বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

ভিক্ষা বিলাস

"রোম্যান্টিক" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান Sayemus Suhan (০ পয়েন্ট)

X আজ রোদের তেজ একটু বেশী তাই গরমটাও অসহ্য লাগছে। সবকিছু উপেক্ষা করে তবুও মানুষ তার গন্তব্যে ছুটে চলেছে অনবরত। কেউ অফিসে, কেউ স্কুল-কলেজে আবার কেউ মাথায় ঝুড়ি আর হাতে কোদাল নিয়ে কাজের সন্ধানে। কুটি মিয়া আর বাদশাহ মিয়াও বের হয়েছে প্রতিদিনের মত। তাদের না বেরিয়ে উপায় নেই। ইনকাম হোক না হোক সর্দারকে দিন শেষে দিনের টাকা দিতে হবে। কুটি মিয়ার বয়স বড়জোর আট বছর হবে। বই খাতা নিয়ে স্কুলে যাওয়া আর সারাদিন দস্যিপনা করে বেড়ানোর সময় যেটা। কিন্তু সে বাদশাহ মিয়ার সাথে ভিক্ষা করে। বাদশাহ মিয়া অনেক আগেই যৌবন খুইয়ে ফেলেছে। হাটুর নীচ থেকে দুটা পাই কাটা তার। হুইল চেয়ারে বসে ভিক্ষা করে আর কুটি মিয়া সেই হুইল চেয়ার ঠেলে বেড়ায় সকাল থেকে সন্ধ্যা। বিনিময়ে তিন বেলা খাবার আর ৫০ টাকা মজুরী পায় সে। এই টাকা থেকে ৫-১০ টাকার চকলেট, চানাচুর কিনে খায় কুটি মিয়া আর বাকি টাকা তার মাকে দেয়। মা ছাড়া কুটি মিয়ার আর কেউ নেই। তার বাবা আছে কি না বা কোন একসময় ছিল কি না তা কুটি মিয়া জানেনা। জানার প্রয়োজনও বোধ করেনি সে এখনও। কারণ হুইল চেয়ার ঠেলে ভিক্ষা করতে পিতৃ পরিচয়ের প্রয়োজন পড়েনা। উঁচু উঁচু দালান আর মানুষজন দেখতে দেখতে কুটি মিয়া চেয়ার ঠেলে চলেছে আর বাদশাহ মিয়া সুর করে গাইছে, আমার আল্লাহ নবিজীর নাম। ওর কোচড়ে একটা বড় টিনের বল। দয়াপরস হয়ে কেউ এক’দু টাকা দিচ্ছে সেখানে। একটা দুতলা বাসের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে হুইল চেয়ারটা ঠেলছিল কুটি মিয়া। সামনে একটা ছোট আইলাইনার খেয়াল করেনি সে। চাকাদুটো আইলাইনারে সজোরে ঝাঁকি লাগতেই টাকার বলটা উড়ে গিয়ে পড়লো একটু দূরে, বাদশাহ মিয়াও প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাচ্ছিল। কোনরকম টাল সামলে নিল। -ওই খা**কির বাচ্চা, চউক্ষের কি মাথা খাইছস? আরেকটু হলেই তো এসকিডেন্ট কইরা ফালাইছিলি। বাদশাহ মিয়া যেন কোন দামি মার্সিডিজ বা লিমুজিনে বসে আছে। কুটি মিয়া ভয়ে জবুথবু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঘটনার আকষ্মিকতায়। বাদশাহ মিয়া হুকুম দিল- ওই ফকিরনীর ছাও পয়সাগুলান ক্যাডায় তুলব, তোর বাপে? কুটি মিয়া যেন জ্ঞান ফিরে পেল আচমকা। তড়িঘড়ি করে কাঁচা পয়সাগুলি আর কিছু নোট বলে তুলে রাখলো। -থাব্রাইয়া তোর গাল ফাডাইয়া ফেলতে মুঞ্চাইতাছে, বুঝছস হারামি? বাদশাহ মিয়ার তোরজোড় এখনো যায়নি। অবশ্য সে এমনিতেই খিটখিটে মেজাজের। হয়ত নিজের নামের স্বার্থকতা বুঝাতেই এমন করে। কুটি একদমই ভয় পায়না লোকটাকে। কারণ সে জানে এই লোক তার উপর নির্ভরশীল। সে হেসে হেসে গাল পেতে দেয় মনিবের সামনে। -দ্যান, একটা থাব্রা দিয়াই ফালান। আইজকের থাব্রার লাইগ্যা কোন টাকা লাগবনা তয় আস্তে মাইরেন। ফিরি থাবরা তো তাই। বাদশাহ মিয়া ফ্রি থাপ্পড় দিতে ইচ্ছুক না। গম্ভীর কণ্ঠে আদেশ দিল-গাড়ী চালা, সাবধান থাহিস কইয়া দিলাম। বাদশাহ কথায় কেউ বলবেনা সে হুইল চেয়ার ঠেলার কথা বলছে আর যাকে বলছে সে কোন প্রফেশনাল ড্রাইভার না। -আইচ্ছা। বলেই কুটি আবারো গাড়ী ঠেলা শুরু করল। কুটি মিয়ার উপর কিংবা এমনিতেই যদি বাদশাহ কোন কারণে রেগে যায় তবে কুটি মিয়াকে ডেকে বলে- ওই কুইট্টা এমুই আয়। থাপড়া দিমু পাঁচ টাকা পাবি। কুটি মিয়া তখন এসে বলে-বাকির নাম ফাঁকি, ট্যাকা নগদ লাগান। বাদশাহ তখন কটমটিয়ে বলবে -জাউরা কোনখানকার ক্যাশথন পাঁচ টাকা উঠাইল। কুটি যেন কিছুই হয়নি এমনভাবে গিয়ে ভিক্ষার থালা থেকে পাঁচ টাকার একটা কয়েন তুলে নিয়ে পকেটে রাখে। তারপর গাল পেতে দেয় বাদশাহ মিয়াকে। বাদশাহ মিয়া কায়দা কসরত করে বেশ সজোরেই চড় লাগায় কুটির গালে। কুটি এক হাতে গাল চেপে ধরে আরেক হতে হুইল চেয়ার ঠেলতে শুরু করে। এটা তাদের অলিখিত এক চুক্তি। বাদশাহ মিয়া এরকম কাণ্ড করে মনে শান্তি পায়। নিজেকে তখন তার সত্যি বাদশাহ মনে হয়। এটাই তার জীবন, এটাই তার বিলাসিতা ওরা চলতে চলতে মতিঝিলে রাঁধুনি হোটেলের সামনে এসে থামল। না না খাওয়া দাওয়া করতে নয়, হোটেল থেকে উদরপূর্তি করে যারা বেরুবে তাদের দিকে ভিক্ষের তালা বাড়িয়ে দিতে। শুট কোট পড়া আর সুগন্ধি মাখা এক লোক বের হতেই বাদশাহ মিয়ার নাকিকান্না শুরু হল। -আল্লাহর ওয়াস্তে কিছু দ্যান গো বাবা, পোলাডা সারাদিন না খাইয়া আছে। বাপ হইয়া ক্যামনে কন পোলার এই ক্ষুধা সহ্য করুম? কুটি মিয়ার দিকে তাকিয়ে লোকটার মায়া হল। হয়ত নিজের সন্তানের মুখয়ব খোঁজে দেখল। তারপর মানিব্যাগ বের করে দশ টাকার একটা চকচকে নোট বের করলো। চিন্তায় পড়ে গেল কাকে দেবে। অবশেষে কুটি মিয়াকে দেয়াটাই ভালো হবে ভেবে দশ ট টাকার নোটট কোটির হাতে ধরিয়ে দিয়ে চলে গেল। আত্মসম্মানে লাগলো বাদশাহর। খ্যাঁকখ্যাঁক করে উঠলো সে- কিরে নবাবের পোলা, ট্যাকাডা ক্যাশে রাহসনা ক্যারে? কুটি মিয়া সমান ত্যাজে জবাব দিল- এই ট্যাকা তো ক্যাশে রাখেনাই ওই সাহেবে, আমার হাতে দিছে। -কি কইলি হারামির বাচ্চা তোরে দিছে! আমি তোর ক্ষুধার কথা কইছিলাম দেইখাই তো দিছে। কিন্তু কুটি টাকা দিতে নারাজ। অবশেষে ক্ষান্ত দিল বাদশাহ। ইত্তেফাক মোড়ের দিকে এগিয়ে গেল ওরা। ওখানেই তারা খায় দুপুরের খাবার। কারণ স্ট্রিট ফুডেই (!) যে তারা অভ্যস্ত। টিকাটুলিতে লাইলী বেগম নামের এক মহিলা ভিক্ষুকদের জন্য রান্না করে। খুব সস্তা সে খাবার। তৃপ্তিঅতৃপ্তি নিয়ে কেটে গেল আরেকটা দিন। রাত প্রায় ৯টা বাজে। কুটি মিয়া ছুটতে ছুটতে এল তার বস্তিতে মায়ের কাছে। মা শিরিন মানুষের বাসায় এক আধটু কাজ করে। কুটি মিয়া ঘরে ফিরে দেখল মা উনুনে ফুঁ দিচ্ছে আর শতছিন্ন শাড়ীর আঁচলে মুখের ঘাম মুছছে। ঘরের এক কোনে মাটির একটা ব্যাংক আছে কুটি মিয়ার। সেটা হাতে নিয়েই ধরাম করে ছুড়ে ফেললো মাটিতে। অনেকগুলো পাঁচ টাকার কয়েন ছড়িয়ে পড়লো চারিদিকে। শিরিন চেঁচিয়ে উঠলো -কিরে কুটি ভাইঙ্গা ফালাইলি ক্যান এইটা? তুই না কইছিলি এই পয়সাগুলান দিয়া ঈদে পাঞ্জাবী কিনবি? -আবার জমামুনে মা, এইহানে কয়ট্যাকা আছে একটু গুইনা দে মা। আজকের কয়েন সহ একে একে চল্লিশটা কয়েন। আর আজকের সেই দশটাকা ও মজুরী পঞ্চাশ টাকা মিলে হল ২৬০ টাকা। কুটি মিয়া চল্লিশটা কয়েনে লেগে আছে চল্লিশটা থাপ্পড়ের চিহ্ন। মা তা জানেনা। পয়সাগুলো পুঁটলি বেঁধে এক দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল কুটি। রহিম মিয়ার টং দোকানে পয়সাগুলো দিয়ে একশ টাকার দুটো নোট যোগাড় করল। কয়েনগুলি পাল্টে নোট করার সাথেই যেন একেকটা চড়ের অনুভূতি সে ভুলে গেল। আবার তাকে ছুটতে হবে। রিকসায় গিয়ে খামাকা দশ টাকা খরচ করার মানে নেই। আর বাংলাদেশ ব্যাংক তো ওই দেখা যায়। আসলে সে বাংলাদেশ ব্যাংকে যাবেনা, যাবে ব্যাংকের সামনে ফুটপাতে। ওখানে একেবারে সস্তায় শাড়ী বিক্রী হয় সে দেখেছে। অনেক্ষন দেখে দেখে একটা শাড়ী পছন্দ হল মায়ের জন্য। কিন্তু দাম চাচ্ছে তিনশত টাকা। মন খারাপ হয়ে গেল কুটির। আফসোস আর গালি দিতে থাকল"ঈশ ওই ল্যাংড়ার বাচ্চা যদি আর কয়েকটা চড় বেশী দিত।" হকার লোকটার মনে হয় মায়া হলো এতটুকুন একটা বাচ্চা শাড়ী কিনতে এসেছে দেখে? -ঐ পোলা শাড়ী কার জন্য? -আমার মায়ের লাইগ্যা। -কত টাকা আছে তোর কাছে? -দুইশ ষাইট ট্যাকা। -দেখি দ্যা আমার কাছে। টাকাগুলো দোকানির হাতে দিল কুটি। দোকানি গুনে দেখল ঠিকই আছে। -নে তোর কোন শাড়ী পছন্দ হইছে নিয়া যা। সম্রাজ্যের পর সম্রাজ্য জয় করেও হয়তো কোন সেনাপতি বা রাজা বাদশাহ এই আনন্দ পাননি মায়ের জন্য মাত্র দুইশত ষাট টাকায় একটা শাড়ী কিনে যে আনন্দ আর পরম তৃপ্তি পেল কুটি মিয়া। তার পছন্দের শাড়ীটা যক্ষের ধনের মত বুকে আগলে রেখেই দৌড় দিল আবার।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৭৩ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now