বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
কাঁধের পাশ দিয়ে শোঁশোঁ শব্দে ব্যাস্ত গাড়ি গুলো ছুটে যাচ্ছে। প্রকৃতির ব্যাস্ততা দেখে আমি ভীষণ আনন্দ পাই। যার যেটার অভাব, সে হয়তো সেটা নিয়ে বেশী আনন্দ পায়। আমার কোন ব্যাস্ততা নেই, ব্যাস্ত হবার কোন জায়গা নেই।
রাত এখন কয়টা বাজে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। একবার মনে হচ্ছে মাত্র সন্ধ্যা নেমেছে। আবার বদ্ধ শহড়ের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছে, না। এখন অনেক রাত। মধ্যরাতের আকাশ থমথমে হয়! হাতের ঘড়িটার দিকে তাকালাম। রাত নয়টা পনেরো। হাতের ঘড়িটার দিকে তাকাতেই মীরার কথা মনে পড়লো। সেদিন প্রথম আমরা রাতে রিকশা করে ঘুরতে বের হয়েছি। নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়। মাত্র শীত পড়তে শুরু করেছে। এরকম পরিবেশে মানুষ প্রায়ই খুব বিভ্রান্তি তে পড়ে। হয়তো বাইরে শীত আছে ভেবে, সোয়েটার পড়ে বের হয়ে গরমে ঘেমে যাবে। সোয়েটার খুলে হাতেও নিতে পারবে না, গরমও সহ্য করতে পারবে না। তখন বাথরুম চাপা ভঙ্গিতে টাইট মেরে বসে থাকা ছাড়া আর উপায় নেই। আমি বরাবর উল্টো পথে হাঁটি। বাইরে শীত নেই ভেবে, পাতলা একটা শার্ট পড়ে বের হয়েছি। মৃদু ঠান্ডা বাতাসে রিকশার এক কোনে জড়থব হয়ে বসে থাকতে দেখে মীরা আমাকে ওর চাদর টা টেনে নিতে বলল। ও ভীষণ সেন্সিটিভ মেয়ে। সব ব্যাপারে বরাবর পারফেক্ট। মহাবিশ্বে কয়েকজন পারফেক্ট নারীর নাম নিয়ে লিস্ট করা হলে, মীরার নাম সেখানে থাকবে। এরকম একটা মেয়ে আমার প্রেমিকা কিভাবে হলো কে জানে!
এলিফেন্ট রোডে সাড়িসাড়ি জুতার দোকান। আমি দোকানগুলো দেখছি। মানুষের ব্যাস্ততা দেখছি। মীরার চাদরটা ভালো উষ্ণতা দিচ্ছে। মীরা এক হাত দিয়ে আমার একটা হাত ধরে রেখেছে। এটা উষ্ণতা হিসেবে আরো ভাল কাজ করছে। মীরা বলল- দেখো তো কটা বাজে?
আমি চাদর থেকে হাত বের করে সময় দেখলাম।
বললাম- বেশী না। আট টা ছুঁইছুঁই। মীরার চোখ পড়লো আমার ভাঙা ঘড়ির দিকে। ঠিক করলো তখনই আমাকে ঘড়ি কিনে দিবে। মীরা যখন যেটা বলবে তার নড়চড় হওয়া একদম চলবেনা। আমি মানা করলেও চলবে না। আমাকে টেনে নিয়ে গিয়ে নতুন ঘড়ি কিনে দিলো। পুরোনো ঘড়িটা খুলে, এই ঘড়িটা আমার হাতে পরিয়ে দিলো। কারো পিছনে টাকা খরচ করে কেউ এতো খুশি হতে পারে, এটা মীরাকে দেখে উপলব্ধি করতাম। মীরা গালভড়া হাসি নিয়ে বলল, এখন থেকে যতবার তুমি টাইম দেখবে, তোমার আমার কথা মনে পড়বে। দেখেছো আমি কত লাকী!
আমি মীরার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলাম। শুরুতে খুব একটা পাত্তা দিইনি কথাটায়। পরে দেখলাম ব্যাপার টা সত্যি। আসলেই যতবার সময় দেখতে হচ্ছে মীরাকে মনে পড়ছে। এখন অবিশ্যি মীরাকে নিয়ে চিন্তা করাটা ঠিক হচ্ছে না! যে মেয়েটার আজ রাতেই গায়ে হলুদ, তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখার কোন অধিকার কী আমার আছে? এই অধীকার এখন শুধু সেই ইতালী ফেরত ডক্টরের। যার সাথে মীরার বিয়ে ঠিক হয়েছে। ঘড়িটা হাত থেকে খুলে ছুঁড়ে ফেলে দিলাম অনেক দূরে। বিরক্ত লাগছে। ছুঁড়ে দেয়ার আগে শেষবারের মত সময় টা দেখে নিলাম। যেনো শেষবারের মত মীরাকে একটুখানি দেখে নেয়া! খানিক দূরে গপ করে একটা শব্দ হলো। শব্দ টা দূরে হলেও, আঘাত টা খুব কাছে হলো। একদম বুকের ভেতর কোন এক মায়া বিন্দুতে চিনচিন ব্যাথায়! এখন নয়টা সাইত্রিশ বাজে। আচ্ছা সময় এতো ধীর গতিতে এগুচ্ছে কেন? প্রকৃতি কি ইচ্ছে করেই সময়কে স্থির করে দিয়েছে?
দোকানে চোখের সামনে কেক ঝুলতে দেখে ক্ষিধের অস্তিত্ব টের পেলাম। যদিও আমার খেতে ইচ্ছে করছে না। কেক কেনার টাকাটা আছে কিনা এটাও দেখে নেয়া দরকার। পকেট হাতড়ে পনেরো টাকা পেলাম। দুইটা পাঁচ টাকার নোট। দুইটা কুঁচকে যাওয়া আধামরা দুই টাকার নোট। আর একটা এক টাকা! কেক খাবার পেছনে সর্বোচ্চ পাঁচ টাকা খরচ করা যাবে। বাকী দশ টাকা নিয়ে আমার অন্য মতলব আছে। সমস্যা হচ্ছে কেক পার-পিস ছয় টাকা করে!
-মামা কেক কত?
-ছয় ট্যাকা।
-আমার কাছে পাঁচ টাকার বেশী নেই মামা।
দোকানদার মামা মাথা নিচু করে ছিল। মাথা উঁচু করে আমার দিকে হা করে তাকালো! হয়তো ভাবছে, আমার মত শিক্ষিত দেখতে একটা ছেলের কাছে পাঁচ টাকার বেশী নেই এটা কেমন কথা! লোকটা কিছু না বলেই আমাকে একটা কেক এগিয়ে দিলো। আমি বসতে বসতে কেকে আলতো একটা কামড় দিতেই, লোকটা খুব দ্রুত আমার দিকে এক কাপ গরম চা বাড়িয়ে দিলো। চায়ে ধোঁয়া উড়ছে। লোভ ধরার মত ধোঁয়া!
- আমার কাছে চা খাওয়ার মত অর্থ নেই। আমি একজন অর্থ-প্রতিবন্ধী।
-ট্যাকা লাগবো না। আপনি চা খান।
লোকটার মুখে হাসি। আমি লজ্জিত চোখে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে কেক ডুবিয়ে মুখে নিলাম। মীরা এখন পাশে থাকলেই রেগে যেতো। বলতো- আশ্চর্য! চায়ের মধ্যে কেউ কেক ডুবিয়ে খায়?
আমি বলতাম- অনেকেই তো খায়! শোনো মীরা, আমার এক ছাত্রীর বাবা একটা প্রাইভেট কম্পানির চিফ এক্সেকিউটর। আমি তাকে দেখেছি চায়ে কেক ডুবিয়ে খেতে।
-পৃথিবীর সবাই খেলেও তুমি খাবে না। বুঝছো?
আমি ঘাড় নাড়িয়ে বলতাম তুমি বললে কেক ই খাবো না। মজার ব্যাপার হচ্ছে, মীরা যতক্ষণে ব্যাপার টা আমাকে বোঝাতো, বেশীরভাগ সময়ই ততক্ষণে আমার কেক খাওয়া শেষ হয়ে যেতো। আশ্চর্য ব্যপার হচ্ছে এখন চায়ে কেক ডুবিয়ে খেতে আমার অস্বস্তি লাগছে। কিছুক্ষণের জন্য আমার মনে হলো, চায়ে ভেজানো কেক খাবার তৃপ্তি টা কেবল মীরা পাশে থাকলেই পাওয়া যাবে। দোকানদার মামা শুষ্ক গলায় আমাকে বলল- আপনার লগে একটা আফারে দেখতাম। সে কই?
আমি ধাক্কা খাবার মত আঁতকে উঠে লোকটার দিকে তাকালাম। এই লোক মীরার কথা কীভাবে জানে!
-ভাইজান আমারে চিনতে পারেননাই মালুম করি।
গফুর ভাইয়ের এর আগে ধানমন্ডি ১৫ তে চায়ের টঙ ছিল। আগে মীরাকে নিয়ে ওনার টঙে প্রায় বসতাম। মীরা আমাকে চা কেক খাওয়াতো। প্রতি বুধবারে তিনি স্পেশিয়াল সিঙারা বানাতেন। অসাধারণ খেতে। এখানেও মীরার আপত্তি ছিল। সিঙারার সাথে পিঁয়াজ খাওয়াটা ওর এক বিন্দু পছন্দ না।
লোকটা কেনো আমায় যত্ন করে চা বানিয়ে খাওয়ালো এবার বোঝা গেলো। আমি এবার হকচকিয়ে বললাম- আপনার আগের টঙ এর কী হয়েছে?
-আর কইয়েন না ভাই। ট্রেনাসফার হয়ে আসছি এইখানে। ওইখানে কিছু চেংরা পোলাপান চা বিস্কুট খেয়ে পেরায়ই বিল দিতো না। ত্যাক্ত করতো। আমি গরীব মানুষ। এতো ট্যাকার বিল মাইর খাইলে, সংসার চলব না।
-আমাকে তো ফ্রি চা খাওয়ালেন। সমস্যা হবে না আপনার?
-কি যে কন ভাইজান! এমনে শরম দিয়েন না তো। একটা কথা তো কইলেন না। আফার কি খবর? ওনারেও অনেকদিন দেখি না। আপনারে কি যত্ন করে চা কেক খাওয়ায় দিতো! আমি ব্যাফক মজা নিয়ে দেখতাম!
-এ জীবনে কখনো আর দেখতে পারবেন বলে মনে হচ্ছে না।
-আপনাদের মান অভিমান হইছে বুঝি? এসব একটু আধটু হয়াই থাকে ভাইজান। মান অভিমানে পেরেম বাড়ে।
আমি চুপ করে রইলাম। সব মান অভিমানে প্রেম বাড়ে না। বাড়লেও সেটা হয়- অর্থহীন। এটা কি গফুর ভাই বুঝবে?
-আপনার আপা খুব শীঘ্রই ইতালি চলে যাচ্ছে। আজ রাতে তার গায়ে হলুদ ছিল। হাজবেন্ড ইতালি থাকে।
গফুর ভাইয়ের মন টা বোধহয় খারাপ হয়ে গেলো। একটু বেশীই খারাপ। লোকটা আমার দিকে করুনার দৃষ্টিতে তাকালো। করুনা আমার পছন্দ না। আমার চা খাওয়া শেষ। আমি উঠে দাঁড়ালাম।
-আপনার কি মন খারাপ হয়ে গেলো গফুর সাহেব? মন খারাপ হবার কিছু নাই। আমি ভাল আছি। দেখছেন না কী আরাম করে স্বাধীনভাবে চায়ে কেক ডুবিয়ে খাচ্ছি। আপনার আপা থাকলে কি এটা পারতাম?
গফুর সাহেব আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েই রইলো। পড়ালেখা কম জানা মানুষেরা খুব সহজে অন্যের চোখ পড়ে ফেলতে পারে। যে মানুষ যত অশিক্ষিত, সে মানুষ তত সহজে অন্যের ভেতরের কথা পড়তে পারে। এসব ব্যাপারে শিক্ষিত মানুষ অনেক পিছিয়ে আছে। গফুর সাহেব সম্ভবত আমার ঠোঁটের কোনে হাসি আর চোখের কোনে জমে থাকা জল একই সাথে দেখাটা মেনে নিতে পারছে না!
.
ঠান্ডা পরতে শুরু করেছে। পাতলা একটা শার্ট পড়ে ঠান্ডাকে হার মানানোর চেষ্টা করছি। ঠান্ডায় আমার সমস্যা হয়। বুকে একটা ব্যাথা করে। কীসের ব্যাথা কে জানে! মীরা অনেকবার আমাকে ডক্টর দেখাতে বলেছিলো। দেখানো হয়নি। শীত একটু বেশী হলেই মীরা ফোন করে আদুরে গলায় জিজ্ঞেস করতো- বুকের ব্যাথাটা কি আর হয় তোমার?
আমি গুছিয়ে মিথ্যেটা বলতাম। না ব্যাথা নেই। মীরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতো। এমনও হয়েছে আমি ব্যাথায় বুকে আগুনের তাপ দিচ্ছি, অথচ মীরাকে বলতাম ব্যাথাটা বোধহয় সেড়ে গেছে মীরা। এখন খালি গায়ে কাঁপতে কাঁপতে বাইরে বের হলেও ঠান্ডায় বুকে ব্যাথা হয় না। দারুন না?
-আজব তো! তুমি খালি গায়ে বাইরে বের হবে কোন দুঃখে?
আমি চাপা হাসি দিয়ে বলতাম কথার কথা বলেছি। খালি গায়ে বের হবো কোন দু:খে!
আমি স্বভাবত মিথ্যে বলতে পারি না। মোবাইল ফোন আবিষ্কারের পরে মিথ্যে না বলতে পারা মানুষগুলোর সুবিধাই হয়েছে। মোবাইল ফোনে খুব সহজে মিথ্যে বলা যায়। চোখ দেখা যায় না। আমার ধারণা চোখটাই সত্যি মিথ্যার বিভেদ।
তবে মীরাকে এই মিথ্যে টা বলে আমার ভাল লাগতো। মীরা খুশি হতো, আমিও খুশি। খুশিতে বুকের ব্যাথা কমে আসতো! এই মুহূর্তে বুকের ব্যাথাটা কমিয়ে আনতে পারছি না। ব্যাথা প্রবল থেকে প্রবল হচ্ছে।
রাত কটা বাজে জানতে পারলে ভাল হতো। ভুল করে হাতের দিকে তাকালাম। হাতে মীরার দেয়া ঘড়িটা নেই। সেখানে একটা শূন্যতা। মীরার কথা মনে পরতেই বুকের ব্যাথা আরেকটু বাড়লো। কে জানে, বাকী জীবনে হয়তো যতবার হাতের দিকে তাকাবো মীরার কথাই মনে পড়বে। হাতের ছায়ায় মীরার স্পর্শ লেগে আছে। একজন লোককে তাড়াহুড়ো করে আমার দিকেই হেঁটে আসতে দেখলাম। ভীষণ ব্যাস্ত মানুষ। এনাকে থামিয়ে টাইম টা জেনে নেয়া যায়।
-এক্সকিউজ মি ভাই। কটা বাজে একটু বলতে পারবেন?
লোকটা পকেট থেকে মোবাইল বের করে বলল- ১১ টা ৩। বলে নিজেই আঁতকে উঠলো! এবার আগের থেকেও বেশী দ্রুত হাঁটতে শুরু করলো।
এতো রাতেও রাস্তার পাশে ফুলের রমরমা ব্যাবসা। শীতকালে ফুলের ব্যাবসা ভাল হয়। গোলাপ ফুল গুলো দেখে লোভ হলো। পকেট থেকে ১০ টাকা দিয়ে একটা গোলাপ ফুল কিনলাম। ফুলের বেপারীকে টাকা দিয়ে নিজেই বোকা হয়ে গেলাম। আমার তো ফুল দেয়ার মানুষ নেই! আচ্ছা এখন গোলাপ টা নিয়ে মীরার বাসায় উপস্থিত হলে কেমন হবে? অনেক আগে মীরাকে একবার দুষ্টুমি করে বলেছিলাম- মীরার অন্য কোথাও বিয়ে ঠিক হলে, ওকে গায়ে হলুদের রাতে তুলে নিয়ে আসবো। সত্যি সত্যি এখন সেখানে উপস্থিত হলে মীরা কি অবাক হবে? যদি গোলাপ টা তার হাতে তুলে দিয়ে বলি- মীরা চলো তো আমার সাথে। গফুর সাহেব আমাদের জন্য চা কেক নিয়ে অপেক্ষা করছেন। দোকান বন্ধ হবে ১ টায়। ১ ঘন্টা হাতে আছে।
মীরার চেহারাটা তখন কেমন দেখাবে ভাবতে ইচ্ছে করছে। মীরা কি আমাকে ফিরিয়ে দিবে? অবশ্যই ফিরিয়ে দিবে। বিয়ে কোন ছেলেখেলা না।
.
মীরার বাসার গলি ধরে হাঁটছি। সম্পর্কের তখন দুই বছর। একবার মীরা আমার সাথে রাগ করে সব ফোন বন্ধ রেখে, ভার্সিটিতে যাওয়া অফ করে দিলো। ৫ দিন কোন যোগাযোগ নেই। কোন উপায় না পেয়ে, আমি রাত বারটায় মীরার বাসার নিচে গোলাপ নিয়ে উপস্থিত হলাম। এতো রাতে মীরার সাথে দেখা হবার কোন সম্ভাবনা নেই। কিন্তু কাকতালিয় ভাবে মীরা সেদিন রুমের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। আমি ওর সামনে তিনবার কান ধরে উঠবস করলাম। মীরা দৌড়ে নিচে নেমে আমার সামনে এসে দাঁড়ালো। মেয়েটার যথেষ্ট সাহস আছে। তবে এতোটা সাহস আমি আশাও করিনি। এতোদিন পর ওকে দেখে আমার চোখ সেদিন ছলছল করলো। আমার চোখ দেখে মীরা আমাকে কাছে টেনে জড়িয়ে ধরলো। আমি- সরি বললাম। মীরা আমার বুকে মাথা ঠেসে রেখেই বলল- চুপ। একদম চুপ।
দশ মিনিট হবে মীরার বাসার নিচে এসে দাঁড়িয়ে আছি। আজ বারান্দায় কেউ নেই। আমি কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থেকে আবার হালছেড়ে হাঁটতে আরম্ভ করবো কি-না ভাবছি। একবার কি পিছু তাকিয়ে শেষবারের মত দেখে নিব মীরা এসেছে কি-না? মীরা এসেছে। মীরা জানত আমি আসবো। গায়ে হলুদ রঙের শাড়ি। চুল গুলো বাগানখোঁপার মত সাজানো। বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছে মীরা। চোখে ঢেউ খেলানো কাজল দেয়া। বিয়েবাড়ির লাইটিং এর আলোয় মীরার চোখের জল ঝলমল করছে। আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। মীরা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। অন্ধকারে কেবল আমার অস্তিত্বই দেখতে পাবে ও। চোখ দেখতে পাবে না। আচ্ছা মীরা কি আজ দৌড়ে নামবে সেদিনের মত? আমাকে কি আরেকবার জড়িয়ে ধরবে? বুকে মাথা ঠেসে দিয়ে কি বলবে- আসতে এতো দেরী করেছো কেন?
আজ মীরা সাহস দেখাচ্ছে না। কিছুক্ষন কি অপেক্ষা করবো আমি? ঠিক হবে না। আমার জন্য মেয়েটা কাঁদছে। আমাকে যত দেখবে কষ্ট তত বাড়বে। আমার যত দ্রুত সম্ভব এখান থেকে চলে যাওয়া উচিৎ। নাকি অন্তত একবার মীরাকে বলা উচিৎ- আমি তোমাকে নিয়ে যেতে এসেছি।
আমি চাপা গলির রাস্তা দিয়ে আবার হাঁটতে আরম্ভ করলাম। আজ রাস্তায় কোন আলো নেই। কেমন যেনো ঘোলাটে অন্ধকার। অন্ধকারে আমার চোখ দেখতে পাচ্ছে না কেউ। আমার চোখে কি জল আছে? থাকলেও সেটা অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে। পেছনে তাকিয়ে কি মীরাকে আরেকবার দেখে নিবো? আমি আর পিছনে তাকালাম না। আচ্ছা এমন কি হতে পারে না, এখনই আমার কাঁধের পেছনে একটা মেয়ের ঠান্ডা হাতের স্পর্শ পড়বে? আমি পিছু তাকিয়ে দেখবো মীরা চোখে জল নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। হয়তো অদ্ভুত বাঁচার নেশাতেই আমি এসব উদ্ভট উল্টাপাল্টা ভাবছি। আমার স্বার্থপর মন নিজের স্বার্থের জন্য এসব ভাবছে। হতে পারে। বস্তুত এটা হওয়া সম্ভব না। আমি জানি আমার জল ফড়িং টা এখনো বারান্দায় নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে- আমার জন্য চোখের জল ফেলছে।
[] লিখাঃ স্বপ্নবাজ হৃদয় []
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now