বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

সবোদ

"ফ্যান্টাসি" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান Sayemus Suhan (০ পয়েন্ট)

X ১। ঃ তর পুতেরে দিয়ালা। হুদাই জিদ করতাসস। একখান গ্যালে আরও তিনখান অইব, এইলায় আমার টাইন থাওক। ঃ আফনে কেলা? আমারে রান্দা কারতাসুইন ক্যান? ঃ আমি কেলা জাইন্যা তর কাম নাই। লইতাম আইসি, দিয়ালা। জামাইরে কইস হিয়ালে লইসে। ঃ দিতাম না। আমারে ছাইরা দেন। ঃ আইজ তাইলে উডিরে কইন্যা। কাইল আবার আইবাম, তর পুতেরে দিয়ালাইস। ও কইন্যা, পুতের কফালো এইতান কী লাগাইসোস? ঃ কাজল দিসি, খাচ ত্যালে ন্যাকড়া চুবাইয়া নিজের আতো বানাইন্যা কাজল। ঃ কাজল দিলে কী অয়? ঃ নজর লাগেনা, বিফদ-আফদ দুরও থাহে। ঃ হা হা হা হা হা। ………………………………………… বুড়ো চলে গিয়েছে অনেক ক্ষণ হয়। একরাশ আলুথালু চুল নিয়ে বিছানায় পা ছড়িয়ে বসে আছে আহেরা। তার পায়ের উপরে ছোট্ট একটা বালিশ, সে বালিশে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে একটি শিশু। শিশুটির বয়স সাড়ে তিন মাস। মায়ের মত তারও মাথা ভর্তি চুল। যদিও এখন কার্তিক মাস, বাইরে বেরুলে হিমে শরীর ঠাণ্ডা হয়ে আসে, কিন্তু জানালা ভেজানো থাকায় ঘরে দারুণ গরম। ছেলেটার চুল ভিজে আছে ঘামে। বড়জা’ বলেছিল মাথাটা ন্যাড়া করে দিতে, আহেরার মনে সায় দেয়নি। কী সুন্দর রেশম রেশম চুল! কী সুন্দর গন্ধ! গামছা দিয়ে ভেজা চুল মুছে দেয় আহেরা। কুপির আলোয় পূর্ণিমার চাঁদের মতো ঝলমল করে তার নাড়ী ছেঁড়া ধন। ঃ ঘুমাও গো বাজান। আমার পাঁচটা না দশটা না, একখান মাত্র পুত। পুতে আমার ঘুম যায়, চাঁন্দের বুড়ি খলখলায়। আহেরার চোখে ঘুম নেই। বালিশের নিচ থেকে চিঠিটা বের করে পড়তে শুরু করে আবার। তার স্বামীর চিঠি। “প্রিয় আহেরা, পর সমাচার এই যে, আমি ভালো আছি। তুমি কেমন আছো? টুকনের জ্বর দেখে এসেছিলাম, বাজানের ওষুধে কাজ না হইলে ফণী ডাক্তাররে খবর দিও। আমার আসতে বিলম্ব হবে, অফিসে অনেক কাজ। পৌষ মাসে মুতালিবের হাতে কিছু জিনিস পাঠাবো। মহররমের মেলা থেকে কিনেছি। তোমার জন্য দুইটা শাড়ি, একটা টাঙাইলের। টুকনের জন্য তিনটা জামা আর একটা টুপি। টুপিটা মনে হয় একটু বড় হয়ে গেল। তাও কিনলাম, কী যে সুন্দর টুপি! সাদার উপরে লাল সুতার সিলি। ইতি টুকনের বাপ।” চিঠিটা দুহাতে মুখের সাথে লেপটে ধরে রাখে আহেরা। বাইরে একটা পেঁচা হুম হুম করে ডেকে জানিয়ে দিয়ে যায় সূর্য উঠতে এখনও অনেক দেরি। ২। নায়েব আলী সাধক মানুষ, গ্রামের মানুষ ভক্তি করে ডাকে ফকির সাহেব। ফকির সাহেবের মেজাজ তিক্ত হয়ে আছে। এক বাটি চিড়া দুধে ভিজিয়ে কখন থেকে অপেক্ষা করছেন, তারা মিয়ার আসার নাম নেই। তারা মিয়া তাঁর ছোটো ছেলে, গত জ্যৈষ্ঠে সাত বছরে পা দিয়েছে। ভারি দুরন্ত, সকাল হতে না হতেই বাইডাগে চলে যায়। হাঁস মুরগির পেছন পেছন দৌড়াতে পারলেই তাঁর আনন্দ। ঃ কইরে তারা মিয়া? কতক্ষণ বইয়া থাকুম আমি? ঃ আইতাসি বাজান। বুজানে আণ্ডা লইতে আইসে, আমি দুইডা খাইয়াম। ঃ আণ্ডা দুফরে খাইস, অহন চিড়া খাইয়া যা। কাইল আডের থন চাম্পা কলা আনসি, চাম্পা কলা আর খাজুরের গুড় দিয়া চিড়া দুধ। ছোট ছোট পায়ে ধুপধাপ করে দৌড়ে এসে ঘরে ঢোকে তারা মিয়া। চাঁপা কলা তাঁর বড়ই প্রিয়। ঃ আরে আরে করস কী? তর ছুড ভাবিরে ক’ আত-পাও ডইল্যা ধুইয়া দিতে। এই বিয়ান বেলায় প্যাঁকের মাইদ্দে গেসিলি ক্যান? দুধের বাটি সরা দিয়ে ঢেকে বিছানা থেকে নামতে গিয়ে ফকির সাহেব টের পেলেন খড়ম জোড়া জায়গা মতো নেই। তারা মিয়ার কাজ। ওদিকে নুরু মুন্সি আগলা ঘরে বসে আছে সকাল থেকে। ঃ আহেরা, নুরুরে কও আমার টাইন চইলা আইতে। ....................................... নুরু মুন্সির হাতে একজোড়া তবলা বায়া। ঃ সেলামালিকুম ফহির সাব। কাতলাসেন থিকা ফিইরাই ভাবলাম আফনেরে দেহাইয়া যাই। চল্লিশ টেহা লইল, কিরম অইসে কইন যে? ঃ আতুড়ি আনসো? ঃ আনসি ফহির সাব। ঃ তইলে দরো, আমি সরুদডা লামাই। সকালের মিঠে রোদের চেয়েও নরম একটা সুর ছড়িয়ে পড়ে সুভরিয়ার বড়বাড়ির বাতাসে। আধখোলা দরজার পাল্লায় হাত রেখে দাঁড়িয়ে আহেরা। শ্বশুরের বাজনা তার খুব ভালো লাগে। এই বাড়ির পুরুষ মানুষ গুলো আজব কিছিমের। শাশুড়ির কাছে শুনেছে ফকির সাহেব নাকি বিয়ের সাত বছরের মাথায় পাগল হয়ে যান। যেন তেন পাগল পাগল না, শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা পাগল। ছয় মাস বদ্ধ উন্মাদ থাকার পর একদিন শিকল ভেঙ্গে নিরুদ্দেশ। টোকনের বাবার তখন তিন বছর বয়স। চার বছর পর তাঁকে খুঁজে পাওয়া যায় দেওখোলার বাজারে। হাতে একটা সরোদ নিয়ে বসে ছিলেন বড় কড়ই গাছটার তলায়, কাঁধ পর্যন্ত নেমে আসা বাবরি চুল আর মুখ ভরা দাড়িতে তাঁকে আর চেনা যায়না। টোকনের বাবাও বাড়ি থেকে পালিয়েছিলেন যখন তিনি ক্লাস এইটের ছাত্র। ফকির সাহেব ততদিনে ফুলবাড়িয়ার পীর শাহ সাহেবের মুরিদ। শাহ সাহেবের পরামর্শে ছেলেকে স্কুল ছাড়িয়ে মাদ্রাসায় দিতে চেয়েছিলেন। একদিন রাতের আঁধারে বাড়ি ছেড়ে সেই যে গেলেন টোকনের বাবা, ফিরে এলেন সাত বছর পর। তাঁর সাথে নান্দাইলের সরকার বাড়ির বড় ছেলে আবুল কালাম। আবুল কালামের বয়স তখন পাঁচ, জায়গীর মাস্টারের সাথে বেড়াতে এসেছে। তারও এক বছর পর আহেরা মাজেদা বউ হয়ে আসে বড় বাড়িতে। আহেরা মাজেদা আবুল কালামের বড় বোন। বেশি দিন থাকা হয়নি, টোকনের বাবার ঢাকায় চাকরি। একদিন বউ কে ডেকে জিগ্যেস করলেন, ঃ ঢাকায় যাবা? শুনেই উত্তেজনায়, আনন্দে বুক ধুকপুক করে উঠে আহেরার। মুখ দিয়ে আওয়াজ বের হতে চায়না। কোনমতে মাথা ঝাঁকিয়ে বলে, ঃ হু ঃ তাহলে চল যাই, এখনই। ঃ এই হাইঞ্জা বেলায়! ঃ দশটার সময় একটা ট্রেন আছে, ঝটিকা। ঃ আব্বা-আম্মারে কই তাইলে? ঃ না না, কাউকে বলতে হবেনা। আমরা পালিয়ে যাবো। বড় বাড়ির পুরুষ মানুষ গুলো আজব কিছিমের। টোকন জন্মায় তার দুই বছর পর। এই দুই বছরে না সরকার বাড়ি, না বড়বাড়ি, কারও সাথে আর দেখা হয়নি আহেরার। দুই মাসের টোকনকে নিয়ে যেদিন বড় বাড়িতে ফিরে এলো সেদিন ছিল শাহ সাহেবের উরস। বাড়ি ভর্তি থৈ থৈ মানুষ, ফকির সাহেব সরোদ বাজাচ্ছেন। ঃ ও ছুড বউ, তারা মিয়ারে কলতলায় ফালাইয়া রাইখা কই গেলা? পুতে আমার ঠাণ্ডার মাইদ্দে খাড়াইয়া খাড়াইয়া কানতাসে। শাশুড়ির ডাকে চমক ভাঙ্গে আহেরার। ৩। ঃ আব্বা, উনি কালকেও আসছিলেন। ঃ হুম, কী চায়? ঃ পুতেরে চায়। ঃ আমি যে তাবিজ দিসিলাম দরজায় ঝুলাইয়া রাখতে, রাহোনাই? ঃ রাকসি, হেইলা তাবিজ উবিজে ডরায় না। ঃ তুমার আম্মারে আইতে কও। আর পুতেরে দিয়া যাও আমার টাইন। যিনি আসেন, তিনি কে, কোথা থেকে আসেন ফকির সাহেব ধরতে পারছেন না। আহেরা ছাড়া আর কেউ তাঁকে দেখেনি। মানুষটি বৃদ্ধ, দেড় হাতের মতো লম্বা। বুক পর্যন্ত নেমে আসা সাদা দাড়ি দুলিয়ে দুলিয়ে আহেরাকে ভয় দেখান, ছেলেটাকে নিয়ে যেতে চান। ফকির সাহেব বড়ই চিন্তিত, তাঁর তাবিজে কাজ হচ্ছেনা। অস্থির ভাবে পায়চারি করতে থাকেন নিকনো উঠোনে, কাঠের খড়মে ঠকাস ঠকাস শব্দ ওঠে, যেন টান টান তবলায় তর্জনীর চাঁটি। হঠাৎ থমকে দাঁড়ালেন, কিছু একটা মনে পড়ে গিয়েছে তাঁর। ঃ তারা মিয়া, তুমার ছুড ভাবিরে কও আমি একটু আড়াত গেলাম। পুতেরে যেন শক্ত কইরা দইরা রাহে। সাবধান। বড়বাড়ির রান্না ঘরের পেছনে বিশাল জঙ্গল, সেখানে ঠাসা ঠাসি করে দাঁড়িয়ে আছে বাঁশের ঝাড় আর অনেক কালের পুরনো সব গাছপালা। ফকির সাহেব সরোদ হাতে নিয়ে জঙ্গলের মাঝখানে, যেখানে আকাশ ঢেকে দেওয়া তেঁতুল গাছটা দাঁড়িয়ে, তার তলায় এসে বসেছেন। জায়গাটা কেমন যেন অচেনা লাগে তাঁর, পাগল হবার পর এখানে আর আসা হয়নি। বড়বাড়ির রান্নাঘরে টোকন কে বুকে চেপে বসে আছে আহেরা মাজেদা। তার মাথায় হাত রেখে দাঁড়িয়ে শাশুড়ি। চারপাশে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে দুই জা, আর তিন ননদ। ঢেঁকির উপরে বসে তারা মিয়া। সরোদ বাজছে। জঙ্গলে যেন ঝড় বয়ে যাচ্ছে আজ। কখনও মিঠে সুর, কখনও আগুনে ঝঙ্কার, কখনও যেন শ্রাবণ মাসের অঝোর বর্ষার মতো অবিরল তান। ফকির সাহেব তাঁর সমস্ত দরদ ঢেলে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে চলেছেন কাঠের যন্ত্রে। ……………………… ফকির সাহেব মারা গিয়েছেন বাইশ বছর হতে চলল। বাজনা ছেড়েছেন তারও বিশ বছর আগে। সরোদটা এখন টোকনের ছোটো বোনের ড্রইং রুমের দেয়ালে। সেই বুড়ো আর টোকনকে চাইতে আসেনি। কিন্তু আহেরা মাজেদাও ছেলেকে ধরে রাখতে পারেন নি বেশিদিন। চিঠির যুগ ফুরিয়েছে সে বহুকাল। আহেরা মাজেদার দিন কাটে ফোনের প্রতীক্ষায়।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১২৫৪ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-
☆ ☆ ☆ ☆ ☆

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now