নিয়তি "ছোট গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)
X
|| গল্প : নিয়তি ||
১.
- আমি শুধু চাই, লোকটার কপালে ও বুকে পরপর দুটো বুলেট ঢোকাবে তুমি। পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে শুট করবে। বোঝাতে পারছি?
- আমি আমার কাজ খুব ভালোভাবেই বুঝি। নিজের মতো করে, নিজের স্টাইল অনুসারে কাজ করি। আপনার জ্ঞান দরকার হচ্ছেনা। সরি।
- আফজাল… আমি শুধু…
- স্টপ ইট, প্লিজ। আপনি আমার নাম নিচ্ছেন কেন? এই লাইনে ক্লায়েন্টের নাম যেমন উচ্চারন করা নিষেধ, তেমনি হিটম্যানের নামও। এমনকি নিজেদের মধ্যেকার আলোচনাতেও এটা নিষিদ্ধ। আপনি পুরোনো ক্লায়েন্ট এই লাইনে। অনেককে দিয়েই কাজ করিয়েছেন। আপনার অন্তত এই নিয়মটা ফলো করা উচিৎ।
- সরি। আমি যা চাচ্ছিলাম, সেটা করলেই খুশি হবো।
- ওকে। লাশের ক্লিয়ার ভিউ ছবি দেখালেই বুঝবেন, রিকোয়ারমেন্ট ফিলাপ হয়েছে কিনা।
- থ্যাংক্স। তোমাকে কি পুরো পেমেন্ট করতে হবে এখন?
- না। ৭৫% কাজের আগে। বাকিটা পরে দেবেন।
- চেকে নেবে?
- না। ক্যাশ।
- আচ্ছা। কাল আমার ড্রাইভার…
- ওই ভুলটা করবেননা। টাকা আপনি দিয়ে যাবেন ঠিক এই রেস্টুরেন্টেই। আমি সন্ধ্যা ৬ টা ২৫ শে থাকবো।
- ওকে।
- যান। আমি ডিনার করবো। কেউ সামনে থাকলে আমি খেতে পারিনা। আপনার কাজ হয়ে যাবে।
- ওকে। কাল তাহলে দেখা হচ্ছে।
- হচ্ছে।
ক্লায়েন্ট চলে যাওয়ার পর আফজাল ওয়েটারকে ডেকে ফুল প্লেট কাচ্চি আর এক লিটার বোরহানির অর্ডার দিলো। তারপর পকেট থেকে ফোনটা বের করে কিছুক্ষণ আগে শেয়ার ইট দিয়ে নেয়া টার্গেটের ছবিটাতে চোখ বোলাতে লাগলো।
ছবিতে মধ্যবয়সী এক হাসিখুশি মানুষকে দেখা যাচ্ছে। কারো সাথে হাত নেড়ে কথা বলার সময় মানুষটার অলক্ষ্যেই ছবিটা তোলা হয়েছে। এই লোকটার নাম বোরহানুদ্দিন আহমেদ। পেশায় অবসরপ্রাপ্ত ব্যাঙ্কার। ইনিই আফজালের নেক্সট টার্গেট।
আফজাল জানেনা কেন ক্লায়েন্ট বোরহানুদ্দিনের মৃত্যু চায়। জানার আগ্রহও নেই। এই লাইনে কৌতুহল জিনিসটা খুব ঝুঁকিপূর্ণ। আর আফজাল রোবোট টাইপ মানুষ। ওর দরকার পেমেন্ট, আর কিছুনা। সেটা আগামীকাল ক্লিয়ার করলেই বোরহানুদ্দিন সাহেবের মৃত্যু পরোয়ানায় সই হয়ে যাবে।
খাবার চলে এসেছে। ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে আফজাল খাওয়ায় মন দিলো। খাওয়া হলো ইবাদতের মতো। এই সময়ে মনোযোগ বিক্ষিপ্ত হতে দিতে নেই। আফজাল হতে দেয়ওনা।
২.
দুই দিন পর। রাত ১১ টা ৫২ মিনিট। নির্জন প্রায়ান্ধকার গলিটার মাঝামাঝি আফজাল দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে সাইলেন্সার লাগানো স্মিথ & ওয়েসন। সাইলেন্সার থেকে এখনো ধোঁয়া বের হচ্ছে।
আফজালের একটু সামনেই বুক চেপে ধরে বোরহানুদ্দিন আহমেদ পড়ে আছেন। অমানুষিক যন্ত্রণায় অদ্ভুত ভঙ্গিতে সারা শরীর মোচড়াচ্ছে তাঁর। আফজাল খুব কাছ থেকে তাঁর বুকের বামপাশে শুট করেছে। একবারই করেছে।
কিছুটা দূরেই একটা কুকুর ডেকে উঠলো। কুকুরের ডাকে যেন অবস্থানের পরিবর্তন হলো আফজালের। সে ধীরপায়ে এগিয়ে গেলো বোরহানুদ্দিনের দিকে। খুব ঠান্ডা মাথায় নিষ্পলক চোখে তাকালো তাঁর চোখের দিকে। তারপর সাবলীল ভঙ্গিতে স্মিথ & ওয়েসন ধরা ডান হাতটা ওঠালো। সোজাসুজি তাক করলো আতঙ্ক আর যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে থাকা বোরহানুদ্দিনের কপাল বরাবর। স্মিত হেসে টিপে দিলো ট্রিগার। সাইলেন্সার লাগানো থাকায় ধুপ করে শুধু একটা শব্দ হলো। পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে শুট করায় বোরহানুদ্দিন আহমেদের কপালের উপরের অংশ ফাটা তরমুজের মতো হয়ে গেছে। রক্ত আর মগজ ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে। সেই সাথে থেমে গেছে কিছুক্ষণ আগের মোচড়ামুচড়ি।
কাজটা শেষ করে আফজাল পকেট থেকে মোবাইলটা বের করলো। পরপর দুটো ছবি তুললো লাশটার। তারপর ঘুরে হাঁটা শুরু করলো। কুকুরগুলোর ডাক আরো বেড়েছে। সেই সাথে বাড়ছে রাত।
৩.
সেই রেস্টুরেন্ট। সেই ক্লায়েন্ট। খুনের পরের দিন। বিকেল ৫ টা ২১ মিনিট। ক্লায়েন্ট লোকটা চুপচাপ বসে আছে। তার সামনে রাখা কফি ঠান্ডা হয়ে গেলেও কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। ঠিক অপোজিটে বসে থাকা আফজাল যথারীতি নিরুত্তাপ। শুধু মাঝে মাঝে হাসিমুখ নিয়ে পাশে রাখা ছোট ব্যাগটার দিকে তাকাচ্ছে। সেখানে কাজের বাকি ২৬% পেমেন্ট আছে।
নীরবতা সর্বদাই হীরন্ময় না। আর এই কারণেই মৃদু গলা খাকাড়ি দিলো ক্লায়েন্ট। আফজাল অলস ভঙ্গিতে পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে গ্যালারিতে গেলো। সেই বিশেষ দুটো ছবি বের করলো আঙ্গুলের স্পর্শে। তারপর মোবাইলটা বাড়িয়ে ধরলো ক্লায়েন্টের দিকে।
ক্লায়েন্ট লোকটা বেশ কিছুক্ষণ আগুপিছু করে ছবি দুটো দেখলো। তারপর সন্তুষ্ট হয়ে ডান হাত বাড়িয়ে দিলো আফজালের দিকে। উদ্দেশ্য হ্যান্ডশেক। আফজাল উপেক্ষা করলো সেই আহবান। বরাবরই করে। ক্লায়েন্ট যা বোঝার বুঝে নিয়েছে। আফজালের সাথে তার সম্পর্কের এখানেই ইতি। দুজনেরই কর্মসাধন সম্পন্ন।
৪.
এক মাস পরের কোন এক বিকেল। সদ্য কৈশোর পেরোনো ছেলেটা রেল লাইনের ধারে বসে আছে। দুই আঙ্গুলের ফাঁকে ধরা অর্ধেক শেষ হওয়া সিগারেটটার ব্যাপারে সে বিস্মৃত হয়েছে। ঘনঘন নিশ্বাস পড়ছে তার। হ্যাঁ, আজই কাজটা করবে সে। তাকে করতেই হবে। ট্রেন আসার সময় প্রায় হয়েই গেছে। সিগারেটটা একপাশে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে লাইনের আরো কাছে সরে এলো ছেলেটা। শুয়ে পড়লো। মাথাটা লাইনের ওপরে রেখে শরীরটা রাখলো লাইনের বাইরের ঢালু জায়গায়।
লাইনটা হালকা কাঁপছে কি! হ্যাঁ, তাইতো! কাঙ্ক্ষিত ট্রেন আসছে। একটু ভয় ভয়ও লাগছে ছেলেটার। এইতো আর কিছুক্ষণ। তারপরই সব জ্বালাযন্ত্রণা থেকে মুক্তি। এই ভেবে নিজেকে সাহস দিচ্ছে ছেলেটা।
ওই তো! ট্রেনের ভেঁপু শোনা যাচ্ছে। লাইনের লৌহ কাঁপুনি এবার ভালোভাবেই শোনা যাচ্ছে। চোখ বুঁজে ফেললো ছেলেটা। বড় করে একটা নিশ্বাস নিলো। বুঝতে পারছে ট্রেনটা অনেক কাছাকাছি চলে আসছে… আর একটু… আর একটু… তারপরই… আহা…
হঠাৎ দুই পায়ে হ্যাঁচকা টান অনুভব করলো ছেলেটা। লাইনে রাখা মাথাটা সেই টানে এক ঝটকায় নিচে নেমে এসে বাড়ি খেলো কাঠের পাটাতনের সাথে। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই দানব ট্রেনের ইঞ্জিন বগিটা চলে গেলো ঠিক যেখানে সে কিছুক্ষণ আগে মাথা রেখেছিলো সেই লাইন দিয়ে।
ওই অবস্থাতেই কে যেন ছেলেটার কলার ধরে তাকে বসিয়েই কষে পরপর দুটো চড় লাগালো গালে। কিছুক্ষণ আগে মাথায় পাওয়া ব্যথা, মানসিক ধাক্কা আর চড়ের ডোজ নিতে পারলোনা সে। জ্ঞান হারিয়ে ঢলে পড়লো চড়দাতার কোলে।
৫.
আফজাল খুবই বিরক্ত বোধ করছে। যেচে একটা ঝামেলাকে ঘাড়ে তুলে নিজের ওপরেই বিরক্ত সে। আজ বিকেলে এক ক্লায়েন্টের সাথে দেখা করে আসার সময় রেল লাইনের নির্জন এলাকা দিয়েই ফিরছিলো সে। হঠাৎ দেখে এক গাধা আত্মহত্যা করার জন্য লাইনে মাথা রেখে শুয়ে আছে। এদিকে ট্রেনটাও অনেক কাছাকাছি এসে পড়েছে। নিজের মধ্যে তখন কিসের উথালপাথাল হয়ে গেছিলো জানেনা আফজাল। অতিমানবের ক্ষিপ্রতায় সে দৌড়ে গিয়ে ছেলেটার পা ধরে টান মেরে তাকে লাইন থেকে নিচে নামিয়ে এনেছিলো। তারপর গাধাটা অজ্ঞান হয়ে যায়। ফেলে রেখে আসলেও হতো। তা না করে তাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিজের দুই রুমের বাসায় এনে তুলেছে। ছেলেটা আফজালের বিছানায় এই মুহূর্তে ঘুমাচ্ছে। শরীর পুড়ে যাচ্ছে জ্বরে। আফজাল বিমর্ষ মুখে ঈর দিকে তাকিয়ে আছে।
ছেলেটা একটু কেশে উঠলো। বসে থাকতে থাকতে আফজালের তন্দ্রার মতো এসেছিলো। সেটা ছুটে গেলো। ছেলেটা ধীরে ধীরে উঠে বসলো বিছানায়। আফজালের দিকে সরাসরি তাকালো।
- পোলাপান মানুষ আত্মহত্যা করতে গিয়েছিলে কেন?
- আপনাকে বলবো কেন?
- আমাকে বলবে। কারণ, আমি না থাকলে এতোক্ষণ তোমার মাথা থ্যাঁতলানো লাশ ওই রেল লাইনেই পড়ে থাকতো। আর তুমি প্রেতলোকে ঘোরাঘুরি করতে।
- আমাকে বাঁচিয়ে আপনি ভালো করেননি।
- চড় দুটোর কথা ভুলে গেছো? আবার দেবো দুটো?
কথাবার্তার এই পর্যায়ে ছেলেটা বিছানা থেকে নেমে কিছু দূরে একটা তেপায়ার উপরে রাখা পানির জগের দিকে গেলো। জগটা তুলে ঢকঢক করে অনেকটা পানি খেলো। তারপর এসে আবারো বিছানায় পা তুলে বসলো। তারপর তাকালো আফজালের দিকে।
- এ জীবনের ওজন আমি আর টানতে পারছিলামনা। তাই আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলাম।
- কতোই বা বয়স তোমার! এর মাঝেই জীবন সম্পর্কে সবটা জেনে বসে আছো!
- আমি কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি।
- প্রেমে ছ্যাঁকা খেয়ে আত্মহত্যা করতে যাচ্ছিলে?
- না। বাবা খুন হবার পর সৎ মা আর তার ভাই অত্যাচারের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছিলো। এমনিতেই মেন্টাল শকের কারণে পড়াশোনা চাঙ্গে উঠেছিলো। ওটা হতোওনা। বেঁচে থেকে অত্যাচার সহ্য করার মানে হয়না।
- তোমার বয়সী ছেলেরা বড় হওয়ার সাথে সাথে পুরুষ হয়ে ওঠা শেখে। আর তুমি কাপুরুষের মতো আত্মহত্যা করতে গেলে। ছি!
- দেখুন… ওফ! আপনার নামটাই তো জানিনা।
- নাম না জানলেও চলবে তোমার।
- আপনি নাম না বললেও আমি বলবো আমারটা। আমার নাম মঞ্জুর আহমেদ। ডাকনাম জিমি।
- তোমার বাবা কিভাবে খুন হন?
- কে বা কারা তাঁকে আমাদের বাড়ির পাশেরই এক গলিতে শুট করে ফেলে রেখে চলে যায়।
- তোমার বাবার নাম কি বোরহানুদ্দিন আহমেদ? উনি কি রিটায়ার্ড ব্যাঙ্কার ছিলেন?
- হ্যাঁ। আপনি আমার বাবাকে চিনতেন?
জিমি নামের ছেলেটার এই প্রশ্নের কোন উত্তর দিলোনা আফজাল। সে নিয়তি নামের রহস্যময় ম্যাজিকটার কথা ভাবছে এখন। সামনে বসে থাকা ছেলেটার বাবাকে সে-ই খুন করেছে। অথচ নিয়তি আজ তাদেরকে মুখোমুখি করেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পরিস্থিতিতে। একে ম্যাজিক ছাড়া আর কি বলা যায়!
হঠাৎ করেই ছেলেটার প্রতি প্রবল একটা মায়া বোধ করলো আফজাল। এই অনুভূতির সাথে সে সেভাবে কখনোই পরিচিত ছিলোনা। সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে স্মিত হেসে সে জিমি'র দিকে তাকালো।
- জিমি, তুমি নিয়তি বিশ্বাস করো?
- হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন?
- না, এমনিতেই। তোমার যদি কোন অসুবিধা না থাকে, তুমি আমার বাসায় থাকতে পারো। কোন সমস্যা হবেনা আমার। আমি একা মানুষ।
- আপনাকে ধন্যবাদ। নামটা…
- আমার নাম আফজাল। আফজাল হোসেন। তোমাকে একটা কথা বলি। আমার কাজ নিয়ে কখনো কোন আগ্রহ দেখাবেনা। ঠিক আছে?
- আচ্ছা।
- সারাদিন তো কিছু খাওনি। জ্বর কমেছে? ক্ষুধাবোধ হচ্ছে?
- হ্যাঁ।
- চলো, বাইরে যেতে হবে খেতে। আমি রান্নাবান্নার ঝামেলায় যাইনা। বাইরেই খাই।
- চলুন।
পরিশিষ্ট...
পাশাপাশি দুজন মানুষ হেঁটে যাচ্ছে। স্বাভাবিক ভাবে তাদের পাশাপাশি হাঁটার কথা না। কিন্তু সবচেয়ে বড় ম্যাজিশিয়ানের ম্যাজিক, যাকে আমরা নিয়তি বলি সেটার ক্ষমতাও অবহেলা করার মতো না। তারা হাঁটতে থাকুক। নিয়তি তাদেরকে কোথায় নিয়ে যায় সেটা জানতে হলেও তাদেরকে হাঁটতে হবে।
© শুভাগত দীপ
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now