখে দিত মাটির পিদিম। মানত করত- তাদের সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে। খারালি কালে সব শুকিয়ে যেত। ভোরের আকাশের মত কচি কলাপাতা শুকিয়ে হলুদ হত। মাঠ ঘাঁট শুকিয়ে ফেটে যেত অচেনা গ্রহের জমিনের মত। শুকিয়ে যেত রসালো ঘাস আর মানকচুর দঙ্গল। পদ্মদীঘি শুকিয়ে হত থিরথিরে নর্দমা। আকাশের রঙ হত সীসের মত। বানকুড়ালি হাওয়ায় ভাসতো অচেনা পাখীর ধূসর পালক। মানত করে কেউ কেউ যেত জিন্দাপীরের কবরে। এক ঘটি ঠাণ্ডা জল কবরে ঢেলে দিয়ে ফেরার পথেই দেখত আকাশে জমেছে অভিমানি মেঘ। কাকের পালকের মত কালো মেঘ। তারপর নামত রিমঝিমি বৃষ্টি। বৃষ্টি ! বৃষ্টি !! বৃষ্টি !!! খারালি শেষের বৃষ্টি দেবতাদের আশীর্বাদ। মাঠ ঘাঁট সব হয়ে পড়ে কচি কলাপাতার মত সবুজ তকতকে। রাতারাতি ঘাস বেড়ে লম্বা হয়ে যায় । ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধে পাগল হয়ে যায় দেশান্তরী পথিকের মন। মনে পড়ে যায় ফেলে আসা পরিবারের কথা। ওদিকে নদীতে বান ডাকে। আল ভেঙ্গে ফসলের ক্ষেতে ঢুকে পড়ে নদীর ঘোলা পানি। সেই সাথে ভেসে আসে রয়না, ট্যাংরা, শোল আর দুধের সরের মত সরপুঁটি। পিরালি বোয়াল আর মাগুর মাছ ও চলে আসে। ঘন বর্ষার দিনগুলোতে নিঝুম হয়ে যায় গ্রামের পরিবেশ। গ্রামগুলো ও হয়ে যায় কেমন বিচ্ছিন্ন। দিনমান বৃষ্টিতে ভেজে পাটের খেত আর বাসক পাতার ঝোপ। আকাশে কালি গোলা মেঘ। শিনশিনে পূবালী হাওয়া। খেয়াঘাঁট বন্ধ হয়ে যায় আগে ভাগে। পারাপারের লোক নেই। মহাজনি নৌকা ভিড়ে থাকে ঘাটে। গুদারা ঘাটের ছোট্ট বেড়ার ঘরে ঘুমিয়ে থাকে বুড়ো চৌকিদার। পাশে একটা ঘিয়া রঙের কুকুর। মাঝে মাঝে ঘুম ভেঙ্গে অযথাই হাঁক দেয় চৌকিদার- কে যায়? সন্ধ্যার পর কমলা রঙের টিমটিমে হারিকেন নিয়ে মাছ ধরতে বের হয় গ্রামের দুই একজন মাছ শিকারী। হাতে কোঁচ আর কোমরে বেতের ঝুরি। বিচিত্র এই অলৌকিক গল্পগুচ্ছ বিবশ করে দেয় আমাকে। বর্ষার দিনে মাছগুলো কেমন পাগল হয়ে যায়। ওরা হয়তো ভাবে - পৃথিবীতে মহাপ্লাবন নেমে এসেছে। আর কখনই খরালি কাল আসবে না ধুলো মাটির এই পৃথিবীতে। গাঙ্গ বেয়ে মাছেরা চলে আসে পাগলের মত। টলটলে পদ্মপুকুর আর ধানের ক্ষেতের জমা পানি আভিজাত্যের গৌরব ভুলে- বিবাদ ভুলে এক হয়ে যায়। শ্যাওলায় মাঝে ঘাই দেয় জিয়ল মাছের পোনা । মাছদের বড় সুখের সময় সেটা। কিন্তু কেউ জানে না সুখের সময় স্বপ্নের চেয়েও ক্ষণস্থায়ী। ক্ষণিকের বিহব্বলতায় অবাক হয়ে মাছেরা দেখে কমলা রঙের কেমন যেন মায়াবী আলো। কিসের আলো ওটা ? কেন এতদিন ও রকম জাদুকরী আলো দেখেনি জলের স্রোতে ভেসে ভেসে। অচেনা অনুভূতি ওদের পালাতে দেয় না। মুহূর্তের ঘোর লাগা অনুভূতি নষ্ট হয়ে যায় শক্ত কোঁচের ঘায়ে। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটে । মোরগ ফুলের মত লাল হয়ে যায় আশেপাশের পানি। ব্যাথা নিয়ে আবিষ্কার করে কোঁচে গেঁথে আছে মাছের শরীর। বেতের ডুলাতে পড়ার আগে মনে পড়ে গাঙ্গের ঘোলা পানির কথা।বর্ষার নতুন পানিতে ভিজে মাছ ধরে মৎস্য শিকারীরা। কিংবদন্তীর মত কয়েক নদীর মোহনায় জমা হয় বোয়াল মাছ। রূপার ফালির মত মাছের টুকরো ভর্তি বেতের ঝুরি নিয়ে বাড়ি ফেরে ওরা। গ্রামের সব রান্না ঘর ভিজে সপসপে থাকে এই মৌসুমে। মাটির চুলার ভেতরে আস্তানা গাড়ে কোলা ব্যাঙ। দাওয়াতে আলগা চুলার ব্যবস্তা করা হয়। শুকনো বাবলার ডাল আর জমা ঘুঁটে নিয়ে রান্নার আয়োজন করে বাড়ির মেয়ে । মরচে রঙের বাটা মসলা গায়ে মেখে কালো কড়াইয়ে রান্না হয় মাছের তরকারি। বৃষ্টি ধরে আসে । বাইরে নীল অন্ধকার। লাল চালের ফ্যানসা ভাত আর ঝাল মাছের তরকারি দিয়ে ভাত খেতে খেতে গ্রামের শিকারী পুরুষ প্রশংসার চোখে চায় গিন্নির দিকে। ভাবে-হাতে কিছু পয়সা হলেই গিন্নিকে একটা নাকছবি বানিয়ে দিতে হবে। বাদলার মৌসুমে সব গ্রামের দৃশ্য কিন্তু এক না। আমি কল্পনা করি কোথাও কোন জংলা ভিটায় রোগা এক মেয়ে শুয়ে আছে বিছানায়। ওষুধ, পথ্য কিছুই নেই। ছোট ভাইকে ফিস ফিস করে বলছে- অপু, সেরে উঠলে আমাকে একদিন রেলগাড়ি দেখাবি? শহরের শেষ মাথায় ছিল গুলশান সিনেমা হলটা। গুলশান সম্ভবত ইরানী শব্দ। মানে কি? ফুল বাগান ? খানিক দূরেই দোতালা একটা মার্কেট। একতলায় মনিহারি দোকান। দোতলা ভর্তি গানের রেকডের দোকান। সুন্দর সব নাম। গীত বিতান। সরগম। গানের ডালি। দিনমান ব্যাস্ত থাক ওরা। খদ্দেরে গিজগিজ করত। মোটা মোটা খাতা ভর্তি গানের কথা লেখা থাকতো। ভাল জামা কাপড় পড়া মানুষজন অনেক সময় নিয়ে ঘেঁটে ঘেঁটে গান পছন্দ করতো। বিশ টাকা করে নিত রেকডিঙের খরচ।মুড়ির টিনের মত বিশাল কালো স্পিকারে জোরে জোরে গান বাজত-পাপা ক্যাহতে হ্যায় বাড়া নাম কারে গা..। মার্কেটের নিচে একটা বুড়ো লোক পুরানো বই বিক্রি করত। শীতের বিকেলগুলোতে হেঁটে যেতাম বই কিনতে। পুরো শহরে এই একজনই পুরানো বই বিক্রি করত। কত দুর্লভ বই যে থাকত বলার মত না। রাদুগা প্রকাশনীর দারুন সব বই পেতাম। মালাইকাইটের ঝাঁপি। বৃষ্টি আর নক্ষত্র। সাগরতীরে। রুপের ডালি খেলা। আমার পশু বন্ধুরা ।সোনার পেয়ালা ।সার্কাসের ছেলে ও অন্যান্য গল্প । ধলা কুকুর শামলা কান । অনেক সময় ঘেঁটে মাত্র একটা বা দুটো বই কিনে বাড়ির পথ ধরতাম। চারিদিকে কমলা রঙের রোদ। উলটো দিকেই পৌর পাঠাগার। বড় একটা কৃষ্ণচুড়া গাছের নিচে। বাইরে পুরানো দিনের দুটো লাম্পপোস্ট। সন্ধ্যার পর পচা পনিরের মত আলো জ্বলত। ওখানে মাঝে মাঝে কবিকে দেখতে পেতাম।পৌর পাঠাগার ভর্তি ইয়া বড় বড় কাঠের আলমারি। সামনে কাঁচ। পুরানো হতে হতে কাঁচ গুলো গাঙ্গের পানির মত ঘোলা হয়ে গেছে। ভেতরে ঠাসা বই। নতুন বই কম, সবই ছেঁড়া আর বিবর্ণ। চর্যাপদের সংগ্রহশালা যেন। পাঠাগারের ভেতরে আলো একদম কম। ষাট পাওয়ারের লাল বাল্বগুলো টিনের শেডের ভেতরে ঘাপটি মেরে আছে। পাঠকদের অবস্থা কাহিল।ওখানে বসে নিয়মিত যারা খবরের কাগজ পড়ে তারা এক মাসের মধ্যে রাতকানা- দিন কানা এমনকি দুপুর কানা ও হয়ে যায়। আরও একটা সমস্যা ছিল। বাথরুমের দরজা নেই। সেখানে চটের একটা বস্তা ঝুলে। ভেতর থেকে প্রস্রাবের ঝাঁঝালো গন্ধ ভেসে আসে সব সময়। বিচ্ছিরী গন্ধে অ্যামোনিয়া ও ফেল মারে। এ রকম পাঠাগার পৃথিবীর আর কোথাও আছে কিনা সন্দেহ। প্রায়ই সন্ধ্যার পর বিদ্যুৎ দাদা চলে যায়। টেবিলে টেবিলে রক্তশূন্য কড়ির মত সাদা রঙের মোমবাতি জ্বেলে দেয় । মোমবাতির জণ্ডিসের মত পাণ্ডুর আলোতে দৈনিক সংবাদপত্রগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ে অলস-বেকার আর ভবঘুরে পাঠক।কবিকে প্রায় সময় খবরের কাগজ হাতে বসে থাকতে দেখতাম। পাঠাগারের ভেতরে এক কোনে বসে থাকতেন। শুনেছিলাম চাকরি খুঁজতেন কবি। একদম বেকার তিনি। বাইরে থেকে কবিকে দেখতে পেলে আর ভেতরে ঢুকতে চাইতাম না, লজ্জা পেতেন তিনি। শীতের সন্ধ্যার হেঁটে যেতাম। ল্যাম্পপোস্টের নরম আলোতে সব কিছু বড্ড বেশি মায়াবী লাগত। পাঠাগারের দোতলায় বড্ড বেশি হৈ চৈ হত শীতের সন্ধ্যাগুলোয়। মঞ্চ নাটকের কতগুলো ছেলে পিলে রোজ এসে রিহারসেল করতো। টানা দেড় দুই মাস রিহারসেল শেষ করে নাটক মঞ্চস্থ করতো। বেশির ভাগই রক্তকবরী, পায়ের আওয়াজ শোনা যায় বা যৌবতী কন্যার মন এই রকম নাম থাকতো। টিকিট বিক্রি হত সারা বিকেল। শহরের রুচিবান মানুষজন কুড়ি টাকা খরচ করে নাটক দেখত।পাঠাগারের বাইরে কয়েকটা ঠেলা গাড়ি থাকে। হরেক কিছু বিক্রি হত। বিশাল একটা অ্যালুমিনিয়ামের ডেকচির মধ্যে নানান রকমের ডাল আর গরু ছাগলের বট দিয়ে বানানো হালিম বিক্রি হতো। ইয়া মোটা একটা লোক সারাক্ষণ লোহার একটা বিদঘুটে চামচ দিয়ে নাড়াচাড়া করতো হালিমগুলো। পাশেই লম্বা টুল। ওখানে বসে ক্ষুধার্ত মানুষগুলো চামচে করে ফুরুত ফুরুত করে হালিম খেত। খাওয়া শেষ হলে সবার প্লেট একটা বালতির মধ্যে ডুবিয়ে রাখত বিক্রেতা। নতুন কোন খদ্দের পেলে বালতির ভেতর থেকে হাত ডুবিয়ে প্লেট তুলে আনত হালিমওয়ালা। গা ঘিনঘিনে একটা ব্যাপার। পাশে সারাক্ষণ দুই তিনটে কুকুর বসে থাকতো আশায় আশায়। যদি কেউ হাড্ডি গুড্ডি ফেলে! কবি সপ্তাহে একদিন সময় দিতেন আমাদের। আমরা তিনজন রেল লাইন ধরে হাঁটতে হাঁটতে চলে যেতাম বহুদূর। রেললাইনের দুই পাশে ঘন ঝোপঝাড়। বনতুলসি, বনকলমি আর আকন্দের দঙ্গল। বন তুলসির ঝোপ থেকে কেমন বুনো একটা ঝাঁঝাঁলো গন্ধ বের হয় সব মৌসুমে। আর আছে একগাদা কড়ই গাছ। সংখ্যায় কত কেউ জানে না। সারাবছর কড়ই গাছের শুকনো গোল ছোট পাতা ঝরে পড়ে। মনে হয় খুশি হয়ে কোন রাজা মুঠো ভর্তি করে মোহর ছুড়ে দিচ্ছে। রেললাইন ভর্তি সাদা চকচকে ছোট ছোট পাথর। এক ভরা জোছনার রাতে আমরা রেললাইন ধরে হাঁটতে দিয়ে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। চাঁদের আলোতে পাথরের টুকরোগুলো চকচক করছে। মনে হয় আরেকটা চাঁদ ভেঙ্গে ওটার টুকরোগুলো ছড়িয়ে দিয়েছে কেউ রেললাইনের মাঝে। কি সুন্দর ! কি সুন্দর !! কি সুন্দর !!!। সে এক অলৌকিক দৃশ্য। দারুন দৃশ্য না ? জানতে চাইলেন কবি। আমরা বিবাগী হয়ে মাথা নাড়লাম। কিছু বললাম না। আমরা প্রায়ই রাতে বের হয়ে পড়তাম। রেল লাইন ধরে হাঁটতে হাঁটতে কত দূর দুরান্ত পযন্ত চলে যেতাম। হাজার বলেও শেষ করা যাবে না আশেপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশের কথা। জোসনার রাতগুলোতে গাছপালা-ঝোপঝাড় সব কিছুই চুপচাপ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিজত চাঁদের আলোতে। আবার অমাবস্যা রাতেও মুগ্ধ হতাম। আকাশ ভর্তি চুমকির মত লক্ষ লক্ষ তারা ঝিকিমিকি করছে। দূরের ঝোপঝাঁড়ে ও লক্ষ লক্ষ তারা ঝিকিমিকি করছে। ওগুলো আসলে জোনাকি। দেখতাম অন্ধকারে কলা বাগানে ডানা ঝাপটে নেমে আসে বাদুড়। পাকা ফসলের ক্ষেতে ঘুরঘুর করে লোভী ইঁদুর। শুনি রাতজাগা পাখীর ডাক। শেয়ালের ডাক শুনে অদ্ভুত রকমের শিহরন লাগতো মনে। তক্কে তক্কে আছে সোনালী শয়তানটা । কার বাড়ির মুরগি চুরির তালে আছে কে বলবে ? গতবার এই রেললাইনের পাশে এক জায়গাতে শেয়াল ধরা পড়েছিল। বহুদিন ধরে মানুষকে জ্বালাছিল ব্যাটা। শেয়ালটাকে ধরার পর এলাকার যুবক ছোকরা সবাই মিলে কেটে রান্না করে খেয়েছিল। কয়েক জন বুড়ো হাবড়া মাংসের জন্য ঘ্যান ঘ্যান করছিল। বারবার বলছিল- ওই বিল্লাল দে না ।দে না বাপ এক টুকরো হিয়ালের গোস। শেয়ালের মাংস খেলে নাকি বাতের ব্যাথ্যা ভাল হয়ে যায়। গরমের এক দুপুরে বেশ আয়েশ করে বই পড়ছিলাম। গুপ্তধন শিকার টাইপের বই। দম ফেলার ফুরসত নেই। এমন সময় উত্তরের ইকবালদের মহল্লা থেকে বেশ গোলমাল ভেসে এলো। মহিলা কেউ কান্না কাটি করছে। সাথে বাচ্চা কাচ্চার কান্না আর বেশ শোরগোল। ইকবালদের মহল্লাটা বেশ ঘনবসতি । বস্তিই বলা চলে। একদম নিন্ম আয়ের মানুষজন থাকে ওখানে। বেড়া আর টিনের চালের ঘর। লাইনের পানি। দুইবেলা লাইন ধরে বস্তির মা মেয়েরা কলসি ঠিলা ভরে পানি নেয়। তখন হালকা পাতলা ঝগড়া হয়। কিন্তু তত বেশি না। এত বছর ধরে আছি-কিন্তু কোন মারামারিই হয়নি। দুই একটা দাম্পত্য কলহ ছাড়া বেশ চুপচাপ। আজ আবার কী হল ? বোঝা যাচ্ছে মস্ত কোন কেওয়াজ। ঝেড়ে দৌড় দিলাম। দেখি পরিচিত এক মহিলা যাকে সবাই শঙ্করের মা বলি-তিনি কান্নাকাটি করছেন। পাশে তার পিচ্চি পিচ্চি দুই বাচ্চা মেয়ে কাদছে। কাদছে আর বলছে- ও দাদারে। শঙ্করের বুড়ো বাপ পাথরের মত বসে আছেন। অসম্ভব রকমের কষ্টে পাথর হয়ে গেছে বুড়ো। কী হয়েছে কিছুই বুঝলাম না। শুনলাম শঙ্কর নাকি মুসলমান হয়ে গেছে। শঙ্করকে চিনতাম বহু আগে থেকেই। রোগা কালো আর লম্বামত এক ছেলে। বয়স বাইশ বা তেইশ হবে। কোন এক কারখানায় লেদ মেশিনের কাজ করে। আগে রঙমিস্ত্রি ছিল। খুব হাসি খুশি এক ছেলে। সবাই পছন্দ করে। ওর আয়েই সংসার চলে। মা সারাদিন ঘর কন্যার কাজ করে। আর অন্যের বাড়িতে টুকটাক ফাই ফরমায়েস খাটতো। যেমন- মসলাবাটা, দুই কলসি পানি দেয়া, ঘর মুছে দেয়া হেন তেন। পিচ্চি ভাই বোন দুটো অনেক ছোট। ক্লাস টুতে পড়ে প্রাথমিক ইস্কুলে। শঙ্করের বাপ বুড়ো রোগা ভোগা মানুষ। সারা বছরই অসুস্থ ।বেকার। মিষ্টির দোকানের বাক্স বানাতে দেখতাম মাঝে সাঝে। আর প্রতি বিকালে রামবাবুর পুকুর পাড়ে ছিপ ফেলে মাছ ধরতে যেত। রামবাবুর পুকুরটা বেশ জনপ্রিয় ছিল মৎস্যশিকারীদের কাছে। জুতার বাক্সের আকারের পুকুরটার তিন দিকে তিনটে ঘাঁট ছিল। বাকি চারিদিকে ছিল হেলেঞ্চা আর জলকলমির দঙ্গল। চৈত্র বৈশাঁখ মাসেও পুকুরের পানি থাকতো বরফের মত ঠাণ্ডা। মাছ সম্ভবত ভালই পাওয়া যেত। নইলে কি অত দূর দুরান্ত থেকে মৎস্য শিকারীরা আসে ? তবে বেশ কয়েকজন ছিল নিয়মিত। এমন কি বাদলার দিনগুলোতেও উনাদের দেখতাম। ছাতা মাথায় করে গুঁটিশুঁটি মেরে বসে আছেন। হাস্যকর রেইনকোট গায়ে দেয়া। লম্বা পলিথিন দিয়ে নিজের হাতে বানানো । পায়ের সামনে ছোট্ট পলিথিনের ব্যাগ। ওখানে মাছ রাখা। কনডেন্স মিল্কের খালি টিনের কৌটা ভর্তি কেঁচো। নিয়মিত শিকারীদের বসার জন্য নিধারিত জায়গা আছে। নাম লেখা নেই। তবে সবাই জানে। পুকুর পাড়ে পাশাপাশি চারটে লম্বা হিলহিলে নারকেল গাছ আছে। গাছগুলো জড়িয়ে রেখেছে হলুদ সবুজ ইয়া মোটা মানি প্ল্যানটের দঙ্গল। ঐ গাছগুলোর নীচে বসে শঙ্করের বুড়ো বাপ। উত্তর দিকে মসজিদের ঘাটলার পাশে বসে দাদন ভুঁইয়া। উনাকে সবাই খলিফা বলে। নাহ ইসলামী শাসন আমলের খলিফা নন। উনি আসলে দর্জি। দর্জিদের কেন খলিফা বলে কে জানে। আমি জানি না। তোমরা কেউ জান ? পূর্বদিকে গফুর হাজির বাড়ির ঘাঁটলা। খানিক ভাঙ্গা- চুড়া। পাশেই কতগুলো চালতা আর জামরুল গাছ। কেমন ছায়া ছায়া। ওখানে বসে আরও একজন নিয়মিত শিকারী - কালু শেখ। ইয়া লম্বা তাগড়া চেহারার মানুষ। গাল ভর্তি দাড়ি। উনার শিশি বোতলের কারবার। কালি বাজার ফল পট্টির ওখানে কালু শেখের দোকান দেখেছি। পুরানো মদের খালি বোতল আর টিনের ড্রাম ভর্তি নারকেল তেল বিক্রি করেন। বাদবাকি মৎস্য শিকারীরা অনিয়মিত বা ভিন মহল্লার। যার যেখানে পছন্দ বা সুযোগ মিলে সেখানেই বসে পড়ে। ছিপ ফেলে তোম্বা মুখে চেয়ে থাকে ফাতনার দিকে। কেউ দামি ফাইবারের ছিপ , নাইলনের সুতো আর দামি বড়শি নিয়ে আসে। কেউ সরু বাঁশ বা কঞ্চির ছিপ আর সস্তা সুতা সাথে মনির মিয়ার দোকানের চারআনা করে কেনা বড়শি নিয়েই বসে। কেউ চটের একটা টুকরোর মধ্যে আয়েশ করে বসে। আবার কেউ এমনিতেই পায়খানায় বসার মত ভঙ্গি করে বসে। যাই হউক না কেন খালি হাতে ফেরে না কেউ। সবাই মাছ পায়। সবচেয়ে ভাগ্যবান শঙ্করের বাপ। সবাই বলে উনার নাকি মাছের রাশি আছে। মাছের রাশির ব্যাপারটা সত্যি হতে পারে। আমি নিজে অনেকদিন ছিপ হাতে বসে দেখেছি রামবাবুর পুকুর পারে।না। মাছে ভুলেও ঠোকর দেয়নি। বেশিক্ষণ বসতেও ইচ্ছা করে না। উশখুশ করতে থাকি। দেখি কালো কাঁচের মত পুকুরের পানির উপর হেঁটে যাচ্ছে অদ্ভুত রকমের কাঁচ পোকা। সবুজ টকটকে জলকলমির ডগার উপর বারবার বসার চেষ্টা করছে লাল টুকটুকে একটা ফড়িঙ। এদিক অদিক ঘাই মারে গজার মাছের পোনা। খলসে মাছের রঙধনুর মত শরীর ঝিকিয়ে উঠে পানির নীচে। একসময় বিরক্ত হয়ে উঠে যাই। শঙ্করের বাপ আসতো প্রায় শেষ বিকালে। সূর্যটা তখন জাফরানি রঙের হয়ে আনন্দদের মামার বাড়ির ছাদের টাঙ্কির কোনা ধরে ঝুলে আছে। যে কোন সময় টুপ করে খসে পড়ে যাবে। খসখস করে বাতাস বইত। পুকুরের পানিতে ক্ষুদে ক্ষুদে ঢেউ উঠত। চারিদিকটা বেশ নীরব তখন। আয়েশ করে বসত নারকেল গাছগুলোর পাশে। ( অসমাপ্ত..., কোন এক বইমেলায় আসবে )


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১৩১২ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now