বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন

বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা

আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

অপরাজিত (২১)

"উপন্যাস" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান TARiN (৩৩০ পয়েন্ট)



X কাজল বড়ো হইয়া উঠিয়াছে, আজকাল গ্রামের সীতানাথ পণ্ডিত সকালে একবেলা করিয়া পড়াইয়া যান, কিন্তু একটু ঘুমকাতুরে বলিয়া সন্ধ্যার পর বদমাশের অনেক বকুনি সত্ত্বেও সে পড়িতে পারে না, চোখের পাতা যেন জুড়াইয়া আসে, অনেক সময় যেখানে-সেখানে ঘুমাইয়া পড়ে-রাত্রে কেহ যদি ডাকিয়া খাওয়ায়, তবেই খাওয়া হয়। তা ছাড়া, বেশি রাত্রে খাইতে হইলে দাদামশায়ের সঙ্গে বসিয়া খাইতে হয়—সে এক বিপদ। দাদামশায়ের সহিত পারতপক্ষে কাজল খাইতে বসিতে চাহে না। বড়ো ভাত ফেলে, ছড়ায় গুছাইয়া খাইতে জানে না বলিয়া দাদামশায় তাকে খাইতে বসিয়া সহবৎ শিক্ষা দেন। কাজল আলুভাতে দিয়া শুকনা ভাত খাইতেছে—দাদামশায় হাঁকিয়া বলিলেন—ডাল দিয়ে মাখো–শুধু ভাত খাচ্ছ কেন?-মাখো-মেখে খাও– তাড়াতাড়ি কম্পিত ও আনাড়ি হাতে ডাল মাখিতে গিয়া থালার কানা ছাড়াইয়া কিছু ডালমাখা ভাত মাটিতে পড়িয়া গেল। দাদামশায় ধমক দিয়া উঠিলেন—পড়ে গেল, পড়ে গেল—আঃ, ছোঁড়া ভাতটা পর্যন্ত যদি গুছিয়ে খেতে জানে!–তো তো-খুঁটে খুঁটে তোল– কাজল ভয়ে ভয়ে মাটি-মাখা ভাতগুলি থালার পাশ হইতে আবার থালায় তুলিয়া লইল। –বেগুন পটোল ফেলেছিস কেন?-ও খাবার জিনিস না?—সব একসঙ্গে মেখে নে– খানিকটা পরে তাহার দৃষ্টি পড়িল, কাজল উচ্ছেভাজা খায় নাই–তখন অম্বল দিয়া খাওয়া হইয়া গিয়াছে—তিনি বলিলেন—উচ্ছেভাজা খানি?–খাও-ও অম্বলমাখা ভাত ঠেলে রাখো। উচ্ছেভাজা তেতো বলিয়া কাজলের মুখে ভালো লাগে না—সে তাতে হাতও দেয় নাই। দাদামশায়ের ভয়ে অম্বলমাখা ভাত ঠেলিয়া রাখিয়া তিক্ত উচ্ছেভাজা একটি একটি কবিয়া খাইতে হইল—একখানি ফেলিবার জো নাই—দাদামশাযের সতর্ক দৃষ্টি। ভাত খাইবে কি কান্নায় কাজলের গলায় ভাতের দলা আটকাইয়া যায়। খাওয়া হইয়া গেলে মেজ মামিমার কাছে গিয়া বলিয়া কহিয়া একটা পান লয়-পান খুলিয়া দেখে কি কি মশলা আছে, পরে মিনতিব সুরে একবার মেজ মামিমার কাছে একবার ছোট মামিমার কাছে বলিয়া বেড়ায় ইতি একটু কাং, ও মামিমা তোমার পায়ে পড়ি। একটু কাৎ দাও না। কাঠ অর্থাৎ দাবৃচিনি। মামিমারা ঝংকাব দিয়া বলেন—রোজ রোজ ডালচিনি চাই—ছেলে আবার শৌখিন কত!…উঃ, তা আবার জিব দেখা চাই—মুখ রাঙা হল কিনা তবে পড়াশুনার আগ্রহ তাহার বেশি ছাড়া কম নয়। বিশ্বেশ্বর মুহুরির হাতবাক্সে কেশবঞ্জনেব উপহারের দরুন গল্পের বই আছে অনেকগুলি। খুনী আসামী কেমন করিয়া ধবা পড়িল, সেই সব গল্প। আর পড়িতে ইচ্ছা করে আরব্য উপন্যাস, কি ছবি! কি গল্প! দাদামশায়ের বিছানার উপর একদিন পড়িয়া ছিল—সে উলটাইয়া দেখিতেছে, টের পাইয়া বিশ্বেশ্বর মুহুরি কাড়িয়া লইযা বলিল, এ, আট বছরের ছেলের আবার নভেল পড়া? এইবার একদিন তোমার দাদামশায় শুনতে পেলে দেখো কি করবে! কিন্তু বইখানা কোথায় আছে সে জানে-দোতলার শোবার ঘবেব সেই কাঁটাল কাঠের সিন্দুকটার মধ্যে একবার যদি চাবিটা পাওয়া যাইত! সারারাত জাগিয়া পড়িয়া ভোরের আগেই তাহা হইলে তুলিয়া রাখে। এ কয়েকদিন বৈকালে দাদামশায় বসিয়া বসিয়া তামাক খান, আর সে পণ্ডিতমশায়ের কাছে বসিয়া বসিয়া পড়ে। সেই সময় পণ্ডিতমশায়ের পেছনকার অর্থাৎ চণ্ডীমণ্ডপের উত্তর-ধারের সমস্ত ফাঁকা জায়গাটা অদ্ভুত ঘটনার রঙ্গভূমিতে পরিণত হয়, ঘটনাটাও হয়তো খুব স্পষ্ট নয়, সে ঠিক বুঝাইয়া বলিতে তো পারে না। কিন্তু দিদিমার মুখে শোনা নানা গল্পের রাজপুত্র ও পাত্রের পুত্রেরা নাম-না-জানা নদীর ধারে ঠিক এই সন্ধ্যাবেলাটাতেই পৌঁছায়–কোন রাজপুরীকে কাঁপাই রাজকন্যাদের সোনার রথ বৈকালের আকাশপানে উঠিয়া অদৃশ্য হইয়া যায়—সে অন্যমনস্ক হইয়া দেওয়ালের পাশে ঝুঁকিয়া আকাশটার দিকে চাহিয়া থাকে, কেমন যেন দুঃখ হয় ঠিক সেই সময় সীতানাথ পণ্ডিত বলেন-দেখুন, দেখুন, বাঁড়ুয্যেমশায়, আপনার নাতির কাণ্ডটা দেখুন, স্লেটে বুড়কে লিখতে দিলাম, তা গেল চুলোয়-হাঁ করে তাকিয়ে কি দেখছে দেখুন—এমন অমনোযোগী ছেলে যদি– দাদামশায় বলেন—দিন না ধাঁ করে এক থাপ্পড় বসিয়ে গালে হতভাগা ছেলে কোথাকার হাড় জ্বালিয়েছে, বাবা করবে না খোজ, আমার ঘাড়ে এ বয়সে যত ঝুঁকি। তবে কাজল যে দুষ্ট হইয়া উঠিয়াছে, এ কথা সবাই বলে। একদণ্ড সুস্থির নয়, সর্বদা চঞ্চল, একদণ্ড চুপ কবিয়া থাকে না, সর্বদা বকিতেছে। পণ্ডিতমশায় বলেন-দেখ তো দলু কেমন অঙ্ক কষে? ওর মধ্যে অনেক জিনিস আছে—আর তুই অঙ্কে একেবারে গাধা। পণ্ডিত পিছন ফিরিতেই কাজল মামাতোভাই দলুকে আঙুল দিয়া ঠেলিয়া চুপি চুপি বলে, তো-তোর মধ্যে অনেক জিনিস আছে, কি জিনিস আছে রে, ভাত ডাল খি-খিচুড়ি, খিচুড়ি? হি হি ইল্লি! খিচুড়ি খাবি, দলু? দাদামশায়ের কাছে আবার নালিশ হয়। তখন দাদামশায় ডাকি শাস্তি স্বরূপ বানান জিজ্ঞাসা করিতে আরম্ভ করেন—বানান কর সূর্য। কাজল বানানটা জানে, কিন্তু ভয়জনিত উত্তেজনার দরুন হঠাৎ তাহার তোতলামিটা বেশি করিয়া দেখা দেয়দু-একবার চেষ্টা করিয়াও দন্ত স্য কথাটা কিছুতেই উচ্চারণ করিতে পারিবে না বুঝিয়া অবশেষে বিপন্নমুখে বলে—তা-তালব্য শয়ে দীঘ্য-উকার ঠাস্ করিয়া এক চড় গালে। ফরসা গাল, তখনই দালিমের মতো রাঙা হইয়া ওঠে, কান পর্যন্ত রাঙা হইয়া যায়। কাজলের ভয় হয় না, একটা নিল অভিমান হয়-বাঃ রে, বানানটা তো সে জানে, কিন্তু মুখে যে আটকাইয়া যায় তা তার দোষ কিসের? কিন্তু মুখে অত কথা বলি বুঝাইয়া প্রতিবাদ বা আত্মপক্ষ সমর্থন কবিবার মতো এতটা জ্ঞান তাহার হয় নাই—সবটা মিলিয়া অভিমানের মাত্রাটাই বাড়াইয়া তোলে। কিন্তু অভিমানটা কাহাব উপব সে নিজেও ভালো বোঝ না। এই সময়ে কাজলের জীবনে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটিল। সীতানাথ পণ্ডিতমহাশয় একটু-আধটু জ্যোতিষের চর্চা কবিতেন। কাজলের পড়িবার সময় তাহার দাদামশায়ের সঙ্গে সীতানাথ পণ্ডিত সে সম্বন্ধে আলোচনা করিতেন—পাঁজি দেখিযা ঠিকুজি তৈয়ারি, জন্মের লগ্ন ও যোগ গণনা, আয়ুষ্কাল নির্ণয় ইত্যাদি। আজ বছরখানেক ধরিয়া কাজল প্রায়ই এসব শুনিয়া আসিতেছে—যদিও সেখানে সে কোন কথা বলে না। কার্তিক মাসের শেষ, শত তখনও ভালো পড়ে নাই। বাড়ির চারিপাশে অনেক খেজুরবাগান, শিউলিরা কার্তিকের শেষে গাছ কাটিয়াছে। শীতের ঠাণ্ডা সান্ধ্য বাতাসে টাটকা খেজুর রসের গন্ধ মাখানো থাকে। কাজলদেব পাড়ার ব্রহ্মঠাকরুন এই সময় কি রোগে পড়িলেন। ব্রহ্মঠাকরুনের বয়স কত তা নির্ণয় করা কঠিন-মুড়ি ভাজিয়া বিক্রয় করিতেন, পতি-পুত্র কেহই ছিল না—কাজল অনেকবার মুড়ি কিনিতে গিয়াছে তাহার বাড়ি। অত্যন্ত খিটখিটে মেজাজের লোক, বিশেষ করিয়া ছেলেপিলেদের দু-চক্ষু পড়িয়া দেখিতে পারিতেন না—দূর দূর করিতেন, উঠানে পা দিলে পাছে গাছটা ভাঙে, উঠানটা খুঁড়িয়া ফেলে—এই ছিল তাহার ভয়। কাজলকে বাড়ির কাছাকাছি ঐেখিলে বলিতেন—একটা যেন মগ-মগ একটা–বাড়ি যা বাপু-কঞ্চি-টঞ্চির খোঁচা মেরে বসৰি-মা বাপু এখান থেকে। ঝালের চারাগুলো মাড়াস নে সেদিন দুপুরের পর তাহার মামাতো-বোন অরু বলিল—বেহ্ম-ঠাকুমা মরমর হয়েছে, সবাই দেখতে যাচ্ছে—যাবি কাজল? ছোট্ট একতলা বাড়ির ঘর, পাড়ার অনেকে দেখিতে আসিয়াছে-মেজেতে বিছানা পাতা, কাজল ও অরু দোরের কাছে দাঁড়াইয়া উকি মারিয়া দেখিল। ব্রহ্মঠাকরুনকে আর চেনা যায় না, মুখের চেহারা যেমন শীর্ণ তেমনি ভয়ঙ্কর, চক্ষু কোটরগত, তাহার ছোটমামা কাছে বসিয়া আছে, হাবু কবিরাজ দাওয়ায় বসিয়া লোকজনের সঙ্গে কি কথা বলিতেছে। বৈকালে দু-তিনবার শোনা গেল ব্ৰহ্মঠাকরুনের রাত্রি কাটে কিনা সন্দেহ। কাজল কিছু বিস্মিত হইল। এমন দোর্দণ্ডপ্রতাপ ব্ৰহ্মঠাকরুন, যাঁহাকে গামছা পরিয়া উঠানে গগাবরজল ছিটাইতে দেখিয়া সে তখনই ভাবিত—তাহার দাদামশায়ের মতো লোক পর্যন্ত যাঁহাকে মানিয়া চলে—তাহার এ কি দশা হইয়াছে আজ!…এত অসহায়, এত দুর্বল তাহাকে কিসে করিয়া ফেলিল?… ব্ৰহ্মঠাকরুন সন্ধ্যার আগে মারা গেলেন। কাজলের মনে হইল পাড়াময় একটা নিস্তব্ধতা কেমন একটা অবোধ্য বিভীষিকার ছায়া যেন সারা পাড়াকে অন্ধকারের মতো গ্রাস করিতে আসিতেছে…সকলেরই মুখে যেন একটা ভয়ের ভাব। শীতের সন্ধ্যা ঘনাইয়াছে। পাড়ার সকলে ব্ৰহ্মঠাকরুনের সৎকারের ব্যবস্থা করিতে তাহার বাড়ির উঠানে সমবেত হইয়াছে। কাজলের দাদামশায়ও গিয়াছেন। কাজল ভয়ে ভয়ে খানিকটা দূরে অগ্রসর হইয়া দেখিতে গেল—কিন্তু ব্রহ্মঠাকরুনের বাড়ি পর্যন্ত যাইতে পারিল না—কিছু দূরে একটা বাঁশঝাড়ের নিচে দাঁড়াইয়া রহিল। সেখান হইতে উঠানটা বা বাড়িটা দেখা যায় না—কথাবার্তার শব্দও কানে আসে না। বাতাস লাগিয়া বাঁশঝাড়ের কঞ্চিতে কঞ্চিতে শব্দ হইতেছে–চারি ধার নির্জন…কাজলের বুক দুরুদুরু করিতেছিল…একটা অদ্ভুত ধরনের ভাবে তাহার মন পূর্ণ হইল—ভয় নয়, একটা বিস্ময়-মাখানো রহস্যের ভাব…অন্ধকারে গা লুকাইয়া দু-একটা বাদুড় আকাশ দিয়া উড়িয়া চলিয়াছে, অন্যদিন এমন সময়ে বাদুড় দেখিলেই কাজল বলিয়া উঠে—বাদুড় বাদুড় মেথর, যা খাবি তা তেঁতর। আজ উড়নশীল বাদুড়ের দৃশ্য তাহার মনে কৌতুক না জাগাইয়া সেই অজানা রহস্যের ভাবই যেন ঘনীভূত করিয়া তুলিল। ব্ৰহ্মঠাকরুন মারা গেলেন বটে কিন্তু মৃত্যুকে কাজল এই প্রথম চিনিল। দিদিমা মারা গিয়াছিলেন কাজলের পাঁচবছর বয়সে তাহাও গভীর রাত্রে, কাজল তখন ঘুমাইয়া ছিল—কিছু দেখে নাই—বোঝেও নাই, এবার মৃত্যুর বিভীষিকা, এই অপূর্ব রহস্য তাহর শিশু-মনকে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিল। একা একা বেড়ায়, তেমন সঙ্গী-সেজুড় নাই—আর ওই সব কথা ভাবে। একদিন তাহার মনে হইল যদি সেও ব্রহ্মঠাকরুনের মতো মরিয়া যায়!…হাত-পায়ে যেন সে বল হারাইয়া ফেলিল,—সত্য, সে-ও হয়তো মারা যাইবে!…। দিনের পর দিন ভয়টা বাড়িতে লাগিল। একলা শুইয়া শুইয়া কথাটা ভাবে-নদীর বাঁধা ঘাটের পৈঠায় সন্ধ্যার সময় বসিয়া ওই কথাই মনে ওঠে।…এই বড়দলের তীরে দিদিমার মতো, ব্রহ্মঠাকরুনের মতো তার দেহও একদিন পুড়াইতে কথাটা ভাবিতেই ভয়ে সর্বশরীর যেন অবশ হইয়া আসে… কাজল তাহার জন্মের সালটা জানিত; কিছুদিন আগে তাহার দাদামশায় সীতানাথ পণ্ডিতের কাছে কাজলের ঠিকুজি করাইয়াছিলেন—সে সে-সময় সেখানে ছিল। কিন্তু তাবিখটা জানে না তবে মাঘ মাসের শেষের দিকে, তা জানে। একদিন সে দুপুরে চুপি চুপি কাছারি ঘরে ঢুকিল। তাকের উপরে রাশীকৃত পুরানো পাঁজি সাজানো থাকে। চুপি চুপি সবগুলি নামাইয়া ১৩৩০ সালের পাঁজিখানা বাছিয়া লইয়া মাঘ মাসের শেষের দিকের তারিখগুলা দেখিতে লাগিল–কি সে বুঝিল সেই জানে—তাহার মনে হইল ২৫শে মাঘ বড়ো খারাপ দিন। ওই দিন জমিলে আয়ু কম হয়, খুব কম। তাহার প্রাণ উড়িয়া গেল—ওই দিমটাতেই হয়তো সে জন্মিয়াছে।…ঠিক। বড়ো মামিকে বৈকালে জিজ্ঞাসা করিল–আমি জন্মেছি কত তারিখে মামিমা?…বড়ো মামিমার তো তাহা ভাবিয়া ঘুম নাই! তিনি জানেন না। বড়ো মামাতো ভাই পটলকে জিজ্ঞাসা করিল–আমি কবে জমেছি জানিস পটলদা?…পটলের বয়স বছর দশেক, সে কি করিয়া জানিবে? দাদামশায়ের কাছে ঠিকুজি আছে, কিন্তু জিজ্ঞাসা করিতে ভরসা হয় না। একদিন সীতানাথ পণ্ডিতকে জিজ্ঞাসা করিল। তিনি বলিলেন-কেন, সে খোঁজে তোমার কি দরকার? সে থাকিতে না পারিয়া সোজাসুজি বলিয়াই ফেলিল–আ-আমি ক-কতদিন বাঁচব পণ্ডিতমশায়? সীতানাথ পণ্ডিত অবাক হইয়া তাহার মুখের দিকে চাহিয়া রহিলেন—এমন কথা কোন ছেলের মুখে কখনও তিনি শুনেন নাই। শশীনারায়ণ বাঁড়ুজ্যেকে ডাকিয়া কহিলেন-শুনেছেন ও বাঁড়ুজ্যেমশায়, আপনার নাতি কি বলছে? শশীনারায়ণ শুনিয়া বলিলেন–এদিকে তো বেশ ইচড়-পাকা? দু-মাসের মধ্যে আজও তো দ্বিতীয় নামতা রপ্ত হল না-বলল বাবো পোনেরং কত? কাজলের ভয়কে কেহই বুঝিল না। কাজল ধমক খাইল বটে, কিন্তু ভয় কি তাতে যায়। এক এক সময়ে তাহার মন হাঁপাইয়া ওঠেকাহাকেও বলিতে পারে না, বুঝাইতে পারে না…এখন সে কি করে? এখানে তাহার কথা কেহ শুনিবে না, রাখিবে না তাহা সে বোঝে। তাহার বাবাকে বলিতে পারিলে হয়তো উপায় হইত। বর্ষাকালের শেষের দিকে সে দু-একবার জ্বরে পড়ে। জ্বর আসিলে উপরের ঘরে একলাটি একটা কিছু টানিয়া গায়ে দিয়া,চুপ করিয়া শুইয়া থাকে। কাহারও পায়ের শব্দে মুখ তুলিয়া বলেও মামিমা, জ্বর হয়েছে আমার একটা লে-এ-এ-প বে-বের করে দাও না?—ইচ্ছা করে কেহ কাছে বসে, কিন্তু বাড়ির এত লোক সবাই নিজের নিজের কাজে ব্যস্ত। জ্বরের প্রথম দিকে কিন্তু চমৎকার লাগে, কেমন যেন একটা নেশা, সব কেমন অদ্ভুত লাগে। ওই জানালার গরাদটাতে একটা ডেওপিপড়ে বেড়াইতেছে, চুনেকালিতে মিশাইয়া জানালার কবটে একটা দাড়িওয়ালা মজার মুখ। জানালার বাহিরের নারিকেল গাছে নারিকেলসুদ্ধ একটা কাঁদি ভাঙিয়া ঝুলিয়া পড়িয়াছে। নিচে তাহার ছোট মামাতো বোন অরু, ভাত ভাত করিয়া চিৎকার শুরু করিয়াছে—বেশ লাগে। কিন্তু শেষের দিকে বড়ো কষ্ট, গা জ্বালা করে, হাত-পা ব্যথা করে, সারা শরীর ঝিম্ ঝিম্ করে, মাথা যেন ভার বোঝা, এ সময়টা কেহ কাছে আসিয়া যদি বসে! কাছারির উত্তর গায়ে পথের ধারে এক বুড়ির খাবারের দোকান, বারো মাস খুব সকালে উঠিয়া সে তেলেভাজা বেগুনি ফুলুরি ভাজে। কাজল তাহার বাঁধা খরিদ্দার। অনেকবার বকুনি খাইয়াও সে এ লোভ সামলাইতে সমর্থ হয় না। সারিবার দিনদুই পরেই কাজল সেখানে গিয়া হাজির। অনেকক্ষণ সে বসিয়া বসিয়া ফুলুরিভাজা দেখিল, পুইপাতার বেগুনি, জবাপাতার তিল পিটুলি। অবশেষে সে অপ্রতিভ মুখে বলে–আমায় পুঁইপাতার বেগুনি দাও না দিদিমা? দেবে? এই নাও পয়সা। বুড়ি দিতে চায় না, বলে—না খোকা দাদা, সেদিন জ্বর থেকে উঠেছ, তোমার বাড়ির লোকে শুনলে আমায় বকবে—কিন্তু কাজলের নিবন্ধাতিশয্যে অবশেষে দিতে হয়। একদিন বিশ্বেশ্বর মুহরির কাছে ধরা পড়িয়া যায়। বুড়ির দোকান হইতে বাহির হইয়া জবাপাতার তিল-পিটুলির ঠোঙা হাতে খাইতে খাইতে পুকুরপাড় পর্যন্ত গিয়াছে—বিশ্বেশ্বর আসিয়া ঠোঙাটি কাড়িয়া লইয়া ঘুড়িয়া ফেলিয়া দিয়া বলিল—আচ্ছা পাজি ছেলে তো? আবার ওই তেলেভাজা খাবারগুলো রোজ রোজ খাওয়া? কাজল বলিল—আমি খা-খা-খাচ্ছি তা তো-তোমার কি? বিশ্বেশ্বর মুহরি হঠাৎ আসিয়া তাহার কান ধরিয়া একটা ঝাকুনি দিয়া বলিল—আমার কি, বটে? রাগে অপমানে কাজলের মুখ রাঙা হইয়া গেল। ইহাদের হাতে মার খাওয়ার অভিজ্ঞতা  তাহার এই প্রথম। সে ছেলেমানুষি সুরে চিৎকার করিয়া বলিল—মুখপুড়ি, হতচ্ছাড়া তু-তুমি মারলে কেন? বিশ্বেশ্বর তাহার গালে জোরে এক চড় বসাইয়া দিয়া বলিল—আমি কেন, এসো তো কর্তার কাছে একবার–এসো। কাজল পাগলের মতো যা-তা বলিয়া গালি দিতে লাগিল। চড়ের চোটে তখন তাহার কান মাথা ঝাঝা করিতেছে, এবং বোধ হয় এ অপমানের কোনও প্রতিকার এখানকার কাহারও নিকট হইতে হইবার আশা নাই, মুহূর্ত মধ্যে ঠাওরাইয়া বুঝিয়া চিৎকার করিয়া বলিল—আমার বা-বাবা আসুক, বলে দেব, দেখো~-দেখো তখন– বিশ্বেশ্বর হাসিয়া বলিল—আচ্ছা যাও, তোমার বাবার ভয়ে আমি একেবারে গর্তের মধ্যে যাব আর কি? আজ পাঁচ বছরের মধ্যে খোঁজ নিলে না, ভারি তো। হয়তো একথা বলিতে বিশ্বেশ্বর সাহস করিত না, যদি সে না জানিত তাঁহার এ জামাইটির প্রতি কর্তার মনোভাব কিরূপ। কাজল রাগের মাথায় ও কতকটা পাছে বিশ্বেশ্বর দাদামশায়ের কাছে ধরিয়া লইয়া যায় সেই ভয়ে, পুকুরের দক্ষিণ পাড়ের নারিকেল বাগানের দিকে ছুটিয়া যাইতে যাইতে বলিতে লাগিল দেখো না, দেখো তুমি, বাবা আসুক না—পরে পিছন দিকে চাহিয়া খুব কড়া কথা শুনানো হইতেছে, এমন সুরে বলিল—তোমার পেটে খি-খিচুড়ি আছে, খি-খিচুড়ি খাবে—খিচুডি? নদীর বাঁধাঘাটে সেদিন সন্ধ্যাবেলা বসিয়া বসিয়া সে অনেকক্ষণ দিদিমার কথা ভাবিল। দিদিমা থাকিলে বিশ্বেশ্বর মুহুরি গায়ে হাত তুলিতে পারিত? সে জবাপাতার বেগুনি খায় তো ওর কি? ওই একটা নক্ষত্র খসিয়া পড়িল। দিদিমা বলিত নক্ষত্র খসিয়া পড়িলে সেই সময় পৃথিবীতে কেউ না কেউ জন্মায়। মরিয়া কি নক্ষত্র হয়? সে যদি মারা যায়, হয়তো অমনি আকাশের গায়ে নক্ষত্র হইয়া ফুটিয়া থাকিবে।   আরও মাস কয়েক পরে ভাদ্রমাসের শেষের দিকে। দাদামশায়ের বৈকালিক মিছবির পানা খাওযার শ্বেত পাথরে গেলাসটা তাহার বড়ো মামিমা মাজিয়া ধুইযা উপবের ঘরের বাসনের জলচৌকিতে রাখিতে তাহার হাতে দিল। সিঁড়িতে উঠিবার সময় কেমন করিয়া গেলাস হাত হইতে পড়িয়া চুরমার হইয়া গেল ভাঙিযা। কাজলের মুখ ভযে বিবর্ণ হইয়া গেল, তাহার ক্ষুদ্র হৃৎপিণ্ডের গতি যেন মিনিটখানেকের জন্য বন্ধ হইয়া গেল, যাঃ, সর্বনাশ! দাদামশায়ের মিছরিপানার গেলাসটা যে! সে দিশেহারা অবস্থায় টুকরাগুলো তাড়াতাড়ি খুঁটিয়া খুঁটিয়া তুলিল; পরে অন্য জায়গায় ফেলিলে পাছে কেহ টের পায়, তাই তাড়াতাড়ি আরব্য উপন্যাস যাহার মধ্যে আছে সেই বড়ো কাঠের সিন্দুকটার পিছনে গোপনে বাখিয়া দিল। এখন সে কি করে! কাল যখন গেলাসের খোজ পড়িবে বিকালবেলা, তখন সে কি জবাব দিবে? কাহারও কাছে কোন কথা বলিল না, বাকি দিনটুকু ভাবিয়া ভাবিয়া কিছু ঠিক করিতেও পারিল না; এক জায়গায় বসিতে পারে না, উদ্বিগ্ন মুখে ছটফট করিয়া বেড়ায়—ওই রকম একটা গেলাস আর কোথাও পাওয়া যায় না? একবার সে এক খেলুড়ে বন্ধুকে চুপি চুপি বলিল,–ভাইতো-তোদের বাড়ি একটা পাথরের গে-গেলাস আছে? কোথায় সে এখন পায় একটা শ্বেত পাথরের গেলাস? রাত্রে একবার তাহার মনে হইল সে বাড়ি ছাড়িয়া পলাইয়া যাইবে। কলিকাতা কোন দিকে? সে বাবার কাছে চলিয়া যাইবে কলিকাতায়–কাল বৈকালের পূর্বেই। কিন্তু রাত্রে পালানো হইল না। নানা দুঃস্বপ্ন দেখিয়া সে সকালে ঘুম ভাঙিয়া উঠিল, দুই-তিন বার কাঠের সিন্দুকটার পিছনে সন্তর্পণে উকি মারিয়া দেখিল, গেলাসের টুকরাগুলা সেখান হইতে কেহ বাহির করিয়াছে কিনা। বড়ো মামিমার সামনে আর যায় না, পাছে গেলাসটা কোথায় জিজ্ঞাসা করিয়া বসে। দুপুরের কিছু পর বাড়ির রাস্তা দিয়া কে একজন সাইকেল চড়িয়া যাইতেছে দেখিয়া সে নাট-মন্দিরের বেড়ার কাছে ছুটিয়া দেখিতে গেল কিন্তু সাইকেল দেখা তাহার হইল না, নদীর বাঁধাঘাটে একখানা কাহাদের ডিঙিনৌকা লাগিয়াছে, একজন ফরসা চেহারার লোক একটা ছড়ি ও ব্যাগ হাতে ডিঙি হইতে নামিয়া ঘাটের সিঁড়িতে পা দিয়া মাঝির সঙ্গে কথা কহিতেছে–কাজল অবাক হইয়া ভাবিতেছে, লোকটা কে, এমন সময় লোকা মাঝির সঙ্গে কথা শেষ করিয়া এদিকে মুখ ফিরাইল। সঙ্গে সঙ্গে কাজল অল্পক্ষণের জন্য চোখে যেন ধোয়া দেখিল, পরক্ষণেই সে নাটমন্দিরের বেড়া গলাইয়া বাহিরের নদীর ধারে রাস্তাটা বাহিয়া বাঁধাঘাটের দিকে ছুটিল। যদিও অনেক বছর পরে দেখা, তবুও কাজল চিনিয়াছে লোকটিকে—তাহার বাবা! অপু খুলনার স্টিমার ফেল করিয়াছিল। নতুবা সে কাল রাত্রেই এখানে পৌঁছিত। সে মাঝিদের জিজ্ঞাসা করিতেছিল, পরশু ভোরে নৌকা এখানে আনিয়া তাহাকে বরিশালের স্টিমার ধরাইয়া দিতে পারিবে কিনা। কথা শেষ করিয়াই ফিরিয়া চাহিয়া সে দেখিল একটি ছোট সুশ্রী বালক ঘাটের দিকে দৌড়িয়া আসিতেছে। পরক্ষণেই সে চিনিল। আজ সারা পথ নৌকায় সে ছেলের কথা ভাবিয়াছে, না জানি সে কত বড়ো হইয়াছে, কেমন দেখিতে হইয়াছে, তাহাকে ভুলিয়া গিয়াছে, না মনে রাখিয়াছে। ছেলের আগেকার চেহারা তাহার মনে ছিল না। এই সুন্দর বালকটিকে দেখিয়া সে যুগপৎ প্রীত ও বিস্মিত হইল—তাহার সেই তিন বছরের ছোট্ট খোকা এমন সুদর্শন লাবণ্যভরা বালকে পরিণত হইল কবে? সে হাসিমুখে বলিল—কি রে খোবা, চিনতে পারিস? কাজল ততক্ষণে আসিয়া অসীম নির্ভরতার সহিত তাহার কোমব জড়াইয়া ধরিয়াছে—ফুলের মতো মুখটি উঁচু করিয়া হাসি-ভরা চোখে বাবার মুখের দিকে চাহিয়া বলিল—না বই কি? আমি বেড়ার ধার থেকে দেখেই ছুট দিইছি—এতদিন আসনি কে-কেন? বাবা? একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটিল। এতদিন তো ভুলিযা ছিল, কিন্তু আজ এইমাত্র—হঠাৎ দেখিবামাত্রই—অপুর বুকের মধ্যে একটা গভীর স্নেহসমুদ্র উদ্বেল হইয়া উঠিল। কি আশ্চর্য, এই ক্ষুদ্র বালকটি তাহারই ছেলে, জগতে নিতান্ত অসহায় হাত-পা হারা, অবোধ-জগতে সে ছাড়া ওর আর কেউ তো নাই! কি করিয়া এতদিন সে ভুলিয়া ছিল! কাজল বলিল-ব্যাগে কি বাবা? —দেখবি? চ দেখাব এখন। তোর জন্য কেমন পিস্তল আছে, একসঙ্গে দুম দুম্ আওয়াজ হয়, ছবির বই আছে দুখানা। কেমন একটা রবারের বেলুন -তো-তো-তোমাকে একটা কথা বলব বাবা? তো-তোমার কাছে একটা পাথরের গে-গেলাস আছে? -পাথরের গেলাস? কেন রে, পাথরের গেলাস কি হবে? কাজল চুপি চুপি বাবাকে গেলাস ভাঙার কথা সব বলিল। বাবার কাছে কোন ভয় হয় না। অপু হাসিয়া ছেলের গায়ে হাত বুলাইয়া বলিল—আচ্ছা চ, কোনো ভয় নেই। সঙ্গে সঙ্গে কাজলের সব ভয়টা কাটিয়া গেল, একজন অসীম শক্তিধর বজ্ৰপাণি দেবতা যেন হঠাৎ বাহুদ্বয় মেলিয়া তাহাকে আশ্রয় ও অভয়দান করিয়াছে—মাভৈঃ। রাত্রে কাজল বলিল—আমি তোমার সঙ্গে যাব বাবা! অপুর অনিচ্ছা ছিল না, কিন্তু কলিকাতায় এখন নিজেই অচল। সে ভুলাইবার জন্য বলিল—আচ্ছা হবে, হবে। শোন্ একটা গল্প বলি খোকা। কাজল চুপ করিয়া গল্প শুনিল। বলিল—নিয়ে যাবে তো বাবা? এখানে সবাই বকে মারে বাবা! তুমি নিয়ে চল, তোমার কত কাজ করে দেব। অপু হাসিয়া বলে–কাজ করে দিবি? কি কাজ করে দিবি রে খোকা? তারপর সে ছেলেকে গল্প শোনায়—একবার চাহিমা দেখে, কখন সে ঘুমাইয়া পড়িয়াছে। খানিক রাত্রি পর্যন্ত সে একখানা বই পড়িল, পরে আলো নিভাইবার পূর্বে ছেলেকে ভালো করিয়া শোয়াইতে গেল। ঘুমন্ত অবস্থায় বালককে কি অদ্ভুত ধরনের অবোধ, অসহায়, দুর্বল পরাধীন মনে হইল অপুর! কি অসহায় ও পরাধীন। সে ভাবে, এই যে ছেলে, পৃথিবীতে এ তো কোথাও ছিল না যাচিয়াও তো আসে নাই–অপর্ণা ও সে, দুজনে যে উহাকে কোন অনন্ত হইতে সৃষ্টি করিয়াছে— তাহার পর সংসারে আসিয়া অবোধ নিষ্পাপ বালককে একা এভাবে সংসারে ছাড়িয়া দিয়া পালানো কি অপর্ণাই সহ্য করিবে? কিন্তু এখন কোথায়ই বা লইয়া যায়? প্রাচীন গ্রীসের এক সমাধির উপরে সেই যে স্মৃতিফলকটির কথা সে পড়িয়াছিল ফ্রেডরিক হ্যারিসনের বই-এ This child of ten years Philip, his father laid here His great hope, Nikoteles. সে দূর কালের হোট বালকটির সুন্দর মুখ, সুন্দর রং, দেব-শিশুর মতো সুন্দর দশ বৎসরের বালক নিকোটিলিসকে আজ রাত্রে সে যেন নির্জন প্রান্তরে খেলা করিতে দেখিতে পাইতেছে সোনালি চুল, ডাগর চোখ। তাহার স্নেহস্মৃতি গ্রীসের সে নির্জন প্রান্তবের সমাধিক্ষেত্রেব বুকে অমর হইয়া আছে! শত শতাব্দী পূর্বে সেই বিরহী পিতৃ-হৃদয়ের সঙ্গে সে যেন আজ নিজের নাড়ীব যোগ অনুভব করিল। মনে হইল, মানুষ সব কালে সব অবস্থায় এক, এক। কিংবা দেবতার মন্দির দ্বারে আরোগ্যকামী বহু যাত্রী জড়ো হইয়াছে নানা দিক দেশ হইতে, ছোট ছেলেটির গরিব বাবা তাহাকে আনিয়াছে…ছেলেটি অসুখে ভোগে, রুগণ, স্বপ্নে দেবতা আসিয়া বলিলেন–যদি তোমার লোগ সারিয়ে দিই, আমায় কি দেবে ইউফেনিস? উঃ, সত্যি! অসুখ সারিলে সে বাঁচে! ছেলেটি উৎসাহের সুরে বলিল-দশটা মার্বেল আমার আছে, সব কটাই দিয়ে দেব-দেবতা খুশির সুরে বলিলেন— স-ব ক-টা! বলো কি? বেশ বেশ, রোগ সারিয়ে দেব তোমার। বাৎসল্যরসের এমন গভীর অনুভূতি জীবনে তাহার এই প্রথম … অনেকদিন পরে উপরের ঘরটাতে শুইল। সেই তাহার ফুলশয্যার খাটটাতে। কাজল পাশেই ঘুমাইতেছে—কিন্তু কত রাত পর্যন্ত তাহার নিজের ঘুম আসিল না। জানালার বাহিরে চাহিয়া চাহিয়া কি ভাবিতে লাগিল। গত পাঁচ ছয় বৎসর বিদেশে সম্পূর্ণ অন্য ধরনের জীবনযাত্রা ও নবতর অনুভূতিরাজির ফলে পুরাতন দিনের অনেক অনুভূতিই অস্পষ্ট হইয়া গিয়াছে—এখানকার তো আরও, কারণ আট নয় বৎসর এখানকার জীবনের সঙ্গে কোনো প্রত্যক্ষ যোগ নাই। তাই আজ এই চিলেকোঠার বহু পরিচিত ঘবটা, এই পালঙ্কটা, ওই সুপারি বনের সারি—এসব যেন স্বপ্ন বলিযা মনে হইতেছে। ঠিক আবার পুরানো দিনের মতো জ্যোৎস্না উঠিয়াছে, ঠিক সেই সব দিনের মতো নাটমন্দির হইতে নৈশ কীর্তনের খোলব আওয়াজ আসিতেছে কিন্তু সে অপু নাই-বদলাইয়া গিয়াছে—বেমালুম বদলাইয়া গিয়াছে।   স্ত্রীর গহনা বেঁচিয়া বই ছাপাইয়া ফেলিল পূজার পরেই। কেবল হার ছড়াটা বেচিতে পারিল না। অপর্ণার অন্যান্য গহনার অপেক্ষা সে এই হার ছড়াটার সঙ্গে বেশি পরিচিত। তাই হারটা সামনে খুলিয়া খানিকক্ষণ ভাবিল, অপর্ণার সেই হাসি-হাসি মুখখানা যেন ঝাপসামতো মনে পড়ে—প্রথমটাতে হঠাৎ যেন খুব সুস্পষ্ট মনে আসে-আধ সেকেন্ড কি সিকি সেকেন্ড মাত্র সময়ের জন্য—তারপরেই ঝাপসা হইয়া যায়। ওই আধ সেকেন্ডের জন্য মনে হয়, সে-ই সেরকম ঘাড় বাঁকাইয়া মুখে হাসি টিপিয়া সামনে দাঁড়াইয়া আছে। ছাপানো বই-এর প্রথম কপিখানা দপ্তরির বাড়ি হইতে আনাইয়া দেখিয়া সে দুঃখ ভুলিয়া গেল। কিছু না, সব দুঃখ দূর হইবে। এই বই-এ সে নাম করিবে। আজ বিশ বৎসরের দুর জীবনের পার হইতে সে নিশ্চিন্দিপুরের পোড় ভিটাকে অভিনন্দন পাঠাইল মনে মনে। যেখানেই থাকি, ভুলি নি! যাহাদের বেদনার রঙে তাহার বইখানা রঙিন, কত স্থানে, কত অবস্থায় তাহাদের সঙ্গে পরিচয়, হয়তো কেউ বাঁচিয়া আছে, কেউ বা নাই। তাহারা আজ কোথায় সে জানে না, এই নিস্তব্ধ রাত্রির অন্ধকার শান্তির মধ্য দিয়া সে মনে মনে সকলকেই আজ তাহার ধন্যবাদ জানাইতেছে। মাসকয়েকের জন্য একটা ছোট অফিসে একটা চাকরি জুটিয়া গেল তাই রক্ষা। এক জায়গায় আবার ছেলে পড়ায়। এসব না করিলে খরচ চলে বা কিসে, বই-এর বিজ্ঞাপনের টাকাই বা আসে কোথা হইতে। আবার সেই সাড়ে নয়টার সময় আফিসে দৌড়, সেখান হইতে বাহির হইয়া একটা গলির মধ্যে একতলা বাসার ছোট্ট ঘরে দুটি ছেলে পড়ানো। বাড়ির কর্তার কিসের ব্যবসা আছে, এই ঘরে তাহাদের বড়ো বড়ো প্যাকবাক্স ছাদের কড়ি পর্যন্ত সাজানো। তাহারই মাঝখানে ছোট তক্তপোশ মাদুর পাতিয়া ছেলে-দুটি পড়ে-সন্ধ্যার পরে অপু যখনই পড়াইতে গিয়াছে, তখনই দেখিয়াছে কয়লার ধোঁয়ায় ঘরটা ভরা। শীতকাল কাটিয়া পুনরায় গ্রীষ্ম পড়িল। বই-এর অবস্থা খুব সুবিধা নয়, নিজে না খাইয়া বিজ্ঞাপনের খরচ জোগায়, তবু বই-এর কাটতি নাই! বইওয়ালারা উপদেশ দেয, এডিটারদের কাছে, কি বড়ো বড়ো সাহিত্যিকদের কাছে যান, একটু জোগাড়যন্ত্র করে ভালো সমালোচনা বার করুন, আপনাকে চেনে কে, বই কি হাওয়ায় কাটবে মশাই? অপু সে সব পারিবে না, নিজের লেখা বই বগলে করিয়া দোরে দোরে ঘুরিয়া বেড়ানো তাহার কম নয়। এতে বই কাটে ভালো, না কাটে সে কি করিবে? অতএব জীবন পুরাতন পরিচিত পথ ধরিয়াই বহিয়া চলিল—আপিস আর ছেলে পড়ানো। রাত্রে আর একটা নতুন বই লেখে। ও যেন একটা নেশা, বই বিক্রি হয়-না-হয়, কেউ পড়ে-না-পড়ে, তাহাকে যেন লিখিয়া যাইতেই হইবে। মেসে লেখার অত্যন্ত অসুবিধা হইতেছে দেখিয়া সে একটা ছোট একতলা বাড়ির নিচেকার একটা ঘর আট টাকায় ভাড়া লইয়া সেখানে উঠিয়া গেল। মেসের বাবুরা লোক বেশ ভালোই কিন্তু তাহাদের মানসিক ধাৱা যে পথ অবলম্বনে চলে অপুর পথ তা নয়—তাহাদের মূখতা, সংস্কার, সীমাবদ্ধতা ও সবরকমের মানসিক দৈন্য অপুকে পীড়া দেয়। খানিকক্ষণ মিষ্টালাপ হয়তো এঁদের সঙ্গে চলিতে পারে কিন্তু বেশিক্ষণ আড্ডা দেওয়া অসম্ভব—বরং কারখানার ননী মিস্ত্রি, কি চাপদানির বিশু স্যাকরার আড্ডার লোকজনকে ভালোই লাগিত–কারণ,তাহারা যে জগৎটাতে বাস করিতঅপুর ছে সেটা একেবারেই অপরিচিত—তাহাদের মোহ ছিল, সেই অজানা ও অপরিচয়ের মোহ, কাশীর কথক ঠাকুর কি অমরকন্টকের আজবলাল ঝা-কে যে কারণে ভালো লাগিয়াছিল। কিন্তু এঁরা সে ধরনের অনন্যসাধারণ নন, নিতান্তই সাধারণ ও নিতান্ত ক্ষুদ্র। কাজেই বেশিক্ষণ থাকিলেই হাঁপ ধরে-অপুর নতুন ঘরটাতে দরজা জানালা কম, দক্ষিণ দিকের ছোট জানালাটা খুলিলে পাশের বাড়ির ইট-বারকরা দেওয়ালটা দেখা যায় মাত্র। ভাবিল—তবুও তো একা থাকতে পারব—লেখাটা হবে। বাড়ি বদল করার দিনটা জিনিসপত্র সরাইতে ও ঘর গুছাইতে সন্ধ্যা হইয়া গেল। হাত-পা ধুইয়া ঠাণ্ডা হইয়া বসিল। আজ রবিবার ছেলে-পড়ানো নাই। বাপ! নিঃশ্বাস ফেলিয়া বাঁচিল। সেই অতটুকু ঘর, কয়লার ধোঁয়া আর রাজ্যের প্যাকবাক্সের টার্পিন তেলের মত গন্ধ। আজ কয়েক দিন হইল কাজলের চিঠি পাইয়াছে, এই প্রথম চিঠি, কাটাকুটি বানান ভুলে ভর্তি। আর একবার পত্ৰখানা বাহির করিয়া পড়িল-বার-পনেরো হইল এইবার লইয়া। বাবার জন্য তাহার মন কেমন করে, একবার যাইতে লিখিয়াছে, একখানা আরব্য উপন্যাস ও একটা লণ্ঠন লইয়া যাইতে লিখিয়াছে, যেন বেশি দেরি না হয়। অপু ভাবে, ছেলেটা পাগল, লণ্ঠন কি হবে? লণ্ঠন?…দ্যাখো তো কাণ্ড। উঠিয়া ঘরে আলো জুলিয়া ছেলের পত্রের জবাব লিখিল। সে আগামী শনিবার তাহাকে দেখিতে যাইতেছে। সোম ও মঙ্গলবার দুটি, ট্রেনে স্টিমারে বেজায় ভিড়। খুলনার স্টিমার এবারও ফেল করিল। শ্বশুরবাড়ি পৌঁছিতে বেলা দুপুর গড়াইয়া গেল। নৌকা হইতে দেখে কাজল ঘাটে হার অপেক্ষায় হাসিমুখে দাঁড়াইয়া-নৌকা থামিতে-নাথামিতে সে ছুটিয়া আসিয়া তাহাকে জড়াইয়া ধরিল। মুখ উঁচু করিয়া বলিল—বাবা, আমার আরব্য উপন্যাস?-অপু সেকথা একেবারেই ভুলিয়া গিয়াছে। কাজল কঁাদকঁদ সুরে বলিল-উ-বাবা, এত করে লিখলাম, তুমি ভুলে গেলে-লণ্ঠন? অপু বলিল,-আচ্ছা তুমি পাগল নাকি লণ্ঠন কি করবি?–কাজল বলিল, সে লণ্ঠন নয় বাবা!…হাতে ঝুলানো যায়, রাঙা কাচ, সবুজ কাচ বের করা যায় এমনি ধারা। ইউ, তুমি আমার কোন কথা শোনো না। একটা আরশি আনবে বাবা? –আরশি?-কি করবি আরশি? —আমি আরশিতে ছিয়া দেখবো—   অপর্ণার দিদি মনোরমা অনেকদিন পরে বাপের বাড়ি আসিয়াছেন। বেশ সুন্দরী, অনেকটা অপর্ণার মতো মুখ। ছোট ভগ্নীপতিকে পাইয়া খুব আহ্লাদিত হইলেন, স্বর্ণগত মা ও বোনের নাম করিয়া চোখের জল ফেলিলেন। অপু তাহার কাছে একটা সত্যকার স্নেহ-ভালোবাসা পাইল। সন্ধ্যাবেলা অপু বলিল—আসুন দিদি, ছাদের উপর বসে আপনার সঙ্গে একটু গল্প করি। ছাদ নির্জন, নদীর ধারেই, অনেকদূর পর্যন্ত দেখা যায়। অপু বলিল–আমার বিয়ের রাতের কথা মনে হয় মনোরমাদি? মনোরমা মৃদু হাসিয়া বলিলেন-সেও যেন এক স্বপ্ন। কোথা থেকে কি যেন সব হয়ে গেল ভাইএখন ভেবে দেখলে—সেদিন তাই এই ছাদের উপর বসে অনেকক্ষণ ধরে ভাবছিলুম-তোমাকেও তো আমি সেই বিয়ের পর আর কখনও দেখি নি। এবার এসেছিলাম ভাগ্যিস, তাই দেখাটা হল। হাসির ভঙ্গি ঠিক অপর্ণাব মতে, মুখের কত কি ভাব, ঠিক তাহারই মতো—বিস্মৃতির জগৎ হইতে সে-ই যেন আবার ফিরিয়া আসিয়াছে। মনোমা অনুযোগ করিয়া বলিলেন-তুমি তো দিদি বলে খোঁজও করো না ভাই। এবার পুজোর সময় বরিশালে যেয়ো–বলা রইল, মাথার দিব্যি। আর তোমার ঠিকানাটা আমায় লিখে দিয়ো তো। কোথা হইতে কাজল আসিয়া বলিল—বাবা একটা অর্থ জানো?… –অর্থ? কি অর্থ? কাজলের মুখ তাহার অপূর্ব সুন্দর মনে হয়-কেমন একধরনের ঘাড় একধারে বাঁকাইয়া চোখে খুশির হাসি হাসিয়া কথাটা শেষ কবে, আবার তখন বোকাব মতোই হাসে-হঠাৎ যেন মুখখানা করুণ ও অপ্রতিভ দেখায়। ঠিক এই সময়েই অপুর মনে ওই স্নেহের বেদনাটা দেখা দেয় কাজলের ওই ধরনের মুখভঙ্গিতে। –বলো দেখি, বাবা, এখান থেকে দিলাম সাড়া, সাড়া গেল সেই বামুনপাড়া? কি অর্থ? অপু ভাবিয়া ভাবিয়া বলিল-পাখি। কাজল ছেলেমানুষি হাসির খই ফুটাইয়া বলিল, ইল্লি! পাখি বুঝি? শাক তো—শাঁকের ডাক। তুমি কিছু জানো না বাবা। অপু বলিল—ছিঃ বাবা, ওরকম ইল্লি-টিল্লি বোলো না, বলতে নেই ও-কথা, ছিঃ। -কেন বলতে নেই বাবা?… -ও ভালো কথা নয়। আসিবার আগের দিন রাত্রে কাজল চুপি চুপি বলিল–এবার আমায় নিয়ে যাও বাবা, আমার এখানে থাকতে একটুও ভালো লাগে না। তঅপু ভাবিল–নিয়েই যাই এবারে, এখানে ওকে কেউ দেখে না, তাছাড়া লেখাপড়াও এখানে থাকলে যা হবে! পরদিন সকালে ছেলেকে লইয়া সে নৌকায় উঠিল। অপর্ণার তোরঙ্গ ও হাতবাক্সটা এখানে আট-নয় বৎসর পড়িয়া আছে, তাহার বড় শালী সঙ্গে দিয়া দিলেন। ইহাদের তুলিয়া দিতে আসিয়া ঘাটে দাঁড়াইয়া চোখের জল ফেলিলেন। অপুকে বার বার বরিশালে যাইতে অনুরোধ করিলেন। সকালের নবীন বোদ ভাঙা নাটমন্দিরের গায়ে পড়িয়াছে। নদীজল হইতে একটা আমিষ গন্ধ আসিতেছে। শশুর মহাশয়ের তামাক খাওয়ার কয়লা পোড়ানোর জন্য শুকনা ডালপালায় আগুন দেওয়া হইয়াছে নদীর ধারটাতেই। কুণ্ডলী পাকাইয়া ধোঁয়ার রাশ উপরে উঠিতেছে। সকালের বাতাসটা বেশ ঠাণ্ডা। আজ বহু বৎসর আগে যেদিন বন্ধু প্রণবের সঙ্গে বিবাহের নিমন্ত্রণে এ বাটী আসিয়াছিল তখন সে কি ভাবিয়াছিল এই বাড়িটার সহিত তাহার জীবনে এমন একটি অদ্ভুত যোগ সাধিত হইবে, আজও সেদিনটার কথা বেশ স্পষ্ট মনে হয়। মনে আছে, আগের দিন একটা গ্রামোফোনের দোকানে গান শুনিয়াছিল—বরিষ ধরা মাঝে শান্তির বারি। শুনিয়া গানটা মুখস্থ করিয়াছিল ও সারাপথে ও স্টিমারে আপন মনে গাহিয়াছিল। এখনও গুন্ গুন্ করিয়া গান গাহিলে সেই দিনটা আবার ফিরিয়া আসে।   ছেলেকে সঙ্গে লইয়া অপু প্রথমে মনসাপোতা আসিল। বছর ছয়-সাত এখানে আসা ঘটে নাই। এই সময়ে দিনকয়েকের ছুটি আছে, এইবার একবার না দেখিয়া গেলে আর আসা ঘটিবে না অনেকদিন। ঘরদোরের অবস্থা খুব খারাপ। অপুর মনে পড়িল, ঠিক এই রকম অপরিষ্কার ভাঙা ঘরে এই বালকের মাকে সে একদিন আনিয়া তুলিয়াছিল। তেলিদের বাড়ি হইতে চাবি আনিয়া ঘরের তালা খুলিয়া ফেলিল। খড় নানাস্থানে উড়িয়া পড়িয়াছে, ইঁদুরের গর্ত, পাড়ার গরু-বাছুর উঠিয়া দাওয়া ভাঙিয়া নষ্ট করিয়া ফেলিয়াছে, উঠানে বনজঙ্গল। কাজল চারদিকে চাহিয়া চাহিয়া অবাক হইয়া বলিল-বাবা, এইটে তোমাদের বাড়ি! অপু হাসিয়া বলিল-তোমাদের বাড়ি বাবা। মামার বাড়ির কোটা দেখেছ জন্মে অবধি, তাতে তো চলবে না, পৈতৃক সম্পত্তি তোমার এই। সকালে উঠিয়া একটি খবরে সে স্তম্ভিত হইয়া গেল। নিরুপমা আর নাই। সে গত পৌষ মাসে তীর্থ করিতে গিয়াছিল, পথে কলেরা হয়, সেখানেই মারা যায়। নিরুপমার জ্যাঠা বৃদ্ধ সরকার মহাশয় বলিতেছেন—আর দাদাঠাকুর, তমরা লেখাপড়া শিখে দেশে তো আর আসবে না? মেয়েটার কথা মনে হলে আর অন্ন মুখে ওঠে না। হল কি জানো, বললে কুড়লের পাটে মেলা দেখতে যাব। তার তো জানো পুজো-আচ্চা এক বাতিক ছিল। পাড়ার সবাই যাচ্ছে, আমি বলি, তা যাও। ওমা, তিন দিন পর সকালে খবর এলো নিরু-মা মো-মরো, শান্তিপুবের পথে একটা দোকানে—কি সমাচার, না কলেরা। গেলুম সবাই ছুটে। পৌছুতে সন্ধে হয়ে গেল। আমরা যখন গেলুম তখন বারোধ হয়ে গিয়েছে, চিনতে পারলে, চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগল। দাদাঠাকুরমা আমার পাড়াসুদ্ধ সবারই উপকার করে বেড়াত—তুমি সবই জানোআর অসুখ দেখে সেই পাড়ার লোকই…যারা সঙ্গে ছিল, পথের ধারের একটা দোচালা ভাঙা ঘরে মাকে আমার ফেলে সবাই পালিয়েছে। পাশের দোকানীটা লোক ভালো—সেই একটু দেখাশুনা করেছে। চিকিৎসে হয়নি, পত্তরও হয়নি, বেঘোরে নিরু-মাকে হারাম। সরকার বাড়ি হইতে ফিরিতে একটু বেলা হইয়া গেল। উঠানে পা দিয়া ডাকিল–ও খোক–কাজল দুপুরে ঘুমাইতেছিল, কখন ঘুম ভাঙিয়া উঠিয়াছে এবং তেলি-বাড়ি হইতে আঁকশি জোগাড় করিয়া আনিয়া উঠানের গাছের চাপা ফুল পাড়িবার জন্য নিচের একটা ডালে আঁকশি বাধাইয়া টানাটানি করিতেছে। দৃশ্যটা তাহার কাছে অদ্ভুত মনে হইল। অপর্ণার পোঁতা সেই চাপাফুল গাছটা। কবে তাহার ফুল ধরিয়াছে, কবে গাছটা মানুষ হইয়াছে, গত সাত বৎসরের মধ্যে অপুর সে খোঁজ লওয়ার অবকাশ ছিল না—কিন্তু কেমন করিয়া সে বলিল-খোকা ফুল পাড়ছিস তো, গাছটা কে পুঁতেছিল জানিস? কাজল বাবার দিকে চাহিয়া হাসিয়া বলিল—–তুমি এসো না বাবা, ওই ডালটা চেপে ধরো না। মোট দুটো পড়েছে। অপু বলিলকে পুঁতেছিল জানিস গাছটা? তোর মা। কিন্তু মা বলিলে কাজল কিছুই বোঝে না। জ্ঞান হইয়া অবধি সে দিদিমা ছাড়া আর কাহাকেও চিনিত না, দিদিমাই তাহার সব। মা একটা অবাস্তব কাল্পনিক ব্যাপার মাত্র। মায়ের কথায় তার মনে কোনও বিশেষ সুখ বা দুঃখ জাগায় না। অনেকদিন পরে মনসাপোতা আসা। সকলেই বাড়িতে ডাকে, নানা সদুপদেশ দেয়। ক্ষেত্র কাপালি অপুকে ডাকিয়া অনেকক্ষণ কথাবার্তা কহিল, দুধ পাঠাইয়া দিল–ঘর ছাইবার জন্য ভড়েরা একগাড়ি উলুখড় দিতে চাহিল। রাত্রে আবার কি কাজে সরকার-বাড়ির সামনের পথ দিয়া আসিতে হইল। বাড়িটার দিকে যেন চাওয়া যায় না। গোটা মনসাপোতাটা নিরুদির অভাবে ফাঁকা হইয়া গিয়াছে তাহার কাছে। নিরুদি, আজ খোকাকে নিয়ে এসেছি, তুমি এসে ওকে দেখবে না, আদর করবে না, খাওয়া-দাওয়ার বন্দোবস্ত করে দেবে না? রাত্রে অপু আর কিছুতেই ঘুমাইতে পারে না। চোখের সামনে নিরুপমার সেই হাসি-হাসি মুখ, সেই অনুযোগের সুর কানে। আর একটি বার দেখা হয় না তাহার সঙ্গে? কাজলকে সে কলিকাতায় লইয়া আসিল পরদিন বৈকালের ট্রেনে। সন্ধ্যার পর গাড়িখানা শিয়ালদহ স্টেশনে ঢুকিল। এত আলো, এত বাড়িঘর, এত গাড়িঘোড়া–কি কাণ্ড এ সব! কাজল বিস্ময়ে একেবারে নির্বাক হইয়া গেল। সে শুধু বাবার হাত ধরিয়া চারিদিকে ডাগর চোখে চাহিতে চাহিতে চলিল। হ্যারিসন রোডের বড়ো বড়ো বাড়িগুলা দেখাইয়া একবার সে বলিল—ওগুলো কাদের বাড়ি, বাবা? অত বাড়ি? আবার বাসাটায় ঢুকিয়া কাপড়-চোপড় ছাড়িয়া সে গলির মোড়ে দাঁড়াইয়া বড়ো রাস্তার গাড়িঘোড়া দেখিতে লাগিল। অবাক-জলপান জিনিসটা কি? বাবার দেওয়া দুটা পয়সা কাছে ছিল, এক পয়সার অবাক-জলপান কিনিয়া খাইয়া সে সত্যই অবাক হইয়া গেল। মনে হইল, এমন অপূর্ব জিনিস সে জীবনে আর কখনও খায় নাই। চাল-ছোলা ভাজা সে অনেক খাইয়াছে। কিন্তু কি মশলা দিয়া ইহারা তৈরি করে এই অবাক-জলপান? অপু তাহাকে ডাকিয়া বাসার মধ্যে লইয়া গেল—ওরকম একলা কোথাও যাস নে খোকা। হারিয়ে যাবি, কি, কি হবে। যাওয়ার দরকার নেই। কাজলের দুঃস্বপ্ন কাটিয়া গিয়াছে। আর দাদামশায়ের বকুনি খাইতে হইবে না, একা গিয়া দোতলার ঘরে রাত্রিতে শুইতে হইবে না, মামিমাদের ভয়ে পাতের প্রত্যেক ভাতটি খুটিয়া গুছাইয়া খাইতে হইবে না। একটি ভাত পাতের নিচে পড়িয়া গেলে বড়ো মামিমা বলিত—পেয়েছ পরের, দেদার ফেলল আর ছড়াও-বাবার অন্ন তো খেতে হল না কখনও? ছেলেমানুষ হইলেও সব সময় এই বাবার খোঁটা কাজলের মনে বাজিত– অপু বাসায় আসিয়া দেখিল, কে একখানা চিঠি দিয়াছে তাহার নামে—অপরিচিত হস্তাক্ষর। আজ পাঁচ-ছয় দিন পত্ৰখানা আসিয়া চিঠির বাক্সে পড়িয়া আছে। খুলিয়া পড়িয়া দেখিল একজন অপরিচিত ভদ্রলোক তাহাকে লিখিতেছেন তাহার বই পড়িয়া মুগ্ধ হইয়াছেন, শুধু তিনি নহেন, তাঁহার বাড়িসুদ্ধ সবাই-প্রকাশকের নিকট হইতে ঠিকানা জানিয়া এই পত্র লিখিতেছেন, তিনি তাহার সহিত দেখা করিতে চাহেন। দু-তিনবার চিঠিখানা পড়িল। এতদিন পরে বোঝা গেল যে, অন্তত একটি লোকেরও ভালো লাগিয়াছে তাহার বইখানা!… পরের প্রশংসা শুনিতে অপু চিরকালই ভালোবাসে, তবে বহু দিন তাহার অদৃষ্টে সে জিনিসটা জোটে নাই-প্রথম যৌবনের সেই সরল হামবড়া ভাব বয়সের অভিজ্ঞতার ফলে দূর হইয়া গিয়াছিল, তবুও সে আনন্দের সহিত বন্ধুবান্ধবের নিকট চিঠিখানা দেখাইয়া বেড়াইল। পরের দিন কাজল চিড়িয়াখানা দেখিল, গড়ের মাঠ দেখিল। মিউজিয়ামের অধুনালুপ্ত সেকালের কচ্ছপের প্রস্তরীভূত বৃহৎ খোলা দুটি দেখিয়া সে অনেকক্ষণ অবাক হইয়া চাহিয়া দাঁড়াইয়া কি ভাবিল। পরে অপু ফিরিয়া যাইতেছে, কাজল বাবার কাপড় ধরিয়া টানিয়া দাঁড় করাইয়া বলিল— শোনো বাবা!-কচ্ছপ দুটোর দিকে আঙুল দিয়া দেখাইয়া বলিল–আচ্ছা, এ দুটোর মধ্যে যদি যুদ্ধ হয় তবে কে জেতে বাবা?… অপু গম্ভীর মুখে ভাবিয়া ভাবিয়া বলে—ওই বাঁ দিকেরটা জেতে।-কাজলের মনের দ্বন্দ্ব দূর হয়। কিন্তু গোলদিঘিতে মাছের ঝাক দেখিয়া সে সকলের অপেক্ষা খুশি। এত বড়ো বড়ো মাছ আর এত একসঙ্গে! মেলা ছেলেমেয়ে মাছ দেখিতে জুটিয়াছে বৈকালে, সেও বাবার কথায় এক পয়সার মুড়ি কিনিয়া জলে ছড়াইয়া দিয়া অধীর আগ্রহে মাছের খেলা দেখিতে লাগিল। -তুমি ছিপে ধরবে বাবা? কত বড়ো বড়ো মাছ? অপু বলিল—চুপ চুপ–-ও মাছ ধরতে দেয় না। ফুটপাতে একজন ভিখারি বসিয়া। কাজল ভয়ের সুরে বলিল—শিগগির একটা পয়সা দাও বাবা, নইলে ছুঁয়ে দেবে।—তাহার বিশ্বাস, কলিকাতার যেখানে যত ভিখারি বসিয়া আছে ইহাদেব পয়সা দিতেই হইবে, নতুবা ইহারা আসিয়া দুইয়া দিবে, তখন তোমাকে বাড়ি ফিবিয়া স্নান করিতে হইবে-সে এক মহা হাঙ্গামা।   বর্ষাকালের মাঝামাঝি অপুর চাকরিটি গেল। অর্থের এমন কষ্ট সে অনেক দিন ভোগ কবে নাই। ভালো স্কুলে দিতে না পারিয়া সে ছেলেকে কর্পোরেশনের ফ্রি স্কুলে ভর্তি করিয়া দিল। ছেলেকে দুধ পর্যন্ত দিতে পারে না। বইয়ের বিশেষ কিছু আয় নাই। হাত এদিকে কপর্দকশূন্য। কাজলের মধ্যে অপু একটা পৃথক জগৎ দেখিতে পায়। দুটা টিনের চাকতি, গোটা দুই মার্বেল, একটা কল-টেপা খেলনা, মোটর গাড়ি, খান দুই বই-হইতে যে মানুষ কিসে এত আনন্দ পায~~ অপু তাহা বুঝিতে পারে না। চঞ্চল ও দুষ্ট ছেলে—পাছে হারাইয়া যায়, এই ভয়ে অপু তাহাকে মাঝে মাঝে ঘরে চাবি দিয়া রাখিয়া নিজের কাজে বাহির হইয়া যায়—এক-একদিন চার-পাঁচ ঘণ্টাও হইয়া যায়-কাজলের কোনো অসুবিধা নেই—সে রাস্তার ধারের জানালাটায় দাঁড়াইয়া পথের লোকজন দেখিতেছেনা হয়, বাবার বইগুলো নাড়িয়া চাড়িয়া ছবি দেখিতেছে—মোটর উপর আনন্দেই আছে। এই বিরাট নগরীর জীবনস্রোত কাজলের কাছে অজানা দুর্বোধ্য। কিন্তু তাহার নবীন মন ও নবীন চক্ষু যে-সকল জিনিস দেখে ও দেখিয়া আনন্দ পায়—বয়স্ক লোকের ক্লান্ত দৃষ্টিতে তাহা অতি তুচ্ছ। হয়তো আঙুল দিয়া দেখাইয়া বলে—দ্যাখো বাবা, ওই চিলটা কিসের ডাল মুখে করে নিয়ে যাচ্ছিল, সামনের ছাদের আলসেতে লেগে ডালটা-ওই দ্যাখো বাবা রাস্তায় পড়ে গিয়েছে। বাবার সঙ্গে বেড়াইতে বাহির হইয়া এত ট্রাম, মোটর, লোকজনের ভিড়ের মাঝখানে কোথায় একটা কাক ফুটপাতের ধারে ড্রেনের জলে স্নান করিতেছে তাই দেখিয়া তাহার মহা আনন্দ-তাহা আবার বাবাকে না দেখাইলে কাজলের মনে তৃপ্তি হইবে। সব বিষয়েই বাবাকে আনন্দের ভাগ না দিতে পারিলে, কাজলের আনন্দ পূর্ণ হয় না। খাইতে খাইতে বেগুনিটা, কি তেলেভাজা কচুরিখানা এক কামড় খাইয়া ভালো লাগলে বাকি আধখানা বাবার মুখে খুঁজিয়া দিবে-অপুও তাহা তখনই খাইয়া ফেলেছি, আমার মুখে দিতে নেই—একথা বলিতে তার প্রাণ কেমন করে-কাজেই পিতৃত্বের গাম্ভীর্যভরা ব্যবধান অকারণে গড়িয়া উঠিয়া পিতা-পুত্রের সহজ সরল মৈত্রীকে বাধা দান করে নাই, কাজল জীবনে বাবার মতো সহচর পায় নাই–এবং অপুও বোধ হয় কাজলের মতো বিশ্বস্ত ও একান্ত নির্ভরশীল তরুণ বন্ধু খুব বেশি পায় নাই জীবনে। আর কি সরলতা!…পথে হয়তো দুজনে বেড়াইতে বাহির হইয়াছে, কাজল বলিল—শোনো বাবা, একটা কথা শোনো, চুপি চুপি বলব—পবে পথের এদিক ওদিক চাহিয়া লাজুক মুখে কানে কানে বলে-ঠাকুর বড়ো দুটাখানি ভাত দ্যায় হোটেলে—আমার খেয়ে পেট ভরে না—তুমি বলবে বাবা? বললে আর দুটো দেবে না? দিনকতক গলির একটা হোটলে পিতাপুত্রে দুজনে খায়—হোটেলের ঠাকুর হয়তো শহরের ছেলের হিসেবে ভাত দেয় কাজলকে কিন্তু পাড়াগাঁয়ের ছেলে কাজল বয়সের অনুপাতে দুটি বেশি ভাতই খাইয়া থাকে। অপু মনে মনে হাসিয়া ভাবে—এই কথা আবার কানে কানে বলা!…রাস্তার মধ্যে ওকে চেনেই বা কে আর শুনছেই বা কে!…ছেলেটা বেজায় বোকা। আর একদিন কাজল লাজুক মুখে বলিল-বাবা একটা কথা বলব?… —কি? –নাঃ বাবা-বলব না— –বল্ না কি? কাজল সরিয়া আসিয়া চুপি চুপি লাজুক সুরে বলিল—তুমি মদ খাও বাবা? অপু বিস্মিত হইয়া বলিল–মদ?…কে বলেছে তোকে? —সেই যে সেদিন খেলে? সেই বাস্তার মোড়ে একটা দোকান থেকে? পান কিনলে আর সেই যে– অপু প্রথমটা অবাক হইয়া গিয়াছিল—ফের বুঝিয়া হো-হো করিয়া হাসিয়া উঠিয়া বলিল,দূর বোকা—সে হল লেমনেড়—সেই পানের দোকানে তো?…তোর ঠাণ্ডা লেগেছিল বলে তোকে দিই নি।…খাওয়াব তোকে একদিন, ও একরকম মিষ্টি শরবৎ। দূর– কাজলের কাছে অনেক ব্যাপার পবিষ্কার হইয়া গেল। কলিকাতায় আসিয়া সে দেখিয়া অবাক হইয়া গিয়াছিল যে এখানে মোড়ে মোড়ে মদের দোকান-পান ও মদ এক্সঙ্গে বিক্রয় হয় প্রায় সর্বত্র। সোডা লেমনেড সে কখনও দেখে নাই ইহার আগে, জানিত না-কি করিয়া সে ধরিয়া লইয়াছে বোতলে ওগুলো মদ। তাই তো সেদিন বাবাকে খাইতে দেখিয়া অবাক হইয়া গিয়াছিল— এত দিন লজ্জায় বলে নাই। সেই দিনই অপু তাহাকে লেমনেড খাওয়াইয়া তাহার ভ্রম ঘুচাইয়া দিল। এই অবস্থায় একদিন সে বিমলেন্দুর পত্র পাইল, একবার আলিপুরে লীলার ওখানে পত্রপাঠ আসিতে। লীলার ব্যাপার সুবিধা নয়। তাহারও আর্থিক অবস্থা বড়ো শোচনীয়। নিজের যাহা কিছু ছিল গিয়াছে, আর কেহ দেয়ও না, বাপের বাড়িতে তাহার নাম করিবার পর্যন্ত উপায় নাই। ইদানীং তাহার মা কাশী হইতে তাহাকে টাকা পাঠাইতেন। বিমলেন্দু নিজের খরচ হইতে বাঁচাইয়া কিছু টাকা দিদির হাতে দিয়া যাইত। তাহার উপর মুশকিল এই যে, লীলা বড়োমানুষের মেয়ে, কষ্ট করা অভ্যাস নাই, হাত ছোট করিতে জানে না। এই রকম কিছুদিন গেল। লীলা যেন দিন দিন কেমন হইয়া যাইতেছিল। অমন হাস্যমুখী শীলা, তাহার মুখে হাসি নাই, মনমরা বিষয় ভাবাশরীরও যেন দিন দিন শুকাইয়া যাইতে থাকে। গত বর্ষাকাল এইভাবেই কাটে, বিমলেন্দু পূজার সময় পীড়াপীড়ি করিয়া ডাক্তার দেখায়। ডাক্তারে বলেন, থাইসিসের সূত্রপাত হইয়াছে, সতর্ক হওয়া দরকার। বিমলেন্দু লিখিয়াছে-লীলার খুব জ্বর। ভুল বকিতেছে, কেহই নাই, সে একা ও একটি চাকর সারারাত জাগিয়াছে, আত্মীয়স্বজন কেহ ডাকিলে আসিবে না, কি করা যায় এ অবস্থায়। অপু এখানে আজকাল তত আসিতে পারে না, অনেকদিন লীলাকে দেখে নাই। লীলার মুখ যেন রাঙা, অস্বাভাবিকভাবে রাঙা ও উজ্জ্বল দেখাইতেছে। বিমলেন্দু শুষ্কমুখে বলিল–কাল রঘুয়ার মুখে খবর পেয়ে এসে দেখি এই অবস্থা। এখন কি করি বলুন তো? বাড়ির কেউ আসবে না, আমি কাউকে বলতেও যাব না, মাকে একখানা টেলিগ্রাম করে দেব? অপু বলিল—মা যদি না আসেন? -কি বলেন? এক্ষুনি ছুটে আসবেন—দিদি-অন্ত প্রাণ। তিনি যে আজ চার বছর কলকাতামুখো হন নি, সে এই দিদির কাণ্ডেই তো। মুশকিল হয়েছে কি জানেন, কাল রাত্রেও বকেছে, শুধু খুকি, খুকি, অথচ তাকে আনানো অসম্ভব। অপু বলিল,-আর এক কাজ করতে হবে, একজন নার্স আমি নিয়ে আসি ঠিক করে। মেয়েমানুষের নার্সিং পুরুষ দিয়ে হয় না। বোসোতোমরা। দুই তিন দিনে সবাই মিলিয়া লীলাকে সাবাইয়া তুলিল। জ্ঞান হইলে সে একদিন কেবল অপুকে ঘরের মধ্যে দেখিতে পাইয়া কাছে ডাকিয়া ক্ষীণ সুরে বলিল—কখন এলে অপূর্ব? রোগ হইতে উঠিয়াও লীলার স্বাস্থ্য ভালো হইল না। শুই আছে তো শুইয়াই আছে, বসিয়া আছে তো বসিয়াই আছে। মাথাব চুল উঠিযা যাইতে লাগিল। আপন মনে গুম হইয়া বসিয়া থাকে, ভালো করিয়া কথাও বলে না, হাসেও না। কোথাও নড়িতে চড়িতে চায় না। ইতিমধ্যে কাশী হইতে লীলার মা আসিলেন। বাপের বাড়ি থাকেন, মোজ মোটরে আসিয়া দু-তিন ঘণ্টা থাকেন—আবার চলিয়া যান। ডাক্তার বলিযাছে, স্বাস্থ্যকর জায়গায় না লইযা গেলে রোগ সারিবে না। দুপুর বেলাটা কিন্তু একটু মেঘ করার দরুন রৌদ্র নাই কোথাও। অপু লীলার বাসায় গিযা দেখিল লীলা জানালার ধারে বসিয়া আছে। সে সব সময় আসিতে পারে না, কাজলকে একা বাসায় রাখিয়া আসা চলে না। ভারি চঞ্চল ও বীতিমতো নির্বোধ ছেলে। তাহা ছাড়া রান্নাবান্না ও সমুদ কাজ করিতে হয় অপুর, কাজলকে দিয়া কুটাগাছটা ভাঙিবার সাহায্য নাই, সে খেলাধুলা লইয়া সারাদিন মহা ব্যস্ত-অপু তাহাকে কিছু করিতে বলেও না, ভাবে–আহা, খেলুক একটু। পুওর মাদারলে চাইল্ড। লীলা ম্লান হাসিয়া বলিল—এসো। —এরা কোথায়? বিমলেন্দু কোথায়? মা এখনও আসেন নি? –বসো। বিমলেন্দু এই কোথায় গেল। নার্স তো নিচে, বোধ হয় খেয়ে একটু ঘুমুচ্ছে। –তারপর কোথায় যাওয়া ঠিক হল—সেই ধরমপুরেই? সঙ্গে যাবেন কে– –মা আর বিমল। খানিকক্ষণ দুজনেই চুপ করিয়া রহিল। পরে লীলা তাহার দিকে ফিরিয়া বলিল–আচ্ছা অপূর্ব, বর্ধমানের কথা মনে হয় তোমার? অপু ভাবিল, আহা, কি হয়ে গিয়েছে লীলা! মুখে বলিল-মনে থাকবে না কেন—খুব মনে আছে। লীলা অন্যমনস্কভাবে বলিল—তোমরা সেই ওদিকের একটা ঘরে থাকতে—সেই আমি যেতুম– —তুমি আমাকে একটা ফাউন্টেন পেন দিয়েছিলে মনে আহে লীলা? তখন ফাউন্টেন পেন নতুন উঠেছে। মনে নেই তোমার? লীলা হাসিল। অপু হিসাব করিয়া বলিল—তা ধরো প্রায় আজ বিশ-বাইশ বছর আগেকার কথা। লীলা খানিকটা চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল—অপূর্ব, কেউ মোটরটা কিনবে বলতে পারো, তোমার সন্ধানে আছে? লীলার অত সাধের গাড়িটা…এত কষ্টে পড়িয়াছে সে!– লীলা বলিল—আমি সে সব গ্রাহ্য করি নে কিন্তু মা-ও ভাবেন-যাক সে সব কথা। তুমি আমাকে কোথাও নিয়ে যাবে অপূর্ব? –কোথায়? —যেখানে হোক। তোমার সেই পোর্তো প্লাতায়—মনে নেই, সেই যে সমুদ্রের মধ্যে কোন্ ডুবো জাহাজ উদ্ধার করে বলেছিলে সোনা আনবে? সেই যে মুকুল-এ পড়ে বলেছিলে? কথাটা অপুর মনে পড়িল। হাসিয়া বলিল, হ্যাঁ সেই—ঠিক। উঃ, সে কথা মনে আছে। তোমার! —আমি বলেছিলাম, কেমন করে যাবে? তুমি বলেছিলে, জাহাজ কিনে সমুদ্রে যাবে। অপু হাসিল। শৈশবের সাধ-আশার নিশ্বলতা সম্বন্ধে সে কি একটা বলিতে যাইতেছিল, কিন্তু হঠাৎ তাহার মনে পড়িয়া গেল, লীলাও এ ধরনের নানা আশা পোষণ করিত, বিদেশে যাইবে, বড়ো আর্টিস্ট হইবে ইত্যাদি-ওর সামনে আর সে কথা বলাব আবশ্যক নাই। কিন্তু লীলাই আবার খানিকটা চুপ করিযা থাকিয়া বলিল—যাবে না? যাও যাও—পবে— হি-হি করিয়া হাসিয়া কেমন একটা অদ্ভুত সুরে বলিল–সমুদ্র থেকে সোনা আনবে তো তোমরাইপোর্তো প্লাতা থেকে, না?…দ্যাখো, এখনও ঠিক মনে কবে রেখেছি—রাখি নি? হি-হি-একটু চা খাবে? লীলার মুখে শীর্ণ হাসি ও তাহার বাঁধুনিহারা উভ্রান্ত আলগা ধবনের কথাবার্তা অপুর বুকে তীক্ষ তীরের মতো বিধিল। সঙ্গে সঙ্গে বুঝিল এত ভালোবাসে নাই সে লীলাকে আর কোনো দিন আজ যত বাসিয়াছে। —দুপুর বেলা চা খাব কি?—সেজন্যে ব্যস্ত হয়ো না লীলা। লীলা বলিল—তোমার মুখে সেই পুরোনো গানটা শুনি নি অনেকদিন–সেই আমি চঞ্চল হে—গাও তো? মেঘলা দিনে দুপুর। বাহিরের দিকে একটা সাহেব-বাড়িব কম্পাউন্ডে গাছের ডালে অনেকগুলি পাখি করব করিতেছে। অপু গান আরম্ভ করিল, লীলা জানালার ধারেই বসিয়া বাহিরের দিকে মুখ রাখিয়া গানটা শুনিতে লাগিল। লীলার মনে আনন্দ দিবার জন্য অপু গানটা দু-তিনবার ফিরাইয়া ফিরাইয়া গাহিল। গান শেষ হইয়া গেল, তবু লীলা জানালাব বাহিরেই চাহিয়া আছে, অন্যমনস্কভাবে যেন কি জিনিস লক্ষ করিতেছে। খানিকক্ষণ কাটিয়া গেল। দুজনেই চুপ করিয়া ছিল। হঠাৎ লীলা বলিল—একটা কথার উত্তব দেবে? লীলার গলার স্বরে অপু বিস্মিত হইল। বলিল—কি কথা?… —আচ্ছা, বেঁচে লাভ কি? অপু এ প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিল না—বলিল—এ কথার কি—এ কথা কেন? –বলো না?… –না লীলা। এ ধরনের কথাবার্তা কেন? এর দরকার নেই। –আচ্ছা, একটা সত্যি কথা বলবে —কি বলো? —আচ্ছা, আমাকে লোকে কি ভাবে? সেই লীলা! তাহার মুখে এ রকম দুর্বল ধরনের কথাবার্তা, সে কি কখনও স্বপ্নেও ভাবিয়াছিল। অপু এক মুহূর্তে সব বুঝিল-অভিমানিনী তেজস্বিনী শীলা আর সব সহ্য করিতে পারে, লোকের ঘৃণা তাহার অসহ্য। গত কয়েক বৎসরে ঠিক তাহাই জুটিয়াছে তাহার কপালে। এতদিন সেটা বোঝে নাই—সম্প্রতি বুঝিয়াছে—জীবনের উপর টান হারাইতে বসিয়াছে। অপুর গলায় যেন একটা ডেলা আটকাইয়া গেল। সে যতদূর সম্ভব সহজ সুরে বলিল-এ ধরনের কথা সে এ পর্যন্ত কোনো দিন লীলার কাছে বলে নাই, কোনও দিন না-দ্যাখো লীলা, অন্য লোকের কথা জানি নে, তবে আমার কথা শুনবে?…আমি তোমাকে আমার চেয়ে অনেক বড়ো তো ভাবিই—অনেকের চেয়ে বড়ো ভাবি-তোমাকে কেউ চেনে নি, চিনলে না, এই কথা ভাবি।আজ নয় লীলা, এতটুকু বেলা থেকে তোমায় আমি জানি, অন্য লোকে ভুল করতে পারে, কিন্তু আমি লীলা যেন অবাক হইয়া গেল, কখনও সে এরকম দেখে নাই অপুকে। সে জিজ্ঞাসা করিতে যাইতেছিল—সত্যি বলছ? কিন্তু অপুর মুখ দেখিয়া হয়তো বুঝিল প্রশ্নটা অনাবশ্যক। পরক্ষণেই খেয়ালী অপু আর একটা কাজ করিয়া বসিল—এটাও সে ইহার আগে কখনও করে নাই-লীলার খুব কাছে সরিয়া গিয়া তার ডান হাতখানা নিজের দুহাতের মধ্যে লইয়া লীলাকে নিজের দিকে টানিয়া তার মুখ ফিরাইল। পরে গভীর স্নেহে তার উত্তপ্ত ললাটে, কানের পাশের চূর্ণ কুন্তলে হাত বুলাইতে বুলাইতে দৃঢ়স্বরে বলিল-তুমি আমি ছেলেবেলার সাথী, লীলা—আমরা কেউ কাউকে ভুলব নাকোনো অবস্থাতেই না। এতদিন ভুলি নি-ও কখনও লীলা। লীলার সারাদেহ শিহরিয়া উঠিল…যাহা আজ অপুর মুখে, কথার সুরে ডাগর চোখের অকপট দৃষ্টিতে পাইল—জীবনে কোনো দিন কাহারও কাছ হইতে তাহা সে কখনও পায় নাই—আজ সে দেখিল অপুকে সে চিরকাল ভালোবাসিয়া আসিয়াছে–বিশেষ করিয়া অপুর মাতৃবিয়োগের পর লালদীঘির সামনের ফুটপাতে তাকে যেদিন শুল্কমুখে নিরাশ্রয় ভাবে বেড়াইতে দেখিয়াছিল— সেদিনটি হইতে। …অপুর চমক ভাঙিল লীলা কখন তাহার বক্ষে মুখ লুকাইয়াছিল—তাহার অশ্রুপ্লাবিত পাণ্ডুর মুখখানি।… অপু বাহিরে চলিয়া আসিলসে অনুভব করিতেছিল, লীলার মতো সে কাহাকেও ভালোবাসে না—সেই গভীর অনুকম্পামিশ্রিত ভালোবাসা, যা মানুষকে সব ভুলাইয়া দেয়, আত্মবিসর্জনে প্রণোদিত করে। লীলাকে যে করিয়া হউক সে সুখী করিবে। লীলাকে এতটুকু কষ্টে পড়িতে দিবে না; নিজেকে ছোট ভাবিতে দিবে না। যাহার ইচ্ছা লীলাকে ছাড়ুক, সে লীলাকে ছাড়িতে পারিবে না। সে লীলাকে কোথাও লইয়া যাইবেই—এ অবস্থায় কলিকাতায় থাকিলে লীলা বাঁচিবে না। বিশ্ব একদিকে-লীলার মুখের অনুরোধ আর একদিকে। সারাপথ ভাবিতে ভাবিতে ফিরিল।   দিন তিনেক পরে। বেলা আটটা। অপু সকালে স্নান সারিয়া কাজলকে সঙ্গে করিয়া বেড়াইতে বাহির হইবেএমন সময়ে মিঃ লাহিড়ীর ছোট নাতি অরুণ ঘরে ঢুকিল—এককোণে ডাকিয়া লইয়া চুপি চুপি উত্তেজিত সুরে বলিল-শিগগির আসুন, দিদি কাল রাত্রে বিষ খেয়েছে। বিষ। সর্বনাশ।—শীলা বিষ খাইয়াছে। কাজলকে কি করা যায়?-খোকা তুই বরং-ঘরে থাক একা। আমি একটা কাজে যাচ্ছি। দেরি হবে ফিরতে। কিন্তু কাজলের চোখে ধুলা দেওয়া অত সহজ নয়। কেন বাবা? কি কাজ? কোথায়? কত দেরি হইতে পারে?…কোনোমতে ভুলাইয়া তাহাকে রাখিয়া দুজনে ট্যাক্সি ধরিয়া লীলার বাসায় আসিল। আরও দুখানা মোটর দাঁড়াইয়া আছে। ঢুকিতেই লীলাদের বাড়ির ডাক্তার বৃদ্ধ কেদারবাবুর সঙ্গে দেখা। অরুণ ব্যস্তসমস্ত ভাবে জিজ্ঞাসা করিলকি অবস্থা এখন? কেদারবাবু বলিলেন—অবস্থা তেমনি। আর একটা ইনজেকশান করেছি। হিলকক সাহেব এলে যে বুঝতে পারি। অপুর প্রশ্নের উত্তরে বলিলেন-বড় স্যাড ব্যাপার-বড় স্যাড। জিনিসটা? মরফিয়া। রাত্রে কখন খেয়েছে, তা তত বোঝা যায় নি, আজ সকালে তাও বেলা হলে তবে টের পাওয়া গেল। কর্নেল হিলকককে আনতে লোক গিয়েছে তিনি না আসা পর্যন্ত অরুণের সঙ্গে সঙ্গে উপরের সেই ঘরটাতে গেল—মাত্র দিন তিনেক আগে যেটাতে বসিয়া সে লীলাকে গান শুনাইয়া গিয়াছে। প্রথমটা কিন্তু সে ঘরে ঢুকিতে পারিল না, তাহার হাত কঁপিতেছিল, পা কাঁপিতেছিল। ঘরটা অন্ধকার, জানালার পর্দাগুলো বন্ধ, ঘরে বেশি লোক নাই, কিন্তু বারান্দাতে আট-দশজন লোক। সবাই পদ্মপুকুরের বাড়ির সবাই চুপি চুপি কথা কহিতেছে, পা টিপিয়া টিপিয়া হাঁটিতেছে। কিছু বিশেষ অস্বাভাবিক ব্যাপার ঘটিয়াছে এখানে, এমন বলিয়া কিন্তু অপুর মনে হইল না। অথচ একজন-যে পৃথিবীর সুখকে এত ভালোবাসিত, আকাঙ্ক্ষা করিত, আশা করিতউপেক্ষায় মুখ বাঁকাইয়া পৃথিবী হইতে ধীরে ধীরে বিদায় লইতেছে। সেদিনকার সেই জানালার পাশের খাটেই লীলা শুইয়া। সংজ্ঞা নাই, পাণ্ডুর, কেমন যেন বিবর্ণ ঠোঁট ঈষৎ নীল। একখানা হাত খাটের বাহিরে ঝুলিতেছিল—সে তুলিয়া দিল। গায়ে রেশমের বরফি কাটা বিলাতী লেপ। কি অপূর্ব যে দেখাইতেছে লীলাকে! …মরণাহত মৃত্যুপার মুখের সৌন্দর্য যেন এ পৃথিবীর নয়—কিংবা হরিদ্রাভ হাতির দাঁতে খোদাই মুখ যেন। দেবীর মতো সৌন্দর্য আরও অপার্থিব হইয়া উঠিয়াছে। তাহার মনে হইল লীলা ঘামিতেছে। তবে বোধ হয় আর ভয় নাই, বিপদ কাটিয়া গিয়াছে। চুপি চুপি বলিল-ঘামছে কেন? ডাক্তারবাবু বলিলেন—ওটা মরফিয়ার সিম্‌টম্‌। মিনিট দশ কাটিল। অপু বাহিরের বারান্দাতে আসিয়া দাঁড়াইল। পাশের ঘবে লোকেরা একবার ঢুকিতেছে, আবার বাহির হইতেছে, অনেকেই আসিয়াছে, কেবল মিঃ লাহিড়ী ও লীলার মা নাই। মিঃ লাহিড়ী দার্জিলিং-এ, লীলার মা মাত্র কাল এখান হইতে বর্ধমানে কি কাজে গিয়াছেন। লীলা সত্যই অভাগিনী! এমন সময় নিচে একটা গোলমাল। একখানা গাড়ির শব্দ উঠিল। ডাক্তার সাহেব আসিয়াছেন—তিনি উপরে উঠিয়া আসিলেন, পিছনে কেদারবাবু ও বিমলেন্দু। অনেকেই ঘরে ঢুকিতে যাইতেছিল, কেদারবাবু নিষেধ করিলেন। মিনিট সাতেক পরে ডাক্তার সাহেব চলিয়া গেলেন। বলিয়া গেলেন—Too late, কোনও আশা নাই। আরও আধঘণ্টা। এত লোক।—অপু ভাবিল, ইহারা এতকাল কোথায় ছিল? আজ Too late! Too late,!… লীলা মারা গেল বেলা দশটায়। অপু তখন খাটের পাশেই দাঁড়াইয়া। এতক্ষণ লীলা চোখ বুজিয়াই ছিল, সে সময়টা হঠাৎ চোখ মেলিয়া চাহিল—তারাগুলা বড়ো বড়ো, তাহার দিকেও চাহিল, অপুর দেহে যেন বিদ্যুৎ খেলিয়া গেল—লীলা তাহাকে চিনিয়াছে বোধ হয়। …কিন্তু পরক্ষণেই দেখিল-দৃষ্টি অর্থহীন, আভাহীন, উদাসীন, অস্বাভাবিক। তারপরই লীলা যেন চোখ তুলিয়া কড়িকাঠে, সেখান হইতে আরও অস্বাভাবিকভাবে মাথার শিয়রে কার্নিসের বিটের দিকে ইচ্ছা করিয়াই কি দেখিবার জন্য চোখ ঘুরাইল-স্বাভাবিক অবস্থায় মানুষ ওরকম চোখ ঘুরাইতে পারে না। তারপরেই সবাই ঘরের বাহির হইয়া আসিল। কেবল বিমলেন্দু ছেলেমানুষের মতো চিৎকার করিয়া কাঁদিয়া উঠিল। অপুও ফিরিল। হায়রে পাপ, হায় পুণ্য! কে মানদণ্ডে তৌল করিবে? মুখ…মূখ…মূখ…মুখ লীলার বিচার করিবে কে? এই সব মূর্খের দল? দুঃখের মধ্যে তাহার হাসি আসিল।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৫৭ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ...