বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

কনকতরী-০৩ (শেষ)

"উপন্যাস" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X আমার স্বপেড়বর ল্যাবরেটরি। ঠেকাতে পারবে না তোমরা কেউ। এবার নিজের একটা বিরাট বাহিনী থাকবে আমার। তোমার দুর্ভাগ্য যে আমার বিজয় দেখে যেতে পারবে না।’ ২৮ ‘প্রলাপ বকছ তুমি, কবীর চৌধুরী। শেষে দেখবে লেজ গুটিয়ে পালাতে হবে তোমাকে।’ থমথম করছে কবীর চৌধুরীর চেহারা। আস্তে করে মাথা দোলাল। ‘আমাকে ঠেকাতে পারবে না দুনিয়ার কেউ। আমি যখন তৈরি হবো তখন মাফিয়াকে মনে হবে বাচ্চা ছেলেদের দল। চাপের মুখে আমার অধীনে চলে আসতে বাধ্য হবে ওরা। সবগুলো অপরাধী সংগঠনের ওপর আধিপত্য স্থাপন করব আমি। শুনে মনে হচ্ছে পাগলের প্রলাপ, রানা? না, রানা, আমি যা বলছি তা বছর পাঁচেকের মধ্যেই ঘটবে। কে কে-এর নাম শুনলে পাতলা পায়খানা করে দেবে যেকোন দেশের পুলিস।’ চুপ করে আছে রানা, দৃষ্টি দেখে মনে হচ্ছে সামনে ভিনগ্রহের আজব প্রাণী দেখছে। কোনও মন্তব্য করল না। আবার শুরু করল কবীর চৌধুরী। ‘ডোনা ডানের কাছ থেকে কি জেনেছ তুমি, রানা?’ শ্রাগ করল রানা। ‘জানতে আর পারলাম কই, তার আগেই তো ওকে খুন করালে।’ ‘খায়রুল বেশ মুষড়ে পড়েছে,’ স্বগতোক্তি করল কবীর চৌধুরী। ‘ওর ইচ্ছে ছিল নিজের হাতে ডাইনীটাকে শেষ করবে।’ চুপ করে আছে রানা। একদৃষ্টিতে রানাকে দেখছে কবীর চৌধুরী, যেন ওর ভেতর দিয়ে দূরে কোথাও তাকিয়ে আছে। কিন্তু রানা একটু নড়তেই পিস্তলটা ওর বুক অনুসরণ করল। অধৈর্য বোধ করছে রানা। সময় বয়ে যাচ্ছে। আর কিছুক্ষণ পর সোহেলের সঙ্গে যোগাযোগের কথা। যোগাযোগ না হলে সোহেল বুঝে নেবে বিপদে পড়েছে ও। অবশেষে ডেস্কের একটা বোতামে চাপ দিল কবীর চৌধুরী। ভারী ওক কাঠের দরজাটা খুলে গেল, ভেতরে ঢুকল জোসেফ ক্যালডন, হাতে রিভলভার, তাক করে রেখেছে রানার দিকে। ‘ওকে বাইরে গার্ডের হাতে দিয়ে এসো,’ বলল কবীর চৌধুরী, ‘তোমার সঙ্গে কথা আছে।’ ‘জ্বী, স্যার!’ খটাস করে পা ঠুকল ক্যালডন। রানাকে হাতের ইশারায় দরজার দিকে এগোতে বলে পাশে সরে দাঁড়াল। বাইরে ওকে নিয়ে এসে গার্ডদের দ্রুত স্প্যানিশে কড়া নির্দেশ দিল সে যাতে মুহূর্তের জন্যেও রানার ওপর থেকে অস্ত্র না সরায়। গার্ডরা রানাকে দেয়ালে বুক ঠেকিয়ে দাঁড় করিয়ে দিল। টমিগান তাক করে রাখল ওর পিঠের দিকে। সন্তুষ্ট হয়ে এবার ক্যালডন ফিরল কবীর চৌধুরীর অফিস ঘরে, ভেতরে ভেতরে কাঁপছে সে, ঘামছে দরদর করে। কথা না বলে কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকল কবীর চৌধুরী, তারপর লোকটাকে অস্বস্তির চরমে পৌঁছে দিয়ে জানতে চাইল, ‘কতদিন হলো তুমি আমার কাজ করছ, ক্যালডন?’ ‘প্রায় দু’বছর, স্যার।’ ‘হুম। ঠিক বলেছ। এরমধ্যে কতবার তোমাকে আমি ক্ষমা করেছি, ক্যালডন?’ ‘আমি...মনে নেই, স্যার।’ ‘এত বেশি বার যে মনে থাকার কথাও নয়।’ ভ্রƒ কোঁচকাল কবীর চৌধুরী। ‘মাতলামো, গায়ে পড়ে গোলমাল, না বুঝে কাজ করে বসা...তবে তোমার শেষের কাজটা আর সবকিছুকে ছাড়িয়ে গেছে।’ ঘামছে ক্যালডন। জিভ দিয়ে শুকনো ঠোঁট ভিজাল। ‘আমি ঠিক বুঝছি না, স্যার, আপনি কি বলতে চাইছেন।’ স্কুল পালানো বাচ্চাকে অভিভাবকরা যেচোখে দেখেন সেভাবে তাকে দেখল কবীর চৌধুরী, আস্তে করে মাথা নাড়ল। ‘ক্যালডন, ক্যালডন, মিথ্যে বলে কোনও লাভ নেই। ওই মেয়েটা, কোরা ল্যানযস; ওকে আমি ডেকে আনিয়েছি। শুনলাম রানাকে হাতের মুঠোয় পেয়েছিলে তুমি, তোমার হাত ফস্কে বেরিয়ে গেছে সে। সেজন্যে তোমাকে আমি ক্ষমা করতে পারি, কারণ তোমার জানার কোনও উপায় ছিল না সে কে, কিজন্যে এসেছে। তাছাড়া আমার এলাকায় কোনও ঝামেলা না করার নির্দেশটাও তোমার স্বপক্ষে যায়। কিন্তু মিথ্যে বলেছ তুমি, ক্যালডন। রিপোর্ট করোনি। আবার মদ খেতে শুরু করেছিলে। এখনও তুমি মদ খেয়ে এসেছ। মদ পেলে আর হুঁশ থাকে না, না?’ অনেকবার কোর্ট মার্শালের মুখোমুখি হয়েছে ক্যালডন আর্মি-জীবনে। কয়েকবার তাকে পদচ্যুত হতে হয়েছে। কিন্তু প্রত্যেকবারই নেশা কাটলে পদ ফিরে পেয়েছে সে, কারণ সে ছিল সত্যি ভাল যোদ্ধা। কোর্ট মার্শালের ব্যাপারে যথেষ্ট অভিজ্ঞতা আছে তার। মাঝে মাঝে অফিসারদের হাতে নিঃশর্ত আÍসমর্পণ সুফল বয়ে আনে। মনে মনে কোরা ল্যানযসকে অভিশাপ দিয়ে পতিতাদের দোজখে নিয়ে ফেলল ক্যালডন। তীরে নেমেই মেয়েটা অন্ধকারে সটকে পড়ল। সরাসরি কবীর চৌধুরীর সঙ্গে এসে দেখা করেছে। মরুক হারামজাদী! জুয়াটা খেলবে, সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল ক্যালডন। বুক টানটান করে দাঁড়িয়ে বলল, ‘জ্বী, স্যার, আমি দোষী। লোকটাকে হাতে পেয়েও গণ্ডগোল করে ফেলেছি।’ ‘তুমি রিপোর্ট করলে আমি অন্য পদক্ষেপ নিতে পারতাম। তাহলে আজকে আমাকে দুশ্চিন্তায় পড়তে হোত না।’ ল্যুগারটা ক্যালডনের বুকে তাক করল বৈজ্ঞানীক। ‘বলো, কেন আমি তোমাকে গুলি করব না?’ ‘আমি দুঃখিত, স্যার। এমন ভুল আর কখনও হবে না।’ ফোঁশ করে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল কবীর চৌধুরী। ‘বেশ, ক্যালডন, শেষবারের মত তোমাকে আমি ক্ষমা করে দিচ্ছি। এবার যে দায়িত্বটা দেব সেটা ঠিক মত পালন করতে ভুল কোরো না। রানাকে খতম করে দেবে। তার আগে ওকে মানসিক ভাবে দুর্বল করে তুলবে।’ ঘড়ির দিকে তাকাল চৌধুরী। ‘এক ঘণ্টার বেশি সময় নেবে না। ঠিক এক ঘণ্টা পর আমি শুনতে চাই রানা মারা গেছে। ২৯ যাও।’ স্বস্তিতে ছেয়ে গেল ক্যালডনের বুক। ভেতরে ভেতরে এখনও কাঁপছে সে। হড়বড় করে বলল, ‘ধন্যবাদ, স্যার। এবার আর ভুল হবে না। আমার ওপর ভরসা রাখতে পারেন, স্যার।’ সে দরজার কাছে চলে গেছে, পেছন থেকে কবীর চৌধুরী বলল, ‘মনে রেখো, এটাই তোমার শেষ সুযোগ।’ অস্ট্রেলিয়ান চলে যাবার পর টেবিলে একটা বোতামে চাপ দিল কবীর চৌধুরী, দেয়ালের গায়ে লাগানো একটা বুক শেলফ সরে গেল, পেছনে দেখা গেল ছোট একটা ঘর। ঘরে প্রহরাধীন দাঁড়িয়ে আছে একটি মেয়ে। ‘ওকে আসতে বলো,’ নির্দেশ দিল কবীর চৌধুরী। ধাক্কা দিয়ে মেয়েটাকে সামনে ঠেলল গার্ড। একটা চেয়ার দেখাল বিজ্ঞানী। ‘ওখানে বসো।’ গার্ডের উদ্দেশে বলল, ‘তুমি ওখানেই থাকো। দরকার হলে জানাব।’ আস্তে করে মাথা দোলাল গার্ড, মুখের সামনে বুক শেলফ সরে আসায় তাকে আর দেখা গেল না। স্থির দৃষ্টিতে কোরাকে দেখল কবীর চৌধুরী, মনে মনে ভাবছে মেয়েটা দায়িত্ব পালন করতে পারবে কিনা। দেখা যাক। ‘হাতে বেশি সময় নেই আমার,’ বলল গুরুগম্ভীর স্বরে। ‘তুমি কি এখনও প্রতিশোধ নিতে চাও?’ ‘চাই।’ ঘৃণায় জ্বলজ্বল করছে কোরার দু’চোখ। সবুজ রঙের বিরাট ইউনিফর্মে অদ্ভুত লাগছে মেয়েটাকে দেখতে। ‘রানা মেরেছে তোমার রেমনকে। আর ওর মৃতদেহ দেবার কথা মিথ্যে বলেছে ক্যালডন। দু’জনের ওপরই প্রতিশোধ নিতে চাও?’ ‘চাই। শুয়োর ওরা দুটো।’ ‘তাহলে মন দিয়ে শোনো। মিনিট খানেক পরে একজন গার্ড তোমাকে নিয়ে যাবে। কিছু যন্ত্রপাতি দেবে তোমাকে। ব্যবহার শিখিয়ে দেবে। সহজ কাজ। ট্রিগার টানা ছাড়া আর কিছুই করতে হবে না তোমাকে। কি মনে করো, পারবে?’ চোখের ওপর থেকে চুল সরাল কোরা। ‘আমি পিস্তল চালাতে পারি না, সেনোর। একটা ছুরি হলে...’ ‘পিস্তল চালাতে হবে না তোমাকে। পরে বুঝতে পারবে। খুব সহজ হবে কাজটা। যদি সফল হও তাহলে আমি দেখব পরবর্তীতে তোমার যাতে কোনও অসুবিধে না হয়।’ ‘এক্ষুণি আমি ওদের শেষ করতে চাই।’ বোতামে চাপ দিল কবীর চৌধুরী। গার্ড বেরিয়ে এলো বুক শেলফকে পাশ কাটিয়ে। দ্রুত কণ্ঠে তাকে নির্দেশ জানাল পাগল বিজ্ঞানী। গার্ড আর কোরা চলে যাবার পর ঘড়ির দিকে তাকাল। ক্যালডন যাবার পর মাত্র দশ মিনিট পার হয়েছে। ঠিক সময় মতই ঠিক কাজ হবে, একই সঙ্গে খুন হয়ে যাবে ক্যালডন আর রানা। আস্তে করে মাথা নাড়ল কবীর চৌধুরী। রানাকে মারতে খারাপই লাগছে। লোকটা যোগ্য প্রতিদ্বন্দ¡ী ছিল। ম্যাপের দিকে তাকাল সে। হাইতির জায়গায় একটা বাতি জ্বলে উঠল। হাতে বেশি সময় নেই, অপারেশন শুরু করতে হবে। আশা করা যায় হাইতির অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র নাক গলাবে না। একটা ফোনের রিসিভার তুলে ডায়াল করল সে, সরকারী একজন কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করবে। * পেছনে অস্ট্রেলিয়ান মেজরের বুটের খটখট আওয়াজ শুনতে পাচ্ছে রানা, মুক্তির পথ খুঁজছে, বুঝতে পারছে দ্রুত শেষ হয়ে আসছে সময়। অস্ট্রেলিয়ানের চেহারাই ঘরের ভেতরে কি সিদ্ধান্ত হয়েছে সেটা বোঝার জন্যে যথেষ্ট। দীর্ঘ করিডর ধরে এগিয়ে চলেছে ওরা, তারপর কংক্রিটের একটা র‌্যাম্প ধরে নিচের দিকে এগোল, ভিলার নিচে পৌঁছে যাচ্ছে। করিডর শেষ হয়ে গেছে, শুরু হলো সরু একটা টানেল। ছাদে ঝুলছে কম পাওয়ারের ন্যাংটো বাতি, আবছায়া তৈরি করেছে। ক্যালডনের বুটের নেইল মেঝেতে কট্কট্ আওয়াজ করছে। পেছনে তাকাল রানা। ক্যালডন নিজের কাজ ভাল বোঝে, দশ ফুট পেছনে আসছে লোকটা, ওর আওতার বাইরে। কাঠের একটা দরজার সামনে এসে টানেলটা শেষ হয়েছে। পেছন থেকে ঘেউ করে উঠল ক্যালডন। ‘দরজা খুলে ভেতরে ঢোকো। দরজা খোলাই রাখবে, যাতে আমি তোমাকে দেখতে পাই। কোনও চালাকি নয়।’ নির্দেশ পালন করল রানা, সময় পাওয়ার জন্যে কথা বলতে শুরু করল। ঘরের মাঝখানে থমকে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আমাদের চুক্তির কি হবে? কবীর চৌধুরীকে আমি তোমার ব্যাপারে কিছুই বলিনি।’ প্রতিটি মুহূর্ত এখন গুরুত্বপূর্ণ। একটু বেশি বাঁচা মানেই আÍরক্ষার একটা সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা। হাসল ক্যালডন নোংরা দাঁতগুলো বের করে। ‘দুঃখিত, কোনও চুক্তি হবে না আর তোমার সঙ্গে। কবীর চৌধুরী এমনিতেই সব জেনে গেছে। আমার কপাল ভাল যে ক্ষমা করে দিয়েছে, নাহলে তোমার মত একই পরিণতি হতো আমারও।’ ঘরের ভেতর চোখ বুলাল রানা। আসবাবপত্র বলতে কিছু নেই স্ট্র্যাপ লাগানো ভারী একটা চেয়ার ছাড়া। চেয়ারটার আকৃতি অনেকটা ইলেকট্রিক চেয়ারের মত। কিন্তু তারের কোনও সংযোগ নেই। চেয়ারের পায়ের কাছে জমাট রক্তের কালচে দাগ দেখল রানা। কেউ একজন মুছেছে, কিন্তু পুরো পরিষ্কার করেনি জায়গাটা। ‘চেয়ারটায় বসো,’ নির্দেশ দিল ক্যালডন। বসল রানা। দরজার ভেতরে ঢুকে দু’কদম এগিয়ে থামল ক্যালডন, ভারী রিভলভারটা তাক করল রানার বুকে। জিজ্ঞেস করল, ‘চেয়ারের ইতিহাসটা জানতে চাও?’ ৩০ ‘তেমন একটা কৌতূহল বোধ করছি না,’ জবাব দিল রানা। গলা শুকিয়ে গেছে ওর, বুঝতে পারছে উদ্যত অস্ত্রের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়া ছাড়া বাঁচার আর কোনও উপায় নেই। ‘তবু জেনে রাখা ভাল,’ খুশি খুশি গলায় বলল ক্যালডন। ‘চেয়ারটা এসেছে ভাঙা দুর্গের ডানজন থেকে। স্ট্র্যাপগুলো দেখেছ? ওগুলো দিয়ে বন্দির হাত-পা বেঁধে লোহার একটা কলার পরানো হতো গলায়, আস্তে আস্তে স্লঙঊু টাইট দিয়ে বন্দির শ্বাস রোধ করে মারা হতো। নির্মম ধীর মৃত্যু, কি বলো? তোমার কপাল ভাল যে এক গুলিতে চট করে মরে যাবার সুযোগ পাচ্ছ।’ শরীরের সমস্ত পেশী শিথিল করে দিল রানা, ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে দেহটাকে প্রস্তুত করে নিচ্ছে। পেটের ভেতর শিরশির করছে ওর, বুঝতে পারছে বিরাট ঝুঁকি নিচ্ছে, বাঁচার আশা নেই বললেই চলে। ও মরে যাবে আর সামনে দাঁড়ানো এই লালমুখো মাতাল বাঁদরটা বেঁচে থাকবে ভাবতেই অন্তরে বিতৃষ্ণা অনুভব করল রানা। বুঝতে পারছে লোকটা আর ফুট দুয়েক সামনে থাকলে সুবিধে হতো। মরণ-চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে এক পায়ের ওপর আরেক পা তুলে দিল রানা, ভাব দেখে মনে হলো এখনই চাকরকে ডাক দিয়ে পাইপ আর স্লি-পার আনতে বলবে। ‘বিরাট ভুল করছ তুমি,’ বলল ও। ‘কবীর চৌধুরী তোমাকেও ছাড়বে না। তারচেয়ে আমাকে মুক্ত করে দাও, শেষ পর্যন্ত আমি হয়তো তোমাকে সাহায্য করতে পারব।’ ঘড়ি দেখল ক্যালডন। ‘বলে যাও, মরার ভয় কমবে। আমাদের হাতে আরও বেশ কিছু সময় আছে। কিছু জানতে চাও? জানতে ইচ্ছে করছে না কেন তোমাকে আমি চেয়ারের সঙ্গে বেঁধে শ্বাস রোধ করে মারছি না? আসলে সেজন্যে তোমার কাছে যেতে হবে। সে ঝুঁকি আমি নেব না।’ মুহূর্তের জন্যে রানার মনে হলো ভুল দেখছে ও, পরমুহূর্তে চেহারা থেকে সমস্ত অনুভূতির ছাপ মুছে ফেলল। টানেল ধরে ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে আসছে একটা মূর্তি। সাদা একটা ভুতুড়ে আকৃতি। নিঃশব্দ, নিশ্চিত পদক্ষেপে আসছে। পরনে ফায়ার ব্রিগেড কর্মীদের পোশাক, মাথায় হেলমেট, পিঠে ট্যাঙ্ক, গ-াভ্স্ পরা হাতে লম্বা একটা নায্ল্। ফ্লেম থ্রোয়ার নিয়ে এগিয়ে আসছে লোকটা, ওদের দু’জনকে পুড়িয়ে মারার মতলব! ব্যাপারটা বুঝতে পেরে অস্ট্রেলিয়ানের মনোযোগ ধরে রাখার চেষ্টা করল রানা। হাসল জোর করে। ‘বাঁচার কি কোনও উপায়ই নেই? মরতেই হবে আমাকে?’ আরেকবার ঘড়ি দেখল ক্যালডন। ‘সময় প্রায় শেষ। কিভাবে মরতে চাও, রানা? বুকে গুলি খাবে, না পিঠে? অনেকে বলে পিঠে গুলি খাওয়াটাই নাকি সোজা, কে জানে!’ হ্যামারটা কক করল সে। ‘চিন্তা কোরো না, গুলি ফস্কায় না আমার। এক গুলিতে মরে যাবে, টেরও পাবে না কখন মরেছ।’ ফ্লেম থ্রোয়ার হাতে নিয়ে অসির পেছনে দরজার কাছে চলে এসেছে লোকটা। ফেস মাস্কের তলায় আবছা ভাবে লোকটার সাদা নাক দেখতে পেল রানা। ফ্লেম থ্রোয়ারের নায্ল্টা সরাসরি অস্ট্রেলিয়ানের পিঠে তাক করেছে সে। ঠিক সময় বেছে নিয়ে চেয়ার থেকে ঝাঁপ দিয়ে পড়ল রানা। ক্যালডনও ট্রিগার টেনেছে, পেছনের লোকটাও ফ্লেম থ্রোয়ার চালু করেছে। কমলা আগুনের একটা বিস্ফোরণ দেখতে পেল রানা, ও জানে মাত্র একটা সুযোগই পাবে ও, সুযোগটা কাজে লাগাতে হবে, অস্ট্রেলিয়ান ওর গায়ে গুলি লাগতে না পারলে লোকটাকে ওর বর্ম হিসেবে ব্যবহার করতে হবে, এছাড়া আর কোনও উপায় নেই বাঁচার। ঘাড় থেকে শুরু করে পাছা পর্যন্ত আধ ইঞ্চি গভীর একটা ক্ষত তৈরি করে চলে গেল বুলেটটা, তখনও রানা শূন্যে। রক্তাক্ত একটা ক্ষত, কিন্তু মারাÍক নয়। সারাদেহে আগুন ধরে যাওয়ায় আর্তচিৎকার করে উঠেছে ক্যালডন, দড়াম করে তার সঙ্গে বাড়ি খেল রানার দেহ। আরেকবার গর্জে উঠল রিভলভারটা। ধাক্কা দিয়ে লোকটাকে ফ্লেম থ্রোয়ারের গায়ে ফেলল রানা। নাযলটা হাত থেকে ফেলে দিয়েছে ফায়ার সুট পরা লোকটা, ঘুরে দৌড় দিতে গেল, পরমুহূর্তে হোসের সঙ্গে পা বেধে আছাড় খেয়ে পড়ল মাটিতে। চিতাবাঘের মত ঝাঁপ দিল রানা, লোকটার কাছে পৌঁছেই পায়ের পাশ দিয়ে গায়ের জোরে লাথি মারল হেলমেটের নিচে, পরপর কয়েকটা লাথি মারল। অবশ করে দিতে চাইছে প্রতিপক্ষকে। মড়াৎ করে একটা আওয়াজ হলো। লোকটার কলার বোন ভেঙে গেছে। প্রবল ঝটকা দিয়ে স্থির হয়ে গেল মাটিতে পড়া দেহটা। দ্রুত হাতে হেলমেট খুলল রানা, অবাক হয়ে গেল কোরা ল্যানযসের চেহারা দেখে। পেছন ফিরে তাকাল গোঙানি শুনে। মেঝেতে দাপাচ্ছে অস্ট্রেলিয়ান মেজর। শক্তিশালী অগিড়বশিখায় পিঠ পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে। চিড়বিড় আওয়াজ করে এখনও পুড়ছে চর্বি। মেঝে হাতড়াচ্ছে লোকটা। রিভলভারটা হাতে পেয়ে মাথায় নল ঠেকিয়ে ট্রিগার টেনে দিল। আস্তে করে নেতিয়ে পড়ল দেহটা। ফায়ার সুট খুলতে খুলতে মেয়েটার পাল্স্ দেখল রানা। নেই। মারা গেছে মেয়েটা। মেয়েটা কেন এখানে ভেবে সময় নষ্ট করল না ও, চটপট কোরার গায়ে বড় হওয়া ফায়ার সুট খুলে পরতে শুরু করল। পরা সেরে হেলমেট চাপিয়ে নিল মাথায়। পিঠে ফুয়েল ট্যাঙ্ক ঝুলিয়ে স্ট্র্যাপ আটকে নিল, নাযলটা হাতে নিয়ে দীর্ঘ টানেল ধরে হাঁটতে শুরু করল, যেপথে এসেছিল। ব্যথায় মনে হচ্ছে মরে যাবে ও। জোর করে ব্যথা ভুলে মাথাটাকে সচল রাখল। ধীরে ধীরে একটা পরিকল্পনা আকৃতি নিচ্ছে ওর মাথায়। কবীর চৌধুরীকে যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে, নইলে ব্যর্থ হতে হবে। বাঁক নিয়ে একটা করিডরে ঢুকল রানা, অন্যপ্রান্তে ভিলা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পথ আছে। দু’জন প্রহরী বাইরের খোলা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে, কিন্তু তাদের কেউই রানার দিকে মনোযোগ দিল না। দেখে মনে হলো দেখেইনি। হয় ৩১ এরকমই নির্দেশ আছে তাদের ওপর, অথবা এই একই ঘটনা আগেও ঘটতে দেখেছে তারা। গার্ডদের পাশ কাটিয়ে ঝড়ো রাতের আঁধারে বেরিয়ে এলো রানা। পুরোটা সময় ওর হাত ছিল ট্রিগারে। মুহূর্তে জ্বলে পুড়ে মারা যেত লোকগুলো, যদি বাধা দেয়ার চেষ্টা করত। গরমে দরদর করে ঘামছে রানা সুটের ভেতর। বাইরের আঁধারে মিশে গিয়ে স্বস্তির শ্বাস ফেলল ও। সাত ভিলার উত্তরে এক হাজার গজ দূরে খালাতো কলাগাছ, পালমেটো আর সোয়াম্প ঘাসের ঘন জঙ্গলের ভেতর থামল রানা, ফ্লেম থ্রোয়ারটা ফেলে দিয়ে একটা ডোবার মধ্যে নেমে আচ্ছামত সারা গায়ে কাদা মাখল। জ্বলুুনি কমল অনেক। রানার মাথার বেশিরভাগ চুলই পুড়ে গেছে। অবশ্য চেহারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, দুয়েকটা ছোট ফোস্কা ছাড়া। টের পাচ্ছে কাঁধে আর বুকে বিরাট বিরাট ফোস্কা উঠছে, ভেতরটা ভরে উঠছে পানিতে। কাদায় শুয়ে আরেকবার ভেবে দেখল রানা, সময় নষ্ট করবে না কবীর চৌধুরী। অন্তত এই পরিস্থিতিতে নয়। সোনাবাহী জাহাজ কাছে চলে আসার কথা। হাইতিতেও আগ্রাসন চালানোর সময় হয়ে গিয়েছে। প্রহরীদের অবশ্য সতর্ক করে দেয়া হবে, হয়তো সেনাবাহিনী নামানো হবে ওর খোঁজে। এই ছোট দ্বীপে চিরুনী চালানো হলে ধরা পড়তে দেরি হবে না ওর। তবে কবীর চৌধুরী ভেবে নিতে পারে উপকূলের দিকে রওনা হয়ে গেছে ও, সেক্ষেত্রে বেশি ঝামেলায় যাবে না, চেষ্টা করবে সরকারী ভাবে ওকে আটক করতে। সামনে একটাই কাজ, স্থির করল রানা। যেভাবে হোক উদ্ধার করতে হবে সোনা। সুইম ট্রাঙ্কটা ছাড়া আর সব কিছুই কেড়ে নেয়া হয়েছে ওর কাছ থেকে। অস্ত্র দরকার একটা। সেই সঙ্গে দরকার তথ্য। ঘন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে কবীর চৌধুরীর পিটি বোটগুলোর দিকে চলল রানা, মাঝে মাঝে এখানে ওখানে টর্চের আলো দেখতে পাচ্ছে। নড়ছে আলোগুলো, এদিক ওদিক যাচ্ছে। মনে হলো না ওর মুক্তিলাভের খবর কবীর চৌধুরীর কানে গেছে। কোরার দেরি দেখলে খোঁজ নিয়ে জানবে চৌধুরী। ঝড় তার রূপ পাল্টেছে, হারিকেনের কেন্দ্র এখান থেকে অনেক দক্ষিণ-পশ্চিমে সরে গেছে, ফলে বাতাসের ঝাপটা এসে লাগছে গ্যালোস কে’তে। তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে, সেই সঙ্গে গল্ফ্ বলের সমান একেকটা শিল পড়ছে। দু’হাতে মাথা ঢেকে এগিয়ে চলল রানা। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, মুহূর্তের জন্যে। দিনের মত আলোকিত হয়ে যাচ্ছে চারপাশ। পিটি বোটগুলো যে পাহাড়ী গুহার ভেতরে রাখা হয়েছে তার কাছে চলে এলো রানা, কোমর সমান উঁচু ঘাসের ভেতর থেকে সামনের দিকে তাকাল। পরবর্তী বিজলির আলোয় দেখতে পেল যা আশা করেছিল। এখনও নেটের তলায় পিয়ারের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে বোটগুলো। গুহার ভেতর থেকে গার্ডদের গলার আওয়াজ পেল। একজন আরেকজনের কাছে সিগারেট চাওয়ায় অনুযোগ করছে লোকটা। নিঃশব্দে পানিতে নেমে সাঁতার শুরু করল রানা, ডুব সাঁতার দিয়ে গুহামুখ পেরিয়ে মাথা তুলল পিটি বোটগুলোর পাশে। তাস পেটাচ্ছে গার্ডরা এখনও। কেউ সতর্ক করেনি এদের। এবার রানা ভাল করে লক্ষ করল বোটগুলো। আশি ফুট দীর্ঘ একেকটা, মেহগনি কাঠের খোল। ডেক আর সুপারস্ট্রাকচার প-াই উডের। তিনটে পঞ্চাশ ক্যালিবার মেশিনগান আছে তিনদিকে। সামনে পেছনে আছে চলি-শ এম এম দুটো কামান। টর্পেডো টিউবগুলো সরিয়ে ফেলা হয়েছে। যা ফায়ার পাওয়ার আছে তাই যথেষ্ট, হাইতির নেভির এটুকুও নেই। পিটি বোটগুলো তীরে সৈন্য নামানোর জন্যে চমৎকার কাজে আসবে। এমনকি বাধার মুখেও খুব একটা অসুবিধে হবে না সৈন্য নামাতে। সাগরের অবস্থা যত খারাপই হোক, ধকল সামলাতে পারবে বোটগুলো। ফোস্কার জ্বালা আর বুলেটের ক্ষতর ব্যথা নিয়ে তিক্ত হাসল রানা, ওকেও পারতে হবে। ফ্ল্যাগ শিপের কম্প্যানিয়নওয়েতে উঠে পিছলে অন্ধকার এঞ্জিন রূমে নামল রানা। আগের বার খেয়াল করেনি, এবার গন্ধ পেয়ে বুঝল পুরোনো প্যাকার্ড এঞ্জিন সরিয়ে ডিজেল এঞ্জিন বসানো হয়েছে। হাতড়ে আন্দাজ করল সম্ভবত অ্যাটলাস টাইপের এঞ্জিন। প্রচুর গতি তুলতে পারবে প্রয়োজনে। বোটটা একবার ঘুরে দেখে পেইন্ট লকারের সামনে থামল রানা। পিটি বোটে এটাই একমাত্র জায়গা যেখানে ও লুকিয়ে থাকতে পারবে। সন্দেহ না করলে বোধহয় বোটগুলো সার্চ করা হবে না। সন্দেহ করার কোনও কারণ নেই। ওর পালানোর খবর জানা গেলে কবীর চৌধুরী ধরে নেবে পালাতে ব্যস্ত ও। দ্বীপের অন্য দিকে ওকে খুঁজবে তার লোকরা, প্রহরী বেষ্টিত পিটি বোটে নয়। দু’ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হলো ওকে, প্রতিটা মুহূর্ত কাটল চরম উৎকণ্ঠায়। বুক-পেট জ্বলে যাচ্ছে। ফোস্কাগুলো মনে হচ্ছে আগুন দিয়ে তৈরি। দপদপ করছে বুলেটের ক্ষতটা। খুটখাট কিছু আওয়াজ হলো বাইরে। দোল খেল বোট। তেমন কিছু শুনতে পাচ্ছে না রানা, তবে আন্দাজ করল বেশি ক্রু ওঠেনি বোটে। কারণ বুঝতে পারল না, বোঝার উপায়ও নেই, এখন এখান থেকে বের হওয়া মানে ধরা পড়ে যাওয়া। কবীর চৌধুরীকে চড়া গলায় নির্দেশ দিতে শুনল। স্বস্তির শ্বাস ফেলল রানা, ঠিক বোটেই উঠেছে ও। একই সঙ্গে চিন্তাও হলো। যদি হাইতির বীচে পৌঁছে যায় তাহলে কি করবে তখন? সঙ্গে অস্ত্র নেই, খারাপ ভাবে পুড়ে গেছে শরীর, জ্বর আসছে গা কাঁপিয়ে। জোর করে মাথা থেকে চিন্তাগুলো দূর করল ও। পিটি বোট খোলা সাগরে বেরিয়ে আসার পর চিন্তা করার আর অবকাশ মিলল না রানার, বারবার এদিক-ওদিক বাড়ি খাচ্ছে ও পেইন্ট লকারের দেয়ালে, ৩২ ব্যথায় মনে হচ্ছে মরে যাবে। দু’হাত দু’দিকে ঠেকিয়ে শরীর সামলানোর চেষ্টা করছে ও। কিছুটা সফলতা এলো। চলি-শ নট গতিতে ছুটছে এলকো এঞ্জিন, ঢেউয়ের ওপর দিয়ে লাফ দিচ্ছে বোটের বো, দড়াম করে পড়ছে পরমুহূর্তে। সাগরের ঢেউগুলো অন্তত আট থেকে দশ ফুট উঁচু হবে, আন্দাজ করল রানা। একঘণ্টার কিছু বেশি সময় এক নাগাড়ে এগিয়ে চলল বোট, তারপর এঞ্জিন বন্ধ করা হলো। ঝাঁকি কমে এলো অনেক। স্বাভাবিকের চেয়ে কম। তার মানে হয় কোনও বন্দরে থেমেছে ওরা, অথবা বড় কোনও জাহাজের পাশে। লোকজনের আওয়াজ কমে আসার পর পেইন্ট লকার থেকে বের হয়ে মৃদু আলোকিত গ্যালিতে চলে এলো রানা। সমস্ত আসবাবপত্র সরিয়ে নেয়া হয়েছে, সম্ভবত বেশি লোক ধরানোর জন্যে। সাবধানে ক্রু আর অফিসার্স কোয়ার্টার পার হলো রানা। আবছা আলোয় এবার দেখতে পেল আগে যা চোখ এড়িয়ে গিয়েছিল। সমস্ত পার্টিশন আর বাঙ্ক খুলে ফেলা হয়েছে জায়গা বাড়ানোর জন্যে। এখন বোটে পঞ্চাশ থেকে ষাটজন লোককে সহজেই জায়গা করে দেয়া যাবে। খালি এঞ্জিন রূমে উঁকি দিয়ে হিসেব করল রানা, ছয়টা পিটি বোটে পঞ্চাশজন করে মোট তিনশোজন। প্রথম দফায় হাইতির সৈকতে তিনশো সৈন্য নামাতে পারবে কবীর চৌধুরী, তারপর বোটগুলো ফেরত পাঠাতে পারবে তার সবুজ ইউনিফর্ম পরা বাকি সৈন্যদের নিয়ে আসতে। মিরাগনের সৈকতে যদি সৈন্য নামায় তাহলে গ্যালোস কে থেকে দূরত্ব দাঁড়াবে চারশো মাইল। সেখান থেকে সরাসরি পেনিনসুলা পেরিয়ে পোর্ট অ প্রিন্সে রাজধানীতে আক্রমণ চালানো সম্ভব। পিটি বোটগুলো এই আবহাওয়ায় ঘণ্টায় তিরিশ মাইল বেগে ছুটতে পারবে। তারমানে বারো ঘণ্টা লাগবে হাইতিতে পৌঁছোতে। হাইতির দিকে যায়নি ওরা, নিশ্চিত হলো রানা। ছায়ায় দাঁড়িয়ে ওপর থেকে ভেসে আসা আওয়াজগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনল রানা। বোঝার চেষ্টা করছে কোন্টা কিসের আওয়াজ। এঞ্জিন রূম পার হয়ে কম্প্যানিয়নওয়েতে উঁকি দিল। পিটি বোটের ডেক ভেসে যাচ্ছে উজ্জ্বল সাদা আলোয়। আলোটা বোট থেকে আসছে না। কম্প্যানিয়নওয়ে ধরে সামনে বাড়ল ও, সিঁড়ি বেয়ে উঠতে শুরু করল, থামল তিন ধাপ সিঁড়ি বাকি থাকতে। কোনাকুনি ভাবে ওপর দিকটা দেখতে পাচ্ছে এখন। জং ধরা একটা বিরাট উঁচু বাঁকা দেয়ালের মত লাগল ওর কাছে জাহাজের খোলটা। ওই জাহাজ থেকেই আলোটা ফেলা হয়েছে নিচে। আরেক ধাপ উঠল রানা। এবার দড়ির মইটা দেখতে পেল, জাহাজের পাশ থেকে বোটে ফেলা হয়েছে। কবীর চৌধুরী নিজের লোকদের উঠতে দেখছে মইয়ের কাছে দাঁড়িয়ে। শেষ লোকটা উঠে যাবার পর দ্রুত ওঠার জন্যে পা ব্যবহার না করে দু’হাতের সাহায্যে উঠতে শুরু করল কবীর চৌধুরী, তরতর করে উঠে যাচ্ছে, ফুলে ফুলে উঠছে কাঁধের পেশী। একজন গার্ড রেখে গেছে বোটে। মনে মনে গাল বকল রানা। ও আশা করেছিল জাহাজে উঠে দেখবে কি ঘটে। কবীর চৌধুরীকে ও যতটা চেনে তাতে ওর ধারণা ঠিক হলে বিরাট গণ্ডগোল বেধে যাবে এখন চিনা জাহাজে। কবীর চৌধুরী মই বেয়ে অদৃশ্য হয়ে যাবার পর গার্ডের দিকে মনোযোগ দিল রানা। লোকটাকে শেষ করতে হবে, বুঝতে পারছে। প্রহরী ওর কাজটা সহজ করে দিল এঞ্জিন রূমের সামনে কম্প্যানিয়নওয়েতে অবস্থান নিয়ে। ছয় ফুট দূরে আছে রানা, একটু নিচে। লোকটার পায়ের দিকে তাকাল রানা। পায়ে কমব্যাট বুট। জি আই সারপ-াস। বারবার পায়ের ভর বদল করছে লোকটা। নার্ভাস। তাকিয়ে আছে চিনা জাহাজটার দিকে। কিছু একটা ঘটবে সেজন্যে অপেক্ষা করছে যেন। আস্তে করে সামনে এগোল রানা, হাত দুটো বাড়িয়ে রেখেছে, জুতো ধরবে বলে। পিঠে টান পড়তেই টের পেল কাদার নিচে খুলে গেছে বুলেটের ক্ষতটার মুখ। পোড়া জায়গার জ্বলুনি এতই বেশি যে ক্ষতটার কথা ভুলে গিয়েছিল ও। দু’হাতে বুট জুতো বেড় দিয়ে ধরেই হ্যাঁচকা টান মারল রানা, পিছিয়ে যাচ্ছে সেই সঙ্গে। দড়াম করে আছাড় খেয়ে পড়ল প্রহরী মেঝের ওপর, মাথা ঠুকে গেল খটাস করে। চিতাবাঘের মত তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল রানা, লোকটার বেল্ট থেকে ট্রেঞ্চ নাইফটা টান দিয়ে বের করেই বসিয়ে দিল গলায়। মোটা রগটা কেটে যাওয়ায় ফিনকি দিয়ে উঠল রক্ত, ওর বুকে ছিটে লাগল। দুর্বল লাগছে ওর, পেট-বুকের জ্বলুনি বেড়ে গেছে আরও। জ্বরও বাড়ছে, ঘুরছে মাথা। অবসাদে ঘুম চলে আসছে। পেশীগুলো শিথিল হয়ে আসতে চাইছে। ভয় হলো রানার, অজ্ঞান না হয়ে যায়। চেতনা হারালে বাঁচার আর কোনও আশা নেই। গার্ডের বেল্ট খুলে পিস্তল আর গ্রেনেড কোমরে ঝোলাল রানা, পুরোনো থম্পসন সাবমেশিনগানটা একবার চেক করে কাঁধে ঝুলিয়ে নিল। লোকটার পকেট হাতড়াল সাবমেশিনগানের নলটা বন্ধ করার মত কিছু পাবার আশায়। আরও একটু সাঁতরাতে হবে ওকে। একটা রুমাল হলেই কাজ চলে যায়। রুমাল নেই, কিন্তু গার্ডের পকেটে এক প্যাকেট কন্ডম পেল। একটা কন্ডমই নলের ডগায় পরাল রানা, মোচড় মেরে জিনিসটা টাইট করে আটকে নিল। লাশটা পেইন্ট লকারে লুকিয়ে রেখে এক টুকরো কাপড় দিয়ে রক্ত মুছে ফেলল। রানা এখন মানসিক ভাবে তৈরি। কম্প্যানিয়নওয়ের মাথায় দাঁড়িয়ে একটু ইতস্তত করল। আলোটা বিপদে ফেলে দিতে পারে, কিন্তু ওটা নেভানোর কোনও উপায় নেই, সেটা হবে আরও দ্রুত ধরা পড়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা। আশা করল পিটি বোটের স্টার্নে পৌঁছে যেতে পারবে ও কারও চোখে ধরা না পড়েই। পা বাড়িয়েই মুহূর্তের জন্যে থামল রানা, পরমুহূর্তে আবার এগোল। চাইনিজ জাহাজে দোজখ নেমে এসেছে। ট্যাট-ট্যাট-ট্যাট-ট্যাট করে হুঙ্কার ছাড়ছে অনেকগুলো টমিগান। বুম-বুম করে ফাটছে গ্রেনেড। পিস্তলের আওয়াজও শুনতে ৩৩ পেল রানা। আলোটা নিভে গেল। ওপর থেকে ভেসে এলো মৃত্যুপথযাত্রী এক লোকের তীক্ষè আর্তচিৎকার। একটা ঢেউ পিটি বোটটাকে ওপরে তুলে বাড়ি মারল জাহাজের খোলের সঙ্গে। আগে পা দিয়ে সাগরে নামল রানা, চেহারা গম্ভীর, ওর ধারণাই সঠিক হয়েছে, চাইনিজ জাহাজের একজন ক্রুকেও বাঁচতে দেবে না কবীর চৌধুরী। সাক্ষী রাখতে অভ্যস্ত নয় সে। আট পানির তলা দিয়ে জাহাজটার স্টার্নের দিকে এগোল রানা। যেকোন সময়ে আবার বাতি জ্বলে উঠবে, পরিষ্কার দেখা যাবে ওকে, সাবমেশিনগান দিয়ে ফুটো করে দেয়া হবে, তার আগেই পৌঁছোতে চাইছে। জাহাজের পাশ থেকে বেরিয়ে স্টার্নের দিকে এগোতেই প্রবল ঢেউয়ের মধ্যে পড়ল রানা। আগের চেয়ে বাতাস আর বৃষ্টির উন্মত্ততা কমেছে, কিন্তু এখনও সাত থেকে আট ফুট উঁচু হয়ে মাথায় সাদা ফেনা নিয়ে ছুটে এসে আছড়ে পড়ছে ঢেউগুলো। দম নিতে উঠে ঢেউয়ের ধাক্কায় আরেকটু হলেই ভারসাম্য হারিয়ে স্রোতের টানে খোলা সাগরের দিকে চলে যেত ও। একেবারে শেষ মুহূর্তে জাহাজের নোঙরের শেকল হাতে পেয়ে আঁকড়ে ধরল। বিরাট একটা ঢেউ ওকে এক্সপ্রেস এলিভেটরের মত ওপরের দিকে ঠেলে দিল। জং ধরা কেব্ল্টা ধরে কোনও মতে টিকে থাকল রানা। বারবার টানটান হচ্ছে কেব্ল্, আবার ঢেউ চলে যেতে ঢিলে হচ্ছে। এমনিতে শেকল বেয়ে ওপরে ওঠা কঠিন হতো না রানার জন্যে, কিন্তু এই শারীরিক অবস্থায় কাজটাকে এখন খুব কঠিন বলে মনে হচ্ছে। আস্তে আস্তে ওপরের দিকে উঠছে রানা, টের পাচ্ছে পিঠের ক্ষতটা টান খেয়ে আরও চওড়া হচ্ছে, ছিঁড়ে যাচ্ছে দু’পাশের মাংসপেশী। আর এক মিনিট, তারপরই জাহাজের ডেকে উঠে পড়তে পারবে ও, লুকিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে ভাবতে পারবে। আর বারো ফুট ওপরে ডেকের রেইলিং। বাতাসের ধাক্কায় দুলছে রানা, যেন পাপেটের পুতুল। বাতাস আর বৃষ্টির শোঁ-শোঁ আওয়াজ ছাপিয়ে এখনও টমিগানের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছে ও। মাঝে মাঝে গ্রেনেড ফাটছে। ডেকের নিচে কোথাও থেকে সাবমেশিনগানের টাশ্-টাশ্ আওয়াজ আসছে। থেমে গেল অস্ত্রটা। একটা গ্রেনেড বিস্ফোরিত হলো। তারপর নামল নীরবতা। একটা লোক চিৎকার করে কি যেন বলল। আবার নীরবতা নামল। শুধু ঝড়-বৃষ্টির একটানা আওয়াজ চলছে যেন অনন্তকাল ধরে। ডেকে এখনও বাতি জ্বালানো হয়নি। বাতাসের আওয়াজের মাঝেও রানার মনে হলো কবীর চৌধুরীর গলা শুনতে পেল, নির্দেশ দিচ্ছে। ডেকের রেইলিঙের ওপর দিয়ে সাবধানে উঁকি দিল রানা, আবছা ভাবে ডেকটা দেখতে পাচ্ছে। পুব আকাশে ধূসরের সামান্য ছোঁয়া লেগেছে, সূর্যের আগমনী ঘোষণা করছে আলোটা। আফটার ওয়েল ডেকে নামার একটা লোহার মই দেখতে পেল রানা, ওটা বেয়ে দ্রুত নেমে গেল নিচে, হামাগুড়ি দিয়ে বসল দেয়ালের পাশে। ঠিক সময় মত নিচে নেমেছে ও। অন্ধকারে ওকে পাশ কাটাল চারজনের একটা দল, মই বেয়ে উঠতে শুরু করল ফ্যানটেইলের দিকে, নিজেদের মধ্যে স্প্যানিশে আলাপ করছে উত্তেজিত স্বরে। তারপুলিনের স্পর্শ পেয়ে ওটার তলায় ঢুকল রানা, হাতড়াতে লাগল হ্যাচ কাভারের খোঁজে। একটা হ্যাচ কাভার অন্তত থাকার কথা এখানে। নেই। দুই নম্বর হোল্ডটা ক্যানভাস দিয়ে ঢাকা, বাতাসের ঝাপটায় তারপুলিনের কোনা ছিঁড়ে সেটাই ওর হাতে লেগেছিল। ইচ্ছে করলে হোল্ডে নামা যায়। দুটো ব্যাপার রানাকে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করল। ডেকটা কেঁপে উঠেছে জাহাজের, প্রাচীন এঞ্জিন সচল হয়েছে, বুঝতে পারল ও। জাহাজের পেছনটা ভয়ানক ভাবে দুলে উঠল, আরেকটু হলে তারপুলিনের তলা থেকে ছিটকে বেরিয়ে যেত রানা। সেই চারজন লোক যারা ওপরে গেছে, তারা নোঙর তুলে ফেলেছে। ঝড়ের দিকে পাশ ফিরে হেলে-দুলে এগোতে শুরু করেছে জাহাজ। বাতি জ্বলে উঠল, ডেক ভেসে গেল উজ্জ্বল সোনালী আলোয়। কেউ একজন বোধহয় ভুল করে বাতি জ্বেলেছে। কিন্তু এখানে একমুহূর্ত থাকাও এখন বিপজ্জনক। ফ্যানটেইলে এখনও আছে লোকগুলো। হ্যাচ কোমিঙের ওপর দিয়ে দেহটা গড়িয়ে দিল রানা, তারপর দু’হাতের জোরে কিছুক্ষণ ঝুলে হোল্ডের অন্ধকারে শরীরটা ছেড়ে দিল। ভয় পাচ্ছে বেকায়দা পড়ে পা না ভেঙে যায়। দশ ফুট নিচে পড়ল ও, চার হাত-পায়ে ভারসাম্য রক্ষা করে হাঁটু মুড়ে বসল। নিচে মসৃণ কাঠের পাটাতন। হাত বোলাল রানা, স্টীলের পাত ঠেকল হাতে, তারপর একসারি পেরেকের মাথা। একটা বাক্সের ওপর পড়েছে ও। হাতড়ে দেখল, হামাগুড়ি দিয়ে এগোচ্ছে। ছয় ফুট দীর্ঘ আর চার ফুট চওড়া প্রতিটা বাক্স, পুরো হোল্ড জুড়ে পাশাপাশি সাজানো। নিচে কয়টা বাক্স আছে কে জানে। দুই বিলিয়ন ডলারের সোনা। হ্যাচ কোমিং থেকে আসা একচিলতে আলো মিলিয়ে গেল, ডেকের বাতিটা নিভে গেছে। নিশ্চয়ই রাইডিং লাইটও নিভিয়ে দেয়া হয়েছে, কবীর চৌধুরী কোনও ঝুঁকি নেবে না। তবে একটু পরই ভোর হবে। বাংলার গৌরব নিশ্চয়ই দূরে নেই আর। চিনা জাহাজটাকে স্পট করতে পারলে দখল করে নেয়া শক্ত হবে না। ট্রেঞ্চ নাইফ দিয়ে একটা বাক্স খোলার চেষ্টা করল রানা। অনেকক্ষণ লাগল ওর। খুব শক্ত করে ইস্পাতের পাত লাগানো হয়েছে, স্লঙঊুগুলোও টাইট করে ৩৪ আটকানো, কিন্তু শেষ পর্যন্ত খুলতে পারল ও। ভেতরে হাত চালিয়ে হতাশ হতে হলো রানাকে। হাতড়ে বুঝল একটা রাশিয়ান সাবমেশিনগান ঠেকেছে হাতে। পুরনো মডেলের জিনিস, কসমোলিন তেলে চুপচুপ করছে। অনেকবছর হলো রাশিয়ানরা আর এই জিনিস বানায় না। পুরো বাক্স হাতিয়ে দেখল রানা, পাঁচটা সাবমেশিনগান ঠেকল ওর হাতে। অস্ত্রগুলো সরিয়ে হাত চালাল, শক্ত কাগজ নিচে। ছুরি দিয়ে কাগজ চিরল ও, মসৃণ শীতল ধাতুর স্পর্শ পেল। সোনা তাহলে অস্ত্রের নিচে লুকিয়ে আনা হয়েছে! সোনার ওপর হাত বুলিয়ে ভাবল রানা, কাকে বোকা বানানোর জন্যে এই সতর্কতা? নিঃশব্দে হাসল রানা। কবীর চৌধুরীর নিজের লোকদের বোকা বানানোর জন্যেই এই ব্যবস্থা। লোকগুলো বোধহয় কেউ সোনার খবর জানেও না। যত পাগলাটেই হোক, কাউকে বিশ্বাস করার বান্দা নয় কবীর চৌধুরী। যত চোর-ডাকাত-খুনে-বদমাশদের এক করেছে কবীর চৌধুরী, নানা অপরাধে নিশ্চয়ই খোঁজা হচ্ছে তাদের। এক ডলারের জন্যে নিজের মায়ের গলা কাটতেও বাধবে না এধরনের মানুষই জোগাড় করেছে পাগলা বিজ্ঞানী। লোকগুলো সোনার খোঁজ পেলে হাইতি আক্রমণের আশা শেষ, নিজেদের ভেতর ক্ষুধার্ত নেকড়ের মত লড়াই বাধিয়ে বসবে সবাই, কবীর চৌধুরীর আওতার বাইরে চলে যাবে পরিস্থিতি। বাক্সের ঢাকনি নামিয়ে রাখল রানা, অন্ধকারে চোখ সয়ে যাওয়ায় হোল্ডের নিচে আর সামনে থেকে একটা হলুদ আলো আসছে, সেটা চোখে পড়ল। নিঃশব্দে এগোল রানা আলোটা লক্ষ্য করে, ভাবছে এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতি থেকে কিভাবে উদ্ধার পাওয়ার কথা চিন্তা করছে কবীর চৌধুরী। লোকটা কি করবে তার ওপরই নির্ভর করবে ও নিজে কিভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করবে। বাক্সের শেষ প্রান্তে পৌঁছে গুনল রানা। ওপর দিকে নয়টা বাক্স, তার নিচে হোল্ডের স্টীল ডেক। আলোটা আসছে ছয় ফুট বাই তিন ফুট একটা বাল্কহেড থেকে, সামান্য ফাঁক হয়ে আছে দরজাটা। শেষ যে লোকটা বেরিয়েছে এখান থেকে সে দরজা বন্ধ করতে ভুলে গেছে। হোল্ড থেকে বেরোবার এটাও একটা পথ হতে পারে, কিন্তু আপাতত বের হবার কোনও ইচ্ছে নেই রানার। সোনা এখানে আছে, আগে হোক পরে হোক কবীর চৌধুরীকে এখানে আসতেই হবে। বাক্সগুলোর ওপর চিৎ হলো রানা, বিশ্রাম নিয়ে নিচ্ছে, তাকিয়ে আছে হ্যাচের ওপরে পাতা ক্যানভাসের দিকে। হোল্ডের তুলনায় ওপরে আলো বেশি, ক্যানভাসটার রং হালকা দেখাচ্ছে। এল কংকুইসটেডরের পূপ কেবিনটার কথা মনে পড়ল। স্টীলের বীম দিয়ে দুর্ভেদ্য করা হয়েছে কেবিনটা। হাসল রানা, এখন ও জানে কোথায় সোনা রাখবে ঠিক করেছিল কবীর চৌধুরী। এল কংকুইসটেডর ধ্বংসাবশেষ হিসেবে এতই পরিচিত যে ওখানে কেউ সোনা খুঁজতে যাবে না। কিন্তু ওদিকেই কি যাচ্ছে কবীর চৌধুরী? তার একটাই মানে, রানা যে মুক্ত সে খবর সে জানে না। কিন্তু এতটা অসতর্ক কি হবে পাগল বিজ্ঞানী? অসম্ভব। তাহলে? তাকে পরিকল্পনা পরিবর্তন করতে হবে, অন্য কোথাও লুকাতে হবে সোনা। কোথায়? বাইরে আলো আরও বাড়ছে, তারপুলিনের ভেতর দিয়ে ধূসর আভা আসতে শুরু করেছে। অপেক্ষা ছাড়া আর কিছু করার নেই রানার। হোল্ড থেকে বেরিয়ে সুবিধে হবে না। অন্তত বিশজন লোক আছে কবীর চৌধুরীর সঙ্গে। কিছুই করতে পারবে না ও এতজনের বিরুদ্ধে। বেশিক্ষণ রানাকে অপেক্ষা করতে হলো না। প্রাচীন এঞ্জিনের ধুকপুকানি থেমে গেল। আস্তে আস্তে বন্ধ হলো ডেকের কাঁপুনি। গতি থেমে যাওয়ায় জাহাজের দুলুনি বেড়ে গেল। টমিগানটা তুলে নিয়ে বাল্কহেডের দিকে এগোল রানা, বুঝতে পারছে না কবীর চৌধুরী জাহাজ থামাল কেন। এক ঘণ্টাও হয়নি রওনা হয়েছে ওরা। পনোরো নট গতিতেও যদি এগিয়ে থাকে, বেশিদূর আসেনি ওরা। কংকুইসটেডরের কাছে তো নয়ই। তবে নিশ্চিত হওয়ার কোনও উপায় নেই। পিটি বোট যখন জাহাজটার সঙ্গে ভিড়ল তখন ওটা কোথায় ছিল তা জানা নেই। কবীর চৌধুরী জানে কোথায় থেমেছে সে। সম্ভবত গোটা জাহাজে একমাত্র কবীর চৌধুরীই জানে। দলে এঞ্জিনিয়ার আর নাবিক আছে লোকটার, তারা জাহাজটাকে চালিয়ে এনেছে। কিন্তু কতজন নেভিগেটর বা প্রাক্তন অফিসার আছে তার সঙ্গে? সম্ভবত একজনকেও রাখেনি কবীর চৌধুরী। রাখার কথা নয়। শিরশির করে উঠল রানার পিঠ। মনে হচ্ছে কি যেন নজর এড়িয়ে গেছে ওর। কবীর চৌধুরীকে ছোট করে দেখার দুঃসাহস নেই ওর, কিন্তু কোথায় যেন ভুল হয়ে গেছে একটা। টমিগানের নল দিয়ে ঠেলে বাল্কহেডটা খুলল রানা, দেখল সবুজ ইউনিফর্ম পরা একটা লোক মই বেয়ে উঠে যাচ্ছে ওপরে। দরজা ফাঁক করে ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকল রানা, সামনের নির্জন করিডরটা দেখল। অনুজ্জ্বল হলুদ আলো জ্বলছে করিডরে। দুলে উঠল রানা, কাত হয়ে যাচ্ছে ওর শরীরটা। মাথা ঘুরে উঠল। ভয় হলো, সত্যিই কি এই বিপদের সময় অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে ও? দু’সেকেন্ড পর বুঝতে পারল জাহাজটাই অস্বাভাবিক ভাবে দুলছে। ক্যাঁচকোঁচ নানা আওয়াজ করছে। পানির ছল-ছল কল-কল আওয়াজ শুনতে পেল। টমিগানের সেফটি ক্যাচ অফ করে করিডর ধরে দ্রুত পায়ে এগোল রানা, ব্রিজের নিচে চলে এলো। করিডর থেকে দু’পাশে যে দরজাগুলো সেগুলো অফিসারদের কোয়ার্টারে গেছে। খোলা একটা দরজা পেরোনোর সময় বাঙ্কের ওপর পড়ে থাকা লাশটা চোখে পড়ল ওর, গুলি করে মাথার খুলি উড়িয়ে দেয়া হয়েছে। আরেকটা লোক পড়ে আছে মেঝেতে, রক্তাক্ত দু’হাত পেট খামচে আছে। কবীর চৌধুরীর লোকরা সম্পূর্ণ অসতর্ক অবস্থায় পেয়েছিল চিনা ৩৫ ক্রুদের। ঝড়ো বাতাসে আগের মত আর দুলছে না জাহাজটা, গা নড়াচ্ছে যেন অনিচ্ছাসত্ত্বেও। পোর্টের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। এখন রানা বুঝতে পারছে কারণ, তবু নিশ্চিত হতে হবে ওকে। মইটার কাছে চলে এসেছে ও, একটু আগে এই মই বেয়েই ওপরে উঠেছে সবুজ ইউনিফর্ম পরা লোকটা। অর্ধেক উঠতেই পানির জোরাল আওয়াজ শুনতে পেল। আওয়াজটা সাগর থেকে আসছে না, আসছে ভেতর থেকে! মই বেয়ে এঞ্জিন রূমে ঢুকল রানা। কয়েকটা লাশ পড়ে আছে শুধু, জীবিত আর কেউ নেই এখন এখানে। আরেকটা মই বেয়ে নিচে নেমে বিল্জের কাছে চলে এলো ও। ট্র্যাপডোরটা এখন খোলা। মই বেয়ে নামতে হলো না ওকে, দেখতে পেল কালো পানি ধীরে ধীরে উঠে আসছে ওর দিকে। জাহাজের প্রত্যেকটা সী-কক সম্ভবত খুলে দেয়া হয়েছে কবীর চৌধুরীর নির্দেশে। ডুবিয়ে দিচ্ছে কবীর চৌধুরী স্বর্ণবাহী জাহাজটাকে। ওটা কোথায় আছে সেটা সে ছাড়া আর কেউ জানে না! নয় প্রাণ হাতে নিয়ে ওপরের দিকে উঠতে শুরু করল রানা, ভয় পাচ্ছে যেকোন সময়ে ডুবে যাবে জাহাজটা। ওপরে না উঠলে বোঝা যাবে না ঠিক কতটা সময় হাতে আছে আর। যে করে হোক জানতে হবে কোথায় আছে ওরা। এত বিপদের মাঝেও কবীর চৌধুরীর প্রশংসা না করে পারল না ও। লোকটা তার আসল পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছে, এল কংকুইসটেডরে সোনা লুকিয়ে রাখা সম্ভব নয় জেনে নতুন পরিকল্পনা করেছে, বোকা বানিয়ে দিয়েছে ওকে। কম্প্যানিয়নওয়েতে পৌঁছে থামল রানা, কান পাতল, বাতাসের আওয়াজের ওপর দিয়ে লোকজনের গলার আওয়াজ শুনতে চেষ্টা করল। সামনেই ব্রিজ। ব্রিজে কেউ নেই। দূরে সরে যাচ্ছে লোকজনের নির্দেশ, গলার আওয়াজ আর চিৎকার। সাবধানে কম্প্যানিয়নওয়েতে উঠে এলো রানা। লোকগুলো এখনও জাহাজ ত্যাগ করেনি। অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। লোকগুলো চলে যাবার পর রেডিয়ো রূমে যাবে ও, চেষ্টা করবে সোহেলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। তবে রেডিয়ো আস্ত রাখার কথা নয় কবীর চৌধুরীর। জাহাজটা ডুবে যাবার আগেই একটা লাইফ র‌্যাফটে উঠতে হবে ওকে। দু’পাশে তাকিয়ে বুঝতে পারল হাতে অন্তত আরও এক ঘণ্টা সময় আছে, তার আগে ডুববে না প্রকাণ্ড জাহাজটা। ততক্ষণে কবীর চৌধুরী চলে যাবে ওর ধরাছোঁয়ার বাইরে। ব্রিজে কেউ নেই। হুইলটা দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে যাতে জাহাজটা যতটা সম্ভব ঝড়ো বাতাসের দিকে পাশ ফিরে থাকে। ক্রল করে পোর্ট সাইডে পৌঁছোল রানা। ওদিকেই কাত হচ্ছে জাহাজটা, কাজেই ওদিক দিয়েই নেমে যাবে কবীর চৌধুরীর ক্রুরা। ওদিকে তাদের বোট থাকবে। ডেক ধরে এগোচ্ছে রানা, জাহাজটা একটা ঝাঁকি খেয়ে আরও কাত হলো। পোর্ট বো থেকে সাবধানে উঁকি দিল রানা, দেখতে পেল জাহাজের গায়ে ঠেকে আছে পিটি বোটটা। ওটা সঙ্গে নিয়ে আসা হয়েছে। কবীর চৌধুরী সবার শেষে নেমেছে বোটে, জাহাজের দিকে তাকিয়ে আছে। লোভ হলো রানার, টমিগানের এক পশলা বুলেট বৃষ্টিতে লোকটাকে খতম করে দেয়া যায়। পরমুহূর্তে আস্তে করে মাথা নাড়ল। সেক্ষেত্রে ওকেও মরতে হবে। ক্রুরা ওকে ছাড়বে না। পিটি বোট নিয়ে অপেক্ষায় থাকবে, জাহাজটা ডুবে যাবার পর পাখি শিকার করার মত নিশ্চিন্তে গুলি করে মারবে ওকে। টমিগান মেঝেতে নামিয়ে রাখল রানা, ওর হাত ভেজা ঠাণ্ডা কিসে যেন স্পর্শ করল। ঝটকা মেরে হাত সরিয়ে নিল রানা, তাকিয়ে দেখল ওটা একজন লোকের চেহারার অংশ। লোকটার ইউনিফর্মে দুটো স্ট্রাইপ। মেট ছিল এজাহাজের। এতক্ষণ লাশটা চোখে পড়েনি। এখন তাকানোয় দেখতে পেল কোনায় পড়ে আছে আরেকজন। হেল্ম্স্ম্যান। নিহতদের সাগরেই কবর দিচ্ছে কবীর চৌধুরী। তিক্ত মনে ভাবল রানা, কি করবে। পাগল বৈজ্ঞানিককে চলে যেতে না দিয়ে কোনও উপায় নেই ওর। সামনের সাগর থেকে ঘুরে এলো দৃষ্টি, কোথাও বাংলার গৌরবের চিহ্নমাত্র নেই। বাতাস এখন বিশ নট গতিতে বইছে। সাগর অপেক্ষাকৃত শান্ত। ঢেউগুলো পিটি বোটটাকে দোলাচ্ছে। ওর চোখের সামনে রওনা হয়ে গেল বোট। স্টার্নে বুক টানটান করে দাঁড়িয়ে আছে কবীর চৌধুরী, মাথায় সবুজ ক্যাপ, হাতে একটা বিনকিউলার, ওটা চোখে তুলে জাহাজটার দিকে তাকাল। মাথা নিচু করে নিল রানা, আবার যখন মাথা তুলল তখন ওর হাতেও ক্যাপ্টেনের বিনকিউলার। হাসছে কবীর চৌধুরী। ঘাড়ের কাছে চুলগুলো দাঁড়িয়ে গেল রানার। ওর মনে হলো লোকটা যেন ওকে দেখেই হাসছে। কাঁধে স্ট্রাইপ লাগানো এক অফিসার কবীর চৌধুরীর পেছনে দাঁড়িয়ে কি যেন বলল। চোখ থেকে বিনকিউলার নামাল না কবীর চৌধুরী, জবাব দেয়ার আগে ভ্রƒ কুঁচকে উঠল, চেপে বসল চোয়ালের হাড়। তার কথা শুনে দ্রুত ভেতরে চলে গেল অফিসার। স্পীড বেড়ে গেল পিটি বোটের, এখন অন্তত বিশ নট গতিতে ছুটছে ঢেউ ভেঙে। তিনশো গজ দূরে সরে গেছে বোটটা, একটু পরই মেঘলা আকাশের কারণে দেখা যাবে না। তখন রানা রেডিও রূমে গিয়ে সোহেলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করবে। তারপর একটা লাইফ র‌্যাফট বা বোট দরকার হবে সাগরে ভেসে থাকার জন্যে। ওর পক্ষে সাঁতরে উপকূলে পৌঁছোনো সম্ভব নয়। কবীর চৌধুরীকে রিস্টওয়াচের দিকে তাকাতে দেখল রানা। ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল ৩৬ ও, কিন্তু থমকে গেল। কবীর চৌধুরীকে দেখে মনে হচ্ছে যেন উত্তেজনায় কাঁপছে। ঋজু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বোটের ডেকে একা। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না রানা। বোটের স্টার্ন থেকে লাফ দিয়ে সাগরে পড়েছে কবীর চৌধুরী। সাঁতরাতে শুরু করল। জাহাজের দিকে আসছে! বারবার ঢেউয়ের ভেতর ডুবছে-উঠছে তার মাথা। পিটি বোটটা কবীর চৌধুরীর একশো গজ দূরে সরে গেছে। অকস্মাৎ বিস্ফোরিত হলো ওটা। তীব্র উজ্জ্বল কমলা-লাল-হলুদ রশ্মি বিচ্ছুরিত হলো চারদিকে। পরমুহূর্তে ভেসে এলো বিস্ফোরণের ভোঁতা আওয়াজ। ছিটকে আকাশে উঠল বোটের সহস্র টুকরো। এক পলক তাকিয়েই রানা বুঝতে পারল ওই বোটে একজন লোকও জীবিত নেই। আবার কবীর চৌধুরীর ওপরে বিনকিউলার ফেরাল রানা। আসছে লোকটা। মাথায় এখন আর সবুজ ক্যাপটা নেই। সমস্ত ক্রু সহ পিটি বোট উড়িয়ে দিয়েছে পাগল বৈজ্ঞানিক। প্রচণ্ড ঝুঁকি নিয়েছে কাজটা করতে গিয়ে। সময়ের একটু ভুল হলে নিজেও সে শেষ হয়ে যেত। একজন সাক্ষীও রাখেনি। মেরুদণ্ডের কাছটা শিরশির করে উঠল রানার, নিষ্ঠুরতা দেখে ও অভ্যস্ত, কিন্তু এর বুঝি কোনও তুলনা হয় না। ডুবন্ত জাহাজের পোর্ট সাইডের একশো গজের ভেতর চলে এসেছে চৌধুরী। আর পঞ্চাশ গজ। আর দু’তিন মিনিট পরই পোর্ট রেইল থেকে ঝুলন্ত দড়ির মই বেয়ে উঠে আসবে জাহাজে। শীতল হাসল রানা, ও অপেক্ষা করবে। দুলে উঠে পোর্টের দিকে আরও ঝুঁকে গেল চিনা জাহাজ। আলোগুলো একবার নিভে আবার জ্বলে উঠল, তারপর নিভে গেল চিরতরে। জাহাজের পেটের ভেতর থেকে চাপা একটা বিস্ফোরণের আওয়াজ শুনতে পেল রানা। ডুবে যেতে আর বড়জোর এক ঘণ্টা। হয়তো তার চেয়েও কম। ব্রিজ থেকে বের হয়ে টমিগানটা চেক করল রানা, তারপর মই বেয়ে নেমে এলো ডেকে। অপেক্ষা করছে। কবীর চৌধুরী যেকোন সময়ে মই বেয়ে উঠে আসবে। আকাশে মেঘের ঘনত্ব বেড়েছে, আলো এতই কম যে এখন আর ডেকের ওপাশে রেইলিংটাও পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে না। পোর্টের দিকে আরও ঝুঁকছে জাহাজটা, রেইলিঙের ওপর দিয়ে উঁচু ঢেউগুলোর পানি ঢুকতে শুরু করেছে। বাতাস বেড়েছে আগের চেয়ে, কিন্তু পেটে পানি ভরা জাহাজটাকে তেমন দোলাতে পারছে না। টমিগান রেইলিঙের দিকে তাক করে আছে রানা, অধৈর্য বোধ করছে। এত দেরি করছে কেন কবীর চৌধুরী? শেষ পর্যন্ত কি পৌঁছোতে পারেনি? সাগর অশান্ত, জাহাজের গায়ে আছড়ে ফেলেছে হয়তো লোকটাকে। অজ্ঞান হয়ে গেলে মারা পড়বে লোকটা। হঠাৎ করেই দমকা বাতাস ছাড়ল। ওই বাতাসের কারণেই বেঁচে গেল রানা। ওর মাথা থেকে এক ইঞ্চি দূরে ডেকহাউসিঙের গায়ে বিঁধল বুলেট। কবীর চৌধুরী পেছনে! মেঝেতে ঝাঁপিয়ে পড়ে শরীরটাকে গড়িয়ে দিল রানা, জানল না রিফ্লেক্স ওকে দ্বিতীয়বার বাঁচাল। রানার মাথা থেকে মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূর দিয়ে বাতাসে শিস কেটে ছুটে গেল দ্বিতীয় বুলেট। প্রথম কম্প্যানিয়নওয়ের কাছে পৌঁছেই উন্মত্তের মত ঝাঁপ দিয়ে নিচে পড়ল রানা, শূন্যে থাকা অবস্থাতেই শুনতে পেল কবীর চৌধুরীর কর্কশ হাসির আওয়াজ। সাবমেশিনগানটা হারিয়েছে রানা, একটা ইন্সপেকশন করিডরে পড়েছে, বাল্কহেডের কাছাকাছি উঠে দাঁড়াল। ট্রেঞ্চ নাইফ, পিস্তল আর গ্রেনেড ছাড়া এখন ওর কাছে আর কোনও অস্ত্র নেই। টমি গানটা কবীর চৌধুরীর দখলে। সাবমেশিনগানের বিরুদ্ধে পিস্তল কাজে আসবে না। গলা শুকিয়ে গেল রানার। ‘রানা?’ ভরাট গলায় ডাকল কবীর চৌধুরী। ‘হ্যাঁ, কবীর চৌধুরী,’ জবাব দিল রানা। ‘কি চাও?’ শুনতে পাচ্ছে নানা রকম আওয়াজ। ডেকের নিচ থেকে এখন অদ্ভুত সব শব্দ ভেসে আসছে। ডুবতে আর বেশি দেরি নেই জাহাজটার। ‘শুনতে পাচ্ছ, রানা?’ ‘পাচ্ছি। বলো।’ গলার আওয়াজ শুনে মনে হচ্ছে কম্প্যানিয়নওয়ের ঠিক গোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে পাগল বিজ্ঞানী। কাভার নিয়েছে নিশ্চয়ই, হাতে আছে টমি গান। আপাতত সুবিধেজনক অবস্থানে আছে সে, কিন্তু রানা যতক্ষণ বেঁচে আছে ততক্ষণ নিশ্চিন্তে কোনও কাজ করতে পারবে না, সর্বক্ষণ সতর্ক থাকতে হবে। সে সময় কবীর চৌধুরীর হাতে নেই। শীঘ্রি একটা বোট বা র‌্যাফট নিয়ে সরে পড়তে হবে তাকে, নইলে এই ক্ষুব্ধ সাগরে স্রেফ মারা পড়বে। ‘শুনছ, রানা?’ ‘শুনছি।’ ‘তাহলে শোনো মনোযোগ দিয়ে। চালমাত অবস্থায় পৌঁছে গেছি আমরা। নিচে তোমাকে আমি ফাঁদে ফেলেছি, কিন্তু তুমি যতক্ষণ বেঁচে আছ ততক্ষণ মটর লঞ্চ সাগরে নামানো আমার পক্ষে অসম্ভব। তার চেয়ে আসো, একটা চুক্তি করি। জানো নিশ্চয়ই, দুই বিলিয়ন ডলারের সোনা আছে এজাহাজে। সোনা ভাগ করে নেব আমরা। এছাড়া আর কোনও উপায় নেই রানা। নইলে দু’জনকেই মরতে হবে এখানে। জাহাজটা আর একঘণ্টাও টিকবে না। তোমাকে আমি যুক্তিপূর্ণ মানুষ হিসেবে জানি। রানা, কি বলো? এক বিলিয়ন ডলারের মালিক হওয়া ডুবে মরার চেয়ে ভাল না?’ ‘তা ভাল। কিন্তু তোমাকে আমি বিশ্বাস করি না, কবীর চৌধুরী।’ সময় চাইছে রানা একটা কিছু করার জন্যে। ‘ভাল কথা, কবীর চৌধরী, আমার পেছনে এলে কিভাবে তুমি?’ ‘স্টারবোর্ড রেইলে একটা মই রেখে দিয়েছিলাম আমি আগেই। বিনকিউলার দিয়ে তোমাকে দেখেছিলাম। আগেই জানতাম জাহাজে তুমি ৩৭ আছ।’ ‘কিভাবে?’ ‘পেইন্ট লকারে গার্ডের লাশটা খুঁজে পেয়েছিলাম আমি।’ জেনেশুনেও ফিরে এসেছে কবীর চৌধুরী। কতটা দুঃসাহস সেটা অনুভব করে আরেকবার শিউরে উঠল রানা। ঠাণ্ডা মাথার প্রতিভাবান এক নিষ্ঠুর খুনী, ওঁৎ পেতে আছে এখন ওকে খুন করার জন্যে। ‘কি হলো, রানা? সিদ্ধান্ত নাও। হাতে সময় নেই।’ ‘ঠিক আছে,’ গলা চড়াল রানা। ‘আগে টমি গানটা নিচে ফেলো, তাহলে বিশ্বাস করব তোমার সদিচ্ছা আছে।’ মুহূর্তের নীরবতা। বাতাসের আওয়াজ ছাড়া আর কোনও আওয়াজ নেই। তারপর কবীর চৌধুরীর গলা ভেসে এলো। ‘ঠিক আছে, রানা। আমি জানি তোমার কাছে গার্ডের পিস্তল আর ছোরা আছে। পিস্তল আমার কাছেও আছে। মেশিনগানটা আমি নিচে ফেলছি, কিন্তু তারপর কিভাবে আমাদের মাঝে চুক্তি হবে?’ ‘সামনে যাবে তুমি,’ বলল রানা, ‘বো’র দিকে। আমি যাব অ্যাফটের দিকে। দু’জন দু’জনকে দেখার পর সামনাসামনি এগোব। দু’জনই আমরা মাথার ওপর হাত তুলে রাখব। দু’জন মুখোমুখি হলে পরস্পরকে আমরা খুন করতে পারি, অথবা পিস্তল ফেলে দিতে পারি। আগে টমি গান ফেলো।’ ‘বেশ। এই যে টমি গান।’ চালাকিটার জন্যে তৈরি ছিল রানা, তারপরও আরেকটু হলে মারা পড়ত। সজোরে টমি গান সিঁড়ির গায়ে বাড়ি মেরে নিচে ছুঁড়ে ফেলেছে কবীর চৌধুরী, যাতে পড়ন্ত গ্রেনেডের ড্রপ খাওয়ার আওয়াজ ওর কানে না যায়। রানার পায়ের সঙ্গে বাড়ি খেয়ে থামল গ্রেনেডটা। লাফ দিয়ে পড়ল রানা দূরে, তারপর দ্রুত ক্রল করতে শুরু করল, গ্রেনেডের বিপজ্জনক আওতার বাইরে চলে গেল দু’সেকেন্ডেরও আগে। বদ্ধ জায়গায় বিকট আওয়াজ করে ফাটল গ্রেনেড। শরীরের কয়েক জায়গায় স্পি-ন্টারের কামড় অনুভব করল রানা। সময় নিল না, আর্তচিৎকার করে উঠল গলা ফাটিয়ে, থেমে গেল মাঝপথে। চিৎকার থামিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে স্টার্নের দিকে ছুটল ও। প্রতিটি সেকেন্ড এখন মূল্যবান। কবীর চৌধুরী হয়তো দু’এক মিনিট সময় নষ্ট করবে রানা সত্যি মারা গেছে কিনা দেখতে। তবে মনে হয় না। জাহাজ ডুবে যাবে যেকোন সময়ে। এখন তার মটর লঞ্চের দিকে বেশি মনোযোগ দেয়ার কথা। ছুটছে রানা আবছা আলোয়। বারবার বাড়ি খাচ্ছে বাল্কহেডের সঙ্গে, খোঁচা লাগছে চোখা জিনিসের, পাত্তা দিচ্ছে না। থামল না সোনা ভরা হোল্ডের কাছে পৌঁছোনো পর্যন্ত। বাক্সগুলো একের পর এক পার হলো ও, হোল্ড কোমিঙের দিকে তাকিয়ে ওপরের তারপুলিন দেখে হতাশায় ছেয়ে গেল মন। শারীরিক এই অবস্থায় দশ ফুট উঁচুতে কিনারা আঁকড়ে ওপরে ওঠা ওর পক্ষে সম্ভব হবে বলে মনে হলো না। লাফ দিল রানা। এক ফুট বাকি থাকল কিনারা থেকে। ঘুরে দাঁড়াল উদ্ভ্রান্তের মত, বুঝতে পারছে হাতে একদম সময় নেই। কবীর চৌধুরী রওনা হয়ে গেলে তাকে হাতের মুঠোয় পাবার আর কোনও উপায় থাকবে না। পাগলের মত একটা বাক্স ধরে টানাহ্যাঁচড়া আরম্ভ করল ও। জানে না অস্ত্র এবং সোনা সহ ভারী বাক্স তুলতে পারবে কিনা। দু’বার চেষ্টার পর জায়গা থেকে বেরিয়ে এলো বাক্স। রানার কাঁধ-পিঠ-কোমরে যেন আগুন ধরে গেল। ওটাকে লম্বালম্বি করে দাঁড় করিয়ে ওপরে উঠল রানা, মিনিট পুরো হবার আগেই কোমিং দিয়ে উঠে পড়ল ডেকে। সোজা ছুটল স্টারবোর্ড রেইলের দিকে। রেইলটা ধরে রেখেছে, যাতে ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে না যায়। জাহাজের পোর্ট রেইলটা এখন পানির প্রায় সমান্তরালে চলে এসেছে। সাগরের পানি ঢুকছে হড়হড় করে। কবীর চৌধুরী যদি মটর লঞ্চ নামিয়ে থাকে তাহলে এতক্ষণে নামিয়ে ফেলেছে, অথবা দেরি করে ফেলেছে, আর পারবে না। ফরোয়ার্ড ডেক হাউসিং ঘুরেই লঞ্চটাকে দেখতে পেল রানা, রেইলের পাশে ভাসছে। সমস্ত দড়ি এখনও খোলা হয়নি বলে রওনা দিতে পারেনি চৌধুরী। শেষ দড়িটা নিয়ে পাগলের মত টানাহ্যাঁচড়া করছে সে এখন। তার দশ ফুটের ভেতর গিয়ে দাঁড়াল রানা, পিস্তল তাক করল। কবীর চৌধুরী মুখ তুলে তাকাচ্ছে না। ‘নড়বে না, কবীর চৌধুরী,’ কড়া গলায় নির্দেশ দিল রানা, দেখল চমকে গেছে লোকটা। ফ্যাকাসে হয়ে গেছে মুখটা। আস্তে আস্তে কবীর চৌধুরীর ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। ‘তাহলে শেষ পর্যন্ত তুমিই জিতলে, রানা! ভেবেছিলাম চিৎকারটা তোমার চালাকি হতে পারে, কিন্তু চেক করার সময় হাতে ছিল না। আমাকে নিয়ে কি করবে ভাবছ?’ ‘আইনের হাতে তুলে দেব।’ আস্তে করে মাথা নাড়ল কবীর চৌধুরী। ‘না, রানা, তা তুমি পারবে না। পারতে; যদি ঠাণ্ডা মাথার খুনী হতে। আমি সাগরে নেমে যাব, রানা, প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করব। প্রকৃতির হাতে মরতে আমার আপত্তি নেই। মানুষের হাতে মৃত্যু, সে আমার জন্যে নয়।’ বিষণড়ব হাসল কবীর চৌধুরী। ‘এই সাগরে আধঘণ্টার বেশি আমি টিকব না, রানা। যেতে দাও আমাকে।’ রানার চোখের দিকে তাকাল। ‘হয় যেতে দাও, নয়তো এখানে এখনই গুলি করে মেরে ফেলো।’ পাগল বৈজ্ঞানিকের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকল রানা একদৃষ্টিতে। আস্তে করে নামিয়ে নিল পিস্তল। ‘যাও।’ শেষ বারের মত রানার দিকে তাকাল কবীর চৌধুরী, তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে সাগরে ঝাঁপ দিল। পাঁচ মিনিট মূর্তির মত দাঁড়িয়ে থাকল রানা। দূরে চলে যাচ্ছে কবীর চৌধুরী। আর বেশিক্ষণ সাঁতরাতে পারবে না। সাগর আবার অশান্ত হয়ে উঠছে। তীর থেকে অন্তত দশ মাইল দূরে আছে ওরা। কবীর চৌধুরী মারা যাবে। ৩৮ সত্যিকার প্রতিভাবান কিন্তু বিপথগামী একজন মানুষের করুণ পরিণতির সাক্ষী ও, দীর্ঘশ্বাস ফেলে লঞ্চে উঠল রানা, দড়ি কেটে ওটাকে মুক্ত করে দিল। জাহাজ থেকে সরে এলো লঞ্চ, দুলছে ঢেউয়ের দোলায়। অন্তত এক হাজার গজ চলে গেছে কবীর চৌধুরী, আর বেশিক্ষণ তাকে দেখা যাবে না এই মেঘলা বিক্ষুব্ধ আবহাওয়ায়। তাকিয়ে থাকল রানা। তারপর নিজেকে উজবুক মনে হলো ওর। কবীর চৌধুরীর সরাসরি সামনে একটা সাবমারসিবলের কালো রঙের কনিং টাওয়ার ভেসে উঠেছে! তিন মিনিটের মাথায় রানার চোখের সামনে সাবমারসিবলের ভেতর ঢুকে গেল কবীর চৌধুরী, একটু পরই বেরিয়ে এলো আবার। হাতে একটা মেগাফোন। স্পষ্ট শুনতে পেল রানা কবীর চৌধুরীর কণ্ঠ। ‘রানা, ডুবিয়ে মারব তোমাকে আমি। বিদায়।’ আরেকটু হলেই সাবমারসিবলটা চিঁড়েচ্যাপ্টা হয়ে যেত। নিচু মেঘের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে তেড়ে ফুঁড়ে ওটাকে পাশ কাটাল বাংলার গৌরব, মাস্তুলে পতপত করে উড়ছে বাংলাদেশী পতাকা। চমকে গেল কবীর চৌধুরী, সামলে নিয়ে মেগাফোনটা আবার মুখের সামনে তুলল। ‘পারলাম না, রানা। এবার তুমিই জিতলে। তবে ভেবো না পার পাবে। আবার দেখা হবে আমাদের।’ সাবমারসিবলের ভেতর ঢুকে গেল সে। ডুবে গেল সাবমারসিবলটা। মাথার ওপর গুঞ্জন শুনল রানা। অনেকগুলো পে-ন যাচ্ছে। ওর লঞ্চের পাশে থামল ডেস্ট্রয়ার, দড়ির মই ফেলা হলো নিচে। লঞ্চ ছেড়ে ডেস্ট্রয়ারে উঠল রানা, ডেকে পা দিতেই ওকে জড়িয়ে ধরল সোহেল। কাতরে উঠল রানা, ‘আস্তে, শালা, আহত হয়েছি।’ তাড়াতাড়ি রানাকে ছেড়ে দিল সোহেল, অপ্রস্তুত হেসে বলল, ‘শেষ দৃশ্যটা দেখবি না?’ আঙুল তুলে দেখাল। ‘ওদিকে তাকিয়ে থাক্।’ পাঁচ মিনিট পর দেখা গেল আগুনের ঝিলিক। বহুদূর থেকে ভেসে এলো ভোঁতা ভারী গর্জন। আমেরিকান বম্বার বোমা ফেলছে গ্যালোস কে’তে। ‘পাঁচশো মেরিন নামবে,’ জানাল সোহেল। ‘কবীর চৌধুরী ধরা পড়বে সদলবলে।’ মাথা নাড়ল রানা। ‘আমার ভুলে আবারও ফস্কে গেছে কবীর চৌধুরী।’ ডুবন্ত জাহাজটা দেখাল। ‘কনক তরী।’ ‘হ্যাঁ,’ ডুবন্ত জাহাজটার দিকে তাকাল সোহেল, ‘স্বর্ণতরী। তুই থাক্, আমি এক্ষুণি আসছি।’ দ্রুত পায়ে ব্রিজের দিকে চলে গেল সোহেল, সেখান থেকে রেডিয়ো রূম হয়ে ফিরে এলো একটু পর। রানা একদৃষ্টিতে দিগন্তের আগুনের ঝিলিক দেখছে। রানার কাঁধে হাত রাখল সোহেল। ‘গভীরতা মাত্র তিরিশ ফ্যাদম। কালকের মধ্যে সোনা তুলে রওনা হয়ে যাব আমরা দেশের পথে। ডেস্ট্রয়ারে চিকিৎসক আছে, তোর কোনও অসুবিধে হবে না। বস্কে জানিয়েছি মিশন সাক্সেসফুল। নিজে থেকে এক মাসের ছুটি মঞ্জুর করেছেন তিনি তোকে।’ আস্তে করে ঘুরে দাঁড়াল রানা, সোহেলের সঙ্গে পা বাড়াল। ক্লান্তিতে ভেঙে আসছে শরীর। নানা জায়গায় জ্বলছে পুড়ছে চামড়া মাংস। বিশ্রাম দরকার ওর। অনেক বিশ্রাম। সুস্থ হলেই আবার ঝাঁপিয়ে পড়বে কোনও না কোনও অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে। তারপর একদিন কোনও এক অ্যাসাইনমেন্ট থেকে আর ফিরবে না ও। ***


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৩১ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now