বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন-৭

"উপন্যাস" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X "ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন" মেরি শেলি অনুবাদ: সুনীলকুমার গঙ্গোপাধ্যায় ---------------------------- সাত ☆☆☆দৈত্যের আবির্ভাব☆☆☆ পর পর দ্রুতগতিতে কয়েকটি অস্বাভাবিক ঘটনা সংঘটনের ফলে মানুষের অনুভূতি উত্তেজনার চরম শিখরে ওঠার পর যে নিস্ক্রিয় জড়তা মৃত্যুর মতো সমস্ত দেহকে শীতল করে রাখে, তার চেয়ে বেদনাকর বোধহয় আর কিছুই নেই। মানুষ তখন আশা-ভরসা, জীবন-মৃত্যু, ভয়-ভাবনার অতীত। জাস্টিনের ফাঁসি হয়েছে, মৃত্যুর পরে সে শান্তি লাভ করেছে; কিন্তু ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন আজও জীবিত, সমস্ত হৃদয় জুড়ে নৈরাশ্য আর বেদনা। তাঁর চোখ থেকে ঘুম চলে গেছে। এক লক্ষ্যহীন প্ৰেতাত্মার মতো তিনি এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। অবর্ণনীয় বীভৎস অন্যায় তিনি করেছেন এবং সেই পাপের ফলে ভবিষ্যতে আরো কত বীভৎস ঘটনা ঘটবে। অতীতের দিকে তাকিয়ে তিনি কোথাও এতটুকু খুশির আলো দেখতে পেলেন না, ভবিষ্যতে কোনো আশার স্বাক্ষর নেই। তার সমস্ত মন ধীরে ধীরে আত্মগ্রাসী বিমৰ্ষতায় অধিকার করল, নিজেকে মনে হল ঘূণ্য অপরাধী—তারপর যে মানসিক অত্যাচার, তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। মানসিক এই অবস্থায় তাঁর শরীর ভেঙে গেল। বিজ্ঞান-সাধনার পুরস্কারের পরিবর্তে প্রথম রূঢ় আঘাতের পর থেকেই তিনি শারীরিক বিশেষ সুস্থ ছিলেন না। তিনি লোকের সঙ্গ এড়িয়ে যেতে লাগলেন। কোথাও কোনো আনন্দ বা কারুর এতটুকু আত্মপ্রসাদ তাঁর কাছে নির্যাতন বলে মনে হত! নির্জনতা—গভীর, অন্ধকার—মৃত্যুর মতো নির্জনতা ছিল তাঁর একমাত্র সান্তনা। অন্ধকারে ঘুরে বেড়াতেন। কখনো কখনো লেকের মাঝখানে এসে হাল তুলে নিয়ে চুপচাপ বসে থাকতেন—নৌকোটি নিজের খুশিমতো যেমন ইচ্ছা, যেখানে ইচ্ছা যাক। লেকের জলে তাঁর কুৎসিত ছায়া দেখে ভাবতেন যে এত সুন্দর স্বর্গীয় পরিবেশের মধ্যে শুধু গুটিকয় ব্যাঙ বা বাদুড় ছাড়া তার মতো অস্থির, তাঁর মতো কুৎসিত আর কেউ নেই। মাঝে মাঝে তাঁর ইচ্ছা হত যে শান্ত শীতল লেকের জলে ঝাঁপিয়ে পড়তে; লেকের নির্মল জলে তাঁর সমস্ত ভয়, ভাবনা, দুঃখ, অশান্তির পরিসমাপ্তি এনে দিতে। কিন্তু তখনই মনে হত তাঁর বাড়ির লোকজনের কথা। নিজে আত্মরক্ষা করে আর সকলকে সেই শয়তানের নিষ্ঠুর হিংস্রতার মুখে ঠেলে দিয়ে যাবেন! প্রতিদিন তিনি ভগবানের কাছে প্রার্থনা করতেন যে, যেন তার মনে একবার শান্তি ফিরে আসে, যেন তিনি পরিবারের প্রত্যেককে সান্তুনা দিতে পারেন, সুখী করতে পারেন। কিন্তু তা হতে পারে না। মনস্তাপ সমস্ত আশা নির্মূল করে দিয়ে যায়! তিনি এক ঘৃণ্য পশু সৃষ্টি করেছেন। প্রতিদিন তিনি ভয়ে ভয়ে থাকতেন— আবার কখন সেই দৈত্যটি এমন এক নৃশংস কুকীর্তি করবে যা তার অতীতের সমস্ত নিষ্ঠুরতাকে ছাপিয়ে যাবে। যতদিন তাঁর প্রিয়তমদের মধ্যে একজনও জীবিত থাকবে ততদিন এই ভীতি থাকবেই। যখনই তার অপরাধ আর বিদ্বেষের কথা তার মনে হত তখনই তার প্রতি ঘৃণায় আর তার কৃতকর্মের জন্য প্রতিহিংসায় তাঁর সমস্ত মন-প্রাণ অস্থির হয়ে উঠত। যদি এন্ডিস্ পর্বতের সুউচ্চ চূড়া থেকে ফেলে দিয়ে তাকে হত্যা করা সম্ভব হত, তবে সেই দুৰ্গম পর্বতশিখরে ছুটে যেতে তিনি বিন্দুমাত্র কুষ্ঠিত হতেন না। মাঝে মাঝে তাকে সামনাসামনি পাওয়ার জন্য তিনি অধীর হয়ে উঠতেন, এতগুলো লোককে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করার শাস্তি কীভাবে তাকে দেওয়া যায়—তা কল্পনা করতে না পেরে আরো অস্থির হয়ে উঠতেন। এলিজাবেথ তাঁকে সান্তুনা দেওয়ার চেষ্টা করত, কিন্তু বন্ধুত্বের অন্তরঙ্গতা, স্বৰ্গ বা মর্ত্যের সৌন্দর্য তাঁর আত্মাকে দুঃখের থেকে মুক্তি দিতে পারত না; বন্ধুত্ব, ভালোবাসা, দয়া, মায়া, মমতা—তাঁর বিকল হৃদয়ের কাছে বিফল। তাঁকে ঘিরে যেন এক কালো মেঘ, যাকে ভেদ করে কোনোকিছু ভালো কাছে যেতে পারে না। একটি আহত হরিণ। যেমন নিজের অসাড় দেহকে টানতে টানতে এক নির্জন স্থানে এনে তার দেহ-বিদ্ধ তীরের দিকে একদৃষ্টি তাকিয়ে থেকে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ে, তারও ঠিক সেই একই অবস্থা। এই রকম মানসিক বিপর্যয়ের মধ্যে একদিন তিনি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়লেন। আল্পস্ পাহাড়ের উপর উপত্যকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মধ্যে মানসিক অবসাদকে নিমগ্ন করে দিতে চাইলেন তিনি। সামুনি উপত্যকার দিকে তিনি পা বাড়ালেন। সারভক্স উপত্যকার মতো সুন্দর না হলেও এই উপত্যকা অপূর্ব মহিমময়। উঁচু তুষারমণ্ডিত পর্বত দিয়ে এই উপত্যকার সীমারেখা আঁকা, কোথাও পাহাড়ের উপর বিধ্বস্ত দুর্গের চিহ্ন নেই। বিরাট হিমানীপ্রবাহের পতনের গুরুগম্ভীর শব্দ আর তার যাত্ৰাপথ ধরে শীতল ধোঁয়া সকলকে বিস্ময়াভিভূত করে রাখে। সব ছাপিয়ে সর্বোচ্চ গিরিশৃঙ্গ মঁ ব্লাঁ—একেশ্বরের মতো মাথা তুলে দাঁড়িয়ে। বিমুগ্ধ নয়নে ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন সেই নৈসৰ্গিক শোভা দেখতে লাগলেন। হঠাৎ তিনি দেখলেন দূর থেকে মানুষের চেহারার মতো কী একটা যেন অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে তাঁর দিকে ছুটে আসছে। বিপদসঙ্কুল বরফের চাইয়ের উপর দিয়ে সে লাফিয়ে লাফিয়ে আসছে, যা যে-কোনো মানুষের পক্ষেই বিপজ্জনক। তাঁর মাথা ঝিম ঝিম করতে লাগল। যতই সেই মূর্তিটি তাঁর দিকে এগিয়ে আসতে লাগল, ততই তিনি স্পষ্ট বুঝতে পারছিলেন যে সে আর কেউ নয়, তাঁর সৃষ্ট সেই শয়তান। তার সঙ্গে চিরকালের মতো শেষ বোঝাপড়ার জন্য তিনি মনে-মনে তৈরি হলেন। তিনি ছুটে গেলেন তার দিকে। চিৎকার করে উঠলেন—শয়তান! পিশাচ! তুই-ই আমার ছোটভাইকে খুন করেছিস! তোর জন্যই জাস্টিনের ফাঁসি হয়েছে। আমি তোকে কী করতে পারি জানিস? আবার তুই আমার সামনে এসেছিস? চলে যা, দূর হ— সে দাঁড়িয়ে রইল নির্বাক হয়ে। তারপর চলে যাওয়ার জন্য ফিরে দাঁড়াল। তিনি আবার বললেন—কোথায় যাচ্ছিস? আগে যাদের তুই খুন করেছিস, তাদের সকলকে ফিরিয়ে দিয়ে যা। নয়তো আমিই গড়েছি তোকে, আমিই আবার তোকে ভেঙে চুরমার করে দেব। খানিকক্ষণ সে ব্যথিতের মতো দাঁড়িয়ে রইল। তারপর তার পীতাভ চোখদুটো তুলে ধরল। বলল-যতখানি ব্যথা দেবে ভেবেছিলে, ততখানি পাইনি। আমি তোমার কাছে অনেকটা এইরকম ব্যবহার আশা করেছিলাম, ঠিক তাই-ই পেয়েছি। কিন্তু কেন আমাকে ঘৃণা করো-কেন আমাকে হত্যা করতে চাও? ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের চোখদুটো অসহ্য রাগে জ্বলে উঠল, বললেন—কেন হত্যা করতে চাই! আমি তোকে সৃষ্টি করেছিলাম অতিমানুষ করার জন্য, কিন্তু তুই অমানুষ হলি। তারপর তুই যথেচ্ছাচার করে চলেছিস। মানুষের রক্তে সারা পৃথিবী রাঙিয়ে দিয়ে তোর তৃপ্তি হল না, তার ওপর আমারই ছােটভাইকে হত্যা করেছিস? আমি তোর সৃষ্টিকর্তা—আর আমারই সংসারে তুই মৃত্যুর কালিমা এনে দিয়েছিস! দৈত্যের চোখ বোধ হয় ছলছল করে উঠল, বলল—তোমার ভাইকে হত্যা করার ইচ্ছা ছিল না। আমার। সত্যি বলছি, হে আমার ভগবান, আমায় বিশ্বাস করো। সব ঘটনাই তোমাকে একে একে বলছি, কিন্তু তার আগে তুমি আমায় ক্ষমা করে। বলো ক্ষমা করলে! তিনি বিদ্রুপের হাসি হেসে উঠলেন-ক্ষমা! বলতে লজ্জা করে না? তুই এমন এক সৃষ্টি—যে চারদিকে অশান্তি আনছে। যার নিছক আনন্দ হচ্ছে লোককে খুন করা। তুই আমার চোখের ঘুম নিয়েছিস, মুখের হাসি নিয়েছিস, মনের শান্তি নিয়েছিস-তোকে ক্ষমা করব? শয়তান! এবারে দৈত্যটি যেন সত্যিই কেঁদে ফেলল, বলল—আমি জানি, আমার জীবনের সমস্ত দুঃখময় কাহিনী শুনলে তুমি আমাকে নিশ্চয়ই ক্ষমা করবে। তুমি আমার স্রষ্টা, কিন্তু তুমিই আমার সমস্ত দুঃখের কারণ। তাই আজ তোমাকেই আমি শুধু বলতে চাই, কেন আমি হিংসাবৃত্তি নিলাম। তুমি ততটুকু শুধু ধৈর্য ধর। তারপর তোমার যা খুশি তাই করো। শুধু আজ আমার একটু কথা শোনো— (চলবে) ------------- ।। একাকী কন্যা ।।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৭৭ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now