বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

উত্তরণ

"ফ্যান্টাসি" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান Sayemus Suhan (০ পয়েন্ট)

X ১. আমার নাম প্রতিমা সাহা। আমার ছেলেবেলা কেটেছে যৌথ পরিবারে। সে এমনই এক যৌথ পরিবার যেখানে কেবল সকালের জলখাবারের সময়ই টেবিলভর্তি মানুষ। বাবু, ছোটকা আর ছোট কাকীমা নিজেদের মতো খেয়েদেয়ে অফিসে চলে গেলে বাকি সময় স্কুলফেরত আমি আর মা ছাড়া বাড়িতে কোনো জনমানুষ্যি ছিল না। ভুল বললাম, আরেকজন ছিল। ঠাকুরদা। তবে বাড়িতে ঠাকুরদার অস্তিত্ব আমার উপস্থিতির উপর নির্ভর করতো। আমাকে পেলে ঠাকুরদার গল্পের ডালি খুলে যেতো। তা না হলে বাকি সময় তিনি নিজের ঘরে বই পড়ে কাটাতেন। ঠাকুরদা অনেক জ্ঞানী লোক ছিলেন। কিন্তু সেই জ্ঞান আমি ভীষণ ভয় পেতাম। সেই বয়সে আমার কাছে সে তো জ্ঞান ছিল না, ছিল বকবকানি। ঠাকুরদার হাত থেকে বাঁচার জন্য পারতপক্ষে আমি তার সামনে যেতাম না। তবু দুই ছেলে, ছেলে বউকে কাছে না পেয়ে ঠিক ঠিকই ঠাকুরদা আমাকেই ধরে ধরে আনতেন আর জ্ঞানের কথা শোনাতেন। ঠাকুরদা বলতেন, মানুষের দেহ নশ্বর কিন্তু দেহত্যাগী আত্মা অবিনশ্বর। আত্মা হচ্ছে অমর শক্তি আর সেই অমর শক্তির রূপান্তর আছে কিন্তু ক্ষয় নেই। ঠাকুরদার কথাগুলো বড্ড ভারী ঠেকতো তখন। সেসব কথার ওজন নেবার বয়স হয়নি তখনো। তবু ঠাকুরদা বকতে বকতে আমার উপস্থিতিই একসময় ভুলে যেতেন। আমি সেই সুযোগটাই নিতাম। ঠাকুরদা আপনমনে বকে যেতেন আর আমি রক্তজবা নিঙড়ে হাতের তালুতে বৃত্ত আঁকতাম। মা আমার কান্ড দেখে ছুটে এসে গালমন্দ করতেন। আমি নাকি সৃষ্টিছাড়া, দস্যি মেয়ে। মায়ের বকুনিতে আমার দস্যিপনা উস্কে যেতো। ঠাকুরদার হাত থেকে রক্ষা পাবার উপায় পেয়ে আমি ঠাকুরঘরে যেয়ে পুজোর বাকি ফুলগুলোও নিয়ে আসতাম। সেই ফুলে মালা গাঁথতাম, টিকলি বানাতাম, জবার রঙে আলতা পরতাম। সেই সাথে পুজোর ফুল নষ্ট হতো দেখে বকুনিও খেতাম বিস্তর। উজ্জয়িনী আমি কৈশোরের চপলতায় উল্টো মাকে দুষতাম, -তোমার ঠাকুর এমন আলতা পড়তে পারে বুঝি? জানে সে ফুলের এমন ব্যবহার? মা আমার পিঠে দমাদম কিল বসাতেন। -পুজোআচ্চনার নামটি নেই। খালি কথার পিঠে কথা, কথার পিঠে কথা! -উহ। খালি আমাকেই যে পাও বড়! ঠাকুরদাকে তো কিচ্ছু বলো না! ঠাকুরদাও তো পুজোর নাম করে না। ঠাকুরের নাম করে হাসে! -ওহ্ তবে সেইখান থেকেই শিখ্যেটা আসছে! বাবা গুরুজন। তুই ওসবে কান দিবি। তুই আমাকে দেখিসনে? ভক্তি কর। ভক্তি কর। -ইস্ আমার অতো ভক্তি নেই। আমার দরকার নেই পুজো! -ঠাকুর দেবতার নাম করে মন্দ কথা বলবি না। কি দোষে যে অমনধারা মেয়ের নাম রাখলাম প্রতিমা! দিনরাত আমার প্রতিমার পিছেই লেগে থাকে! ও ঠাকুর দয়া কর! মুখ তুলে চাও! -মা তবে বাবুকে বলো আমার নামটা এফিডেভিট করে প্রতিমা সাহার বদলে অলুক্ষনে সাহা নয়তো দস্যি সাহা করে দিক। মা তখন হেসে ফেলতেন। কি সুন্দর সেই হাসি! মায়ের হাসিমুখ দেখে আমার মনে হতো, এই তো আসল প্রতিমা! মায়ের মুখে হাসি আনবার লোভে কতদিন ঘুম থেকে উঠেই ছুট লাগিয়েছি! পুজোর ফুল নষ্ট করবার ক্ষতিপূরণস্বরূপ সারা রাজ্য ঘুরে ভোরবেলাতে মায়ের জন্য কোচড় ভরে জবা, নয়নতারা, বেলি নিয়ে আসতাম। কিন্তু আমার পক্ষে মাকে খুশি করার চেয়ে ঠাকুর খুশি করা সহজ ছিল। আমি কোচড় উপুড় করে যখন মায়ের পুজোর থালা ভরে দিতাম, মা তখনও আমাকে গালমন্দ করতে ছাড়তেন না। আমার দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে একই প্রশ্ন বারবার করতেন, -সত্যি বলছিস, এগুলো চুরির ফুল নয়? রোকেয়াদের বাগান থেকে তুলে আনিস নিতো? আমিও বারবার একই কায়দায় উত্তর করতাম, -ছি ছি, আমি জানিনে বুঝি চুরির ফুল তোমার দেবতা নেয় না! -কি অলুক্ষনে! কি অলুক্ষনে! বলে কি না তোমার দেবতা! এই মেয়ের জ্ঞানগম্যি হবেনে! ঠাকুর। ঠাকুর। আমাকে ছেড়ে দিয়ে মা তখন ঠাকুরকে নিয়ে পড়তেন। ঠাকুর যেন আমায় সুমতি দেন। সেই তো ঠাকুর আমাকে জ্ঞান দিলেন। গন্যিমান্যিও বানালেন কিন্তু সুমতি দিলেন না। ২. -আমার স্ত্রীর নাম প্রতিমা সাহা। আমার নাম শফিকুল ইসলাম। এই নিয়ে তিনবার আমি আমার আর আমার প্রতিমার নাম বললাম। প্রথমবার মনে হলো মেয়েটি শুনতে পায়নি। দ্বিতীয়বার মনে হলো মেয়েটি ভাল মতো শুনতে পায়নি। আর তৃতীয়বার মনে হলো মেয়েটি ভাল মতো শুনতে পাবার পরও আবার শুনতে চাইছে। আমি আবার আমাদের নাম বললাম। এবার মেয়েটি বিস্ফোরিত চোখে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে, -পেসেন্ট আপনার স্ত্রী হন? আমি বিরক্ত হই না। এসব প্রশ্ন শুনে আমাদের অভ্যেস আছে। কিন্তু এখন তো বাড়তি প্রশ্ন শুনবার সময় না। তাই আমি মেয়েটির প্রশ্নের পৌনঃপুনিকতায় কেবল অধৈর্য্য হই। -পেসেন্ট আমার স্ত্রী হন, আমার আসছে বাচ্চার মাও হন। আমাদের নাম ঠিকানা লেখা হয়েছে তো। এবার রুমটা কোনদিকে বলে দিন। ডাক্তার সাহেব বলেছেন কাল সকালেই সিজার করতে হবে। রিসেপশনিস্ট মেয়েটার চোখ এখন প্রতিমার মুখের দিকে। আমি পরখ ছাড়াই বুঝতে পারি মেয়েটির চোখের দৃষ্টি প্রতিমার কপাল, সিঁথি প্রতিমার হাতের কব্জিসন্ধিতে এসে পরেছে। আমি মেয়েটিকে আর প্রশ্ন করবার কষ্ট দেই না। -প্রতিমা শাখা সিঁদুর পরে না। আমার ইচ্ছা অনিচ্ছার বিষয় না এটা ওর ইচ্ছে। আপনি কি আমাদের বিয়ের দিনক্ষণ, পূর্বাপরও জানতে চান? জানতে চাইলে তার ডিটেলস আমি তারিখসহ বলতে পারি। আমার কথা শুনে প্রতিমা হাসছে। আমি বুঝতে পারছি, প্রতিমার দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছে কিন্তু ওর হাসি দেখে আমার ভাল লাগে। মেয়েটি এবার হাল ছেড়ে দেবার ভঙ্গিতে আমাদের দিকে তাকিয়ে বলে, -আপনাদের কেবিন নং ২৮। এই সিস্টার আপনাদের কেবিনে নিয়ে যাবে। কেবিনে ঢুকেই প্রতিমা বেডে শুয়ে পড়ে। -কষ্ট হচ্ছে? -না, ক্লান্ত লাগছে। আমি চেয়ার টেনে নিয়ে প্রতিমার মাথার কাছে বসি। প্রতিমা আমার হাত নিজের মুঠোতে পুরে বুকের মাঝে জড়ো করে রাখে। -শীত করছে? আজ কিন্তু বেশ ঠাণ্ডা পড়েছে। নিউজে দেখলাম শৈত্য প্রবাহ শুরু হয়েছে। অবশ্য আমরা যথেষ্ট শীতের কাপড় এনেছি কি বলো? নিরুত্তর প্রতিমার মায়াবী মুখটা দেখে আমার বুকের মধ্যে লুকিয়ে থাকা শীত হুড়মুড় করে নেমে আসে। ছটফট করতে করতে আমি প্রতিমার বুকে মাথা গুঁজে দেই, ওম খুঁজি। প্রতিমার বুকে কি সুন্দর গন্ধ! -তোমার বুকে লেবুপাতার ঘ্রাণ। -ছাই ঘ্রাণ। এখনই কেমন দুধ দুধ গন্ধ! আমি গন্ধের বিভ্রমে পড়ে যাই। -ছাই না সত্যি! প্রতিমা হাসে। -ছুটি নিয়ে এখন এইসব হচ্ছে না! কাল সকালে বুঝবে কত ধানে কত চাল। আমি প্রতিমার কথার পিঠে কথা বাড়াই না। ওর বুকে ছড়ানো লেবুপাতার গন্ধে আমি গোলকধাঁধায় পড়ে যাই। শীত কমে যেয়ে আমার শরীর জুড়ে মায়াবী উষ্ণতা নেমে এসেছে। আমরা দুজন খানিকক্ষণ নিশ্চুপ, নিশ্চল থাকি। কেমন একটা ভাললাগা আচ্ছন্ন করে রাখে আমাদের। কিছু কিছু একান্ত সময় আছে যখন জাগতিক অনুভূতির গল্পগুলো তুলে রাখতে হয়। তবু প্রতিমা সময়জ্ঞান ভুলে গিয়ে বোকার মতো প্রশ্ন করে, -মা ফোন করেছিল? -না। প্রতিমার চোখ নয় তো চাঁদ। সেই চাঁদের শরীরে আমার উত্তরে আবছা মেঘের ছায়া ভাসে। আমার ইচ্ছে করে আদরের মই বেয়ে গন্তব্যে পৌঁছাই, তারপর সেই ছায়া দুহাতে সরিয়ে দেই। আমার ইচ্ছেমুক্তি ঘটবার আগেই প্রতিমার চোখের সে ছায়া গাঢ় হয়। আমি চমকে যাই। -আমাকে ফোন করেছিল। সকালে। -থাক কথা বলার দরকার নেই। ঘুমোবার চেষ্টা কর। প্রতিমা বাঁ কাত হয়ে ধীর ভঙ্গিতে উঠে বসে। তারপর কথাহীন নিশ্চল বসে থাকে। আমি অপরাধীর মতো বলি, -শুয়ে পড়ো তো। সিস্টার কি বললো শুনলে তো। রেস্ট নিতে হবে। -আজ আমাকে অনেক কথা বলেছেন মা। প্রতিমা খানিকটা সময় নিয়ে কান্না সামলায়। -তোমার জন্মের আগে খুব অসুস্থ ছিলেন মা। মায়ের শুধু টেনশন ছিল, এবারো মেয়ে হবে। তোমার চারবোনের পর তোমার পঞ্চম বোনটা জন্মাবার দশদিন পরে মারা গিয়েছিল। সেই বোনের মৃত্যুর পর থেকেই মা নাকি আধপাগল হয়ে যান। আর বাবা পীরের দরগায় ছেলে সন্তানের মানত রাখেন। -তুমি থামো। আমি এসব জানি। -মা কাঁদছিলেন। বলছিলেন, ‘আমার সেই আব্বাকে তুমি নিয়া গেলা। ধর্ম মানলা না? তুমি সুখী হবা না, দেইখো। ‘ মায়ের অভিশাপ বড় কানে বাজছে। আমি প্রতিমাকে দুহাতে কাছে টানি। প্রতিমা কাঁদছে। আমি খানিকক্ষণ ওকে কাঁদতে দেই। তারপর আমরা দুটি মানুষ প্রগাঢ় ভালোবাসা আর মায়ায় নিজেদের আঁকড়ে ধরি। আমরা জানি আমাদের জাত নেই, ধর্ম নেই। অধর্মও নেই। আমাদের প্রতি ছুটে আসা অভিশাপ থেকে উত্তরণের জন্য ভালোবাসা ছাড়া কোনো বিকল্প আমরা খুঁজে পাই না।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১২৪৬ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-
☆ ☆ ☆ ☆ ☆

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now