বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

তির্যক

"ছোট গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X || গল্প : তির্যক || ১. মুহিব নামটা যতোটা সুন্দর, মুহিব ছেলেটাকে সে হিসাবে সুন্দর বলা যায়না। না, হাইট বা গায়ের রঙ নিয়ে কোন কথা হচ্ছেনা। সমস্যাটা মুহিবের চোখ নিয়ে। মুহিব ট্যারা। লক্ষ্মীট্যারা না, এটাকে নারায়ণট্যারা বলাই বেশি যুক্তিযুক্ত। তার চোখের মণিদুটোর অবস্থান বেশ অদ্ভুত। দুটো দুই কোণে। হুট করে কেউ ওর চোখের দিকে তাকালে অস্বস্তিতে ভুগবে। মুহিব কোন দিকে তাকিয়ে আছে বা তার ফোকাস পয়েন্ট কোথায় সেটা তার চোখের মুভমেন্ট দেখে বোঝা অসম্ভব। এহেন মুহিবের সাথে যখন সোসাইটির সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েটার প্রেম হয়ে যায়, সেটাকে ন্যাচারাল বলার উপায় থাকেনা। আবার টিপিক্যাল ঈর্ষাকাতর বাঙ্গালী মানসিকতা এই প্রেমকে সুপারন্যাচারাল বা ডিভাইন বলেও স্বীকার করতে চায়না। অদ্ভুত এই গল্পটার শুরু এক বৃষ্টিভেজা বিকেলে। ট্যারা হোক আর যাই হোক, মুহিব ছেলেটা একেবারে মাটির মানুষ। তাদের এই সোসাইটির প্রত্যেকটা ফ্ল্যাটের সবাই ওকে একজন পরোপকারী ছেলে হিসেবেই চেনে। ছাত্র হিসেবেও ভালো। এমবিএ শেষ করে চাকরি করেনি। বাবা'র বিশাল টায়ার টিউব ইন্ডাস্ট্রি। ইচ্ছে হলে মাঝে মাঝে অফিসে যায়, না হলে বাসাতেই বইপত্র পড়ে আর মুভি দেখে সময় কাটিয়ে দেয়। কোন বাজে নেশাও নেই। নিজের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে মুহিব সম্পূর্ণ সচেতন। যে কারণে বন্ধুবান্ধবের তালিকাও স্বাভাবিকভাবেই ছোট। সোসাইটিতে যখন অবসরপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক রেজাউল করিম সাহেব তাঁর একমাত্র কন্যা এলাকে নিয়ে এলেন, ঠিক তখন থেকেই মুহিব কিছুটা পালটে গেলো। প্রেম ট্রেম জাতীয় বিষয়াদি নিয়ে মুহিবের কখনোই কোন আগ্রহ ছিলোনা। আর সেটার পেছনে অনেকাংশে নিজের ট্যারা চোখ দুটোর ভূমিকা আছে, এটাও অস্বীকার করা যায়না। সেভাবেই চলছিলো। এলাকে তার প্রথম দিন থেকেই ভালো লাগতো। ভালো লাগবে না-ই বা কেন! অপ্সরী বোধহয় একেই বলে! মেয়েটার আশেপাশে ঘোরাঘুরি করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো মুহিবের দৌড়। কখনো ছাদে, কখনো রাস্তায় - এইটুকুই। সেই বৃষ্টিভেজা বিকেলে যদি এলাই মুহিবের সাথে যেচে কথা না বলতো, তাহলেই কোন কিছু পাল্টাতো না। অন্যান্য বাদলদিনের মতোই সেদিনও ছাদে উঠেছিলো মুহিব ভেজার উদ্দেশ্যে। সেখানেই এলার সাথে প্রথম আলাপ। সে এসেছিলো শুকাতে দেয়া কাপড় নিতে। কিন্তু বৃষ্টির প্রতি হঠাৎ জন্মানো প্রেম তাকেও ফিরতে দেয়নি। এলা সেদিন মুহিবের ট্যারা চোখদুটো দেখে হেসে উঠেছিলো। আর সেদিনই জীবনের প্রথম মুহিব নিজের সীমাবদ্ধতাটা নিয়ে লজ্জিত হয়েছিলো। ঈশ্বর নাকি মানুষকে কিছু না কিছু হাত খুলেই দেন। মুহিবকেও দিয়েছেন। তার চোখ দুটো ট্যারা হলেও কণ্ঠস্বর দারুন! আর এই কণ্ঠস্বরের জাদুতেই হয়তো, এলা নিজেই তার নাম্বার চেয়ে নেয়। সেদিনের পর থেকে নিয়ম করে মুহিব ও এলার মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে ফোনালাপ চলতে থাকে। মাঝে মাঝে একসাথে হাঁটতেও দেখা যায় ওদের। যে মুহিব কখনো নিজের ট্যারা চোখ ঢাকার কোন চেষ্টাই করেনি, তাকেও তখন রে-ব্যান এভিয়েটর সানগ্লাস পরে হাসিমুখে চলাফেরা করতে দেখা যেতো। ২. বাঙ্গালী অতি উৎসাহী জাত। মুহিব বা এলার মাঝে আর যাই থাকুক, আয়োজিত কোন প্রেম কখনোই ছিলোনা। যেহেতু সোসাইটির অনেকেই জানলো মুহিব ও এলা পরস্পর ফোনালাপ করে থাকে, একসাথে বেড়িয়ে থাকে, সেহেতু তারা সিদ্ধান্তে এলো 'ট্যারা' পোলার সাথে সুন্দরী মাইয়াটার প্রেম চলছে। পোলার বাপ যেহেতু টাকার কুমীর, মাইয়া তাকে ফাঁসাচ্ছে। কোন একক মানবমনের ওপর একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মতামত বা চিন্তাধারা বেশ ভালোই প্রভাব ফেলে। মুহিবের ওপরেও ফেললো। মুহিব আশেপাশের লোকের আলোচনায় প্রভাবিত হয়ে অবচেতনভাবেই এলার প্রেমে পড়ে গেলো। কিন্তু এলা নিজ স্থানে অনড়। মুহিব তার ভালো একজন বন্ধু ছাড়া কিছুইনা। হ্যাঁ, সে রাত দেড়টায় কল দিলে মুহিবকে তার সুকণ্ঠ দিয়ে তাকে বিনোদিত করতে হবে। সে ফুচকা খেতে চাইলে তাকে জলাবদ্ধ রাস্তা পার হয়ে ফুচকার ব্যবস্থা করতে হবে। দরকার প্রয়োজনে মাঝে মাঝে তাকে অফেরতযোগ্য ধারও দিতে হবে মুহিবের। এই সবই এলার বন্ধুত্বের সংজ্ঞা। ৩. প্রকৃতি বাড়াবাড়ি পছন্দ করেনা। এলা বাড়াবাড়ি করে ফেললো। এক বিকেলে সোসাইটির পার্কে মুহিব ও এলা হাঁটছিলো। এলা বকবক করে যাচ্ছিলো আর মুহিব ওর গ্লাসের ফাঁক দিয়ে মুগ্ধ দৃষ্টিতে এলার দিকে তাকিয়ে ছিলো। বরাবরের মতোই। বিপত্তিটা ঘটলো কিছুক্ষণ পর। এলার এক বান্ধবী এসে ওদের সাথে যোগ দিলো। মুহিবের সাথে ওর কোন পরিচয় ছিলোনা। বাড়াবাড়িটা এলা করলো পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে। মুহিবকে নিজের ভালো একজন বন্ধু বলার সাথে সাথে এটাও বলাটা দায়িত্ব মনে করলো যে সে একজন বিশিষ্ট ট্যারা। শুধু তাই না বাড়াবাড়ির চূড়ান্ত করলো মুহিবকে ওর রে-ব্যানটা খুলতে জোরাজুরি করে। মুহিব স্বাভাবিকভাবেই আর নিতে পারছিলোনা। চলে গিয়েছিলো একবারো পেছনে না ফিরে। আর পেছন ফিরে তাকালেই বা কি! দেখতে পেতো দুই বান্ধবীর বিনোদিত হাসিমুখ। ৪. এই ঘটনার পর এলা মুহিবকে এড়িয়ে চলা শুরু করলো। বোকা মুহিব ভাবলো, হয়তো এবার দ্বিধা ঠেলে সরিয়ে মনের কথাটা এলাকে বলে দেয়াই ভালো। স্মার্টফোনের যুগেও সে রাত জেগে সাড়ে ছয় পৃষ্ঠার একটা চিঠি লিখে ফেললো। বাড়ির কাজের মেয়েকে দিয়ে সেটা পাঠালো এলাদের ফ্ল্যাটে। দুর্ভাগ্যবশত, চিঠিটা এলার হাতে না পড়ে পড়লো তার বাবার হাতে। ভদ্রলোক পুরো চিঠিটা মোট তিনবার পড়লেন। তারপর এলেন মুহিবের বাবার সাথে দেখা করতে। মুহিবের বাবা ব্যবসার কাজে মালয়েশিয়া ছিলেন বলে তাঁর সাথে দেখা হলোনা এলার বাবার। তবে ঘটনার নায়কের সাথে ঠিকই মোলাকাত হয়ে গেলো। ভদ্রলোক শান্ত ভঙ্গিতে মুহিবকে বোঝালেন যে এটা কোনক্রমেই সম্ভব না। আর এলা আরেকজনের বাগদত্তা। ছেলে আমেরিকাপ্রবাসী। ভদ্রলোকের বাল্যবন্ধুর ছেলে। এই বছরের শেষেই বিয়ে হবে। ভদ্রলোক বিস্মিত হলেন এই ভেবে যে, এলা মুহিবকে ব্যাপারটা কেন জানায়নি। তিনি মুহিবের কাছ থেকে বিদায় নিলেন বেশ নিশ্চিন্ত হয়েই। কারণ, মুহিব তাকে এনশিওর করেছিলো এই ব্যাপারে আর এগোবেনা বলে। তবে মুহিব কথা রাখেনি। এক বিকেলে এলাকে ছাদে পেয়ে তার হাতে একটা চিরকুট ধরিয়ে দিয়েছিলো। এলা তাকে সামনে দাঁড় করিয়ে রেখেই সেটায় চোখ বোলায়। চিরকুটে লেখা ছিলো - 'ব্যাপারটা অনেকটা তোমারে বধিবে যে, গোকুলে বাড়িছে সে কথাটার মতো। তাইনা এলা? মানে, আমেরিকার কোন একটা শহরে একজন বাড়ছেন তোমাকে বিয়ে করবেন বলে। আমাকে সবটা বললেও পারতে।' এলার সুন্দর মুখটা ঘামে ভিজে যাওয়া দেখে মুহিব হেসেছিলো। যা বোঝার, বুঝে ফেলেছিলো সে। চোখ থেকে রে-ব্যানটা খুলে মেঝেতে ফেলে তাতে পা মাড়িয়ে চলে গিয়েছিলো মুহিব। ৫. তিন মাস পর ডিসেম্বরের এক শীতের রাতে এলা ও আমেরিকাপ্রবাসী ছেলেটার বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের পরপরই এলাকে নিয়ে ছেলেটা পাড়ি জমায় তার নিজের আলয় নিউ ইয়র্কে। ভালো কথা, ছেলেটার নাম মুবিন। কি অদ্ভুত না! মুহিব-মুবিন, মুবিন-মুহিব! এর অল্প কিছুদিনের মধ্যেই মুহিব মিডল ইস্টে চলে যায় তার বাবার এক বন্ধুর মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে জব করতে। সে আর কখনো এলার খোঁজ নেয়নি। রোবটে পরিণত হয় সে। রক্তমাংস দিয়ে গড়া রোবট। যার ধ্যানজ্ঞানই হলো কাজ। ট্যারা চোখ দুটো আর কখনোই ঢাকার চেষ্টা করেনি সে। কখনোই না। পরিশিষ্ট... এলা আর মুবিনের বিয়ের ছয় মাস পর। ইদানীং সারারাত এলা এক ফোঁটাও ঘুমাতে পারেনা। ভয়াবহ এক ইনসমনিয়ায় ভুগছে সে। কারণটা হলো মুবিন। মুবিনের চোখদুটো গতো মাস তিনেক থেকেই কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে। মণিদুটো যেন স্বাভাবিক স্থান থেকে সরে যাচ্ছে। বেশ কয়েকজন চক্ষু বিশেষজ্ঞ দেখালেও এখনো কোন কাজ হয়নি। অক্ষিকোটরের মাঝের চোখ দুটো যেন ঠিক মুবিনের না। ট্যারা হতে থাকা চোখদুটো ওর হতে পারেনা। তবে এমন চোখ এলার চেনা। বেশ ভালোভাবেই চেনা। ©শুভাগত দীপ


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১২০০ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now