বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন

বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা

আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

কোথাও কেউ নেই (৯)

"উপন্যাস" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান TARiN (১০২৯ পয়েন্ট)



X ০৯. বকুলের বিয়ের কথাবার্তা হচ্ছে বকুলের বিয়ের কথাবার্তা হচ্ছে এই খবরটি বকুল কাউকে বলেনি। টিন ভাবীকে পর্যন্ত না। অথচ বকুল অবাক হয়ে লক্ষ্য করল ক্লাসের সবাই এটা জানে। সেকেন্ড পিরিয়ডে ইংরেজি। আপা আসেননি। সবাই খুব হৈচৈ করছে। অনিমা গিয়ে এক ফাঁকে বোর্ডে লিখল আজ বকুলের গায়ে হলুদ, কাল বকুলের বিয়ে। দারুণ হাসোহাসি শুরু হল। হাসতে হাসতে একজন অন্যজনের গায়ে গড়িয়ে পড়ছে। বকুল বেঞ্চে মাথা রেখে কেঁদে ভাসাতে লাগল। ফোর্থ পিরিয়ডে ছুটি নিয়ে চলে গেল টিনা ভাবীদের বাসায়। ভেবেছিল পাঁচটা পর্যন্ত থাকবে–কিন্তু টিনা ভাবীর দেশের বাড়ি থেকে লোকজন এসেছে। বাসা ভর্তি মানুষ। কিছু কিছু দিন এমন খারাপ ভাবে শুরু হয়। বাসায় ফেরার পথে ডাক্তার সাহেবের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। এই যে বকুল না? এ রকম মাথা নিচু হরে হাঁট কেন? গাড়ির নিচে পড়বে। বকুল কি বলবে ভেবে পেল না। এস পেপসি খেয়ে যাও। জি না, লাগবে না। লাগবে না কেন। লাগবে। আস তো! চল ফার্মেসিতে বসি, যা গরম। গরম কোথায়? আজি তো ঠাণ্ড। এই তো কথা ফুটছে। আমার তো ধারণা ছিল তুমি কথা বলতেই জানো না। জানব না কেন? বকুল অবাক হয়ে লক্ষ্য করল, সে বেশ কথার পিঠে কথা বলছে। কয়েক’দিন আগে কি তুমি শাড়ি পরে কোথাও গিয়েছিলো? নীল শাড়ি? টিনা ভাবীর বাসায় গিয়েছিলাম। আমি চিনতে পারিনি। সারাক্ষণ ভাবছিলাম চেনা চেনা লাগছে। অথচ চিনাছি না কেন? আচ্ছা! বকুল বল তো, কাদের পথে দেখলে চেনা চেনা মনে হয়, কিন্তু আসলে ওরা চেনা নয়। বকুল অনেকক্ষণ ভেবেও কিছু বলতে পারছে না। ডাক্তার ছেলেটি হাসতে হাসতে বলল, টিভি বা সিনেমায় যারা অভিনয় করে ওদের রাস্তায় দেখলে চেনা চেনা মনে হয় ঠিক না? আমি ওদের কাউকে কখনো রাস্তায় দেখিনি। আমি অনেক দেখেছি। সুবৰ্ণাকে দেখেছেন কখনো? না তাকে দেখিনি। আমি দেখেছি। আমি আর অনিমা এক’দিন নিউ মার্কেটে গিয়েছিলাম। তখন তাকে দেখলাম কাগজ কিনছে। প্রিন্টের সাদা শাড়ি পরা ছিল। বকুল প্রায় পাঁচটা পর্যন্ত ফার্মেসিতে একটি টুলের ওপর বসে বসে গল্প করল। এতটা সময় গিয়েছে সে নিজেও বুঝতে পারেনি। বাসায় ফিরতে ভয় ভয় লাগছিল। তার মনে হল বাবু নিশ্চয়ই আজও দেখেছে এবং হয়ত বলে দেবে মুনা আপাকে। কিংবা কে জানে বাবা নিজেই হয়ত দেখেছেন। তিনি পাঁচটার দিকে মাঝে মাঝে অফিস থেকে ফেরেন। বেছে বেছে হয়ত আজই ফিরেছেন। বকুল ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলল। বাড়িতে কেউ নেই। বাবা, মুনা আপা, বাবু কেউই ফেরেনি। দশ-এগারো বছরের একটা কাজের মেয়েকে দেখা গেল, তার নাম সখী। এ রকম অদ্ভুত নাম থাকে নাকি মানুষের? যতবার তার নাম ধরে ডাকা হয় ততবারই এমন হাসি লাগে। লতিফা এক সময় বিরক্ত হয়ে বললেন, ওকে সখিনা ডাকবি। সখী ডাকছিস কি? যে নাম ওর বাবা-মা রেখেছে সেটা ডাকবে না? না ঐ নামে ডাকতে হবে না। সখিনা ডাকবি। মেয়েটা খুব কাজের। অল্প সময়ের মধ্যেই ঘর-দুয়ার গুছিয়ে ঝকঝকে করে ফেলেছে। বকুলকে জিজ্ঞেস করল, চা খাবে কি না। লতিফা চিন্তিত মুখে বললেন এই মেয়ে বেশিদিন থাকবে না। যারা কাজ জানে তারা এ বাড়িতে বেশিদিন টেকে না। লতিফার শরীর আজ বেশ ভাল। অনেক দিন পর তিনি আজ রান্নাঘরে ঢুকে হালুয়া বানালেন। সবাই চায়ের সঙ্গে খাবে। গরম পানি দিয়ে ভালমত গোসল করলেন। তার শরীর বেশ ঝরঝরে। লাগছে। বকুল বলল–তুমি গোসল-টোসল সেরে এমন সেজোগুজে বসে আছ কেন? সাজগোজের কি দেখলি? পরিষ্কার একটা শাড়ি পারলাম শুধু। তোমাকে বেশ ফ্রেশ লাগছে মা। লতিফা মনে মনে খুশি হলেন। শরীর যদি সত্যি সত্যি সেরে গিয়ে থাকে তাহলে শক্ত হাতে এবার সংসারের হাল ধরতে হবে। সব জলে ভেসে যাচ্ছে। বকুল! কি? তোর রেহানা। আপা আর আসে না ক্লাসে? আসবে না কেন, রোজই আসে। তোর বিয়ের কথা কিছু বলে না? না। তুই নিজে কিছু জিজ্ঞেস করিস না? কি যে তুমি বল মা। আমি গিয়ে জিজ্ঞেস করব। আমার বিয়ের কি করলেন আপা? লতিফা হেসে ফেললেন। মনে মনে ভাবলেন বড় কথা শিখেছে তো এই মেয়ে। মেয়েরা কত তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যায়। কয়েক’দিন আগেও খালি গায়ে ফ্রক পরে ঘুরে বেড়াত, আজ বিয়ের কথা হচ্ছে। হয়ত সত্যি সত্যি বিয়েও হয়ে যাবে। জাপানে না কোথায় চলে যাবে এইটুকু মেয়ে। এক’দিন তারও ছেলেমেয়ে হবে। ওদেরও বিয়ের বয়স হবে। লতিফার চোখ ভিজে ওঠার উপক্রম হল। বকুল বলল, তুমি শুয়ে থাক তো মা! আবার জ্বর এসে যাবে। আসবে না। আয় বারান্দায় একটু বসি। তারা দু’জন বারান্দায় মোড়া পেতে বসল। তোমার শরীর সতি সত্যি সেরে গেছে নাকি মা? বোধ হয় সেরেছে। বাবুর স্কুল ছুটি হয়। কখন? এখন ছুটি হয়ে গেছে। ও খেলতে যায়, সন্ধ্যা হয় আসতে আসতে। আর মুনা? ও কখন আসে? একেক দিন একেক সময় আসে। বলতে বলতেই শওকত সাহেবকে লম্বা পা ফেলে আসতে দেখা গেল। লতিফা বললেন তোর বাবার শরীরটা খুব খারাপ হয়েছে তো। হুঁ। যত্ন করার কেউ নেই। কখন খায় কি করে কে জানে। বকুল বলল, চল ভেতরে যাই মা। বাবা এখানে আমাদের বসে থাকতে দেখলে রাগ করবেন। শওকত সাহেব কিন্তু রাগ করলেন না। সন্ধ্যাবেলা বই নিয়ে বসবার জন্যেও কাউকে বললেন না। নতুন কাজের মেয়েটা তার চোখের সামনে একটা গ্লাস ভেঙে ফেলল, তিনি শুধু মৃদু স্বরে বললেন–কাজকর্ম সাবধানে করবি। অন্য সময় হলে এর জন্যে চড়-চাপড় মারতেন। চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় তুলতেন। রাতের খাবারও খেলেন নিঃশব্দে। মুনা একবার বলল, তোমার শরীর ভাল তো মামা। হুঁ ভাল। অফিসে ঝামেলা মিটেছে? হুঁ মিটেছে। লতিফা বসেছেন ওদের সঙ্গে। আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে এখনো তাঁর জ্বর আসেনি। মাথা একটু হালকা লাগছে। এ ছাড়া শারীরিক আর কোনো অসুবিধা নেই। তিনি নিজেও ব্যাপারটা ঠিক বিশ্বাস করতে পারছেন না। বকুল বসেছে তার পাশে। তিনি একবার বললেন–দেখ তো আমার গা গরম কি না। বকুল বলল না। অসুখটা বোধ হয়। সেরেই গেল। তার চোখ চকমক করতে লাগল। শওকত সাহেব খাওয়া শেষ করে উঠবার সময় বললেন–মুনা, তুই একটু শুনে যা। অফিসের ঝামেলার ব্যাপারটা মুনা শুনল। শান্ত স্বরে বলল এটা কতদিন আগের ব্যাপার? এক মাস। এতদিন তুমি এটা হজম করে রেখেছিলে? শওকত সাহেব জবাব না দিয়ে সিগারেট টানতে লাগলেন। এখন ওরা পুলিশ কেইস করবে? ই। টাকাটা রিকভার না হলে করবে। তোমাকে তো তাহলে ধরে নিয়ে যাবে হাজতে। হুঁ। টাকার ব্যাপারে তুমি কিছু জানো? না। কিছুই জানি না। মুনা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, তুমি জানো না ঠিক না মামা! তুমি জানো। তবে তুমি একা এটা করনি তা ঠিক। এত সাহস তোমার নেই। সঙ্গে অন্য লোক ছিল। তুমি খানিকটা শেয়ার পেয়েছে? কত পেয়েছে? শওকত সাহেব চুপ করে রইলেন। মুনা তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল, কত পেয়েছ? দশ হাজার। আমাকে যে ছ’হাজার দিতে চেয়েছিলে সেটা ওখান থেকেই? হ্যাঁ। বাকি চার হাজার কোথায়? ধার-টার ছিল। শোধ দিয়েছি। ঐ দিন যে মিষ্টি আনলে সেটা কি এই টাকা থেকে? শওকত সাহেব জবাব দিলেন না। দ্বিতীয় সিগারেট ধরিয়ে খুক খুক করে কাশতে লাগলেন। মুনা বলল–মামা, তুমি কাল সকালেই অফিসে গিয়ে বলবে, আমি টাকাটা ফেরত দেব, তবে আমাকে দুমাস সময় দিতে হবে। দু’মাসের মধ্যে কোথায় পাব এত টাকা? পাবে না। তবে এর মধ্যে আমরা বকুলের বিয়ে দিয়ে দেব। তোমাকে জেলে নিয়ে ঢোকালে ঐ মেয়ের কি আর বিয়ে হবে, না পড়াশোনা হবে? যত সুন্দরীই হোক চোরের মেয়েদের আমাদের সমাজে জায়গা নেই। বুঝলে মামা? তুমি কালই অফিসে যাবে এবং দু’মাস সময় নেবে। ঠিক আছে নেব। মুনা উঠে পড়ল। অনেক রাত পর্যন্ত ঘুম এল না তার। সে বুঝতে পারল বকুলও জেগে আছে, কিন্তু সাড়াশব্দ দিচ্ছে না। সে কি কিছু আঁচ করতে পারছে? বকুল? কি? জেগে আছিস তো কথা বলছিস না কেন? বাবা এতক্ষণ ধরে কি বললেন? তেমন কিছু না। তোর বিয়ে নিয়ে কথা হল। বুঝলি বকুল, আমি অনেক ভেবে-টেবে দেখলাম অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে যাওয়া খারাপ না। এর কিছু কিছু ভাল দিকও আছে। বকুল ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেলল। এই সময়ে মেয়েদের মনে প্রচুর ভালবাসা থাকে। ভালবাসাটা খুবই জরুরি। সব কিছু অভাবই সহ্য করা যায়, কিন্তু ভালবাসার অভাব সহ্য করা যায় না। বকুল ক্ষীণ স্বরে বলল, তোমাকে একটা কথা বলব মুনা আপা? বল। তুমি রাগ করবে না তো? রাগ করবার মতো কথা না হলে রাগ করব কেন? বল কি বলবি? বকুল মুনার কাছে সরে এসে আলতো করে একটা হাত রাখল তার গায়ে। প্রায় ফিসফিস করে বলল, ক্লাস টেনের একটা মেয়ে যদি কোনো ছেলেকে পছন্দ করে তাহলে সেটা কি খারাপ আপা? মুনা তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল, ছেলেটা কে? বকুল জবাব না দিয়ে দুহাতে মুনাকে জড়িয়ে ধরল। মুনা লক্ষ্য করল বকুল থারথার করে কাঁপছে। ভোরবেলা সূর্য ভালভাবে ওঠার আগেই বাড়িতে পুলিশের ওসি এবং তিনজন কনস্টেবল এল। তাদের সঙ্গে সার্চ ওয়ারেন্ট আছে। জিনিসপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে তারা টাকা খুঁজল। লতিফা রক্তশূন্য মুখে দরজা ধরে সারাক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। মাঝে মাঝে কিছু একটা বলতে চেষ্টা করলেন। কেউ তা বুঝতে পারল না। শওকত সাহেব বসে রইলেন বেতের চেয়ারে। তিনি খুব ঘামতে লাগলেন। তার ঠিক সামনেই বসেছেন ওসি সাহেব। এ জাতীয় দৃশ্য তিনি তাঁর জীবনে অনেক দেখেছেন। কাজেই এ দৃশ্য তার মনে কিছুমাত্র রেখাপাত করল না। তবু তিনি একবার লতিফার দিকে তাকিয়ে বললেন, ভয়ের কিছু নেই, আপনি শান্ত হয়ে বসুন। এই ভোরবেলাতেও বাড়ির সামনে এবং তার লাগোয়া রাস্তায় প্রচুর লোক জমে গেল। এ বাড়িতে একটি মেয়ে খুন হয়েছে। এ রকম একটা গুজব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল। রোদ বাড়তে লাগল কিন্তু কৌতূহলী মানুষের ভিড় কমল না। সার্চ শেষ হতে হতে আটটা বেজে গেল। ওসি সাহেব বললেন, শওকত সাহেব আপনার নামে একটা ওয়ারেন্ট আছে, আপনাকে আমাদের সঙ্গে যেতে হবে। ভয়ের কিছু নেই, জামিনের ব্যবস্থা হবে। মুনা বলল, আমি কি যেতে পারি আপনার সঙ্গে? হ্যাঁ নিশ্চয়ই পারেন। একজন পুরুষ মানুষ হলে ভাল হত। উকিল-টুকিলের ব্যবস্থা করতে হবে। অনেক ছোটাছুটির ব্যাপার আছে। মুনা বাবুকে পাঠাল পরিচিত। যদি কাউকে পাওয়া যায়। আশপাশের বাসার অনেকের সঙ্গেই এদের চেনা-জানা। তবু কেউ আসতে রাজি হল না। সাবধানী মানুষ, ইচ্ছা করে কোনো বাজে ঝামেলায় জড়াতে চায় না। বাকেরকে শুধু পাওয়া গেল। সে ঘুমুচ্ছিল। খবর পেয়েই ছুটে এসেছে। তার মুখ অস্বাভাবিক গম্ভীর। সিগারেট ধরিয়ে দায়িত্বশীল মানুষের মত সে মুনাকে বলল, নো প্রবলেম, এক ঘণ্টার মধ্যে জামিনে ছাড়িয়ে আনব। ছেলেখেলা নাকি। তোমরা সব দরজা বন্ধ করে বসে থাক। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে কোনো উত্তর দেবে না। ঘরে টাকা-পয়সা আছে তো? বকুল তার ঘরে একা একা বসে ছিল। শওকত সাহেবকে বের করে নিয়ে যাবার সময় সে শুধু বেরিয়ে এল। অত্যন্ত কঠিন স্বরে জিজ্ঞেস করল, আমার বাবাকে আপনারা কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? ওসি সাহেব সে প্রশ্নের জবাব দিতে পারলেন না। শওকত সাহেব অপ্রকৃতিস্থ মানুষের মত চারদিকে তাকাতে লাগলেন। উপদেশ দেবার মত ভঙ্গিতে বললেন, ঠিকমত পড়াশোনা করিস মা। দু’দিন পর মেট্রিক পরীক্ষা। বাসার সামনে অসম্ভব ভিড়, সেই ভিড় ঠেলে তারা এগুতে লাগল। শওকত সাহেব শিশুদের মত শব্দ করে কাঁদতে লাগলেন। বাকের তাঁর একটা হাত ধরে আছে। সে মৃদু স্বরে বলল, মামা কাঁদবেন না। কিছু হবে না, এক ঘণ্টার মধ্যে জামিন হবে। আমার চেনা লোকজন আছে। বাসার সামনে লোকের ভিড় বাড়তেই লাগল। উকিল ভদ্রলোক দেখতে পান-বিড়ির দোকানদারের মত। রোগা দড়ি পাকানো চেহারা। কথাও ঠিকমত বলতে পারেন না–জড়িয়ে যায়। কিন্তু তিনি নাকি ফৌজদারী মামলায় একজন মহা ওস্তাদ আদমি। তার হাতে মামলা গেলে নাকে তেল দিয়ে ঘুমানো যায়। কিন্তু মুনা বিশেষ ভরসা পাচ্ছে না। তাকে সামনে বসিয়ে উকিল সাহেব গভীর যত্নে দাঁত খোঁচাচ্ছেন। তাঁর ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে প্রতিটি দাতের গোড়ায় গোসত আটকে আছে এবং এই মুহূর্তেই সেগুলো বের করা দরকার। মুনার পাশের চেয়ারে বসে আছে বাকের। তার ভাবভঙ্গি খুব বিনীত। বাকেরই তাকে এখানে নিয়ে এসেছে। বাকেরের ধারণা এই লোক এক নম্বর আসল জিনিস, খাঁটি বাঘের বাচ্চা। বাঘের বাচ্চারা এত দীর্ঘ সময় নিয়ে দাঁতের পরিচর্যা করে তা মুনার জানা ছিল না। সে অস্বস্তি নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। উকিল সাহেব মাঝে মাঝে দাঁত খোঁচানো বন্ধ রেখে এক দৃষ্টিতে মুনার দিকে তাকাচ্ছেন। তাঁর দৃষ্টি মুনার বুকের কাছে এসে থমকে যাচ্ছে। এমন নির্লজ্জ মানুষও আছে নাকি? আসামি আপনার কে হয়? আমার মামা। আপন মামা? মায়ের ভাই? জি। মুনা ভেবে পেল না। আপন মামা না পর মামা, তার সঙ্গে এই মামলার সম্পর্ক কী? নাকি উকিল-মোক্তারদের স্বভাবই হচ্ছে খামোক প্রশ্ন করা। ভয়ের কিছু নেই, ক্রিমিন্যাল মিস এপ্ৰোপ্রিয়েশন; চারশ তিন ধারা। ম্যাক্সিমাম পেনাল্টি হচ্ছে দুবছরের জেলা। এত নার্ভাস হবার তো কিছু দেখি না। ডোন্ট গেট নাভার্স। মুনা নড়েচড়ে বসে রুমাল দিয়ে নাক ঘষল। বড় ঘাম হচ্ছে। এ জন্যেই বোধ হয় তাকে নাৰ্ভাস দেখাচ্ছে। আপনার নাম কী? মুনা। মিস নাকি মিসেস? এই সব কী ধরনের প্রশ্ন? মুনা মৃদু স্বরে বলল, মিস। মিস মুনা, এখন আপনি বলুন আপনার মামা কী চুরি সত্যি সত্যিই করেছেন? মুনা কী জবাব দেবে ভেবে পেল না। তাকাল বাকেরের দিকে। বাকের দাঁত বের করে হাসছে। কেন হাসছে কে বলবে। এটা একটা লজ্জায় ফেলার প্রশ্ন, এতে হাসির কিছু নেই। উকিল সাহেব অ্যাসট্রেতে একগাদা থুথু ফেলে সেদিকে গভীর মনোযোগের সঙ্গে তাকিয়ে রইলেন। যেন এই মুহূর্তে থুথুটায় বিরাট একটা কিছু ঘটবে। সেই ঘটনা তিনি প্রত্যক্ষ করতে চান। এক সময় তার দেখা শেষ হল। তিনি গম্ভীর গলায় বললেন–চুরি যদি না করে থাকেন। তাহলে খালাস করে আনা মুশকিল। আর যদি সত্যি চুরি করে থাকেন। সহজেই খালাস হয়ে যাবে। মুনা অবাক হয়ে বলল, তার মানে? অপরাধীদের খালাস করা অতি সহজ। এরা যখন অপরাধ করে কিছুটা সাবধান হয়েই করে। কোর্টে অপরাধ প্রমাণ করা কঠিন হয়। আর যারা অপরাধী না, ভাল মানুষ–তারা পড়ে যায় প্যাঁচকলে। হা হা হা। মুনা অবিশ্বাসী চোখে তাকিয়ে রইল। ভদ্রলোক গম্ভীর হয়ে বললেন, অপরাধীদের খালাস করে আনার মধ্যে একটা আনন্দ আছে। আইনের পশ্চাৎদেশে লাথি বসানোর আনন্দ। আমি এটা খুব এনজয় করি। বাকের শব্দ করে হাসতে লাগল। সে মুগ্ধ। মুনা কিছু বলল না। উকিল সাহেব জড়ানো স্বরে বললেন। এই জাতীয় ছোটখাটো মামলা আমি নিই না। তবে আপনারটা নেব। মুনা একবার ভাবল বলে আমারটা কেন নেবেন? কিন্তু সে কিছু বলল না। উকিল সাহেবের চোখ তার বুকের ওপর স্থির হয়ে আছে। শাড়ির আঁচল টেনে দেয়া উচিত। সেটা অভদ্রতা হবে। এতটা অভদ্র হওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। মুনা বলল, আমরা কী তাহলে উঠব? হ্যাঁ উঠবেন। যাবতীয় কাগজপত্র এবং আসামিকে সঙ্গে নিয়ে আসবেন। কবে আসবেন সেটা আমার মুহুরির কাছ থেকে জেনে যান। মুহুরি কোথায়? পাশের ঘরে। আর শুনুন–আমার ফিস কিন্তু বেশি। এবং ফিসের টাকার সবটা আমি অ্যাডভান্স নেই। আজ এক টাকা কাল আট আনা–এই ভাবে নেই না। আপনার ফিস কত? সেটা বলব কাগজপত্র দেখে। বাকের দাঁত বের করে বলল, একটু সার কনসেশন করতে হবে। গরিব মানুষ সার ভেরি নিডি। কনসেশন কিছু নেই। অনোর বেলায় যা আপনাদের বেলাতেও তা। মাছের বাজার তো না। মুনা বেরিয়ে এসেই বিরক্ত স্বরে বলল ভেরি নিডি, গরিব মানুষ, এসব বলার দরকার কী? দরাদাম করতে হবে না? বল কী তুমি? বাড়িতে তো তোমার টাকার গাছ নেই। লোকটাকেও আমার পছন্দ হয়নি। আস্ত ছোটলোক। ছোটলোক কী বড়লোক এটা দিয়ে আমাদের দরকার কী? আমরা দেখব। কাকে দিয়ে কাজ উদ্ধার হয়। এই শালাকে দিয়ে হবে। এ হচ্ছে নাম্বার ওয়ান ধনুকর। ধনুকর মানে? ধনুকর মানে হচ্ছে যে, ধুনে দেয়। এই শালা ধুনে দেবে। এক ধাক্কায় মামাকে খালাস করে নিয়ে আসবে। এখন যে জিনিসটা লাগবে সেটা হচ্ছে টাকা। মানি। এখন শুরু হবে টাকার খেলা। টাকা-পয়সা কেমন আছে তোমাদের? মুনা জবাব দিল না। টাকা-পয়সা তেমন কিছু নেই। মামার কাছে ছহাজার টাকা ছিল। তার থেকে এখন কত আছে কে জানে। তার নিজের একাউন্টে পাঁচ হাজার টাকার মত আছে। বেতনের টাকা থেকে জমানো। মামির কিছু গোপন সঞ্চয় আছে। তাঁর ভাই তাকে ঈদ উপলক্ষে টাকা-পয়সা যা দেন তার সবটাই মামি জমিয়ে রাখেন। একটা পাই পয়সাও খরচ করেন না। বাকের বলল, কোল্ড ড্রিংক-ট্রিংক কিছু খাবে? ফান্টা, পেপসি? মুনা বিরক্ত স্বরে বলল–ঠাণ্ডার মধ্যে ফান্টা-পেপসি খাব কী জন্যে? তাহলে গরম কিছু খাও। চা খাবে? আমি এখন কিছু খাব না। আপনি চলে যান, আমার অন্য কাজ আছে। কী কাজ? এক জায়গায় যাব। চল আমি দিয়ে আসি। আমার এখন কোনো কাজ নেই, ফ্রি আছি। আপনি তো সব সময়ই ফ্রি। বাকের শুকনো মুখে বলল, মামুন সাহেবের কাছে যাচ্ছ? তিনি তো আমার মত ফ্রি না। কলেজ-টলেজ আছে। তাকে কী এখন পাবে? মামুন সত্যি সত্যি ছিল না। গতকাল রাতের ট্রেনে দেশের বাড়িতে চলে গেছে। কেন গিয়েছে তা মেসের কেউ বলতে পারে না। কাউকে জানিয়ে যায়নি। মুনা বড়ই অবাক হল। এমন হুঁট করে চলে যাবে? কিছু বলেও যাবে না। কবে ফিরে আসবে তাও কেউ বলতে পারল না। বেলা সাড়ে এগারোটা। মুনা বাসায় ফিরে যাবার জন্যে রিকশা নিল, কিন্তু মাঝপথে ঠিক করল। অফিসে যাবে। পর পর দু’দিন কামাই হয়েছে। আজ নিয়ে তিন দিন হবে। এটা ঠিক না। কিন্তু অফিসে যেতে ইচ্ছা করছে না। কিছুতেই মন বসছে না। আকাশে মেঘ করেছে। বৃষ্টি হবে বোধ হয়। রিকশাওয়ালা প্রচণ্ড গতিতে রিকশা টানছে। একটা অ্যাকসিডেন্ট-ট্যাকসিডেন্ট বাধাবে। মুনা একবার ভাবল বলবে আস্তে চালাও ভাই। কিন্তু কথা বলতে ইচ্ছা করছে না। কেন যেন শুধু কান্না পাচ্ছে। দুঃসময়ে কাউকে কাছে থাকতে হয়।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ১৮ জন


এ জাতীয় গল্প

→ কোথাও কেউ নেই (২০)
→ কোথাও কেউ নেই (১৯)
→ কোথাও কেউ নেই (১৮)
→ কোথাও কেউ নেই (১৭)
→ কোথাও কেউ নেই (১৬)
→ কোথাও কেউ নেই (১৫)
→ কোথাও কেউ নেই (১৪)
→ কোথাও কেউ নেই (১৩)
→ কোথাও কেউ নেই (১২)
→ কোথাও কেউ নেই (১১)
→ কোথাও কেউ নেই (১০)
→ কোথাও কেউ নেই (৮)
→ কোথাও কেউ নেই (৭)
→ কোথাও কেউ নেই (৬)

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ...