বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

ধোয়াশা

"ভৌতিক গল্প " বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X ।।ধোয়াশা।। গল্পঃ নিস্তব্ধ কন্যা লেখকঃ পলাশ বসু। ------------------- মাঝারি গড়ন আকৃতির ফর্সা মেয়ে মরিয়ম।ষোল-সতের বয়সের এই মেয়েটি কিছুদিন আগে মাধ্যমিকের গন্ডি পেরিয়ে পাশের গাঁয়ের একটি কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তী হয়েছে। মরিয়মের বাবার খুব ইচ্ছা ছিল মেয়েকে একটি ভাল ঘরে বিয়ে দেবেন। কিন্তু আজকাল মেয়েটার কী হয়েছে কে জানে। কলেজে যায়না। কার সাথে কোন প্রকারের কথা বলেনা। কেউ কিছু বললেই রেগে যায়। অসম্ভব রকম রেগে যায়। তাই আজকাল মেয়ের সাথে তার বাবা-মা কেউ ই কোন কথা বলেন না। প্রথম প্রথম এই ধরণের আচারণ দেখে মরিয়মের বাবা-মা বেশ বিরক্ত হতেন। বকা-ঝকা করতেন এমনকি মারধরও! কিন্তু কোন লাভ হয়না বিধায় তারা এ পথ থেকে সরে এসেছেন। মরিয়মের এই ধরণের আচারণ শুরু হবার পর থেকে তার ভেতর আরও একটি পরিবর্তন এসেছে। মরিয়ম এখন ভীষন রকমের পরিশ্রমী হয়ে উঠেছে। যতক্ষণ জেগে থাকে ততক্ষণ ই কিছুনা কিছু কাজ করতেই থাকে। এই অল্পবয়স্কা একটা মেয়ে এত কাজ করার শক্তি-ক্ষমতা কোথ থেকে পায় কে জানে। পাড়া-প্রতিবেশীরা এ নিয়ে সমলোচনা করে। মরিয়মের বান্ধবীরা এখন মরিয়মকে ত্যাগ করেছে। সকলে এখন তাকে পাশ কাটিয়ে চলে। মরিয়মের ছোট ভাই মাসুদও এখন তাকে দেখলে ভয় পায়। এই তো কিছুদিন আগে পাশের বাড়ির রোখসানা এসে মরিয়মকে জিজ্ঞাসা করেছিল; মরিয়ম কলেজে যাবে কিনা? এ কথা শুনেই মরিয়ম রোখসানার উপর বেজায় রেগে যায় এবং তার উপর খুব বিশ্রী ভাষা প্রয়োগ করে। এটা নিয়ে আবার রোখসানার মা কোমর বেঁধে এসে দু-চার কথা শুনিয়ে গেলেন মরিয়মের মাকে। এমন মেয়ে যদি তিনি পেটে ধরতেন তাহলে নাকি তাকে গলা টিপে মেরে ফেলতেন। মরিয়মের মা নীরবে চোখের জল ফেলেন। তার এমন সুস্থ-স্বাভাবিক মেয়েটার কী হল? যে কিনা ভাল হোক বা মন্দ,কারো কোন কথা ই সজ্য করতে পারেনা। অনেকে বলাবলি করছিল মেয়ের উপর নাকি জ্বিন-ভূতের আঁচর হয়েছে। মরিয়মদের এলাকার তার এক দুরসম্পর্কের দাদি বলছিলেন; তিনি নাকি প্রায় ই দেখতেন মরিয়মকে সন্ধ্যা বেলায় পুকুর ঘাটে পানি আনতে যেতে। পুকুর পাড়ের জায়গাটা নাকি খুব খারাপ। ওখানে রয়েছে বহুকাল আগের এক প্রকান্ড তেঁতুল গাছ। ঐ পুকুর ঘাটকে কেন্দ্র করে এ বাড়ির লোকের মুখে অনেক কাহিনী প্রচলিত রয়েছে। লোকমুখে শোনা যায়, বহুদিন আগে এক লোক পুকুর পাড়ের তেঁতুল গাছের তলায় বসে বড়শি দিয়ে মাছ ধরছিলেন। মাছ ধরার পর তিনি সেগুলকে পাতিলের ভেতর রাখছিলেন। কিন্তু আশ্চার্য ভাবে মাছ কেন জানি গায়েব হয়ে যাচ্ছিল। পাতিলের মুখ ভালভাবে ঢেকে রাখা সত্ত্বেও মাছ কোথায় যাচ্ছে এটা ভেবে তিনি অবাক হচ্ছিলেন! কিছুক্ষণ পর ই তিনি পাতিলের মুখ থেকে ঢাকনা সরানোর আওয়াজ পান এবং তাকিয়ে দেখেন তেঁতুল গাছের পেছন থেকে একটি কাল লোমশ কদাকার হাত এসে তার পাতিলের ভেতর থেকে মাছ তুলছে! এটা দেখেই তিনি চিৎকার দিয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। পরে বেশ কিছুদিন অসুস্থ থাকার পর মারা যান। এদিকে মরিয়মের দাদি মরিয়মদের ঘরের দাওয়ায় আসতেই,মরিয়মের মা তাকে বসতে একটি পিড়ি এগিয়ে দিলেন। মাথায় একরাশ সাদা চুলের অধিকারিনী এই বৃদ্ধা কোমড়ে বা হাত রেখে আর মাটিতে ডান হাতের উপর ভর করে পিড়িতে বসলেন। মরিয়মের মা তাকে একটি পান সেঝে দিলেন। বৃদ্ধা পান হাত বাড়িয়ে নিয়ে মুখে দিতে দিতে বলতে লাগলেন মরিয়মের বিষয়ে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একজন ফকির এনে মরিয়মের কাধ থেকে জ্বিনকে নামিয়ে ফেলার। মরিয়মের মা বৃদ্ধার কথার কোন জবাব না দিয়ে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন মরিয়মের দিকে। মরিয়ম তখন উঠানের পশ্চিম দিকে ঝাড়ু দিচ্ছিল। বৃদ্ধা চুনের কৌটায় আঙ্গুল ঢুকিয়ে খানিকটা চুন নিলেন এবং আঙ্গুল মুখে পুরে চুষতে লাগলেন। মরিয়মের মায়ের বিষন্নতা দেখে বৃদ্ধা বললেন তার বাপের বাড়ির এলাকায় একজন বিখ্যাত ফকির আছে,যিনি কিনা জ্বিন-ভূত তাড়াতে সিদ্ধহস্ত। মরিয়মের বাবা-মা যদি চান তাহলে তরিকুলকে পাঠিয়ে তিনি ফকির বাবা কে এ বাড়িতে আনার ব্যাবস্থা করে দিতে পারবেন। আশাহত চোখে মরিয়মের মা বৃদ্ধার দিকে তাকালেন। এক দীর্ঘনিঃশ্বাস নেয়ার পর তিনি বললেন মরিয়মের বাপ হাট থেকে ফিরলে তার সঙ্গে আলাপ করে সিদ্ধান্ত নেবেন। বৃদ্ধার ঘরে একটু কাজ আছে বিধায় মরিয়মের মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিজের ঘরের দিকে রওনা করলেন। দাওয়ার বাঁশের খুঁটিতে ভর দিয়ে বৃদ্ধা বা হাত কোমরে দিয়ে কিছুটা সামনের দিকে কুঁজো হয়ে হাটতে হাটতে চলে গেলেন নিজের ঘরে। বৃদ্ধার গমনের দিকে কিছুক্ষণ অপলকে তাকিয়ে রইলেন মরিয়মের মা। এদিকে আজ হাটবার। সাধারণত হাটবার দিন মরিয়মের বাবা একটু বেশি ই ব্যাস্ত থাকেন। কারণ এ দিন তার বেচা-কেনা বেশি হয়। হাটখোলার বাজারে মরিয়মের বাবার একটি চায়ের দোকান আছে। চা ছাড়াও এখানে পান,বিড়ি,বিস্কুট বিক্রি হয়। হাটখোলার কারই আর জানতে বাকি নেই মরিয়মের অসুস্থতার খবর। বিকেলের দিকে আজিজ সাহেব আসলেন মরিয়মের বাবার চায়ের দোকানে। মরিয়মের বাবা তাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে ই সালাম ঠুকে বসতে বললেন এবং তার জন্য চা বানাতে শুরু করলেন। আজিজ সাহেব এ তল্লাটের একজন গন্য-মান্য ব্যাক্তি। পেশায় তিনি চিকিৎসক। তবে কোন স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় হতে প্রাপ্ত ডিগ্রি তার নেই। অর্থাৎ তিনি একজন হাতুড়ে চিকিৎসক। তবে তিনি দীর্ঘ ৩০ বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন। তার ভুল চিকিৎসায় কোন রোগি মারা গিয়েছে অথবা ভুক্তভোগি হয়েছে, এ রকম প্রচার নেই। মরিয়মের সম্পর্কে আজিজ সাহেব তার বাবার কাছে জানতে চাইলেন। মেয়ের সব সমস্যার কথা মরিয়মের বাবা আজিজ সাহেবের কাছে খুলে বললেন। পরের দিন সকালে আজিজ সাহেব উপস্থিত হলেন মরিয়মদের বাড়িতে। মরিয়ম তখন উঠানের এক কোনে বসে বাসন মাজছিল। মরিয়মের বাবা আজিজ সাহেবকে নিয়ে গেলেন মরিয়মের কাছে। আজিজ সাহেবের জন্য এক থালা মুরি আর বিস্কুট নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে সেখানে উপস্থিত হলেন মরিয়মের মা। মায়ের পেছন পেছন সেখানে গেল ছোট্ট মাসুদও। মরিয়মের মা,বাবা,ভাই এবং আজিজ সাহেব সবাই তখন মরিয়মের দিকে তাকিয়ে আছেন। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর নীরবতা ভাঙলেন আজিজ সাহেব। তিনি মরিয়মকে জিজ্ঞাসা করলেন 'কেমন আচ রে মরিয়ম'? এক বিরক্তিকর ক্ষুব্ধ দৃষ্টি দিয়ে মরিয়ম তাকাল আজিজ সাহেবের দিকে! কোন জবাব না দিয়ে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকার পর আবার সে নিজের কাজে মন দিল। মরিয়মের বাবা বললেন 'কিরে মইরম ডাক্তার সাইব তোরে কি জিগাইল, বল'। মরিয়ম এবারও কোন কথার জবাব না দিয়ে চুপচাপ তার কাজ চালিয়ে যেতে থাকল। এরপর মরিয়মের মা তার মেয়েকে বললেন 'ঐ মাইয়া তোরে কি জিগায়,কথা কানে ঢোকেনা'? এ কথা শোনার সাথে সাথে মরিয়ম বাসন মাজা বন্ধ করে উঠে দাড়াল। রাগে গজগজ করতে করতে এক ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল মায়ের হাতে থাকা মুরি-বিস্কুটের প্লেটটি। এবং অতি ক্ষীপ্র মেজাজে ঐ স্থান ত্যাগ করল। এতক্ষণ ধরে উঠানের ওপারে বসে থাকা কুকুরটি, এবার ছুটে আসল এবং তৃপ্তি সহকারে খেতে শুরু করল উঠানে পরে থাকা মুরি এবং বিস্কুট গুলি। ছোট্ট মাসুদ পরনের গেঞ্জির এক কোনা ধরে মুখে নিয়ে চিবুতে চিবুতে অন্য হাত দিয়ে মায়ের আঁচল খামচে ধরে কুকুরটির মুরি খাওয়ার দৃশ্য দেখতে লাগল। মরিয়মের এই আচারণ তার বাবা-মায়ের কাছে নতুন মনে না হলেও, আজিজ সাহেব কিন্তু বেশ অবাক হলেন। আজিজ সাহবে হাল ছাড়লেন। এ রোগের চিকিৎসা তার দ্বারা সম্ভব নয়। মেয়েকে ভাল একজন ডাক্তার দেখানোর পরামর্শ দিয়ে তিনি প্রস্থান করলেন। বিকেলে বৃদ্ধা দাদি আবার আসলেন মরিয়মদের দাওয়ায়। রীতিমত মরিয়মের মা তাকে বসতে পিড়ি এগিয়ে দিলেন এবং সাথে পান। বৃদ্ধা পান খেতে খেতে বলতে লাগলেন 'আগেই কইচিলাম গো মইরমের মা,এইসব ডাক্তার-কবিরাজ দিয়া কোন লাব হইব না'। মুখ কিছুটা এগিয়ে নিয়ে ফিস ফিস কন্ঠে বললেন 'মাইয়ারে জ্বিনে পাইচে,জ্বিনে। ফকির দিয়া ঝার-ফুক দাও,সব টিক হইয়া যাইব'। অবশেষে দু-দিন পর তরিকুলকে পাঠিয়ে বৃদ্ধার বাপের বাড়ির এলাকা থেকে ফকির বাবা কে মরিয়মদের বাড়িতে ডেকে আনা হল। লম্বা চেহারার অধিকারী এই ফকির বাবা। মুখে কাঁচা-পাকা দাড়ির সংমিশ্রণ, গায়ে একটি তেল চিটচিটে ময়লা ফতুয়া, পরনে লুঙ্গী এবং মাথায় টুপি। কাধে তার ছোট্ট একটি থলে।মরিয়মের বাবা ফকিরকে উঠানের মাঝে একটি চেয়ার এগিয়ে দিয়ে বসতে বললেন। ফকির বাবা চেয়ারে বসলেন এবং কবে থেকে ঘারে জ্বিন চেপেছে তা জানতে চাইলেন। মরিয়মের বাবা বিস্তারিত ফকিরের কাছে খুলে বললেন। ফকির বাবা মরিয়মকে দেখতে চাইলেন। মরিয়ম তখন ঘরের ভেতরে কাজে ব্যাস্ত ছিল। যেহেতু স্বাভাবিকভাবে কিছু বলে-কয়ে মরিয়মকে দিয়ে করানো সম্ভব নয়। তাই মরিয়মকে তার মা জোড় করে ধরে নিয়ে গেলেন ফকির বাবার কাছে। ফকির বাবা মরিয়মের কাছে কিছু জানতে চাইলেন। কিন্তু মরিয়ম ফকিরের কোন প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে থাকল এবং মায়ের ধরে থাকা হাতটি ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা চালাতে লাগল। এদিকে এই কান্ড দেখার জন্য বাড়ির সব ছেলে-ছোকড়ার দল এসে ভির জমিয়েছে। পাশের বাড়ির মহিলারাও মাথায় বড় ঘোমটা টেনে তাদের ঘরের দরজা-জানালা থেকে উকি দিয়ে এই দৃশের সাক্ষী হতে পিছপা হলেন না। ফকির বাবা এবার মুখে কিছু মন্ত্র আওরে মরিয়মের মাথায় একটি ফু দিলেন। মরিয়ম এতে প্রচন্ড রেগে বাম পায়ের বৃদ্ধা আঙ্গুল দিয়ে মাটি খামচাতে থাকল এবং তার সাথে মায়ের শক্ত করে ধরে থাকা হাতটি ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা অনবরত রাখল। এরপরে ফকির বাবা থলে থেকে একটি তাবিজ বের করে মরিয়মের মাথায় ঠেকালেন। মরিয়ম এবার রাগের শেষ সীমানায় পৌছাল। ফকিরের হাত সরিয়ে দিয়ে তার গায়ে থুথু ছিটিয়ে মায়ের ধরা হাত আলগা করে সেখান থেকে দৌড়ে পালাল। এটা দেখে ফকির বাবা বলতে শুরু করলেন,খুব বদ রকমের একটি ভূত মরিয়মের ঘারে চেপেছে, তবে যেভাবেই হোক তার হাত থেকে নিস্তার পাবেনা। এরপর থেকে শুরু হল ফকির বাবার ভুত তাড়ানোর চিকিৎসা। তবে একে চিকিৎসা না বলে অপচিকিৎসা বলাই শ্রেয়। মরিয়মের উপর শুরু হল ব্যাপক মার-ধর! এতে মরিয়মের অসুস্থতার কোন উন্নতি না ঘটলেও দিন দিন অবনতি হতে লাগল। মরিয়মের নাকের সামনে রাখা হল শুকনো লঙ্কা পোড়া। খাওয়ান হল ডিম পরা,পানি পরা। আরও কত কী! কিন্তু কোন কিছুতেই কোন কাজ হলনা। কোন পরিবর্তন না দেখে ফকির বাবাও হাল ছাড়লেন। তাই এই অসুস্থতাকে সঙ্গে নিয়ে অতিবাহিত হতে থাকল মরিয়মের জীবন। মরিয়মের বাবা-মা তখন হতাশার সাগরে নিমজ্জিত। কয়েক মাস পরের কথা। পাশের গ্রামে মরিয়মের কলেজ ক্যাম্পাসে শহর থেকে মেডিক্যাল ক্যাম্পেইনে আসল ছয় সদস্যের একটি মেডিক্যাল টিম। উদ্দেশ্য গ্রামের গরীব-দুস্থদের মাঝে সল্পমূল্যে উন্নত চিকিৎসা সেবা প্রদান করা। দুই জন চিকিৎসক এবং চার জন নার্সের সমন্বয়ে গঠিত এ দলের নেতৃত্বে ছিলেন সাইকোলিজিস্ট এবং মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাঃ সোহানুর রহমান সোহান। তারা পনের দিনের ক্যাম্পেইনের জন্য গ্রামে এসেছিলেন। এই মেডিক্যাল টিমের উন্নত চিকিৎসার ফলে গ্রামের অনেক মানুষ ই তাদের অসুখ থেকে মুক্তি পাচ্ছিলেন। একসময় ডাঃ সোহান এই কলেজে অধ্যয়নরতা অসুস্থ মরিয়মের সম্পর্কে জানতে পারেন। মরিয়মের অসুখ সম্পর্কে বিষদ জানার জন্য তিনি নিজেই উপস্থিত হন,মরিয়মদের বাড়িতে। মরিয়মের বাবা হাটখোলা থেকে খবর পেলেন তার বাড়িতে শহর থেকে বিরাট ডাক্তার এসেছে। তরিঘরি করে তিনি ছুটে আসলেন বাড়িতে। গাছের কচি ডাব,চা-বিস্কুট দিয়ে ডাক্তারের আতিথিয়তায় কোন ত্রুটি রাখলেন না। ডাঃ সোহান মরিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলেন। মরিয়মের বাবা ডাঃ সোহানকে মেয়ের বিষয়ে সব খুলে বললেন। ডাঃ সোহান রোগির সাথে কিছুক্ষণ একাকী কথা বলতে চাইলেন। সেই সময় মরিয়ম পুকুর ঘাটে পানি আনতে গিয়েছিল। মরিয়মের বাবার কথা অনুযায়ি ডাঃ সোহান মরিয়মকে অনুসরণ করতে পুকুর ঘাটের দিকে চললেন। বাড়ির ছেলে বুড়ো সবাই তখন ডাঃ সোহানের দিকে ফ্যাল ফ্যাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। এ রকম লম্বা, সদালাপি,সুদর্শন লোক তারা আগে কোনদিন দেখেনি। ইতিমধ্যে কাখে পানি বোঝাই কলসি নিয়ে মরিয়ম বাড়ির দিকে আসতে শুরু করল এবং পথিমধ্যে ডাঃ সোহানের সাথে দেখা হল। মরিয়ম এক পলক ডাঃ সোহানের চোখের দিকে তাকিয়ে দৃষ্টি নিচের দিকে নিক্ষেপ করল। এবং কলসিটি একটু জাগিয়ে আটসাট করে নিয়ে, অপর হাত দিয়ে বুকের ওরনাটি কিঞ্চিত ঠিক করে নিল। ডাঃ সোহান মরিয়মের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ফর্সা দুটি গালে লাল লাল ছোপ পরেছে। চোখের নিচে কাল দাগ। দেখে মনে হয় কতদিন ধরে যেন মেয়েটি নির্ঘুম রাত কাটিয়েছে! কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর ডাঃ সোহান মরিয়মকে জিজ্ঞাসা করলেন 'তোমার নাম কী'? মরিয়ম এতে ডাক্তারের উপর বেজায় চটে গিয়ে বলল- 'আমার নাম দিয়া,আপনের কাম কি? এই গ্রামে নাম জিগানোর মত আর কাউরে খুঁইজা পাইলেন না'? কথা গুলি বলেই মরিয়ম ডাক্তারকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। মরিয়মের গমন পথের দিকে ডাঃ সোহান কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। এতক্ষণে ডাঃ সোহান আচ করে ফেললেন মরিয়মের আসল সমস্যার বিষয়ে! তিনি মরিয়মের বাবাকে বুঝিয়ে বললেন মরিয়মের অসুস্থতার সম্পর্কে। প্রকৃতপক্ষে মরিয়ম বাইপোলার ডিজঅর্ডার (Bipolar Disorder manic depression) এ আক্রান্ত। সঠিক চিকিৎসা হলে এ রোগ থেকে সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়া সম্ভব! ডাঃ সোহান মরিয়মের বাবা কে একটি ভিজিটিং কার্ড দিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মেয়েকে নিয়ে তার সাথে দেখা করার জন্য বললেন। শহরে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করাতে অনেক খরচ। মরিয়মের বাবা মাথা নিচু করে ডাঃ সোহানের সব কথা শ্রবন করছিলেন এবং মনে মনে কিছুটা ইস্তত বোধ করছিলেন। ডাঃ সোহান তাকে অভয় দিলেন এবং এ রোগের চিকিৎসা খুব একটা ব্যায়বহুল নয় এবং যতটা সম্ভব তিনি সাহায্য করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিলেন। মরিয়মদের এই চরমকালে ডাঃ সোহান যেন ঠিক দেবদূতের ন্যায় হাঝির হলেন। তার কথায় মরিয়মের বাবা যেন হতাশার অন্ধকার সাগরে নতুন আশার সূর্যদয় দেখতে পেলেন। এর কিছুদিন পর মরিয়মের ছোট ফুফুকে মরিয়মের গ্রামের বাড়িতে ডেকে আনা হল। এবং তারপরে মরিয়মকে সঙ্গে নিয়ে তার বাবা এবং ফুফু শহরে চললেন মরিয়মকে সুস্থ করে তোলার উদ্দেশ্যে। ।।সমাপ্ত।।।।ধোয়াশা।। গল্পঃ নিস্তব্ধ কন্যা লেখকঃ পলাশ বসু। ------------------- মাঝারি গড়ন আকৃতির ফর্সা মেয়ে মরিয়ম।ষোল-সতের বয়সের এই মেয়েটি কিছুদিন আগে মাধ্যমিকের গন্ডি পেরিয়ে পাশের গাঁয়ের একটি কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তী হয়েছে। মরিয়মের বাবার খুব ইচ্ছা ছিল মেয়েকে একটি ভাল ঘরে বিয়ে দেবেন। কিন্তু আজকাল মেয়েটার কী হয়েছে কে জানে। কলেজে যায়না। কার সাথে কোন প্রকারের কথা বলেনা। কেউ কিছু বললেই রেগে যায়। অসম্ভব রকম রেগে যায়। তাই আজকাল মেয়ের সাথে তার বাবা-মা কেউ ই কোন কথা বলেন না। প্রথম প্রথম এই ধরণের আচারণ দেখে মরিয়মের বাবা-মা বেশ বিরক্ত হতেন। বকা-ঝকা করতেন এমনকি মারধরও! কিন্তু কোন লাভ হয়না বিধায় তারা এ পথ থেকে সরে এসেছেন। মরিয়মের এই ধরণের আচারণ শুরু হবার পর থেকে তার ভেতর আরও একটি পরিবর্তন এসেছে। মরিয়ম এখন ভীষন রকমের পরিশ্রমী হয়ে উঠেছে। যতক্ষণ জেগে থাকে ততক্ষণ ই কিছুনা কিছু কাজ করতেই থাকে। এই অল্পবয়স্কা একটা মেয়ে এত কাজ করার শক্তি-ক্ষমতা কোথ থেকে পায় কে জানে। পাড়া-প্রতিবেশীরা এ নিয়ে সমলোচনা করে। মরিয়মের বান্ধবীরা এখন মরিয়মকে ত্যাগ করেছে। সকলে এখন তাকে পাশ কাটিয়ে চলে। মরিয়মের ছোট ভাই মাসুদও এখন তাকে দেখলে ভয় পায়। এই তো কিছুদিন আগে পাশের বাড়ির রোখসানা এসে মরিয়মকে জিজ্ঞাসা করেছিল; মরিয়ম কলেজে যাবে কিনা? এ কথা শুনেই মরিয়ম রোখসানার উপর বেজায় রেগে যায় এবং তার উপর খুব বিশ্রী ভাষা প্রয়োগ করে। এটা নিয়ে আবার রোখসানার মা কোমর বেঁধে এসে দু-চার কথা শুনিয়ে গেলেন মরিয়মের মাকে। এমন মেয়ে যদি তিনি পেটে ধরতেন তাহলে নাকি তাকে গলা টিপে মেরে ফেলতেন। মরিয়মের মা নীরবে চোখের জল ফেলেন। তার এমন সুস্থ-স্বাভাবিক মেয়েটার কী হল? যে কিনা ভাল হোক বা মন্দ,কারো কোন কথা ই সজ্য করতে পারেনা। অনেকে বলাবলি করছিল মেয়ের উপর নাকি জ্বিন-ভূতের আঁচর হয়েছে। মরিয়মদের এলাকার তার এক দুরসম্পর্কের দাদি বলছিলেন; তিনি নাকি প্রায় ই দেখতেন মরিয়মকে সন্ধ্যা বেলায় পুকুর ঘাটে পানি আনতে যেতে। পুকুর পাড়ের জায়গাটা নাকি খুব খারাপ। ওখানে রয়েছে বহুকাল আগের এক প্রকান্ড তেঁতুল গাছ। ঐ পুকুর ঘাটকে কেন্দ্র করে এ বাড়ির লোকের মুখে অনেক কাহিনী প্রচলিত রয়েছে। লোকমুখে শোনা যায়, বহুদিন আগে এক লোক পুকুর পাড়ের তেঁতুল গাছের তলায় বসে বড়শি দিয়ে মাছ ধরছিলেন। মাছ ধরার পর তিনি সেগুলকে পাতিলের ভেতর রাখছিলেন। কিন্তু আশ্চার্য ভাবে মাছ কেন জানি গায়েব হয়ে যাচ্ছিল। পাতিলের মুখ ভালভাবে ঢেকে রাখা সত্ত্বেও মাছ কোথায় যাচ্ছে এটা ভেবে তিনি অবাক হচ্ছিলেন! কিছুক্ষণ পর ই তিনি পাতিলের মুখ থেকে ঢাকনা সরানোর আওয়াজ পান এবং তাকিয়ে দেখেন তেঁতুল গাছের পেছন থেকে একটি কাল লোমশ কদাকার হাত এসে তার পাতিলের ভেতর থেকে মাছ তুলছে! এটা দেখেই তিনি চিৎকার দিয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। পরে বেশ কিছুদিন অসুস্থ থাকার পর মারা যান। এদিকে মরিয়মের দাদি মরিয়মদের ঘরের দাওয়ায় আসতেই,মরিয়মের মা তাকে বসতে একটি পিড়ি এগিয়ে দিলেন। মাথায় একরাশ সাদা চুলের অধিকারিনী এই বৃদ্ধা কোমড়ে বা হাত রেখে আর মাটিতে ডান হাতের উপর ভর করে পিড়িতে বসলেন। মরিয়মের মা তাকে একটি পান সেঝে দিলেন। বৃদ্ধা পান হাত বাড়িয়ে নিয়ে মুখে দিতে দিতে বলতে লাগলেন মরিয়মের বিষয়ে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একজন ফকির এনে মরিয়মের কাধ থেকে জ্বিনকে নামিয়ে ফেলার। মরিয়মের মা বৃদ্ধার কথার কোন জবাব না দিয়ে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন মরিয়মের দিকে। মরিয়ম তখন উঠানের পশ্চিম দিকে ঝাড়ু দিচ্ছিল। বৃদ্ধা চুনের কৌটায় আঙ্গুল ঢুকিয়ে খানিকটা চুন নিলেন এবং আঙ্গুল মুখে পুরে চুষতে লাগলেন। মরিয়মের মায়ের বিষন্নতা দেখে বৃদ্ধা বললেন তার বাপের বাড়ির এলাকায় একজন বিখ্যাত ফকির আছে,যিনি কিনা জ্বিন-ভূত তাড়াতে সিদ্ধহস্ত। মরিয়মের বাবা-মা যদি চান তাহলে তরিকুলকে পাঠিয়ে তিনি ফকির বাবা কে এ বাড়িতে আনার ব্যাবস্থা করে দিতে পারবেন। আশাহত চোখে মরিয়মের মা বৃদ্ধার দিকে তাকালেন। এক দীর্ঘনিঃশ্বাস নেয়ার পর তিনি বললেন মরিয়মের বাপ হাট থেকে ফিরলে তার সঙ্গে আলাপ করে সিদ্ধান্ত নেবেন। বৃদ্ধার ঘরে একটু কাজ আছে বিধায় মরিয়মের মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিজের ঘরের দিকে রওনা করলেন। দাওয়ার বাঁশের খুঁটিতে ভর দিয়ে বৃদ্ধা বা হাত কোমরে দিয়ে কিছুটা সামনের দিকে কুঁজো হয়ে হাটতে হাটতে চলে গেলেন নিজের ঘরে। বৃদ্ধার গমনের দিকে কিছুক্ষণ অপলকে তাকিয়ে রইলেন মরিয়মের মা। এদিকে আজ হাটবার। সাধারণত হাটবার দিন মরিয়মের বাবা একটু বেশি ই ব্যাস্ত থাকেন। কারণ এ দিন তার বেচা-কেনা বেশি হয়। হাটখোলার বাজারে মরিয়মের বাবার একটি চায়ের দোকান আছে। চা ছাড়াও এখানে পান,বিড়ি,বিস্কুট বিক্রি হয়। হাটখোলার কারই আর জানতে বাকি নেই মরিয়মের অসুস্থতার খবর। বিকেলের দিকে আজিজ সাহেব আসলেন মরিয়মের বাবার চায়ের দোকানে। মরিয়মের বাবা তাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে ই সালাম ঠুকে বসতে বললেন এবং তার জন্য চা বানাতে শুরু করলেন। আজিজ সাহেব এ তল্লাটের একজন গন্য-মান্য ব্যাক্তি। পেশায় তিনি চিকিৎসক। তবে কোন স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় হতে প্রাপ্ত ডিগ্রি তার নেই। অর্থাৎ তিনি একজন হাতুড়ে চিকিৎসক। তবে তিনি দীর্ঘ ৩০ বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন। তার ভুল চিকিৎসায় কোন রোগি মারা গিয়েছে অথবা ভুক্তভোগি হয়েছে, এ রকম প্রচার নেই। মরিয়মের সম্পর্কে আজিজ সাহেব তার বাবার কাছে জানতে চাইলেন। মেয়ের সব সমস্যার কথা মরিয়মের বাবা আজিজ সাহেবের কাছে খুলে বললেন। পরের দিন সকালে আজিজ সাহেব উপস্থিত হলেন মরিয়মদের বাড়িতে। মরিয়ম তখন উঠানের এক কোনে বসে বাসন মাজছিল। মরিয়মের বাবা আজিজ সাহেবকে নিয়ে গেলেন মরিয়মের কাছে। আজিজ সাহেবের জন্য এক থালা মুরি আর বিস্কুট নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে সেখানে উপস্থিত হলেন মরিয়মের মা। মায়ের পেছন পেছন সেখানে গেল ছোট্ট মাসুদও। মরিয়মের মা,বাবা,ভাই এবং আজিজ সাহেব সবাই তখন মরিয়মের দিকে তাকিয়ে আছেন। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর নীরবতা ভাঙলেন আজিজ সাহেব। তিনি মরিয়মকে জিজ্ঞাসা করলেন 'কেমন আচ রে মরিয়ম'? এক বিরক্তিকর ক্ষুব্ধ দৃষ্টি দিয়ে মরিয়ম তাকাল আজিজ সাহেবের দিকে! কোন জবাব না দিয়ে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকার পর আবার সে নিজের কাজে মন দিল। মরিয়মের বাবা বললেন 'কিরে মইরম ডাক্তার সাইব তোরে কি জিগাইল, বল'। মরিয়ম এবারও কোন কথার জবাব না দিয়ে চুপচাপ তার কাজ চালিয়ে যেতে থাকল। এরপর মরিয়মের মা তার মেয়েকে বললেন 'ঐ মাইয়া তোরে কি জিগায়,কথা কানে ঢোকেনা'? এ কথা শোনার সাথে সাথে মরিয়ম বাসন মাজা বন্ধ করে উঠে দাড়াল। রাগে গজগজ করতে করতে এক ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল মায়ের হাতে থাকা মুরি-বিস্কুটের প্লেটটি। এবং অতি ক্ষীপ্র মেজাজে ঐ স্থান ত্যাগ করল। এতক্ষণ ধরে উঠানের ওপারে বসে থাকা কুকুরটি, এবার ছুটে আসল এবং তৃপ্তি সহকারে খেতে শুরু করল উঠানে পরে থাকা মুরি এবং বিস্কুট গুলি। ছোট্ট মাসুদ পরনের গেঞ্জির এক কোনা ধরে মুখে নিয়ে চিবুতে চিবুতে অন্য হাত দিয়ে মায়ের আঁচল খামচে ধরে কুকুরটির মুরি খাওয়ার দৃশ্য দেখতে লাগল। মরিয়মের এই আচারণ তার বাবা-মায়ের কাছে নতুন মনে না হলেও, আজিজ সাহেব কিন্তু বেশ অবাক হলেন। আজিজ সাহবে হাল ছাড়লেন। এ রোগের চিকিৎসা তার দ্বারা সম্ভব নয়। মেয়েকে ভাল একজন ডাক্তার দেখানোর পরামর্শ দিয়ে তিনি প্রস্থান করলেন। বিকেলে বৃদ্ধা দাদি আবার আসলেন মরিয়মদের দাওয়ায়। রীতিমত মরিয়মের মা তাকে বসতে পিড়ি এগিয়ে দিলেন এবং সাথে পান। বৃদ্ধা পান খেতে খেতে বলতে লাগলেন 'আগেই কইচিলাম গো মইরমের মা,এইসব ডাক্তার-কবিরাজ দিয়া কোন লাব হইব না'। মুখ কিছুটা এগিয়ে নিয়ে ফিস ফিস কন্ঠে বললেন 'মাইয়ারে জ্বিনে পাইচে,জ্বিনে। ফকির দিয়া ঝার-ফুক দাও,সব টিক হইয়া যাইব'। অবশেষে দু-দিন পর তরিকুলকে পাঠিয়ে বৃদ্ধার বাপের বাড়ির এলাকা থেকে ফকির বাবা কে মরিয়মদের বাড়িতে ডেকে আনা হল। লম্বা চেহারার অধিকারী এই ফকির বাবা। মুখে কাঁচা-পাকা দাড়ির সংমিশ্রণ, গায়ে একটি তেল চিটচিটে ময়লা ফতুয়া, পরনে লুঙ্গী এবং মাথায় টুপি। কাধে তার ছোট্ট একটি থলে।মরিয়মের বাবা ফকিরকে উঠানের মাঝে একটি চেয়ার এগিয়ে দিয়ে বসতে বললেন। ফকির বাবা চেয়ারে বসলেন এবং কবে থেকে ঘারে জ্বিন চেপেছে তা জানতে চাইলেন। মরিয়মের বাবা বিস্তারিত ফকিরের কাছে খুলে বললেন। ফকির বাবা মরিয়মকে দেখতে চাইলেন। মরিয়ম তখন ঘরের ভেতরে কাজে ব্যাস্ত ছিল। যেহেতু স্বাভাবিকভাবে কিছু বলে-কয়ে মরিয়মকে দিয়ে করানো সম্ভব নয়। তাই মরিয়মকে তার মা জোড় করে ধরে নিয়ে গেলেন ফকির বাবার কাছে। ফকির বাবা মরিয়মের কাছে কিছু জানতে চাইলেন। কিন্তু মরিয়ম ফকিরের কোন প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে থাকল এবং মায়ের ধরে থাকা হাতটি ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা চালাতে লাগল। এদিকে এই কান্ড দেখার জন্য বাড়ির সব ছেলে-ছোকড়ার দল এসে ভির জমিয়েছে। পাশের বাড়ির মহিলারাও মাথায় বড় ঘোমটা টেনে তাদের ঘরের দরজা-জানালা থেকে উকি দিয়ে এই দৃশের সাক্ষী হতে পিছপা হলেন না। ফকির বাবা এবার মুখে কিছু মন্ত্র আওরে মরিয়মের মাথায় একটি ফু দিলেন। মরিয়ম এতে প্রচন্ড রেগে বাম পায়ের বৃদ্ধা আঙ্গুল দিয়ে মাটি খামচাতে থাকল এবং তার সাথে মায়ের শক্ত করে ধরে থাকা হাতটি ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা অনবরত রাখল। এরপরে ফকির বাবা থলে থেকে একটি তাবিজ বের করে মরিয়মের মাথায় ঠেকালেন। মরিয়ম এবার রাগের শেষ সীমানায় পৌছাল। ফকিরের হাত সরিয়ে দিয়ে তার গায়ে থুথু ছিটিয়ে মায়ের ধরা হাত আলগা করে সেখান থেকে দৌড়ে পালাল। এটা দেখে ফকির বাবা বলতে শুরু করলেন,খুব বদ রকমের একটি ভূত মরিয়মের ঘারে চেপেছে, তবে যেভাবেই হোক তার হাত থেকে নিস্তার পাবেনা। এরপর থেকে শুরু হল ফকির বাবার ভুত তাড়ানোর চিকিৎসা। তবে একে চিকিৎসা না বলে অপচিকিৎসা বলাই শ্রেয়। মরিয়মের উপর শুরু হল ব্যাপক মার-ধর! এতে মরিয়মের অসুস্থতার কোন উন্নতি না ঘটলেও দিন দিন অবনতি হতে লাগল। মরিয়মের নাকের সামনে রাখা হল শুকনো লঙ্কা পোড়া। খাওয়ান হল ডিম পরা,পানি পরা। আরও কত কী! কিন্তু কোন কিছুতেই কোন কাজ হলনা। কোন পরিবর্তন না দেখে ফকির বাবাও হাল ছাড়লেন। তাই এই অসুস্থতাকে সঙ্গে নিয়ে অতিবাহিত হতে থাকল মরিয়মের জীবন। মরিয়মের বাবা-মা তখন হতাশার সাগরে নিমজ্জিত। কয়েক মাস পরের কথা। পাশের গ্রামে মরিয়মের কলেজ ক্যাম্পাসে শহর থেকে মেডিক্যাল ক্যাম্পেইনে আসল ছয় সদস্যের একটি মেডিক্যাল টিম। উদ্দেশ্য গ্রামের গরীব-দুস্থদের মাঝে সল্পমূল্যে উন্নত চিকিৎসা সেবা প্রদান করা। দুই জন চিকিৎসক এবং চার জন নার্সের সমন্বয়ে গঠিত এ দলের নেতৃত্বে ছিলেন সাইকোলিজিস্ট এবং মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাঃ সোহানুর রহমান সোহান। তারা পনের দিনের ক্যাম্পেইনের জন্য গ্রামে এসেছিলেন। এই মেডিক্যাল টিমের উন্নত চিকিৎসার ফলে গ্রামের অনেক মানুষ ই তাদের অসুখ থেকে মুক্তি পাচ্ছিলেন। একসময় ডাঃ সোহান এই কলেজে অধ্যয়নরতা অসুস্থ মরিয়মের সম্পর্কে জানতে পারেন। মরিয়মের অসুখ সম্পর্কে বিষদ জানার জন্য তিনি নিজেই উপস্থিত হন,মরিয়মদের বাড়িতে। মরিয়মের বাবা হাটখোলা থেকে খবর পেলেন তার বাড়িতে শহর থেকে বিরাট ডাক্তার এসেছে। তরিঘরি করে তিনি ছুটে আসলেন বাড়িতে। গাছের কচি ডাব,চা-বিস্কুট দিয়ে ডাক্তারের আতিথিয়তায় কোন ত্রুটি রাখলেন না। ডাঃ সোহান মরিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলেন। মরিয়মের বাবা ডাঃ সোহানকে মেয়ের বিষয়ে সব খুলে বললেন। ডাঃ সোহান রোগির সাথে কিছুক্ষণ একাকী কথা বলতে চাইলেন। সেই সময় মরিয়ম পুকুর ঘাটে পানি আনতে গিয়েছিল। মরিয়মের বাবার কথা অনুযায়ি ডাঃ সোহান মরিয়মকে অনুসরণ করতে পুকুর ঘাটের দিকে চললেন। বাড়ির ছেলে বুড়ো সবাই তখন ডাঃ সোহানের দিকে ফ্যাল ফ্যাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। এ রকম লম্বা, সদালাপি,সুদর্শন লোক তারা আগে কোনদিন দেখেনি। ইতিমধ্যে কাখে পানি বোঝাই কলসি নিয়ে মরিয়ম বাড়ির দিকে আসতে শুরু করল এবং পথিমধ্যে ডাঃ সোহানের সাথে দেখা হল। মরিয়ম এক পলক ডাঃ সোহানের চোখের দিকে তাকিয়ে দৃষ্টি নিচের দিকে নিক্ষেপ করল। এবং কলসিটি একটু জাগিয়ে আটসাট করে নিয়ে, অপর হাত দিয়ে বুকের ওরনাটি কিঞ্চিত ঠিক করে নিল। ডাঃ সোহান মরিয়মের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ফর্সা দুটি গালে লাল লাল ছোপ পরেছে। চোখের নিচে কাল দাগ। দেখে মনে হয় কতদিন ধরে যেন মেয়েটি নির্ঘুম রাত কাটিয়েছে! কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর ডাঃ সোহান মরিয়মকে জিজ্ঞাসা করলেন 'তোমার নাম কী'? মরিয়ম এতে ডাক্তারের উপর বেজায় চটে গিয়ে বলল- 'আমার নাম দিয়া,আপনের কাম কি? এই গ্রামে নাম জিগানোর মত আর কাউরে খুঁইজা পাইলেন না'? কথা গুলি বলেই মরিয়ম ডাক্তারকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। মরিয়মের গমন পথের দিকে ডাঃ সোহান কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। এতক্ষণে ডাঃ সোহান আচ করে ফেললেন মরিয়মের আসল সমস্যার বিষয়ে! তিনি মরিয়মের বাবাকে বুঝিয়ে বললেন মরিয়মের অসুস্থতার সম্পর্কে। প্রকৃতপক্ষে মরিয়ম বাইপোলার ডিজঅর্ডার (Bipolar Disorder manic depression) এ আক্রান্ত। সঠিক চিকিৎসা হলে এ রোগ থেকে সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়া সম্ভব! ডাঃ সোহান মরিয়মের বাবা কে একটি ভিজিটিং কার্ড দিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মেয়েকে নিয়ে তার সাথে দেখা করার জন্য বললেন। শহরে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করাতে অনেক খরচ। মরিয়মের বাবা মাথা নিচু করে ডাঃ সোহানের সব কথা শ্রবন করছিলেন এবং মনে মনে কিছুটা ইস্তত বোধ করছিলেন। ডাঃ সোহান তাকে অভয় দিলেন এবং এ রোগের চিকিৎসা খুব একটা ব্যায়বহুল নয় এবং যতটা সম্ভব তিনি সাহায্য করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিলেন। মরিয়মদের এই চরমকালে ডাঃ সোহান যেন ঠিক দেবদূতের ন্যায় হাঝির হলেন। তার কথায় মরিয়মের বাবা যেন হতাশার অন্ধকার সাগরে নতুন আশার সূর্যদয় দেখতে পেলেন। এর কিছুদিন পর মরিয়মের ছোট ফুফুকে মরিয়মের গ্রামের বাড়িতে ডেকে আনা হল। এবং তারপরে মরিয়মকে সঙ্গে নিয়ে তার বাবা এবং ফুফু শহরে চললেন মরিয়মকে সুস্থ করে তোলার উদ্দেশ্যে। ।।সমাপ্ত।।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮৪ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now