বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

অভিশপ্ত রক্ত-১

"উপন্যাস" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X হরর উপন্যাসিকা "অভিশপ্ত রক্ত" আফজাল হোসেন ----------------- (পর্ব ১) এক রিকশাওয়ালাটা রোগা ৷ অথচ রিকশাটা চালাচ্ছে ঝড়ের বেগে। রুমার ভয় ভয় লাগছে, এই … বুঝি ভয়ঙ্কর একটা অ্যাক্সিডেণ্ট ঘটবে। সে রিকশা থেকে ছিটকে রাস্তায় পড়বে ৷ মাথা টাথা ফেটে একটা রক্তারক্তি কান্ড হবে। সােহেল চত্বরের মোড় ঘুরে কিছুটা সামনে এগােতেই রিকশা জ্যামে আটকা পড়ল।রুমা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ল। শক্ত হয়ে না থেকে আরাম করে বসল ৷ ভাবছে, রিকশাওয়ালাকে বলবে নাকি যেন একটু ধীরে সূস্থে চালায়। অবশ্য বললে ও কোনও কাজ হবে বলে মনে হচ্ছে না। চ্যাংড়া চেহেরাররিকশাওয়ালা, এদেরকে জোরে চালাতে নিষেধ করলে আরও গতি বাড়িয়ে দেয়। এরা মনে হয় কম বয়সী মেয়ে প্যাসেঞ্জারদের আতঙ্কের মধ্যে রেখে এক ধরনের আনন্দ খুঁজে পায়। আরও একবার এমনই এক চ্যাংড়া চেহারার রিকশাওয়ালার রিকশায় চড়েছিল রুমা। সেই রিকশাওয়ালাটাও এমন জোরে চালাচ্ছিল l রুমা জোরে চালাতে নিষেধ করল। এর পর রিকশাওয়ালাটা গতি আরও বাড়িয়ে দিল। রুমা রেগে উঠে বলল… আস্তে চালাতে বললাম … এখন দেখি আরও জোরে চালাচ্ছেন? রিকশাওয়ালাটা পেছনে মুখ ঘুরিয়ে মুখ ভর্তি হাসি নিয়ে বলল… আফা… টাইট হইয়্যা বহেন ৷ কিচ্ছু হইবে না ৷’ তারপর গতি আরও বাড়িয়ে দিল ৷ গায়ের সর্বশক্তি দিয়ে চালাতে লাগল ৷ রুমা ভয়ে-আতঙ্কে শক্ত কাঠ হয়ে যেন উড়তে-উড়তে গন্তব্যে পৌঁছে গেল। গন্তব্যে পৌছানোর পর রিকশাওয়ালাটা গামছা দিয়ে মুখের ঘাম মুছতে মুছতে বলল, আফা, পাঁচাটা ট্যাকা বাড়াইয়া দিয়েন। অনেক খাটনি গেছে।‘ রিকশাওয়ালার মুখ ভর্তি হাসি দেখে মনে হচ্ছে খাটনি গেলেও সে বেশ আনন্দ পেয়েছে ৷ লম্বা জ্যাম। জ্যাম ছাড়তে আর কতক্ষণ লাগবে কে জানে ৷ প্রায় রোজ বিকেলেই সন্ধ্যার আগ মুহূর্তে অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পথে রুমার এমন জ্যামে আটকা পড়ার অভিজ্ঞতা হচ্ছে। অফিস শেষে ঘরমুখী মনুেষের ভিড়েই বোধহয় রোজ এই সময়ে জ্যামটা লাগে৷ রুমা একটা বেসরকারি ব্যাঙ্ককের জুনিয়র অফিসার। মাত্র কয়েক মাস হলো চাকরিটা পেয়েছে। মাইনে বেশ ভালোই। আটটা পাঁচটা অফিস ৷ কাগজে কলমে আটটা পাচটা হলেও অফিস থেকে বের হতে ছয়টা সোয়া ছয়টা বেজে যায় ৷ জ্যাম মনে হয় ছুটতে শুরু করেছে। রিকশা গাড়িগুলো ধীরে ধীরে সামনের দিকে এগোচ্ছে। মাথা ভর্তি সাদা চুলে ভরা এক বৃদ্ধা ধীরে ধীরে সামনে এগোতে থাকা রিকশা গাড়ির যাত্রীদের দিকে ছুটে ছুটে গিয়ে চেচিয়ে টেচিয়ে কী যেন বলছে। সবাই বৃদ্ধাকে দূর দুর করে তাড়িয়ে দিচ্ছে। রিকশা গাড়ির হর্নের শব্দে বৃদ্ধা ঠিক কী বলতে চাইছে বোঝাও যাচ্ছে না৷ দেখে মনে হচ্ছে…, বৃদ্ধা রাস্তার ভ্রাম্যমান পাগলী। গায়ে ময়লা নোংরা পোশাক। মাথায় পাটের আঁশের মত ঘিয়ে জঙ্গুলে চুল। চুলগুলো মুখের উপর পড়ে ঢেকে রয়েছে তার সমস্ত মুখ। চেহারা দেখা যাচ্ছে না। হাত ভর্তি ময়লা জমা বড় বড় নখ। নখগুলো কিছুটা পাখির ঠোটের মত বাকানাে। সেই নখ দিয়ে অনবরত সে মাথা চুলকাচ্ছে। রুমার রিকশা বৃদ্ধার কাছাকাছি পৌছে গেছে। অন্য সব যানের মত রুমার রিকশার দিকেও বৃদ্ধা ছুটে এসেছে। বৃদ্ধার দুহাত ভর্তি নখের আঁচড়৷ চেরা ক্ষত। ক্ষতগুলি দিয়ে চুইয়ে বের হচ্ছে টাটকা রক্ত। হাত দুটো সামনের দিকে বাড়িয়ে ধরে সেই রক্ত দেখিয়ে দেখিয়ে বৃদ্ধা এলোমেলো কিছু বকছে ….…রক্ত.……রক্ত…..রক্ত লাগবে রক্ত….…এই নে রক্ত…….আমার গায়ের সমস্ত রক্ত নিয়ে নে….… বোঝাই যাচ্ছে বদ্ধ উন্মাদ ৷ কী আশ্চর্য! রিকশাওয়ালাটা রিকশা খামিয়ে তামাশা দেখতে লাগল৷ সেই সুযোগে বৃদ্ধা পাগলিটা একেবারে রুমার সামনে এসে পড়ল। হাত বাড়িয়ে রুমাকে ছুতে চাইছে আর মুখে বলেই যাচ্ছে, ‘রক্ত…….রক্ত লাগবে রক্ত……. রুমা ভয়ে গুটিসুটি মেরে আতঙ্কিত গলায় কােনক্রমে ধমকে উঠল, “এই, পাগলি, যাও, যাও এখান থেকে যাও, সরো, দূরে সরো.…. রিকশাওয়ালাকে উদ্দেশ্য করে যোগ করল,রিকশাটা থামিয়ে রেখেছেন কেন জলদি এখান থেকে চলুন ৷ জলদি চলুন।‘ রিকশাওয়ালার কোনও বিকার ঘটল না। সে মুখ টিপে টিপে হাসছে ৷ তার চেহারা দেখে মনে হচ্ছে ব্যাপারটায় সে খুব মজা পাচ্ছে ৷ গুটিয়ে রিকশায় বসা রুমার ডান হাতটা মুহূর্তের জন্য বৃদ্ধা পাগলিটা স্পর্শ করে ফেলল ৷ স্পর্শের সঙ্গে সঙ্গে রুমা প্রচণ্ড একটা আর্তচিৎকার দিয়ে উঠল ৷ তার কাছে মনে হলো যেন সে জ্বলন্ত গনগনে লাল অঙ্গারের ছ্যাঁকা খেয়েছে। প্রচণ্ড জ্জ্বলুনি হতে লাগল। জায়গাটি পোড়া ক্ষতের মত কালো হয়ে গেল ৷ জেগে উঠল বড়সড় একটা ফোস্কা ৷ যন্ত্রণায় ও আতঙ্কে রুমা রিকশা থেকে ছিটকে নেমে, কেউ আমাকে এই পাগলির হাত থেকে রক্ষা করুন, কেউ রক্ষা করুন...’ বলে চিৎকার করতে করতে ছুটতে লাগল। পিছু পিছু পাগলিটাও ধাওয়া করতে লাগল ৷ তাই দেখে রিকশাওয়লাটা আর হাসি চেপে রাখতে পারল না৷ দাত বের করে হেসে ফেললো৷ রুমা রাস্তার ডিডাইডার টপকে ডান পাশের রাস্তায় চলে গেল। ডান পাশের রাস্তা দিয়ে হুসহাস করে ছুটছে ভারী ভারী যান। দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য রুমা রাস্তার মাঝ বরাবর পৌঁছাতেই প্রচন্ড গতিতে ছুটে আসা একটা মাইক্রেবোসের সাথে অ্যাক্সিডেণ্ট করে রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে ৷ রক্তে ভেসে যেতে লাগল রাস্তা ৷ আশপাশের লোকজন ছুটে এল। দুই রুমাকে অপারেশন থিয়েটারে নেয়া হয়েছে ৷ জরুরি ভিত্তিতে একটা মেজর অপারেশন করা হবে৷ ডাক্তার নার্সদের ব্যস্ত ছোটাছুটি ৷ রুমার বাবা মা অপারেশন থিয়েটারের সামনে ওয়েটিং লাউঞ্জে অপেক্ষা করছে। অপারেশন থিয়েটারের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ ৷ রুমার মা ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেঁদেই যাচ্ছেন ৷ রুমার বাবারও দুচােধ ছাপিয়ে নামছে নোনা জলের বন্যা। তাঁদের একমাত্র মেয়ে এখন জীবন মৃত্যুর মুখোমুখি। ডাক্তাররা তেমন একটা ভরসা দিতে পারছে না। বাচার সম্ভাবনা নাকি খুম কম। ডাক্তাররা যথাসাধ্য চেষ্টা চালাচ্ছে, বাকিটা আল্লাহবর হাতে ৷ অপারেশন থিয়েটারের ট্রান্সলুসেণ্ট গ্লাসের দরজা খুলে হন্তদন্ত ভঙ্গিতে বের হয়ে এল এক নার্স। রুমার বাবা মা দুজনেই সেদিকে তাকিয়ে ছিলেন ৷ নার্সকে বেরুতে দেখেই তারা দুজন ছুটে গেলেন তার কাছে। নার্স মেয়েটা বলল … এখনই এক ব্যাগ এবি নেগেটিভ রক্তের প্রয়জন। তা না হলে আপনাদের মেয়ের রক্তের গ্রুপ এৰি নেগেটিভ ! এই গ্রুপের আর কােনও রক্ত আপাতত আমাদের হাতে নেই। আমরা বিভিন্ন হসপিটাল এবং ব্লাড ব্যাঙ্কগুলোতে খোঁজ নিচ্ছি ৷ কিন্তু তার আগে এখনই এক ব্যাগ রক্ত না হলে চলছে না। , রুমার বাবা মা দুজনেই এক সাথে বলে উঠলেন, আমার রক্ত নিন।‘ নার্স বলল, চলুন তা হলে, রক্ত পরীক্ষা করে দেখি আপনাদের কারও রক্ত গ্রুপ এবি নেগেটিভ কিনা। এই গ্রুপের রক্ত খুবই রেয়ার।‘ রুমার বাবামা দুজনের রক্ত পরীক্ষা করে দেখা গেল তাঁদের কাররই এবি নেগেটিভ রক্ত নয়। রুমার বাবা মা দুজনেই অস্থির হয়ে পাগলের মত তাঁদের বিভিন্ন আত্মীয় পরিজনদের ফোন করতে লাগলেন। তাদের মধ্যে যদি কাউকে পাওয়া যায় যার রক্ত গ্রুপ এবি নেগেটিভ সেই আশায় ৷ কর্তব্যরত নার্সও বিভিন্ন হসপিটাল এবং ব্লাড ব্যাঙ্কগুলোতে খোঁজ নিতে লাগল। কিন্তু কোথাও থেকে আশার খবর পাওয়া গেল না। এমন সময় ইণ্টারকমে রিসিপশন থেকে ফোন এল। রিসেপশন থেকে জানাল, কীভাবে যেন বৃদ্ধা এক পাগলী রিসেপশসে ঢুকে পড়েছে। সে আবোল তাবোল উল্টোপাল্টা বকছে৷ তবে তার উদ্দেশ্য বোঝা যাচ্ছে-সে রক্ত দিডতে চাচ্ছে। গার্ড ডেকে তাকে তাড়ানাের চেষ্টা করা হয়েছে ৷ কিন্তু সে রক্ত না দিয়ে কিছুতেই যাবে না বলে বসে আছে। সব শোনার পর নার্স রিসিপশনিস্টকে বলল, ঠিক আছে, পাগলিটাকে কারও সাথে ব্লাড ট্রান্সমিশন রুমে পাঠিয়ে দাও। পাগলির রক্ত পরীক্ষা করে দেখা গেল রক্তের গ্রুপ এবি নেগেটিভ। রুমার বাবা মাকে খবরটা জানানো হলো l ওঁরা খবরটা শুনে ওয়েটিংলাউঞ্জ থেকে ছুটে গেলেন রক্ত পরিসঞ্চালন কক্ষে। তাঁরা একটি বার সেই বৃদ্ধাকে দেখতে চান, যে তাদের একমাত্র মেয়ের এমন চরম মুহূর্তে তাকে বাচানোর জন্য রক্ত দিতে এসেছে । বৃদ্ধাকে মাথা নত করে ধন্যবাদ জানাবেন ওঁরা। জানাবেন কৃতজ্ঞতা ৷ রক্ত পরিসঞ্চালন কক্ষে ঢুকে রুমার বাবা মা দুজনেই বৃদ্ধা পাগলীটাকে দেখে একটা ধাক্কা খেলেন। নোংরা ময়লা বিচ্ছিরি বেশভুষার এক বৃদ্ধা৷ যেন নর্দমা থেকে উঠে এসেছে। গা থেক দুর্গন্ধ বেরুচ্ছে। মাথা ভর্তি পাটের আশের মত জ়ঙ্গুলে চুল ঢেকে রেখেছে তার মুখখানা ৷ গায়ের রং ঠিক কালো নয়… কেমন ছাই বর্ণ। দেহটা কুঁজাে মানুষের মতো ৷ হাত ভর্তি ময়লা জমা বড় বড় নখ ৷ দেখেই কেমন গা ঘিন মিন করে ওঠে ৷ রুমার বাবা মা এই ভেবে শিউরে উঠলেন, এমন কুৎসিত একটা পাগলির রক্ত ঢুকানো হবে তাঁদের মেয়ের শরীরে। এ ছাড়া কী ই বা করার আছে! মেয়েকে বাঁচাতে হলে সবকিছুই মুখ বুজে মেনে নিতে হবে। রুমার মা এগিয়ে গেলেন পাগলীটার কাছে ৷ কৃতজ্ঞতাসূচক কথা বলতে লাগলেন, "আপনাকে যে কী বলে ধন্যবাদ জানাব। এখনই এক ব্যাগ রক্তের ব্যবস্থা না হলে কী যে হত !আপনি এর বিনিময়ে যা চাইবেন তাই দেব।" বৃদ্ধা পাগলীটা খলখল করে কুৎসিত ভঙ্গিতে হেসে উঠে বলল, আমি যা চাইব তাই দিবি?’ হাত বাড়িয়ে ধরে বলল… “নে… নেহ তা হলে আমার শরীরের সমস্ত রক্ত নিয়ে নে। রুমার বাবা মা বুঝতে পারলেন একেবারে রাস্তার বদ্ধ উন্মাদ৷ একে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে কিছু হবে না। তার চেয়ে বরং কিছু নগদ টাকা পয়সা দিয়ে দেওয়াই ভাল ৷ রুমার বাবা পাঁচশো টাকার কতগুলো কড়কড়ে নোট বারিএ ধরলেন পাগলীটার দিকে। তাই দেখে পাগলী বিকট গা শিউরানাে শব্দে হেসে উঠল ৷ হাসির দমকে তার মুখ ঢেকে পাকা চুলগুলো দু পাশে সরে গেল। এই প্রথম তার চেহারাটা ভালভাবে সম্পূর্ণ দেখা গেল ৷ দেখা গেল তার চোখ দুটো। কী আশ্চর্য! পাগলিটা তো অন্ধ। তার দুচোখের ই কালো মণির কোনও চিহ্ন মাত্র নেই। চোখ দুটো খােসা ছাড়ানাে পচা লিচুর মত ঘোলাটে। মুখখানা যেন আগুনে ঝলসানাে, কুঁচকানাে ভাঁজ ভাঁজ শত শত ৰলিরেখায় পরিপূর্ণ। পাগলীটার চেহারা দেখে রুমার বাবা মা’র বুক ধক করে উঠল ৷ এমনকী নার্স মেয়েটাও মনে হয় একটু কেঁপে উঠল ৷ এত কুৎসিত আর ভয়ঙ্কর চেহারা কোন মানুষের হতে পারে, বোধহয় তা তাদের কল্পনাতেও ছিল না। রুমার বাবা মা ভেবে অবাক হলেন, বদ্ধ উন্মাদ, তার ওপর এমন একজন অন্ধ কীভাবে এই হসপিটালে এসে পৌছল আর টাকা বাড়িয়ে ধরার সঙ্গে সঙ্গে কেন অমন বিদ্রুপাত্মক হাসি হেসে উঠল। তার তো টাকা দেখতে পাওয়ার কোনও কারণই নেই। রুমার বাবা টাকাটা হাতে ধরিয়ে দিতে যাচ্ছিলেন ৷ তার আগেই অন্ধ পাগলিটা বেডের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলতে লাগল, ‘নে, নেহ্, তাড়াতাড়ি সব রক্ত নিয়ে নে। আর সময় নষ্ট করিস না। না হলে মেয়েটাকে বাচানাে যাবে না। নার্স মেয়েটা রুমার বাবাকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘স্যর, একে টাকা দিয়ে কোনও লাভ হবে না। টাকা পয়সা সামলে রাখার মত হুশ এর নেই। তার চেয়ে বরং রক্ত দেওয়া শেষে কিছু খাবার কিনে দিবেন ৷ এমনিতেও রক্ত দেওয়া শেষে তরল খাবার খাওয়ার প্রয়োজন হয়। আপনারা এখন গিয়ে লাউঞ্জে অপেক্ষা করেন। আমি রক্তটা নিই।‘ রুমার বাবা মা একরাশ ৰিস্ময় নিয়ে লাউঞ্জে ফিরে গেলেন ৷ এমনিতেই তাঁরা তাঁদের একমাত্র মেয়েকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় অস্থির হয়ে আছেন, তার ওপর পাগলিটার হঠাৎ আগমন এবং তার অদ্ভুত আচরণ তাঁদেরকে একেবারে হত্ববিহল করে দিয়েছে। পাগলির রক্তে রক্তের বোতলটা অতি দ্রুতই ভরে গেল। নার্স পাগলীর হাত থেকে রক্ত নেয়ার সুচটা খোলার জন্য হাত বাড়াল। ঠিক তখন পাগলি হুঁংকার দিয়ে উঠল… আরও রক্ত নে, মেয়েটাকে বাচাতে হলে আমার শরীরের আরও রক্ত ওর দরকার। সব রক্ত নিয়ে নে। নার্স বোঝাতে চাইল একজন মানুষের শরীর থেকে একবারে এর চেয়ে বেশি রক্ত নেওয়া ঠিক নয়। কিন্তু পাগলী কিছুতেই মানল না৷ আরও রক্ত দেবার জন্য সে একেবারে মরিয়া হয়ে উঠল। চিৎকার চেচামেচি শুরু করল। তার অপ্রকৃতিস্থতা চরম রূপ নিল ৷ কিছুতেই পাগলীকে মানাতে না পেরে শেষ পর্যন্ত রক্ত নেবার জন্য আর একটা খালি রক্তের ব্যাগ লাগিয়ে দিল নার্স। ভাবল আরও হাফ ব্যাগ রক্ত নিলেও নেওয়া যায়। পাগলীর শারীরিক অবস্থা বেশ ভালই আছে। ব্লাড প্রেশার যথেষ্টই নরমাল। সমস্যা হবে বলে মনে হয় না। নার্স দ্বিতীয় রক্তের ব্যাগটা লাগিয়ে দেবার পর পাগলিকে একা রেখে প্রথমে ভরা ব্যাগটা নিয়ে অপারেশন থিয়েটারের দিকে গেল ৷ অপারেশন থিয়েটারে রক্তের জন্য অপেক্ষা করছে ৷ যত দ্রুত সম্ভব পৌছে দেওয়া প্রয়োজন। নার্সের কাছে একটা ব্যাপার খুব অদ্ভুত লাগছে। মানুষের শরীর থেকে রক্ত নেবার বেশ কিছুক্ষণ পর্যন্ত রক্তে বেশ একটা গরম ভাব থাকে ৷ রক্তের ব্যাগটা হাতে ধরলেই সেই গরম অনুভূতিটা টের পাওয়া যায় ৷ কিন্ত পাগলীটার রক্তটা একেবারে হিমশীতল। যেন এই মুহূর্তে রক্তটা নেওয়া হয়নি, নেয়া হয়েছে অনেক আগে। ফ্রিজে রাখা ছিল। নার্স রক্তের ব্যাগটা অপারেশন থিয়েটারে পৌছে দিয়েই আবার রক্ত পরিসঞ্চালন কামরায় ফিরে এল ৷ পরিসঞ্চালন কামরার দরজা খুলতেই সে প্রচণ্ড আঁতকে উঠল ৷ সমস্ত কামরা ভর্তি কুয়াশার মত ঘন ধোয়া ৷ আগুন লাগল নাকি? কাশতে কাশতে ঘন ধোয়া ভেদ করে সে ভিতরে এগিয়ে গেল ৷ একী কাণ্ড ...বেডে শোয়া অবস্থায়ই পাগলীর সমস্ত দেহটা একেবারে পুড়ে অঙ্গার হয়ে রয়েছে। পােড়া বিকৃত মুখটার মাঝে খোসা ছাড়ানাে সিদ্ধ ডিমের মত সাদা চোখ দুটো ঠেলে বেরিয়ে আছে ৷ কী বিভত্স দৃশ্য। নার্স মেয়েটা জ্ঞান হারিয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। শুধু পাগলির দেহটাই পুড়ে অঙ্গার হয়েছে৷ কামরার অন্য সব কিছুই একেবারে অক্ষত ৷ এমনকি পাগলীর অঙ্গার দেহটা যে বেডের উপর, সেই বেডের চাদরটা পর্যন্ত অক্ষত ৷ পাগলির শরীর থেকে আরও রক্ত নেবার জন্য লাগানো দ্বিতীয় ব্যাগটাও অক্ষত এবং রক্তে পরিপূর্ণ ৷ ওদিকে অপারেশন থিয়েটারে পাগলীর রক্ত রুমার শরীরে প্রবেশ করতেই রুমার শারীরিক অবস্থার অতি দ্রুত উন্নতি হতে লাগল। যেন মৃত্যু পথযাত্রী একটা মানুষ ঘুরে জীবনের দিকে ছুটে আসছে ৷ নিমিষে হার্টবিট, শ্বাসপ্রশ্বাস, ব্লাড প্রেশার, পালস সব কিছু স্বাভাবিক রূপ নিচ্ছে ৷ অপারেশন করা রত ডাক্তারদের মধ্যে এক ধরনের স্বস্তি ফিরে এল ৷ অবাক, বিস্মিত আর আনন্দিত ডাক্তাররা ভাবল, এটা নিশ্চয়ই মিরাকাল! নিশ্চয়ই সৃষ্টিকর্তার সরাসরি হস্তক্ষেপ !তাদের একবারও মনে হলো না পাগলির ওই রক্তেই যে অস্বাভাবিক কোনও ক্ষমতা রয়েছে l তারা তাে তখন পর্যন্ত জানেই না এটা কার রক্ত। আর এটাও জানে না রক্ত পরিসঞ্চালন কক্ষে কী ঘটেছে। (ক্রমশ) ------------ ।। একাকী কন্যা ।।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৮৭ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now