বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
রিটার্ন অব ড্রাকুলা
কাহিনী : ফ্রেডা ওয়ারিংটন
অনুবাদক : ইসমাইল আরমান
-------------------------------------
পর্ব ০৩ঃ
দূর্গ দেখা যেতেই রাশ টেনে ক্যারিজ থামালেন ডাঃ
সিউয়ার্ড। নেমে পড়লাম আমরা। ঘোড়াগুলোকে গাছের
সঙ্গে ভাল করে বেঁধে তারপর পায়ে হেঁটে এগোলাম
সবাই। আমাদের দৃষ্টি আটকে রইল দূর্গের ধূসর দেয়ালের
ওপর।
মাথার ওপর তখন কালো মেঘ জমাট বাঁধতে শুরু করেছে।
গুড়গুড় শব্দে মেঘ ডেকে উঠল, বুক কেঁপে উঠল আমার।
শক্ত
করে ধরলাম জোনাথনের হাত। ও-ও পাল্টা চাপ দিল
আমার হাতে। অজানা এক ভয় লক্ষ্য করলাম ওর
চোখেমুখে।
ভ্যান হেলসিংকে ঘনঘন কপাল মুছতে দেখলাম। মুখে যা-ই
বলুন, ভদ্রলোক যে ভেতরে ভেতরে ঠিকই বিচলিত হয়ে
পড়েছেন, তা তাঁর মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। ওঁরও নিশ্চয়ই
সেইসব পুরনো স্মৃতি মনে পড়ে যাচ্ছে। ড্রাকুলার সহচরী
সেই তিন রক্তলোলুপ নারীর বুকে লৌহশলাকা গেঁথে
তাদের হত্যা করেছিলেন তিনি-ই। নিবৃত্ত করেছিলেন
তাদের পৈশাচিক প্রবৃত্তি। দৃশ্যটা আমি দেখিনি
নিজের চোখে, কিন্তু এটুকু বুঝি.... সে অভিজ্ঞতা
কোনওভাবেই সুখকর হতে পারে না।
দূর্গ থেকে এক মাইল দূরে যেখানে কাউন্ট ড্রাকুলা তার
শেষ পরিণতির স্বীকার হয়েছিল, সেখানে পৌঁছে একটু
থামলাম আমরা। ঢালের গায়ে সেই উঁচু পাথরটা পরিষ্কার
চিনলাম - ওখানেই আশ্রয় নিয়েছিলাম আমি আর
প্রফেসর হেলসিং, কাউন্ট'কে নিয়ে দূর্গের পথে ফিরতে
থাকা জিপসিদের ওপর নজর রেখেছিলাম ওটার আড়াল
থেকে। পুরো ঘটনাটা আজও চোখের সামনে ভাসে।
জিপসিদের ক্যারাভান থামানো হলো, ড্রাকুলার
কফিনের ডালা খোলা হলো, ঘুমন্ত পিশাচটার বুকে
লোহার গজাল ঢোকাল জোনাথন, ক্যুয়েন্সি মরিস গেঁথে
দিলেন একটা ধারাল ছুরি, মূহুর্তে ধূলোয় পরিণত হলো
জ্যান্ত লাশটা। চারপাশে তখন সোঁ সোঁ হাওয়া বইছে,
মেঘে মেঘে ঘর্ষণে চমকাচ্ছে বিদ্যুৎ। সে এক অদ্ভুত
পরিবেশ।
এসব ভাবতে ভাবতে অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম, হঠাৎ
জোনাথন বলে উঠল, " দেখো! দেখো! "
মুখ তুলতেই সূর্যের ওপর থেকে কালো মেঘটাকে সরে
যেতে দেখলাম। মেঘের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে এল সূর্যের
সোনালি কিরণ। সেই আলোয় আলোকিত হয়ে উঠল
ড্রাকুলার প্রাসাদ দূর্গ।
হেসে উঠলেন ভ্যান হেলসিং। জোনাথনের কাঁধে হাত
রেখে বললেন, " এটা একটা সঙ্কেত। ড্রাকুলার অভিশাপ
থেকে মুক্ত হয়েছে পৃথিবী। ও আর কোনওদিনই ফিরবে না।
ঈশ্বরকে ধন্যবাদ "।
দূর্গের সামনে গিয়ে ধর্মীয় আচার পালন করলাম আমরা।
প্রার্থনাসঙ্গীত গাইলাম, ছিটোলাম পবিত্র পানি।
তারপর ফিরতি পথ ধরলাম। নিরাপদে ফিরে এলাম
খামারবাড়িতে।
আর কিছু লিখতে পাচ্ছি না। শরীর খুব ক্লান্ত। জোনাথন
তো ঘুমিয়েই পড়েছে। মনের অবস্থা ব্যাখ্যা করার সম্ভবত
কোনও প্রয়োজন নেই। শুধু এটুকু বলতে পারি, স্বস্তি অনুভব
করছি।
।। ২৫ শে জুলাই, সন্ধ্যা।।
ট্রেনে চড়ে বুদাপেস্টে ফেরার পথে এখন ডায়েরী
লিখছি। এবারের ট্রানসিলভানিয়া ভ্রমণে সত্যিকার
ছুটির আনন্দ উপভোগ করেছি আমরা - মুক্ত, স্বাধীন,
বন্ধনহীন। ট্রানসিলভানিয়া ছেড়ে আসতে বরঞ্চ খারাপই
লাগছিল আমাদের। অশুভ আশঙ্কা দূরীভূত হওয়ায়
ওখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বড্ড ভাল লাগছিল
আমাদের, কেবলই মনে হচ্ছিল, আর ক'টা দিন এখানে
কাটিয়ে গেলে মন্দ হতো না।
গতকাল সন্ধ্যা আর আজ সকালে বেশ অনেকক্ষণ কথা
হয়েছে ইলিনার সঙ্গে। একসঙ্গে হাঁটতে বেরিয়েছিলাম
আমরা। গল্প করার ফাঁকে ও নিজের উচ্চশিক্ষা আর দেশ
বিদেশ ভ্রমণের ইচ্ছের কথা জানাল আমায়। কিন্তু
নিরুপায়। বদমেজাজি, একগুঁয়ে বাপের কবলে পড়ে ওর
জীবন দূর্বিষহ হয়ে পড়েছে। ইলিনাকে দেখে মায়া হলো।
বেচারীর জন্য কিছু করার ইচ্ছা মনে মনে হলেও আমি
জানি আমি নিরুপায়। অন্যের মেয়ের ব্যাপারে নাক
গলাবার কোনও অধিকার আমার নেই। তাই বললাম, "
এবারের গ্রীষ্মটা তো এই চমৎকার জায়গায় কাটাতে
পারছ, সেটাই বা কম কি? আমার পরামর্শ যদি শোনো তো
বলি কি কাজে লাগাও এই সময়টা। বুদাপেস্টে ফেরার
আগেই একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলো মিকোলাসের
ব্যাপারে। ছবিও আঁকতে পারো, তোমার বাবা খুশিই
হবেন তোমায় পেইন্টিং করতে দেখলে। তোমাদের
সম্পর্কটাও হয়তো সহজ হয়ে উঠবে তাতে।"
" কিন্তু আমি যে পেইন্টিং করতে পারি না, মাদাম
হার্কার", বলল ইলিনা।
" সে কি!" বিস্মিত হলাম ওর কথায়, " আমি তো ভেবেছি
তোমার বাবার মতো তুমিও একজন আর্টিস্ট। "
" না, না", মাথা নাড়ল ইলিনা, " আমি স্রেফ বাবার
অ্যাসিস্ট্যান্ট। ইজেল, রঙ তুলি হাতের সামনে এগিয়ে
দেয়া, খিদে পেলে নাস্তা পরিবেশন করা - এসবই আমার
দায়িত্ব। উনি নিজেও চান না আমি পেইন্টিং করি।
তাছাড়া আমি নিজেও খুব একটা আগ্রহী নই এসব আঁকা
টাঁকার ব্যাপারে।"" বেশ", বললাম আমি, " তা হলে আমি অন্তত ইংরেজিটা
আরও ভালভাবে শিখতে সাহায্য করব তোমায়।"
ফার্মহাউজে ফিরে আমি ইলিনাকে ' হাঙ্গেরিয়ান টু
ইংলিশ ' ডিকশনারিটা উপহার দিলাম। সেইসঙ্গে দিলাম
একটা নতুন খাতা, পেন আর এক দোয়াত কালি। সামান্য
এই উপহার পেয়েই আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়ল ইলিনা।
আবেগাপ্লুত গলায় বলল, " ধন্যবাদ মাদাম, কথা দিচ্ছি, এই
খাতায় আপনার মতোই ডায়েরী লিখব আমি। ভবিষ্যতে
যদি কখনো দেখা হয়, পড়তেও দেব আপনাকে সেই
ডায়েরী। "
মেয়েটার জন্য এটুকু করতে পেরেই ভাল লাগল আমার। তা
সে যত সামান্যই হোক। অদ্ভুত এই এক মেয়ে ইলিনা। ওকে
দেখে কেন জানি আমার বারবার বান্ধবী লুসি'র কথা
মনে পড়ে যাচ্ছিল, সাত বছর আগে যাকে চিরদিনের জন্য
হারিয়েছি।
।। ৩০ শে জুলাই, এস্কেটার।।
অবশেষে বাড়ি পৌঁছেছি। আর পৌঁছন মাত্র জানতে
পারলাম, আমাদের অনুপস্থিতিতে ব্রঙ্কাইটিস হয়েছিল
আমাদের ছোট্ট ক্যুইন্সি'র। যদিও ডাঃ সিউয়ার্ড এবং
ভ্যান হেলসিং দুজনেই ওকে পরীক্ষা করে দেখে
বলেছেন, এখন সে সম্পূর্ণ সুস্থ। কোনও ভয় নেই। আমাদের
অনুপস্থিতিতে ডাঃ সিউয়ার্ডের স্ত্রী মিসেস অ্যালিস
সিউয়ার্ড যথাসাধ্য সেবাযত্ন করেছেন ক্যুইন্সির; তবু মনে
মনে ক্ষুব্ধই হলাম, কেন তিনি চিঠিতে ক্যুইন্সি'র
অসুস্থতার কথা জানালেন না আমায়। যদিও জানি, চিঠি
পাঠালেও এর চেয়ে দ্রুত বাড়ি ফিরতে পারতাম না
আমরা।
যাই হোক, বাড়ি ফেরার পর আলমারি সিন্দুক ঘেঁটে পুরনো
সমস্ত ডায়েরী, স্মৃতিকথা আর পত্রিকার কাটিং বের
করেছি আমরা - একত্র করেছি ওগুলো। এবারের ভ্রমণের
বৃত্তান্তও জোনাথন যোগ করবে ওগুলোর সঙ্গে। ফলে
ড্রাকুলা সংক্রান্ত একটা পূর্ণাঙ্গ বিবরণ তৈরি হবে।
বলে রাখা ভাল, এরই মধ্যে ভ্যান হেলসিং স্বীকার
করেছেন, প্রফেসর আন্দ্রে কোভাসকে তিনি কাউন্ট
ড্রাকুলার ব্যাপারে সবকিছুই জানিয়েছেন।
হেলসিংয়ের কথায় ভ্রু কোঁচকাল জোনাথন। বলল, "
কাজটা কি ঠিক করলেন? বাইরের কাউকে এসব
জানানো...... "
" খামোখাই দুশ্চিন্তা করছ", ওকে আশ্বস্ত করে বললেন
হেলসিং, " শুনে খুশি হবে, তথাকথিত আধুনিক মানুষদের
মতো সঙ্কীর্ণমনা নয় আন্দ্রে কোভাক্স। পৃথিবীতে যে
ব্যাখ্যার অতীত কিছু ঘটনাও মাঝেমাঝে ঘটে, তা সে-ও
মানে। সে আমার প্রতিটা কথা বিশ্বাস করেছে ও
গোপনীয়তা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে।
তাছাড়া ইতিহাস আর মাইথোলজির ওপর ওর এমনিই ঝোঁক
আছে, আমার কথা শোনার পর তা আরও বেড়েছে।
কার্পেথিয়ান এলাকা আর ড্রাকুলা ক্যাসলের ব্যাপারে
নানা গুজব সে বহুদিন ধরেই শুনে আসছে আর সেইসব
গুজবের পেছনে আসল রহস্য জানতে পেরে ও আমার কাছে
রীতিমতো কৃতজ্ঞ হয়েছে"।
" তা হলে তো আর কিছুই বলার নেই", শুকনো গলায়
প্রসঙ্গটার ইতি ঘটাল জোনাথন, " আশা করি
ভেবেচিন্তেই যা করার করেছেন আপনি"।
খুব শিগগীরই ফিরে যাবেন আমাদের অতিথিরা। ডাঃ
সিউয়ার্ড আর আর্থার সস্ত্রীক ফিরে যাবেন লন্ডনে, আর
ভ্যান হেলসিং ফিরে যাবেন আমস্টারডামে। আমি আর
জোনাথনও ফিরে যাব আমাদের রোজকার স্বাভাবিক
জীবনে।
।। জোনাথন হার্কারের ডায়েরী।।
১০ ই অগস্ট।
গত সপ্তাহে ট্রানসিলভ্যানিয়া থেকে ফেরার পর
সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম - এবারের অভিযানের বিবরণটা
লিখে রাখব, সেটা রেখে দেব আমাদের ড্রাকুলা
সংক্রান্ত পুরনো নথিগুলোর সঙ্গে। কাজটা সম্পূর্ণ করতে
পেরে যেন মনে হচ্ছে কাঁধের ওপর থেকে বিরাট বোঝা
নেমে গেছে।
আমাদের বন্ধুরা সবাই চলে গেছেন, বাড়িটা খালি খালি
লাগছে। অদ্ভুত একটা ক্লান্তি আসছে মনের মধ্যে কিন্তু
কি জানি কেন মাঝেমাঝেই শিউরে শিউরে উঠছি।
একটা অজানা ভয় আমায় যেন গ্রাস করতে চাইছে। এই
ভয়ের উৎপত্তি হয়েছে এবারের ড্রাকুলা ক্যাসল
অভিযানে গিয়ে। কাউকে এখনো বলিনি.....কিন্তু
সেখানে গিয়ে কিছু একটা দেখেছি বা অনুভব করেছি।
পুরোটাই চোখের ভুল বা মনের কারসাজি হতে পারে, তাই
কাউকে বলতে পাচ্ছি না কিছু। এমনকি ডায়েরীতেও
এখনো উল্লেখ করিনি......
ব্যাপারটা হলো কি, ড্রাকুলা ক্যাসলের কাছে পৌঁছনো
মাত্র একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল আমার মধ্যে। সারাক্ষণ
মনে হচ্ছিল কেউ যেন নজর রাখছে আমাদের ওপর।
চোখের কোণে লম্বা একটা ছায়ার নড়াচড়াও লক্ষ্য
করেছি বেশ কয়েকবার, ঝট করে মাথা ঘুরিয়ে তাকিয়েও
কাউকে দেখতে পাইনি অবশ্য। চোখের ভুল হওয়াটাই
স্বাভাবিক, কারণ আমি ছাড়া আর কেউই এ জাতীয় কিছু
দেখেনি। তাই কাউকে এসব বলার প্রয়োজন মনে করিনি।
আমার সঙ্গীরা সবাই হালকা মেজাজ নিয়ে ফিরে
এসেছে, সবাই বলাবলি করছে, এই অভিযানটা নাকি
তাদের মনের যাবতীয় দ্বিধাদ্বন্দ্ব দূর করেছে কিন্তু কেন
জানি আমি ওদের সাথে একমত হতে পারছি না। কেবলই
মনে হচ্ছে ট্রানসিলভ্যানিয়া ফিরে যাওয়া উচিত হয়নি
আমাদের। কাজটা করে সেই ভয়াল দুঃস্বপ্নের দ্বিতীয়
অধ্যায়টা শুরু করলাম না তো? না, কোনও প্রমাণ দেখাতে
পারব না এই আশঙ্কার পেছনে; পুরোটাই অমূলক হতে
পারে। তারপরেও ধারণাটা বদ্ধমূল হয়ে উঠছে বুকের
গভীরে।
এসব কি আমারই মনের ভুল? কে জানে? সময়ই এর উত্তর
দেবে।
ক্রমশ....
Post: অশুভ আত্মা
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now