বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

রিটার্ন অব ড্রাকুলা-১৭

"উপন্যাস" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X রিটার্ন অব ড্রাকুলা কাহিনী : ফ্রেডা ওয়ারিংটন অনুবাদক : ইসমাইল আরমান ------------------------------------- পর্ব ১৭ঃ ।। জোনাথন হারকারের ডায়েরী।। ১২ অক্টোবর।। স্টাডিরুমে বসে ডায়েরী লিখছি এখন আমি। সঙ্গী বলতে আমাদের একমাত্র পোষা সাদা বেড়ালটা। একেবারেই জ্বালায় না আমাদের পুষি। মাঝেমাঝে ওর সঙ্গ দারুণ উপভোগ করি আমি। ইলিনা আমাদের বাড়ি আসার পর থেকে এখন মাঝেমাঝে স্টাডিরুমেই সময় কাটাতে হয় আমায়; তখন সঙ্গী বলতে আমাদের একমাত্র এই পুষি। কি শান্ত চোখদুটো পুষি'র। আদুরে ভঙ্গিতে মাঝেমাঝে আমার পায়ে মাথা ঘষে। না, ইলিনা মেয়েটাকে এড়িয়ে চলছি না আমি। বরঞ্চ ও আসাতে খুশীই হয়েছি আমরা। কুইন্সি'র দায়িত্ব ভাগাভাগি করার মতো একজন সঙ্গী পেয়েছে মীনা। কিন্তু ইলিনা আসার পর থেকেই কেমন এক ধরনের বিমর্ষ ভাব ভর করেছে আমার মধ্যে। তাই এই দূরে দূরে থাকা। কেন এমনটা হচ্ছে, জানি না। অথচ ইলিনা আসার পর থেকে বেশ খুশীতেই আছে দুজনে....হাসাহাসি....কত গল্প দুজনায়। আমি চাই না, ওদের বন্ধুত্বে বাদ সাধুক আমার এই গাম্ভীর্য, বিষণ্ণতা। কেন এই বিমর্ষতা, আমি বুঝতে পারছি না। অনেক ভেবে দেখেছি, এর একটা কারণ হতে পারে, ইদানীং আমাদের ফার্মে একটা অফিসিয়ালি কারণে বেশ ঝামেলা চলছে। তাছাড়া, কুইন্সি'র অসুস্থতাকেও অস্বীকার করা যায় না। এসব কারণেই হয়তো....কিন্তু এগুলো তো নতুন কিছু নয় আমার জীবনে! তাহলে হঠাৎ কেন এত বিষণ্ণতা চেপে বসছে আমার ঘাড়ে? ট্রানসিলভ্যানিয়ার ভ্রমণটাই কি এর মূলে? আমার জীবনে সেই এক ভয়াবহ অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল, ড্রাকুলার ক্যাসলে প্রথম পা রাখার সাথে; তারপর কোনওমতে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে এসেছিলাম ঠিকই কিন্তু তারপরও বহুদিন আমি অসুখে ভুগেছি। শারীরিক ও মানসিক - দু'দিক থেকেই আমি ভুগেছিলাম। সুস্থ হয়ে ওঠার পরও আরও কত ভয়াবহ জিনিস প্রত্যক্ষ করেছি। মীনার বান্ধবী লুসি ওয়েস্টের্নার ভ্যাম্পায়ারের শিকার হওয়া এবং নিজেরও ভ্যাম্পায়ারে পরিণত হওয়া, ইংলন্ডে ড্রাকুলার আবির্ভাব এবং ত্রাস সৃষ্টি.... এবং শেষমেশ মীনা'র দিকেও হাত বাড়িয়েছিল সে। রক্তপান করেছিল আমার স্ত্রী -র। নিজেকে সেসময় বড়ই অসহায় মনে হয়েছিল। মরমে মরে গিয়েছিলাম আমি সেদিন সেই পিশাচের বিরুদ্ধে অক্ষমতায়। সময়ের ডানায় ভর করে ভয়াবহ সেসব দিন আজ শুধুই স্মৃতি। সেইসব ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পর কেটে গেছে সাত সাতটা বছর। কিন্তু আজও সেসব ঘটনা মনে পড়লে আমার আতঙ্ক জাগে। সমগ্র স্বত্তার ওপর চেপে বসে এক চরম বিষাদ। এখন আমার সেইরকম দশা'ই চলছে। মনের এই অবস্থা জীবনে সবকিছুর ওপর প্রভাব ফেলে। হাসি আনন্দ, দৈনন্দিন কাজকর্ম - কোনও কিছুই স্বাভাবিক চলতে পারে না। আজকাল আমি সবকিছুর মধ্যেই কিরকম একটা কালো ছায়া দেখতে পাই। ইলিনা চমৎকার একটি মেয়ে, দেখতে শুনতে ভাল, খারাপ কোনও স্বভাবই নেই ওর ভেতরে....কিন্তু তবু ওকে আজকাল আমার কেমন যেন লাগে। ব্যাপারটা ভাষায় ঠিকভাবে বোঝাতে পারব না আমি। ওর ভেতরে মাঝেমাঝে কিরকম একটা অশুভ কিছু ইঙ্গিত প্রায়ই দেখতে পাই। বিশেষ করে মীনা সামনে না থাকলে। আমার দিকে মাঝেমাঝেই ও কেমন বাঁকা দৃষ্টিতে তাকায়....ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে একটা দুর্বোধ্য হাসি....এসবের আমি কোনও মানে বুঝতে পারি না। এসব কি আমার অতি কল্পনা? আর এমনই আশ্চর্য, এই জিনিসগুলো একমাত্র আমি ছাড়া কেউ দেখতে পায় না। এইসব ব্যাপারগুলোই ভাবিয়ে তোলে আমাকে, সুখ শান্তির পথে বাধা সৃষ্টি করে, বিষন্ন করে তোলে। ইলিনার কথা যখন এসেই পড়ল, তখন ওর ব্যাপারে আরেকটু লেখা যাক। ইদানীং ওকে আমি খুব মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করছি। ওর পোশাকআশাক আমার চোখে বেশ বেমানান ঠেকে। রঙচঙে যুবতী একটা মেয়ে, অথচ ওর পোশাক বলতে শুধু গলা পর্যন্ত ঢাকা সাদা ব্লাউজ আর লম্বা কালো স্কার্ট। ঠিক যেন গভর্নেস। ওটা ছাড়া আর কোনও পোশাক কি নেই ওর? না থাকলে মীনার কাছ থেকে পোশাক ধার চেয়ে নিতে পারে। কিন্তু সেটা করছে না কেন? লজ্জায়? কিন্তু ওদের বন্ধুত্ব যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তাতে তো ওর মধ্যে কোনও দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকার কথা নয়। ইলিনাকে দেখি আর কি যেন হয় আমার মধ্যে। ওকে যত দেখি, তত একটা মুগ্ধতা কাজ করে আমার মধ্যে। আবার সেইসঙ্গে চরম বিতৃষ্ণা। কেন এমন পরস্পরবিরোধী আবেগের সঞ্চার হয় আমার মধ্যে? নাহ, এখন থেকে নিজেকে আরও নিয়ন্ত্রণ করা দরকার আমার। ১৪ অক্টোবর।। গত রাতে স্টাডি'তে বসে বসেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু ঘুমের মধ্যে একটা কেমন অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলাম। যেন চেয়ারে মূর্তির মতো আটকা পড়ে গেছি আমি; চেষ্টা করেও নড়তে পারছি না। হঠাৎ এইসময় ইলিনা উদয় হলো আমার কামরায়। ওর পরনে সাদা ফিনফিনে পোশাক, পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি ওর শরীরের প্রতিটি বাঁক। বাতাসে যেন ভাসতে লাগল ইলিনা....ভূতের মতো। বুক শেলফের সামনে দিয়ে যখন ভাসতে ভাসতে গেল, লক্ষ্য করলাম ওর শরীরটা জীবিত মানুষের মতো নিরেট নয়, ওর শরীর ভেদ করেও পড়তে পারা যাচ্ছে শেলফে সাজিয়ে রাখা বইগুলোর নাম। ম্যান্টেলপিসের সামনে দিয়ে ও যখন গেল, ওখানে ঝুলিয়ে রাখা আয়নায় কোনও প্রতিবিম্ব পড়ল না। ধীরেধীরে আমার চারপাশে চক্কোর দিতে লাগল ও। ওর মুখে ফুটে উঠল মোহনীয় এক হাসি, চোখ জ্বলজ্বল করতে লাগল। যেন সম্মোহন করছে আমায়। " এখনও যুবক তুমি, জোনাথন", মাদকতা মেশানো গলায় বলল সে, " এখনও শক্তিশালী। তুমি এখনও সন্তুষ্ট করতে পারবে আমাদের সবাইকে"। আমার গায়ের ওপর ঝুঁকে এল ইলিনা, চামড়ায় পেলাম ওর গরম।নিশ্বাসের হলকা। ভয় পেলাম, সেইসঙ্গে বুক ঢিবঢিব করে উঠল আমার এক অজানা উত্তেজনায়। এই অনুভূতির সাথে আমি পরিচিত - ড্রাকুলা ক্যাসলে ড্রাকুলার সহচরী ওই তিন ডাইনী যখন আমার কাছে এসেছিল, ঠিক এমনটাই লেগেছিল আমার। মনের গহীনে জেগে উঠল তীব্র প্রতিবাদ, চাইলাম ইলিনাকে ঠেলে সরিয়ে দিতে, কিন্তু পারলাম না। ধীরেধীরে ওর ঠোঁট স্পর্শ করল আমার ঘাড়........ আর তখুনি ধড়মড় করে জেগে উঠলাম আমি। হতভম্ব হয়ে চারদিকে নজর ঘোরাতেই দেখি, স্টাডি'তে আগের মত বসে আছি আমি....একাকী, নিঃসঙ্গ। কেউ নেই আশেপাশে। আত্মগ্লানিতে হেঁট হয়ে এল মাথা। কি দেখলাম এসব? অসহায়, আশ্রিতা একটা মেয়ে.....উপায়ান্তর না দেখে ঠাঁই নিয়েছে আমার বাড়িতে.....আর তাকেই কিনা ড্রাকুলা ক্যাসলের ওই পিশাচিনী'গুলোর রূপে কল্পনা করলাম? নিশ্চয়ই আমার অবচেতন মনে এ ধরনের কোনও চিন্তা খেলা করে, নইলে এমন দৃশ্য দেখতে যাব কেন? খারাপ লাগছে খুব। ইলিনা আমাদের পরিবারের একজন সদস্যের মতো হয়ে গেছে এই ক'দিনেই; তাকে নিয়ে খারাপ চিন্তা মানায় না আমাকে। - হোক সেটা সচেতন, বা অবচেতনভাবে। এই তো....ডায়েরী লিখতে লিখতেও শুনতে পাচ্ছি ওর আর মীনার টুকরো টুকরো হাসি, কথাবার্তা.... ঘুমোতে যাবার আগে দুজনে চুল আঁচড়াতে বসেছে.... আমি চাই না ওদের মাঝে আমার কারণে কোনও তিক্ততা সৃষ্টি হোক। ১৬ অক্টোবর।। আজকের দিনটা শান্তিতে কেটেছে। অফিসের কাজেই ব্যস্ত ছিলাম সারাদিন, অন্য কিছু নিয়ে ভাববার সময় ছিল না, আজেবাজে কোনও চিন্তাও জেঁকে বসেনি মাথায়। বাসায় ফেরার পর মীনার সঙ্গে আনন্দঘন সময় কাটিয়েছি। ও এখনো জানে না, মনের মধ্যে কি অশান্তি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি আমি....জানার ইচ্ছেও নেই। কুইন্সিকে নিয়ে ও এমনিতেই যথেষ্ট পরেশান, এর মধ্যে আর নতুন করে দুশ্চিন্তা গছানো ঠিক হবে না। আমার একার সমস্যা আমাকেই সমাধান করতে হবে। ১৭ অক্টোবর।। কাল রাতে অদ্ভুত একটা অভিজ্ঞতা হয়েছে। কেন ঘটল ঘটনাটা, এর পেছনে কোনও যুক্তি আছে কিনা জানি না। তারপরেও ঠিক করেছি ডায়েরীতে তুলে রাখব ওটা। স্টাডিতে বসে পড়াশোনা করছিলাম গত রাতে, হঠাৎ বাইরে থেকে শুনতে পেলাম আমাদের পোষা বেড়ালটার একটানা মিঁয়াও মিঁয়াও ডাক। জানলার চৌকাঠে বসেছিল ও, থাবা ঘষছিল কাঁচে; তাড়াতাড়ি জানলা খুলে ওকে ভেতরে ঢোকালাম। ডেস্কের ওপর উঠে বসল বেড়ালটা, শান্ত ভঙ্গিতে দেখতে লাগল আমার কাজ। এমনিতে পুসি চুপচাপ স্বভাবের বেড়াল, কিন্তু কাল মনে হলো আরও কেমন যেন থম মেরে আছে। কালকে ওর উপস্থিতি কেমন যেন অস্বস্তি জাগিয়ে তুলছিল আমার মধ্যে। হঠাৎ খেয়াল করলাম, ডেস্ক ল্যাম্পের আলোটা বেড়ালের বিশাল এক ছায়া ফেলেছে পেছনের দেয়ালে.....আর সেখানে জ্বলছে নিভছে লাল -নীল রঙের ফুটকি। কলম নামিয়ে রাখলাম আমি, বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম সেদিকে। বোঝার চেষ্টা করলাম ব্যাপারটা চোখের ভুল কিনা। আর কোনও ব্যাখ্যা থাকতে পারে না, কারণ লাল - নীল আলোর এই খেলা জীবনে স্রেফ একবার দেখেছিলাম আমি - সেন্ট জর্জ দিবসের রাতে ট্রানসিলভ্যানিয়ার আকাশে। সেই রাতেই প্রথমবারের মতো ড্রাকুলা ক্যাসলে গিয়েছিলাম আমি। যাই হোক, বর্তমান প্রসঙ্গে ফিরে আসি। বেড়ালটা একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল আমার দিকে। ধীরেধীরে ওর চোখের রঙ বদলাতে শুরু করল - সবুজ থেকে লাল- মনে হলো শয়তান ভর করছে ওর মধ্যে। কানদুটো লেপ্টে গেল মাথার সাথে, বীভৎস ভঙ্গিতে হাঁ করল প্রাণীটা, গলা দিয়ে বেরিয়ে এল চাপা হিসহিসানি। আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে ওটা। ভয়ে অন্তরাত্মা শুকিয়ে গেল, ওর চেহারা আর গলার আওয়াজ শুনে। ঢোঁক গিলে ওকে তাড়াতে গেলাম, আর তখুনি আমায় লক্ষ্য করে ঝাঁপ দিল বেড়াল। এসে পড়ল সোজা মুখের ওপর। ধারালো নখের আঁচড়ে কেটে গেল আমার কপাল আর গালের চামড়া, ব্যথায় চেঁচিয়ে উঠলাম। চেষ্টা করলাম ওকে ছুঁড়ে ফেলতে, কিন্তু চামড়া আর মাংসে নখ গেঁথে ঝুলে রইল বেড়ালটা। এক লাফে উঠে দাঁড়ালাম, চেয়ারটা উলটে পড়ে গেল। আর্তনাদ করে সর্বশক্তিতে খামচে ধরলাম বেড়ালের দেহ, এক ঝটকায় ছাড়িয়ে নিয়ে ওকে ফেলে দিলাম একপাশে। আয়নার সামনে গিয়ে পড়ল প্রাণীটা, মেঝেতে গড়ান দিয়ে সিধে হলো। শেষবারের মতো গরগর করে উঠল আমার উদ্দেশ্যে, তারপর একছুটে জানলা দিয়ে পালিয়ে গেল। যন্ত্রণায় টলতে টলতে আয়নার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। দেখলাম রক্তাক্ত হয়ে গেছে আমার মুখ, সর্বত্র আঁচড়ের দাগ।ব্যথার চেয়েও বড় হয়ে উঠল আরেকটা চিন্তা। মনে হলো, বেড়ালটা যখন আয়নার সামনে গিয়ে পড়েছিল, তখন আয়নায় ওর প্রতিফলন দেখিনি আমি! কয়েক মূহুর্ত পরেই ছুটে এল মীনা আর ইলিনা। আমার অবস্থা দেখে চমকে উঠল। সংক্ষেপে ওদেরকে জানালাম, পুসি হঠাৎ আমায় আক্রমণ করে বসেছিল। কেন জানি না। ওরা আর কোনও প্রশ্ন করল না আমায়। আমার সেবা শুশ্রূষায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল। পরে বেড়ালটাকে বাগানে খুঁজে পেল মালি - একটা ঝোপের পেছনে বসে ঠকঠক করে কাঁপছিল। ওকে সে বাসার ভেতরে দিয়ে এল। আমি তখন ড্রয়িংরুমে বসে মুখের ক্ষতে মলম পট্টি লাগাচ্ছি, মীনা বেড়ালটাকে নিয়ে এল আমার কাছে, বন্ধুত্ব করিয়ে দেবার জন্য। কিন্তু আমি আর কোনও আগ্রহ দেখালাম না। যদিও পুসি আবার তার শান্ত রূপে ফিরে গেছে, তারপরেও কেন যেন আর ওকে সহ্য করতে পারছি না। মীনা অবশ্য ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করল ওর আচরণের - বলছে কোনও কারণে ঘাবড়ে গিয়েছিল প্রাণীটা, তাই হামলা করে বসেছে আমার ওপরে.....কিন্তু আমার বিশ্বাস হলো না কথাটা। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়েছে, জেনেশুনেই আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল শয়তানটা। হয়তো ভুল করছি আমি। সেবা শুশ্রূষার ফাঁকে মনে হলো, মূহুর্তের জন্য হলেও ইলিনার চোখেও সেই বেড়ালটার মতো শয়তানি দৃষ্টি দেখতে পেলাম আমি। এটা মনে হতেই ওর দিকে ভাল করে তাকালাম, না, চোখের দৃষ্টি একেবারেই স্বাভাবিক। কি যে হচ্ছে, কিছুই বুঝতে পারছি না। মীনা হারকারের ডায়েরী ২১ অক্টোবর।। ধীরেধীরে সুস্থ হয়ে উঠছে কুইন্সি। এখনো বেশ দুর্বল ও, বিছানায় কাটাচ্ছে বেশীরভাগ সময়.....তারপরেও ডাক্তার জানিয়েছে, আর চিন্তার কিছু নেই। ছেলে ভাল হয়ে উঠলেও নতুন সমস্যা দেখা দিয়েছে আমার স্বামীকে নিয়ে। সঙ্গী হিসেবে ইলিনা থাকায় খুব ভাল হয়েছে - উদ্বেগ ভাগাভাগি করার মতো একজন মানুষ পাচ্ছি আমি। কি যে হয়েছে জোনাথনের, কিছুই বুঝতে পারছি না। সেদিন বেড়ালের হামলার পর থেকে কেমন যেন হয়ে গেছে ও। সবসময় বিমর্ষ হয়ে থাকে, চেহারা দেখে মনে হয় যেন ঝড় বয়ে গেছে ওর ওপর দিয়ে। রাতেও বোধহয় ঠিকমতো ঘুমোয় না, চোখের নীচে কালি পড়তে শুরু করেছে। এক রাতে স্বপ্ন দেখে ছটফট করে জেগে উঠল, অথচ কি দেখেছে, কিছুই মনে করতে পারল না। ডাক্তার দেখানো দরকার। ডাঃ সিউয়ার্ডকে লন্ডন থেকে ডেকে আনব কিনা ভাবছি। বেড়ালটা সে রাতে অমন করল কেন, তা বুঝতেই পারছি না এখনো। অথচ ওই ঘটনার পর থেকে একেবারে লক্ষ্মী হয়ে গেছে, ঠিক আগের মতো। দেখে বিশ্বাস করা মুশকিল, শান্তশিষ্ট এই প্রাণীটাই কারও ওপর অমনভাবে হামলা করতে পারে। জোনাথন আর সহ্য করতে পারছে না ওকে, দূরে সরিয়ে রাখছি কুইন্সি'র কাছ থেকেও। অযথা ঝুঁকি নেবার কোনও মানে হয় না। নিজের কথা যদি বলি....সংসার সামলাতে সামলাতে ক্লান্ত আমি, তাছাড়া, ঘুমের মধ্যে দুঃস্বপ্নের উৎপাত বন্ধ হয়নি পুরোপুরি। আজকাল বেশ টের পাই, পুরো বাড়িতেই কেমন যেন একটা থমথমে পরিবেশ....ঠিক ঝড় ওঠার আগে যেমন শান্ত থাকে প্রকৃতি। মাঝেমাঝে মনে হয়, আড়াল থেকে কেউ যেন লক্ষ্য রাখছে আমাকে, কিন্তু বাস্তবে তেমন কোনও আলামত পাইনি। ব্যাপারটা মনের ভুল হবার সম্ভাবনা ষোলো আনা। মনের এই অবস্থায় একমাত্র ইলিনাই আমায় সুস্থ স্বাভাবিক থাকতে সাহায্য করছে। ওর প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। ২৩ অক্টোবর।। আজ রাতে যা ঘটে গেছে, তা লিখবার ইচ্ছে হচ্ছে না আমার, লজ্জায় সংকুচিত হয়ে আছে মন। তারপরেও এক ধরনের তাগিদ থেকে কলম তুলে নিয়েছি হাতে - সত্যকে লিপিবদ্ধ করার তাগিদ। যা আমি লিখে রেখে যাব, তা হয়ত অদূর ভবিষ্যতে কাজে আসতে পারে....মানে ও যদি আমার এই ডায়েরী পড়ে, আর কি। ও জানবে, আমি এখনো ওকে আগের মতোই ভালবাসি এবং শ্রদ্ধা করি। কিন্তু ডায়েরী'টা পড়ার পর ওর অনুভূতি কি হবে, তা স্রেফ ঈশ্বরই জানেন। রাত দশটার দিকে আমরা যখন শুতে গেলাম, জোনাথনকে কেমন অস্বাভাবিক রকম নীরব দেখাল। ওর চোখে লক্ষ্য করলাম খেলা করছে এক অদ্ভুত বুনো দৃষ্টি। অন্য কোনও সময় হলে এর কারণ জিজ্ঞাসা করতাম, কিন্তু কাল কেন যেন জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হল না। আমার নিজের ওপরেও অন্যরকম এক মেজাজ ভর করেছিল। নিভু নিভু হয়ে জ্বলছিল ঘরের প্রদীপগুলো, বাতাস বেশ গুমোট। তাজা হাওয়ার জন্য খুলে দিলাম জানলা, কিন্তু টের পেলাম, বাইরেও বাতাস বইছে না। দূর থেকে ভেসে এল চাপা গুড়গুড় আওয়াজ - আকাশ ঢাকা পড়ে গেছে ঘন কালো মেঘে। নামি নামি করেও নামছে না বৃষ্টি। বিদ্যুৎ চমকের আলোয় ক্ষণে ক্ষণে ঝলসে উঠছে গাছপালার মাথা আর দূরের গীর্জার চোখা চূড়া। জানলার সামনে ধূলোর একটা মেঘ পাক খেতে দেখলাম.....সঙ্গে সঙ্গে একটা ঘোরের মতো সৃষ্টি হলো, যেন আমায় মনে করিয়ে দিতে চাইল কোনও অশুভ স্মৃতি। তাড়াতাড়ি জানলা বন্ধ করে দিলাম। বিছানায় উঠেই আলো নিভিয়ে দিল জোনাথন। সেটাও অস্বাভাবিক। ঘুমোনোর আগে কিছুক্ষণ গল্প করা আমাদের অভ্যাস। আলোটা তখন জ্বালানোই থাকে। কিন্তু কাল রাতে কোনও কথা বলল না জোনাথন, আলোও নিভিয়ে দিল। ওর হাবভাব কেমন অস্বাভাবিক ঠেকল আমার কাছে। বিরক্ত করলাম না ওকে, পাশ ফিরে শুয়ে ঘুমোনোর চেষ্টা করলাম। হঠাৎ চমকে উঠে তাকাতেই দেখি, আমার ওপর ঝুঁকে আছে জোনাথন। পশুর মতো ধকধক করে জ্বলছে ওর চোখদুটো - মণিদুটোর রঙ হলুদ থেকে ধীরেধীরে লালচে হয়ে উঠল। দম আটকে এল আমার, ওই চোখজোড়া জোনাথনের হতে পারে না, কিছুতেই না। কিন্তু কিছুই করতে পারলাম না, জ্বলন্ত ওই চোখজোড়ার দিকে তাকিয়ে অবশ হয়ে এসেছে দেহ, নড়বার ক্ষমতা নেই। ধীরেধীরে আমার ঠোঁটের ওপর নেমে আসতে লাগল ওর ঠোঁট, ক্ষুধার্তের মতো চুমো খেল আমায়। এরপর যা ঘটল, তা আর বিস্তারিত বলতে পারছি না। কিন্তু এখনও সেই স্মৃতি মনে পড়লে কেঁপে উঠছি বারবার। কামোন্মাদ এক পশুর মতো আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল ও.....এমন ঘটনা আর কখনো ঘটেনি। ওর আচরণ দেখে ভয়ে আতঙ্কে বিহ্বল হয়ে পড়লাম আমি। ধাক্কা দিয়ে ওকে সরিয়ে ছুটে বেরিয়ে এলাম বেডরুম থেকে। স্নায়ু শান্ত হবার পর যখন ফের গেলাম বেডরুমে, তখন দেখি ও ঘুমোচ্ছে। একটু আগে ঘটে যাওয়া ঘটনার কোনও প্রভাবই দেখা যাচ্ছে না ওর মধ্যে। সে রাতটা কুইন্সির ঘরে বসেই কাটিয়ে দিয়েছি। ভয়াল একটা চিন্তা আস্তে আস্তে জেঁকে বসছে আমার মাথায়। কেন যেন মনে হচ্ছে, আজ রাতে যাকে দেখলাম, সে জোনাথন হতে পারে না। অন্য কেউ ছিল ওটা। জানি, কথাটা অবিশ্বাস্য শোনাচ্ছে কিন্তু এ ছাড়া আর তো কিছু ভাবতে পারছি না। এমন কেন করল জোনাথন? ও তো এমন মানুষ নয়! সকাল হলে ওর সঙ্গে কথা বলতে হবে ব্যাপারটা নিয়ে। কিন্তু ও কথা বলবে কিনা সেটাই সন্দেহ। ক'দিন ধরে দেখছি একেবারে গুম হয়ে গেছে জোনাথন। প্রয়োজন ছাড়া মুখই খুলছে না। কি হয়েছে ওর! ২৪ অক্টোবর।। বিচ্ছিরি একটা দিন শেষ হলো আজ। গুমোট আবহাওয়া, আকাশ মেঘাচ্ছন্ন, অথচ ঝড় বাদলের নামগন্ধ নেই। জোনাথনের সঙ্গেও যেভাবে চেয়েছি, কথা বলতে পারিনি। প্রসঙ্গটা তুললেই বার বার এড়িয়ে যাচ্ছে ও। মাতালের মতো চোখজোড়া লাল হয়ে আছে ওর, যদিও মদ্যপান করেনি একফোঁটা ; আমার হাত ধরে এক পর্যায়ে বলল, " প্লিজ, এ নিয়ে এখন কোনও কথা বোলো না। বলবার মতো কিছু নেই। ব্যাপারটা একটা বাজে দুঃস্বপ্ন ভেবে ভুলে থাকলেই চলবে"। " কিন্তু জোনাথন", বললাম আমি, " ব্যাপারটা স্বাভাবিক নয়। আজ পর্যন্ত কখনো তোমার অমন চেহারা দেখিনি। কিছু একটা কারণ তো নিশ্চয়ই আছে। এড়িয়ে গেলে তো সমস্যার সমাধান হবে না!" " বললাম তো, কোনও সমস্যা নেই", একটু রাগী গলায় বলল জোনাথন। এমন সুরে আমার সঙ্গে কখনো কথা বলেনি জোনাথন। তারপরই নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, " প্লিজ মীনা, এ নিয়ে আর কথা বাড়িয়ো না। আমি তোমার মনে আঘাত দিতে চাইনি"। " আমি আঘাত পাইনি, জোনাথন", বললাম আমি, " শুধু জানতে চাইছি, কাল রাতে কি হয়েছিল তোমার। শরীর টরীর খারাপ করেছিল নাকি...." কথা বলতে বলতেই জোনাথনের চেহারায় এক আশ্চর্য পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম। বিষাদ সরে গিয়ে ওর মুখে ফুটে উঠল একটা কুটিল হাসি। ঘাড় কাত করে বিকৃত গলায় বলল, " শরীর খারাপ হয়নি তোমার স্বামীর। আসলে কি ঘটেছিল সেটা তুমি খুব ভাল করেই জানো। স্বীকার করতে চাইছ না"। চমকে উঠলাম ওর এই কথায়। মনে হলো, তৃতীয় কোনও ব্যক্তি কথা বলছে জোনাথনের ভেতর থেকে। ভয়ার্ত কন্ঠে প্রায় চেঁচিয়ে উঠলাম, " জোনাথন! কি বলছ এসব? " আমার গলা শুনে যেন সম্বিৎ ফিরে এল জোনাথনের। ধড়মড় করে সোজা হয়ে বসল। হতভম্ব গলায় বলল, " ক্ক....কি বলেছি আমি?" " কেন, তুমি জানো না?" " না তো! খারাপ কিছু বলেছি? " জবাব দিলাম না।আসলে কি বলব সেটাই ভেবে পেলাম না। বড়সড় একটা ধাক্কা খেয়েছি, সেটা সামলে নেবার জন্য সরে এলাম জোনাথনের সামনে থেকে। খানিক পরে ও নিজেই খুঁজে নিল আমায়। দু'হাত ধরে ক্ষমা প্রার্থনার সুরে বলল, " আমায় ক্ষমা করো মীনা। আমার কি হয়েছে, আমি নিজেই জানি না। গত রাতের কথা খুব সামান্যই মনে আছে আমার। শুধু এটুকু বলতে পারি, পাশবিক কিছু একটা ভর করেছিল আমার ওপর ; নিজের দৈহিক চাহিদা মেটানো ছাড়া আর কোনও কিছু ভাবতে দিচ্ছিল না। জানি না, তোমার কোনও ক্ষতি করে বসেছি কিনা......." " ক্ষমা চাইতে হবে না তোমায়, কিচ্ছু হয়নি আমার", আন্তরিক গলায় বললাম ওকে, " শুধু এটুকু বলো, তোমার কি সত্যিই কিছু মনে নেই গতরাতের কথা?" ...." মনে আছে। খুব অল্প"। " জ্বর হয়নি তো?" বলে হাত রাখলাম ওর কপালে। কিন্তু না, বাড়তি কোনও উত্তাপ অনুভব করলাম না। সমস্যাটা অন্য কোথাও। " আমি খুব দুঃখিত মীনা", মিনমিন করে বলল জোনাথন। " আমিও, জোনাথন"। আমাদের কথা ওখানেই শেষ হলো। কিন্তু শেষ হলো না উদ্বেগের। ইচ্ছের বিরুদ্ধে জোর করে ওকে ট্রানসিলভ্যানিয়া নিয়ে গিয়ে ভুল করেছি কিনা ভাবতে লাগলাম। ওখান থেকে ফেরার পর থেকেই শুরু হয়েছে যত গণ্ডগোল। যে অশুভ ছায়া থেকে মুক্তি পাবার জন্য গিয়েছিলাম ওখানে, মনে হচ্ছে সেটা আরও গাঢ় হয়েছে আমাদের ভ্রমণের ফলে। ক্রমশ অশুভ আত্মা


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮০ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now