বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
"কিছু ভুলের শান্তনা হয় না "
___হৃদয় মাহমুদ।
-
-
-
তখন মোবাইল ফোন গুটিকয়েক লোকের হাতে ছিলো, তাও হাতে গোনা। একগ্রামে কতজন লোকের কাছে মোবাইল ফোন আছে সবাই বলে দিতে পারতো। রাস্তা দিয়ে কেউ যদি মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে হেঁটে যেতো হৈ চৈ শুরু হয়ে যেতো। সবাই তার দিকে অপলকে চেয়ে থাকতো, একে অপরকে বলতো "দেখো দেখো লোকটার হাতে মোবাইল ফোন "। মোবাইল ওয়ালা লোকটার কত যে দাম ছিলো যেখানে সেখানে। বিশেষ করে যারা প্রবাসে থাকতো তারা আসার সময় একটা মোবাইল নিয়ে আসতো। অন্যরাতো একটু ধরে দেখলেই খুশি, কথা বলতে পারলেতো ঘন্টাখানেকের গল্প বলে পেলতো। বিয়ের জন্য পাত্র দেখতে আসলে বলতো "ছেলের একটা মোবাইল ফোন আছে "। সেই সময়ে রানার হাতে ছিলো একটা মোবাইল। তাই রানা ছিলো অনেক দামী পার্সন। মোটামুটি সবার নজর কাটতো শুধুমাত্র একটি মোবাইলের কারনে। তবে তার মোবাইল ছাড়াও আরো গুন ছিলো দেখতে সুন্দর, স্মার্ট, মিষ্টিকণ্ঠা কিন্তু বেশি শিক্ষিত নয়।
.
একদিন হঠাৎ করেই একটি অপরিচিত নাম্বার থেকে একটা কল আসলো। ধরতেই কেটে গিয়ে মিস কল হয়ে গেলো। রানা নাম্বারটা দেখে ভাবতে থাকলো কার হতে পারে? কিন্তু না চেনে না, তাই সে ব্যাক মিস কল দিলো। কল রেট ছিলো খুব বেশী তাই ব্যাক করা যাবে না। রানার মিস কলের রিপ্লাই আবার মিস কল আসলো। এভাবে মিস কল খেলতে খেলতে একদা রানাকে ম্যাসেজ করলো "আপনি কে মিস কল দেন কেনো "? রানা রিপ্লাই ম্যাসেজ দিলো "আপনি কে, আপনিওতো মিস কল দেন। তাছাড়া আপনি প্রথমে আমাকে মিস কল দিয়েছেন "? রং নাম্বার থেকে দুজনের মধ্যে ম্যাসেজিং হতে লাগলো বেশ কিছুদিন একজন বললো আপনি আগে দিয়েছেন আবার অন্যজন বলছে না আপনি আগে দিয়েছেন। ঠিকানা জিজ্ঞেস করলে জানতে পারলো রানা যেখানে থাকে সেখান থেকে অনেক দূরে, প্রায় একশত কিলোমিটার দূরে। নাম বলেছে সিনথিয়া। মেয়ের নাম শুনার পর রানার মনে কৌতুহল জন্মালো সত্যি মেয়ে কিনা জানতে হবে? এটাই স্বাভাবিক যে ছেলের প্রতি মেয়ে কিংবা মেয়ের প্রতি ছেলের একটা অশরীরী টান অনুভূত হয়। একে অপরের প্রতি একটা আকর্ষনের জন্ম নেয়। অদেখাতে এটার শক্তি আরো কঠিন। রানার মনের মধ্যে নানান প্রশ্ন ঘুরপাক খেলো, কল করলেই বুঝতে পারবে সত্যিকারের মেয়ে কিনা, ছোট বা বড় কিনা, বিবাহিত বা অবিবাহিত কিনা, শিক্ষিত বা অশিক্ষিত কিনা? এতকিছু ভেবে রানা কল ব্যাক করার পর চুপচাপ শুনে রইলো ভয়েজ শুনার জন্য, যদি ছেলে হয় কথা বলে উঠলেই বুঝতে পারবে তখন ফোনটা এক চাপেই কেটে দিবে ভেবে রেখেছে। রানার পা কিন্তু ভুমিকম্পনের মত কাঁপছিলো ভয়ে। যেইনা ফোনের অপর প্রান্ত থেকে মেয়েলী কণ্ঠে হ্যালো বলে উঠলো সত্যি সত্যি ভয়ে কেটেই দিলো। কারন বুড়ো আঙ্গুলটা ফোনের লাল বাটনের উপরে রাখা ছিলো, তাই হতভম্ব হয়ে কেটে দিলো। মেয়ে নিশ্চিত হয়ে আবার ফোন দিলোঃ
__(মেয়েটি রিসিভ করেই) হ্যালো রানা বলছেন?
__জি আমি রানা। আপনি সিনথিয়া?
__হ্যাঁ আমি সিনথিয়া। প্রথমে কেটে দিলেন কেনো?
__কই নাতো কাটিনি। এমনিই কেটে গেছে।
__আচ্ছা যাই হোক। আপনি কি করেন?
__(রানা কিছুক্ষণ চুপ থেকে) আমি ব্যবসা করি।
__কিসের ব্যবসা করেন?
__গাড়ির পার্টস এবং আমার নিজস্ব পাঁচটা হাইস গাড়ি আছে।
__ও ভালোই তো। আপনিতো অনেক টাকার মালিক!
__কই আর টাকা সব মিলিয়ে দুই কোটি হবে আর কি!
__এটাকে অল্প বলছেন?
__অল্পই তো।
__আপনি একজন কোটিপতি মানুষ। পড়াশুনা করেছেন?
__তেমন করিনি সুযোগ পাইনি ব্যবসা নিয়ে পড়ে আছি। শুধু আমার কথা শুনবেন, আপনার কথা শুনাবেন না?
__অবশ্যই। আমি ডিগ্রি কমপ্লিট করেছি। আমার বাবা একজন ডাক্তার আর ভাইয়া ট্রিপল E করে লন্ডনে আছেন।
এভাবে দুজনের মধ্যে নিয়মিত কথা হতো। দুজন দুজনকে নিয়ে ভাবনার অন্ত ছিলো না। কথা বলার আগে ভেবেছে সত্যি মেয়ে কিনা? আর কথা বলার পরে ভাবতে থাকলো "দেখতে কেমন হবে, লম্বা নাকি খাটো হবে, হিরো হবে কিনা, মোটা নাকি চিকন হবে, আমাকে পছন্দ করবে কিনা ইত্যাদি ইত্যাদি "।
.
কথা বলতে বলতে এক ধরনের ভাবের জন্ম হলো, একে অপরের প্রতি আন্তরিকতার সৃষ্টি হলো, দুজনের কৌতুহলের শেষ নেই। দেখার ইচ্ছে জাগলো দুজন দুজনকে দেখবে। তখনতো আর ইন্টারনেট ছিলো না, ফেসবুক বা অন্য কোন ওয়ে ছিলো না যে সরাসরি না গিয়ে দেখতে পাবে। মোবাইলে কোনো মতে কথা বলতে পারতো বড় জোর ফটো তুলতে পারতো। তাই নির্দিষ্ট দিন সময় ঠিক করে নিলো দেখা করবে। রানা ভালোভাবে স্যূট কোট টাই পরে হাইসগাড়ি নিজে ড্রাইভ করে দেখা করতে গেলো। বিলম্ভ হয়নি সিনথিয়াকে পেয়েও গেলো। দুজনই স্মার্ট একে অপরকে খুবই পছন্দ হলো। রানা সিনথিয়াকে নিজের গাড়িতে করে কিছুক্ষণ ঘুরে বেড়ালো। তারপর হালকা খাওয়া দাওয়া করে সিনথিয়াকে বাসায় পৌছে দিলো। তারপর দুজন দুজনকে পছন্দের কথা জানালো। সিদ্ধান্ত নিলো বিয়ে করবে তবে রানার কেউ নেই। অভিবাবক হওয়ার মত তার কেউ নেই সে নিজেই নিজের অভিবাবক। সিনথিয়া সহ তার বাবাকে বুঝিয়ে বিয়ে করে ফেললো। আপাতত দুজনে সিনথিয়াদের বাড়িতেই রইলো। রানা কিছু দিনের মধ্যে নিজের বাড়ির কাজ শুরু করবে। বাড়ি কমপ্লিট হলে এখান থেকে চলে যাবে। শুরু হলো দুজনের সংসার জীবন। প্রতিদিন গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যায় সন্ধা হলে ফেরে। সিনথিয়া তার পার্টসের দোকান দেখবে কোথায়, কেমন চলছে? রানা নিলো না পরে একদিন যাওয়া যাবে বলে এড়িয়ে গেলো। শশুরকেও একই কথা বলে পরে অন্যদিন একসাথে নিয়ে যাবে। রানার পকেট ভর্তি টাকা, অঢেল খরচ দেখে সিনথিয়া মহা খুশি। এরই মধ্যে সিনথিয়া একটা খুশির সংবাদ দেয় যে তাদের ঘরে নতুন মেহমান আসছে, তাদের অনাগত সন্তান। এই খুশিতে মিষ্টি এনে সবাইকে খাওয়ায়। এভাবে প্রায় আট মাস কাটলো। একদিন সকালে বের হওয়ার পর সন্ধায় আর ফিরলো না। মোবাইলও বন্ধ কোনো খোঁজ নেই। রাতটা কেটে গেলে সকালে অনেক জায়গায় খোঁজ নিয়ে দেখলো কোথাও নাই একেবারে নিখোঁজ রানা। থানায় জিডি করলো কিন্তু কোন কাজ হলো না। সিনথিয়ার এই অবস্থা কোথাও বেরি হতে পারলো না, প্রায় এক দেড় মাস হয়ে গেলো কোন খবর নাই। এরই মধ্যে সিনথিয়ার ঘরে একটা ছেলে সন্তান জন্ম হলো।
.
একদিন রানার গ্রামের বাড়ির ঠিকানা নিয়ে কোন মতে খোঁজ করতে করতে সিনথিয়া রানার বাড়িতে এসে হাজির হয়। তখন তার সন্তানের বয়স দুই মাস। রানার বাড়ির পথে সিএনজিতে আসার সময় রানার মত কাউকে দেখতে পায় সিনথিয়া, লোকটি একটি ভ্যান গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিলো। অবিকল রানার মত দেখতে তবে সিনথিয়া রানাকে এই জায়গায় কল্পনাই করতে পারে না। সেজন্য আর গুরুত্ব দেয়নি। যাইহোক, রানার বাড়িতে গিয়ে রানাকে খোঁজ করতেই বেরিয়ে আসে আসল ঘটনা। ঘটনাটা হলোঃ
রানা প্রকৃতপক্ষে একজন লরির ড্রাইভার। সিনথিয়ার সাথে যা যা করেছে সব মিথ্যা নাটক। সে এক গরিব পরিবারের ছেলে। তারা তিন ভাই সে মেঝো। থাকার মত একটা ঘরও নেই। কোনো রকম দিনাতিপাত করে। গ্রামে বিয়ে করেছে পাঁচ বছর কোনো সন্তান নেই। ড্রাইভিং করে কোনো রকম সংসার চালাতো তবে ছেলে হিসেবে সবাই ভালো জানতো। তাকে সকলে ভালোবাসতো। একদা হঠাৎ করেই রানা উধাও হয়ে গেলো (যখন সিনথিয়াকে বিয়ে করেছে তখন) কোনো খোঁজ খবর ছিলো না প্রায় আট মাস (এই আট মাস সিনথিয়ার কাছে ছিলো)। আট মাস পর গ্রামের লোকেরা খবর পেয়ে ধরে নিয়ে আসে। তারপর থেকে বাড়িতে, কড়া নজরদারীতে কোথাও যেতে পারলো না। তখন সেদিকে ( সিনথিয়াদের পক্ষ থেকে) খোঁজ করতে শুরু করলো সিনথিয়া।
.
মেয়েটা রানার গল্প শুনেতো হতবাক কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা, এই সব কি শুনছে সে। মনে করেছে লোকটা কোথায় গেলো, কোনো দূর্ঘটনা হলো কিনা আর এখন শুনছে আজবগুবি গল্পের মত, একেবারে ভাবনার বাহিরে। তার মুখ থেকে কোনো কথাই বেরুচ্ছিলোনা বোবার মত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সবার কথা শুনছে বাচ্চাটাকে বুকে জড়িয়ে রেখে। এরই মধ্যে রানার আবির্ভাব, জিজ্ঞেস করলে রানা সিনথিয়াকে স্বীকার করা মাত্রই শুরু হলো ঝামেলা। গ্রাম্য ঐতিহ্যবাহী হিসাব-নিকাশ। সিনথিয়া থেকে বাচ্চাটা কেড়ে নিলো, রানাকে একপাশে নিয়ে হালকা পাতলা উত্তম মধ্যমও দিলো। সবার কথা হচ্ছে সিনথিয়া তুমি যেখান থেকে এসেছো সেখানে চলে যাও। রানার বউ আছে সংসার আছে, সে তোমার সাথে কোথাও যাবে না। মেয়েটি এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হলো যে চলে যেতে বাধ্য তবে বাচ্চা ছাড়া সে যাবেই না। সিনথিয়া বুঝতে পারলো রানাকে ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। তাছাড়া সেতো একটা চীট ফটকাবাজ। তাই সিনথিয়ার কথা হলো বাচ্চাটা দিয়ে দিলে চলে যাবে কিন্তু বাচ্চাতো দিবেই না। অতঃপর সিনথিয়া থেকে ব্ল্যাংক স্ট্যাম্পে সাইন নিলো যেনো কখনো সিনথিয়া আর রানার কাছে না আসে, কখনো মামলা মোকদ্দমা না করে এই ভয়ে। সিনথিয়া সাইন দিয়ে দিন শেষে কোলের বাচ্চাটাকে নিয়ে তার আপন ঠিকানায় চলে গেলো। পরবর্তীতে সিনথিয়া আর কখনো রানার খোঁজ নেয়নি এবংকি সিনথিয়ারও কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি।
.
আজকে রানা দুই সন্তানের পিতা এখনো গ্রামেই আছে, শহরে যেতে দেয়নি কেউ। সেই তখন থেকেই ভ্যানে করে স্ক্যারাফ(ফেলে দেওয়া জিনিসপত্র) ব্যবসা করে। এখন আর সেই রানা নাই, ব্রেইনে সমস্যা এসে গেছে, চুলগুলো উঠে গেছে, গায়ে ময়লা, ছেঁড়া জামা কাপড়, কখনো খায় কখনো খায়ও না। স্ক্যারাফ বিক্রি করে কোনো মতে সংসার চালায়।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now