বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
গল্পঃ নিশিথে
.
.
আমাবস্যার রাত্রির মতোই কিছুকিছু রাত্রি নিকষকালো অন্ধকারের সংস্পর্শ পায়। গগনপৃষ্ঠায় কোন চন্দ্রের দেখা মেলেনা। থাকেনা কোনো তাঁরার বিচরণ। সে নিশিথে শান্ত গ্রামের দিকে ধেয়ে আশা সেই তেপান্তরের মাঠ পেরানো গা জুড়ানো মৃদুলা বাতাসের কোনো বেহায়াপনাও থাকেনা। স্বর্গপুরেও স্বার্গের সেই জোনাকিপোকার নীলবাতি গুলো সেইসময় আর জ্বলে-নিভে উঠেনা। যাকে বলে, তমস্র নিশীথিনী! তেমন একটি নিশিথে বাহির বাড়ির দুয়ারে দাঁড়িয়ে আছে ইমু। ভেজা টলমলানো নির্বাক চোখে তাকিয়ে আছে আলোকসজ্জায় সাজানো মস্ত বড় বিয়ের গেইট'টার দিকে। খুব নিখুঁতভাবে সাজানো হয়েছে সমস্ত বাড়িটাই। শত হলেও আজ মামার একমাত্র মেয়ের বিয়ে বলে কথা, অপূর্ণতায় বা থাকবে কেন! খুব ধুমধাম করে আজ বিয়ে হচ্ছে সামিয়ার। ইমুকে এমন একটা দিনের সম্মুখীন হতে হবে, সে কথা ইমু কল্পনাও করেনি কোনদিন। ভেতর বাড়ি থেকে সানাইয়ের সুর ভেসে আসছে। সেই সানাইয়ের প্রতিটি টান হাওয়াকে জড়িয়ে একাকার হয়ে যাচ্ছে সমস্ত পাড়া জুড়ে। কর্ণপথ ঘেসে সেই সানাইয়ের প্রতিটি টান যেন ইমুর হৃদয়টাকে ভেদ করে গায়ের পিষ্টক অতিক্রম করে চলে যাচ্ছে কোনএক কষ্টের নীল তীর হয়ে। ইমুর গাল বেয়ে পরা চোখেরজল গুলো আলোকসজ্জার লাল-নীল-হলুদ বাতিতে যেন একুরিয়ামের সচ্ছ জলের মতো দেখাচ্ছে। এখন কেবলই নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখে কষ্ট বিসর্জনের বৃথা চেষ্টা করেই চলেছে ইমু। কিন্তু ভাগ্যদোষে সেটাও ভাগ্যে হয়ে উঠছেনা! হঠাৎ পিছন থেকে কান্নার শব্দ পেয়ে ইমু কারো উপস্থিত উপলদ্ধি করতে পারলো। চোখের জলকণা গুলো হাতের আঙ্গুল দিয়ে সরিয়ে পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখলো, আনুমানিক ৭/৮ ফুট দূরে তুলি (ইমুর ছোটবোন) দাঁড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে দুচোখ ভাসিয়ে ফেলেছে। ইমু তুলির কাছে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাস করলো---
-- কিরে তুলি, তুই কাঁদছিস কেন? কি হয়েছে তোর? কেউ কিছু বলেছে? বল আমায় কে কি বলেছে? এই তুলি?
.
তুলি কান্না জড়িতে কণ্ঠে বললো---
-- তোর অনেক কষ্ট হচ্ছে তাইনারে ভাইয়া?
.
বোনকে দেখে বাঁধ দেওয়া চোখেরজল আর বাঁধা মানলো না। বোনের প্রশ্নতে আর বোনের কান্নার চোখ দেখে নিজের অশ্রুকণা মুহূর্তের মধ্যে গড়িয়ে নেমে আসলো। ইমু আর কিছুই বলতে পারলো না। খুব বেশি কষ্ট পেলে মানুষ কিছুই বলতে পারেনা, আঘাত করলেও প্রতিবাদ করতে পারেনা। কেবলই তখন অতি কষ্টে বাকরূদ্ধ হয় চঞ্চলা সেই হৃদয়, স্থির হয়ে দাঁড়ায় বীর-পালোয়ানের দেহ। তুলি ইমুর হাত ধরে কাঁদোকাঁদো গলায় বললো---
-- চল ভাইয়া, আমি তোকে আর একা একা থাকতে দিবোনা। যতক্ষণ এই বাড়িতে আমরা থাকবো ততক্ষণ তুই আমার সাথে থাকবি। কোথাও একা যেতে পারবিনা। কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন হলে আমাকে সঙ্গে নিয়ে যাবি। কথা দে ভাইয়া আমাকে ছেড়ে দূরেদূরে থাকবিনা?
.
ইমু মৃদু হাসলো! যে হাসিতে সুখের- আনন্দের কোন প্রাপ্তির সংস্পর্শ নেই। বোনের দুই চোখেরজল দুহাত প্রসারিত করে চাপা আঙ্গুল দিয়ে মুছে দিয়ে বললো---
-- পাগলি বোন আমার, আমি কি তোকে ছেড়ে কখনো একা থেকেছি নাকি!
-- তাহলে চল আমার সাথে,
.
কথাটা বলেই তুলি ইমুর হাত ধরে টেনে নিয়ে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করলো। ইমুর মা ইমুকে দেখে জিজ্ঞাস করলো---
-- কিরে তুই এতক্ষণ কোথায় ছিলি? খেয়েছিস কিছু?
.
ইমু কোন কথাই বললো না। ভাইবোন-কে একসাথে দেখে মা বললো---
-- কাজ করিস আর না-করিস, সময়মতো খেয়ে নিস। এখানে কিন্তু সবাই ব্যস্ত কেউ আদর করার সময় পাবেনা।
.
কথাটা শেষ করে ইমুর মা নিজের কাজে চলে গেল।
.
আজ পাক্কা আড়াই বছর পূর্ণ হয়েছে ইমু আর সামিয়ার সম্পর্কের। সামিয়ার সাথে এই গভীর প্রেমের সম্পর্কের কথা তুলি ছাড়া আর কেউ জানেনা। কিন্তু গত কয়েকদিন আগে আরেকজন মানুষকে ইমু জানিয়েছে। সেই ব্যক্তিটি ইমুর বাবা! ইমুর বাবাও জানতে পারতো না, যদিনা সেদিন ইমু তাকে সব না জানাতো। সামিয়ার যখন বিয়ের কথা পাকাপোক্ত হয়ে গেছে। ঠিক তখন ইমু তার বাবাকে তাদের সম্পর্কের কথা বলতে বাধ্য হলো। মানুষের যখন পিছন হাটতে হাটতে প্রাচীরে পিঠ ঠেকে যায়। তখন আর পিছু হাটাবার উপায় থাকেনা। সামনে থাকে মহাবিপদ, পিছনে থাকে নিষ্ঠুর প্রাচীর। তেমনই একটা সময়ে ইমু তার বাবাকে গিয়ে বললো---
-- বাবা আপনাকে কিছু কথা ছিল,
-- বল?
-- সামিয়ার তো বিয়ে ঠিক হয়েছে,
-- হ্যা, এই মাসের ২৬ তারিখ ওর বিয়ে।
-- কিন্তু,
-- কি কিন্তু!
-- আমি সামিয়াকে ভালবাসি বাবা, আর সামিয়াও আমাকে ভালবাসে।
-- কি বললি!
-- হ্যা বাবা,
-- এই কথাটা যেন দ্বিতীয়বার তোর মুখে না শুনি, দুদিন বাদেই ওর বিয়ে। এখন এসব কথা রটলে সমস্যা হবে।
-- বাবা,
-- চুপ, একদম চুপ! বেয়াদব ছেলে। তুই জানিস তুই কি বলছিস? তোর মা শুনলে কি করবে তোকে সেটা বুঝতে পারিস? ভালবাসার কি বুঝিস তুই! আমি আবারও বলছি এই কথাটা যেন আমি কারো মুখে দ্বিতীয়বার না শুনি।
.
বাবার এমন আচরণ দেখে ইমু রুম থেকে বেড়িয়ে গেল। আশা করেছিলো মায়ের কাছে কোন সম্মতি না পেলেও, বাবার কাছে থেকে কিছুটা সাড়া পাবে। কিন্তু ভাবনার সম্পূর্ণ বিপরীত কিছু ঘটে গেল। ইমু কি করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছেনা। এদিকে সামিয়ার বিয়ের দিনতারিখ বাতাসের সাথে পাল্লা দিয়ে সামনের দিকে ছুটে আসছে। বাবার সাথে কথা বলার পর ইমু সামিয়াকে ফোন দিলো---
-- হ্যালো,
-- বাবার সাথে কথা হয়েছে,
-- কি বললো আংকেল?
-- খুব রাগারাগি করেছে। তিনি এগুলো কখনোই মেনে নিবে না।
.
সামিয়া শান্ত হয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ড বাদে জিজ্ঞাস করলো---
-- তাহলে এখন?
-- দেখি কি করা যায়।
-- হ্যা তুমি বরং সেটাই দেখতে থাকো, আর এদিকে তারা আমার বিয়ের বরণডালা সাজাতে থাকুক!
.
সামিয়ার এমন কথা শুনে ইমু আর কিছুই বললো না। সামিয়া বললো---
-- সামনে ২৬ তারিখ দিনধার্য করা হয়েছে সেটা জানো?
-- হুম,
-- আজ ১৯ তারিখ, হাতে মাত্র এক সাপ্তাহ সময় আছে। এরমধ্য যেভাবে পারো তাদের রাজি করাও। আর তোমার মামা! আমার বাবাকে তো খুব ভালো করেই চিনো। তিনি কিছু টের পেলে কি কি করতে পারে সেটা ভালো করেই জানো।
-- হ্যা তাই করছি, রাজি হলে ভালো, না হলে একটা পথ তো আছেই।
-- কি পথ?
-- দুজনে দূরে কোথাও পালিয়ে যাবো,
-- বাবা আসছে রাখছি ফোন,
.
কথাটা বলেই সামিয়া ফোন কেটে দিলো। ইমু সময়ের পালের সাথে অধিক চিন্তায় অনেকটা চিন্তায় কাতর হয়ে পরলো। ইমুর বাবা ইমুর চালচলন ঢের লক্ষ্য করতে লাগলো। দেখতে দেখতে চারদিন চলে গেল। এখনো কিছুই করতে পারলো না ইমু। আর মাত্র তিনদিন হাতে সময় আছে। এরমধ্যেই কিছুএকটা করতেই হবে ইমুকে। কিন্তু কোনো উপায় বেড় করতে সক্ষম হলোনা ইমু। সর্বশেষ কোন উপায় না পেয়ে বাধ্য হয়ে সামিয়াকে পালিয়ে যাওয়ার কথা বলে দিলো। তুলি-কে ইমু রাতে ব্যাগ গুছাতে বললো। ২৪ তারিখ ভোরবেলায় সামিয়াকে প্রয়োজনীয় সবকিছু গুছিয়ে বেড় হওয়ার কথা বলে দিলো ইমু। এদিকে ২৩ তারিখের দিনগত রাত্রে তুলি-কে ইমুর ব্যাগ গোছানো দেখে ইমুর বাবা সন্দেহ করলো। বুঝতে পারলো এমন কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। ইমুর বাবা তার ছোট ভাইকে (ইমুর ছোট চাচা) ইমুর সব ঘটনা খুলে বললো। এবং ইমুকে এসে বোঝাতে বললো। রাত শেষেই সকালবেলায় বাড়িতে ইমুর ছোট চাচা এসে উপস্থিত হলো। ইমু আর সামিয়া-কে বাসা থেকে বেড় হওয়ার কথা বলতে পারলো না। ছোট চাচা এসে ইমুকে ডেকে নিয়ে রুমে গিয়ে বসলো। ইমুরও আর বুঝতে বাকি রইলোনা তারা সবাই সবকিছু বুঝে ফেলেছে। ইমুর ছোটচাচা ইমুকে জিজ্ঞাস করলো---
-- বড়ভাই যা বললো সবকথা কি সত্যি?
-- কি বলেছে?
-- তুই নাকি সামিয়াকে, সামিয়া নাকি তোকে ভালবাসে?
-- হ্যা,
-- এসব কিছু ভুলে যা,
-- কেন? ভুলে যাবো কেন?
-- কেন ভুলে যাবি জানতে চাইছিস? শোন তাহলে, তুইতো এখন একজন স্টুডেন্ট, স্টুডেন্ট না?
-- হুম,
-- ধর তুই এখন সামিয়া-কে বিয়ে করলি। সেটা কোন ফ্যামিলিই মেনে নিলো না। তখন কি হবে?
.
ইমু মাথানত করে রইলো।
-- আচ্ছা, তুইতো গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করিসনি যে ওকে নিয়ে কোথাও চলে গিয়ে একটা চাকরিবাকরি করে খাওয়াবি। ঘরে চাল না থাকলে সে কষ্টটা কার গায়ে লাগবে? পেটে ভাত না পরলে সে ভালবাসা টিকবে তো?
.
ইমু কথাগুলো খুব মনোযোগ সহকারে শুনে যাচ্ছ।
-- শোন ইমু, ভালবাসলে মানুষের কি চাওয়া থাকে? সেই মানুষটি সুখে থাকুক, শান্তিতে থাকুক। না পাওয়ায় যে কষ্ট, তার চেয়ে অনেক বেশি কষ্ট যখন তার সখের একটা চাওয়া তুই পূরন করতে পারবিনা। আশেপাশের মানুষগুলো যখন দেখবি শপিং থেকে ভাল জামাকাপড় কিনে এনে তাদের প্রিয়জনদের দিচ্ছে, যখন দেখবি বাজার থেকে বড়বড় মাছ কিনে এনে সবাই মিলে কব্জি ডুবিয়ে খাচ্ছে, তখন এই না পাওয়ার কষ্টের চেয়ে অনেক বেশি কষ্ট পাবি। সামিয়ার যেখানে বিয়ে হচ্ছে সে অনেক বড়লোকের ছেলে। তুই এখন যেসব চাকরী করে মাইনে পাবি, সারা মাস চাকরী করে সেই মাইনে দিয়ে ঐ ছেলের একটা পারফিউম ও কিনতে পারবিনা। তাছাড়া সে দেখতে শুনতে ভালো, অর্থবিত্তের কোনকিছুর অভাব নেই। সেখানে ও সুখেই থাকবে, তুই কি দিয়ে রাখতে পারবি এতটা সুখে ওকে? শুধু ভালবাসা? ঠিকবেনা এসব, বাস্তব বড় কঠিন। হ্যা আমিও বুঝি প্রথম কয়েকদিন খুব কষ্ট হবে। কিন্তু দেখবি সময়ের সাথে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। সামিয়াও সবভুলে ভালো থাকবে। ওর জীবনটা কেন তুই শুধুশুধু কষ্টে জর্জরিত করে দিবি। কি দিতে পারবি ওকে? সারাবছর খেয়েদেয়ে ভালো একটা শাড়ি কিনে দেওয়ারও সামর্থ্য পাবিনা। অথচ সেখানে সামিয়ার কোনকিছুর অভাব থাকবেনা। তাহলে কেন তুই ওর সুখে থাকাটা কমনা করতে পারছিস না? সামিয়া সুখে থাকুক তুই কি সেইটা চাসনা? বোঝার মতো যথেষ্ট জ্ঞান হয়েছে তোর, আর কিছুই বলবো না। থাক তুই!
.
ইমুর চাচা ইমুর মস্তিষ্ক বিগড়ে দিলো। অনেকটা ইমোশনাল ব্লাকমেইল বলা হয় যাকে। যেটা মস্তিষ্কের সকল ভাবনে পালটে দিতে সক্ষম। এই সময়টুকুতে সামিয়া ইমুকে অগণিত বার ফোনকল ম্যাসেজিং করেই চলেছে। ছোট চাচা আবার পিছন ঘুরে বললো---
-- যদি সামিয়া-কে ভাল রাখতে চাস। এসব কিছু ভুলে যা, বাদ দিয়ে সব।
.
কথা শেষ করেই ছোট চাচা অন্য রুমের ভেতর চলে গেল। ইমু সেখানে থমকে বসে রইলো। ছোট চাচার প্রতিটি কথার লাইন ইমুর মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। তার কথাগুলোও ধ্রুবসত্য! ইমু ঠিক তখন নিজের যোগ্যতা নিয়ে নিজের ভেতর প্রশ্ন তুললো। কি করবো এখন? কোথায় যাবো? থাকবো কোথায়? খাবো কি? খাবারই বা আসবে কোথায় থেকে? চাকরী করলেই বা কত টাকা মাইনে পাবো এখন? সব ভাবনার পর, সবশেষে মেনে নিলো চাচার কথাই। সামিয়ার ফোন রিসিভ করলো ইমু---
-- হ্যালো,
-- হ্যালো কোথায় আছো তুমি?
-- বাসায়,
-- বেড় হবে কখন?
-- জানিনা,
-- জানিনা মানে!
-- আমরা কোথাও যাচ্ছিনা!
-- তাহলে?
-- আমি পারবো না...
.
কথাটা শুনে সামিয়ার মাথায় আকাশ ভেঙে পরলো। বিশ্বাসটুকু হঠাৎ করেই চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল। আশার প্রদীপটি নিভে গেল এক ধমকা কথার হাওয়ায়। সামিয়া কান্নায় ভেঙে পরলো। ইমুকে আহত স্বরে জিজ্ঞাস করলো---
-- এটাই কি তোমার শেষ কথা?
.
ইমুও বুকের ভেত চিনচিন ব্যথার কষাঘাত নিয়ে বলে দিলো---
-- হ্যা!
.
সামিয়া ফোনটা কেটে দিলো। ইমুও আর দেরি করলো না, ড্রয়ার থেকে অর্ধপাতা ঘুমের বরি খেয়ে ফেললো। তখন থেকে প্রায় টানা ১৬ ঘন্টা পর ইমুর ঘুম ভাঙ্গলো। ভাঙ্গিস শরীরের পেষার তখন ঠিক ছিলো। বিজ্ঞান বলে লো-পেষারের মানুষ বেশি ঘুমের বরি খেলে আর জেগে উঠেনা, চিরনিদ্রায় তারা চলে যায়! পেষার-লো থাকলেই হয়তো এই ঘুমিই ইমুর শেষ ঘুম হতো। ডাক্তার এসেছিলো ইমুকে দেখে বলে গিয়েছে ভয়ের কোন কারণ নেই, ঘুম ভাঙলেই সবঠিক হয়ে যাবে। ইমুর ঘুম ভাঙ্গার পর অনুভব করলো মাথাটা অনেক ভারি লাগছে। তাই ঘুম ভাঙার পরপরি গোসল করার জন্যে গোসলখানায় চলে গেল। গোসল সেরে ইমু রুমে ডুকতেই দেখলো ইমুর মামা (সামিয়ার বাবা) এসেছে। ঘরে ডুকে ইমু সালাম দিতেই বললো---
-- কিরে তোর নাকি কি হয়েছে?
-- না মামা কিছুই হয়নি,
-- তোর মা বললো তুই অসুস্থ, তাই আমি নিজেই তোকে দেখার জন্যে চলে এলাম।
-- এমনিতেই শরীরটা তেমন ভালো ছিলোনা মামা,
-- এখন কেমন লাগছে?
.
ইমু বুকের মাঝে কষ্ট পুষে মুখে হাসি ফুটিয়ে বললো---
-- ভালো মামা,
-- তাহলে চল, এসেছি যখন সবাইকে নিয়েই যাই,
-- উনাদের সবাইকে নিয়ে যান, আমি যাবনা মামা।
-- তুই যাবিনা বলেই তোর মা-বাবা, তুলি কেউ যাবেনা বলছে। আর আমার মেয়ের বিয়েতে তুই থাকবিনা সেটা কি করে হয় বল? চল, আর কথা বাড়াস না। অনেক কাজ আছে আমার বুঝলি। তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নে।
.
ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও মামার দিকে তাকিয়ে ইমুকেও সাবার সাথে যেতে বাধ্য হতে হলো সামিয়ার বিয়েতে। যার কারণেই আজ ইমু এখানে উপস্থিত। তুলি ইমুকে নিয়ে খাবার খেতে গেল। বোনের অনুরোধে একমুঠো খাবার মুখে দিয়েই ইমু অন্যে রুমে চলে গেল। তুলিকে বলে আসলো---
-- খেয়ে ঐ রুমে চলে আসিস, আমি ঐখানে আছি।
.
ইমু রুমের ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখলো সামিয়া জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। যদিও এইসময় এই রুমে সামিয়ার থাকার কথা নয়। সামিয়া-কে দেখে ইমু সাথেসাথে বেড়িয়ে আসার জন্যে পিছু হাটলো। সামিয়া খেয়াল করলো রুমের ভেতরে কেউ এসেছে। ঘুরে তাকিয়ে দেখলো ইমুকে। সাথেসাথে সামিয়া বললো---
-- দাঁড়াও,
.
ইমু দাঁড়িয়ে পরলো। সামিয়া ইমুকে জিজ্ঞেস করলো---
-- এখানে এসেছ কেন?
-- এমনিতেই এসেছিলাম,
-- এই বাড়িতে কেন এসেছো?
.
ইমু কোন প্রতিউত্তর দিলোনা। সামিয়া বললো---
-- আমি চলে যাবও তাই দেখতে এসেছো?
-- সেই ভাগ্যটাই বা কজনের হয় বলো?
-- অন্যের ভাগ্য নিয়ে খেলা করে নিজের ভাগ্যের গুণকীর্তন গাইছো?
-- হা হা হা আমার আবার ভাগ্য! জানো সামিয়া বড্ড ইচ্ছে ছিলো তোমায় লাল শাড়িতে দেখবো। হাত ভর্তি চুড়ি থাকবে, কপলে টিকলি থাকবে। আর একটা লাল টিপ থাকবে। কার্ণে মাঝে ঝুলানো ঝুমকালতার মতো দুল থাকবে। ঘোমটা টেনে বসে থাকবে তুমি। কিন্তু দেখ নিয়তির কি নির্মম পরিহাস। তোমাকে কাল ঠিক এমন করেই সবাই সাজাবে কিন্তু সেটা আমার জন্যে নয়, অন্য কারো জন্য!
.
দুজনের চোখেরজলের অশ্রুধার বয়েই চলেছে। একজনের চোখেরজলের মাঝে তাকিয়ে, নিজ কান্না প্রতিচ্ছবি দেখাটা বড্ড কঠিন। একপোয়া তরল দুধে এক লিটার পানি দিয়ে জ্বাল করলে, সে দুধের কোন স্বাদ থাকেনা। হয়তো সাদা রঙটা থেকে যায় ঠিকি। কিন্তু শত জ্বাল দেওয়ার পরেও সেই একপোয়া দুধের স্বাদ আর ফেরত আসেনা। তেমনি মানুষের জীবনটাও! ছোট জীবনে যখন অনেক কষ্ট জমে যায়, তখন আর সেই জীবনের আনন্দ থাকেনা। জীবনটা ঠিকি থেকে যায়, তবে সেই জীবনের স্বাদটাও হারিয়ে যায়। সামিয়া কাঁদো কণ্ঠে ইমুর কাছে জানতে চাইলো---
-- কেন এমনটা করলে আমার সাথে?
-- কোনো একদিন ঠিক এই প্রশ্নের উত্তরটা পেয়ে যাবে!
-- শেষ একটা কথা রাখবে আমার?
-- তোমার কোনো কথাই তো আমি রাখতে পারলাম না! তবুও বলো চেষ্টা করে দেখবো।
-- এই বাড়ি থেকে আজ রাতেই তুমি চলে যাবে, আমি তোমার মুখ আর দর্শন করতে চাইনা।
.
ইমু নিজের চোখেরজল মুছে সামিয়া-কে বললো---
-- ঠিকাছে,
.
সামিয়া-কে কথা দিয়ে রুম থেকে বেড়িয়ে এলো ইমু। কাউকে কিছু না জানিয়ে সেই নিশিথেই মামা বাড়ি ছেড়ে চলে এলো। তারপর থেকে ইমুর আর কোনদিন যাওয়া হয়ে উঠেনি সেই মামার বাড়ি। দিনের পরে দিন গেল, মাসের পরে মাস, বছরের পর বছর ঠিকি চলে গেল। আর যাওয়া হলোনা সেই মামার বাড়ি।
.
জানিনা কার জীবনের গল্পের সাথে সুর মেলালাম। কাকে কষ্ট দিলাম, কাকে বা দিলাম সুখ। হৃদয়ের উপরে যে দাগ পরে গেছে সেই বাল্যকালে। যে গল্পে ভালবাসা ছিলো, সুখ ছিলো, আশা- স্বপ্ন- স্বাধীনতা ছিলো। সেই গল্প আজ নিমেষেই অসহায় হয় গেছে অর্থের কাছে। জীবনের এই ব্যকরণে সন্ধি যে পাতায় পেলাম, সেই পাতাটায়ি বিচ্ছেদ পেলাম। ইমুর মতো না জানি কত ইমুর এমন বিচ্ছেদের গল্প রয়েছে। না জানি সেই ইমু গুলো আজ কতদিন যাবত মামার বাড়ি যায়না! না জানি সেই ইমুরদের চোখেও কি আলোকসজ্জায় সাজানো বিয়ের গেইট'টা আজও কি টলমল চোখে ভেসে উঠে।
.
.
লেখকঃ ডাকনাম ইমু-ইমরান
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now