বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন

বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা

আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

মৃত্যুর দিন-তারিখ

"ফ্যান্টাসি" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান Radiyah Ridhi (৩৫ পয়েন্ট)



X জামাল হোসেন একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্রাঞ্চ ম্যানেজার। একদিন এক ভদ্রলোক এলেন তার অফিসকক্ষে, বললেন, আমার একটা অ্যাকাউন্ট আছে, সব টাকা তুলে ফেলতে চাই..., দ্যাখেন তো কত জমা আছে? অ্যাকাউন্ট নম্বর বলেন... লোকটা অ্যাকাউন্ট নম্বর বলার পর জামাল হোসেন কম্পি­উটারে চোখ বুলিয়ে বললেন, ১ লাখ ২০ হাজার টাকা আছে...সবই তুলে ফেলবেন কেন, অল্প কিছু রেখে অ্যাকাউন্টটা তো চালু রাখতে পারেন। না রে ভাই, আমার হাতে সময় নেই, মৃত্যুর দিন ঘনিয়ে এসেছে, টাকাপয়সা যা আছে ছেলেমেয়েদের ভাগজোখ করে দিয়ে যেতে হবে। এবার ভদ্রলোকের দিকে ভালো করে তাকালেন জামাল হোসেন। বয়স ৬০-৬৫ হবে, কিন্তু দেখতে এখনো বেশ শক্তসমর্থই মনে হয়। মাথাভর্তি সাদা-কালো-ধূসর চুল, ব্যাকব্রাশ করে আঁচড়ানো। ক্লিন শেভ করা মুখ, চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা। কালো প্যান্টে ইন করা নীল ফুলস্লিভ শার্ট। সুন্দর উচ্চারণে কথা বলেন। সব মিলিয়ে লোকটাকে দেখে একধরনের সমীহ জাগে। আপনার তো এমন কিছু বয়স হয়নি, মৃত্যুর কথা ভাবছেন কেন? আমার বয়স ৬৮। জামাল হোসেন দেখলেন, তার হিসাবের চেয়ে বয়স কিছুটা বেশি ভদ্রলোকের। হেসে বললেন, ৬৮ এমন কিছু বয়স নয়, আজকাল মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে... আমি জানি, ৬৮ এমন কিছু বয়স নয়, কিন্তু সবাই তো আর দীর্ঘ জীবন লাভ করে না...আমার মৃত্যুর সময় হয়ে গেছে। কেন, আপনার কি অসুখ-বিসুখ আছে? হাইপ্রেশার, ডায়াবেটিস, বা... না না, আপনাদের দোয়ায় রোগশোক তেমন কিছু নেই আমার। রিটায়ারমেন্টের আগে দীর্ঘ ৩১ বছর অধ্যাপনা করেছি সরকারি কলেজে। নিয়মের জীবন যাপন করেছি। এখনো রোজ সকালে এক ঘণ্টা করে হাঁটি, বিড়ি-সিগারেট খাই না, কোনো বদভ্যাস নেই... বেশ তো, তাহলে মৃত্যুভয় করছেন কেন? মৃত্যুভয়? না, আমার তো কোনো মৃত্যুভয় নেই, মৃত্যু এক স্বাভাবিক ঘটনা, ভয় পেয়ে কী হবে? তাহলে কেন বলছেন, আপনার মৃত্যু ঘনিয়ে এসেছে? আমি জানি যে আমার মৃত্যু ঘনিয়ে এসেছে, তাই বললাম...এতে ভয় পাওয়া না পাওয়ার প্রশ্ন আসছে কেন? দেখুন...কী যেন নাম আপনার? আবু জাফর মোহাম্মদ হায়দার। দেখুন হায়দার সাহেব, আমাদের কার মৃত্যু কখন হবে, আমরা কেউই তা জানি না। আজকে অফিস থেকে বেরিয়ে আমি তো রোড অ্যাকসিডেন্টে মারাও যেতে পারি...কে কখন মরবে, আমরা কেউ কি জানি? আমি জানি। থতমত খেলেন জামাল হোসেন, একটু উত্তেজিত হয়েই বললেন, আপনি জানেন! মানে, আপনি কখন মারা যাবেন, সেটা আপনি জানেন? জি, আমি জানি, কিন্তু আমি আপনাকে বলতে চাই না। কারণ, সেটা আপনি বিশ্বাস করবেন না। জামাল হোসেন ব্যস্ত মানুষ। অফিস সময়ে কারও সঙ্গে বসে আজগুবি আলাপ-আলোচনার সময় নেই তার।এই যে হায়দার সাহেবের সঙ্গে বসে আলাপ করছেন, এর ভেতর পিয়নটা এসে দুবার বলে গেছে, বাইরে তার জন্য অপেক্ষা করছেন বেশ কয়েকজন। অর্থাৎ এখন তার উচিত এই পাগলাটে মানুষটাকে বিদায় করা। কিন্তু এই ভদ্রলোকের কথা বলার ভঙ্গির মধ্যে কী একটা যেন আছে। সম্ভ্রান্ত চেহারা ভদ্রলোকের, ফালতু কথা বলার লোক মনে হচ্ছে না তাকে। কিন্তু তিনি যা বলছেন, সেটা অবিশ্বাস্য। চা খাবেন এক কাপ? না, আমি দিনে একবার চা খাই, সকালে ব্রেকফাস্টের সময়। তাহলে আপনি বলছেন, আপনি কখন মারা যাবেন, সেটা আপনি জানেন? এবার হাসলেন হায়দার সাহেব, ঝকঝকে দাঁত, সুন্দর হাসি, বাদ দিন, যেটা আপনার বিশ্বাস হচ্ছে না, সেটা নিয়ে আলাপ না করলেই তো হয়। কথা ঠিক, এ বিষয়ে আর কথা না বাড়ানোই ভালো। কিন্তু জামাল হোসেনের মন থেকে উসখুস ভাবটা কিছুতেই যাচ্ছে না। একটা মানুষ কী করে বলতে পারেন যে তিনি কখন মারা যাবেন, তা তিনি নিশ্চিত করে জানেন। এই উসখুসের কারণেই জামাল হোসেন কথা চালিয়ে যান। তাহলে আপনি বলছেন, আপনি যে খুব তাড়াতাড়ি মারা যাবেন, সেটা আপনি জানেন, দিনক্ষণও জানেন? জি, আমি এ মাসেই, মানে জানুয়ারির ২৭ তারিখ রাত দশটায় এ দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করব। আশ্চর্য! দিন তারিখ ঘণ্টা মিনিটও আপনার জানা...? জানি আপনার বিশ্বাস হচ্ছে না। আপনি কেন, কোনো মানুষই তা বিশ্বাস করবে না, কিন্তু পৃথিবীতে কত অবিশ্বাস্য ঘটনাই তো ঘটে। ধরে নিন না এটাও সে রকম একটা ঘটনা। তা ছাড়া আমি তো আপনাকে বিশ্বাস করতে বলছি না। জামাল হোসেন দোটানার মধ্যে পড়ে গেলেন। একবার মনে হচ্ছে, কাজ শেষ করে লোকটাকে দ্রুত বিদায় করা দরকার, আবার মনে হচ্ছে দেখিই না লোকটার এই পাগলামিটা কত দূর পর্যন্ত গড়ায়। আচ্ছা, ঠিক কখন থেকে এই ব্যাপারটা, মানে নিজের মৃত্যু সম্পর্কে আগাম জেনে যাওয়ার ক্ষমতা আপনি লাভ করলেন? সাত বছর আগে থেকে। শুধু নিজের মৃত্যু সম্পর্কেই আগাম জেনেছেন, নাকি অন্যদের মৃত্যু সম্পর্কেও আগেভাগে বলতে পারেন? অন্যদেরটাও বলতে পারব। অন্যদেরটাও! তাহলে তো আপনি দেশের প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি...কে কখন মারা যাবেন সবই জানেন...এমনকি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট কখন মারা যাবেন...এত সব জেনে আপনি বসে আছেন কেন? পত্রপত্রিকায় প্রচার করলে লোকে আপনার পেছনে লাইন ধরবে...হায়দার সাহেবের চেহারায় এবার একধরনের পরিবর্তন এল, গম্ভীর মুখে বললেন, ম্যানেজার সাহেব, আপনি আমার সঙ্গে ঠাট্টা করছেন? আমি একজন শিক্ষক মানুষ, সারা দেশে আমার অনেক ছাত্র, তাদের অনেকেই আজ প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি...আমি কি ঠাট্টার পাত্র? সরি, কিছু মনে করবেন না হায়দার সাহেব, আসলে পুরো ব্যাপারটা আমার কেমন গোলমেলে লাগছে। আচ্ছা, কে কখন মারা যাবেন, এই ব্যাপারটা আপনি কীভাবে নির্ণয় করেন? হাত দেখে। ওহো, তার মানে, আপনি একজন হস্তবিশারদ? আমি শুধু আয়ুরেখা চিনি, এই আয়ুরেখা দেখে মৃত্যুর সময় নির্ধারণ করার ব্যাপারটি শিখিয়েছিলেন আমার মরহুম আব্বা। আপনার আব্বা? জি, মৃত্যুর আগে তিনি তার হাতের আয়ুরেখার একটি নির্দিষ্ট অবস্থান দেখিয়ে বলেছিলেন, ১৭ সেপ্টেম্বর তিনি মারা যাবেন। আপনার মতো আমিও বিশ্বাস করিনি তখন। কিন্তু তিনি যেমনটি বলেছিলেন, ঠিক তেমনটি ২০০১ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সকাল আটটায় তিনি ইন্তেকাল করেছেন। জামাল হোসেন মনে মনে ভাবলেন, ঝড়ে বক মরে আর ফকিরের কেরামতি বাড়ে। আপনি কী ভাবছেন আমি জানি, ম্যানেজার সাহেব। আপনি ভাবছেন, ঝড়ে বক মরে আর ফকিরের কেরামতি বাড়ে...তাই নয়? চমকে উঠলেন জামাল হোসেন, আপনি কি মানুষের মনের কথাও পড়তে পারেন নাকি? এবার একটু হাসলেন হায়দার সাহেব, আরে না, এটা অনুমান করে বললাম। আচ্ছা, আপনি আমার হাত দেখে বলতে পারবেন, আমি কবে, কখন মারা যাব? আবার হাসলেন হায়দার সাহেব, পারব, কিন্তু বলব না। কেন? এবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হায়দার সাহেব বললেন, মৃত্যুর দিনক্ষণ জেনে বেঁচে থাকা বড় কষ্টের, ম্যানেজার সাহেব। সবাই এটা সহজভাবে নিতে পারে না। জেদ চেপে গেল যেন জামাল হোসেনের মনে, হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, আমি পারব সহজভাবে নিতে। প্লিজ, আপনি আমার হাতটা দেখুন। হায়দার সাহেব তার হাত দেখতে চান না, কিন্তু জামাল হোসেন যেন নাছোড়বান্দা, কিছুতেই ছাড়বেন না। বারবার এক কথা বলতেই থাকেন, প্লিজ, আমার হাতটা দেখুন, প্লিজ... আপনার বয়স কত, ম্যানেজার সাহেব? আমার? আটত্রিশ। ওহো, আমার প্রায় অর্ধেক। তা এখনই আপনার মৃত্যুর দিনক্ষণ জেনে কী হবে...আপনি তো আরও অনেক দিন বাঁচবেন... তবু আমি জানতে চাই। প্লিজ, আমার হাতটা দেখুন। অগত্যা রাজি হলেন হায়দার সাহেব, তবে একটা শর্তে, তিনি হাত দেখে যে ভবিষ্যদ্বাণীই করুন, সেটা কাউকে জানানো যাবে না।জামাল হোসেনের হাতটা উল্টেপাল্টে দেখতে শুরু করলেন হায়দার সাহেব। একবার ডান হাত, একবার বাঁ হাত। একবার তার চোখের খুব কাছে নিয়ে যান হাতটাকে, আবার একটু দূর থেকে দেখেন। জামাল হোসেনও কোনো কথা না বলে নিজের হাত হায়দার সাহেবের হাতে সঁপে দিয়ে ধৈর্য ধরে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। বেশ কিছুটা সময় নিয়ে হাত দেখার পর এবার হায়দার সাহেব অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকালেন জামাল হোসেনের দিকে। সেই চাউনিটা দেখে কেন যেন বুক কেঁপে উঠল জামাল হোসেনের। হুম্...একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হায়দার সাহেব বললেন, এ রকম তো হওয়ার কথা নয়, এত কম বয়সে..., আপনার বয়স ৩৮ বলেছিলেন না? জি। এত কম বয়সে! কী হয়েছে খুলে বলুন, হায়দার সাহেব... আপনার কোনো অসুখ-বিসুখ নেই তো? জি না, আমার কোনো অসুখ নেই, দিব্যি সুস্থ মানুষ আমি। তাহলে কেন এমন হবে... কী হয়েছে তা-ই বলুন, কী দেখলেন আমার হাতে? অধৈর্য শোনাল জামাল হোসেনের গলা। আপনাকে একটা কথা বলি ম্যানেজার সাহেব, এখন আমি যা বলব, তা আপনি বিশ্বাস না করলেই ভালো হয়। ধরে নিন আমি একটা পাগল কিসিমের লোক, যত সব উল্টাপাল্টা বকছি... আশ্চর্য, এত কথা না বাড়িয়ে আসল কথাটাই বলুন না। আরও অধৈর্য হয়ে ওঠেন জামাল হোসেন। বলতে খুবই কষ্ট হচ্ছে আমার বিশ্বাস করুন, কিন্তু আমাকে বলতে হচ্ছে, আপনার দিনও ফুরিয়ে এসেছে ম্যানেজার সাহেব। আমার হাত গণনা যদি ঠিক হয়, সামনের ফেব্রুয়ারি মাসের ১৩ তারিখ রাতের যেকোনো একটা সময়, সম্ভবত শেষ রাতের দিকে আপনি মারা যাবেন। সারা শরীর থরথর করে কেঁপে উঠল জামাল হোসেনের। কয়েক মুহূর্ত বর্তমান থেকে হারিয়ে গেলেন যেন তিনি। এ সময় পিয়নটা এসে বলল, স্যার, বাইরে তো লোকজন অপেক্ষা করতেছে দেখা করনের লাইগা..., তখনই যেন সংবিৎ ফিরে পেলেন তিনি। হায়দার সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললেন, আচ্ছা, আপনি এখন যান...অ্যাকাউন্ট ক্লোজ করার জন্য একটা দরখাস্ত লিখে দিন, সব টাকা তুলে নিয়ে যেতে পারবেন।আপনাকে একটা কথা বলি ম্যানেজার সাহেব, এখন আমি যা বলব, তা আপনি বিশ্বাস না করলেই ভালো হয়। ধরে নিন আমি একটা পাগল কিসিমের লোক, যত সব উল্টাপাল্টা বকছি... হায়দার সাহেব বেরিয়ে যাওয়ার সময় বললেন, আমার কথা ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করবেন ম্যানেজার সাহেব, বিশ্বাস না করার চেষ্টা করবেন। মনটা কেমন যেন এলোমেলো হয়ে পড়েছিল, একটা ভীতিও ঢুকে পড়েছিল। কিন্তু অফিসের কাজে ব্যস্ত হয়ে দু–একজন লোকের সঙ্গে প্রয়োজনীয় আলাপ শেষ করার পর ধীরে ধীরে মন থেকে বিষয়টা সরে যেতে লাগল। নিজের বোকামিতে যেন নিজের ওপরই বিরক্ত জামাল হোসেন। কোথাকার এক লোক এসে কী সব আজেবাজে বকল আর তা বসে বসে সময় নষ্ট করে শুনলেন। লোকটার উদ্দেশে বিড়বিড় করে জামাল বললেন, শালা পাগল! এর মধ্যে কেটে গেল বেশ কয়েকটা দিন। জামাল হোসেনের দিন চলছে আগের নিয়মে। অফিস করেন, বাড়ি ফিরে তানিয়া আর তন্ময়ের কাছে তাদের স্কুলের কথা, বন্ধুদের কথা শোনেন। ছুটির দিনে স্ত্রী ও ছেলেমেয়েকে নিয়ে এখানে–ওখানে বেড়াতে যান। কখনো বাসায় মেহমান আসে, তাদের সঙ্গে গল্পগুজব করেন। পাগলা বুড়োটার কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলেন। ২৮ জানুয়ারি ছিল শুক্রবার, ছুটির দিন। সকালে নাশতা সেরে বাজার করতে গিয়েছিলেন জামাল হোসেন। ঘরে ফিরে পত্রিকার পাতা ওলটাচ্ছেন আয়েশি ভঙ্গিতে চায়ে চুমুক দিতে দিতে। হঠাৎ একটা শোক সংবাদে চোখ আটকে গেল তার, ‘স্যার সলিমুল্লাহ কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ আবু জাফর মোহাম্মদ হায়দার গতকাল ২৭ জানুয়ারি রাত দশটায় তার নন্দনকাননস্থ বাসভবনে মৃত্যুবরণ করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৬৮ বছর। তিনি দুই পুত্র, এক কন্যাসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।’ দুবার পুরো সংবাদটি পড়লেন তিনি। হঠাৎ ধক করে উঠল বুক। তারপর ঘামতে শুরু করলেন জামাল হোসেন। শোকসংবাদের পাশে ছোট্ট একটি সাদা-কালো ছবি ছাপা হয়েছে। চিনতে ভুল হলো না, এই লোকটাই তো এসেছিলেন তার অফিসে। আশ্চর্য, ২৭ জানুয়ারি রাত দশটায় মারা যাবেন বলে গিয়েছিলেন নিজেই। তার মানে, লোকটা হাত দেখে যা গণনা করেছেন, সেটাই সত্য হলো! লোকটা তো জামালের হাত দেখে বলেছিলেন...তার মানে...মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠল, জ্ঞান হারালেন তিনি। ঠিক কতক্ষণ সংজ্ঞাহীন ছিলেন জানেন না; যখন জ্ঞান ফিরল, দেখলেন, তার চারপাশে ভিড় করে আছে তানিয়া, তন্ময় আর তার স্ত্রী বিলকিস। বিলকিস আঁচল দিয়ে চোখ মুছছে। তার বন্ধু ডাক্তার অবিনাশ থাকে পাশের বাড়িতে, সে-ও চলে এসেছে এর মধ্যে। জামাল চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তাকাচ্ছিলেন সবার দিকে। অবিনাশ বলল, কী রে, অফিসে চাপ বেড়েছে নাকি আজকাল? ব্লাড প্রেশারটা একটু বেড়েছে। যাহোক, আমি ওষুধ লিখে দিচ্ছি, ওষুধগুলো চলুক...দু–এক দিন রেস্ট নিলে সব ঠিক হয়ে যাবে, ভয়ের কিছু নেই। বিলকিস তখনো নীরবে কাঁদছিল। অবিনাশ বলল, নার্ভাস হবেন না ভাবি, দিন দুয়েক রেস্ট নিলে সব ঠিক হয়ে যাবে। অফিসে একটা ছুটির দরখাস্ত পাঠিয়ে দিলেন জামাল হোসেন। কিন্তু ঘরে শুয়ে–বসে সময় কাটিয়েও তার অস্থিরতা কাটে না। শুধু দিন গুনতে থাকেন, ১৩ ফেব্রুয়ারি...১৩ ফেব্রুয়ারি...এই একটা বিশেষ দিনের কথাই ঘুরেফিরে মনে আসতে থাকে তার। তানিয়া ও তন্ময়ের দিকে তাকিয়ে বুকের ভেতর হু হু করে ওঠে, বিলকিসের দিকে তাকিয়েও বিষণ্ন হয়ে পড়েন। হাসিখুশি মানুষটার হঠাৎ এই পরিবর্তনে সবাই বিস্মিত। বিলকিস বলেছে, তোমার যে কী হয়েছে, কিছুই তো বুঝতে পারছি না। চলো, একজন বড় ডাক্তার দেখাই... কিন্তু তার তো কোনো অসুখ নেই, ডাক্তার দেখিয়ে কী হবে? আসল কারণটা কাউকে খুলে বলতে পারেন না তিনি। ১৩ ফেব্রুয়ারি যে তার জীবনের শেষ দিন, এ কথা কী করে বলবেন, কে বিশ্বাস করবে! ছেলেমেয়ে স্কুল থেকে ফিরে যখন এসে আব্বু বলে জড়িয়ে ধরে, তখন চোখের পানি ধরে রাখতে পারেন না জামাল হোসেন। তানিয়া আর তন্ময় অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। আব্বুর কী হয়েছে বুঝতে পারে না, কিন্তু তাদেরও মনটা খারাপ হয়ে থাকে। অনেক দিন ধরে একটা সাইকেলের বায়না করছিল তন্ময়। একদিন বিকেলে দেখে, আব্বু সেই সাইকেল নিয়ে হাজির। আনন্দে ডগমগ হয়ে তন্ময় বলল, থ্যাংক ইউ আব্বু...। এ কথার জবাব না দিয়ে যখন চোখের পানি মুছছিলেন জামাল, তখন সব খুশি যেন উবে গেল তন্ময়ের, সে অবাক হয়ে শুধু আব্বুকে জড়িয়ে ধরে রাখে। আরেক দিন তানিয়ার জন্য নিয়ে এল একটি বড়সড় বার্বি পুতুল। অথচ কিছুদিন আগে যখন এ রকম একটা পুতুলের বায়না করেছিল তানিয়া, তখন আব্বু বলেছিল, তুমি এখন ক্লাস নাইনে পড়ো তানি, তোমার এখন আর পুতুল খেলার বয়স নেই। তানিয়া পুতুল পেয়ে খুশি হতে পারেনি; কারণ, তার বারবার মনে হচ্ছিল, আব্বুর যেন কিছু একটা হয়েছে। এর মধ্যে অফিসের কলিগরা দেখা করতে এলেন একদিন। জামাল হোসেন তাদের সবার কাছে কাকুতিমিনতি করে বললেন, আপনাদের সঙ্গে অনেক সময় খারাপ ব্যবহার করেছি, আপনারা আমাকে ক্ষমা করে দেবেন। কলিগদের একজন মীর আসলাম বললেন, এসব কী বলছেন স্যার, আপনার মতো একজন বস পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার, অফিসের কাজের জন্য ভালো–মন্দ তো বলতেই হয়, এসব আমরা মনে রাখি না, আপনি তাড়াতাড়ি ভালো হয়ে অফিসে ফিরে আসুন, এটাই আমরাই চাই। পিয়ন শহীদকে চাকরি থেকে বের করে দিয়েছিলাম, বেচারা না জানি পরিবার নিয়ে কী কষ্টে আছে, ওকে একটা খবর দেবেন আসলাম সাহেব, ওকে বলবেন আবার চাকরিতে যোগ দিতে, বলবেন আমাকে ক্ষমা করে দিতে... আচ্ছা স্যার বলব, আপনি বেশি চিন্তা করবেন না স্যার, আপনার তো তেমন কিছু হয়নি। কলিগরা চলে যাওয়ার পর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন জামাল হোসেন, তিনি তো জানেন তার কিছুই হয়নি, কিন্তু তা সত্ত্বেও তাকে যে চলে যেতে হবে সব ছেড়ে, এ কথা কী করে বলবেন তিনি। মাঝেমধ্যে মনে হয়, হায়দার সাহেবের সঙ্গে দেখা না হলেই হয়তো ভালো হতো, তার মৃত্যুর দিনক্ষণটা আর জানা হতো না। এখন প্রতিদিন কী কষ্টকর অপেক্ষা ফেব্রুয়ারির ১৩ তারিখের জন্য। এর মধ্যে একদিন অবিনাশ এসে বলল, সত্যি করে বল তো জামাল, তোর কী হয়েছে, কিছু একটা নিশ্চয় হয়েছে...আমি তোর ছোটবেলার বন্ধু, আমাকে অন্তত বল... সত্যি, অবিনাশ তার ছোটবেলার বন্ধু, একসঙ্গে ফুটবল খেলেছে, মারামারি করেছে, একই স্কুলে পড়েছে। জামালের মনে হলো, অন্তত অবিনাশকে সব বলা যায়। তাহলে চল, বাইরে কোথাও বসি।অবিনাশকে নিয়ে ডিসি হিল পার্কের একটা নির্জনমতো জায়গায় বসলেন জামাল। ধীরে ধীরে হায়দার সাহেবের সব কথা, তার ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী হুবহু ২৭ জানুয়ারি রাত ১০টায় তিনি যে মারা গেলেন সে কথা, ১৩ ফেব্রুয়ারি যে জামাল মারা যাবেন বলে জানিয়েছেন সেই কথা, সব খুলে বললেন। শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে অবিনাশ বলল, এটা হচ্ছে একটা কাকতালীয় ব্যাপার, কাকও উড়ে গেল ওই সময় গাছ থেকে তালও পড়ে গেল...স্রেফ কো-ইনসিডেন্স। কিন্তু তারিখ–সময় সবই কী করে মিলে গেল? অটো সাজেশন বলে একটা কথা আছে, হায়দার সাহেব হয়তো তার বাবার হাত দেখার কথা বিশ্বাস করে অনেক দিন ধরে নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট সময়ে মরবেন বলে মনে মনে প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলেন, ঘটনাচক্রে সেটাই ঘটে গেছে। তবে এসব ঘটনার বৈজ্ঞানিক কোনো ব্যাখ্যা নেই। এসব ফালতু কথা ভেবে ভেবে অনর্থক দুশ্চিন্তা করিস না তো... অবিনাশ বলল বটে ফালতু কথা, জামাল হোসেন কিছুতেই হায়দার সাহেবের ভবিষ্যদ্বাণী মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারেন না। কারণ, ঠিক যে তারিখ যে সময়ে হায়দার সাহেব মরবেন বলে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, তার একটুও এদিক–সেদিক হয়নি। ১৩ ফেব্রুয়ারি সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই জামাল হোসেন তানিয়া ও তন্ময়কে বললেন, আজ তোমরা স্কুলে যেয়ো না, আজ সারা দিন তোমরা আমার চোখের সামনে থাকবে। তানিয়া ও তন্ময় তো কিছুদিন ধরে দেখছে, তাদের আব্বুর আচরণ কেমন যেন অদ্ভুত হয়ে উঠেছে। তারা কোনো বাক্যব্যয় না করে রাজি হয়ে গেল। তন্ময়কে বললেন, ছোটবেলায় তোকে পিঠে চাপিয়ে ঘোড়া ঘোড়া খেলতাম, মনে আছে বাবা? আয়, আজ তোকে আবার ঘোড়ায় চড়াব। তন্ময় অবাক হয়ে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকে আব্বুর দিকে, তারপর আব্বুর পিঠে চেপে ঘোড়া ঘোড়া খেলতে থাকে। ঘোড়ার খেলা শেষ হলে জামাল হোসেন তানিয়াকে বললেন, ছোটবেলায় তুই নানির কাছে শোনা গল্পগুলো আবার আমাকে শোনাতি, মনে আছে? আজ আবার আমাকে সেই গল্পগুলো শোনা তো মামণি। সেই গল্পগুলো তো এখন আর আমার মনে নেই আব্বু... তাহলে তুই যে গল্প জানিস, তা-ই শোনা আমাকে। তানিয়া বইয়ে পড়া গল্প শোনাতে থাকে তার আব্বুকে, আর আব্বু তার চুলে বিলি কাটতে থাকেন। এসব দেখে বিলকিস বানু বারবার চোখ মোছে আর মনে মনে বিড়বিড় করতে থাকেন, কী যে হয়ে গেল লোকটার। রাতে জামাল হোসেন বললেন, আজ আমরা সবাই এক ঘরে ঘুমাব। বিলকিস বলে, এক ঘরে মানে? এক খাটে চারজন? হ্যাঁ, গাদাগাদি করে একসঙ্গে ঘুমাব, একটা তো রাত মোটে... কী আর করা, আজকাল স্বামীর ইচ্ছা-অনিচ্ছার আগামাথা কিছুই বুঝতে পারছে না বিলকিস বেগম। চারজনের ঘুমানোর ব্যবস্থা হলো এক খাটে। সারা রাত ঘুম নেই জামালের চোখে। তন্ময় আর তানিয়া যখন ঘুমে অচেতন, বিলকিস দেখল, জামাল কখনো চুমু খাচ্ছেন ঘুমন্ত ছেলেটার কপালে, কখনো হাত বোলাচ্ছেন মেয়েটার মাথায়। একবার উঠে বাথরুমে যাচ্ছেন, একবার উঠে পানি খাচ্ছেন। এভাবে কখন রাতটা কেটে গেছে। ভোরের আলো ফোটার পর হঠাৎ জামাল হোসেন বললেন, বাইরে কি চাঁদের আলো দেখা যাচ্ছে বিলকিস? চাঁদের আলো হবে কেন, দেখছ না ভোর হয়েছে? সত্যি বলছ ভোর হয়েছে! বলে একছুটে বাইরে চলে গেলেন জামাল। ফিরে এসে চিত্কার শুরু করলেন জামাল হোসেন, ভোর হয়ে গেছে, ভোর হয়ে গেছে...তার মানে আর কোনো চিন্তা নেই...আমি বেঁচে গেছি, আমি বেঁচে গেছি... ঘুমভাঙা চোখে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে তানিয়া আর তন্ময়, তাদের আব্বু তখনো চিত্কার করছে, আমি বেঁচে আছি...আমি বেঁচে আছি... সকালের দিকে ডাক্তার অবিনাশ এল, কী রে জামাল, বেঁচে আছিস? দৌড়ে গিয়ে বন্ধুকে জড়িয়ে ধরলেন জামাল, বেঁচে আছি দোস্ত। অবিনাশের দিকে তাকিয়ে বিলকিস বললেন, আপনার বন্ধু কি পাগল হয়ে গেল, অবিনাশদা? হেসে ডাক্তার বলল, না ভাবি, পাগলামির রোগে ধরেছিল, আজ থেকে ভালো হয়ে গেল। জামাল বললেন, আজ আমরা সবাই শিশুপার্কে যাব। অবিনাশ, তুই বউদি আর ছেলেমেয়েদের নিয়ে আমাদের সঙ্গে যাবি। আমি? আমার চেম্বার আছে না? আরে, এক দিন চেম্বারে না গেলে কিচ্ছু হবে না, আজ সবাই মিলে আনন্দ করব, আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি, আজ আমার জন্মদিন। বিলকিস অবাক হয়ে বলল, জন্মদিন? তোমার জন্মদিন তো আগস্টের ১ তারিখ। এটা আমার নতুন জন্ম বিলকিস, আজ সারা দিন আমরা মজা করব। অবিনাশ মিটিমিটি হাসছে। তানিয়া ও তন্ময় কিছুই বুঝতে পারছে না, কিন্তু আব্বুর আনন্দ দেখে তারা খুশি, আজ শিশুপার্কে যাবে, এই আনন্দে ভাই–বোনে নাচতে শুরু করল। এই গল্পটার লেখক আমি না


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৮৫ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ...