বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন

বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা

আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

তবুও টুনটুনি ও তবুও ছোটাচ্চু (১)

"ছোটদের গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান TARiN (০ পয়েন্ট)



X কবি টুনি স্কুলের বারান্দায় বসে দেখছিল তার ক্লাসের ছেলেমেয়েরা মাঠে ছোটাচ্চুটি করে খেলছে। টুনির ভেতরে একটা বড় মানুষ বড় মানুষ ভাব আছে, তাই সে সবসময় সবার সাথে ছোটাচ্চুটি করতে পারে না। অনেক সময়েই সে বারান্দায় বসে বসে অন্যদের ছোটাচ্চুটি করতে দেখে। টুনি দেখল, খেলার মাঠে কিছু একটা হয়েছে আর তখন একটা ছেলে আরেকটা মেয়ে গলা ফাটিয়ে ঝগড়া করতে শুরু করেছে। মনে হচ্ছে পারলে একজন বুঝি আরেকজনকে কাঁচা খেয়ে ফেলবে। ঠিক কী নিয়ে দুইজন ঝগড়া করছে টুনি সেটা বোঝার চেষ্টা করছিল, ঠিক তখন শুনল রিনরিনে গলার স্বরে কে যেন ডাকল, “টুনি আপু।” টুনি তাকিয়ে দেখে তাদের স্কুলের ছোট ক্লাসের একটা মেয়ে তাকে ডাকছে। টুনি তার দিকে তাকিয়ে মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল, “কী আপু?” মেয়েটি ছোট হলেও বড়দের মতো করে বলল, “আমি কি তোমার সাথে একটু কথা বলতে পারি?” টুনি বলল, “একশ’বার। এসো, আমার পাশে বসো।” মেয়েটা টুনির পাশে বসে টুনির দিকে তাকাল। টুনি দেখল মেয়েটার চোখে পানি টলটল করছে। টুনি জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে তোমার?” মেয়েটা হাত দিয়ে চোখের পানি মুছে বলল, “আমার খুব মন খারাপ।” “কেন? তোমার কেন মন খারাপ?” “দৈনিক নতুন পৃথিবী পত্রিকা আমাকে অপমান করেছে।” টুনি চোখ বড় বড় করে মেয়েটার দিকে তাকাল। দৈনিক নতুন পৃথিবী এই দেশের অনেক বড় পত্রিকা। সেই পত্রিকা মন্ত্রী-মিনিস্টারদের পর্যন্ত জীবন বরবাদ করে দেয়, সেই পত্রিকা এইটুকুন একটা বাচ্চা মেয়েকে কেমন করে অপমান করতে পারে টুনি বুঝে পেল না। মেয়েটার কথা শুনে টুনির একটু হাসি পেয়ে যায় কিন্তু সে হাসিটা গোপন করে জিজ্ঞেস করল, “নতুন পৃথিবী তোমাকে কেমন করে অপমান করল?” “এই দেখো।” বলে মেয়েটা তার স্কার্টের পকেট থেকে ভাঁজ করা একটা কাগজ বের করে তাকে দিল।” টুনি কাগজটা খুলে দেখে সত্যি সত্যি এটা নতুন পৃথিবী পত্রিকার প্যাডের কাগজ। সেখানে টাইপ করে লেখা : প্রিয় মেহজাবিন আরা মিলা নতুন পৃথিবী ও ম্যান্ডারিন ক্রোকারিজের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত শিশু-কিশোর সাহিত্য প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার জন্যে তোমাকে ধন্যবাদ। তবে তুমি নিজের লেখা কবিতা জমা না দিয়ে অন্য কারো লেখা একটি কবিতা নিজের নামে জমা দিয়েছ দেখে আমরা অত্যন্ত মর্মাহত হয়েছি। যদি এই কোমল বয়সে তুমি এই ধরনের অন্যায় কাজে লিপ্ত হয়ে যাও তাহলে তুমি বড় হয়ে এই দেশ সমাজের কোনো কাজে আসবে না। কাজেই আমরা আশা করব তুমি ভবিষ্যতে এই ধরনের অন্যায় কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকবে। তোমার শুভাকাক্ষী কাতিমুন নাহার নির্বাহী সম্পাদক শিশু-কিশোর সাহিত্য প্রতিযোগিতা টুনি চিঠিটা পড়ে ছোট মেয়েটার দিকে তাকাল, “এই চিঠিটা তোমাকে লিখেছে? তোমার নাম মেহজাবিন আরা মিলা।” মিলা নামের মেয়েটা মাথা নাড়ল। “তুমি এদের প্রতিযোগিতায় একটা কবিতা পাঠিয়েছিলে? নিজের লেখা কবিতা?” “মেয়েটা আবার মাথা নাড়ল।” “নতুন পৃথিবী মনে করেছে তুমি এটা অন্যের লেখা থেকে চুরি করেছ?” মিলা ঠোঁট উল্টে প্রায় কেঁদেই দিচ্ছিল, অনেক কষ্টে নিজেকে শান্ত করে মাথা নাড়ল। টুনি জিজ্ঞেস করল, “কেন তারা আরো ভেবেছে তুমি আরেকজনের কবিতা চুরি করেছ?” মিলা বলল, “জানি না।” “তোমার কবিতাটা কি আছে? মিলা মাথা নাড়ল, “আছে।” “দেখি।” মিলা তখন তার স্কার্টের পকেট থেকে আরেকটা কাগজ বের করে টুনির হাতে দিল। টুনি কাগজটা খুলে দেখে সেখানে একেবারে মুক্তার মতো ঝকঝকে হাতের লেখায় একটা কবিতা লেখা। টুনি জিজ্ঞেস করল, “এটা কার হাতের লেখা?” “আমার।” টুনি অবাক হয়ে বলল, “তোমার?” “হ্যাঁ।” টুনি অবাক হয়ে বলল, “তুমি এইটুকুন একটা মেয়ে, আর তোমার হাতের লেখা এত সুন্দর?” মিলা কিছু না বলে চুপ করে রইল। টুনি তখন কবিতাটি পড়ল : দূর্বাঘাস ভোরের সূর্যকে ডেকে বলে দেখো, সারা রাত অনেক ভালোবাসায় জড়ো করেছি এক ফোঁটা শিশির। সূর্য হা হা করে হাসে, তারপর প্রখর রোদ্দুর দিয়ে শুষে নেয় শিশিরের কণা। সন্ধেবেলা সূর্যের আলো যখন ক্ষীণ ম্রিয়মাণ দূর্বাঘাস বলে, সন্ধ্যার অন্ধকারে যদি হারিয়েই যাবে তাহলে কেন জ্বলে উঠো দুপুরবেলায়? টুনি হাঁ করে মিলার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ঢোক গিলে বলল, “এটা তুমি লিখেছ?” মিলা মাথা নাড়ল। টুনি আবার জিজ্ঞেস করল, “তুমি, মানে তুমি লিখেছ?” মিলা আবার মাথা নাড়ল। টুনি জিজ্ঞেস করল, “তুমি কোন ক্লাসে পড়ো?” “ক্লাস ওয়ান।” “তুমি ক্লাস ওয়ানে পড়ো আর সূর্যের আলো ক্ষীণ ম্রিয়মাণের কবিতা লেখো?” এটা টুনির অভিযোগ না প্রশংসা বুঝতে না পেরে মিলা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কেন, কী হয়েছে?” “ক্লাস ওয়ানের ছেলেমেয়েরা স্বরে আ ম আম কিংবা ক লয়ে আকার লা কলা পড়তে গিয়ে দাঁত ভেঙে ফেলে আর তুমি শিশির কণার উপর কবিতা লিখো?” মিলা একটু দুশ্চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, “লিখলে কী হয়?” “লিখলে কিছু হয় না। কিন্তু ক্লাস ওয়ানের বাচ্চা কখনো এ রকম কবিতা লিখে না। লিখার কথা না।” টুনি হঠাৎ করে ঘুরে মিলার দিকে তাকাল, তারপর চোখ সরু করে বলল, “তুই সত্যি সত্যি বল দেখি যে তুই নিজে এটা লিখেছিস?” টুনি খেয়ালই করল না সে হঠাৎ করে মিলাকে তুই করে বলতে শুরু করেছে। মিলা ঠোঁট উল্টিয়ে প্রায় কেঁদেই ফেলছিল। অনেক কষ্টে কান্না থামিয়ে বলল, “তুমিও নতুন পৃথিবীর মতো আমাকে অবিশ্বাস করছ?” টুনি গলা উঁচিয়ে বলল, “শুধু আমি কেন, যে কেউ অবিশ্বাস করবে। ক্লাস ওয়ানের বাচ্চা এ রকম কবিতা লিখে না, লিখতে পারে না।” টুনি নিজের হাতটা এগিয়ে দিয়ে বলল, “আমাকে ছুঁয়ে বল যে তুই নিজে এই কবিতাটা লিখেছিস।” “ছুঁয়ে বললে কী হয়?” “তুই যদি মিথ্যা কথা বলিস তাহলে আমি দড়াম করে পড়ে মরে যাব।” মিলা চোখ বড় বড় করে বলল, “সত্যি?” “একশ’বার সত্যি।” মিলা টুনির হাত ছুঁয়ে বলল, “আমি নিজে লিখেছি। খোদার কসম।” টুনি তখন তার পকেট থেকে একটা ছোট নোটবই এবং কলম বের করে মিলার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “এখানে একটা অটোগ্রাফ দে।” মিলা বলল, “অটোগ্রাফ কী?” “অটোগ্রাফ হচ্ছে তোর সিগনেচার।” “সিগনেচার? সিগনেচার কেমন করে দেয়?” টুনি বলল, “নিজের নাম নিজে লেখাই হচ্ছে সিগনেচার। এখানে তোর নামটা লিখে দিলেই সেটা হবে তোর অটোগ্রাফ।” মিলা নোটবই আর কলমটা হাতে নিয়ে বলল, “আমাকে কেন অটোগ্রাফ দিতে হবে?” “তার কারণ তুই একদিন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কবি হবি। কে জানে শুধু বাংলাদেশের না, হয়তো সারা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কবি হবি! তখন সব মানুষ তোর পিছনে ঘুরবে তোর অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্যে। আমি তখন বলব কবি মেহজাবিন আরা মিলার প্রথম অটোগ্রাফটা আমার কাছে আছে!” মিলা লজ্জা পেয়ে টুনিকে ছোট একটা ধাক্কা দিয়ে বলল, “যাও টুনি আপু।” “কে জানে, তখন হয়তো তোর অটোগ্রাফটা অনেক টাকায় বিক্রি করা যাবে। আমি অবশ্যি এটা বিক্রি করব না, আমার কাছে রেখে দেব।” মিলা লাজুক মুখে টুনিকে আরেকটা ধাক্কা দিয়ে বলল, “যাও টুনি আপু, তুমি শুধু ঠাট্টা করো।” টুনি মিলার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমাকে দেখে কি মনে হয় আমি ঠাট্টা-তামাশা করি?” মিলা মাথা নাড়ল, “না। সবাই বলে তোমার মাথায় অনেক বুদ্ধি। সেই জন্যেই তো আমি তোমার কাছে এসেছি।” টুনি বলল, “ঠিক আছে। এসেছিস, ভালো করেছিস। এখন কথা বন্ধ করে আগে একটা অটোগ্রাফ দে।” মিলা লাজুক মুখে নোটবইটার উপর কলমটা রেখে বলল, “শুধু নাম লিখলেই হবে?” “উঁহু, প্রথমে লেখ প্রিয় টুনি আপু, তারপর লেখ তোমার জন্যে অনেক ভালোবাসা, তার নিচে তোর নাম লিখে আজকের তারিখটা দে।” মিলা টুনির কথামতো সবকিছু লিখে নোটবইটা টুনির কাছে ফেরত দিল, মেয়েটির হাতের লেখা ঝকঝক করছে। এত ছোট মেয়ের হাতের লেখা এত সুন্দর হতে পারে বিশ্বাস করা কঠিন। মিলা এসেছিল খুব মন খারাপ করে, চোখের পানি টলটল করছিল, এখন তার মনটা যথেষ্ট ভালো হয়েছে, মুখে একটু হাসি ফুটেছে। সে টুনিকে জিজ্ঞেস করল, “এখন আমি কী করব টুনি আপু?” “নতুন পৃথিবীকে একটা শিক্ষা দিতে হবে।” “কীভাবে শিক্ষা দিবে টুনি আপু?” “সেটা চিন্তা করে বের করতে হবে। চিন্তা করলে একটা বুদ্ধি বের হয়ে যাবে।” মিলা বলল, “আমি অনেক চিন্তা করেছি, কোনো বুদ্ধি বের হয় নাই। সেই জন্যে তোমার কাছে এসেছি।” “তুই চিন্তা করে সময় নষ্ট করিস না। চিন্তা করাটা আমার আমার উপর ছেড়ে দে। তুই কবি মানুষ, বসে বসে ভোরের শিশির আর ক্ষীণ মিয়মাণ সূর্যের আলো নিয়ে কবিতা লিখতে থাক।” মিলা বলল, “আমার এত মন খারাপ হয়েছিল যে আমি ঠিক করেছিলাম আর কোনোদিন কবিতা লিখব না।” টুনি চোখ কপালে তুলে বলল, “সে কী! আমি অ্যাডভান্স তোর থেকে অটোগ্রাফ নিয়ে রাখলাম আর তুই কবিতা লিখবি না মানে?” মিলার চোখ আবার ছলছল করতে থাকে। কোনোভাবে কান্না সামলে নিয়ে বলল, “যখন এই খারাপ চিঠিটা এসেছে আমি তখন সেটা আব্বুর কাছে নিয়ে গিয়েছিলাম, আব্বু কি বলেছে জানো?” “কী বলেছে?” আব্বু বলেছে, ও আচ্ছা ভেরি গুড!” “ও আচ্ছা ভেরি গুড? তাই বলেছে?” “হ্যাঁ। আমি কী বলেছি আব্বু শুনেই নাই। ও আচ্ছা ভেরি গুড বলে আবার পত্রিকা পড়তে শুরু করেছে।” টুনি বলল, “কাজটা ঠিক হয় নাই।” মিলা বলল, “তারপর চিঠিটা আম্মুর কাছে নিয়ে গেছি।” “তোর আম্মু কী বলেছে?” “আম্মু বলেছে উচিত শিক্ষা হয়েছে। লেখাপড়া নাই দিন-রাত বসে বসে ঢং করে কবিতা লিখিস, এখন যদি এই ঢং বন্ধ হয়!” টুনি চোখ কপালে তুলে বলল, “হায় হায়! তাই বলেছে?” “হ্যাঁ। সবচেয়ে খারাপ কথা বলেছে আমার আপু।” টুনি জিজ্ঞেস করল, “তোর আপু কী বলেছে?” আপু বলেছে, “তুই আরেকজনের কবিতা নকল করে লিখবি আর তোকে মাথায় নিয়ে নাচবে? তোর লজ্জা করল না আরেকজনের কবিতা নকল করে মেরে দিতে? তুই ছোট বলে ছেড়ে দিয়েছে। বড় হলে তোকে নিশ্চয়ই ধরে জেলে দিয়ে দিত, দুই বছর জেলে বসে বসে টয়লেট পরিষ্কার করলে তুই সিধে হয়ে যেতি।” টুনি হতাশভাবে মাথা নেড়ে বলল, “না, না, না। তোর আপুর এ রকম কথা বলাটা একেবারে ঠিক হয় নাই। মিলা, তুই মন খারাপ করবি না। আমি আছি তোর সাথে। তুই যখন অনেক বড় কবি হবি তখন তোকে সাংবাদিকেরা জিজ্ঞেস করবে, আপনাকে কবি হওয়ার জন্যে কে অনুপ্রেরণা দিয়েছে? তখন তুই মনে করে আমার নাম বলবি কিন্তু!” মিলা লাজুক মুখে হাসল, হেসে বলল, “তোমার সাথে কথা বলে আমার মন সত্যিই ভালো হয়ে গেছে।” “গুড। যখন নতুন পৃথিবীকে একটা কঠিন শিক্ষা দিব তখন তোর মন আরো ভালো হয়ে যাবে।” “সত্যি শিক্ষা দেওয়া যাবে?” “দিতে হবে। একটা প্রতিশোধ নিতে হবে না? প্রতিশোধেই আনন্দ।” “প্রতিশোধেই আনন্দ?” কথাটা মনে হয় মিলার খুব পছন্দ হলো, একটু পরে পরে বলল, “প্রতিশোধেই আনন্দ! প্রতিশোধেই আনন্দ!” . টুনি পরের দুই দিন একটু খোঁজখবর নিল। নতুন পৃথিবী পত্রিকা ম্যান্ডারিন ক্রোকারিজ নামের একটা কোম্পানির সাথে প্রত্যেক বছর শিশু-কিশোর সাহিত্য প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েদের চার ভাগে ভাগ করা হয়, ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত প্রাইমারি, ক্লাস সিক্স থেকে এইট জুনিয়র, নাইন-টেন সেকেন্ডারি আর ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্রছাত্রীরা হচ্ছে হায়ার সেকেন্ডারি। এই চার ভাগের প্রত্যেক ভাগে তিন ধরনের প্রতিযোগিতা হয়-গল্প, কবিতা আর প্রবন্ধ। প্রত্যেকটা প্রতিযোগিতাতে চ্যাম্পিয়ন, ফার্স্ট রানার্স-আপ আর অনেকগুলো সেকেন্ড রানার্স-আপ পুরস্কার দেওয়া হয়। কাজেই অনেক ছেলেমেয়ে পুরস্কার পায়। পুরস্কার হিসেবে বই দেয়া হয়। নতুন পৃথিবীদের নিজেদের বই প্রকশানা আছে, তাই পুরস্কার দিতে তাদের কোনো টাকা খরচ হয় না। যে বইগুলো বিক্রি হয় না সেগুলো পুরস্কার হিসেবে দিয়ে দেয়। টুনি খোঁজ নিয়ে দেখল গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ জমা দেওয়ার এখনো সপ্তাহ খানেক সময় আছে। লেখা জমা পাওয়ার ঠিক এক মাস পরে অনেক বড় অনুষ্ঠান হয়, সেই অনুষ্ঠানে অনেক হইচই করে পুরস্কার দেওয়া হয়। মিলার সেখানে পুরস্কার পাওয়ার কথা ছিল কিন্তু তাকে বাতিল করে দিয়েছে। টুনি মিলাকে শান্ত করার জন্যে বড় গলা করে বলেছে যে সে নতুন পৃথিবীর উপর প্রতিশোধ নেবে। কিন্তু কীভাবে প্রতিশোধটা নেবে সে নিজেও জানে না। সে যখন এ রকম একটা অবস্থায় পড়ে তখন সবসময় বাসার অন্যদের সাথে বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করে। এবারেও সে আলোচনা শুরু করল, প্রথম কথা বলল ঝুমু খালার সাথে। ঝুমু খালা পুরো বিষয়টা শুনে গম্ভীর মুখে বলল, “আমারে পত্রিকার অফিসে নিয়া যাও।” টুনি বলল, “তুমি পত্রিকা অফিসে গিয়ে কী করবে?” “ওই মোটা মহিলারে সাইজ করে দিয়ে আসি।” টু নি অবাক হয়ে বলল, “কোন মোটা মহিলা?” “যে মোটা মহিলা এ রকম খারাপ একটা চিঠি লিখেছে।” “তুমি কেমন করে জানো মহিলা মোটা?” “ঘটনার বর্ণনা শুনেই বোঝা যায়। এ রকম খারাপ চিঠি যে লেখে সে নির্ঘাত মোটা।” ঠিক তখন শান্ত পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল, সে থেমে গিয়ে চোখ বড় বড় করে বলল, “কে কাকে খারাপ চিঠি লিখেছে? আছে চিঠিটা? দেখি।” টুনি বলল, “না শান্ত ভাইয়া, চিঠিটা নাই। এটা পত্রিকা অফিস থেকে লিখেছে আমাদের স্কুলে ক্লাস ওয়ানের একটা বাচ্চার কাছে।” “কেন? কেন পত্রিকা অফিস থেকে ছোট বাচ্চাদের কাছে খারাপ খারাপ চিঠি লিখবে?” টুনিকে তখন পুরোটা বলতে হলো এবং সবকিছু শুনে শান্ত মহাখাপ্পা হয়ে উঠল। জিজ্ঞেস করল, “পত্রিকার অফিসটা কয় তলা?” “জানি না। কেন?” “তিনতলা থেকে কম হলে নিচ থেকে ঢিল মেরে সবগুলো কাঁচ ভেঙে দিয়ে আসতাম। উচিত শিক্ষা হতো।” শান্ত গরগর করতে করতে চলে গেল। টুনি অন্যদেরকেও জিজ্ঞেস করল, “কেউ বলল মিথ্যা অপবাদ দেওয়ার জন্যে মামলা করে দিতে, কেউ বলল, নতুন পৃথিবী পত্রিকা বয়কট করতে, কেউ বলল অফিসের সামনে মানববন্ধন কিংবা অনশন করতে। কোনোটাই আসলে করার মতো না। তাই সন্ধেবেলা যখন দাদি টেলিভিশন দেখতে বসেছে টুনি তখন দাদিকে পুরো ঘটনাটা বর্ণনা করে কী করা উচিত জিজ্ঞেস করল। দাদি বললেন, “এটা হচ্ছে একটা ভুল বোঝাবুঝি। তোদের স্কুলের ছোট মেয়েটা এতই ভালো কবিতা লিখে যে পত্রিকাওয়ালারা ধরে নিয়েছে সে নিজে লিখেনি। কাজেই কোনো একজন বড় মানুষকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিতে হবে। বলে দিতে হবে আসলেই বাচ্চাটা নিজে লিখেছে। তাহলেই তো ঝামেলা মিটে যাবে। বাচ্চাটা তাহলে একটা পুরস্কারও পাবে, কত খুশি হবে!” টুনি চিন্তা করে দেখল দাদি আসলে ভুল কথা বলেননি। সে নিজেই দেখেছে মিলার কবিতাটা মোটেও ক্লাস ওয়ানের একটা বাচ্চার লেখা কবিতার মতো মনে হয় না। কাজেই পত্রিকার লোকজন যদি মনে করে মিলা অন্য কারো কবিতা চুরি করে দিয়ে দিয়েছে তাহলে পত্রিকাওয়ালাদের দোষ দেওয়া যায় না। তাই প্রতিশোধ নেওয়ার পরিকল্পনা করার আগে নতুন পৃথিবী পত্রিকার লোকজনের সাথে কথা বলা দরকার। কাতিমুন নাহার নামে যে মহিলাটি চিঠিটি লিখেছে তাকে একটা ফোন করে বিষয়টা বুঝিয়ে বলতে হবে, তারপর তাকে অনুরোধ করতে হবে মিলাকে উৎসাহ দিয়ে সুন্দর একটা চিঠি লিখে দিতে। তাহলেই সবচেয়ে সুন্দর করে সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু সমস্যা হলো টুনি ফোন করার মতো বড় কাউকে খুঁজে পেল না। এই সমস্ত কাজের জন্যে ছোটাচ্চু সবচেয়ে ভালো কিন্তু সে কয়েক দিন থেকে লাপাত্তা। তাদের স্কুলের কোনো স্যার আর ম্যাডাম বলে দিলে সবচেয়ে ভালো হতো কিন্তু টুনি স্যার-ম্যাডামদের থেকে দূরে দূরে থাকে, তাই কাউকে বলতে পারবে বলে মনে হয় না। দাদিও কাজটা করতে পারতেন কিন্তু দাদি টেলিফোনে কথা বলতে চান না, মানুষটাকে সামনে না দেখলে দাদি নাকি কথা বলতে পারেন না। এখন দাদিকে তো আর টেনে পত্রিকা অফিসে নেওয়া যাবে না। পত্রিকার অফিস কী রকম হয় সেটা সম্পর্কে টুনির কোনো ধারণা নেই, হয়তো ভিতরে ঢুকতেই দিবে না। যখন এ রকম অবস্থা তখন শান্ত টুনিকে বলল, “তুই টেলিফোন করার মানুষ খুঁজে পাচ্ছিস না? ঠিক আছে, আমি টেলিফোন করে দিব।” টুনি মুখ গম্ভীর করে বলল, “শান্ত ভাইয়া, টেলিফোন করতে হবে একজন বড় মানুষের, তুমি মোটেও বড় মানুষ না।” শান্ত অবাক হয়ে বলল, “আরে ওই মোটা মহিলা আমাকে দেখবে নাকি? ওই মহিলা জানবে কেমন করে আমি বড় না ছোট? সে শুধু আমার গলার স্বর শুনবে।” টুনি বলল, “তোমার গলার স্বর শুনে বোঝা যায় যে তুমি বড় মানুষ। আর ওউ মহিলা মোটা তুমি কেমন করে জানো?” শান্ত বলল, “ঝুমু খালা বলছিল তাই বলেছি। যাই হোক আমার গলার স্বর শুনে মোটেও বুঝবে না আমি ছোট। আমি বড় মানুষদের মতো গলা মোটা করে বলব।” তারপর শান্ত গলা মোটা করে কথা বলে দেখাল এবং সেটা শুনে টুনি যথেষ্ট বিরক্ত হয়ে বলল, “শান্ত ভাইয়া, তোমার গলার স্বর শুনে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে তুমি ইয়ারকি করছ।” “ঠিক আছে, তাহলে মাইক্রোফোনের উপর কাপড় রেখে কথা বলব। তাহলে গলার স্বর মোটা শোনাবে। এটা হচ্ছে অনেক পুরানো টেকনিক।” টুনি বলল, “না, তোমাকে কথা বলতেই হবে না।” শান্ত রেগে গেল, বলল, “কেন আমাকে কথা বলতে হবে না।” টুনি শান্ত গলায় বলল, “কারণ তোমার মাথা গরম, কী বলতে গিয়ে কী বলে ফেলবে। তুমি এমনিতেই কথা বলতে পারো না। এখানে গুছিয়ে কথা বলতে হবে।” “গুছিয়ে বলতে হবে মানে?” “মানে ওদেরকে বোঝাতে হবে প্রডিজি বলে একটা শব্দ আছে–” “কী বলে শব্দ আছে?” “প্রডিজি, তার মানে যাদের প্রতিভা একেবারে ছোট থাকতে বের হয়ে আসে। যেমন গাউস কিংবা মোজার্ট। আমাদের মিলাও মনে হয় একজন প্রডিজি। “কী নাম বললি?” “গণিতবিদ গাউস, সংগীতবিদ মোজার্ট।” শান্ত বিড়বিড় করে নামগুলো মুখস্থ করতে লাগল এবং সেটা দেখেই টুনির একটু সন্দেহ হলো। কিন্তু সন্দেহ হলেও কিছু করার নেই। . সেইদিন বিকালবেলা শান্তকে দেখা গেল খুবই খুশি, তার মুখে বিরাট একটা হাসি। শান্তর মুখে এ রকম বিরাট হাসি দেখেই টুনির মনে হলো যে শান্ত নিশ্চয়ই কোনো একটা অপকর্ম করে এসেছে। জিজ্ঞেস করল, “শান্ত ভাইয়া, কী হয়েছে?” “বিশাল মজা হয়েছে।” “বিশাল মজা! কোথায়?” “নতুন পৃথিবী পত্রিকার মোটা মহিলা যা তড়পানি তড়পাচ্ছে সেটা আর বলার মতো না!” কথা শেষ করে শান্ত আনন্দে হা হা করে হাসল। টুনি আতঙ্কিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, “মোটা মহিলা, কোন মোটা মহিলা?” “এই যে নতুন পৃথিবীর মোটা মহিলা। তোর স্কুলের মেয়ে মিলাকে যে খারাপ চিঠি লিখেছে।” টুনি চোখ কপালে তুলে বলল, “তুমি তার সাথে কথা বলেছ? সর্বনাশ! কী বলেছ?” শান্ত মুখ গম্ভীর করে বলল, “আমি কি কখনো অন্যায় কথা বলি? যা দরকার তাই বলেছি।” টুনি বলল, “কিন্তু তোমাকে না আমি কথা বলতে না করলাম!” “আমি কী করব-না-করব সেটাকে তুই না বলার কে? আমার ইচ্ছা হয়েছে কথা বলেছি। ইচ্ছে হলে মারামারি করব। তুই কে?” টুনি চোখ বড় বড় করে শান্তর দিকে তাকিয়ে রইল। একটু পর জিজ্ঞেস করল, “তুমি কী বলেছ? আর নতুন পৃথিবী কী বলেছে?” “কত দিবি?” “কত দিব মানে?” “মানে আমাকে কত দিবি?” “তোমাকে দিব কেন?” “পুরা কথাবার্তা রেকর্ড করা আছে, যদি শুনতে চাস তোকে শুনিয়ে দেব। কত দিবি বল।” “তুমি সব কথা রেকর্ড করে রেখেছ? তুমি জানো পারমিশন না নিয়ে কথা রেকর্ড করা বেআইনি?” “বেআইনির খেতা পুড়ি। তোকে শুনাব, তুই কত দিবি বল।” টুনি মুখ শক্ত করে বলল, “আমি এক পয়সাও দিব না। তুমি শুনাতে চাইলে শুনাও।” শান্ত কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তার মুখের হাসিটা বড় হতে থাকল, বোঝাই যাচ্ছে সে নতুন পৃথিবীর সাথে যে কথাবার্তা চালিয়ে এসেছে সেটা তাকে শোনাতে চাচ্ছে। টুনির ধারণা সত্যি, একটু পর শান্ত তার পকেট থেকে একটা মোবাইল ফোন বের করল। টুনি ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল “এটা কার ফোন?” “সেটা তোর জানার দরকার কী? তোকে কথাবার্তা শুনাচ্ছি, চুপ করে শুনে যা।” শান্ত মোবাইল ফোনের কোথায় টেপাটেপি করল, তখন হঠাৎ কথা শোনা যেতে লাগল। একটা নারী কণ্ঠ কথা বলল, “হ্যালো।” পুরুষ কণ্ঠ বলল, “আমি শিশু-কিশোর সাহিত্য প্রতিযোগিতার সভাপতির সাথে কথা বলতে চাচ্ছি।” পুরুষ কণ্ঠটি শান্তর, কীভাবে কীভাবে সে জানি মোটা করেছে, মনে হচ্ছে যে বড় মানুষের গলা। নারী কণ্ঠ বলল, “আমি প্রতিযোগিতা কমিটির সাধারণ সম্পাদক। কাতিমুন নাহার।” “ভেরি গুড। আমি একটা বিষয় নিয়ে আপনাদের সাথে কথা বলতে চাচ্ছিলাম। আমার পরিচিত ছোট একটা মেয়ে, নাম মিলা, কয়েক দিন আগে আপনাদের প্রতিযোগিতায় একটা কবিতা পাঠিয়েছে।” “আমাদের কাছে প্রতিদিন হাজার হাজার গল্প-কবিতা আসে। আমরা।” শান্ত মহিলাকে মাঝখানে থামিয়ে বলল, “ছোট হলে কী হবে, মিলা অসাধারণ কবিতা লিখে। এখন সমস্যা হচ্ছে তার কবিতাটা দেখে আপনারা মনে করেছেন এটা বুঝি মিলা নিজে লিখেনি! আপনারা ভেবেছেন এটা বুঝি মিলা অন্য কারো কাছ থেকে কপি করেছে।” মহিলার গলার স্বর এবারে উত্তেজিত হয়ে উঠল, বলল, “হ্যাঁ হ্যাঁ, আমার মনে পড়েছে। আমরা একটা কবিতা পেয়েছি, যেখানে মেয়েটা দাবি করেছে সে ক্লাস ওয়ানে পড়ে, কিন্তু হাতের লেখা দেখেই বোঝা যাচ্ছে এটা ক্লাস ওয়ানের একটা মেয়ের হাতের লেখা না। শুধু তা-ই না, কবিতার ভাষা এবং বিষয়বস্তু রীতিমতো বড় মানুষের। অন্য কোনো বড় মানুষের লেখা নিজের বলে দাবি করে মেয়েটা আমাদের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছে। এই টুকুন মেয়ে এত অল্প বয়সে লেখা চুরি করা শিখে গেছে!” শান্ত বলল, “আপনি আসলে ভুল করছেন। এই মেয়েটি কবিতাটা নিজেই লিখেছে। মেয়েটা একটা প্রডিজি।” “প্ৰডিজি? প্রডিজি কি গাছে ধরে?” “গাউস হচ্ছে গণিতের প্রডিজি, মোঞ্জার্ট সংগীতের, আমাদের মিলা হচ্ছে সাহিত্যের প্রডিজি। কবিতার প্রডিজি–” টেলিফোনে যখন এই কথাগুলো শোনা যাচ্ছিল তখন শান্ত রীতিমতো গর্বের ভঙ্গি করে বুকে থাবা দিল। মহিলা কেমন জানি ক্ষেপে গেল, বলল, “কবিতার প্রডিজি না, সে হচ্ছে লেখা চুরির প্রডিজি!” শান্ত খুব অল্পতে ক্ষেপে যায়, শুধু ক্ষেপে যায় না, ক্ষেপে গিয়ে রীতিমতো ঝগড়া-ঝাটি শুরু করে দেয়। কিন্তু অবাক ব্যাপার, মহিলার কথা শুনে সে এবারে একটুও ক্ষেপল না। রীতিমতো মধুর স্বরে বলল, “আপনি খুব বড় ভুল করছেন ম্যাডাম। একজন প্রডিজির প্রতিভার সঠিক মূল্যায়ন করছেন না। একটা ছোট শিশুর কোমল হৃদয়ে আঘাত দিচ্ছেন।” শান্ত এবার নিজের বুকে থাবা দিল। নিজের কথা বলার প্রতিভায় সে নিজেই মুগ্ধ! মহিলা মনে হয় শান্তর কথা শুনে আরো ক্ষেপে গেল, বলল, “কোমল হৃদয়? শিশুর কোমল হৃদয়? আপনি কয়জন শিশুকে দেখেছেন? নতুন পৃথিবী পত্রিকায় আমি ছয় বছর থেকে শিশুদের সেকশন দেখি। শিশুদের আমার চেনা হয়ে গেছে!” শান্ত মধুর গলায় বলল, “সত্যি? আপনি কী রকম চিনেছেন একটু বলবেন? শিশুরা কী রকম?” মহিলা চিৎকার করে বলল, “আজকালকার শিশুরা হচ্ছে পাজি এবং বদমাইশ। তাদের বাবা-মায়েরা আদর দিয়ে তাদের মাথা খেয়েছে। তারা হচ্ছে পুরোপুরি বখে পাওয়া জেনারেশন।” “আপনার কি ধারণা আমাদের মিলাও বখে যাওয়া একটা মেয়ে?” “আপনার মিলা শুধু বখে যাওয়া মেয়ে না, সে হচ্ছে ক্রিমিনাল। কারণ সে লেখা চুরি করে।” “তাহলে একটা ক্রিমিনালকে কী রকম শাস্তি দেওয়া দরকার বলে মনে করেন?” “পিটিয়ে লাশ করে দেওয়া দরকার। আমার হাতে যদি থাকত তাহলে আমি পিটিয়ে তাকে সিধে করে দিতাম।” “ম্যাডাম, আপনাকে একটা কথা বলি?” “বলেন।” “আপনি আসলে ভুল জায়গায় কাজ করছেন। আপনি ছোট শিশুদের ভালোবাসেন না, তাদের জন্যে আপনার কোনো সম্মানবোধ নেই। একটি প্রতিভাবান শিশুকে আপনি ধরে নিয়েছেন ক্রিমিনাল। তাহলে আপনি কেন শিশুদের নিয়ে কাজ করছেন? আপনার কোথায় কাজ করা উচিত জানেন?” “আপনার মুখ থেকে এটা আমার শোনার কোনো প্রয়োজন নেই।” শান্ত মধুর গলায় বলল, “আপনার কাজ করা উচিত কসাই হিসেবে। অবলা গরু-ছাগলকে জবাই দেবেন। চামড়া ছিলে মাংস কাটবেন!” মহিলা গর্জন করে উঠল, “আপনি এভাবে কথা বলবেন না।” “কিংবা আপনি জঙ্গি হয়ে যেতে পারেন। বোমা মেরে নিরপরাধ মানুষ মারবেন! কিংবা জেলখানায় জল্লাদ হিসাবেও চাকরি করতে পারেন।” “খবরদার। খবরদার–” “এত অল্পে রেগে যাচ্ছেন, আপনার ব্লাড প্রেসারটাও পরীক্ষা করা দরকার।” “ভালো হচ্ছে না কিন্তু–” “তার সাথে সাথে মাথাটাও!” খটাস করে একটা শব্দ হলো এবং টেলিফোনটা রেখে দিল। শান্ত এবারে টুনির দিকে তাকিয়ে আনন্দে হা হা করে হাসতে থাকল। বলল, “কেমন দেখলি? কত সুন্দর করে কথা বলেছি দেখেছিস?” “দেখলাম।” “এইটা আমি নূতন শিখেছি। কথা বলার সময় নিজে কখনো রাগতে হয় না। অন্যজনকে রাগিয়ে দিতে হয়। একজন রেগে গেলে শুধু আউল ফাউল কথা বলতে থাকে। কী মজা হয় তখন!” শান্ত আপনমনে হাসতে হাসতে চলে গেল। টুনি একটা নিশ্বাস ফেলল, নতুন পৃথিবীর উপরে প্রতিশোধ নেওয়া ছাড়া এখন আর কোনো উপায় থাকল না। শান্ত অবশ্যি খুব ভুল বলেনি, এই মহিলার আসলেই বাচ্চা কাচ্চার জন্যে মায়া নেই। ধরেই নেয় বাচ্চা মানেই ইবলিশ। বাচ্চা মানেই দুষ্টু, পাজি, বদমাইশ। কী আশ্চর্য! . পরদিন টুনি স্কুলে গিয়ে মিলাকে খুঁজে বের করল। মিলা টুনিকে দেখে খুব খুশি হয়ে উঠল, বলল, “টুনি আপু তোমাকে আজকে খুব সুইট লাগছে।” টুনি বলল, “ধূর বোকা মেয়ে। আমি কি রসগোল্লা না সন্দেশ যে আমাকে সুইট লাগবে?” টুনির কথা শুনে মিলা হি হি করে হাসল। বলল, “তুমি যে কী মজা করে কথা বলো টুনি আপু! তুমি কি কখনো কবিতা লিখেছ?” “মাথা খারাপ হয়েছে তোর? আমি কেমন করে কবিতা লিখব!” মিলা বলল, “আমার মনে হয় তুমি কবিতা লিখলে অনেক সুন্দর করে লিখতে পারবে।” “সেটা নিয়েই তোর সাথে কথা বলব। কিন্তু তার আগে আমাকে তোর লেখা খুব ভালো একটা কবিতা দে।” “কী করবে তুমি?” “কাজ আছে।” “তুমি এক সেকেন্ড দাঁড়াও, আমি আমার কবিতার খাতাটি নিয়ে আসি।” মিলা কিছুক্ষণের মাঝেই একটা সুন্দর বাঁধানো খাতা নিয়ে এলো। টুনি মিলাকে নিয়ে বারান্দায় বসে বাঁধানো খাতাটা খুলতেই অবাক হয়ে যায়। প্রত্যেকটা পৃষ্ঠাই ছেঁড়া এবং সেই ছেঁড়া পৃষ্ঠাগুলো স্কচ টেপ দিয়ে জোড়া লাগানো। টুনি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “তোর কবিতার খাতা এভাবে কে ছিঁড়েছে?” “আমি।” “তুই?” মিলা কেমন যেন লজ্জা পেয়ে যায়। মাথা নিচু করে বলল, “হ্যাঁ, আমি।” “কেন?” “যখন নতুন পৃথিবী আমাকে এই খারাপ চিঠিটা লিখেছে তখন আমার খুব মন খারাপ হয়েছিল আর রাগ উঠেছিল। তাই সবগুলি পৃষ্ঠা ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছিলাম। ঠিক করেছিলাম আর জীবনেও কবিতা লিখব না।” “সর্বনাশ! তারপর?” “তারপর তুমি যখন–” মিলা থেমে গেল। “আমি যখন?” “তুমি যখন সেদিন আমার অটোগ্রাফ নিয়েছ তখন আবার আমার মন ভালো হয়ে গেল। তখন আবার ছিড়া টুকরাগুলো বের করে স্কচ টেপ দিয়ে জোড়া দিয়েছি।” টুনি বলল, “বুঝতে পারছি তুই শুধু কবি না, তুই একটা পাগলি মেয়ে। তোকে দেখে-শুনে রাখতে হবে।” মিলা হি হি করে হাসল। টুনি কবিতার খাতার পৃষ্ঠা ওল্টাতে ওল্টাতে বলল, “এইখানে তোর প্রিয় কবিতা কোনটা?” মিলা বলল, “মানুষের মন নিয়ে একটা কবিতা আছে।” টুনি কবিতাটা বের করে পড়ল, তারপর মাথা নেড়ে বলল “ফার্স্ট ক্লাস। এখন তুই একটা কাগজে সুন্দর করে এই কবিতাটা লিখে ফেল।” “কেন টুনি আপু?” “আগে লিখে দে তারপর বলব।” মিলা তার ঝকঝকে হাতের লেখায় কবিতাটা কপি করতে থাকে। টুনি ভুরু কুঁচকে বলল, “এখন আমাকেও একটা কবিতা লিখতে হবে।” মিলা হাততালি দিয়ে বলল, “তুমি কবিতা লিখবে? বাহ্! কী মজা।” টুনি বলল, “আগেই এত খুশি হোস না। এর মাঝে কোনো মজা নেই।” “তুমি কী নিয়ে কবিতা লিখবে টুনি আপু?” “তোর কোনো আইডিয়া আছে?” “তুমিও মানুষের মন নিয়ে লিখো না কেন?” টুনি মাথা নাড়ল, বলল, “উঁহু, আমি লিখব রসগোল্লা নিয়ে।” “রসগোল্লা?” মিলা আবার হি হি করে হাসতে থাকে। টুনি তখন অনেক সময় লাগিয়ে রসগোল্লা নিয়ে কবিতা লিখল : বড় ভাই কাড়া, ছোট বোন কাড়ি বাবা আনল রসগোল্লা আস্ত এক হাঁড়ি কাড়া বলল আমি খাব, কাড়ি বলে আমি তারপর কাড়াকাড়ি করল কাড়াকাড়ি। কবিতাটা পড়ে হাসতে হাসতে মিলার চোখে পানি এসে গেল, বলল, “টুনি আপু, তুমি খুবই ফানি। তোমার কবিতা তোমার থেকেও ফানি।” টুনি বলল, “এটা মোটেও আমার অরিজিনাল কবিতা না-আমি কি নিজে লিখতে পারি নাকি? ছোট থাকতে হাসাহাসি নিয়ে একটা কবিতা পড়েছিলাম, সেটা থেকে নকল করে এটা বানিয়েছি।” টুনি দুটি কবিতা আলাদা করে রেখে দুটি কাগজ নিল। একটা মিলাকে দিয়ে বলল, “তুই এখানে লেখ, শিশু-কিশোর সাহিত্য প্রতিযোগিতা, তার নিচে লেখ আমি এই প্রতিযোগিতার জন্যে একটা কবিতা পাঠাচ্ছি। তারপর নিচে তোর নাম, ক্লাস, রোল নাম্বার এইসব লেখ।” মিলা ভুরু কুঁচকে বলল, “কেন টুনি আপু? আমি মোটেই আর ওদের কাছে কবিতা পাঠাব না। কোনোদিনও পাঠাব না।” টুনি বলল, “আমি জানি। তোকে তোর কবিতা পাঠাতে হবে না।” “তাহলে কেন লিখব?” “একটু পরেই বুঝতে পারবি কেন লিখছিস।” মিলা মুখ ভার করে লিখল। তখন টুনি নিজের হাতে অন্য কাগজটিতে একই কথা লিখল, নিচে টুনি তার নাম, ক্লাস, রোল নম্বর এইসব লিখল। টুনি তারপর দুটি খাম বের করল, তারপর বলল, “ধরা যাক তুই আর আমি এই প্রতিযোগিতায় দুইটা কবিতা পাঠাব বলে ঠিক করেছি। ধরা যাক দুইজনে একসাথে বসে দুইটা খামে চিঠি আর কবিতা ভরতে গিয়ে গোলমাল করলাম! তাহলে কী হবে?” মিলা বলল, “কী হবে?” “তোর সুন্দর কবিতাটা যাবে আমার নামে! আর আমার ফালতু কবিতাটা যাবে তোর নামে।” “হ্যাঁ। তাহলে কী হবে?” “সেটা আমি এখনো জানি না। কিন্তু তুই এত সুন্দর কবিতা লিখিস যে তোর কবিতাটা পুরস্কার পেতেও পারে! কিন্তু এবারে পুরস্কারটা আসবে আমার নামে। আমি যেহেতু ক্লাস ওয়ানে পড়ি না, তাই পুরস্কারটা আমাকে দিয়ে দেবে। আরেকটা খারাপ চিঠি লিখবে না।” “তাহলে কী হবে?” “তাহলে পুরস্কার নেওয়ার জন্যে আমাকে স্টেজে ডাকবে-আমি স্টেজে উঠে বলব, ভুল করে তোর কবিতাটা আমার খামে ঢুকে গেছে! আসল পুরস্কারটা পাওয়ার কথা তোর। তখন তোকে স্টেজে ডাকতে হবে-তুই যখন স্টেজে যাবি তখন একটা বিশাল হাউকাউ লেগে যাবে।” “হাউকাউ?” “হ্যাঁ। তখন তুই আর আমি মিলে স্টেজে দাঁড়িয়ে সবকিছু বলে দেব। উচিত শিক্ষা হবে তাদের।” “আর যদি পুরস্কার না পাই?” “তাহলে অবশ্য কিছু করার নেই। আমরা তখন গোড়া থেকে নতুন একটা কিছু শুরু করব। অন্য একটা প্ল্যান। সেটা হবে প্ল্যান বি। সেটাও যদি না হয় তাহলে শুরু করব প্ল্যান সি। এভাবে যতক্ষণ পর্যন্ত প্রতিশোধ না নিচ্ছি ততক্ষণ চলতেই থাকবে।” . টুনিকে অবশ্যি প্ল্যান বি কিংবা সিতে যেতে হলো না, কারণ দুই সপ্তাহ পর টুনি একটা চিঠি পেল, সেখানে লেখা জুনিয়র ক্যাটাগরিতে কবিতা প্রতিযোগিতায় সে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। আরো দুই সপ্তাহ পরে পুরস্কার বিতরণী। তাকে পুরস্কার নেওয়ার জন্যে ওই দিন পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে থাকতে বলেছে। মিলার সামনে টুনি অনেক সাহস দেখালেও ভেতরে ভেতরে সে খুব নার্ভাস। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে সে যে নাটকটা মঞ্চস্থ করবে বলে ঠিক করেছে, সেটাতে আসলেই তারা ঠিক ঠিক করে অভিনয় করতে পারবে কি? যদি না পারে তখন কী হবে? . পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে টুনি আর মিলা সময়মতো এসে দর্শকদের সিটে মাঝামাঝি বসে আছে। এই অনুষ্ঠানে মিলাকে আনতে গিয়ে টুনিকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। টুনি ছোটাচ্চুকে নিয়ে মিলার বাসায় গিয়ে মিলার আব্বু-আম্মুকে অনেক কিছু বুঝিয়ে মিলাকে এনেছে। বেশ বড় একটা হলঘরে এখন তারা বসে আছে। এখানে সব মিলিয়ে কয়েকশ মানুষ বসতে পারে। আজকে অবশ্যি বেশিরভাগই কমবয়সী বাচ্চাকাচ্চা। কমবয়সী বাচ্চাকাচ্চা বেশি থাকলে যা হয় এখানে তাই হচ্ছে। সবাই কিচিরমিচির করে কথা বলছে। টুনি স্টেজটার দিকে তাকিয়ে ছিল, বসার জন্যে সেখানে বেশ কয়েকটা চেয়ার রাখা আছে। সামনে টেবিল, সেই টেবিলে পুরস্কার সাজানো। পুরস্কার হিসেবে মেডেল এবং বই দেয়া হবে। বইগুলো রঙিন ফিতা দিয়ে বেঁধে রাখা আছে। স্টেজটাও খুব সুন্দর করে সাজানো হয়েছে, পিছনে বিশাল একটা ব্যানার, সেখানে বড় বড় করে লেখা “নতুন পৃথিবী ম্যান্ডারিন ক্রোকারিজ শিশু-কিশোর সাহিত্য প্রতিযোগিতা”, পাশে অতিথিদের নাম। অনুষ্ঠানের সময় বলা হয়েছিল বিকাল পাঁচটা, এখন সাড়ে পাঁচটা বেজে গিয়েছে, তবুও অনুষ্ঠান শুরু হয়নি। কখন শুরু হবে কে জানে! মিলার সামনে টুনি একটা সাহসী ভাব ধরে রাখলেও ভেতরে ভেতরে সে অসম্ভব নার্ভাস। হঠাৎ করে হলঘরে একটু উত্তেজনা দেখা গেল, গুরুত্বপূর্ণ চেহারার একজন বয়স্ক মানুষ এসে ঢুকলেন, তখন সবাই খুব ব্যস্ত হয়ে তাঁকে নিয়ে সামনে সোফায় বসাল। তখন সালোয়ার-কামিজ পরা মোটাসোটা একজন মহিলা স্টেজে গিয়ে মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়াল, মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল, “আমার ছোট বন্ধুরা, এক্ষুনি তোমাদের প্রিয় অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যাবে। আমি কাতিমুন নাহার, এই সাহিত্য প্রতিযোগিতা কমিটির সাধারণ সম্পাদক।” টুনি গলা নামিয়ে ফিসফিস করে মিলাকে বলল, “এই মহিলাটাই তোকে সেই খারাপ চিঠিটা লিখেছিল।” মিলা মাথা নাড়ল, বলল, “হুঁ।” “ঝুমু খালা বলেছিল মহিলাটা মোটা হবে। আসলেই মোটা, দেখেছিস?” “ঝুমু খালা কে?” “আমাদের বাসায় থাকে। সবাইকে দেখে-শুনে রাখে। খুব বুদ্ধিমতী।” “তোমার থেকেও বুদ্ধিমতী।” “আমার আর কী বুদ্ধি! ঝুমু খালার বুদ্ধি দেখলে তুই ট্যারা হয়ে যাবি।” টুনি স্টেজে কাতিমুন নাহারকে দেখতে দেখতে বলল, “এত বড় একটা অনুষ্ঠান আর এই মহিলা সালোয়ার-কামিজ পরে চলে এসেছে। তার শাড়ি পরে আসা উচিত ছিল।” মিলা বলল, “শাড়ি পরলে সবাইকে কী সুন্দর লাগে, তাই না টুনি আপু?” “হ্যাঁ। আমি যখন বড় হব তখন সবসময় শাড়ি পরব।” মিলা বলল, “আমিও।” স্টেজে ততক্ষণে অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেছে। গুরুত্বপূর্ণ চেহারার মানুষটার সাথে আরো কয়েকজন মানুষ স্টেজে গিয়ে বসেছে। কাতিমুন নাহার কিছুক্ষণ কথা বলল, অন্যেরাও কিছুক্ষণ কথা বলল। বড় মানুষেরা এত বেদরকারি কথা বলতে পারে যে, দেখে টুনি অবাক হয়ে যায়। সে যখন বড় হবে তখন সে মরে গেলেও স্টেজে উঠে বক্তৃতা দেবে না। জীবনেও একটা বেদরকারি কথা বলবে না। শেষ পর্যন্ত বক্তৃতা শেষ হলো। তারপর পুরস্কার বিতরণ শুরু হলো। প্রথমে প্রাইমারি, ছোট ছোট বাচ্চাগুলো স্টেজে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ চেহারার বয়স্ক মানুষটার কাছ থেকে মেডেল আর পুরস্কার নিল। তারপর মাইকের সামনে গিয়ে নিজেদের লেখা, গল্প, কবিতা আর প্রবন্ধ থেকে একটুখানি পড়ে শোনাল, তারপর স্টেজ থেকে নেমে গেল। এরপর জুনিয়র গ্রুপ, টুনির বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ড জেট প্লেনের ইঞ্জিনের মতো শব্দ করতে লাগল। প্রথমে গল্পের জন্য পুরস্কার দেয়া হলো, তারপর কবিতা। টুনি শুনতে পেল জুনিয়র গ্রুপে কবিতা প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হিসেবে তাকে স্টেজে ডাকা হয়েছে। টুনি স্টেজের দিকে রওনা দিল, মনে হচ্ছে সে মাথা ঘুরে পড়ে যাবে, তার মুখ থেকে রীতিমতো গরম ভাপ বের হতে লাগল। সে কি পারবে অনেক যত্নে করে তৈরি করা নাটকটা ঠিকমতো মঞ্চস্থ করতে? টুনি অনেকটা আচ্ছন্নের মতো স্টেজে হাজির হলো, গুরুত্বপূর্ণ চেহারার মানুষটা তার গলায় মেডেল ঝুলিয়ে দিল, হাতে সার্টিফিকেট আর বই। কাতিমুন নাহার তখন টুনির হাতে মিলার লেখা কবিতাটা দিয়ে তাকে সেটা পড়ে শোনাতে বলল। টুনি এক হাতে কবিতাটা নিয়ে মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ায়, কবিতাটা পড়ার ভঙ্গি করে হঠাৎ করে থেমে গেল, তারপর এদিক-সেদিক তাকাল, তারপর মাইকে বলল, “কিছু একটা ভুল হয়েছে।” কাতিমুন নাহার এগিয়ে এলো, বলল, “কী ভুল?” “এই কবিতাটা আমার লেখা না।” “তাহলে কার লেখা?” “আমাদের স্কুলের আরেকটা মেয়ে। আমরা দুইজন একসাথে খামের ভিতর কবিতা ঢুকাচ্ছিলাম তখন ভুল করে তার কবিতাটা আমার খামে ঢুকে গেছে।” টুনি হঠাৎ করে টের পেল তার ভেতরে এতক্ষণ যে একটা ভয় কাজ করছিল হঠাৎ করে সেই ভয়টা কেটে গেছে। সামনে হলভর্তি মানুষ তার দিকে তাকিয়ে আছে, তবুও সে আর নার্ভাস না। টুনি খুব শান্তভাবে তার গলা থেকে মেডেলটা খুলে কাতিমুন নাহারের দিকে এগিয়ে দিল। বলল, “এই কবিতাটা যে লিখেছে তাকে এই পুরস্কারটা দেন।” কাতিমুন নাহার যথেষ্ট বিরক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর বলল, “তোমাদের যন্ত্রণায় আর পারা গেল না। একজনের কবিতা আরেকজনের নামে চালিয়ে দিচ্ছ?” টুনি গলা উঁচু করে বলল, “আমি মোটেই আরেকজনের কবিতা নিজের নামে চালিয়ে দিচ্ছি না, আমি মেডেলটা ফেরত দিয়েছি। আসলে যার পুরস্কার পাওয়ার কথা তাকে পুরস্কারটা দেন।” “সে কি আছে এখানে?” টুনি মাথা নাড়ল, বলল, “আছে।” মোটাসোটা কাতিমুন নাহার তখন স্টেজে বসে থাকা মানুষদের সাথে কথা বলল, তারপর ফিরে এসে মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “আমাদের ছোট একটা গোলমাল হয়েছে। একজনের কবিতার জন্যে ভুলে আরেকজনকে পুরস্কার দিয়ে দেয়া হচ্ছিল। আমরা এখন অপূর্ব একটা কবিতা লেখার জন্যে সত্যিকার চ্যাম্পিয়নকে পুরস্কার নেয়ার জন্যে তাকে স্টেজে আসতে বলছি।” তারপর কাতিমুন নাহার টুনিকে জিজ্ঞেস করল, “কী নাম?” “আমি বলি।” বলে টুনি কাতিমুন নাহারকে প্রায় ঠেলে মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “মেহজাবিন আরা মিলা। স্টেজে চলে আয়।” মিলার নাম শুনে কাতিমুন নাহারের নাদুসনুদুস দেহ ইলেকট্রিক শক খাওয়ার মতো চমকে উঠল, কিছু একটা বলার চেষ্টা করল কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। সবাই অবাক হয়ে দেখল পাঁচ-ছয় বছরের ছোট একটা মেয়ে আস্তে আস্তে পা ফেলে স্টেজের দিকে এগিয়ে আসছে। প্রথমে হলভর্তি মানুষ নিঃশব্দ হয়ে গেল, তারপর ফিসফিস করে কথা বলতে লাগল, তারপর একজন হাততালি দিল। তখন সবাই মিলে একসাথে হাততালি দিতে লাগল। মিলা স্টেজে ওঠার পর চেয়ারে বসে থাকা মানুষেরা অবাক হয়ে একজন আরেকজনের দিকে তাকাল। গুরুত্বপূর্ণ চেহারার মানুষটি চোখ বড় বড় করে মিলাকে বললেন, “তুমি এই কবিতাটি লিখেছ?” মিলা কোনো কথা না বলে মাথা নাড়ল। মানুষটা বলল, “কী আশ্চর্য! এসো, আমার কাছ থেকে পুরস্কার নিয়ে যাও।” মিলা মাথা নাড়ল, বলল, “না, আমি পুরস্কার নিব না।” তারপর পকেটে হাত ঢুকিয়ে তার কাছে লেখা চিঠিটা বের করে গুরুত্বপূর্ণ চেহারার মানুষটার হাতে দিয়ে বলল, “আমি একটা কবিতা পাঠিয়েছিলাম, সেটা পেয়ে নতুন পৃথিবী আমাকে এই চিঠি পাঠিয়েছে।” গুরুত্বপূর্ণ মানুষটা চিঠিটা পড়ে মাথা নাড়তে থাকেন। মিলা বলল, “বড় বড় মানুষেরা যখন আমাদের মতো ছোট মানুষের কাছে এ রকম চিঠি লিখে তাহলে আমাদের খুব মন খারাপ হয়।” কাতিমুন নাহার এগিয়ে এসে বলল, “আসলে হয়েছে কী, আমি, মানে মিলা কাতিমুন নাহারের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি যদি কবিতা লিখতে পারি সেটা আমার দোষ?” গুরুত্বপূর্ণ মানুষটা বলল, “উই আর ভেরি সরি। এসো তুমি এখন তোমার পুরস্কারটা নিয়ে যাও। তুমি কাছে এসো, তোমার গলায় মেডেলটা পরিয়ে দিই।” মিলা মাথা নাড়ল, বলল, “না। যে বড় মানুষেরা আমার মতো ছোট মানুষের মনে কষ্ট দেয় আমি তাদের কাছ থেকে পুরস্কার নিব না।” তারপর টুনির হাত ধরে বলল, “চলো টুনি আপু, আমরা যাই।” টুনি বলল, “চল।” তারপর টুনি মিলার হাত ধরে স্টেজ থেকে নেমে এলো। পুরো হলের মানুষ নিঃশব্দে তাদের দিকে তাকিয়ে রইল। মিলা টুনির দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “পুরস্কার থেকে বেশি আনন্দ প্রতিশোধে! তাই না টুনি আপু?” টুনি মাথা নাড়ল। বলল, “ঠিক বলেছিস।” হল ঘর থেকে বের হওয়ার আগেই শুনতে পেল ভেতরে প্রচণ্ড হই-হল্লা শুরু হয়েছে। আর কী আশ্চর্য এর মাঝে একজন চিৎকার করে বলছে, “আমার কাছে এই নাদুসনুদুস মহিলার রেকর্ডিং আছে, শুনে দেখেন সে বাচ্চাদের সম্পর্কে কী কথা বলে। শুনে দেখেন–” গলার স্বরটা শান্তর। কী আশ্চর্য। শান্ত এখানে কীভাবে এসেছে? কখন এসেছে? টুনি আর মিলা তাড়াতাড়ি হেঁটে যেতে থাকে। তারা পিছন দিকে তাকায় না, কারণ তাদের মনে হয় কয়েকজন ক্যামেরাম্যান ক্যামেরা নিয়ে তাদের কাছে ছুটে আসছে!


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ১০৭ জন


এ জাতীয় গল্প

→ তবুও টুনটুনি ও তবুও ছোটাচ্চু (৬)(শেষ পর্ব)
→ তবুও টুনটুনি ও তবুও ছোটাচ্চু (৫)
→ তবুও টুনটুনি ও তবুও ছোটাচ্চু (৪)
→ তবুও টুনটুনি ও তবুও ছোটাচ্চু (৩)
→ তবুও টুনটুনি ও তবুও ছোটাচ্চু (২)

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ...