বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
রিটার্ন অব ড্রাকুলা
কাহিনী : ফ্রেডা ওয়ারিংটন
অনুবাদক : ইসমাইল আরমান
-------------------------------------
পর্ব ০২ঃ
মীনার ডায়েরী
২১ শে জুলাই
বিসত্রিসে যাওয়ার পথে ট্রেনে বসে লিখছি। জানলা দিয়ে
চোখে পড়ছে অপূর্ব প্রাকৃতিক দৃশ্য, সেইসঙ্গে মনে
হচ্ছে যেন বড় আস্তে চলছে ট্রেনটা। ক্লাউসেনবার্গে
কাটিয়েছি গত রাতটা, উঠেছিলাম পুরনো এক হোটেলে। সে
এক গা ছমছমে জায়গা, দিনের বেলাতেও কেমন অন্ধকার
অন্ধকার। পুরনো আমলের গম্বুজ আর খিলানওয়ালা ভবন, সামনের
আঙিনায় আগাছার জঙ্গল। সিঁড়িটা লোহার...জং ধরা, প্যাঁচানো।
কামরাগুলো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হলেও খুব ছোট ছোট।
জোনাথন বলল, আগেরবার ও যে হোটেলে উঠেছিল সেটা
এর চেয়ে অনেক ভাল ছিল। ইচ্ছে করেই ওখানে উঠিনি আমরা,
যাতে কেউ জোনাথনকে চিনতে না পারে। এখানকার
লোকেরা দয়ালু আর অমায়িক হলেও খুব কুসংস্কারাচ্ছন্ন।
আমাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য টের পেলে নির্ঘাত থামাবার চেষ্টা
করত...অযথা ঝামেলায় জড়াইনি। হোটেলে একটা অদ্ভুত
অভিজ্ঞতা হয়েছে, সেটা লিখে রাখা দরকার। আমরা যখন
হোটেলের আগাছায় ভরা আঙিনা পেরিয়ে মূল ভবনের দিকে
যাচ্ছিলাম, তখন নজরে পড়ল, হোটেলের দোতলার বারান্দায়
একজন জিপসি মহিলা দাঁড়িয়ে আছে। ছোটখাটো দেহ, গায়ে
ময়লা পোশাক, মাথায় রুক্ষ চুলের জটা। আমার দিকে কুতকুতে
চোখে তাকিয়েছিল, ওর দিকে মুখ তুলতেই সে তার একটা হাত
উঁচু করে রোমানিয়ান ভাষায় কি যেন বলল। ঠিকমতো বুঝতে
পারিনি কথাটা, মনে হলো, যেন বলল, " ওর রক্ত আর তোমার
রক্ত...." এই জাতীয় কিছু একটা। মহিলার হাবভাব দেখে গায়ে কাঁটা
দিয়ে উঠল আমার। জোনাথনকে ডেকে দেখাতে চাইলাম,
কিন্তু দ্বিতীয় বার মুখ তুলে সেদিকে তাকাতেই দেখি গায়েব
হয়ে গেছে জিপসিটা। ও কি সত্যিই কোন মানুষ ছিল, নাকি
আত্মা....কে জানে। ভয়ে অন্তরাত্মা শুকিয়ে গিয়েছিল আমার।
হোটেল ছাড়তে পেরে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছি।
ইলিনার সঙ্গে যাত্রাপথে খুব একটা কথা হয়নি। লাজুক স্বভাবের
মেয়ে, এখনো পুরোপুরি খোলামেলা হতে পারেনি আমার
সঙ্গে। চমৎকার ইংরেজি বলে, জার্মান ভাষার জ্ঞান তো আমার
চেয়ে ভালই আর হাঙ্গেরিয়ান ভাষাতেও বেশ দক্ষতা
আছে....আমি যার প্রায় কিছুই জানি না। কাজেই আমার প্রতি ওর অনুরাগ
সৃষ্টি হবার কোনও সম্ভাবনাই দেখছি না। একবারই শুধু আমার
ডায়েরী লেখার ব্যাপারে শুধু কৌতূহল দেখিয়েছিল। আমার
ডায়েরী লেখার অভ্যাস দেখে খুব একটা মুগ্ধ হয়েছে বলে
মনে হলো না।
উঁচুনিচু পাহাড়ি পথে ছুটে চলেছে ট্রেন। কোথাও দেখা যায়
মন জুড়ানো সবুজ বনানী, কোথাও বা বরফের চাদরে ঢেকে
আছে সবকিছু, সবুজ গালিচার মতো খেত খামার, ছবির মতো সুন্দর
গ্রাম। আকাশে যেন কেউ নীল-সাদা রঙের পোঁচ দিয়ে
দিয়েছে। এতসব চমৎকার দৃশ্য, অথচ গতবার কিছুই লক্ষ্য করিনি।
চেনা পথ হয়েও এবার সবকিছুই কেমন নতুন মনে হচ্ছে
চোখে। বুঝলাম ট্রানসিলভ্যানিয়ার যে ভয়াল রূপ মনের ভেতর
গেঁথে আছে এখনো, এবার যেন তা দূর করতে পারব।
জোনাথনকেও বেশ শান্ত দেখাচ্ছে। মাঝেমাঝে অবশ্য
একটা গাঢ় ছায়া দেখতে পাচ্ছি ওর মুখে। আমাদের মধ্যে ওর
অভিজ্ঞতাই সবচেয়ে ভয়াবহ। নিশ্চয়ই মনে পড়ে যাচ্ছে ওর
সেসব। জোনাথনের সঙ্গে কিছুটা মিল দেখা যাচ্ছে ডাঃ
সিউয়ার্ডের আচরণেও। শুধু ভ্যান হেলসিংএর মেজাজই প্রফুল্ল
মনে হচ্ছে- বার বার মনে করিয়ে দিচ্ছেন, অতীতের অবসান
ঘটেছে, জয়ী হয়েছি আমরা.....কাজেই দুশ্চিন্তা ভুলে গিয়ে
ভ্রমণটাকে হালকা মেজাজে উপভোগ করা উচিত সবার। এতকিছুর
পরেও বলতে দ্বিধা নেই, ড্রাকুলার ক্যাসলের যত নিকটবর্তী
হচ্ছি, ততই নার্ভাস হয়ে পড়ছি আমি, এর সঙ্গে অনুভব করছি খানিকটা
উত্তেজনা। বিপদ আপদ হবার কোনও সম্ভাবনা নেই, এই
উপলব্ধিই হয়তো সৃষ্টি করছে এই উত্তেজনার। বুঝতে পারছি,
হাসিখুশি থাকতে হবে আমায়। জোনাথন যে কিছুতেই স্বাভাবিক
হতে পারবে না, তা আমি জানি। কাজেই আমাকেই দায়িত্ব নিতে
হবে ওকে চিন্তামুক্ত রাখার। বিসত্রিসে পৌঁছে গিয়েছি প্রায়।
এখানে একটা হোটেলে খাওয়া দাওয়া সেরে তারপর একটা
ঘোড়ার গাড়ি ভাড়া করে যাওয়া হবে পার্বত্য এলাকার খামার বাড়িটায়।
আপাতত এটাই আমাদের পরিকল্পনা। দু'দিনের ভেতর কাজ সেরে
যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফেরার পথ ধরার ইচ্ছে আছে আমাদের।
২১ শে জুলাই
আজ আমরা বিসত্রিস থেকে খামারবাড়িতে এসে পৌঁছেছি। ঘোড়ার
গাড়িতে আলাদা কোনও কোচোয়ান নেয়া হয়নি; জোনাথন, ডাঃ
সিউয়ার্ড, আর আর্থার পালা করে চালিয়ে নিয়ে এসেছেন
আমাদের ক্যারিজটা। পাহাড়ি পথ ধরে দীর্ঘ যাত্রা প্রায় নির্বিঘ্নে
কেটেছে। যাত্রাপথের দৃশ্য অবশ্য গতকালের মতোই সুন্দর
ছিল। বেশ কিছু গ্রাম পেরিয়ে এলাম আমরা, সবগুলোই বলতে
গেলে একরকম। কাঠ বা ইঁটের তৈরি একতলা বাড়ির সারি, সামনে
বেড়া দিয়ে ঘেরা ছোট্ট উঠোন, উঠোনে খড়ের গাদা,
চারপাশে ফলের গাছ....কৃষকের বাড়ি যেমন হয় আর কি।
খামারবাড়িটার অবস্থান গ্রামের একেবারে শেষপ্রান্তে- বাড়িটাকে
ঘিরে থাকা বার্চগাছের সারির জন্য দূর থেকে দেখা যায় না।
গাছগাছালিতে ঘেরা চমৎকার এক জায়গা, পেছনে মাথা তুলে
রয়েছে সুউচ্চ কার্পেথিয়ান পর্বতমালা। আমাদের ক্যারিজটা বিশাল
খামারবাড়িটার ধনুকাকৃতির ফটকের সামনে দাঁড়াতেই বেশকিছু নারী
পুরুষ এগিয়ে এল আমাদের অভ্যর্থনা জানাতে। মহিলাদের গায়ে
অ্যাপ্রন, স্কার্ট আর ভেড়ার চামড়ার কোট। পুরুষদের পরনে
ঘরে সেলাই করা সুতির প্যান্ট, টিউনিক, খড়ের টুপি আর চামড়ার বুট।
খামারবাড়িটা বেশ সুন্দর - আগাগোড়া কাঠের তৈরি। থাম আর
খিলানগুলোয় সুন্দর নকশা করা। ওপরতলায় খোলামেলা ব্যালকনি,
নিচের উঠোন জুড়ে নানারকম খোঁয়াড়। কি নেই ওতে!
শুকোর, ভেড়া, হাঁস মুরগী.... সবই পোষা হচ্ছে খামারে।
গন্ধে দম আটকে আসার যোগাড়। এই খোঁয়াড়ের জন্যই নষ্ট
হচ্ছে খামারবাড়ির সৌন্দর্য। খামারবাড়ির পেছনে চোখে পড়ল
ফসলি খেত আর ফলের বাগান। ওগুলো গিয়ে মিশেছে গাছপালা
আর ঝোপঝাড়ে ছাওয়া এক পাহাড়ি ঢালে। এমিল জানাল, পাহাড়ের ওই
জঙ্গলটায় নাকি প্রচুর নেকড়ে বাস করে। শুনে বুক ঢিবঢিব করে
উঠল - বুঝতে পারলাম, গন্তব্যের কত কাছে পৌঁছে গেছি আমরা।
খামারের মালিক আর তার স্ত্রী 'র সঙ্গে পরিচয় হলো
আমাদের। দুজনেই খুব অমায়িক। ভাঙা ভাঙা জার্মান ভাষায় স্বাগত জানাল
আমাদের। বিশেষ করে এমিল আর তার মেয়ে ইলিনাকে
দেখে এত খুশী হলো, মনে হলো যেন ওরা তাদের
পরিবারেরই একজন। ওদের হাবভাবে মনে হলো, যেন দু-
রাতের বদলে আমরা এখানে পুরো গ্রীষ্মকালটা কাটিয়ে
গেলেই যেন ওরা বেশী খুশি হবে। জানতে পারলাম সাত
সন্তানের জনক -জননী এরা। তিনটি মেয়ে আর চারটি ছেলে।
মা - বাবার মতো তারাও প্রত্যেকে সহজ সরল আর কুসংস্কারাচ্ছন্ন।
এমিলকে দেখলাম, এদের মাঝে এসে সে খুব প্রাণচঞ্চল
হয়ে উঠেছে, অথচ বুদাপেস্টে এমনটা ছিল না মোটেও।
তবে ইলিনা তার ব্যতিক্রম। ওর চোখেমুখে স্পষ্টত অস্বস্তির
ছাপ। শহুরে মেয়ে, এসব গেঁয়ো লোকজন হয়তো পছন্দ
করছে না মোটেও।
ভাল একটা কামরা পেলাম আমি আর জোনাথন। পরিচ্ছন্ন, প্রচুর
খোলামেলা, আলো বাতাসযুক্ত একটা ঘর। জানলা দিয়ে দেখা
যাচ্ছে আপেল আর চেরি ফলের বাগান, সেইসঙ্গে সবুজ
প্রান্তর। শোনা যাচ্ছে পাখির কলকাকলি। রাতে বেশ জম্পেশ
ডিনারের আয়োজন করেছিল খামার মালিক। আমরাও পেট পুরে
খেয়েছি। ঘুমিয়ে পড়েছে জোনাথন, কিন্তু ঘুম আসছে না
আমার। ডায়েরী খুলে বসেছি দিনলিপি লিখতে। ।। ২৩ শে
জুলাই।।
যাক, শেষ হয়েছে আমাদের অভিযান। দিনটাও কেটেছে ভাল।
বেশ ভোরেই ক্যারিজ নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম আমরা।
স্থানীয় অধিবাসীদের কুসংস্কার সম্পর্কে জানা আছে
আমাদের, তাই খামারের লোকজনকে জানাইনি কোথায় যাচ্ছি
আমরা। ভোরের ফুরফুরে হাওয়া মেখে আমরা বেরিয়ে
পড়লাম। ততক্ষণে সূর্যও উঠে গেছে। নবোদিত সূর্যের
আলোয় সেজেছে প্রকৃতি। দেখে বিশ্বাস করা কঠিন এই
সুন্দর জায়গায় কোনোকালে মূর্তিমান অমঙ্গল রাজত্ব করত।
উপত্যকা থেকে বেরোবার পর বদলাতে শুরু করল দুপাশের
দৃশ্য। নেমে এল নীরবতা। কার্পেথিয়ান পর্বতমালার পাদদেশের
ছায়ায় ঢাকা বনের ভেতর দিয়ে এঁকেবেঁকে হেলে দুলে
এগিয়ে গিয়েছে কাঁচা রাস্তা। যেদিকেই তাকানো যায়, চোখে
পড়ে পাহাড়ের রাজকীয় চূড়া। গিরিখাত দেখতে পেলাম
আমরা....পেরোলাম নুড়িপাথরে ভরা অগভীর স্রোতস্বিনী,
বোরগো গিরিপথ ধরে এগিয়ে চললাম পার্বত্য এলাকার
গভীরে। বলতে দ্বিধা নেই, ধীরেধীরে এক অজানা ভয়
ছেঁকে ধরল আমায়। আমার হাত ধরে রেখেছিল জোনাথন,
কিন্তু ওর দৃষ্টি আটকে ছিল বাইরে। বুঝলাম পুরনো স্মৃতি মনে
পড়ে যাচ্ছে ওর। ব্যাপারটা নতুন নয়, গত ক'দিন ধরেই লক্ষ্য করছি
যাত্রার প্রতিটা পর্যায়ে খুব উদাস হয়ে পড়ছে জোনাথন, আমারও
ধাপে ধাপে মনে পড়ে যাচ্ছিল পুরনো দিনগুলোর কথা। ডাঃ
সিউয়ার্ড যখন আর্থারের হাতে ঘোড়ার রাশ ধরিয়ে দিয়ে
ক্যারিজের ভেতর এসে বসলেন, তখন জোনাথন তাঁকে
উদ্দেশ্য করে বলে উঠল, " কেন আবার আমরা খামোখা
এসবের মধ্যে জড়াতে যাচ্ছি?"
ওর কাঁধে হাত রেখে ভ্যান হেলসিং বললেন, " সাহস রাখো বন্ধু।
তোমার মনের সমস্ত ভয় আর সন্দেহ যে অমূলক, সেটা
প্রমাণের জন্যই তো চলেছি আমরা"। গিরিখাতের সমতল অংশে
পৌঁছলাম আমরা অনেকক্ষণ পর। দু'পাশের পাহাড়ি দেয়াল তখন
অনেকটাই চেপে এসেছে গায়ের ওপর। হিম হিম হয়ে উঠছে
বাতাস- গ্রীষ্মকালীন পরিবেশ পেরিয়ে পাহাড়ি এলাকার শীতল
আবহাওয়ায় এসে পৌঁছেছি আমরা। আকাশের সূর্যটাকেও কেমন
ম্লান দেখাতে লাগল। ড্রাকুলার ক্যাসল অভিমুখে পরিত্যক্ত পথ
ধরে ক্যারিজ ছোটালেন ডাঃ সিউয়ার্ড। ঘন ঘন চাবুকের শব্দ
শুনতে পেলাম। এবড়োখেবড়ো রাস্তায় ঝাঁকি খেতে
খেতে যেন উড়ে চলল আমাদের বাহন। চারপাশের পরিবেশ
আরও নীরব, আরও নিস্তব্ধ হয়ে পড়ল। অজান্তেই গলায়
ঝোলানো ক্রুশটার কাছে উঠে এল আমার হাত। ঢালু পথে
ধীরেধীরে ওপরে উঠতে লাগল ক্যারিজ। জানলা দিয়ে
বাইরে তাকালাম - দেখলাম প্রাণহীন বিরান প্রকৃতি - সাত বছরে
কোনও পরিবর্তন হয়নি। কয়েক ঘন্টা চলার পর আমরা পৌঁছলাম
পরিত্যক্ত সেই এলাকার প্রাণকেন্দ্রে। শুনতে পেলাম
পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা ঝর্নার কুলুকুলু ধ্বনি। হঠাৎ
কোথা থেকে একটা ভয়ঙ্কর গর্জন ভেসে এল। সচকিত হয়ে
উঠলাম আমরা। কিসের ডাক ওটা? কোনও বুনো কুকুরের..... না কি
কোনও হিংস্র নেকড়ের?
ক্রমশ.....
Post: অশুভ আত্মা
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now