বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
হাসপাতালের কেবিন ধরাধরি ছাড়া পাওয়া যায় না, এই
প্রচলিত ধারণা সম্ভবত পুরোপুরি সত্যি নয়। মিসির
আলি পেয়েছেন, ধরাধরি ছাড়াই পেয়েছেন।
অবশ্যি জেনারেল ওয়ার্ডে থাকার সময় একজন
ডাক্তারকে বিনীতভাবে বলেছিলেন, ভাই একটু
দেখবেন – একটা কেবিন পেলে বড় ভাল হয়।
এই সামান্য কথাতেই কাজ হবে এটা বিশ্বাস করা কঠিন।
আজকাল কথাতে কিছু হয় না। যে-ডাক্তারকে
অনুরোধ করা হয়েছিল তিনি বুড়ো। মুখের ভঙ্গি
দেখে মনে হয় সমগ্র মানবজাতির উপরই তিনি
বিরক্ত। কোনো ভয়ংকর দুর্ঘটনায় মানবজাতি নিঃশেষ
হয়ে আবার যদি এককোষী ‘অ্যামিবা’ থেকে
জীবনের শুরু করে তা হলে তিনি খানিকটা আরাম
পান। তাঁকে দেখে মনে হয়নি তিনি মিসির আলির
অনুরোধ মনে রাখবেন। কিন্তু ভদ্রলোক মনে
রেখেছেন। কেবিন জোগাড় হয়েছে
পাঁচতলায়। রুম নাম্বার চারশো নয়।
সব জায়গায় বাংলা প্রচলন হলেও হাসপাতালের
সাইনবোর্ডগুলি এখনও বদলায়নি। ওয়ার্ড, কেবিন,
পেডিয়াট্রিকস এসব ইংরেজিতেই লেখা। শুধু
রোমান হরফের জায়গায় ব্যবহার করা হয়েছে বাংলা
হরফ। হয়তো এগুলির সুন্দর বাংলা প্রতিশব্দ পাওয়া
যায়নি। কেবিনের বাংলা কি হবে? কুটির? জেনারেল
ওয়ার্ডের বাংলা কি ‘সাধারণ কক্ষ’?
যতটা উৎসাহ নিয়ে মিসির আলি চারশো নম্বর
কেবিনে এলেন ততটা উৎসাহ থাকল না।
ঘণ্টাখানেকের মধ্যে তিনি আবিষ্কার করলেন –
বাথরুমের ট্যাপ বন্ধ হয় না। যত কষেই প্যাঁচ
আটকানো যাক ক্ষীণ জলধারা ঝরনার মতো
পড়তেই থাকে। কমোডের ফ্ল্যাশও কাজ করে
না। ফ্ল্যাশ টানলে ঘড়ঘড় শব্দ হয় এবং কমোডের
পানিতে সামান্য আলোড়ন দেখা যায়। এই পর্যন্তই।
তার চেয়েও ভয়াবহ আবিষ্কারতা করলেন রাতে
ঘুমোতে যাবার সময়। দেখলেন বেদের পাশে
শাদা দেয়ালে সবুজ রঙের মার্কার দিয়ে লেখা –
“এই ঘরে যে থাকবে
সে মারা যাবে।
ইহা সত্য। মিথ্যা নয়।।”
মিসির আলির চরিত্র এমন নয় যে এই লেখা দেখে
তিনি আঁতকে উঠবেন এবং জেনারেল ওয়ার্ডে
ফেরত যাবার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়বেন। তবে
বড় রকমের অসুখ-বিসুখের সময় মানুষের মন
দুর্বল থাকে। মিসির আলির মনে হল তিনি মারাই
যাবেন। সবুজ রঙের এই ছেলেমানুষি লেখার
কারণে নয়, সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক নিয়মে। তার ‘লিভার’
কাজ করছে না বললেই হয়। মনে হচ্ছে লিভারটির
আর কাজ করার ইচ্ছাও নেই। শরীরের একটি
অঙ্গ নষ্ট হয়ে গেলে অন্য অঙ্গগুলিও তাকে
অনুসরণ করে। একে বলে সিমপ্যাথেটিক
রিঅ্যাকশন। কারও একটা চোখ নসত হলে অন্য
চোখের দৃষ্টি কমতে থাকে। তাঁর নিজের
বেলাতেও মনে হচ্ছে তা-ই হচ্ছে। লিভারের
শোকে শরীরের অন্যসব অঙ্গপ্রত্যঙ্গও
কাতর। একসময় ফট করে কাজ বন্ধ করে দেবে।
হৃদপিণ্ড বলবে – কী দরকার গ্যালন গ্যালন রক্ত
পাম্প করে? অনেক তো করলাম। শুরু হবে
অনির্দিষ্টের পথে যাত্রা। সেই যাত্রা কেমন হবে
তিনি জানেন না। কেউই জানে না। প্রাণের জন্ম-
রহস্য যেমন অজানা, প্রাণের বিনাশ-রহস্যও তেমনি
অজানা।
তিনি শুয়ে পড়লেন। প্রচণ্ড মাথা ধরেছে। বেল
টিপে নার্সকে ডাকলেই সে কড়া কোনো
ঘুমের ওষুধ খাইয়ে দেবে। মিসির আলির ধারণা এরা
ঘুমের ট্যাবলেট অ্যাপ্রনের পকেটে নিয়ে
ঘুরে বেড়ায়। রোগীর সামান্য কাতরানির শব্দ
কানে যাবামাত্র ঘুমের ট্যাবলেট গিলিয়ে দেয়।
কাজেই ওদের না ডেকে মাথার যন্ত্রণা নিয়ে
শুয়ে থাকাই ভাল। শুয়ে শুয়ে মৃত্যুর পরের জগৎ
নিয়ে চিন্তা করা যেতে পারে।
ধরা যাক মৃত্যুর পরে একটি জগৎ আছে।
পার্টিকেলের যদি অ্যান্টি-পার্টিকেল থাকতে
পারে, ইউনিভার্সের যদি অ্যান্টি- ইউনিভার্স হয় তা
হলে শরীরে অ্যান্টি-শরীর থাকতে সমস্যা
কী? যদি মৃত্যুর পর কোনো জগৎ থাকে কী
হবে সেই জগতের নিয়ম কানুন? এ-জগতের
প্রাকৃতিক নিয়নকানুন কি সেই জগতেও সত্যি?
এখানে আলোর গতি সেকেন্ডে এক লক্ষ
ছিয়াশি হাজার মাইল, সেখানেও কি তা-ই? নিউটনের
গতিসূত্র কি সেই জগতের জন্যেও সত্যি?
হাইজেনবার্গের আনসারটিনিটি প্রিন্সিপ্যাল? একই
সময়ে বস্তুর গতি এবং অবস্থান নির্ণয় করা অসম্ভব।
পরকালেও কি তা-ই? নাকি সেখানে এটি খুবই
সম্ভব?
মিসির আলি কলিংবেলের সুইচ টিপলেন। প্রচণ্ড বমি-
ভাব হচ্ছে। বমি করে বিছানা ভাসিয়ে দিতে চাচ্ছেন
না, আবার একা একা বাথরুম পর্যন্ত যাবার সাহসও
পাচ্ছেন না।মনে হচ্ছে মাথা ঘুরে বাথরুমের
দরজায় পড়ে যাবেন।
অল্পবয়েসি একজন নার্স ঢুকল। তাঁর গায়ের রঙ
কালো, মুখে বসন্তের দাগ, তাঁর পরও চেহারায়
কোথায় যেন একধরনের স্নিগ্ধতা লুকিয়ে
আছে। মিসির আলি বললেন, ‘এত রাতে আপনাকে
ডাকার জন্য আমি খুব লজ্জিত। আপনি কি আমাকে
বাথরুম পর্যন্ত নিয়ে যাবেন? আমি বমি করবো।’
‘বাথরুমে যেতে হবে না। বিছানায় বসে বসেই বমি
করুন – আপনার খাটের নিচে গামলা আছে।’
সিস্টার মিসির আলিকে ধরে ধরে বসালেন।
আশ্চর্যের ব্যাপার, বমি-ভাব সঙ্গে সঙ্গে কমে
গেল। মিসির আলি বললেন, ‘সিস্টার, আপনার নাম
জানতে পারি?’
‘আমার নাম সুস্মিতা। আপনি কি এখন একটু ভাল বোধ
করছেন?’
‘বমি গলা পর্যন্ত এসে থেমে আছে। এটাকে
যদি ভাল বলেন তা হলে ভাল।’
‘আপনার কি মাথায় যন্ত্রণা হচ্ছে?’
‘হচ্ছে।’
‘খুব বেশি?’
‘হ্যাঁ,খুব বেশি।’
‘আপনি শুয়ে থাকুন। আমি রেসিডেন্ট ফিজিশিয়ানকে
ডেকে নিয়ে আসছি। তিনি হয়তো আপনাকে
ঘুমের ওষুধ দেবেন। তা ছাড়া আপনার গা বেশ
গরম। মনে হচ্ছে টেম্পারেচার দুই-এর উপরে।’
সুস্মিতা জ্বর দেখল। আকশো দুই পয়েন্ট পাঁচ।
সে ঘরের বাতি নিভিয়ে ডাক্তারকে খবর দিতে
গেল।
মিসির আলি লক্ষ করছেন তাঁর মাথার যন্ত্রণা ক্রমেই
বাড়ছে। ঘর অন্ধকার, তবু চোখ বন্ধ করলেই
হলুদ আলো দেখ যায়। চোখের রেটিনা
সম্ভবত কোনো কারণে উত্তেজিত। ব্যথার
সঙ্গে এর কোন সম্পর্ক আছে কি? আচ্ছা –
জ্বর মাপার যন্ত্র আছে থার্মোমিটার । ব্যাথা মাপার
যন্ত্র এখনও বের হল না কেন? মানুষের
ব্যাথাবোধের মূল কেন্দ্র মস্তিষ্ক। স্নায়ু ব্যাথার
খবর মস্তিষ্কে পৌঁছে দেয়। যে-ইলেকট্রিক্যাল
সিগন্যাল ব্যথার পরিমাপক সেই সিগন্যাল মাপা কি
অসম্ভব?
ব্যথা মাপার একটা যন্ত্র থাকলে ভাল হত।
প্রসববেদনার তীব্রতা নাকি সবচে’ বেশি । তার
পরেই থার্ড ডিগ্রী বার্ন। তবে ব্যথা সহ্য করার
ক্ষমতাও একেক মানুষের একেক রকম। কেউ
কেউ তীব্র ব্যথাও সহ্য করতে পারে। মিসির
আলি পারেন না। তাঁর ইচ্ছা করছে দেয়ালে মাথা
ঠুকতে। ব্যথা ভোলবার জন্যে কী করা জায়?
মস্তিষ্ককে কি কোনো জটিল প্রক্রিয়ায় ফেলে
দেয়া যায় না? উলটো করে নিজের সঙ্গে কথা
বললে কেমন হয়? কিংবা একই বাচ্য চক্রাকারে বলা
যায় না?
শিবে বখু কি থাব্য?
শিবে বখু কি থাব্য?
শিবে বখু কি থাব্য?
নার্স ডাক্তারকে সঙ্গে নিয়ে ঘরে ঢুকল। বাতি
জ্বালাল। ডাক্তার সাহেব বললেন, ‘কী ব্যাপার?’
মিসির আলি বললেন, ‘আমার ডেলিরিয়াম হচ্ছে।
আঁকতই বাক্য বারবার উলটো করে বলছি। ‘ব্যাথা কি
খুব বেশি’ – এই বাক্যটিকে আমি উলটো করে
বলছি, থাব্য কি বখু শিবে?’
ডাক্তার সাহেব বললেন, ‘কোনো রোগীর
যখন ডেলিরিয়াম হয় সে বুঝতে পারে না যে
ডেলিরিয়াম হচ্ছে।’
‘আমি বুঝতে পারি। কারণ আমার কাজই হচ্ছে
মানুষের মনোজগৎ নিয়ে। ডাক্তার সাহেব,
আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দিন। সম্ভব হলে খানিকটা
অক্সিজেন দেবারও ব্যবস্থা করুন। আমার
মস্তিষ্কে অক্সিজেন ডিপ্রাইভেশন হচ্ছে। আমার
হ্যালুসিনেশন হচ্ছে।’
‘কী হ্যালুসিনেশন?’
‘আমি দেখছি আমার হাত দুটো অনেক লম্বা হয়ে
গেছে। এখন লম্বা হচ্ছে।’
মিসির আলি গানের সুরে বলতে লাগলেন –
‘ম্বাল তক তহা রমাআ ।
ম্বাল তক তহা রমাআ ।
ম্বাল তক তহা রমাআ ।’
ডাক্তার সাহেব নার্সকে প্যাথিড্রিন ইনজেকশন
দিতে বললেন ৷
{চলবে.....}
**ভাল লাগলে বা ভাল না লাগলে কমেন্টস্ করে জানান**
☺আর বেশি ভাল লাগলে ৫ রিটিং দিয়েন ☺
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now