বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন

বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা

আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

রাশা (৯)

"ছোটদের গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান TARiN (১১১০ পয়েন্ট)



X মুহম্মদ জাফর ইকবাল ০৯. পাত্রী যখন সানজিদা রাশা আর গ্রামের অন্য ছেলেমেয়েরা আজ একটু সকাল সকাল স্কুলে চলে এসেছে। প্রতিদিনই সবাই দলবেঁধে আসে, অনেকগুলো ছেলেমেয়ে তাই দেখা যায় কোনোদিন কারো ভাত খাওয়া হয়নি, কারো ইংরেজি খাতা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, কারো প্যান্টের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বোতামটা গেছে ছিঁড়ে, এক্ষুণি সেখানে বোতাম সেলাই করতে হবে। আবার কোনো কোনোদিন দেখা যায় কেউ মন ঠিক করতে পারছে না সে আজকে স্কুলে যাবে কি যাবে না–সব মিলিয়ে প্রতিদিনই অনেক সময় নষ্ট হয়, তাই বেশ আগে থেকেই স্কুলে যাওয়ার কাজ শুরু করতে হয়। আজকে কিভাবে কিভাবে জানি কারো দেরি হয়নি, তাই যখন স্কুলে এসেছে তখন স্কুলে আর কেউ পৌঁছায়নি, স্কুলের দপ্তরি মাত্র ক্লাসঘর খুলছে। রাশা তখন বারান্দায় পা ছড়িয়ে বসেছে আর ঠিক তখন ঢ্যাঙ্গা মতন একটা ছেলেকে ইতস্তত এদিক-সেদিক তাকিয়ে এগিয়ে আসতে দেখা গেল। গ্রামের ছেলে চেহারায় তার স্পষ্ট ছাপ আছে। ছেলেটা ইতিউতি তাকিয়ে একটু এগিয়ে এসে জিতুকে জিজ্ঞেস করল, “ক্লাস এইট কোনখানে?” জিতু হাত দিয়ে ক্লাস এইট দেখানোর চেষ্টা করে। তখন রাশা জিজ্ঞেস করল, “কেন? ক্লাস এইটের কী হয়েছে?” “একটা চিঠি।” “চিঠি? কে দিয়েছে চিঠি?” ছেলেটা এদিক-সেদিক তাকাল, তারপর গলা নামিয়ে বলল, “সানজিদা।” “দেখি! আমি ক্লাস এইটে পড়ি।” “সত্যি?” “হ্যাঁ সত্যি।” “গোপনীয় চিঠি সানজিদা বলেছে ক্লাস এইটে দিতে। একটা মেয়ের নাম বলেছিল খাসা না মাসা রাশা মুখ শক্ত করে বলল, “রাশা?” “হ্যাঁ। হ্যাঁ, রাশা।” “আমি রাশা। দেখি চিঠিটা।” ছেলেটা আবার এদিক-সেদিক তাকাল তারপর তার বুক পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করে রাশার হাতে দিল। কাগজে লেখা : “আমার খুব বিপদ। আজকে দুপুরবেলা আমাকে জোর করে বিয়ে দিয়ে দেবে। তোমরা যদি আমাকে উদ্ধার না করো তাহলে আমাকে গলায় দড়ি দিয়ে মরতে হবে। -সানজিদা” রাশা দুইবার চিঠিটা পড়ল, তারপর ফিসফিস করে বলল, “সর্বনাশ!” জয়নব পাশে দাঁড়িয়ে ছিল, জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে?” “আমাদের সানজিদাকে জোর করে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে।” জয়নব একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, “সবসময় এই এক ঘটনা। দেখিস একদিন আমাকেও জোর করে বিয়ে দিয়ে দিবে।” “কক্ষণো না। আঠারো বছর হওয়ার আগে মেয়েদের বিয়ে দেওয়া যায়। এইটা বেআইনি।” জয়নব বাঁকা করে হাসল, “তোর এই বেআইনি ঘটনার খবরটা কে জানছে?” “আমরা জানাব।” “কাকে জানাবি?” “পুলিশকে।” “পুলিশের তো আর খেয়েদেয়ে কাজ নাই। তোর কথা শুনে যাবে বিয়ে থামাতে।” কথাটা সত্যি। পুলিশ তার কথায় বিয়ে থামাতে যাবে বলে মনে হয়। রাশা দাঁত কামড়ে চিন্তা করছিল তখন ঢ্যাঙ্গা ছেলেটা বলল, “আমি যাই।” “কোথায়?” “বাড়িতে। লুকিয়ে এসেছি, না গেলে সন্দেহ করবে।” “তুমি সানজিদার কী হও?” “ভাই। মামাতো ভাই।” “সানজিদার কী অবস্থা?” “খারাপ। কান্নাকাটি করছে। তাই ঘরের ভেতর দরজা বন্ধ করে আটকে রেখেছে।” রাশা একটা নিশ্বাস ফেলল, “যে ছেলের সাথে বিয়ে দেবে, সেই ছেলে কী করে?” “ছেলে? ছেলের সাথে বিয়ে দেবে নাকি। বিয়ে দেবে একটা বড় মানুষের সাথে।” “একই কথা।” রাশা অধৈর্য হয়ে বলল, “কী করে সেই লোক?” “কিছু করে না। জমিজিরাত আছে।” রাশা ফোঁস করে একটা শ্বাস ফেলল, বলল, “লেখাপড়া?” ছেলেটা হাসার চেষ্টা করল, “লেখাপড়া? গ্রামের মানুষ লেখাপড়া করে কী করবে?” “লেখাপড়া নাই কাজকর্ম নাই কিন্তু বিয়ে করার শখ?” ছেলেটা উদাসমুখে বলল, “বিয়ে করার শখ তো সবারই থাকে!” রাশা কোনো কথা না বলে ছেলেটার দিকে কটমট করে তাকাল, তখন ছেলেটা বলল, “আমি যাই।” “দাঁড়াও, দাঁড়াও, সানজিদার বাড়ি কোথায় বলে যাও। কতদূর?” “কাছেই। গোকুলপুর গ্রামে। বাবার নাম মাহতাব হোসেন। গিয়ে জিজ্ঞেস করলে বলে দেবে।” “গ্রামের নাম কী বললে, গোকুলপুর?” “না, গোকুলপুর।” “তাই তো বললাম, গোকুলপুর।” “উঁহু। তুমি বলেছ গোকুলপুর। আসলে নাম হচ্ছে গোকুলপুর।” রাশা ভালো করে লক্ষ করেও তার আর এই ছেলের গোকুলপুরের উচ্চারণের মাঝে কোনো পার্থক্য খুঁজে পেল না। সে তাই হাল ছেড়ে দিয়ে বলল, “কেমন করে যেতে হয়? “বাজারটা পার হয়ে দক্ষিণ দিকে যাবে।” “আমি উত্তর-দক্ষিণ বুঝি না। ডানদিক না বামদিক বলো–” ছেলেটাকে একটু বিভ্রান্ত দেখা গেল, রাশা যেরকম উত্তর-দক্ষিণ বুঝে না এই ছেলেটা সেরকম ডান-বাম বুঝে না। খানিকক্ষণ চিন্তা করে বলল, “পুব দিক থেকে এলে বাম দিকে। আর পশ্চিম দিক থেকে এলে ডান দিকে।” রাশা অধৈর্য হয়ে বলল, “পুব-পশ্চিম তো আমি জানি না!” ছেলেটাও অধৈর্য হয়ে বলল, “বাজারের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করো সুখনকান্দি কোনদিকে–” “একটু আগে না বললে গোকুলপুর। এখন সুখনকান্দি কেন বলছ?” “সুখনকান্দির পুব দিকে হচ্ছে গোকুলপুর।” রাশা হাল ছেড়ে দিল, বলল, “তুমি একটু দাঁড়াও। আমি তোমার সাথে যাব।” জয়নব ভুরু কুঁচকে বলল, “তুই যাবি? এখন?” “যেতে হবে না? অবশ্যই যেতে হবে।” “গিয়ে কী করবি?” “গিয়ে বলব সানজিদাকে বিয়ে দিতে পারবে না। আঠারো বছরের আগে কোনো মেয়েকে বিয়ে দেওয়া বেআইনি।” “তুই ভাবছিস সানজিদার বাপ-চাচারা তোর কথা শুনবে?” “কেন শুনবে না?” “আয়নাতে কোনোদিন তুই নিজেকে দেখেছিস?” “কেন দেখব না? একশবার দেখেছি।” “দেখিস নাই। দেখলে তুই জানতি তুই হচ্ছিস পুঁচকি একটা মানুষ। তার ওপর মেয়েমানুষ। তোর কথা কেউ শুনবে না।” “শব্দটা হচ্ছে পুঁচকে। পুঁচকি না। তা ছাড়া মানুষ, মেয়ে মানুষে কিছু আসে যায় না। সত্যি কথা যে কেউ বলতে পারে, ছোট-বড় পুরুষ-মেয়ে কিছুতে কিছু আসে যায় না।” “ঠিক আছে। যা, যখন সানজিদার বাপ-চাচা তোকে দৌড়িয়ে দেবে তখন আমাকে দোষ দিস না।” “আমি কি একা যাব নাকি?” “কাকে নিয়ে যাবি?” “তোকে।” “আমাকে?” “হ্যাঁ, চল যাই।” জয়নব কিছুক্ষণ রাশার দিকে তাকিয়ে হতাশভাবে মাথা নাড়ল। তারপর বলল, “তোর সাথে থেকে আমি যে কোনদিন কী বিপদে পড়ব, খোদাই জানে। রাশ বলল, “চল আমরা দুইজন গিয়ে সানজিদার বাসাটা আগে চিনে আসি। তারপর ক্লাসের সব ছেলেমেয়েকে নিয়ে বাড়িটা ঘেরাও করব। মানববন্ধন করব। অনশন করব।” জয়নব বলল, “তুই গ্রামের মানুষকে চিনিস না!” “না চিনলে নাই। আয় যাই।” জিতু বলল, “আমিও যাব।” রাশা বলল, “না, তুই এখন থাক। যখন পুরো ক্লাস নিয়ে যাব তখন তুই যাবি। আমি আমাদের ক্লাসের ছেলেমেয়েদের জন্যে একটা চিঠি লিখে যাচ্ছি, ছেলেমেয়েরা এলে তুই দিয়ে দিস। আমরা যাব, বাড়িটা চিনেই চলে আসব। আমাদের বই-খাতা রেখে যাচ্ছি, তুই দেখে রাখিস।” রাশা তার ক্লাসের ছেলেমেয়েদের একটা চিঠি লিখে সেটা জিতুর হাতে দিল। জিতু একটু মন খারাপ করে সেই চিঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল, রাশা তখন জয়নবকে নিয়ে ঢ্যাঙ্গা ছেলেটার সাথে রওনা দিল। জয়নব বিড়বিড় করে বলল, “যদি কোনোভাবে বাড়িতে খবর পায় আমি স্কুল পালিয়ে তোর সাথে আদাড়ে-বাদাড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি তাহলে আমার কপালে দুঃখ আছে।” “দুঃখ থাকলে থাকবে। আমরা যাচ্ছি সানজিদাকে রক্ষা করতে। সে লিখেছে তাকে উদ্ধার করতে না পারলে গলায় দড়ি দিবে মনে আছে?” জয়নব মাথা নাড়ল, বলল, “তা ঠিক।” ঢ্যাঙ্গা ছেলেটার সাথে রওনা দিয়ে একটু পরেই রাশা বুঝতে পারল কাজটা তারা বুদ্ধিমানের মতোই করেছে। ছেলেটা এমন বিচিত্র সব রাস্তা ঘাট দিয়ে যেতে লাগল যে রাশা বুঝতে পারল সে কোনোদিন একা একা এখানে আসতে পারত না। ছেলেটা বলেছিল বাড়িটা কাছেই, কিন্তু রাশার বোঝা উচিত ছিল গ্রামের মানুষের কাছে কাছে কিংবা দূরে শব্দগুলোর কোনো অর্থ নেই। হেঁটে হেঁটে যেখানে যাওয়া সম্ভব সেটাই হচ্ছে কাছে। শেষ পর্যন্ত যখন তারা সানজিদার বাড়িতে পৌঁছল তখন রাশা আর জয়নব দুজনেই ঘেমে-নেয়ে উঠেছে। ঢ্যাঙ্গা ছেলেটা বলল, “বরযাত্রী চলে এসেছে মনে হয়।” রাশ চমকে উঠে বলল, “বরযাত্রী চলে এসেছে? সানজিদা যে বলল দুপুরে? এখন তো সকাল।” জয়নব বলল, “গ্রামের মানুষের কাছে সকাল-দুপুর এক ব্যাপার। তাদের কাছে পার্থক্য শুধু দুইটা, দিন আর রাত।” “সর্বনাশ। এখন যদি জোর করে বিয়ে দিয়ে দেয়?” জয়নব কোনো কথা বলল না, মুখ শক্ত করে রাশার দিকে তাকাল। রাশা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চিন্তা করল, তারপর একটা নিশ্বাস ফেলে ঢ্যাঙ্গা ছেলেটাকে বলল, “তুমি কি আমাকে সানজিদার বাপের কাছে নিয়ে যাবে?” ছেলেটা বলল, “মাথা খারাপ? আমার ঘাড়ে দুইটা মাথা? আমি তোমাদের কারো কাছে নিতে পারব না। তোমরা নিজেরা যার কাছে যেতে চাঁও যাও।” রাশা বলল, “তাহলে অন্তত একটা জিনিস করো।” “কী?” “কাউকে বলো না আমরা সানজিদার স্কুল থেকে এসেছি। ঠিক আছে?” “ঠিক আছে।” রাশা জয়নবকে বলল, “চল যাই।” “দাঁড়া।” “কী হলো?” “তিনবার কুলহু আল্লা পড়ে বুকে ফুঁ দিয়ে দিই।” জয়নব তিনবার কুলহু আল্লা পড়ে প্রথমে নিজের বুকে তারপর রাশার বুকে ফুঁ দিল। তারপর দুজন সানজিদার বাড়িতে গিয়ে ঢুকল। বিয়ে বাড়িতে আরো অনেক হইচই হয়, আরো অনেক আনন্দের ছাপ থাকে। এখানে আনন্দের ছাপ নেই, মানুষজন একটু গম্ভীর মুখে ঘোরাঘুরি করছে। খুব বেশি মানুষ নেই, ছোট বাচ্চারা সেজেগুজে ছোটাছুটি করছে সেরকম দেখা গেল না। রাশা এবং জয়নব যে বাইরে থেকে এসেছে সেটা কেউ ধরতে পারল না, দুপক্ষই ধরে নিল তারা অন্যপক্ষের। ভিতরে ঢুকেই তারা বরযাত্রীর দলটাকে আবিষ্কার করল। যে মানুষটা বিয়ে করতে এসেছে সে যক্ষ্মা রোগীর মতো শুকনো, গাল ভেঙে ঢুকে গেছে। গায়ের রঙ বিবর্ণ। একটা সিল্কের পাঞ্জাবি পরে এসেছে, মাথায় পাগড়ির বদলে একটা টুপি। গলায় একটা মালা, কোরবানির সময় কোরবানির গরুর গলায় এরকম মালা দেয়, রাশা এর আগে কখনো মানুষকে এরকম মালা পরতে দেখেনি। কিছু নানা বয়সী মানুষ ঘরে গম্ভীর মুখে বসে আছে। উঠানে কয়েকটা চেয়ার সেখানে কয়েকজন বয়স্ক মানুষ নিচু গলায় কথা বলছে, মুখ দেখে মনে হয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। রাশা কাছাকাছি গিয়ে মানুষগুলোর কথী শোনার চেষ্টা করল, ধুরন্ধর টাইপের একজন বলল, “মোটরসাইকেল ছাড়া কী রকম হয়? আজকাল কি দেখেছেন মোটরসাইকেল ছাড়া কেউ বিয়ে দেয়?” বয়স্ক একজন মানুষ, মনে হয় সানজিদার বাবা, ভীত মুখে বললেন, “মোটরসাইকেল আমি কোথা থেকে দেব। গরিব মানুষ–” “আপনি গরিব মানুষ মানলাম, কিন্তু আমাদের ছেলে গ্রামের মাঝে একজন সম্মানী মানুষ। সে যখন বউ নিয়ে যাবে, তখন দশজন জিজ্ঞেস করবে শ্বশুরবাড়ি থেকে কী দিল? তখন আমরা কী বলব? হ্যাঁ?” “কিন্তু সেইরকম তো কথা ছিল না। যখন বিয়ের আলাপ হয় তখন আপনারা বলেছেন কোনোরকম দেয়া-থোয়া নাই। সুন্দর একটা বউ হলেই হবে। আমার মেয়ে ফুলের মতন সুন্দর—” ধুরন্ধর মানুষটা বলল, “আরে, সুন্দর না হলে কি আমরা এই বাড়িতে আসি—” রাশার মনে হলো মানুষটার টুঁটি চেপে ধরে, কিন্তু সে টুঁটি চেপে ধরল! সেখান থেকে সরে এলো। এরকম নির্লজ্জভাবে কেউ কথা বলতে পারে সে কখনো কল্পনাও করেনি। এতক্ষণ তার মাঝে একটু দুশ্চিন্তা ছিল, এখন তার সাথে যোগ হলো রাগ। মোটামুটি সে ঠিক করে ফেলেছে, যা হয় হবে সে কিছু একটা করে ফেলবে আজ। জয়নব বাড়ির ভেতর থেকে ঘুরে এসেছে, রাশা জিজ্ঞেস করল, “দেখেছিস সানজিদাকে?” “না। একটা ঘরের ভিতর বন্ধ করে রেখেছে।” রাশা কোনো কথা না বলে একটা নিশ্বাস ফেলল। জয়নব জিজ্ঞেস করল, “কী করবি ঠিক করেছিস?” রাশা মাথা নাড়ল, “এখনো ঠিক করি নাই।” “জামাইকে গিয়ে সোজাসুজি বলে দেখলে হয়। বলবি, মেয়ের বয়স মাত্র চৌদ্দ। চৌদ্দ বছরের মেয়েকে বিয়ে করা বেআইনি। একটু ভয় দেখা।” “কিভাবে ভয় দেখাব?” “বল যদি বিয়ে করে তাহলে আমরা পুলিশকে খবর দিব। এস.পি. ডি.সি. আমাদের পরিচিত। মনে নাই তুই যখন কম্পিউটারে রাজ্জাক স্যারের ছবি দেখালি-” রাশার চোখ হঠাৎ চকচক করে উঠে, সে ফিসফিস করে বলল, “আমার মাথায় একটা আইডিয়া এসেছে।” “কী আইডিয়া?” “আমার একটা মোবাইল ফোন দরকার।” জয়নবের মুখের আলো দপ করে নিভে গেল। বলল, “মোবাইল ফোন এখন কোথায় পাব?” “সত্যিকারের মোবাইল ফোন না হলেও হবে। খেলনা হলেও হবে।” “খেলনা মোবাইল ফোনই আমি কোথায় পাব?” “দেখতে মোবাইল ফোনের মতো কোনো কিছু হলেও হবে।” “কেন? কী করবি আগে শুনি।” “আমি ভান করব মোবাইল ফোনে কথা বলছি। ঐ যে শুটকা জামাইটা দেখছিস, তাকে শুনিয়ে শুনিয়ে কথা বলব।” “তাকে শুনিয়ে শুনিয়ে কী বলবি?” “এমন ভান করব যেন আমি পুলিশকে ফোন করে বলছি যে এখানে আঠারো বছরের কম বয়সের একটা মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে আর সে জন্যে তারা যেন তাকে ধরতে আসে, এই সব।” জয়নব কিছুক্ষণ চিন্তা করে মাথা নাড়ল, বলল, “মন্দ না বুদ্ধিটা। মনে হয় কাজ করতেও পারে। ভয় দেখাতে হবে শুটকা জামাইকে। কিন্তু—” “কিন্তু কী?” “কিন্তু জামাইকে শোনাবি কেমন করে?” “জামাইটা ঐ জানালার কাছে বসেছে না? আমি জানালার ঐ পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে জোরে জোরে কথা বলব যেন শুনতে পায়।” “কিন্তু ঐ পাশে কি দাঁড়ানোর জায়গা আছে? ঝোঁপঝাড়-” “ঝোঁপঝাড়ই তো ভালো।” জয়নব বলল, “না শুনলে তো হবে না–যেভাবে হোক কথাগুলো শোনাতে হবে।” “হ্যাঁ। লিকলিকে জামাইয়ের নামটা আগে জেনে নিই, জোরে জোরে কয়েকবার নামটা বলব, তাহলেই মানুষটার কৌতূহল হবে। শুনতে চাইবে কে তার নাম বলছে।” জয়নব মাথা নাড়ল, বলল, “ঠিক বলেছিস।” “এখন দরকার, একটা মোবাইল ফোন না হলে মোবাইল ফোনের মতো দেখতে কোনো জিনিস।” রাশা আর জয়নব তখন চারপাশে খুঁজতে থাকে। ঠিক তখন একজন মানুষ সিগারেট ধরানোর জন্যে পকেট থেকে একটা ম্যাচের বাক্স বের করে ফস করে একটা কাঠি জ্বালিয়ে খালি বাক্সটা ছুঁড়ে ফেলে দেয়। মানুষটা এগিয়ে যাবার পর জয়নব ম্যাচের বাক্সটা তুলে এনে বলল, “এই যে নে তোর মোবাইল ফোন।” “ম্যাচের বাক্স?” “হ্যাঁ, এমনভাবে ধরবি যে শুধু উপরের অংশটা যেন দেখতে পায়, নিচে কী আছে কেউ জানবে না।” রাশা একটু সরে গিয়ে ম্যাচের বাক্সটা একটু খুলে সেটাকে মোবাইল ফোনের মতো ধরে একটু প্রাকটিস করল, কেউ যদি না জানে তাহলে ভাবতে পারে যে সে আসলেই মোবাইল ফোনে কথা বলছে। রাশা জয়নবের দিকে তাকিয়ে বলল, “যা এবারে তুই জামাইয়ের নামটা জেনে আয়।” জয়নব চলে গেল, কয়েক মিনিট পর ফিরে এসে বলল, “শুটকো জামাইয়ের নাম রজব আলী। বাবার নাম-” “থাক বাবার নামের দরকার নাই, আমি পরে উল্টোপাল্টা করে ফেলব। রজব আলী। নাম হওয়া উচিত ছিল গজব আলী।” রাশা জয়নবের দিকে তাকিয়ে বলল, “ঠিক আছে। আমি এখন যাচ্ছি। আমাকে আবার কুলহু আল্লাহ্ পড়ে ফুঁ দে।” জয়নব আবার কুলহু আল্লাহ পড়ে রাশার বুকে ফুঁ দিল। . রাশা ঘরটার পেছনে ঝোঁপঝাড়ের ভেতর দিয়ে হেঁটে জানালার নিচে দাঁড়াল। ঠিক জানালার নিচে দাঁড়িয়েছে কিনা বোঝার চেষ্টা করতেই উপর থেকে রজব আলী স্বয়ং গলা খাকারি দিয়ে থুথু ফেলল, একটুর জন্যে রাশা বেঁচে গেল আরেকটু হলে তার মাথায় পড়ত। রাশা ম্যাচের খালি বাক্সটা মোবাইল ফোনের মতো করে ধরে গলা উচিয়ে বলল, “রজব আলী, রজব আলী, বললাম তো নাম রজব আলী।” রাশা সরাসরি তাকাল না, কিন্তু তার মনে হলো কাজ হয়েছে। সুতি সত্যি রজব আলী নিজের নাম শুনে জানালায় উঁকি দিয়েছে। রাশা না দেখার ভান করে বলল, “হ্যাঁ। আমি হান্ড্রেড পার্সেন্ট সিওর সানজিদার বয়স আঠারো থেকে কম। সানজিদা আমার সাথে পড়ে আমি জানি।” রাশা এবারে কিছুক্ষণ শোনার ভান করল, তারপর বলল, “দেখেন, আমি লুকিয়ে লুকিয়ে একটা চিপা থেকে ফোন করছি, আমার হাতে সময় নাই, আপনি বরং এস.পি, সাহেবকে দেন। এসপি, সাহেব আমাদের স্কুলে এসেছিলেন, তখন একটা ঘটনা ঘটেছিল সেই থেকে এস.পি, সাহেব আর ডি.সি. সাহেব আমাকে খুব ভালো করে চিনেন। আপনি বলেন রাশা কথা বলতে চায়। রা-শা।” রাশা এবারে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল, ফোনটা এস.পি, সাহেবকে দিতে যতক্ষণ সময় লাগার কথা ততক্ষণ সময় দিয়ে সে এবারে এস.পি. সাহেবের সাথে কথা বলার অভিনয় করতে থাকে, “মালিকুম।” একটু বিরতি, তারপর হাসি হাসি মুখে, “জি জি ভালো আছি। আমরা সবাই ভালো আছি।” একটু বিরতি তারপর হঠাৎ খুবই গম্ভীর গলায়, “আপনি যখন আমাদের স্কুলে এসেছিলেন, তখন মনে আছে আমার সাথে সুন্দর একটা মেয়ে ছিল, সানজিদা? সেই মেয়েটাকে তার বাবা-মা জোর করে একটা মানুষের সাথে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে। আমাদের দেশে আইন আছে না আঠারো বছরের কম হলে বিয়ে দেওয়া যাবে না? তাহলে?” রাশা এবারে কিছুক্ষণ শোনার ভান করল, হুঁ-হ্যাঁ করল তারপর উত্তেজিত গলায় বলল, “খুবই ভালো হয় তাহলে! খুবই ভালো হয়। সবাইকে অ্যারেস্ট করে নিয়ে যাবে? হাতে হ্যান্ডকাফ দিয়ে কোমরে দড়ি? ইস! কী মজা হবে! কখন আসবে পুলিশ?” কিছুক্ষণ আবার শোনার ভান করল, তারপর বলল, “আধাঘণ্টার মাঝে? গুড!” একটু বিরতি, তারপর, “না না আমি কাউকে বলব না। ওরা কেউ জানতে পারবে না। তারপর হঠাৎ মনে পড়েছে সেরকম ভান করে বলল, “স্যার, স্যার আপনি কি সাথে কোনো সাংবাদিক পাঠাতে পারবেন? তাহলে যখন অ্যারেস্ট করে তখন ছবি তুলতে পারত। পত্রিকায় ছাপা হতো, নাবালিকা বিবাহ করিতে গিয়ে জামাই গ্রেপ্তার।” রাশ তখন হি হি করে অনেকক্ষণ হাসল। সে একবারও উপর দিকে তাকাল না কিন্তু চোখের কোনা দিয়ে বুঝতে পারল সেখানে রজব আলী দাঁড়িয়ে সবকিছু শুনছে যা যা বলা দরকার সব সে বলে দিয়েছে এখন আর রজব আলীকে কিছু শোনানো দরকার নেই। কাজেই সে ফোনে কথা বলার ভঙ্গি করে হেঁটে হেঁটে একটু সরে এলো। তার খুব ইচ্ছে করছিল একবার চোখ তুলে তাকিয়ে দেখে রজব আলী মানুষটার মুখের ভাব কেমন হয়েছে কিন্তু সে কোনো ঝুঁকি নিল না। কিছুক্ষণের মাঝে জয়নব এসে রাশার সাথে যোগ দিয়ে হাত-পা নেড়ে চোখ উপরে তুলে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, রাশা থামাল, বলল, “জয়নব, খবরদার বেশি খুশি হবি না। খুবই নরমাল ভাব দেখা–এখন কিন্তু আমাকে অনেকে লক্ষ করবে। আমার সাথে সাথে তাকেও।” জয়নব তখন বাড়াবাড়ি খুশির ভঙ্গিটা চেপে গিয়ে ফিসফিস করে বলল, “কী মজা হয়েছে তুই চিন্তা করতে পারবি না।” “কেন? কী হয়েছে?” “তোর কথা শুনে গজব আলীর মনে হয় ভয়ে কাপড় নষ্ট হয়ে গেছে। ভিতরে হইচই শুরু হয়ে গেছে। ফিসফিস করে শুধু কথা বলে একজন আরেকজনের সাথে!” রাশা মুখ টিপে বলল, “এখন আরেকটা কাজ বাকি।” “কী?” “ভিতরে গিয়ে গুজব ছড়িয়ে দিতে হবে রাস্তার মোড়ে অনেক পুলিশ দেখা গেছে।” “কিভাবে ছড়াবি?” “খুবই সোজা, খালি কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করব, পুলিশ কেন আসছে?” জয়নব চোখ কপালে তুলে রাশাকে একটা ধাক্কা দিয়ে বলল, “ইস! তুই যা পাজি! তোর মাথায় যা ফিচলি বুদ্ধি।” “শব্দটা ফিচলি না। শব্দটা ফিচলে।” রাশা আর জয়নব এবার বাড়ির উঠানে গিয়ে প্রথম যে মানুষটাকে পেল তাকে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা আপনি কি জানেন, পুলিশ কেন আসছে?” মানুষটা অবাক হয়ে বলল, “পুলিশ? পুলিশ কেন আসবে?” “আমি জানি না, তাই আপনাকে জিজ্ঞেস করলাম।” “কোথায় পুলিশ?” “ঐ রাস্তার মোড়ে। তাই তো বলল।” “কে বলল?” রাশা ঠোঁট উল্টে বলল, “ঐ যে একজন, চিনি না আমি!” মানুষটাও মাথা নেড়ে হেঁটে চলে গেল, তখন তারা একটু সামনে গিয়ে বুড়োমতন একজনকে জিজ্ঞেস করল, “চাচা, এখানে কী কিছু হয়েছে?” “না তো। কিছু হয়নি।” “তাহলে পুলিশ কেন আসছে?” “পুলিশ আসছে নাকি?” “আমি তো জানি না–” বলে রাশা হেঁটে চলে গেল। . কয়েক মিনিটের ভেতর পুরো বাড়িতে গুজব রটে গেল যে পুলিশ আসছে, শুধু যে আসছে তা নয়, কয়েকজন বলল, তারা পুলিশকে দেখেও ফেলেছে। তারপর যা একটা মজা হলো সেটা দেখার মতো! রজব আলী তার গলা থেকে মালা খুলে, টুপি পকেটে ভরে কোনোমতে তার স্যান্ডেল পরে রীতিমতো দৌড়। সাথে সাথে বুড়ো আধবুড়ো যারা আছে তারাও। রাশা দেখল সানজিদার বাবা অবাক হয়ে একজনকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনারা কোথায় যাচ্ছেন?” মানুষটা মুখ খিঁচিয়ে বলল, “আপনারা মানুষ খুব খারাপ, বিয়ে করাতে ডেকে এনে পুলিশ খবর দেন!” সানজিদার বাবা চোখ কপালে তুলে বললেন, “আমরা? আমরা পুলিশ কখন খবর দিলাম?” মানুষটার সেটা ব্যাখ্যা করার সময় নাই, কোনোমতে পায়ে স্যান্ডেল পরে ছুটতে থাকে। রাশা আর জয়নব কোনোমতে হাসি চেপে রজব আলীর পিছনে পিছনে ছুটতে থাকে, চিৎকার করে ডাকে, “দুলাভাই! দুলাভাই?” মানুষটা পিছনে ফিরে রাশাকে দেখে আঁতকে ওঠে। রাশা মিষ্টি করে বলল, “আপনারা চলে যাচ্ছেন কেন? বসেন। একটুক্ষণ বসেন। প্লিজ!”। মানুষটা হাত তুলে রাশাকে দেখিয়ে বলল, “তু-তু-তুমি। তু-তু-তুমি!” “আমি কী?” “ম-মনে করেছ আমি কি-কিছু জানি না। আমি সব জানি।” “কী জানেন?” রজব আলী সেটা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করল না। রাস্তা ছেড়ে মাঠের মাঝখান দিয়ে ছুটতে লাগল। বাড়ির সামনে সবাই অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, এখনো কেউ বুঝতে পারছে না কী হয়েছে। সানজিদার বাবা হতভম্বের মতো এদিক-সেদিক তাকিয়ে বললেন, “কী হয়েছে? আমি এখনো বুঝতে পারছি না।” একজন বলল, “পুলিশ আসছে, পুলিশ আসছে বলে সবাই ছুটতে লাগল।” “কিন্তু পুলিশ আসলে তাদের সমস্যা কী? তারা কী চোর না ডাকাত?” যারা হাজির ছিল তারা কেউ এর উত্তর দিতে পারল না, তখন রাশা বলল, “আসলে চাচা, চুরি-ভাকাতি অপরাধ, আবার আঠারো বছরের কমবয়সী মেয়ে বিয়ে করাও অপরাধ। মনে হয় সেই জন্যে!” সানজিদার বাবা চোখ বড় বড় করে রাশার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি কে?” “আমি সানজিদার সাথে পড়ি।” “তুমি কখন এসেছ?” “সানজিদার বিয়ের খবর শুনেই স্কুল থেকে ছুটতে ছুটতে চলে এসেছি।” সানজিদার বাবার হঠাৎ কী যেন সন্দেহ হলো, জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার নাম কি?” “আমার নাম রাশা।” সানজিদার বাবার চোখ বড় বড় হয়ে গেল, বললেন, “তুমি সেই মেয়ে, তোমাদের এক মাস্টারের চাকরি গিয়েছে তাকে তুমি ধরিয়ে দিয়েছ?” রাশা ঠিক বুঝতে পারল না সানজিদার বাবা এটা প্রশংসা হিসেবে বলছেন নাকি অভিযোগ করে বলছেন। তাই সে ইতস্তত করে বলল, “আমি আসলে কিছু করি নাই। ডিসি সাহেব এসপি সাহেব ছিলেন, তারা খুব রাগ করলেন—” হঠাৎ করে সানজিদার বাবা কিছু একটা অনুমান করলেন, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে রাশার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি কী পুলিশ খবর দিয়েছ?” “জি না আমি পুলিশকে কিছু বলি নাই।” একটু ইতস্তত করে বলল, “তবে—” “তবে কী?” “বরপক্ষ মনে করেছে আমি বলেছি। তাতেই যা ভয় পেয়েছে।” সানজিদার বাবা বিস্ফারিত চোখে রাশার দিকে তাকিয়ে রইলেন, তাকে দেখে মনে হতে লাগল, নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। তিনি রাগবেন না হাসবেন বুঝতে পারছিলেন না, কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন তখন রাশা বলল, “চাচা, ভালোই হয়েছে বর পার্টি ভেগে গেছে!” “কী বললে? ভালো হয়েছে?” “জি চাচা। কমবয়সী মেয়ের বিয়ে দিলে অনেক ঝামেলা। আপনিও বিপদে পড়তেন।” সানজিদার বাৰা অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে রাশার দিকে তাকিয়েছিলেন, তার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না যে এইটুকুন একটা মেয়ে তাকে বড় মানুষের মতো উপদেশ দিচ্ছে। তিনি রেগে উঠার চেষ্টা করছিলেন, তখন রাশা বলল, “চাচা, আপনি যাই বলেন, জামাইটাকে আমার একদম পছন্দ হয় নাই। গাল ভাঙা, শুকনা দেখে মনে হয় যক্ষ্মারোগী। ভালো করে কথাও বলতে পারে না, মনে হয় তোতলা! আমাদের সানজিদার বিয়ে হবে স্মার্ট একটা ছেলের সাথে। ডাক্তার না হলে ইঞ্জিনিয়ার না হলে পাইলট। আমরা সবাই গেট ধরব–এক লক্ষ টাকার এক পয়সা কম দিলে আমরা গেট ছাড়ব না!” “কত বললে? এক লক্ষ টাকা?” “জি। সানজিদার জামাইয়ের কাছে এক লক্ষ টাকা হবে হাতের ময়লা!” “হাতের ময়লা?” “জি চাচা। সানজিদা এত সুন্দর তার সাথে এইরকম ভুসভুসা জামাই মানায় না চাচা।” আশেপাশে যারা দাঁড়িয়েছিলেন তাদের একজন মাথা নেড়ে বলল, “কথাটা ঠিক। জামাইয়ের চেহারাটা জানি কেমন।” আরেকজন বলল, “শুধু জামাই কেন? জামাইয়ের বাপের চেহারাও তো খাটাশের মতো।” “শুধু চেহারা খাটাশের মতো না, স্বভাব-চরিত্রও জানি কেমন? আগে কথা বলেছে যে দেয়া-থোয়া লাগবে না, এখন বলে মোটরসাইকেল না দিলে বিয়া হবে না! কী ছোটলোক।” সানজিদার বাবা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “মনে হয় আল্লাহ্ যেটা করেন ভালোর জন্যেই করেন।” রাশা মাথা নাড়ল, বলল, “জি চাচা সেইটা সত্যি কথা।” সানজিদার বাবা মাথা ঘুরিয়ে রাশার দিকে তাকালেন, রাশা বলল, “চাচা, আমি কি সানজিদার সাথে একটু দেখা করতে পারি?” “যাও। ভিতরে যাও।” “চাচা, আরেকটা কথা চাচা।” “কী কথা?” কালকে থেকে সানজিদাকে আবার স্কুলে পাঠাবেন। প্লিজ। সে লেখাপড়ায় এত ভালো!” সানজিদার বাবা কিছুক্ষণ রাশার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, “ঠিক আছে।” সানজিদাকে একটা লাল শাড়ি পরানো হয়েছে, রাশাকে দেখে তাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। রাশা বলল, “এই মেয়ে, কাঁদছিস কেন বোকার মতো? তোর জামাই ভেগে গেছে, তোর আর চিন্তা নাই।” তারপর তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “তোকে যা সুন্দর লাগছে। আমি ছেলে হলে নির্ঘাত তোকে বিয়ে করতাম!” বয়স্ক একজন মহিলা মাথায় থাবা দিয়ে বললেন, “এত রান্নাবান্না হয়েছে, এতো খাবার এখন কী করব?” রাশা মাথা ঘুরিয়ে বলল, “সেটা নিয়ে আপনি চিন্তা করবেন না খালাম্মা। আমাদের ক্লাসের সব ছেলেমেয়ে চলে আসবে! অনশন করতে এসে পেট ভরে খেয়ে যাবে! হি হি হি…”


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৩১ জন


এ জাতীয় গল্প

→ রাশা (১৫) (শেষ পর্ব)
→ রাশা (১৪)
→ রাশা (১৩)
→ রাশা (১২)
→ রাশা (১১)
→ রাশা (১০)
→ রাশা (৮)
→ রাশা (৭)
→ রাশা (৬)
→ রাশা (৫)
→ রাশা (৪)
→ রাশা (৩)
→ রাশা (২)
→ রাশা (১)

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ...