বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
একজন অভ্র এবং জনৈক পিতা (পর্ব-১)
আবুল ফাতাহ
.
এক
বাসাটার সামনে এসেই থমকে গেলাম।কিভাবে ঢোকা উচিৎ বুঝতে পারছি না।আমার পায়ে বার্মিজ সেন্ডেল।কালো রঙের।বহুল ব্যাবহারে চ্যাপ্টা হয়ে গেছে।তলার খাঁজকাটা অংশটুকু পীচ ঢালা পথের অত্যাচারে টাইলস করা মেঝের মতই মসৃণ।বৃষ্টির দিনে হাঁটতে গেলে সীমান্তের “নো ম্যানস ল্যান্ড”এ হাটার অনুভূতি চলে আসে।বুড়ো আঙ্গুলে দেহের সব ভার চাপিয়ে দিয়ে পা টিপে টিপে এগোতে হয়।যেন এক্ষুনি বিএসএফ গুলি শুরু করবে!
আমি জহির সাহেবের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে দেখতে পাচ্ছি,বাড়িতে ঢোকার দরজার পাশেই একটা জুতোর র্যাক রাখা।আমি পড়ে গেলাম ঝামেলায়।আমার সেন্ডেল ওই র্যাকে শোভা পায় কিনা বুঝতে পারছি না।না পাবারই কথা।এইমুহুর্তে র্যাকে যে জুতোগুলো দেখতি পাচ্ছি,আমার তো ধারনা এগুলো বেঁচেই আমার বার্মিজ সেন্ডেলের একটা ফ্যাক্টরি দেয়া সম্ভব!এদিকে এত ধনী মানুষের বাড়ির বাইরে সেন্ডেল রেখে গেলেও খারাপ দেখায়।শিষ্টাচার বহির্ভূত।তাছাড়া আমার পর কেউ এসে ছাল ওঠা কুকুরের মত একজোড়া সেন্ডেল দেখে ভেবে বসতে পারে এগুলো বোধহয় জহির সাহেব পায়ে দেন!ভদ্রলোক আমাকে ডেকে পাঠিয়েছেন,তাকে অপমান করাটা ঠিক হবে না বোধহয়।
র্যাকে সেন্ডেল রাখার ক্ষেত্রে আরেকটা ছোট্ট সমস্যাও আছে।বারান্দার মেঝেতে মসৃন টাইলস লাগানো।অনেক দামী টাইলস,দেখেই বোঝা যায়।এমন সুন্দর টাইলস মাড়িয়ে জুতো রাখার র্যাকের কাছে যেতেও মায়া লাগে।জুতোর র্যাকটা বাইরে রাখা উচিৎ ছিল।তবে আমার বুদ্ধিতে তো আর বড়লোকরা চলেন না।তারা চলেন তাদের বুদ্ধিতে।আরেকটা কাজ অবশ্য করা যায়।আমি সেটাই করলাম।সেন্ডেল পায়ে দিয়েই সোজা ড্রয়িংরুমে ঢুকে পড়লাম।
কেন করলাম কাজটা?
দেখবেন,মাঝে মধ্যে অদ্ভুত অদ্ভুত সব কাজ করতে ইচ্ছে করে।উদাহরন দেই।ধরুন,আপনি দশতলা বিল্ডিং এর ছাদে দাঁড়িয়ে আছেন।একেবারে রেলিং ঘেষে।একবার নীচে উঁকি দিন।কি মনে হচ্ছে না,লাফ দিতে পারলে মন্দ হয় না?
কিংবা ধরা যাক,আপনি বাসে বসে আছেন।আপনার সামনের সীটে যে বসেছে তার মাথায় একটা চকচকে টাক।বিশাল।সীটের উপর দিয়ে শুধু টাকটাই দেখা যাচ্ছে।জানালার কাচে রোদ প্রতিফলিত হয়ে সেই টাকে পড়ছে,সেখান থেকে আবার প্রতিফলিত হয়ে আপনার মুখ আলোকিত হচ্ছে!কি ইচ্ছে করবে না টাকে ড্রাম বাজাতে?
কিন্তু এরকম করা হয় না কখনো।কারন এই কাজগুলো করতে প্রচন্ড সাহসের দরকার হয়।সাহসও না ঠিক, দুঃসাহস।এরকম দুঃসাহস সাধারনত মানুষকে দেয়া হয় না।তাহলে পুরো পৃথিবীটা উলট পালট হয়ে যেত।তৈরি হত প্রচন্ড বিশৃঙ্খলা।যেমন কথার কথা,আপনি আর আপনার স্ত্রী রাতের বেলা ছাদে হাঁটাহাঁটি করছেন।আকাশে গোল একটা চাঁদ।চাঁদের আশেপাশে উজ্জ্বল চন্দ্রবলয়।মোটামুটি রোমান্টিক একটা পরিবেশ।আপনি চন্দ্রবলয়ের দিকে তাকিয়ে চন্দ্রগ্রস্থ হয়ে পড়েছেন।উচ্চস্বরে স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করছেন। হঠাৎ লক্ষ্য করলেন আপনার স্ত্রীর কোনো সাড়াশব্দ নেই।খানিক পরই বুঝতে পারলেন আপনার স্ত্রী ছাদ থেকে লাফ দিয়েছে।হয়ত চাঁদের অসহ্য সৌন্দর্য কিংবা আপনার কবিতা সহ্য করতে পারেনি!
রাস্তায় বেরোলেই দেখা যেত অদ্ভুত সব ঘটনা।কেউ কারো টাকে ড্রাম বাজাচ্ছে তো আবার কেউ কারো পাছায় লাথি দিচ্ছে।অথবা রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া “মক্ষীরানী” টাইপের কোনো মেয়েকে টুক করে চুমু খেয়ে বসেছে কোনো পাংকু!
তবে এমন কোনো সিস্টেম থাকলে সবচাইতে বিপদে পড়ত দেশের রাজনীতিবিদরা।রাস্তায় বের হলেই চড় থাবড়া খেয়ে হাসপাতালের পথ ধরতে হত।ভয়াবহ পরিস্থিতি!
আমিও ঠিক তেমনি বারান্দায় দাঁড়িয়ে যখন সেন্ডেল বিষয়ক জটিলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম তখন হঠাৎ করেই মনে হল সেন্ডেল পায়ে ঢুকে পড়লে কেমন হয়?
একাজেও যথেষ্ঠ দুঃসাহসের প্রয়োজন আছে,তবে দুঃসাহস দেখাবার একটা সুযোগও আছে।এমন সুযোগ ভবিষ্যতে আসার সম্ভবনা ক্ষীন।যতদুর বুঝতে পারছি জহির সাহেব আমাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজে ডেকেছেন।আমার মত “অগুরুত্বপূর্ণ” মানুষের ডাক যখন পড়ে তখন ধরে নিতে হয় কারনটা গুরুত্বপূর্ণ।
জহির সাহেব হলেন আমার ছাত্রী আফরীনের বাবার বন্ধু।কাল যখন আফরীনদের বাড়িতে গিয়েছিলাম তখন আফরীনের বাবা আশফাক সাহেব আমাকে জহির সাহেবের ঠিকানা দিয়ে বললেন আমি যেন আজ জহির সাহেবের সাথে দেখা করি।খুবই নাকি জরুরি।
আমি বুঝতে পারছি না আমার কাছে ভদ্রলোকের কী এমন জরুরি কাজ থাকতে পারে।সমস্যা নেই কিছুক্ষন পরই জানতে পারব।এখনই অত উতলা হবার কিছু নেই।শেখ সাদী বলেছেন,‘যে ব্যাপারটা তুমি কিছুক্ষন পর এমনিতেই জানতে পারবে সেটা নিয়ে প্রশ্ন করা বোকামি।’
ধারনা করছি আমি এই মুহুর্তে জহির সাহেবের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ।এতই গুরুত্বপূর্ণ যে চল্লিশ টাকা দামের বার্মিজ সেন্ডেল পায়ে দিয়ে ড্রয়িংরুমে ঢুকে পড়লেও আমাকে কিছু বলা যাবে না।তবে উল্টোটা হবার সম্ভবনাও যে নেই তাও কিন্তু না।ধনী মানুষদের আশেপাশে “দুধের মাছির” অভাব থাকে না। ধনীরা ইশারা করা মাত্রই এরা জান হাজির করে ফেলার একটা ভঙ্গি নেয়।সেই হিসেবে বলা যায় না,আমার বেয়াদবি দেখে নিতম্বে কষে একটা লাথি দিয়ে বেরও করে দেয়া হতে পারে।অদ্ভুত ইচ্ছে তো শুধু আমার একারই হয় না,জহির সাহেবেরও হতে পারে!
তবে ভদ্রলোক যেহেতু নিজেই আমাকে ডেকেছেন তখন আশা করা যেতে পারে আমার “পাগলামী” সম্পর্কে তিনি সম্যক জ্ঞাত। মাঝে মধ্যে পাগলামি করারও দরকার আছে।তাতে অন্তত সেন্ডেল পায়ে ধনী মানুষের বাড়ির ড্রয়িংরুমে ঢুকে পড়া যায়।
আমি সেন্ডেল পায়ে দিয়েই বিশাল ড্রয়িংরুমটা পর্যবেক্ষণে লেগে পড়লাম।খুবই পরিপাটি করে সাজানো।যেখানে যেটা থাকার কথা ঠিক সেখানেই আছে সেই জিনিষটা।ঝাড়বাতি, দামী পার্শিয়ান কার্পেট,ম্যান্টেল পিস,মায় সোফাটা পর্যন্ত।
নব দম্পতির প্রথম ঝগড়াটাই বোধহয় ফার্নিচার সাজানো নিয়েই হয়। মানুষ খুবই সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে তুচ্ছ এই ব্যাপারটা নিয়ে।এখন এটাও একটা ব্যবসা হয়ে দাঁড়িয়েছে।বাড়িতে ক'জন লোক আসবে।গম্ভীর মুখে মাপাজোকা করবে,এরপর ফার্নিচারগুলো সেটিং করে দিয়ে যাবে।যাবার সময় নোটের একটা তোড়া সাথে করে নিয়ে যাবে।ফেলো কড়ি মাখো তেল।
জহির সাহেবের ড্রয়িংরুমটা দেখতে দেখতেই আমি একটা ব্যাপার আবিষ্কার করে ফেললাম।অশেষ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা থাকলেই যে ব্যাপারটা ধরে ফেলা যাবে তা কিন্তু না।এক্ষেত্রে আরেকটা জিনিসের দরকার আছে।অনুভূতি।
জহির সাহেবকে চমকে দেবার মত একটা অস্ত্র হাতে পেয়ে মনে মনে খুশি হয়ে উঠলাম।অবশ্য ধনীদের খুব সহজেই অভিভূত করে ফেলা যায়।নয়ত মানুষজন ধনীদের আলতু ফালতু জিনিস গছিয়ে দিয়ে ব্যবসা করতে পারত না।
আমার ধারনা,রাস্তা থেকে খানিকটা কাঁচা গোবর তুলে নিয়ে গিয়ে ধনীদের সামনে রেখে যদি বলা যায়,স্যার,এই গোবর হল রাজা বিক্রমাদিত্যের পোষা গরুর বংশধরের।এই গোবর ড্রয়িংরুমের দেয়ালে লেপে দেয়াটা এখন আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।কালই অমুক সাহেব আমার কাছ থেকে এক কেজি গোবর কিনেছেন।তমুক সাহেব তো দুই কেজির অর্ডার করেছেন।দেখেছেন,কী আভিজাত্য!
হুমম,তা কেজি কত?
স্যার,মাত্র দু লাখ টাকা।
ওকে তিন কেজি দিয়ে যাও।আর মৌর্য আমলের গরুর বংশধরের গোবর পেলে অমুক তমুকের কাছে না গিয়ে আগে আমার কাছে আসবে ঠিক আছে।আভিজাত্যে আমিও কম যাই না,হু!
কথাগুলো কল্পনা করে বেশ বিনোদিত হচ্ছিলাম এমন সময় রুমে জহির সাহেব প্রবেশ করলেন।আমি যারপরনাই অবাক হয়ে গেলাম তাকে দেখে।আমি কখনো জহির সাহেবকে দেখিনি তবু নিশ্চিত হয়ে গেলাম ইনিই জহির সাহেব।
লোকটার পরনের কাপড় চোপড় দেখে অবশ্য জহির সাহেবের চাইতে জহির সাহেবের খানসামা জাতীয় কেউ বলেই ভ্রম হয়।একটা কম দামী পাতলা ফতুয়া আর লুঙ্গি পরা ভদ্রলোক।লুঙ্গিটাও বিপদজনক অবস্থানে। মেঝেতে লুটোপুটি খাচ্ছে।এই বাড়িতে সাফাইয়ের কাজের জন্য লোকের দরকার নেই।জহির সাহেব পুরো বাড়িতে একটা চক্কর দিলেই সে কাজ হয়ে যাবে।
জহির সাহেবের এই রুপ কল্পনা করিনি।তবে বড়লোক হলেই যে সারাদিন স্লিপিং গাউন পরে বসে থাকতে হবে এমন কথা তো কোথাও লেখা নেই।তাই বলে ভদ্রলোক আরেকটু দামী পোশাক পড়তে পারলেন না?
এই পোশাকেও জহির সাহেবকে চিনে ফেলার কারন হল ভদ্রলোকের চেহারায় সত্যিকারের একটা আভিজাত্য আছে। চুলগুলো এলোমেলো। জায়গায় জায়গায় পাঁক ধরেছে তাতে।মুখে চাপ দাড়ি।সেখানেও রুপোলী ছোপ।চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ। যদিও বয়স হয়েছে,তবুও মনে হয় না সহসা চশমার আশ্রয়ে যেতে হবে ও দুটোকে।
‘আপনিই অভ্র?’আমার সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করলেন জহির খান।
‘জী।’আমি উত্তর দিলাম।এই ফাঁকে লক্ষ্য করেছি ভদ্রলোক আমার পায়ের দিকে একপলক তাকিয়েছেন।আমার পায়ের বহুল ব্যাবহৃত সেন্ডেল দেখেও তার মধ্যে কোনো ভাবান্তর ঘটল না।বিন্দুমাত্রও না।ব্যাপারটা এমন নয় যে নিকট ভবিষ্যতে আমি তার কোনো একটা উপকার করতে যাচ্ছি বলে তিনি আমার “বদতমিজি” সহ্য করে নিচ্ছেন।সেক্ষেত্রে তার চোখে বিরক্তির ছাপ পড়ত।কিন্তু তার চোখেও ফুটে ওঠেনি কোনো বিস্ময়,রাগ কিংবা অপমান।যেন ড্রয়িংরুম বানানোই হয়েছে সেন্ডেল পায়ে ঢুকে পড়ার জন্য।
আমি ভদ্রলোককে পছন্দ করে ফেললাম। একজন মানুষকে পছন্দ কিংবা অপছন্দ করতে হাজার বছর কিংবা শত কারন লাগে না,কয়েকটা মুহুর্ত এবং একটা কারনই যথেষ্ঠ।জহির সাহেবকে ভাল লাগার জন্য প্রয়োজনীয় মুহুর্ত এবং কারন আমি পেয়ে গেছি।
‘আপনি আশফাকের মেয়েকে পড়ান,তাইনা?’ জিজ্ঞেস করলেন ভদ্রলোক।
‘আসলে ঠিক পড়াই না।অনেক সময় লাগবে আসল ব্যাপার খুলে বলতে।সংক্ষেপে,আমি আফরীনের সঙ্গী বলতে পারেন।কিছুদিন আগে ওর মানসিক কিছু সমস্যা হয়েছিল।আমি সমস্যাটা সমাধান করে দেই।আশফাক সাহেব আর ছাড়েননি আমাকে।তখন থেকেই আমি ওকে সঙ্গ দেই।মাঝে মধ্যে পড়া টড়াও দেখিয়ে দেই।সেই হিসেবে অবশ্য বলা যায় টিউটর।’
আমি চাইলে সহজেই বলতে পারতাম,জী আমি আফরীনের টিউটর।কিন্তু ভদ্রলোকের প্রতিক্রিয়া যাচাইয়ের জন্য খানিক প্যাঁচ-ঘোচের মধ্যে গেলাম।কী আশ্চর্য!আমার এই কথাগুলোও ভদ্রলোক খুব স্বাভাবিকভাবেই নিলেন।কোনো প্রশ্ন,এমন কি কপালটাও কুঁচকে উঠল না তাঁর।হতে পারে ব্যাপারটা তাঁর জানা নয়ত অনুভূতিগুলো কার্য ক্ষমতা হারিয়েছে।খুব নিঃসঙ্গ মানুষের অনুভূতি শক্তি সাধারণত লোপ পায়।আবার হঠাৎ করে তীক্ষ্ণও হয়ে যেতে পারে।জহির সাহেবের বোধহয় প্রথমটাই হয়েছে।
আমিও এত সহজে হাল ছাড়ার বান্দা না।তাঁর চোখে বিস্ময়ের রেখা দেখতেই হবে আমাকে।আমি আশপাশটা দেখতে দেখতে,যেন নিতান্তই কথার কথা,এমন ভঙ্গিতে বললাম,‘আপনার স্ত্রী কতদিন হল মারা গেছেন,স্যার?’
সম্পুর্ণ ব্যার্থ হলাম।ভদ্রলোক স্বাভাবিকভাবেই বললেন,‘মাস দুয়েক হবে,’এরপর বিরতি দিয়ে বললেন,‘নিশ্চয়ই আশফাকের কাছ থেকে জেনেছেন?’
‘জী না,উনি খুবই ব্যাস্ত মানুষ। প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিছুই বলেন না।আমাকে শুধু আপনার বাসার ঠিকানা দিয়ে আসতে বলেছিলেন।নাথিং মোর।’
‘তাহলে আপনি কিভাবে জানলেন আমি বিপত্নীক?’
আমার উদ্দেশ্য সফল। ভদ্রলোকের চেহারায় যথেষ্ট পরিমাণে কৌতুহল এবং বিস্ময় খেলা করছে।
আমি হেসে বললাম,‘আপনার ড্রয়িং দেখে।’
জহির সাহেব এক পলকে ড্রয়িং রুমটা দেখে নিলেন।ব্যাপারটা আন্দাজ করতে চেষ্টা করছেন।কিছুক্ষণ এদিক সেদিক তাকিয়ে বললেন।‘কই,শাহনাজের মালা পড়ানো ছবি-টবি তো কোথাও ঝোলানো নেই।’
আমি আবার হেসে বললাম,‘মালা ঝোলানো ছবি দেখে বুঝতে পারাটা তো খুবই স্থুল ব্যাপার।যে কেউ পারবে।এর মধ্যে অন্য ব্যাপার আছে।’
‘তারমানে আপনি নিজেকে “যে কেউ” থেকেও বড় কিছু ভাবেন?’
‘বড় ভাবি না,আলাদা ভাবি।দুটোর মধ্যে পার্থক্য সুস্পষ্ট।আমরা সবাই আসলে আলাদা।সবারই এমন কিছু বৈশিষ্ট থাকে যেটা তাকে “যে কেউ” থেকে আলাদা করে দেয়।ধরে নিন পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা আমার একটা বৈশিষ্ট।’
‘আর কী কী বৈশিষ্ট আছে আপনার মধ্যে।’
জহির সাহেব মজা পেতে শুরু করেছেন আমার সাথে কথা বলে।এ ব্যাপারটাই চাইছিলাম আমি।বললাম,‘আছে,আরো কিছু বৈশিষ্ট আছে।ধীরে ধীরে হয়ত দেখতে পাবেন।’
‘আমি কিছু ব্যাপার ধরতে পারছি।’
জহির সাহেব ভেবেছিলেন বোধহয়,আমি জিজ্ঞেস করব-কী ব্যাপার।কিন্তু আমি চুপ রইলাম।
সশব্দে হেসে উঠলেন ভদ্রলোক।‘আপনার সবচাইতে বড় বৈশিষ্টটা কী জানেন? আপনি খুবই আনপ্রেডিক্টেবল।আপনাকে বোঝা খুব কম মানুষের পক্ষেই সম্ভব।আপনি শুধু বিভ্রান্তি তৈরি করতেই ভালবাসেন তা না,আপনি নিজেই একটা বিভ্রান্তি,হা হা হা!’
আমিও হেসে ফেললাম।নাহ,যা ভেবেছিলাম,তা নয়।ভদ্রলোকের অনুভূতিশক্তি লোপ পায়নি।তীক্ষ্ণ হয়েছে।তবে সেটা পরিমিত।অকারণ আবেগ নেই ভদ্রলোকের মধ্যে।আমার ভাল লাগা আরো খানিক বাড়ল।বললাম,‘আমি কিভাবে আপনার স্ত্রীর মৃত্যুর কথা জানতে পারলাম সেটা কি বলব?’
‘আমি আগ্রহবোধ করছি,কিন্তু আপনি নিজে থেকে না বললে যে আপনাকে দিয়ে বলানো যাবে না সেটাও ভালমতই জানি।’
আমি একটা হাসি দিয়ে বললাম,‘আপনার ড্রয়িংরুমের জিনিসপত্র মাত্রাতিরিক্ত রকমের গোছানো হলেও তাতে মমতার স্পষ্ট অভাবে দেখা যাচ্ছে।যতই কাজের লোক থাকুক,বাড়ির মেয়েরা গোছানো জিনিসও আবার গোছায়।মমতার ছাপটা তাতেই পড়ে।এখানে সেটা অনুপস্থিত।’
জহির সাহেব আবার চোখ ঘুরিয়ে তাকালেন পুরো ড্রয়িং রুমে।বোধহয় মমতা খুঁজে বেড়াচ্ছেন! বললেন,‘আশ্চর্যের ব্যাপার,এইমাত্র ব্যাপারটা আমিও লক্ষ্য করলাম।’
আমি তৃতীয়বারের মত হেসে বললাম,‘আপনি আসলে এমন কিছুই লক্ষ্য করছেন না।’
‘মানে? কিভাবে বলছেন এ কথা?’
‘এটা আসলে চোখে পড়ার কিংবা লক্ষ্য করার মত কোনো বিষয় না।আপনার মধ্যে এই ক্ষমতা থাকলে আমি বলার আগেই বুঝতে পারতেন ব্যাপারটা।’
‘কিন্তু সব জিনিস যে সবার চোখে পড়বে এমন তো কোনো কথা নেই।অনেক ব্যাপার আছে না,কেউ ধরিয়ে না দিলে বোঝা যায় না?’
‘হুম,তবে এটা তেমন কোনো ব্যাপার না।আগেই বলেছি,এটা হল একটা অনুভূতি।আর অনুভূতি কখনো তৈরি করা যায় না।’
‘তাহলে আমার কেন মনে হচ্ছে আমি রুমের প্রতিটা জিনিসে মমতার ছাপ স্পষ্টই দেখতে পাচ্ছি?’
‘স্যার একটা গল্প বলি।অনেক কাল আগে একবার এক ভাষ্কর,নাম জানি না,একটা মার্বেল পাথর নির্মিত ভাষ্কর্য তৈরি করে।অনেক বড় ভাষ্কর্য।মাটি থেকে ভাষ্কর্যের মাথা দেখতে চাইলে টুপি খুলে পড়ে যায় আরকি!
‘সত্যিই?!’
‘না স্যার,মজা করলাম।তবে অনেক বড় ছিল ভাষ্কর্যটা।তো ভাষ্কর্য উদ্বোধনের দিন দেশের হোমড়া চোমড়াদের আমন্ত্রণ জানানো হল।সবাই তারিফ করতে লাগল ভাষ্কর্যটার।এর মধ্যে এক হোমড়া গোঁ ধরে বসল।তার দাবী ভাষ্কর্যের নাকটা বড় হয়েছে।নাকটা একটু ছোট করলেই একেবারে “খাপের খাপ,মন্তাজের বাপ”!
‘মানে?’
‘একটা আঞ্চলিক প্রবাদ স্যার।মানে হল পারফেক্ট।যাইহোক,সেই ভাষ্কর বার বার বলতে লাগল,না,এভাবেই ঠিক আছে।কিন্তু ক্ষমতাবানদের ব্যাপার স্যাপার তো জানেনই।এরা যা বলবে সেটাই করাটা যেন অধঃস্তনদের অবশ্য কর্তব্য।তো সেই ভাষ্কর্য শেষ পর্যন্ত অনিচ্ছা সত্বেও মই বেয়ে উঠে গেল ভাষ্কর্যের নাকের ডগায়।এরপর হাতুড়ি দিয়ে খানিক খুটখাট করে নেমে এল।এরপর ভাষ্কর্য দেখে সেই হোমড়া খুশি হয়ে বলল,এবার ঠিক আছে।
মজার ব্যাপারটা কি জানেন,স্যার?ভাষ্কর কিন্তু মূর্তিটার নাকে একটা টোকাও দেয়নি।যেমন ছিল তেমনি আছে।হাতের ফাঁকে কায়দা করে কিছু মার্বেল পাথর নিয়ে গিয়েছিল সেটাই হাতুড়ি দিয়ে ভেঙ্গে নীচে গুড়ো ফেলেছে।’
‘হুম,বেশ মজার ছিল গল্পটা।কিন্তু আমার সাথে এর কী সম্পর্ক?’
‘আপনি তখন জানতে চাইললেন না,আপনার কেন মনে হচ্ছে আপনিও আমার মত মমতার ছাপ দেখতে পাচ্ছেন রুমের সর্বত্র?এটা স্যার,আপনার বিভ্রান্তি।আমার কথাগুলো আপনার মনে একটা প্রভাব ফেলেছে।এজন্য আপনার মন আপনার চোখকে এমন কিছু দেখিয়ে আপনাকে মানসিক প্রশান্তি দিতে চাইছে।
‘কেন?আমার মন আমাকে এমন কিছু কেন দেখাবে?’কপালে ভাঁজ ফেলে জানতে চাইলেন জহির সাহেব।
‘এর পেছনেও কারণ আছে।আপনি সবসময় প্রাচুর্য আর ক্ষমতার মধ্যে বড় হয়েছেন।যখন যা চেয়েছেন,তাই পেয়েছেন।আপনাকে কখনো কারো কাছে ছোট হতে হয়নি।আপনার অবচেতন মনও ওভাবেই ভাবতে অভ্যস্ত।আপনাকে সব সময় সেটাই দেখায় যা আপনি দেখতে চান।আর আমার কথায় আপনার মনের মধ্যে এই ব্যাপারটা দেখার একটা আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে।আশা করি বোঝাতে পেরেছি?’
‘পেরেছেন,খুব ভাল মতই পেরেছেন।’ গম্ভীর হয়ে গেলেন ভদ্রলোক।
আমি খানিকটা ভড়কে গেলাম।ভদ্রলোককে কি একটু বেশি অপমান করা হয়ে গেল না?যদিও সুক্ষ্মভাবে,কিন্তু সেটা ধরতে পারার মত ক্ষমতা জহির সাহেবের আছে।
তিনি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,‘আমি কি তোমাকে তুমি করে বলতে পারি?’
‘বলেই তো ফেলেছেন,’ মুচকি হেসে বললাম।‘না হলে আমিই বলতে বলতাম।অস্বস্তি হচ্ছিল।’
জহির সাহেবও পাল্টা হাসি দিয়ে সোফার দিকে ইশারা করলেন,‘চলো কথা বলি।’
“সেটাই তো করছি” বলতে গিয়েও বললাম না।এই মানুষটার সাথে সস্তা রসিকতা যায় না।ইনি সূক্ষ্ম আবেগের মানুষ।তাঁর সাথে সবকিছুই সুক্ষ্মভাবে করতে হবে।অপমানও!
জহির সাহেবের পিছু পিছু সোফায় গিয়ে বসলাম।ভদ্রলোক আমাকে তুমি করে বলা শুরু করেছেন।শুনতে বেশ লাগছে।মমতার টান আছে তাঁর এই সম্বোধনের মধ্যে।
‘আমাকে একটা কাজ করে দিতে হবে,পারবে?’সোফায় বসে বললেন তিনি।
‘শোনার পর বলতে পারব।’
‘বলছি,’ বলেই চুপ হয়ে গেলেন তিনি।চুপ করেছেন তো করেছেনই।আমার ঘুম পেয়ে গেল!অনেক কষ্টে হাই চেপে রেখেছি,এমন সময় আমাকে চমকে দিয়ে বললেন,‘আমার মেয়েকে খুঁজে বের করতে পারবে?’
‘কেন পারব না?’ আমি একগাল হেসে বললাম।সম্ভবত আফরীনের মত উনার মেয়েকেও সঙ্গ দিতে হবে আমার।লুকোচুরিও খেলতে হতে পারে।অন্তত ভদ্রলোকের কথায় তো সেটাই মনে হচ্ছে।পেশাদার সঙ্গী।অভিনব পেশা! ‘বয়স কত আপনার মেয়ের?’ জানতে চাইলাম।
জহির সাহেব আমার দিকে কেমন কেমন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,‘বিশ চলে।’
আমি বিষম খেলাম।গোটা দুয়েক শব্দ বাগে আনার চেষ্টা চালাচ্ছি কিছু একটা বলার জন্য।
‘আসলে আমারই দোষ।আচমকা এভাবে বলাটা ঠিক হয়নি।শুরু থেকে না বললে কিছু বুঝবে না।এই কাহিনীর শুরু আজ থেকে বিশ বছর আগে।’ বলেই আবার চুপ হয়ে গেলেন জহির সাহেব।
আমি বসে বসে চিন্তা করতে লাগলাম,সব কাহিনীর শুরুই কি “আজ থেকে বিশ বছর আগে”ই হয়ে থাকে!
.
(পরের পর্ব আজ রাত নটায় প্রকাশিত হবে)
.
এই মেলায় অভ্র সিরিজের নতুন বই 'অভ্রত্ব' প্রকাশিত হয়েছে রোদেলা প্রকাশনী থেকে। স্টল নাম্বার : ২১৩-১৫। সবাইকে পড়ে দেখার আমন্ত্রণ।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now