বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
রিটার্ন অব ড্রাকুলা
কাহিনী : ফ্রেডা ওয়ারিংটন
অনুবাদক : ইসমাইল আরমান
-------------------------------------
পর্ব ২৭ঃ
( জোনাথনের ডায়েরী)
ডাঃ সিউয়ার্ড তাঁদের গোরস্থানের অভিজ্ঞতা বলতে
লাগলেন :
" গোরস্থানে পৌঁছেই তল্লাশি শুরু করেছিলাম আমরা -
ইলিনার ডায়েরীর বর্ণনা মোতাবেক ড্রাকুলার
সমাধিকক্ষটার খোঁজে। জায়গাটা স্রেফ একটা
গোলকধাঁধা, আপনি নিজেও হয়তো টের পেয়েছেন। প্রচুর
সময় নষ্ট হয়েছে আমাদের। শেষ পর্যন্ত গোরস্থানের
একপ্রান্তে....গাছগাছালির ছায়ায় সমাধিকক্ষটা
আবিষ্কার করি আমরা। ওটার ভেতরে ঢোকামাত্র দেখা
হয়ে যায় কাউন্টের সঙ্গে। কবর থেকে নিজের ছাই-মাটি
ওঠাচ্ছিল সে - ভরছিল বড় একটা চামড়ার ব্যাগে।
আমাদেরকে দেখতে পেয়েই চমকে ওঠে পিশাচটা,
পরক্ষণেই ক্ষেপে ওঠে।"
" ছাই মাটি তুলছিল কেন?" বাধা দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম
আমি।
" এখানকার আস্তানা গুটিয়ে নিচ্ছিল ও", বললেন ভ্যান
হেলসিং, " এখানে ওর কাজ শেষ, তাই রওনা হচ্ছিল নতুন
আস্তানার খোঁজে"।
" ঠেকাতে পারেননি?"
" নাহ! দেরী করে ফেলেছিলাম আমরা। যখন ওখানে
পৌঁছলাম, তখন ও বেরিয়ে পড়ার জন্য প্রায় তৈরি।
আমাদেরকে দেখে খনখনে গলায় সেটাই জানাল। আমরা
নাকি বড্ড দেরী করে ফেলেছি, বিদায় নেবার সব
আয়োজন শেষ হয়ে গেছে ওর"।
" তারপর? " আমি জিজ্ঞেস করলাম।
" তারপর আর কি, ওর পথ আগলে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমরা",
আগের কথার খেই ধরে বললেন ডাঃ সিউয়ার্ড, " আমাদের
দিকে ছাই মাটি ভর্তি ব্যাগটা ছুঁড়ে দিল, সেটা উড়ে
গিয়ে পড়ল সমাধিকক্ষের বাইরে। এরপর আমাদের দিকে
ধেয়ে এল শয়তানটা। প্রফেসরকে আড়াল করে দাঁড়ালাম
আমি, বরফশীতল হাতের মুঠোয় আমার গলা চেপে ধরল ও।
এক ঝটকায় ছুঁড়ে ফেলল একপাশে। তারপর ঝাঁপিয়ে পড়ল
প্রফেসরের ওপর। শুরু হলো ধস্তাধস্তি। হাতের মুঠোয় ক্রুশ
নিয়ে পেছন থেকে ড্রাকুলাকে আক্রমণ করল আর্থার।
সঙ্গে সঙ্গে প্রফেসরকে এক ধাক্কায় সরিয়ে দিয়ে
আর্থারের হাত চেপে ধরল শয়তানটা, যাতে ক্রুশটা তার
গায়ে না লাগাতে পারে ও। আর্থারের সঙ্গে তখন যুদ্ধ
করছে ড্রাকুলা, ক্রুশটা আগুনের মতো তেতে উঠতে
দেখলাম; তবু ওটা হাত থেকে ফেলে দিল না আর্থার।
খানিক পরে আমি আর প্রফেসরও উঠে দাঁড়িয়ে
নিজেদের ক্রুশ বের করলাম, এগিয়ে গেলাম ড্রাকুলার
দিকে। তিন তিনটে ক্রুশের সামনে দুর্বল হয়ে পড়ল
পিশাচটা। আর্থারকে ছেড়ে দিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে বেরিয়ে
গেল সমাধিকক্ষ ছেড়ে। যাবার সময় ছোঁ মেরে ব্যাগটা
তুলে নিয়ে যেতে ভুলল না। পিছু পিছু ধাওয়া করলাম
আমরা কিন্তু খানিক পরেই হারিয়ে ফেললাম ওকে।
আপনার সঙ্গে দেখা হবার আগ পর্যন্ত গোরস্থানের
ভেতরেই খুঁজছিলাম ওকে, জানতাম না শয়তানটা এ
বাড়িতে আসবে। বাকিটা তো আপনি জানেনই"।
" ও কি আপনাদের খুন করতে চাইছিল?" জিজ্ঞেস করলাম
আমি।
" খুন করতে তো চেয়েছে বটেই", বললেন হেলসিং, " তবে
এত তাড়াতাড়ি না। খতম করবার আগে আমাদের
যতরকমভাবে সম্ভব শাস্তি দিতে চায় ও"।
এতক্ষণ একটা কথাও বলেননি আর্থার, এবার গোঙানির
মতো একটা আওয়াজ করে উঠলেন।
" আরেকটা ভ্যাম্পায়ারের কথা বলছিলেন না আপনি?"
আমায় লক্ষ্য করে বললেন ডাঃ সিউয়ার্ড, " সেটা আবার
কে?"
গোরস্থানে দেখা ছায়ামূর্তিটার কথা ওঁদের খুলে
বললাম। শেষে যোগ করলাম, " ব্যাপারটা কল্পনা কি না
জানি না তবে লোকটাকে একেবারে জান্তব মনে হলো;
সেইসঙ্গে কেমন পরিচিতও। চেহারাটা মনে পড়লে এখনও
কাঁপুনি দিচ্ছে শরীরে"।
কিছুক্ষণ নীরবতায় কাটল। ব্রান্ডি ঢেলে পরিবেশন
করলাম সবাইকে। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলাম। এরপরই
নড়ে উঠলেন আর্থার গোড্যালমিং। কোলের ওপর রাখা
হাতের মুঠো বার বার খুলছেন আর বন্ধ করছেন। হাতের
তালুতে গরম ক্রুশের ছ্যাঁকাটা স্পষ্ট দেখতে পেলাম।
হঠাৎ তিনি মুখ তুলে বলে উঠলেন, " এভাবে আর চলতে
পারে না। এভাবে আর চলতে পারছি না আমি। মাফ
করবেন বন্ধুরা....শপথ ভাঙতে ভাল লাগছে না
আমার.....ভাল লাগছে না আপনাদের এইসময় ছেড়ে চলে
যেতে....কিন্তু এ ছাড়া আর কোনও উপায়ও দেখছি না"।
ভ্রু কোঁচকালেন ভ্যান হেলসিং। " কি বলতে চাও?"
আর্থার বলতে লাগল, " ড্রাকুলার সঙ্গে আর লড়তে পারব
না আমি, প্রফেসর। এই লড়াইয়ের জন্য এক দফা চরম মূল্য
চুকিয়েছি আমি - নিজ হাতে কাঠের গজাল ঢুকিয়েছি
আমার প্রিয়তমা লুসি'র বুকে। অমন কাজ আবার করা সম্ভব
নয় আমার পক্ষে। অথচ আপনাদের সঙ্গে যদি থাকি,
আবার তাই-ই ঘটবে.....আর এবার তার শিকার হবে আমার
স্ত্রী আর ছেলে। আজ জোনাথনের স্ত্রী আর ছেলে
ড্রাকুলার খপ্পরে পড়ল। কাল হয়ত আমার স্ত্রী আর ছেলে
তার শিকার হবে; না, প্রফেসর, ওদেরকে আমি এত বড়
বিপদের মাঝে টানতে পারব না। অনুমতি দিন, ওদের
কাছে ফিরে যাই আমি। এমন কোথাও নিয়ে যাব,
যেখানে ড্রাকুলা পৌঁছতে পারবে না। অনেক...অনেক
দূরে - দেশের বাইরে"।
গলা ভেঙে গেল আর্থারের। বুকের ভেতরটা কেমন করে
উঠল আমার।
" আমাকে ক্ষমা করুন, জোনাথন", এবার আমার দিকে
ফিরে বলল আর্থার, " আপনার এই বিপদের মূহুর্তে মুখ
ফিরিয়ে নিতে চাইছি। কিন্তু আমার স্ত্রী -পুত্রকে রক্ষা
করাও তো আমার দায়িত্ব "।
" ক্ষমা চাইবার কোনও দরকার নেই", আন্তরিক গলায়
বললাম আমি, " আপনার দিকটা বুঝতে পারছি আমি।
যেতে চাইলে নিশ্চিন্তে চলে যান। আমি কিছু মনে করব
না"।
বিমর্ষ হয়ে পড়লেন ভ্যান হেলসিং আর ডাঃ সিউয়ার্ড।
কিন্তু ওঁরাও বুঝতে পারছেন, ইচ্ছের বিরুদ্ধে আর্থারকে
আটকে রেখে কোনও লাভ হবে না। অগত্যা তাঁর সঙ্গে
হাত মেলালেন দুজনে। প্রফেসর বললেন, " বেশ, তা হলে
তুমি যাও। ঈশ্বর তোমার সহায় হোন"।
কামরা থেকে নিজের লাগেজ নিয়ে খুব শীঘ্রি আমার
বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন আর্থার গোড্যালমিং।
তাঁর বিদায়ের পর আরও বিষন্ন হয়ে পড়লাম আমরা। আমার
মনে হল, আমাদের দুর্ধর্ষ দলটা বুঝি এবার ধ্বংস হতে
বসেছে। ব্যাপারটা ঘটছে তখনই.....যখন ড্রাকুলা নামের
শত্রুটি নতুন করে ফিরে এসেছে এই দুনিয়ায়.....ফির
ে এসেছে আগের চেয়েও ভয়ানক রূপে। এর চেয়ে
দুর্ভাগ্যজনক আর কি হতে পারে?
" চলুন শুয়ে পড়ি", একসময় বললেন ডাঃ সিউয়ার্ড, " কাল
না হয় আবার আলোচনায় বসা যাবে"।
ঘুম আসবে না বলে প্রতিবাদ করলাম আমি, চাইলাম তখনি
মীনার খোঁজে বেরোতে। কিন্তু প্রফেসর বললেন, " মাথা
ঠাণ্ডা রাখো, জোনাথন। সিউয়ার্ড ঠিকই বলেছে। আজ
রাতে আর কিছু করার নেই আমাদের। মন আর দেহকে কষ্ট
দিয়ে মীনাকে কোনও সাহায্য করতে পারব না আমরা।
তারচেয়ে বিশ্রাম নিয়ে শক্তি সঞ্চয় করা দরকার, যাতে
আগামীকাল নতুন উদ্যমে কাজে লাগতে পারি।
১২ নভেম্বর, সন্ধ্যা।
ভ্যান হেলসিংয়ের কথায় বিশ্রাম নিতে গেলেও আসলে
বিশ্রাম হয়নি আমার। রাতের যতটুকু বাকি ছিল, বিছানায়
কেবলই গড়াগড়ি দিয়েছি। দু একবার তন্দ্রায় মুদে এসেছে
চোখ, সঙ্গে সঙ্গে দেখেছি বিশ্রী সব দুঃস্বপ্ন। জেগে
উঠেছি ধড়মড় করে। তাই ভোরের আলো ফুটবার সঙ্গে
সঙ্গে ' ধুত্তোর ' বলে উঠে পড়েছিলাম। ভ্যান হেলসিং
আর ডাঃ সিউয়ার্ডের অবস্থাও যে কম বেশী আমারই
মতো, সেটা টের পেলাম কামরা থেকে বের হবার পরে।
দুজনেই বাগানে পায়চারী করছিলেন।
খামোখা সময় নষ্ট করার মানে হয় না, তাই সবাই যখন
উঠেই পড়েছি, দ্রুত ব্রেকফাস্ট সেরে নিলাম আমরা।
তারপর বসলাম ইলিনার ডায়েরীটা নিয়ে। ওটা পড়তে
পড়তে আবারও তিক্ততায় ছেয়ে গেল মন। কত সহজে
বোকা বনেছি আমরা ডাইনীটার হাতে, ভেবে কপাল
চাপড়াতে লাগলাম।
" অযথা নিজেকে দোষারোপ কোরো না", স্বান্তনা
দিলেন ভ্যান হেলসিং, " ইলিনা খুব চালাক মেয়ে, ওর
স্বরূপ বোঝার উপায় ছিল না তোমাদের। সুকৌশলে ধোঁকা
দিয়েছে সবাইকে। ড্রাকুলার নির্দেশে এখানে আশ্রয়
নিয়ে এসেছিল সে, কিন্তু তার সঙ্গে কতটা নিজের ইচ্ছা
কাজ করছিল, কে জানে। ড্রাকুলা ওকে জাদু করেছে
সন্দেহ নেই; কিন্তু ও নিজেও সম্ভবত অন্ধকারের পূজারী।
"
মীনা আর ক্যুইন্সির অপহরণের ব্যাপারটা পুলিশে জানাব
কিনা, এ নিয়ে আলোচনা করলাম কিছুক্ষণ, শেষে স্থির
করলাম পুলিশকে সবকিছু জানানো ঠিক নয়, ওরা আমাদের
কথার একবর্ণ'ও বিশ্বাস করবে না। আবার লুকোছাপা
করতে গেলে আমরাই বিপদে পড়তে পারি। তাই ঠিক
করলাম, যা করার নিজেরাই করব।
" কিভাবে এগোতে চান?" প্রফেসরকে জিজ্ঞেস করলাম
অধৈর্য গলায়।
" বুঝতে পারছি, এখুনি ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইছ খোঁজাখুঁজির
কাজে", মৃদু হেসে বললেন হেলসিং, " কিন্তু ওতে
খামোখা শক্তিক্ষয় ছাড়া আর কিছুই হবে না। ধীরে
এগোতে হবে আমাদেরকে। ড্রাকুলার খোঁজ পেতে হলে
প্রথমেই বিশ্লেষণ করতে হবে ওর সম্পর্কে যা যা জানি,
সেসব তথ্য"। ভ্যান হেলসিংয়ের কথার টোনে মনে হলো
পুরনো রূপে ফিরে গেছেন তিনি। হেলসিং বলতে
লাগলেন, " বেঁচে থাকার জন্য ভ্যাম্পায়ারের চাই রক্ত।
মৃত্যু নেই ওদের, কিন্তু রক্ত খেতে না পেলে বৃদ্ধ ও দুর্বল
হয়ে পড়ে ওরা। রক্তই ওদের প্রাণশক্তি জোগায়, ফিরিয়ে
দেয় হারানো যৌবন - কাউন্ট ড্রাকুলার বেলাতেও
এমনটা দেখছি আমরা। লুসির রক্ত পান করে জোয়ান হয়ে
উঠেছিল ও। তবে এ-ও সত্য, শুধু উদরপূর্তির জন্য মানুষ
শিকার করে না সে। মানুষকে ঈর্ষা করে ড্রাকুলা -
মানুষের মুক্ত, বাঁধনহীন জীবনের জন্য.....ঈশ্বরের প্রতি
মানুষের অনুরাগের জন্য। ও চায়, আমরা সবাই ঈশ্বরের
বদলে ওর দাসত্ব মেনে নিই, ওকেই সর্বশক্তিমান স্বীকৃতি
দিই। ক্ষমতা এবং শক্তির প্রতি ওর এত লোভ যে ও
বারবার মৃত্যুকে ফাঁকি দিয়ে চলেছে। ওর বুকে কাঠের
গজাল ঢুকিয়ে এফোঁড় ওফোঁড় করার পরেও ওকে নিকেশ
করতে পারিনি আমরা। এখানেই আমার সবচেয়ে বড়
খটকা। সমস্যাটা কোথায়? লুসি আর ওর তিন সহচরীকে
যদি চিরতরে ধ্বংস করতে পারি, তাহলে ওকে কেন
পারলাম না? তোমাদের কারোর কোনও আইডিয়া আছে?"
একটু ভেবে নিয়ে এবার ডাঃ সিউয়ার্ড বললেন, "
ড্রাকুলা বলছিল, ওকে ধ্বংস করার সময় নিজেদের নিয়ম
ভেঙেছি আমরা। লুসি আর ওর তিন সহচরীর সঙ্গে
ড্রাকুলাকে ধ্বংস করার পদ্ধতির মধ্যে কি কোনও
পার্থক্য ছিল?"
" উঁহু ", মাথা নাড়লাম আমি, " মুখে রসুনের কোয়া পুরে ওর
মাথা কেটে ফেলা হয়েছিল আর তারপর হৃদপিন্ড বরাবর
ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল কাঠের গজাল"।
" কিন্তু ছুরিটা মন্ত্রপূত ছিল না", বললেন প্রফেসর, " মরিস
ওর ব্যক্তিগত ছুরি ব্যবহার করেছিল কাউন্টের মাথা
কাটার জন্য। মন্ত্র পড়ে ওটায় ফুঁ দিইনি আমি......তাড়াহু
ড়োর কারণে সে সুযোগও পাইনি। তবে মনে হচ্ছে,
ওখানেই ভুল করেছিলাম আমরা। আরও একটা ব্যাপার
ভেবে দেখার মতো। মীনাকে নিজের রক্ত পান
করিয়েছিল ড্রাকুলা - তারমানে ও শেষ হয়ে গেলেও
মীনার শরীরে রয়ে গিয়েছিল ওর দেহের জীবন্ত একটা
অংশ। ইলিনার ডায়েরীতে কি লেখা আছে ভেবে
দ্যাখো। মীনার রক্ত কৌশলে সংগ্রহ করে সে ড্রাকুলার
ছাই ভস্মের মধ্যে ঢেলে এসেছিল আর এভাবেই সে
কাউন্টকে দৈহিক রূপে ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করেছে।
তারমানে এই রক্তই ওর পুনর্জীবনের চাবিকাঠি "।
বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কথা বলছেন প্রফেসর
হেলসিং কিন্তু কথাগুলো শুনে অস্বস্তি বোধ করলাম।
আমার প্রাণপ্রিয় স্ত্রী মীনা- তার রক্ত থেকে জীবন
পেয়েছে এক পিশাচ - এটা আমি কিভাবে মেনে নিই?
আমার মনের অবস্থা টের পেয়ে আমার কাঁধে হাত
রাখলেন ডাঃ সিউয়ার্ড।
......" কিন্তু আমার ধারণা, ওটুকুই যথেষ্ট নয় ড্রাকুলার
জন্য", আপনমনে বলে চললেন হেলসিং, " প্রথমবার যখন
আনডেড.....মানে জীবন্মৃতে পরিণত হয় সে, নিঃসন্দেহে
বুদ্ধি বিবেচনার হানি ঘটেছিল ওর। এক অর্থে শিশুতে
পরিণত হয়েছিল ও.....ভ্যাম্পায়ার শিশু, শক্তি ও বুদ্ধির
দিক থেকে দুর্বল। ধীরেধীরে নিজের অভিজ্ঞতা আর
পৈশাচিক ক্ষমতার চর্চার মাধ্যমে পরিপক্বতা এসেছিল
ওর। দ্বিতীয়বার পুনরাবির্ভাবের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা
হবার কথা। তারমানে এখন ও দুর্বল - আমাদের চেয়ে
শক্তিশালী কিন্তু ভ্যাম্পায়ার হিসেবে দুর্বল। পুরনো
শক্তি ফিরে পাবার জন্য চাই নিজের পুরনো রক্ত। আর
সেজন্যই মীনাকে নিয়ে গেছে ও"।
মুখ থেকে রক্ত সরে গেল আমার। মীনার শরীর থেকে যদি
কাউন্ট রক্তশোষণ করে, তাহলে তো মীনাও ভ্যাম্পায়ার
হয়ে যাবে....কিংবা নিশ্চিত মৃত্যু!
আশ্বাসের দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন প্রফেসর।
বললেন, " সাহস হারিয়ো না জোনাথন। এসবের মাঝে
সুসংবাদও আছে"।
" কি সুসংবাদ? "
হেলসিং বললেন, " যখন ড্রাকুলা আত্মা হিসেবে ছিল,
তখন ও অন্যের শরীর দখল করতে পারত....হানা দিতে পারত
আমাদের স্বপ্নে....ইচ্ছের বিরুদ্ধে করিয়ে নিতে পারত
যে কোনও কাজ। কিন্তু ভেবে দ্যাখো, যখন থেকে ও
দেহধারণ করল, এখন আর তার সে ক্ষমতা নেই। নতুন
শরীরের ভেতরই আটকা পড়েছে তার আত্মা। শক্তি
বেড়েছে ওর কিন্তু কমে গেছে স্বাধীনতা। দুটোই
একসঙ্গে পাওয়া সম্ভব নয় ওর পক্ষে। আত্মা হিসেবে
আমাদের অনেক বেশী ক্ষতি করতে পারত ড্রাকুলা,
পাগল বানাতে পারত সবাইকে। কিন্তু শরীর ধারণ করার
মোহে সুযোগটা হাতছাড়া করেছে সে। আত্মাকে
ঠেকাতে পারতাম না আমরা, কিন্তু দেহধারী
ভ্যাম্পায়ারকে মোকাবিলা করা যাবে"।
" তার জন্য ওকে খুঁজে পেতে হবে", বললাম আমি।
" শয়তানটা এবার নির্ঘাত নতুন কোনও কৌশল খাটাবে",
বলে উঠলেন ডাঃ সিউয়ার্ড, " গতবার ও পঞ্চাশটা মাটি
ভর্তি বাক্স নিয়ে এসেছিল ট্রানসিলভ্যানিয়া থেকে।
অথচ এবার এনেছে স্রেফ একটা পোঁটলায় করে। অতীতের
ভুলত্রুটি থেকে শিক্ষা নিয়েছে "।
" হ্যাঁ, সঙ্গে বোঝা রাখছে না", একমত হলেন প্রফেসর
হেলসিং, " তাতে চলাফেরায় অসুবিধা আছে"।
" নিজের সঙ্গে নিজের কবরের মাটি নিয়ে ঘোরে কেন?"
জিজ্ঞেস করলাম আমি, " তার দরকারটা কি?"
" ভ্যাম্পায়ারের জন্য তার কবরের মাটি আমাদের খাদ্য
পানীয়ের মতোই জরুরী ", বলতে লাগলেন হেলসিং, " ওই
মাটির স্পর্শ না পেলে বিশ্রাম পুরো হয় না তাদের।
তবে....কাউন্ট ড্রাকুলা সম্ভবত এই দুর্বলতা কাটিয়ে
উঠতে শুরু করেছে। অল্প মাটি নিয়ে ঘোরাফেরা থেকে
এটাই প্রমাণিত হয়। দুশ্চিন্তার আরেকটা বিষয় হলো - ওর
ধ্বংস নেই। তারমানে দিনের আলোতেও বেরোতে
পারবে ও"।
" সূর্যের আলো ওর গায়ে পড়লে ওর কিছুই হবে না, বলতে
চাইছেন? "
" ঠিক তা না। কষ্ট হবে ওর, হয়তো অসহ্য জ্বলুনি
হবে....কিন্তু ধ্বংস হবে বলে মনে হয় না। কবরের মাটির
স্পর্শ পেলে আবার দূর হয়ে যাবে ওর কষ্ট।"
" সঙ্গে ওই মাটি নিয়ে গেছে ও", বললাম আমি, "
তারমানে নতুন করে একটা আস্তানা তৈরি করতে যাচ্ছে।
ওখানেই সম্ভবত নিয়ে গেছে মীনা আর কুইন্সিকে।"
" আমরা সে জায়গা খুঁজে বের করব জোনাথন", দৃঢ়
প্রত্যয়ের সঙ্গে বললেন হেলসিং, " মীনা বা কুইন্সিকে
নিয়ে ভেবো না, এখুনি ওদের কোনও ক্ষতি করবে না
কাউন্ট। ওরা মরে গেলে আমাদের তো আর ভয় দেখাতে
পারবে না সে"।
তাঁর এই কথায় কিছুটা স্বস্তি পেলাম আমি।
ব্রেকফাস্টের পর হেলসিংকে অসুস্থ দেখাল। মাথার
আঘাতটা ভোগাতে শুরু করেছে তাঁকে। ক্ষতটা পরীক্ষা
করে ওষুধ দিলেন ডাঃ সিউয়ার্ড, তারপর তাঁকে পাঠিয়ে
দিলেন বিশ্রামে। অসুস্থ শরীরে খাটাখাটুনি করা উচিত
হবে না হেলসিংয়ের। সামনের দিনগুলোর জন্য তাঁর সুস্থ
থাকা একান্ত জরুরী।
প্রফেসরকে কামরায় পাঠিয়ে দিয়ে অনুসন্ধানের কাজে
বেরিয়ে পড়লাম আমি আর সিউয়ার্ড। আমি খোঁজখবর
নিয়েছি এক্সেটারে, সিউয়ার্ড গিয়েছিলেন আরেকটু
দূরে। খানিক আগে ফিরে এসেছি দুজনেই।
যেখান থেকে ঘোড়া আর ক্যারিজ ভাড়া করেছে কাউন্ট,
সে জায়গার খোঁজ পাওয়া গেছে।
১৩ নভেম্বর
অপ্রত্যাশিত মোড় নিয়েছে ঘটনাপ্রবাহ। এটাকে ভাল
বলব না খারাপ....ঠিক বুঝতে পারছি না। আপাতত যা
ঘটছে তা লিখে ফেলাই ভাল।
গত রাতে আবারও সেই অশুভ অনুভূতি হয়েছিল
আমার....মনে হচ্ছিল, যেন কেউ ঘুরে বেড়াচ্ছে আমাদের
আশেপাশে, নজর রাখছে আড়াল থেকে। এই দফায়
প্রফেসর হেলসিং আর ডাঃ সিউয়ার্ডও আমার অনুভূতির
ভাগীদার হলেন। যখনি এই অভিজ্ঞতা হলো, তখন
তিনজনেই বসেছিলাম ড্রয়িংরুমে, আলোচনা করছিলাম
আমাদের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে।
ব্যাপারটা যখন ঘটল, তখন মাঝরাত পেরিয়ে গেছে।
সারাদিনের ছোটাছুটি আর সন্ধ্যার পর থেকে অবিরাম
আলাপ আলোচনা করতে করতে আমরা যখন ক্লান্ত,
ঘুমোতে যাবার কথা ভাবছি, হঠাৎ আবার শুরু হলো সেই
অস্বস্তিবোধ। তারপর ধীরেধীরে বাড়তে লাগল সেই
অস্বস্তি।
ক্রমশ
অশুভ আত্মা
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now