বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

রোমেলী দুর্গে চ্যাপ্টার- ৪

"সাইমুম সিরিজ" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X ৪ অল্পক্ষণ হলো মিটিং শুরু হয়েছে। একটা বড় টেবিল ঘিরে চারজন মানুষ। প্রধান বা সভাপতির আসনে বসেছে ‘থ্রি জিরো’র ইউরোপীয় প্রধান আইজ্যাক বেগিন। তার পাশেই ইসরাইলী রাস্ট্রদূত বসেছে। তাদের সামনে টেবিলের ওপ্রান্তে বসেছে ‘থ্রি জিরো’র ইস্তাম্বুল প্রজেক্টের প্রধান প্রফেসর ডক্টর ডেভিড ইয়াহুদ। তার পাশেই ‘স্মার্থা’। স্মার্থা ইস্তাম্বুল প্রজেক্টের নতুন অপারেশন চীফ। ইরগুন ইবান নিহত হবার পর তার দায়িত্ব এসে পড়েছে স্মার্থার উপর। প্রফেসর ডক্টর ইয়াহুদ তাদের ইস্তাম্বুল প্রজেক্ট সম্প্রতি মারাত্মক যে বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে, তার উপর পূর্ণাঙ্গ ব্রিফিং শেষ করল। ‘থ্রি জিরো’র ইউরোপীয় প্রধান আইজ্যাক বেগিনের মুখ আষাঢ়ে মেঘের মত ভারি। মাথা নিচু করে সে ডক্টর ডেভিড ইয়াহুদের কথা শুনছিল। ডক্টর ইয়াহুদের কথা শেষ হলে ধীরে ধীরে মুখ তুলল আইজ্যাক বেগিন। চোখে-মুখে তার অনেক প্রশ্ন। মুখ ফাঁক করেছে প্রশ্ন করার জন্যে। এই সময় ইন্টারকমে কথা বলে উঠল আইজ্যাক বেগিনের পিএস। ‘বল রবিন। জরুরি কিছু?’ জিজ্ঞাসা আইজ্যাক বেগিনের। ‘স্যার, বেঞ্জামিন এসেছে। ভেতরে পাঠাব?’ বলল রবিন। ‘বেঞ্জামিন? লরেন্স কোথায়? আমি তো লরেন্সের টেলিফোনের অপেক্ষা করছি। পাঠাও তাকে।’ আইজ্যাক বেগিন বলল। ‘লরেন্স তো এভাবে আমাদের দূতাবাসে আসার কথা নয়। তার উপর পুলিশের নজর আছে বলে আমরা জানি।’ বলল তুরস্কে কার্যরত ইসরাইলি রাষ্টদূত। ‘আমি সে কথাই ভাবছি। টেলিফোনে মেসেজ আসবে লরেন্সের কাছ থেকে। কিন্তু সেই মেসেজের বদলে বেঞ্জামিন আসছে কেন? লরেন্সের মোবাইল ঘন্টা খানেক আগে থেকে বন্ধ।’ আইজ্যাক বেগিন বলল। ‘লরেন্সের সাথে গোয়েন্দা হেডকোয়ার্টারেই যেহেতু ডিউটি ছিল, তাই জরুরি কোন কথা তার থাকতে পারে।’ বলল ড.ইয়াহুদ। দরজায় নক হলো। ‘এস রবিন।’ বলল আইজ্যাক বেগিন। রবিন লরেন্সকে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করল। রবিন লরেন্সকে ভেতরে ঢুকিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়ে চলে গেল। নির্দেশ মত স্মার্থার পাশে একটা খালি চেয়ারে বসল বেঞ্জামিন। বেঞ্জামিন পুলিশের গোয়েন্দা হেডকোয়ার্টারে একজন সিভিলিয়ান কেমিষ্ট অফিসার। সবার চোখ বেঞ্জামিনের দিকে নিবদ্ধ। মুখ খুলল বেঞ্জামিন। একবার ড. ইয়াহুদের দিকে তাকিয়ে চোখ নিবদ্ধ করল আইজ্যাক বেগিনের দিকে। তার চোখ-মুখ ভীত ও ফ্যাকাসে। বলল, ‘স্যার, লরেন্স নিহত হয়েছেন।’ ‘কখন, কিভাবে? সে তার কাজ করতে পারেনি?’ জিজ্ঞাসা আইজ্যাক বেগিনের। ‘সে বেয়ারার ছদ্মবেশে নাস্তা নিয়ে ঘরে ঢুকেছিল। জেনারেল মোস্তফা তখন ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু খালেদ খাকান তাকে গুলী করে মেরেছে।’ ‘খালেদ খাকান কি করে তাকে সন্দেহ করল? লরেন্স অত্যন্ত চালাক লোক। একাধিক অপশন দেয়া হয়েছিল। যে কোন মূল্যে আজকেই ভিসিডি উদ্ধার করতে হবে। সুযোগ পেলে চায়ে বিষ মিশিয়ে ওদের হত্যা করে ভিসিডির কাছে পৌঁছতে হবে। এ সুযোগ না পেলে ঘরে বিষাক্ত গ্যাস ছুঁড়ে সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। এই দুই ক্ষেত্রে সন্দেহ হবার আগেই তো কাজ শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু সে খালেদ খাকানের সন্দেহের শিকার হলো কি করে? জেনারেল মোস্তফা সন্দেহ করলে একটা কথা ছিল যে, সে লরেন্সকে চিনতে পেরেছে।’ বেঞ্জামিন বলল, ‘আমি বলাবলি করতে শুনেছি যে, লরেন্স ঘরে প্রবেশ করার আগেই জেনারেল মোস্তফা বেরিয়ে এসেছিল এবং তাঁর নির্দেশেই লরেন্স নাস্তা নিয়ে যান ঐ ঘরে। তিনি জেনারেল মোস্তফার বরাত দিয়ে ভিসিডিটি কম্পিউটার থেকে নিয়ে আসার চেষ্টাও করেন। সেই সময় খালেদ খাকান বাধা দিলে লরেন্স তাকে গুলী করেন। কাঁধে গুলীবিদ্ধ হয়েও খালেদ খাকান গুলী করে হত্যা করে লরেন্সকে।’ ‘তাই হবে। ওতো খালেদ খাকান নয়, আমাদের চিরশত্রু, আমাদের সীমাহীন সর্বনাশের হোতা সেই আহমদ মুসা। নিখুঁত মেকআপে তার চেহারা অনেক খানি পরিবর্তন করেছিল। দেরি হয়েছে তাকে চিনতে। সব ব্যাপার আমরা জেনেছি। তার নাম পাল্টিয়ে তুর্কি সরকার ও ওআইসি তাকে নিয়ে এসেছে তাদের আইআরটি রক্ষার জন্যে।’ থামল আইজ্যাক বেগিন। ড. ডেভিড ইয়াহুদ, স্মার্থা সকালের চোখ বিস্ময়ে বিস্ফারিত। অবচেতন মনে শিউরেও উঠেছে তারা। তারা সবাই জানে, সব যুদ্ধেই অবশেষে তারা আহমদ মুসার কাছে হেরেছে। সাধারণ ঐ লোকটি একেবারেই অসাধারণ। যেমন সে ক্ষীপ্র, তেমনি ধুর্ত, তার সাহসেরও পরিমাপ নেই। তাদের মুখে কোন কথা নেই। কথা বলে উঠল আইজ্যাক বেগিন। বলল বেঞ্জামিনকে লক্ষ্য করে, ‘তুমি এবার এস।’ ‘ইয়েস স্যার।’ বলে বেঞ্জামিন উঠে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। বেঞ্জামিন বেরিয়ে যেতেই আইজ্যাক বেগিন বলল, ‘এখন দুই টার্গেট, ‘সোর্ড’-এর ফর্মুলা হাত করা এবং আহমদ মুসাকে হত্যা করা। দেখামাত্র তাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত আমাদের আগে থেকেই আছে। সেটাই কার্যকারী করতেই হবে।’ ‘সে সাংঘাতিক ধড়িবাজ। তার ফাইল আমি মোসাদ-এর ওয়েবসাইটে পড়লাম। তাকে ধরার জন্যে, তাকে শেষ করার জন্যে হাজারো ফাঁদ পাতা হয়েছে, হাজারো সুযোগ আমাদের হাতে এসেছে, কিন্তু সবই আমাদের ব্যর্থ হয়েছে। ইস্তাম্বুলে আমাদের যে অভিজ্ঞতা, তাও এ কথাই বলছে যে, তার সাথে লড়াই নয় ধ্বংস করতে হবে তাকে। আমি মনে করি স্যার, আইআরটি সমেত তাকে ও বিজ্ঞানীদের ধ্বংস করা হোক। তাতে আহমদ মুসাসহ ওদের সোর্ড ও গবেষণা কার্যক্রম শেষ হয়ে যাবে।’ বলল স্মার্থা। গম্ভীর হলো আইজ্যাক বেগিন এবং ড. ডেভিড ইয়াহুদের মুখ। ড. ইয়াহুদ তাকাল আইজ্যাক বেগিনের দিকে। আইজ্যাক বেগিন সোজা হয়ে বসল চেয়ারে। বলল, ‘স্মার্থা, তুমি আমাদের অপারেশন স্কোয়াডের একটি কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব। তোমার জানা দরকার যে, সোর্ড, সোর্ডের বিজ্ঞানী বা আইআরটি ধ্বংস করা আমাদের মিশন নয়। আমরা ‘সোর্ড’-এর ফর্মুলা চাই, আমরা চাই সোর্ডের ডিজাইন।’ ‘কিন্তু স্যার, আমি বুঝতে পারছি না, ‘সোর্ড’ এবং এর ডিজাইনে এত গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে কেন? আমি জানি, মার্কিন ইহুদী কণাবিজ্ঞানী ইলাম ইমামুয়েল আলোক কণা ফোটন নিয়ে ‘সোর্ড’-এর অনুরূপ গবেষণায় সফল হয়েছেন। এর অর্থ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ‘সোর্ড’ জাতীয় ডিফেনসিভ শিল্ডের মালিক হওয়ার সাথে সাথে গোপনে ইসরাইলও এর মালিক হয়ে গেছে। অতএব সোর্ড কিংবা সোর্ডের ফর্মূলার দরকার ইসরাইলের নেই। এরপরও স্যার, আইআরটির সোর্ড ও সোর্ডের ফর্মূলা পাওয়ার জন্যে অহেতুক আমরা এত ক্ষতি স্বীকার করছি কেন? সব সমতে আইআরটি ধ্বংস করলেই তো আমাদের কাজ শেষ হয়ে যায়। সোর্ড ওদের হাতে না থাকলেই আমরা বেঁচে যাই।’ বলল স্মার্থা। ‘তুমি যে তথ্য দিয়েছ তা ঠিক। কিন্তু সব তথ্য তুমি দিতে পারনি। আমাদের কণাবিজ্ঞানী ইলাম ইমামুয়েল আলোক-কণার ‘ফোটন’- শিল্ড আবিষ্কার করেছেন, যার ফাংশন ডিফেন্সিভ অস্ত্র হিসেবে ওদের সোর্ড এর মতই। কিন্তু ওদের ‘সোর্ড’- এর ভয়াবহ অফেনসিভ ক্যারেক্টার রয়েছে, যা আমাদের ফোটন শিল্ডে নেই।’ বলল আইজ্যাক বেগিন। ‘বুঝলাম না, স্যার?’ স্মার্থা বলল। ‘বলছি শোন, ইস্তাম্বুলের ‘আইআরটি’ গবেষণাগার ‘সোর্ড’ নামের যে ‘ফোটন-শিল্ড তৈরি করেছে তা যেমন ডিফেনসিভ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা যায়, তেমনি অফেনসিভ অন্ত্র হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। আইআরটির প্রধান বিজ্ঞানী ড. আন্দালুসির বহু আগের লেখা ‘টেকনোলজিক্যাল ইউজ অব ফোটনস’ নামের একটা নিবন্ধ তার গোপন ওয়েব সাইট থেকে আমাদের বিজ্ঞানীরা উদ্ধার করেছেন। তাতে অন্যান্য বিষয়ের সাথে তিনি গামা-ফোটনের ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিজম নতুন উপাদান ‘আল-সালাম’- এর কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন এই ‘আল-সালাম’- এর প্রযুক্তিগত ব্যবহার ফোটন-নেটকে ভয়ংকর মারণাস্ত্রে রূপ দিতে পারে, যা পাল্টে দিতে পারে দুনিয়াকে। তার মতে ‘আল-সালাম’- এর প্রযুক্তি রূপকে যদি ফোটন-নেটের সাথে যুক্ত করা হয়, তাহলে এমন একটা অস্ত্র তৈরি হবে যা আলোর গতিতে দুনিয়ার যে কোন প্রান্তে পৌছে যে কোন দুর্ভেদ্য সাইলোতে ঢুকে পড়ে মেটালিক-ননমেটালিক সব অস্ত্রকে সম্পূর্ণ হাওয়া করে দিতে পারে। আজ আইআরটিতে বসে ড. আন্দালুসি যে ‘সোর্ড’ তৈরি করেছেন, তাতে এই অফেনসিভ ক্যারেক্টার যুক্ত রয়েছে। ‘সোর্ড’- এর যে অর্থ তার মধ্যেও এর ইংগিত আছে। ‘সোর্ড’ -কে সেভিয়ার অব ওয়ার্ল্ড র‌্যাশনাল ডোমেইন বলা যায়। সংক্ষেপে এর অর্থ ‘মানব-ধর্মের ত্রাতা’। মানব ধর্ম বলতে ওরা বুঝাচ্ছে ‘শান্তি’ (rational domain)। আর বিজ্ঞানী ড. আন্দালুসি ফোটনের ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিজম- এর নতুন উপাদানের নাম রেখেছেন ‘আল-সালাম’ মানে শান্তি। এর অর্থ তারা বুঝাচ্ছেন, আমরা মনে করছি, দুনিয়ার সব অস্ত্রকে তার নিজ নিজ সাইলোতে ধ্বংস করে দিয়ে তারা দুনিয়াতে যুদ্ধহীন শান্তি নিয়ে আসবেন। এটাই আমাদের আতংকের বিষয়। আমরা চাই আমাদের সাইলোগুলোতে আমাদের অন্ত্র অটুট রেখে দুনিয়ার সব অস্ত্র ধ্বংস করতে। এজন্যেই আমরা মরিয়া ওদের ‘সোর্ড’ এবং তার ফর্মুলা হাত করতে।’ থামল আইজ্যাক বেগিন। স্মার্থার ঠোঁট শুকনো। তার চোখে অসহায় দৃষ্টি। তার ঠোঁট নড়ল, কিন্তু কথা বেরুলো না। কথা যেন গলায় আটকে গেছে। স্মার্থা সামনের গ্লাসের ঢাকনা সরিয়ে এক গ্লাস পানি সবটাই খেয়ে নিল। গ্লাসটা টেবিলে রেখে সে বলল, ‘স্যার আমাদের বিজ্ঞানী গামাফোটনের ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিজম-এর আল-সালাম উপাদান খোঁজার চেষ্টা করছে না?’ চেয়ারে গা এলিয়ে দিল আইজ্যাক বেগিন। তার চোখে-মুখে দারুণ হতাশার ছাপ। বলল, ইউরোপ-আমেরিকার কার্যরত আমাদের সকল কণাবিজ্ঞানী অবিরাম চেষ্টা করেও এই ব্যাপারে এক ধাপ এগোতে পারেনি। এমনকি কোন সম্ভাবনাও তারা সৃষ্টি করতে পারেনি।’ স্মার্থারও চোখে-মুখে ভীতি-মিশ্রিত হতাশার সুর। বলল, ‘দক্ষিণ স্পেনের প্রায় পরিত্যক্ত শহর গ্রানাডার দরিদ্র মরিসকো পরিবারের সন্তান ড. আমির আবদুল্লাহ আন্দালুসি যা পারলো, আমাদের হাজারো বিজ্ঞানীরা তা পারল না?’ ‘তিনি দরিদ্র মরিসকো ঘরের সন্তান বটে, কিন্তু তার বাল্য-কৈশোরের গোটা সময় কেটেছে মালাগা, গ্রানাডা, কার্ডোভার ভাঙা লাইব্রেরীগুলোতে। সে যেন কোন হারানো জিনিস অবিরাম খুঁজে ফিরেছে। কিছু পেয়েছে কিনা জানি না, কিন্তু অনুসন্ধিতসু কিশোর মাদ্রিদের আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কণা-পদার্থ বিজ্ঞানে সর্বকালের সর্বোচ্চ নাম্বার নিয়ে পাস করেছে। আর বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে তার ‘ক্যারেক্টার’ অব ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিজমের যে গবেষণাপত্র তিনি তৈরি করেন, তা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে সর্বোচ্চ মান লাভ করে। সুতরাং তিনি সামান্য থেকে উঠে আসা হলেও একজন অসামান্য মানুষ। তাকে ইউরোপ-আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণাগারগুলো যে কোন মূল্যে কিনতে চেয়েছিল। কিন্তু তিনি নামমাত্র বেতনে সৌদি আরবের মদিনা বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। সেখান থেকেই তিনি এসেছেন ওআইসির আইআরটি প্রজেক্টে।’ থামল ড. ডেভিড ইয়াহুদ। কথা বলে উঠল আইজ্যাক বেগিন। বলল, ‘ড. আন্দালুসি যা পেরেছেন, তা আমাদের বিজ্ঞানীরা না পারাটা বিস্ময়ের নয়। মাধ্যাকর্ষণ শক্তি নিউটন আবিষ্কার করেন, আর কোন বিজ্ঞানী পারেননি। আইনস্টাইন আবিষ্কার করেন, আপেক্ষিক তত্ব। অন্য কোন বিজ্ঞানীর পক্ষে তা সম্ভব হয়নি। বিজ্ঞানের জগতে এটাই ঘটে।’ ‘স্যার, এখন তাহলে আমাদের করনীয়? আমার মনে হচ্ছে, আমাদের দুনিয়ার এখন প্রথম এবং একমাত্র কাজই হবে, যে কোন মূল্যে সোর্ডের ফর্মুলা হস্তগত করা এবং বিজ্ঞানীদের সমেত আইআরটিকে ধ্বংস করা।’ বলল স্মার্থা। ‘সেটাই তো আমরা চাচ্ছি। কিন্তু হচ্ছে কই। আমাদের চলার পথ তো ধীরে ধীরে সংকুচিতই হয়ে পড়ছে। স্মার্থা, তুমি যা বলেছ আমরা সেটাই চিন্তু করছি। যে কোন মূলেই আমরা সোর্ডের ফর্মুলা হাত করব এবং আইআরটিকে অবশ্যই আমরা চলতে দেব না।’ আইজ্যাক বেগিন বলল। ‘আমাদের অনেক ক্ষতি হলেও আমরা একটা বড় সাফল্য পেয়েছি। প্রফেসর বেগভিচের আত্মা শান্তি পাক। তার চেষ্টাতেই আমরা আইআরটির প্রধান বিজ্ঞানী ড. আন্দালুসির বাসার সন্ধান পেয়েছি। এখন আমরা কার্যকরী কিছু ভালো পদক্ষেপের দিকে এগোতে পারব।’ বলল ড. ডেভিড ইয়াহুদ। ‘সেই পদক্ষেপগুলো সম্পর্কে কি চিন্তা করেছেন? আমাদের কিন্তু দ্রুত এগোতে হবে। অনেক সময় আমাদের নষ্ট হয়েছে ইতিমধ্যেই।’ আইজ্যাক বেগিন বলল। ‘ড. আন্দালুসিকে ভয় দেখিয়ে আমরা কাজ আদায় করব। সেটা ব্যর্থ হলে আমরা তাকে কিডন্যাপ করে ফর্মুলা আদায়ের ব্যবস্থা করব। কিন্তু অনেক বিবেচনার পর এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে, তাকে ভয় দেখিয়ে কিংবা কিডন্যাপ, নির্যাতন করে কিংবা হত্যার ভয় দেখিয়েও তার কাছ থেকে কিছু আদায় করা যাবে না। তিনি তার জীবনের চেয়ে আইআরটি’র স্বার্থ, জাতির স্বার্থকে অনেক বড় বলে মনে করেন। সুতরাং আমরা ভাবছি যে, তিনি তার জীবনের চেয়ে যাকে বেশি ভালোবাসেন, যার ক্ষতি তিনি সহ্য করতে পারবেন না, এমন কিছুর উপর আমাদের হাত দিতে হবে। এই লক্ষ্যে আমরা তার পারিবারিক তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছি। শীঘ্রই আমরা এ বিষয়ে একটা কমপ্লিট চিত্র পেয়ে যাব। আমরা এখন তারই অপেক্ষা করছি। ‘ধন্যবাদ ড. ডেভিড ইয়াহুদ। আপনারা ঠিক পথে এগোচ্ছেন। ড. আন্দালুসির মত আদর্শনিষ্ঠ ও জাতিগত- প্রাণ লোকদের শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে বা ক্ষতি করে দূর্বল করা যায় না। আঘাত দিতে হয় এদের মনে। এরা নীতিনিষ্ঠ, আদর্শবাদী বলে তাদের মনটা স্পর্শকাতর হয়ে থাকে। তাই তাদের মনে উপযুক্ত আঘাত পড়লে তাদের আদর্শিক ও মানসিক প্রতিরোধ ধ্বসে পড়ে। সুতরাং ড. আন্দালুসির ব্যাপারে আপনারা সঠিক পথ বেছে নিয়েছেন।’ বলল আইজ্যাক বেগিন। ‘কিন্তু আহমদ মুসাকে পথ থেকে সরাতে না পারলে এই কাজ নিরাপদ হবে না বলে আমি মনে করি। এই ইস্তাম্বুলেই সে আমাদের অনেকগুলো উদ্যোগ র্ব্যথ করে দিয়েছে।’ ইসরাইলী রাষ্ট্রদূত বলল। ‘আহমদ মুসা ও সোর্ড- এর ফর্মূলা দু’টিই আমাদের নাম্বার ওয়ান প্রায়োরিটি। এ ব্যাপারে উপর থেকেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। আহমদ মুসার একদিন বেঁচে থাকা মানে আমাদের হায়াত একদিন কমে যাওয়া। আমাদের দুর্ভাগ্য বসফরাস ব্রীজ থেকে পড়েও সে বেঁচে গেল। বারবার গুলীর মুখ থেকে বেঁচে গেছে। তার আমরা কোন ক্ষতি করতে পারিনে, তার হাতে আমাদের ক্ষতি আকাশ স্পর্শ করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছিল আমাদের জন্যে স্বর্গভূমি, সেখান থেকে আমরা উৎখাত হয়েছি। আমাদের কিছু বিজ্ঞানী ও আমলা নাম ভাঁড়িয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে টিকে আছে বলেই কিছু সুবিধা আমরা পাচ্ছি। যেখানেই আমাদের প্রজেষ্ট সেখানেই আহমদ মুসা। এই আহমদ মুসা তুরস্কেও এসেছে। একথা ঠিক, সে থাকবে আর আমরা সফল হবো, এটা অসম্ভব। বিজ্ঞানী ও আহমদ মুসাকে এক সাথেই ধরতে হবে।’ বলল আইজ্যাক বেগিন। ‘আহমদ মুসা এক জায়গায় থাকে না, সর্বশেষ তথ্য হলো সে এখন হেলিকপ্টার ব্যবহার করে।’ ড. ডেভিড ইয়াহুদ বলল। ভ্রু কুঞ্চিত হলো আইজ্যাক বেগিনের। বলল, ‘আহমদ মুসাকে তুর্কি সরকার এতটা গুরুত্ব দিচ্ছে!’ ‘ওআইসি নিশ্চয় এর পেছনে রয়েছে। কারন আইআরটি তো ওআইসির একটি প্রতিষ্ঠান। ওআইসি গুরুত্ব দিলে তুর্কি সরকার অবশ্যই গুরুত্ব দিতে বাধ্য। তাছাড়া আমি শুনেছি, খালেদ খাকান ওরফে আহমদ মুসা খোদ তুর্কি প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর মেহমান হিসেবে এখানে এসেছে।’ ইসরাইলী রাষ্ট্রদূত বলল হতাশ কন্ঠে। ‘স্বাভাবিক। স্বপ্ন তারা দেখতেই পারে। অটোম্যানদেরই উত্তরসূরী তো তারা! কিন্তু স্বপ্নটা তারা বেশি দেখে ফেলেছে। এই স্বপ্ন শীঘ্রই মুখ থুবড়ে পড়বে। অটোম্যানদের সেই দিন আর ফিরে...।’ কথায় ছেদ পড়ল আইজ্যাক বেগিনের। পকেটের মোবাইল বেজে উঠেছে তার। কথা বন্ধ করে মোবাইল তুলল আইজ্যাক বেগিন। মোবাইলের স্ক্রীনের দিকে একনজর তাকিয়েই মুখের কাছে নিয়ে বলল, ‘বল অ্যালিয়াস, কোন-খবর?’ অ্যালিয়াস সিজলি এলাকায় বিজ্ঞানী ড. আন্দালুসির নতুন বাড়ির আশে-পাশে মোতায়েন ‘থ্রি জিরো’র লোকদের একজন। ‘স্যার, বিজ্ঞানী ড. আন্দালুসি চলে যাচ্ছেন। তিনি হেলিকপ্টারে উঠছেন। তার বাড়ির লনেই হেলিকপ্টারটা রয়েছে।’ বলল অ্যালিয়াস। ‘যেতে পারেন। হয়তো ইনস্টিটিউট থেকে ডাক পড়েছে। উইকএন্ডটা গোটা দিন বাসায় থাকতে পারলেন না। তুমি হেলিকপ্টারের পাশে মানে বিজ্ঞানীকে বিদায় দিতে আসা কাউকে দেখছ?’ আইজ্যাক বেগিন বলল। ‘দেখছি স্যার। একজন সুবেশধারী মহিলাকে দেখছি। তার পেছনে পরিচারিকা ধরনের আরও দু’জন মহিলা এবং আরও দুতিন জন লোক। পেছনের এরা সবাই কাজের মানুষ বলে মনে হচ্ছে।’ বলল অ্যালিয়াস। ‘সুবেশধারী তাঁর স্ত্রী হতে পারেন। বয়স কত মনে হচ্ছে?’ আইজ্যাক বেগিন বলল। ‘স্যার তিরিশের মত বয়স হবে।’ বলল অ্যালিয়াস। ‘বয়সের পার্থক্য ঠিক আছে। মুসলমানদের আইডিয়েল পরিবারগুলোতে ৫ থেকে ১০ বছরের পার্থক্য স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে থাকে। নিশ্চিত উনি ম্যাডাম আন্দালুসি।’ থামল আইজ্যাক বেগিন। ‘কোন নির্দেশ স্যার?’ ‘হ্যাঁ, বিজ্ঞানী ড. আন্দালুসি চলে যাচ্ছেন। তোমাদের কাজ বেড়ে যাচ্ছে। তোমরা বিজ্ঞানীর পরিবার সম্পর্কে আরও খোঁজ খবর নাও। বাড়িতে কে কখন আসা-যাওয়া করে তার তালিকা রাখ। অন্যান্য খোঁজ আমরা নিচ্ছি। আবার কোন দিন বিজ্ঞানী আসছেন সে খোঁজ নাও। বিজ্ঞানীর সাথে আমরা একবার কথা বলব, তারপর যা করার তা আমরা করব। বাড়ির চাকর-বাকর, লোকেরা যারা বাইরে বের হয়, তাদের সাথে সম্পর্ক কর এবং বাড়ির নিয়ম-কানুন, রুটিন সম্পর্কে জান। কিন্তু সাবধান, কোনোভাবেই ওদের মনে যেন তোমাদের সম্পর্কে সন্দেহের উদ্রেক না হয়।’ ‘আপনাদের এই নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন হবে স্যার।’ ‘ধন্যবাদ অ্যালিয়াস।’ মোবাইল রেখে দিল আইজ্যাক বেগিন। তাকাল ড. ডেভিড ইয়াহুদের দিকে। বলল, ‘ড. ইয়াহুদ, বিজ্ঞানীর বাড়িটার একটা নক্সা আপনার কাছে দেখেছি, সেটা রুম-অ্যারেঞ্জমেন্টর ডিজাইন। আমাদের প্রয়োজন ডিটেইল লে-আউট।’ ‘আমরা সেটার সন্ধান করেছি। বাড়িটার নির্মাতা ইস্তাম্বুলের পূর্ব বিভাগ। পূর্ব বিভাগে বাড়ির লে-আউট থাকার কথা। কিন্তু সেখানে পাওয়া যায়নি।’ বলল ড. ডেভিড ইয়াহুদ। ‘ড. ইয়াহুদ, আপনি সুইচ দূতাবাসে যোগাযোগ করুন। ওখানে জোসেফ জাকারিয়া আছে ডাইরেক্টর এ্যাডমিনিস্ট্রেশন হিসেবে। তার কাছে সাহায্য পাবেন। ওরা ভাড়া নেবার সময় বাড়ির লে-আউট নিশ্চয় নিয়েছিল, কিংবা তারা একটা লে-আউট তৈরি করেছিল। যা হোক, আমরা যা চাই, ওদের কাছ থেকে তা পাওয়া যাবে।’ ড.ডেভিড ইয়াহুদের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। বলল, ‘অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটা দিক আপনি সামনে নিয়ে এসেছেন। বিষয়টা আমার মনেই হয়নি। ধন্যবাদ মি. বেগিন। আমরা অবশ্যই...।’ ডেভিড ইয়াহুদের কথা শেষ না হতেই উঠে দাঁড়াল আইজ্যাক বেগিন। বলল, ‘ধন্যবাদ ডেভিড ইয়াহুদ। আমি উঠছি। জরুরি কাজ আছে।’ ড. ডেভিড ইয়াহুদও উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘চলুন আমিও বেরুবো।’ বেরিয়ে এল তারা সবাই ঘর থেকে। ড. ডেভিড ইয়াহুদ তার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘জেমস জোসেফ, তোমার হাতে মাত্র এক ঘন্টা সময় আছে। তোমার এ্যাপয়েনমেন্টা রাত ঠিক আটটায়। রেড়ি হয়ে নাও।’ জেমস জোসেফও ঘড়ির দিকে তাকাল। বলল, ‘ঠিক আছে স্যার। আমি যাচ্ছি’ বলেই উঠে দাঁড়িয়ে জেমস জোসেফ ঘর থেকে দ্রুত বেরিয়ে গেল। জেমস জোসেফ বিজ্ঞানী ড. আন্দালুসির বাড়িতে অভিযানের নতুন সদস্য। সে ইস্তাম্বুলের ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির মেকানিক্যাল স্পেস সাইন্সের ছাত্র। সেই সাথে সে জায়নবাদী আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থার সক্রিয় কর্মী। জেমস জোসেফ বেরিয়ে যেতেই বাইরে গাড়ি দাঁড়াবার শব্দ হলো। কয়েক মুহূর্ত পরে ঘরে ঢুকল আইজ্যাক বেগিন। ঘরে ঢুকেই বলল, জেমস জোসেফকে বেরিয়ে যেতে দেখলাম। সব রেডি তো। ওরা তো বেরুচ্ছে ঠিক সময়ে?’ ‘হ্যাঁ, ঠিক সময়ে বেরুচ্ছে। স্মার্থা এবার নেতৃত্বে আছে। আপনি সব ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।’ বলল ড. ডেভিড ইয়াহুদ। ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্ট ডেলিগেশনের সাথে স্মার্থা বেমানান। ‘স্মার্থা শিক্ষকতা করলেও সে ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজিতে কণাবিজ্ঞানের একটা বিষয়ের উপর পিএইচডি করছে। সুতরাং বেমানান হওয়ার কথা নয়।’ বলল ড. ডেভিড ইয়াহুদ। ‘ধন্যবাদ ডক্টর। আমি খুব উদ্বিগ্ন। ক’দিন আমি ছিলাম না। এর মধ্যে অনেক কিছু ঘটে গেছে। বিস্তারিত একটু বলুন ডক্টর।’ আইজ্যাক বেগিন বলল। ‘সত্যিই অনেক কিছু ঘটে গেছে।’ বলে একটু থামল ড. ডেভিড ইয়াহুদ। সোজা হয়ে বসল চেয়ারে। বলল, ‘বিজ্ঞানী ড. আন্দালুসির বাড়ি আমরা যতটা প্রটেকটেড মনে করেছিলাম, তার চেয়ে অনেক সুরক্ষিত বাড়িটা। আমরা নিশ্চিত হয়েছি, বিজ্ঞানীর বাড়ির কাজের লোকগুলো অবশ্যই পুলিশ বা গোয়েন্দা বিভাগের লোক। মোতায়েনকৃত আমাদের লোকেরা তাদের কাছ থেকে কথা আদায় করতে গিয়ে বিপদে পড়ার মুখোমুখি হয়েছে। প্রয়োজনীয় কোন কথা আদায় করতে পারেনি। যে কথাগুলো তারা আদায় করতে পেরেছে তা উল্টা-পাল্টা বা ফাঁদ জাতীয় বলেই আমাদের মনে হয়েছে।’ ‘পরীক্ষামূলকভাবে হকার-ফেরিওয়ালা পাঠাবার যে কথা হয়েছিল, সেটার কিছু করা গেছে?’ বলল আইজ্যাক বেগিন। ‘ও পরীক্ষাও হয়ে গেছে। ফেরিওয়ালা, নিউজপেপার হকার ও হোম সার্ভিসের লোকদের পাঠিয়েছিলাম। ওরা গেট পর্যন্তও পৌঁছতে পারেনি। তার আগেই তাদের ধরে ফেলা হয়েছে। অবশ্য পরে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। ওরা আমাদের লোক, কিন্তু সেই সাথে ওরা প্রকৌশলীও। সুতরাং কোন অসুবিধা হয়নি। তবে পরিষ্কার হয়েছে, বিনা বাধায় বিজ্ঞানীর বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছতে পারা যাবে না। জোর করে যাওয়ার চেষ্টা করলে লড়াই করতে হবে নিঃসন্দেহে।’ ড. ডেভিড ইয়াহুদ বলল। ‘জেমস জোসেফদের দ্বারা যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছিলেন, সেটার ব্যাপারে আপনি কতটা নিশ্চিত?’ বলল আইজ্যাক বেগিন। ‘হ্যাঁ। অনেক চিন্তা করে এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির ছেলেরা যদি বিজ্ঞানী ড. আন্দালুসির সাথে দেখা করার একটা অফিসিয়াল উদ্যোগ নেয় তাহলে তারা সে অনুমতি পেতে পারে। এমন ভাবনা থেকেই জেমস জোসেফকে দিয়ে ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির এক গ্রুপ ব্রিলিয়ান্ট ছাত্রকে উৎসাহিত করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্রিলিয়ান্ট ছাত্রদের রিসার্চ ফোরাম আছে। তারা বিজ্ঞান-টেকনোলজির অত্যাধুনিক টপিক্সের উপর মাঝে মাঝেই সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, গোলটেবিল ও গ্রুপ জিসকাশনের আয়োজন করে। বড় বড় বিজ্ঞানী ও শিক্ষকদের এসব অনুষ্ঠানে আনা এবং তাদের সাথে গ্রুপ করে দেখা করা তাদের নিয়মিত প্রোগ্রামের অংশ। তাদের এসব প্রোগ্রাম ও পরিচয়ের নানারকম পেপারস-ব্রসিয়ারস আছে। জেমস জোসেফ এই ফোরামের একজন সদস্য, অবশ্য মূল বডিতে সে নেই। তবে তার প্রস্তাবকে তারা গ্রহণ করে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে আইআরটির টেলিফোন নাম্বার যোগাড় করে ফোরামের প্রেসিডেন্ট বিজ্ঞানী ড. আন্দালুসিকে টেলিফোন করে। ফোরামের একটা গ্রুপ তার সাথে দেখা করতে চাইলে বিজ্ঞানী তার অপরাগতার কথা প্রকাশ করেন। এই অবস্থায় ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির কণাবিজ্ঞান বিভাগের ডীন ড. ফাতিমা বাদরুমা ফোরামকে পরামর্শ দেন তাদের ‘হিস্ট্রি এন্ড মেথডলজি অব স্ট্রাটেজিক রির্সাচ’ বিষয়ের ভিজিটিং প্রফেসর ড. সারার সাহায্য নিতে। তিনি জানান, কিছুদিন আগে ইস্তাম্বুল বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সায়েন্স এন্ড ইমান বিল গায়ে’-এর উপর সাড়া জাগানো যে আন্তর্জাতিক সেমিনার হয়, তাতে বিজ্ঞানী ড. আন্দালুসি ও ড. সারা ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে। আমি তখন দেখেছি মার্কিন স্ট্রাটেজিক রিসার্চেও ড. সারাকে ড. আন্দালুসি খুব রেসপেক্ট করেন। তিনি যদি ফোরামের পক্ষে ড. আন্দালুসিকে অনুরোধ করেন, তাহলে ড. আন্দালুসি নিশ্চত রাজি হবেন। ড. ফাতিমা বাদরুমার পরামর্শ অনুসারে ফোরাম প্রতিনিধিরা ড. সারার সাথে দেখা করে তাঁকে অনুরোধ করেন। প্রতিনিধি দলে জেমস জোসেফও ছিল। সেই ফোরামের পক্ষ থেকে একটা ফোল্ডার তৈরি করে ড. সারাকে দেয়া হয়। ড. সারা অনেক আলোচনা ও জিজ্ঞাসাবাদের পর ফোরামের পক্ষে ড. আন্দালুসিকে অনুরোধ করতে রাজি হন। তার অনুরোধেই ড. আন্দালুসি রাজি হন ফোরামকে সাক্ষাৎকার দিতে। আমরা চেয়েছিলাম ড. আন্দালুসি যেন তাঁর বাড়িতে সাক্ষাৎ দিতে রাজি হন। এ জন্যেই সিজলি এলাকায় তার বাড়ির কাছের ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির ফোরামকে আমরা ব্যবহার করেছি। আমাদের উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। সাক্ষাৎ দিতে রাজি হওয়ার পর ড. আন্দালুসি বলেন, অফিসে আমি কাউকে সাক্ষাৎ দেই না। তার উপর আগামী শুক্রবার সিজলিতে আমার বাসাতেই থাকব। বিশ্ববিদ্যালয়ও ঐ এলাকাতেই। সুতরাং সাক্ষাৎটা আমার বাসাতেই হবে।’ থামল ড. ডেভিড ইয়াহুদ। খুশিতে উঠে দাঁড়িয়েছে আইজ্যাক বেগিন। সে হাত বাড়িয়ে ড. ইয়াহুদের সাথে হ্যান্ডশেক করে বলল, ইশ্বর আমাদের সাহায্য করছেন। না হলে এতবড় সুযোগ আমরা এভাবে পেয়ে যাই! এখন বলুন, অপারেশন টিমটা আপনার কেমন হয়েছে। তারা পরিকল্পনা অনুসারে ড. আন্দালুসিকে তার স্ত্রী সমেত ওখান থেকে বের করতে পারবে তো?’ ‘অবশ্যই বিজ্ঞানীর বাসার মূল অপারেশনে নেতৃত্ব দেবে স্মার্থা। তার সাতে আমাদের আটজন চৌকশ কমান্ডো। জেমস জোসেফ এদের সাথে থাকবে। কারণ যেখানে ওদের আটকে রাখা হবে, সেটা জেমস জোসেফেরই জানা। অন্যদিকে বিজ্ঞানীর বাসায় যাওয়ার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র প্রতিনিধিদলকে কিডন্যাপ করবে অন্য একটা কমান্ডো দল। এরও নিরাপদ পরিকল্পনা করা হয়েছে। আটকে রাখার জায়াগাও ঠিক করা আছে। আমাদের লোকদের প্রত্যেকের ডুপ্লিকেট আইডি কার্ড তৈরি করা হয়েছে। এই আই ডি কার্ডগুলো নিয়ে ছাত্র সেজে আমাদের স্মার্থা বাহিনী বিজ্ঞানী ড. আন্দালুসির বাড়িতে প্রবেশ করবে। ছাত্র প্রতিনিধি দলের যে নাম পরিচয় বিজ্ঞানীকে আগেই সরবরাহ করা হয়েছে, তাতে কারও ছবি নেই, ছবি তারা চায়ওনি। সুতরাং কোন দিক দিয়ে কোন অসুবিধা হবে না।’ খুশিতে আইজ্যাক বেগিনের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল, ‘আপনি বললেন, বিজ্ঞানীর বাড়িতে চাকর-বাকর যারা আছে, তারা হয় পুলিশের না হয় গোয়েন্দা বিভাগের লোক। বাড়িতে তাদের সংখ্যা কত হতে পারি এ ব্যাপারে কিছু জেনেছেন?’ ‘বিজ্ঞানীর বাড়ির উপর আমাদের যারা চোখে রেখেছে, তাদের মতে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কারণে যারা বাইরে এসেছে, তাদের সংখ্যা পাঁচ-ছয় জনের বেশি নয়।’ ‘তার মানে বিজ্ঞানীর বাড়িতে ঐ ধরনের লোক সাত আটজনের বেশি হবে না। আর তোমার স্মার্থা বাহিনীতে থাকছে ১০ জন। তুমি কি মনে করছ? সাফল্যের ব্যাপারে কিন্তু কোন ঝুঁকি থাকা চলবে না।’ বলল আইজ্যাক বেগিন। ‘কোন চিন্তু নেই। আমার লোকরা প্রস্তুত অবস্থায় প্রথম আঘাত করবে। ওরা থাকবে অপ্রস্তুত। স্মার্থার পরিকল্পনা হলো, প্রথম আঘাতেই ওদের অধিকাংশ লোককে টার্গেটে নিয়ে আসা। এজন্যে কথা হয়েছে, সাক্ষাতের এক পর্যায়ে আমাদের লোকরা চোখের পলকে গোটা বাড়িতে ছড়িয়ে পড়বে এবং একযোগে আক্রমণ করবে। ওদেরকে প্রস্তুতির কোন সুযোগ দেয়া যাবে না। শুধু বিজ্ঞানী ও তার স্ত্রীকে কোন আঘাত করতে নিষেধ করা হয়েছে। ওদের ধরে নিয়ে যেতে হবে।’ ড. ডেভিড ইয়াহুদ বলল। ‘কেন, বিজ্ঞানীর বাচ্চাদের বাদ দিচ্ছেন কেন? ওদের ধরে নিয়ে যেতে হবে। স্ত্রীর সাথে ওরাও হবে বিজ্ঞানীকে কথা বলাবার অব্যর্থ টোপ।’ আইজ্যাক বেগিন বলল। ‘না, বিজ্ঞানীর ছেলে-মেয়েরা এখন এখানে নেই। এই তথ্য আমরা নিশ্চিতই জানতে পেরেছি।’ বলেই দ্রুত ঘড়ির দিকে তাকাল ড. ডেভিড ইয়াহুদ। বলল, ‘এখন ১০টা বিশ মিনিট। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেলিগেটদের কিডন্যাপের অপারেশন এখন নিশ্চয় শেষ হয়েছে। স্মার্থা বাহিনী যাচ্ছে এখন বিজ্ঞানীর বাড়িতে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্ট ডেলিগেশনের ছদ্মবেশে। কিন্তু এতক্ষনেও টেলিফোন আসছে না কেন? প্রথম অপারেশনের পরেই তার খবর জানানোর কথা ছিল।’ থামল ড. ডেভিড ইয়াহুদ। তাকাল আবার ঘড়ির দিকে। সংগে সংগেই বেজে উঠল তার মোবাইল। দ্রুত মোবাইল মুখের কাছে তুলে ধরল ড. ডেভিড ইয়াহুদ। ওপারের কন্ঠ শুনেই বলল, ‘বল জেমস জোসেফ, সুখবর?’ ‘জি স্যার। অপারেশন সাকসেসফুল। দু’টি ক্লোরোফরম টাইম বোমার স্বয়ংক্রিয় বিস্ফোরণে দুই গাড়ির সবাই সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে। পরে আমাদের ড্রাইভার গাড়ি দু’টিকে ড্রাইভ করে সিজলি পাহাড়ে নিয়ে যায়। একটা ঝোঁপে তাদের সংজ্ঞাহীন দেহ লুকিয়ে রেখে গাড়ি নিয়ে চলে আসে। ম্যাডাম স্মার্থার নেতৃত্বে আমরা নতুন ছাত্র ডেলিগেটরা এখন যাচ্ছি বিজ্ঞানীর বাড়ির দিকে।’ ‘ধন্যবাদ। অসংখ্য ধন্যবাদ তোমাদের। টেলিফোনটা স্মার্থাকে দাও।’ বলল ডেভিড ইয়াহুদ। কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা। ওপার থেকে স্মার্থার গলা পেতেই ড. ডেভিড ইয়াহুদ বলল, ‘এখন আর কোন কথা নয়। গড ব্লেস ইউ স্মার্থা। এটাই আমাদের সর্বোচ্চ সুযোগ। লক্ষ্য অর্জনের জন্য আশা করি সব কিছুই করবে। গড ব্লেস ইউ। গুড বাই।’ মোবাইল রেখে দিল ড. ডেভিড ইয়াহুদ। বলল আইজ্যাক বেগিনের দিকে তাকিয়ে, ‘ওরা বিজ্ঞানীর বাড়িতে যাত্রা করেছে মি. আইজ্যাক বেগিন। ঈশ্বরকে ডাকুন।’ ‘গড হেলপ আস।’ বলল আইজ্যাক বেগিন। ‘সামনে আধ ঘন্টা সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আসুন আমরা সুখবরের জন্য অপেক্ষা করি।’ ড. ডেভিড ইয়াহুদ বলল। ‘ঠিক আছে। কিন্তু সুড়ঙ্গ পথ সম্পর্কে ওদের সুস্পষ্ট ধারণা আছে তো। ঠিকভাবে বুঝতে না পারলে বিজ্ঞানী ও তার স্ত্রীকে নিয়ে পালানোর সব আয়োজন পন্ড হয়ে যাবে।’ বলল আইজ্যাক বেগিন। ‘সে রকম কোন অসুবিধা হবে না। অপারেশন টীমে যারা আছে, তারা প্রত্যেককেই বাড়ির নকশা, ঘরগুলোর নকশা, সুড়ঙ্গের মুখ এবং তাদের অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা দেয়া হয়েছে।’ বলল ড. ডেভিড ইয়াহুদ। আইজ্যাক বেগিনের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল, ‘ধন্যবাদ।’ বলে সোফায় গা এলিয়ে দিল। পকেট থেকে মোবাইল বের করে বলল, ‘মাফ করবেন ড. ইয়াহুদ, একটা জরুরি টেলিফোন সেরে নেই।’ ‘অবশ্যই।’ বলল ড. ইয়াহুদ। আইআরটি-তে রোববারের সকাল। ফরমাল অফিস নেই। তবু নাস্তার পর ড. শেখ আবদুল্লাহ বিন বাজ এবং আইটি ইঞ্জিনিয়ার ইসমত কামাল বেশ অনেকক্ষণ আগে অফিসে এসেছে। অফিসের লাউঞ্জে বসে আহমদ মুসা তাদের সাথে আলাপ করছিল। বিজ্ঞানী ড. আন্দালুসির দক্ষিণহস্ত তরুণ আলোক বিজ্ঞানী ড. ইবনুল আব্বাস আবদুল্লাহ সেসুসি লাউঞ্জে ঢুকল। সবার উদ্দেশ্যে সালাম দিয়ে এক জনের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এখন দশটা বিশ মি. খালেদ খাকান। মাত্র বিশ মিনিট লেট। ছুটির দিনে এই লেট নিশ্চয় কাউন্টেবল নয়।’ ড. সেসুসির মুখে হাসি। সকাল ৯টায় আহমদ মুসা অফিসে এসেছে। সকাল সাড়ে ৮ টায় ড. সেসুসি টেলিফোন করেছিল আহমদ মুসাকে। বলেছিল, আপনি যখন এসেছেন, তখন আমিও ১০টার দিকে লাউঞ্জে আসছি। ‘ওয়েলকাম ড. সেসুসি। ছুটির দিন না হলেও বিজ্ঞানীদের লেট দোষনীয় নয়। বিজ্ঞানীরা অংকে একেবারে অ্যাকুরেট বলেই ব্যক্তি জীবনের কাজ-কর্মে অনেক খানি বেহিসেবী। সুতরাং বিশ মিনিট লেট আমরা সানন্দে গ্রহন করলাম।’ হাসতে হাসতে বলল আহমদ মুসা। ‘ধন্যবাদ। তবে মি. খালেদ খাকান বিজ্ঞানীদের এই বেহিসেবী হবার কথা তাদের পরিবারের কাছে না বলা উচিত। তাতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।’ বলল ড. সেসুসি মুখ টিপে হেসে। ‘পরিস্থিতি আরও খারাপ না করার কথা বলছেন। তার মানে পরিস্থিতি এখন খারাপ। তাই কি ড. সেসুসি?’ বলল ড. আবদুল্লাহ বাজ। তার ঠোঁটে হাসি। হাসল ড. সেসুসি। বলল, ‘সবে তো আমাদের সাথে আসলেন। আমাকে এখনো বুঝে সারেননি হয়তো। কিন্তু গত তিন মাসে আমাদের চার বিজ্ঞানীর বাড়িতে কয়েকবার গেছি। সেখানে ভাবীদের কাছে মজার মজার কথা শুনেছি। আল্লাহ নাকি বিজ্ঞানীদের মাথায় বস্তুবিজ্ঞানের জ্ঞান ও তার প্রতি আকর্ষণ বাড়িয়ে দিয়েছেন এবং সেই সাথে মগজ থেকে সংসার বুদ্ধির জ্ঞান কেটে নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন। আন্দালুসি ভাবীর কাছে এ অভিযোগ শুনেছি। তিনি আমাকে বলেছেন, ‘বিয়ের পর গত ২৫ বছরে তোমার স্যার একদিনের জন্যেও কোন অবকাশ সফরে নিয়ে যাবার সময় পাননি। আমার স্ত্রীর সামনে এ কথা বলায় আমি বিপদেই পড়েছিলাম।’ হেসে উঠল আহমদ মুসা ও ড. বাজ দু’জনেই। ড. বাজ বলল, ‘বিপদে পড়েছিলেন কেন, আপনার তো শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ হয়েছে।’ ‘ঠিক বলেছেন। পরের উইক এন্ডেই আমি উইক এন্ডের সাথে আরও দু’দিন যোগ করে স্ত্রীকে নিয়ে ‘লেক ভ্যান’-এ গিয়েছিলাম তিনদিনের অবকাশ যাপনে। নূহ আ.- এর কিস্তির মাউন্ট আরারা দেখা আমার স্ত্রীর একটা বড় শখ ছিল।’ বলল ড. সেসুসি। তার মুখে হাসি। ‘তাহলে আল্লাহ নিশ্চয় বিশেষ আনুকুল্য দেখিয়ে আপনার মগজের সংসার-বুদ্ধির সবটুকু অংশ কেটে রাখেননি।’ বলল আহমদ মুসা মিষ্টি হেসে। ‘আল হামদুলিল্লাহ। দোয়া করুন, দয়া করে আর যেন না কাটেন। ঘরের বিপদের মত বড় বিপদ আর নেই। গত উইক এন্ডেও ড. আন্দালুসি বাসায় যাননি। এ উইক এন্ডেও যেতে পারলেন না।’ ড. সেসুসি বলল। তার মুখেও মিষ্টি হাসি। আহমদ মুসা হঠাৎ গম্ভীর হয়ে উঠেছে। বলল দ্রুত কণ্ঠে, ‘তা ঠিক। কিন্তু ড. আন্দালুসি মিসেস আন্দালুসির অনুমতি নিয়েছেন। মিসেস আন্দালুসি শুধু অনমুতিই দেননি, বলেছেন, ‘দেশ, ধর্ম, জাতি, সর্বোপরি মানুষের প্রয়োজনে ড. আন্দালুসি যা করেন তার সাথে তিনি আছেন।’ গম্ভীর হয়ে উঠল ড. সেসুসির মুখও। বলল, ‘ম্যাডাম রসিকতা করে অনেক সময় অনেক কথা বলেন। কিন্তু তিনি একজন মডেল বিজ্ঞানীর মডেল স্ত্রী। তিনি একদিন হাসতে হাসতে আমাকে বলেছেন, ‘বেটা! বিজ্ঞানীদের স্ত্রীরা কিন্তু স্বভাবগতভাবে বিজ্ঞানের সতীন। এ ব্যাপারে বিজ্ঞানীদের ও তাদের স্ত্রীদের কিন্তু সচেতন থাকা দরকার। স্ত্রীরা অবশ্যই ত্যাগ স্বীকার করবে, কিন্তু স্বামীদের তার স্বীকৃতি দেয়া উচিত, ঠিক যেমন তোমার স্যার দিয়ে থাকেন।’ ড. সেসুসি কথা শেষ করে একটু থেমে আবার বলে উঠল, ‘ম্যাডামের কথা আমার চিরদিন মনে থাকবে।’ ড. সেসুসি কথা শেষ করতেই আহমদ মুসার মোবাইল বেজে উঠল। আহমদ মুসা মোবাইল বের করে স্ক্রীনের দিকে চেয়ে জোসেফাইনের নাম দেখেই বলল, ‘মাফ করবেন, আমি কলটা রিসিভ করছি।’ বলে আহমদ মুসা সোফা থেকে উঠে ঘরের একটা প্রান্তে সরে গেল। ‘হ্যালো, জোসেফাইন। আসসালামু আলাইকুম। ভালো আছ?’ আহমদ মুসা বলল। ‘ওয়া আলাইকুম সালাম। আমরা ভাল আছি। এইমাত্র আমার সেই বান্ধবী জেফি জিনা একটা খবর দিল। মনে হয় খবরটা খুব খারাপ।’ বলল জোসেফাইন। ‘খবরটা খুব খারাপ?’ দ্রুত কণ্ঠ আহমদ মুসার। ‘আজ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির একটা ছাত্র প্রতিনিধিদলের সাথে বিজ্ঞানী ড. আন্দালুসির সাক্ষাতকার ছিল বিজ্ঞানীর সিজলির বাড়িতে। এই উপলক্ষে জেফি জিনাকেও চায়ের আমন্ত্রণের কথা বলেছিলেন বিজ্ঞানী। জেফি জিনা..........।’ জোসেফাইনের কথায় বাধা দিয়ে আহমদ মুসা মাঝখানেই বলে উঠল, ‘সেখানে কিছু ঘটেছে?’ উদ্বিগ্ন কণ্ঠ আহমদ মুসার। ‘সেখানে কিছু ঘটার কথা নয়, একটা সন্দেহজনক ঘটনার খবর দিয়েছে জেফি জিনা।’ মুহূর্তের জন্যে থামল জোসেফাইন, তারপর বলে উঠল, ‘জেফি জিনা বিজ্ঞানীর বাড়ি যাচ্ছিলেন তার গাড়িতে করে। তিনি ছাত্র প্রতিনিধি দলের দু’টি মাইক্রো দেখেছিলেন তার সামনে। তিনি দেখেন, মাইক্রো দু’টি ডানদিকে শেষ একজিট রোড পার হয়ে বিজ্ঞানীর বাড়ির দিকে কয়েক গজ এগিয়ে হঠাৎ থেমে যায়। থামাটা এত আকস্মিক ছিল যে, পেছনের মাইক্রোটা সামনের মাইক্রোকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। পরক্ষণেই রাস্তার পাশ থেকে দু’জন লোক হঠাৎ বেরিয়ে এসে দুই মাইক্রোর ড্রাইভিং সিটে উঠে যায়। তার পরেই মাইক্রো দু’টি দ্রুত ঘুরে সেই ডানের একজিট রোড ধরে ডান দিকে চলে যায়। জেফি জিনা ততক্ষণে ডানর একজিট রোডটার কাছে এসে পড়েছিল। যখন মাইক্রো দু’টি ঘুরে দাঁড়িয়ে ডানের রোড ধরে চলছিল, তখন জেফি জিনা সেই দু’জন ড্রাইভারের পাশে বসা একজনকে দেখেন যাকে ছাত্র বলে তিনি চিনতে পারেন। সে ছাড়া মাত্র প্রতিনিধিদলের কাউকে গাড়ির সিটে বসা দেখতে পাননি। বিস্মিত হন জেফি জিনা। তিনি রাস্তা থেকে একটু সরে গাড়িটা দাঁড় করান। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে টেলিফোন করে ছাত্র প্রতিনিধিদলের যে কারও টেলিফোন যোগাড়ের চেষ্টা করেন। টেলিফোন নাম্বার পেতে দেরি হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের কণাবিজ্ঞান বিভাগের ডীনের অফিস থেকে প্রতিনিধিদলের নেতা ছাত্রটির টেলিফোন নাম্বার পেয়ে যান। কিন্তু তিনি টেলিফোন করার চেষ্টা করাকালেই মাইক্রো দু’টিকে দ্রুত ফিরে আসতে দেখেন। তিনি মোবাইল রেখে ড্যাশ বোর্ড থেকে তার দুরবিনটা নিয়ে তাকান মাইক্রোর দিকে। পরে দুই মাইক্রোতে ওঠা দু’জন লোককেই ড্রাইভ করতে দেখেন। কিন্তু সিটগুলোতে বসা যাদের দেখলেন, তাদেরকে তার ছাত্র বলে মনে হয়নি। জেফি জিনার বিস্ময় সন্দেহে পরিণত হয়। তিনি দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাওয়া প্রতিনিধি দলের নেতা ঐ ছাত্রের নাম্বারে টেলিফোন করেন। কিন্তু বারবার টেলিফোন করেও কোন উত্তর পাননি তিনি। বারবারই নো-রিপ্লাই হয়। ততক্ষণে মাইক্রো দু’টি চলে গেছে। বিজ্ঞানীর বাড়ি সেখান থেকে খুব বেশি দূরে নয়। কিন্তু প্রবল দ্বিধায় পড়েন তিনি। তার নিশ্চিত মনে হয়, ঐ দুই মাইক্রোতে যারা গেছে তারা ছাত্র-প্রতিনিধি দল নয়। প্রবল ........।’ ‘ইন্নালিল্লাহ...। স্যরি জোসেফাইন, তুমি একটু হোল্ড কর। তোমার সাথে আরও কথা বলতে হবে। আমি একটা টেলিফোন করে নেই।’ বলেই কল হোল্ড করে আহমদ মুসা দ্রুত ওয়ান টাস ডায়ালে জেনারেল মোস্তফা কামালকে টেলিফোন করল। ওপার থেকে তার কণ্ঠ পেতেই সালাম দিয়ে দ্রুত কণ্ঠে বলল, ‘জেনারেল, এখনি আপনি সিজলি এলাকার পুলিশ ষ্টেশনগুলোকে দ্রুত বিজ্ঞানী ড. আন্দালুসির বাড়িতে পৌছার জন্যে মুভ করতে বলুন। আর আপনি বিজ্ঞানী ড. আন্দালুসিকে টেলিফোন করুন। জরুরি।’ ‘বুঝতে পারছি কিছু ঘটেছে। কি ঘটেছে? বাড়িতে তো আমাদের শক্তিশালী গোয়েন্দা টিম রয়েছে।’ দ্রুত, উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল জেনারেল মোস্তফা। ‘ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির ছাত্র-প্রতিনিধিদলের সাথে ড. আন্দালুসির একটা সাক্ষাতকার ছিল আজ সকালে। যা খবর পেলাম, তাতে মনে হচ্ছে ছাত্র প্রতিনিধিদলকে কিডন্যাপ করে শত্রু পক্ষের কেউ সেখানে গেছে।’ আহমদ মুসা বলল। ‘ও গড! বুঝেছি। আমি পুলিশ ষ্টেশনগুলোতে টেলিফোন করছি। আমরা যাচ্ছি সেখানে, আপনি প্লিজ আসুন মি. খালেদ খাকান।’ বলেই ‘আসসালাম’ কথাটি কাঁপা কণ্ঠে উচ্চারণ করে কল লাইন কেটে দিল। আহমদ মুসা জোসেফাইনের হোল্ড লাইনটা অন করে বলল দ্রুত কণ্ঠে, ‘মনে হয় সাংঘাতিক কিছু ঘটে গেছে সেখানে। তোমার বান্ধবী জেফি জিনা শেষ পর্যন্ত কোথায় ছিলেন?’ ‘প্রবল দ্বিধা নিয়ে অবশেষে তিনি বিজ্ঞানীর বাড়ির দিকেই এগোন। কিন্তু বিজ্ঞানীর বাড়ির রাস্তায় যাবার আগেই দু’জন লোক এসে তার পথ রোধ করে দাঁড়ায়। বলে, বিজ্ঞানী স্যারের বাড়ি যেতে হলে পাশ লাগবে। পাশ আছে কিনা। তখন জেফি জিনা জানান, তার দাওয়াত আছে সেখানে। কিন্তু সেই লোক দুজন বলে, ছাত্র প্রতিনিধি দলের পাশ ছিল, তাঁরা গেছে। পাশ না থাকলে আপনাকে যেতে দিতে পারি না। তখন জেফি জিনা তাদেরকে বলে, তোমরা যদি সরকারি কিংবা সিকিউরিটির লোক হও, তাহলে এখনি পুলিশকে খবর দিয়ে বিজ্ঞানী স্যারের বাড়িতে যাও। তার বিপদের আশংকা করছি আমি। সেই দু’জন লোক জানায়। ভয় নেই, বাড়িতে তাঁর নিরাপত্তার জন্যে ব্যবস্থা আছে। তার পরেই জেফি জিনা আমাকে টেলিফোন করে তোমাকে সব জানাবার অনুরোধ করে তিনি দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে গেছেন।’ থামল জোসেফাইন।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৫১ জন


এ জাতীয় গল্প

→ রোমেলী দুর্গে চ্যাপ্টার- ৭ (শেষ)
→ রোমেলী দুর্গে চ্যাপ্টার- ৬ বাকি অংশ
→ রোমেলী দুর্গে চ্যাপ্টার- ৬
→ রোমেলী দুর্গে চ্যাপ্টার- ৫
→ রোমেলী দুর্গে চ্যাপ্টার- ৪ বাকি অংশ
→ রোমেলী দুর্গে চ্যাপ্টার- ৩ বাকি অংশ
→ রোমেলী দুর্গে চ্যাপ্টার- ৩
→ রোমেলী দুর্গে চ্যাপ্টার- ২ বাকি অংশ
→ রোমেলী দুর্গে চ্যাপ্টার- ২
→ রোমেলী দুর্গে চ্যাপ্টার- ১

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now