বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন

বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা

আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

জোছনা বিলাস

"জীবনের গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান PRINCE FAHAD (১১১৪ পয়েন্ট)



X স্ত্রীকে ধমক দিয়ে বললাম,চুপ! একদম চুপ।বাবাকে নিয়ে আর একটা কথাও বলবে না।বাবা-মা কি ধন তুমি তা বুঝো?বুঝো বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ব কত্তব্য কি?এসব তুমি বুঝবে না।মা-বাবার সাথে কেমন ব্যাবহার করতে হয় তোমার বাবা-মা তোমাকে শেখাইনি।আর শেখাবেই বা কেমন করে!তারা তো সবসময় বিজনেস নিয়ে ব্যস্ত।কোনোকিছুতে তো কমতি নেই,তারপরও আরো চাই আরো চাই।বড় হওয়ার কী এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা!' আমি যখন এগারো মাস বয়সের ছোট্ট শিশু তখন আমার মা মারা যায়।আম্মা মারা যাওয়ার পর আমাকে নিয়ে বাবা পড়লেন মহা বিপদে।এই দুধের শিশুকে নিয়ে কী করবেন?কার কাছে যাবে?কোথা থেকে মায়ের বুকের দুধ এনে দিবে?আর কেই বা তাকে মানুষ করবে?উফ!এতোসব ঝালেমা কীভাবে সামলাবেন? সবাই মিলে বাবাকে বললো,আরেকটা বিয়ে করে নে সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে।কিন্তু বাবা তা করেননি। বাবা চাননি আমি সৎ মায়ের সংসারে মানুষ হই।সৎ মায়ের সংসারে মানুষ হওয়ার কী যে জ্বালা যন্ত্রণা বাবা তা ভালো করেই জানেন।তা-ই বাবা আর দ্বিতীয় বিয়ে করেনি।আমাকে আঁকড়ে ধরে তাঁর বাঁচার চেষ্টা।' বাবা আমাকে সবসময় নিজ হাতে তুলে খাওয়াতেন।বুকে নিয়ে ঘুম পাড়াতেন।আমি প্রস্রাব পায়খানা করে বাবার বুক ভাসিয়ে দিতাম।বাবা রাগ করে কখনো আমাকে ছুড়ে ফেলে দেননি।ঠিক মায়েদের মতো আমার ময়লা পরিষ্কার করতেন।কান্না করলে কোলে নিয়ে সারা পাড়া ঘুরে বেড়াতেন।আঙুল ধরে এক পা দু'পা করে হাটতে শেখাতেন।বাবার কান্ড কারখানা দেখে সবাই হাসাহাসি করতো।বাবা কখনো মন খারাপ করতেন না।করলেও তা প্রকাশ করতেন না।আমার একটু অসুখবিসুখ হলে ঠিক মায়েদের মতো সারারাত জেগে থাকতেন।ছুটে যেতেন ডাক্তার কাকুর কাছে।যত রাতই হোক না কেন ডাক্তার কাকুকে না নিয়ে বাড়িতে আসতেন না।আমাকে নিয়ে তাঁর আরো কত্ত পাগলামি! আমাদের স্কুলটা ছিলো বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে।মাঝ পথে একটা খাল ছিলো।খালের ওপর বাঁশের তৈরি সাঁকো।আমি একা একা যেতে পারতাম না।প্রচন্ড ভয় পেতাম।অবশ্য সাঁকোর নিচ দিয়েও যাওয়া যেতো।তবে পানি ভাঙতে হতো।চৈত্র মাসেও হাটু অবধি পানি জমে থাকতো।বাবা আমাকে কাঁদে করে সেই সাঁকো পাড় করে স্কুলে পৌঁছে দিতো।আবার নিয়ে আসতো।এতোকিছুর পরও বাবা আমার ওপর কখনো রাগ বা বিরক্ত হতো না।তাঁর সবটুকু উজাড় করে আমাকে ভালোবাসতো।আমার সব শখ আহ্লাদগুলো পূরণ করতো।মায়ের অভাব কী জিনিস কখনো অনুভব করিনি।আজও করতে পারি না।' বাবার এখন বয়স হয়েছে।চুল দাড়ি পেকেছে।শরীরের চামড়া কুজো হয়ে গেছে।শক্তি সামর্থ্য কমেছে।হাটা চলাও করতে পারে না।হুইলচেয়ারে বসে পড়েছেন।এখন সন্তান হিশেবে আমার উচিত বাবার সব দায় দায়িত্ব নিজের কাঁদে তুলে নেয়া।কখন কী প্রয়োজন খোঁজ খবর রাখা।তাঁর শখ আহ্লাদগুলো পূরণ করা।আর পুত্রবধূ হিশেবে তোমার কত্তব্য বাবার দেখাশোনা করা।সবসময় তাঁর পাশেপাশে থাকা।তাঁর সাথে গল্পসল্পে সময় কাটানো।হাসি আনন্দে মাথিয়ে রাখা।আর তুমি কি-না বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসার কথা বলছো।তুমি ভাবলে কী করে তোমার কথায় বাবাকে আমি বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসবো।ছিঃ ছিঃ ভাবতেও আমার ঘৃণা হচ্ছে,তোমার মতো একটা মেয়েকে আমি বউ করে এনেছি।ইচ্ছে করছে... কী করবে?মারবে আমাকে?মারো! রাগ সামলাতে না পেরে কষে একটা থাপ্পড় মারলাম স্বর্ণাকে।থাপ্পড়টা একটু জুড়েসোড়েই মেরেছি।গাল ফুলে লাল টকটকে হয়ে গেছে।পাঁচ আঙুলের দাগ বসে গেছে।স্বর্ণা গালে হাত দিয়ে কেঁদে কেঁদে বললো,'আজ পর্যন্ত কেউ আমার গায়ে হাত তুলেনি।তুমি কোন সাহসে আমার গায়ে হাত তুললে।আজ এর একটা বিহিত হবে।হয় তোমার বাবা এই বাড়িতে থাকবে নয়তো আমি।' অনেক বুঝিয়েছি আর না।অবুঝকে বুঝানো যায় কিন্তু যে বুঝেও বুঝে না তাকে হালের বলদ দিয়েও বুঝানো যায় না।স্বর্ণার হাতটা ধরে এক টান দিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসলাম।আমার শ্বশুর বাড়ি বেশি দূরে নয় আধঘন্টার রাস্তা।গিয়ে দেখি শ্বশুর শাশুড়ি দুজনেই বাড়িতে আছে।ভালোই হলো দুজনকে এক সাথে পেয়ে গেলাম।স্বর্ণার মা-বাবা আমাদের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। আমি স্বর্ণাকে তাঁর বাবা-মার দিকে ঠেলে দিয়ে বললাম,'একদিন আপনার কাছ থেকে আপনার মেয়েকে চেয়ে নিয়েছিলাম।বলেছিলাম,কখনো ওকে কোন কষ্ট দিবো না।আমি আমার কথা রাখতে পারিনি,আমি ব্যর্থ।তা-ই আপনার মেয়েকে আবার আপনার কাছে ফিরিয়ে দিতে এসেছি।আমাকে ক্ষমা করবেন।আর হ্যাঁ,আরেকটা কথা বলে যায়,আপনার মেয়েকে এমন কোন ছেলের সাথে বিয়ে দিবেন --যার বাবা-মা,পরিবার পরিজন বলতে কেউ নাই কিংবা আপনার ঘর জামাই হয়ে থাকতে পারবে।কারণ,আপনার মেয়ে স্বামী চায়,স্বামীর পরিবার নয়।স্বামীর বাবা-মা তাঁর কাছে উগ্র ঝামেলা।চিন্তা করবেন না,কিছুদিনের মধ্যেই ডিবোর্স লেটার পেয়ে যাবেন।' বাবার রুমে উঁকি দিয়ে দেখি,বাবা মন খারাপ করে বসে আছে।আমি জানি তাঁর মন খারাপের কারণটা কী।আমি বাবার কাছে গিয়ে পা দুটো জড়িয়ে ধরে বললাম,বাবা আমি স্বর্ণার হয়ে তোমার কাছে ক্ষমা চাইছি।ও বুঝতে পারেনি তা-ই এমনটা করেছে।তুমি প্লিজ মন খারাপ করে থেকো না! ঠিকই তো বলেছে।আমি বুড়ো মানুষ নানানরকম সমস্যা।ঘরে থাকলেই কী আর বৃদ্ধাশ্রমে থাকলেই কী?তুই এই নিয়ে আবার বৌমার সাথে রাগারাগি করেছিস কেন? শুধু রাগারাগি করিনি,একবারে ওর বাবা-মার কাছে দিয়ে এসেছি।যে মেয়ে আমার বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাতে চায়,তার জায়গা আমার বাড়িতে হবে না।আমার কাছে তোমার সমতুল্য এই পৃথিবীতে আর কেউ নেই।বলতে পারি আর না পারি,তোমাকে বড্ড বেশি ভালোবাসি বাবা। বাবা আমার দিকে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে।তাঁর চোখ ছলছল করছে।আমি বাবাকে বললাম,যাজ্ঞে এসব বাদ দাও।তোমার শরীর ভালো আছে তো? হুঁ,কেন? বাহিরে যাব। এত রাতে আবার বাহিরে গিয়ে কী করবি? চা খাব। চা পাতি তো ঘরেই আছে,বানিয়ে নিয়ে আয়। ঘরে তো প্রতিদিনই খাই,আজকে একটু অন্যরকম চা খাব।দেখ না,বাহিরে কত সুন্দর জোছনা নেমেছে!এই ভরা জোছনাতে মাঝ রাস্তায় দাঁড়িয়ে টং দোকানের ধোয়া উড়ানো গরম চা খেতে কেমন লাগবে বাবা?বাবা হাসতে হাসতে বলবো,ফাইন খারাপ।আমি বাবাকে বললাম,এটা তো তোমার পুরোনো ডাইলগ,নতুন কিছু বলো।বাবা আমাকে বললেন,বাবারে সবকিছুতে নতুন খুঁজলে হয় না।দেখ না,আজকে আমরা নতুনত্ব খুঁজতে খুঁজতে নিজেকেই হারিয়ে ফেলছি।যাজ্ঞে চল, বাবা ছেলে মিলে জোছনা বিলাস করে আসি।' হুঁ,চল। সারারাত বাবাকে নিয়ে জোছনা বিলাস করে ভোর রাতে এসে শুয়েছি।সকাল সকাল কলিংবেলের আওয়াজে ঘুমটা ভেঙে গেলো।এত সকালে আবার কে এলো?দরজা খুলে দেখি, স্বর্ণা আর তাঁর মা-বাবা এসেছে।আমি উনাদের ভিতরে এসে বসতে বললাম।আমার শ্বশুর মশাই বললেন,'বসতে আসিনি বাবা,শুধু একটা কথা বলে চলে যাব।ব্যর্থতা তোমার নয়,ব্যর্থতা আমার।আমি আমার মেয়েকে সঠিক শিক্ষা দিতে পারিনি।বাবা,আমার মেয়েটা অবুঝ কিন্তু খারাপ না।তুমি নাহয় ওকে একটু বুঝিয়ে নিও।আমি কথা দিচ্ছি ও আর কখনো এরকম ভুল করবে না।আমি বললাম,ভুল তো আমার সাথে করেনি,করেছে আমার বাবার সাথে।বাবা অনেক কষ্ট পেয়েছেন।স্বর্ণাকে বলুন বাবার কাছে ক্ষমা চাইতে।বাবা যদি ক্ষমা করেন তাহলে আমার কোনো সমস্যা নাই।' স্বর্ণা বাবার পা জড়িয়ে ধরে কাঁদছে আর বলছে,বাবা আমি না বুঝে বড় ভুল করে ফেলেছি।আপনি আমাকে ক্ষমা করুন।আর কখনো এমন ভুল হবে না।বাবা স্বর্ণা মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো,মারে তুই আমার মেয়ের মতো।সন্তান ভুল করলে বাবা কী কখনো রাগ করে থাকতে পারে? অফিসের কাজ শেষ করে বাসার আসতে অনেকটা দেরি হয়ে গেছে।এসে দেখি, বাবা আর স্বর্ণা একসাথে বসে গল্প করছে।তাদের দেখে মনে হচ্ছে খুব হাসি খুশি।হেসে লুটিয়ে পড়ছে।কাল যে এতোকিছু হয়ে গেলো এসবের কিছুই মনে নেই।আমাকে দেখে বাবা বললো,তোর আসতে এত দেরি হলো কেন?আমরা কখন থেকে বসে আছি! এই অফিসে একটু জরুরি কাজ ছিলো।কেন কোথাও যাবে নাকি? হুঁ,জোছনা বিলাস করতে।আজকে আমাদের সাথে বৌমাও যাবে।সেই সন্ধ্যা থেকে বলতে বলতে আমার মাথা নষ্ট করে ফেলছে।চল আজকে সবাই মিলে জোছনা বিলাস করে আসি।' ---সমাপ্ত লেখাঃ আবিদুর রহমান


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৩৫ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ...